॥ দুই ॥
মিথ্যা বলার প্রতিভা জহিরের ছোটোবেলাতেই ছিল। মায়ের বকুনি থেকে বাঁচতে এতো বিশ্বাসযোগ্যভাবে ভাইদের ঘাড়ে দোষ ফেলতো যে তার অপরাধের সমস্ত শাস্তি তার ভাইদেরই ভোগ করতে হতো। শীর্ণ পায়ের জোরে সহানুভূতির সবটুকু সে নিজেই আদায় করে নিতো, একটা অপুষ্ট পায়ের সাথে তার সহোদরেরা টিকে উঠতে পারতো না।
স্কুলে ছুটির জন্য নিকটাত্মীয়দের মেরে ফেলতে কখনো কার্পণ্য করেনি সে। তার ছুটির প্রয়োজন মেটাতে প্রতিজনকে একাধিকবার মরতে হয়েছিল। নিকটাত্মীয়দের মৃত্যু, অসুখ বিসুখ ছাড়াও নিত্য নতুন অব্যর্থ অজুহাত সে আবিষ্কার করতে পারতো। এতো অজুহাত সে উৎপাদন করতো যে নিজের চাহিদা মিটিয়ে উপঢৌকনের বিনিময়ে অন্য ছেলেদেরকেও বিলাতে পারতো। পড়ালেখা বিশেষ করতো না সে, কিন্তু তাতে পরীক্ষায় পাশ করতে কোনো অসুবিধা হয়নি তার। ভালো ছাত্রদের বিভিন্ন প্রলোভনে আকৃষ্ট করে তাদের খাতা নকল করে করেই ক্লাসের সিঁড়ি চড়েছিলো সে। কাউকে লজেন্স আইসক্রিম, কাউকে গোপন উত্তেজনা, কাউকে পাশের বাড়ির ঝর্ণার সুনজর ইত্যাদির লোভ দেখিয়ে বশ করতো সে। খুব অল্পবয়সেই জহির বুঝেছিল মানুষ লোভী প্রাণী। অন্য পশুপাখি পেট ভরলে আর খায় না, মানুষের পেটের সাথে পকেটও আছে, পেট ভরে গেলে পকেটে পোরা শুরু করে। অতি বুদ্ধিমান মানুষও লোভের কাছে অহরহ পরাজিত হয়।
জহিরের মফস্বলের পারিবারিক জীবন বড়ো কোনো সংকট ছাড়া স্বচ্ছন্দে চলছিলো, কিন্তু বৈশাখের ঝড়ের মতো মধ্যবিত্ত সংসারে অনিষ্ট কোনো পূর্বাভাস না দিয়েই চলে আসে। একদিন জহিরের বাবা ডাক্তারের চেম্বার থেকে চোখে অসহায়ত্ব, হাতে প্রেসক্রিপশন আর বুকে ক্যান্সার নিয়ে ফিরলেন। অল্পকিছু জমিজমা, মায়ের গহনা, আঁচলে বাঁধা সঞ্চয় এবং তাদের নিশ্চিন্ত ভবিষ্যৎ সব ক্যান্সারের ভোগে গেল। কিন্তু বাপ তার বাঁচলো না, স্বামী অথবা গহনার শোকে মা-টাও বেশিদিন টিকলো না। গহনার শোকেই হবে হয়তো, তিন ভরির সোনার হার, হাফ ডজন চুড়ি, বাপের বাড়ি থেকে আনা ঝুমকা ইত্যাদির কথা স্মরণ করে যত চোখের জল ঝরেছে, স্বামীর জন্য ততটা নয়। বাপ মা না থাকলে ভাইবোনের বন্ধনও শিথিল হয়ে আসে। ভিটা বিক্রি করে ভাইরা যার যার প্রাপ্য নিয়ে নিজ নিজ পথ ধরলো, কারো খোঁজ কেউ রাখে না। সম্পদ নেই, তাই হিংসা প্রতিহিংসার সম্পর্কটুকুও রইলো না। জহিরের পথ তাকে নিয়ে আসলো শহরে, পকেটে তিনলাখ টাকা আর নকল করে পাওয়া কিছু সার্টিফিকেট নিয়ে সে সমৃদ্ধির সন্ধান করতে লাগলো।
