॥ তিন ॥
দার্শনিকেরা মানুষের চরিত্র সম্পর্কে যতটুকু জ্ঞান রাখেন, চোর লুটেরা প্রতারকদের রাখতে হয় তার চেয়ে একটু বেশি। তাই কখনো না পাওয়া চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে মানুষ দেখার জন্য জহির পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। অনেক উঁচু থেকে দেখলে সব মানুষকে একই রকম লাগে, পিঁপড়াদের যেমন দেখা যায়, তারা ছোটাছুটি করে খাবার আর আশ্রয়ের জন্য। উঁচু থেকে নিচুতে নামলে দেখা যায় মানুষ আসলে সব আলাদা। একই প্রজাতির প্রাণী লিঙ্গে, রঙে, আকারে, সম্পদে, ধর্মে বিভিন্ন জাতের হয়ে যায়
জহির মানুষের চেহারা দেখে তাদের পকেটের স্বাস্থ্য মাপে। নারীদের দেহের ভাঁজ তাকে আকর্ষণ করে না, মোটা মানিব্যাগে উঁচু হয়ে থাকা পুরুষদের পশ্চাত দেখলে লোভ হয় তার। সুন্দরীদের দেহের চেয়ে গয়নার দিকেই তার নজর বেশি। চোখ দিয়ে পরখ করে সে বুঝতে চেষ্টা করে গয়নায় সোনা আছে নাকি সোনালি ধোঁকা। অন্ধ ভিক্ষুকটার থালায় পড়ে থাকা দশ বিশ টাকার নোটগুলো উদ্ধার হওয়ার জন্য আর্তি জানায় তার কাছে। এক্সরে রিপোর্ট হাতে নিয়ে গ্রাম থেকে আসা উদ্ভ্রান্ত মানুষদের দেখে তার চোখ চকচক করে, খুব সহজে তাদের নিঃস্ব করে দিতে ইচ্ছা করে। অল্প একটু আবেগ পুষে রাখার জন্য যে ক্ষতি তার হয়েছে, নিষ্ঠুর হয়ে তার চেয়ে অনেক বেশি শোধ করে নিবে সে। জগতের কারো প্রতি এতটুকু মমতা অবশিষ্ট নেই তার।
মানুষ সম্পর্কে বিদ্যা যথেষ্ট সংগ্রহ করেছে জহির কিন্তু লুট করার সাহসটা এখনো আহরণ করতে পারেনি। মেস মালিকের তাগাদার ভয়ে সারাদিন রাস্তায় কাটায়, গভীর রাতে নিঃশব্দে মেসে ঢোকে। রাস্তার ধুলোতে জামা কাপড় ময়লা হয়েছে, মুখ হয়েছে মলিন। জহিরের চেহারায় নিশ্চয়ই দীনভাব চলে এসেছে। সেদিন এক চায়ের দোকানদার খুব উৎকটভাবে তাকে তার দোকানের সামনে থেকে সরে যেতে বললো। কয়েকদিন আগেও এত তাচ্ছিল্য সইতে হয়নি তাকে। একটু ময়লা লেগেছে গায়ে তাতেই লোকের চোখে ঘৃণা আর সন্দেহ বেড়েছে। পথে ঘুরতে ঘুরতে ভালো পায়ের চপ্পলটার একটা ফিতাও অবিবেচকের মতো ছিড়ে গেল, এখন সে দুই পায়েই খুঁড়িয়ে হাঁটে।
পেটে খাবার না পড়লে ছেড়া জুতা নিয়ে বেশিদূর হাঁটা যায় না। ক্লান্ত হয়ে রাস্তার পাশে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো জহির। রাস্তায় প্রচণ্ড ভিড়, তিন চাকা, চার চাকার একই গতি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জ্যামে আটকে পড়া মানুষের বিরক্তি উপভোগ করতে থাকে সে। কারো জন্য অপেক্ষা করছে বসের চোখ রাঙানি, কাউকে হয়তো প্রেমিকার দোর্দণ্ড অভিমান মোকাবিলা করতে হবে, কারো বাচ্চার স্কুল ছুটি হয়ে গেছে, কারো বাজারের ব্যাগে মাছ পচে যাচ্ছে। তারা অস্থির হয়, সময় দেখে ঘড়িতে, ফোনে কৈফিয়ত দাখিল করে। যাদের হর্ন আছে তারা ঘনঘন অকারণে বাজায়, যাদের নেই তারা করে গালাগালি। মানুষের এত দুর্ভোগ দেখেও ক্ষুধাটা ভুলে থাকতে পারছে না জহির। একটা লাল রঙের চকচকে গাড়ি তার সামনে এসে আটকালো, হঠাৎ গাড়ির কালো কাঁচ অর্ধেক নেমে গেল। ভিতর থেকে স্থূলাঙ্গী মধ্যবয়স্কা তার দিকে একটা বিশ টাকার সবুজ নোট ছুড়ে দিলো, মহিলার সারা গা মেদ আর চকচকে সোনালি অহংকারে ভরা। নোটটা উড়ে জানালা পার হওয়া মাত্র মহিলাটা কাঁচ তুলে দিয়ে বিভেদের আড়ালে চলে গেল। হাত তো পাতেনি জহির, তবে কি তার ক্ষুধার্ত চেহারাটাই আর্তি জানাচ্ছিলো? নোটটাকে উপেক্ষা করতে পারেনি সে। বিশ টাকার বিনিময়ে যথেষ্ট আত্মতৃপ্তি আর জহিরের বাকি আত্মসম্মানবোধটুকু ছিনিয়ে নিয়ে গাড়িটা চলে গেল। পাপ তারা করে কোটি টাকার, পূণ্যের জন্য রাখে খুচরো নোট। তারপর হাত পাততে আর কোনো অসুবিধা হয়নি জহিরের। পূণ্য বিতরণের ব্যবসাঁটা ভালোই চলে এখানে, এই শহরে পাপীর অভাব নেই।