সে জেনে এসেছে চাকরিতেই নিশ্চিত সমৃদ্ধি। উপরি আয়, চার চাকা, সুন্দরী বউ ইত্যাদির অভাব হবে না যদি একটা চাকরি জুটে যায়। চাকরির দাপটে বিয়ের বাজারে অসুস্থ পায়ের খুঁতটাও তখন ক্ষুদ্র হয়ে যাবে। কিন্তু পরীক্ষার এতগুলো বাধা ডিঙ্গিয়ে কেরানি হওয়ার জন্য আবার নতুন করে পরীক্ষায় বসা, এমন অমানবিক নিয়ম জঘন্য লাগে জহিরের। নকল করার সুবিধাটুকুও রাখেনি অবিবেচক কর্তারা। হিংসুটে ছেলেমেয়েগুলো তাকে একটুও সাহায্য করে না। তার পা দেখে এদের মায়া হয় না, চকলেট লজেন্সে এরা ভোলে না, তাকে উদ্ধারের জন্য পাশের বাড়িতে কোনো পরিচিত ‘ঝর্ণা‘ও নেই।
সারাদিন রাস্তায় দিশাহীন ঘুরতে থাকে জহির, কনুই ঠেলাঠেলি করে বাসে চড়ে, পার্কে বসে চাকরির বিজ্ঞাপন মুখস্থ করে, কম টাকায় নিত্য নতুন উপায়ে ক্ষুধা নিবারণ করে তারপর ক্লান্ত শরীর আর শুকনো মুখ নিয়ে মেসে ফেরে। যত দিন যাচ্ছিলো তার চেয়ার টেবিলে ঘেরা নয়টা পাঁচটার স্বপ্ন তত ফিকে হয়ে আসছিল। সুন্দরীরা সব গাড়িওয়ালাদের সাথে পেছনের সিটে বসে কালো কাঁচের আড়ালে চলে যাচ্ছে। ঘর্মাক্ত বাসে চড়ার জন্যও এখন তার ট্রাঙ্কের তালা খুলতে হয়। চপ্পল জোড়া শহরের ফুটপাতে ক্ষয়ে ক্ষয়ে ক্ষীণ হয়ে কোনোরকমে মুমূর্ষু প্রাণটা টিকিয়ে রেখেছে। অফিসপাড়ায় গিয়ে সে যখন নির্ভাজ শার্ট প্যান্ট, চকচকে চেহারা আর ঝকঝকে জুতা পরা চাকুরেদের দেখে, হিংসায় তার আত্মা জ্বলে যায়। তাদের গলায় ঝোলানো টাইগুলো জিব বের করে উপহাস করে তাকে। বসে বসে অভিশাপ দেয় সে, রাস্তায় জ্যাম লাগুক, অফিস টাইম পার হয়ে যাক, বেতন কাটা যাক তোদের। গালি অভিশাপ দিয়েও তার জ্বালা মিটে না, গলায় ঝুলে থাকা বেয়াদব টাইগুলোর অহংকার কেচি দিয়ে কেটে ছোটো করে দিতে ইচ্ছা করে।
হতাশায় হিংসায় সে বোধহয় পাগলই হয়ে যেতো, মেসের ভাড়া আর পেটের দায় মেটাতে ভিটা বেঁচা টাকাটাও হয়তো নিঃশেষ হয়ে যেতো, কিন্তু তাকে সেই অধঃপতন থেকে রক্ষা করেছে স্বপন মৃধা। তার কথা মনে পড়লে এত বছর পরও কৃতজ্ঞতায় কিছুটা নুয়ে যায় জহির। সেদিন মেসের সামনে চায়ের দোকানের বেঞ্চে তাকে প্রথম দেখেছিল জহির। বয়স মধ্য ত্রিশের আশেপাশেই হবে, চুল দাড়িতে আলস্য আছে, কিন্তু তাকে মানিয়ে গেছে খুব। সুদর্শন, সুপুরুষ এবং সদালাপী লোকটা তাকে নিজের পাশে ডেকে বসিয়েছিলো, সেই ডাকে স্নেহ টের পেয়েছিলো জহির। তার সাথে প্রথম দেখায় প্রায় সবাই তার চেয়ে তার পায়ের প্রতিই আগ্রহী হয় বেশি। পোলিও, টাইফয়েড নাকি দুর্ঘটনা, কারণ উদ্ঘাটন না করা পর্যন্ত শান্তি হয় না তাদের, কেউ কেউ কারণ নিয়ে বাজিও ধরে নিজেদের মধ্যে। যারা একটু ভদ্রগোছের তারা আড়চোখে তাকায়, যাদের ভদ্রতার বালাই নেই তারা প্যান্ট গুটিয়ে তার পায়ের পরিধি মাপে, সবল পা-টার সাথে দুর্বলটার তুলনা করে। কিন্তু এই লোকটা একবারের জন্যও তার পা নিয়ে কোনো কথা তুললো না, লুকিয়ে দেখবার কোনো চেষ্টাও করলো না। এক কাপ চা শেষ হওয়ার আগেই স্বপন মৃধা হয়ে গেল স্বপনদা। জহির ‘তুমি’র দূরত্ব ঘুচিয়ে ‘তুই’ এর গণ্ডিতে ঢুকে পড়লো। ,
আমি এই মেসেই থাকি, দোতলায়। তোকে তো দেখিনি আগে।
প্রমিত ভাষায় কথা বলে স্বপন, কিন্তু শুনতে আরোপিত মনে হয় না, আঞ্চলিকতা লুকানোর বাড়তি প্রচেষ্টা নেই, একেবারেই সহজাত। কথা শুনেই তার শিক্ষার পরিমাণ এবং বংশের উচ্চতা নিয়ে ধারণা পাওয়া যায়। জহির বলে, আমি আসছি বেশিদিন হয় নাই, মাস তিনেক।
স্বপন মৃধার উজ্জ্বল পোশাক আর ব্যক্তিত্বের তুলনায় মলিন পরিচ্ছদে ম্রিয়মাণ দেখায় জহিরকে, কণ্ঠেও বিরাজ করে মধ্যবিত্তের আড়ষ্টতা।
চাকরি নাকি মামলা?
চোখ নাচিয়ে জিজ্ঞাসা করলো স্বপন
চাকরি।
কোনো সুবিধা যে হয়নি তা তো বোঝা যাচ্ছে কিন্তু অমন শুকনা মুখ নিয়ে কেউ আমার সামনে ঘুরলে সহ্য হয় না, জীবনে এত সিরিয়াস হতে নেই। সিগারেট চলবে?
একটা সোনালি রঙের প্যাকেটের মুখ খুলে জহিরের সামনে ধরলো স্বপন। সিগারেটে জহিরের অরুচি নেই, বিশেষ করে বিনা পয়সায় পেলে তৃপ্তি আরো বেশি হয়। ইতস্তত করে সে একটা সিগারেটকে দুই আঙ্গুলে চিমটি দিয়ে উঠিয়ে নিলো। জীবনের অপ্রাপ্তি, অনিষ্ট, অনিশ্চয়তা সব কিছুক্ষণের জন্য ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে রইলো। দুশ্চিন্তা থেকে সাময়িক বিরতি নিয়ে খুব আরাম হলো জহিরের। কিন্তু একটা সিগারেটকে ধ্বংস করতে কত সময়ই বা লাগে!
সিগারেট খেতে মন চাইলে আমার ঘরে চলে আসবি
নিমন্ত্রণ করলো স্বপন। তারপর থেকে দোতলার দক্ষিণ দিকের ঘরে জহিরের যাতায়াত বাড়তে লাগলো। স্বপনের ঘরে অন্যসব ঘরের মতো দারিদ্র্যের কুৎসিত চিহ্ন ছড়িয়ে ছিটিয়ে নেই। তার বিছানায় তেল চিটচিটে নোংরা চাদর নেই, বালিশে লালার দাগ লেগে নেই, তার মশারি মাকড়সার জালের মতো ঝুলে থাকে না। ঘাম আর ছত্রাকের স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধটাও এই ঘরে অনুপস্থিত। দামি পারফিউমের সাথে সিগারেটের ধোঁয়া মিলে যে গন্ধটা হয় তাতে আভিজাত্য আছে। স্বপনের মানিব্যাগের টাকা কখনো ফুরায় না, আয়েশ করা ছাড়া তার আর কোনো কাজ নেই।
স্বাধীনতার লোভে ঘর ছেড়েছে স্বপন, অর্থ সম্পদ যতটুকু অবহেলা করলে আয়েশের ঘাটতি হয় না ততটুকুই করেছে সে। চাইলে সে নিজেদের বাগানসমৃদ্ধ বাড়িতে থাকতে পারে, দুই সিটের গাড়ি নিয়ে ছুটতে পারে অচেনা রাস্তায়, গ্রীষ্মকালে শীত উদযাপন করতে যেতে পারে পৃথিবীর অপর প্রান্তে। কিন্তু সেজন্য তাকে তার বাপ মায়ের বাধ্য হতে হবে, গলায় দড়ি পরে সংসারের নাটকে শামিল হতে হবে।
জহির অভিভূত হয়, সংসার থেকে বাঁচতে বিলাসিতা ত্যাগ করেছে এই লোক, অথচ সে এক পায়ে সংসারকে তাড়া করে ফিরছে। স্বপনের মধ্যে কোনো আক্ষেপ নেই, জীবনটাকে সে চেটেপুটে উপভোগ করছে। সিগারেটের উপলক্ষ্যে জহির স্বপনের কাছে জীবনের অল্প একটু স্বাদ নিতে আসে। মাঝে মাঝে অবশ্য হতাশা তার চোখমুখ ফুড়ে বের হয়ে আসে। স্বপন তাকে সাহস জোগায়, চাকরি বাদে ভিন্ন কিছু চিন্তা করতে বলে। কিন্তু জহির খুব নিরুপায় বোধ করে, যে টুকু বিদ্যা তার পেটে আছে তাতে চাকরি জোটে না, আর যেটুকু অর্থ তার ট্রাঙ্কে আছে তাতে ব্যবসা ঘটে না।
জহিরের অসহায়ত্বের সাথে সাথে স্বপনের মমতা বৃদ্ধি পায়। একদিন স্বপন জহিরকে জানায়, জগতে কিছু পেতে হলে যেমন কঠিন পথ আছে, তেমনি পয়সা খরচ করলে সহজ পথও তৈরি করা যায়। যাদের পয়সা নেই তারা এই নিয়ম মানতে চায় না, পয়সাওয়ালাদের তারা নীতির দড়ি দিয়ে বাঁধতে চায়। উদাহরণ দেয়ার জন্য নিজের বাপকে হাজির করে স্বপন, এত বিত্ত ন্যায়ের সরু পথ ধরে আসতে পারে না। জহিরকে সে বলে যে তার পরিচিত একজন লোক আছে, চাকরি পাওয়ার পেছনের দরজাটা তার জানা আছে। জহিরের ন্যায় নীতির বালাই নেই, তাকে অনৈতিক উপায় দেখানোর আগে কোনো ভূমিকার প্রয়োজন ছিল না। সে অবিলম্বে রাজি হয়ে গেল।
পরের সোমবার সেই পরিচিত লোকের সময় পাওয়া গেল। দুপুরবেলা স্বপন আর জহির বিদেশি অক্ষরে লেখা সাইনবোর্ড সমৃদ্ধ এক রেস্টুরেন্টে ঢুকলো, জহির এমন জায়গায় আসেনি আগে আর। রেস্টুরেন্টের ভিতরে কাঁচের সমাহার। দরজা, জানালা, দেয়াল, টেবিল সব কিছু কাঁচের। ভিতরে মৃদু শব্দে ভীনদেশি সংগীতের সাথে চামচ আর চীনা মাটির কলহের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। মানুষ কথা বলছে নিচু গলায়, হাসছে মুখ চেপে, খাচ্ছে দায়িত্ব পালনের মতো। বাংলাদেশের মধ্যে এ যেন ভিন্ন এক সভ্যতা।
মিনিট বিশেক কাঁচের টেবিলে কনুই পেতে বসে থাকার পর একটা লোক হাতে পায়ে ব্যস্ততা নিয়ে তাদের টেবিলের দিকে এগিয়ে আসলো। লোকটার গায়ে ধবল বকের মতো শাদা শার্ট, ফর্সা গাল নিয়মিত পরিচর্যার কারণে সবুজাভ হয়ে আছে, চুল উর্দি পরা সৈন্যর মতো সুশৃঙ্খল। গলায় টাই পরিমাণ মতো ঝুলছে, পেটের মাঝামাঝি থেমে যাওয়া আনাড়ি না, আবার নাভির নিচে নেমে যাওয়া বেহায়াও না। পরিচ্ছদ এবং পরিপাট্যে লোকটা বয়স এমন লুকিয়েছে যে সহজে আন্দাজ করা যায় না। লোকটা কাছে আসতেই আফটার শেভের সুগন্ধ বিকিরিত হতে লাগলো। স্বপনের দিকে হাত বাড়িয়ে আন্তরিক ভঙ্গিতে মাথা নোয়ালো লোকটা, জহিরকে যেন দেখলোই না। চেয়ারে বসে কিছুক্ষণ করলো কুশল বিনিময় আর কিছুক্ষণ খোঁজ খবর না নেয়ায় একে অপরের প্রতি জানালো অভিযোগ অনুযোগ। স্বপনের সম্বোধন থেকে জহির জানতে পারলো লোকটার নাম মিহির। এই কয়েক মিনিটের মধ্যে মিহির সাহেব অন্তত চারবার ঘড়ির দিকে তাকালো। স্বপন সেটা লক্ষ করে বললো, খুব বিজি নাকি?
আর বলবেন না, একেবারে জানে মেরে ফেলছে। প্রমোশনের পর থেকে লাঞ্চের টাইমটাও ঠিকমতো পাচ্ছি না।
লোকটার কথায় অনুযোগ ছিলো কিন্তু তার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে না লাঞ্চে পর্যাপ্ত সময় না পেয়ে সে খুব অখুশি, তার স্বাস্থ্যেও অপুষ্টির কোনো লক্ষণ নেই।
আচ্ছা, কাজের কথা বলি, আপনাকে যে ছেলেটার কথা বলেছিলাম এই সেই ছেলে।
স্বপনের দৃষ্টি অনুসরণ করে এই প্রথম মিহির সাহেব জহিরের দিকে তাকিয়ে দেখলো। সামান্য একটু ঠোঁট বাঁকা করে জহিরকে অভিবাদন জানালো নাকি তাচ্ছিল্য করলো বোঝা গেল না। স্বপনকে বললো, স্বপনদা আপনার ক্যান্ডিডেট, কোনো সমস্যা হবে না, কিন্তু টাকা লাগবে পাঁচ লাখ।
জহিরের ম্রিয়মাণ চেহারায় যে নিভু নিভু প্রদীপ জ্বলছিলো তা দপ করে নিভে গেল। অন্ধকার মুখে জহির স্বপনের দিকে তাকালো। স্বপন বুঝতে পেরে মিহির সাহেবকে বললো, ইটস ঠু মাচ ফর হিম।
স্বপনদা আজকালকার খবর আপনি জানেন না, পিপল আর উইলিং টু গিভ টেন টু ফিফটিন লাক ফর দিস জব। হি ইজ ফিজিক্যালি চ্যালঞ্জড, কোটা আছে, সেটাই সুবিধার কথা, তাই কম লাগছে। তাছাড়া আমি তো আমারটা ছেড়েই দিয়েছি, বাকিরা তো আর ছাড়বে না, এর চেয়ে কম সম্ভব না।
এরমধ্যে বেয়ারা এসে তিনটা মগ রেখে গেল, তাতে খয়েরি ফেনা। কয়েকটা চুমুক দিয়ে মিহির সাহেব আবার ঘড়ি দেখলো। পকেট হাতড়ে একটা কার্ড বের করে জহিরের দিকে বাড়িয়ে দিলো। মিহির চৌধুরীর নামের নিচে কয়েকটা রোমান হরফ পাশপাশি বসে তার উচ্চপদের পরিচয় দিচ্ছে।
আগামী বুধবারে এসো, টাকাটা নগদ নিয়ে আসবে, বড়ো নোটে। পরীক্ষার ব্যাপারটা আমরা সামলে নিবো, কিন্তু ভাইভাতে সব কাগজপত্র নিয়ে চলে আসবে, উইথ ফরমাল এ্যটায়ার।
কাঁচের টেবিলের ভিতর থেকে জহিরের শুকনো পা-টাতে চোখ বুলিয়ে বললো, ভাইভাতে তোমার সমস্যা হবে না, ইউ গট দিস জব
এই সুখবরেও জহিরের মুখ উজ্জ্বল হলো না। পঙ্গু পায়ের কল্যাণে অনেক টাকা তার সাশ্রয় হয়েছে তবুও হিসাব করে ঘাটতি মেটাতে পারছে না সে। মিহির চৌধুরি ঘড়ির তাড়া খেয়ে উঠে দাঁড়ালো। বিদায়ের সময় স্বপনের সাথে হাত মিলিয়ে চলে গেল, এবারও জহিরকে চেয়েও দেখলো না। বেয়ারা বিল দিয়ে গেল, বিলের অঙ্ক দেখে জহিরের অন্ধকার মুখ এই শীততাপ পরিবেশেও ঘামতে লাগলো। এই টাকায় একমাস ভাত খেতে পারে সে। স্বপন তার হাত থেকে বিলের কাগজ নিয়ে নিজের মোটা মানিব্যাগ খুলে জহিরকে স্বস্তি দিলো। জহির তার মগের অবশিষ্ট তরল শেষ বিন্দু পর্যন্ত চুকচুক করে খাওয়ার চেষ্টা করছে, এক ফোঁটাও অপচয় করতে চায় না সে। গায়ে তার কাঁটা দিয়ে উঠছে, প্রাপ্য সম্মান না দিয়ে এত দামি তরল কী অবহেলায় এতক্ষণ গিলেছে সে!
একদিনের ব্যবধানে এতগুলো টাকা জোগাড় করার কোনো উপায় খুঁজে পায় না জহির। বেচার জন্য ভিটাও অবশিষ্ট নেই তার, ভাইদের কাছে গেলে মেরে অন্য পা-টাও ভেঙ্গে দিবে। এত বড়ো সুযোগ অপচয়ের হতাশায় স্বপনের ঘরে বসে তার প্যাকেট থেকে নিঃসংকোচে একটার পর একটা সিগারেট পোড়াতে থাকে জহির। স্বপনের সান্ত্বনাতেও নিঃশ্বাস তার স্বাভাবিক হয় না। ধোঁয়া আর দীর্ঘশ্বাসে ভরে যায় স্বপনের ঘর। নিজের সিগারেটগুলোকে রক্ষা করার আর কোনো উপায় না পেয়ে, স্বপন তার ড্রয়ারের থেকে দুটি নোটের বান্ডেল বের করে জহিরের সামনে রাখলো। বললো, পুরুষ মানুষের অমন শাবানামার্কা চেহারা দেখতে ভালো লাগে না, নে, যা চাকর হ গিয়ে।
স্বপনের কথা শুনে জহির হতবাক হয়ে রইলো। ধোঁয়ার মধ্যে স্বপনের আবছা মূর্তিটাকে স্বর্গ থেকে আবির্ভূত ঝাঁকড়া চুলের হাফপ্যান্ট পরা কোনো দেবতা মনে হচ্ছে। তার প্রয়োজনটা এত বেশি যে ভদ্রতা করে টাকা নিতে অস্বীকৃতি জানানোর অভিনয়টা পর্যন্ত করতে পারলো না। জহিরের স্তম্ভিত মুখ দেখে স্বপন বললো, খবরদার, ধন্যবাদ টন্যবাদ দিবি না, টাকা আমায় ফেরত দিতে হবে, একবারে না পারলে মাসে মাসে দিবি I
জহির ধন্যবাদ দিলো না, কিন্তু আবেগে চোখ তার ছলছল করে উঠলো। স্বপন হুমকি দিলো, যদি কাঁদা টাদা শুরু করিস তো চড় খাবি বলে দিলাম।
চড় খাওয়ার আশঙ্কা সত্ত্বেও শেষের আদেশটি পালন করতে পারলো না জহির।
পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে একটা স্বপ্ন নিয়ে ফিরলো জহির। এতদিন তার ঠিকমতো ঘুম আসেনি দুশ্চিন্তায়, আজ রাতে ঘুম আসছে না উত্তেজনায়। বুকের পাথর সরাতে গিয়ে ট্রাঙ্ক খালি করতে হয়েছে তার, তবুও হালকা বোধ করে সে। এমন কতো ট্রাঙ্কের চাবিতে তার বউয়ের আঁচল ভারী হয়ে থাকবে! সেই আঁচল যখনি সে সরাতে যাবে চাবিরা ঝনঝন শব্দে তার বৈভবের পরিমাণ জানিয়ে দিবে। ভাবতেই রোমাঞ্চ অনুভব করে জহির।
নারীর লাজুক আঁচলে নাকি চাবির ঝনঝন শব্দে, কীসে যে বেশি রোমাঞ্চ হয় জহির বুঝতে পারে না।
সিগারেট খেতে খেতে নেশা হয়ে গেছে জহিরের, সকালবেলা একটা সিগারেট আর স্বপন মৃধার দর্শন না হলে দিন যেন তার শুরুই হয় না ৷ স্বপন এবং সিগারেট কোনোটাই পাওয়া গেল না, স্বপনের দরজার আংটা দুটিকে আঁকড়ে ধরে আছে একটা সোনালি তালা। ‘স্বপনদার পিঠে ডানা আছে, কোথায় উড়তে গেছে কে জানে!’ ভাবলো জহির। তারপর গতরাতে বোনা স্বপ্নটাই জাবর কাটতে কাটতে সারাদিন পার করলো সে। সন্ধ্যায় এসে দেখলো তালাটা এখনো পাহারায় বহাল আছে। স্বপনকে ফোন করতেই একটা যান্ত্রিক নারীকণ্ঠ দুঃখপ্রকাশ করলো। বিছানায় শুয়ে জহির কল্পনায় তার বাসর রচনা করতে লাগলো, কিন্তু আগের রাতের মতো ভাবনাটা আজকে অত জমলো না। ‘স্বপনদার আবার কী হইলো এই চিন্তাটা দেবী মনসার মতো তার বেডরুমের ছিদ্র গলে ঢুকে পড়ছে
দুই দিন অপেক্ষা করলো জহির, কিন্তু স্বপনের ঘরের তালা খুললো না। একটা দুর্ভাবনা মনের মধ্যে পাক খেয়ে উঠছে, কোনোমতেই ধামাচাপা দিতে পারছে না। স্বপনের খোঁজ জানার জন্য অনেক সঙ্কোচের পর ব্যস্ত মিহির চৌধুরিকে ফোন করলো জহির, যান্ত্রিক কণ্ঠ জানিয়ে দিলো, যাকে সে ফোন করেছে সে এখন তার আওতার বাহিরে আছে। জহির বিমূঢ় হয়ে বসে রইলো, কিছুই ভাবতে পারছে না সে, ট্রাঙ্কের মতো মাথাটাও তার খালি হয়ে গেছে।
মিহির চৌধুরির চার রঙের দামি কার্ডটাতে লেখা ঠিকানায় গিয়ে আবিষ্কার করলো, তার মতো আরো অনেকে কার্ড হাতে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সবার চোখেমুখে বিহ্বলতা, কী হয়েছে ঠিক যেন বুঝতে পারছে না কিংবা বুঝতে চাইছে না। জহির তাকিয়ে দেখছে চারপাশে, এই মুখগুলোতে সে নিজেকেই দেখতে পেলো। টাকা বাঁচানোর জন্য অখাদ্য খেয়ে গালের হাড় বেরিয়ে গেছে, পায়ে সেলাই করা স্যান্ডেল, গায়ে রওজ্বলা শার্ট, হাবাগোবা ছাপ মারা মফস্বলের চেহারা। অফিসে তারা ঢুকতে পারছে না। দারোয়ান এসে জানিয়ে দিলো, এখানে এই নামে কোনো কর্মকর্তা নেই। তবুও তারা সরছে না, এই ঠিকানাটুকু ছাড়া তাদের কিছুই অবশিষ্ট নেই আর। এতক্ষণ যা সবার মনে ঘাপটি মেরে পড়েছিলো কিন্তু মুখে আনার সাহস কেউ করেনি, অফিসের এক কর্তা এসে তা প্রকাশ করে গেল। জানিয়ে গেল, তারা প্রতারিত হয়েছে, এখানে বসে থেকে কোনো লাভ হবে না। পুলিশের কাছে যাওয়ার পরামর্শও দিলো। নিঃস্ব হওয়ার মতো আর কিছুই বাকি নেই তাদের, তাই থানায় যাওয়ার কথা কেউ চিন্তাও করলো না। কেউ বসে পড়লো গালে হাত দিয়ে, কেউ মাথা চাপড়ে বিলাপ শুরু করলো, গালাগালি করে কেউ কেউ মনকে প্রবোধ দেয়ার চেষ্টা করলো। জহির দাঁড়িয়ে রইলো স্তব্ধ হয়ে, কিন্তু তার মধ্যে কোনো ক্ষোভ নেই। সে অভিভূত হয়ে আছে, জাদুকরের জাদু শেষ হলে দর্শক যেমন হতবাক হয়ে থাকে।
হৃদয় হাতড়ে স্বপনের জন্য কোনো অশ্রদ্ধা খুঁজে পেলো না জহির। অস্ত্র দিয়ে নয়, শক্তি দিয়ে নয় কেবল বুদ্ধির জোরে তার টাকাটা লুটে নিয়ে গেছে স্বপন। নিজে সে কম বুদ্ধিমান না, কিন্তু বুদ্ধির খেলায় যে তাকে হারিয়েছে তার প্রতি সম্মান না জানিয়ে পারে না। মনের তলায় অল্প একটু আবেগ তার জমা ছিলো, সেটাই তার দুর্বলতা। কে যেন কাঁদছে তার পাশে বসে, বাপের গরু বেচে আর ঋণ নিয়ে টাকাটা সে তুলে দিয়েছিলো ঐ পাষণ্ডের হাতে। জহির নোনা জলে মাখামাখি ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে, একটুও করুণা হয় না তার। এইসব লোভী, হাভাতে, বেকুবদের দেখে বরং ঘৃণা আসে মনে, ঘৃণার তেজে বাকি আবেগটুকুও বাষ্প হয়ে যায় তার। জহিরের মনে হয়, যাদের বুদ্ধি কম কিন্তু লোভ বেশি তাদের ঠকানোটাই ন্যায্যতা। বাঘ হরিণ ধরে খেলে তাকে তো ধরে ফাঁসি দেয়া হয় না। শিকারির সাথে শিকারের সম্পর্ক এমনই প্রাকৃতিক। মুখে ব্যঙ্গের হাসি নিয়ে জহির প্রতারিতদের শোক দেখে, মনে অদ্ভুত আনন্দ হয় তার
সবার অলক্ষে এই শহরে জন্ম নেয় আরেকজন শিকারি।