ধীরে ধীরে ভিক্ষার সব কায়দা সে রপ্ত করে ফেললো। অন্য ভিক্ষুকদের মতো ঘ্যানঘ্যানে মুখস্ত সুরে সে ভিক্ষা চায় না, কার কাছে কীভাবে চাইলে পকেট গলানো যাবে তা সে বুঝে ফেলেছে। স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েদের কাছে ভদ্রভাবে শুদ্ধ ভাষায় অসহায়ত্ব জানালে তারা টিফিনের টাকাও বের করে দিয়ে দেয়। অফিসপাড়ায় খোঁড়া পা না দেখালে কেউ এমনি এমনি পকেটে হাত দেয় না। গ্রাম থেকে বাসে ট্রেনে শহরে আসা গৃহিণীদের কিছু বলতে হয় না, ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকলেও তারা আঁচল খুলে টাকা দিয়ে যায়। যেখানে উঁচু দালান বেশি, প্রাচুর্য অত্যধিক, যেখানে প্রায় সবার চোখে কালো চশমা থাকে, তাদের আচরণ হয় প্রভুর মতো, যথেষ্ট কাকুতি মিনতি করে খুশি করতে না পারলে একটি পয়সাও কেউ দেয় না।
মেস ছেড়ে দিয়েছে জহির, এতো ধুলো নিয়ে ভদ্রলোকদের সাথে বসবাস করা যায় না। ভিখারি প্রজাতির সাথে সামঞ্জস্য করে সে থাকে ফুটপাতে, রেলের প্ল্যাটফর্মে, অথবা গাছের নিচে। ছাদ, মেঝে আর দেয়াল তিনটা একসাথে জোটে না কোনোসময়। মাঝে মাঝে ঘুমাতে দেরি হয় জহিরের, একটা ভাবনা মশার মতো গুনগুন করে তাকে জাগিয়ে রাখে। সেদিন একটা থেমে থাকা গাড়ির কাঁচে নিজেকে দেখে চিনতে পারেনি জহির। শরীরজুড়ে নোংরার সমাহার, চুল, দাড়িতে প্রায় জট লেগে গেছে, ত্বকে পড়েছে মাটির প্রলেপ, গাড়ির কাঁচের অস্পষ্ট প্রতিবিম্বেও হলদেটে দাঁত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, কয়েকটা মাছি উপগ্রহের মতো সবসময় তার চারপাশে ঘোরে। অথচ সে হতে চেয়েছিলো জাদুকর, ভোজবাজি দেখিয়ে বোকা মানুষদের সর্বস্বান্ত করে দিতে চেয়েছিলো। অসহায়ত্ব দেখিয়ে মানুষের করুণা আদায়ে কোনো বাহাদুরি নেই। ভিক্ষা করে নিজের বুদ্ধিমত্তার অপচয় করছে সে। কিন্তু হাত পেতে পেট ভরানো এত সহজ যে অন্যকিছু করার স্পৃহা সে পায় না।
জহিরের চপ্পল দুটো এমন দুস্থ হয়েছে যে, সেগুলোকে আর পায়ে পরা যায় না। বড়োজোর কাউকে অপদস্থ করার জন্য গলায় পরানো যায়, অথবা বদনজর থেকে বাঁচার জন্য ট্রাকের পেছনে ঝোলানো যায়। খালি পায়ে হাঁটতে পারে না জহির, ভদ্রজীবনের এই অভ্যাসটা এখনো ছাড়তে পারেনি সে। ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে সে একটা মসজিদের সামনে এসে দাঁড়ায়, মসজিদের সিঁড়িতে শত শত জুতা কবুতরের মতো জোড়ায় জোড়ায় বসে আছে। এক জোড়া উড়িয়ে দেয়ার ইচ্ছাটা কোনোমতে দমন করতে পারে না জহির। পূণ্যের ব্যবসা যে করে পাপের পরোয়া তার নেই। নিজের ছেড়া চপ্পল খুলে রেখে বাদামি নতুন এক জোড়া স্যান্ডেলে পা ঢোকায় সে, খুব আরাম হয়, তারচেয়ে বেশি হয় তৃপ্তি। জুতার মালিক এসে যখন তার জুতার জায়গায় ছেড়া চপ্পল দেখবে, কেমন তাজ্জব হয়ে যাবে। আশেপাশে খোঁজাখুঁজি করবে, না পেয়ে অবাক হয়ে মাথা চুলকাবে, ঘটনা উপলব্ধি করে মুখটা কেমন হা হয়ে যাবে, লোকটার বোকা চেহারাটা কল্পনা করতেই মনটা প্রফুল্ল হয়ে যায় জহিরের। সারাদিন ভিক্ষা করে হাত ভর্তি টাকা আয় করলেও এত সুখ তার কোনোদিন হয়নি।
নতুন জুতা পায়ে দিয়ে মোটামুটি সুস্থভাবে হাঁটে জহির, ভিক্ষা করতে ইচ্ছা করে না আর। সারাদিন পার্কে বসে রইলো সে, কত দয়ালু মানুষ সামনে দিয়ে হেঁটে গেল, একটু হাত বাড়ালেই পকেট ভরে যেত কিন্তু মানুষের কাছে চাওয়ার প্রবৃত্তি হারিয়ে ফেলেছে সে।
ফুটপাতে যারা শোয় অনিদ্রা রোগ তাদের নেই, ঐসব রোগ নরম বিছানার বিলাস। জহিরের প্রতিবেশী সবাই ঘুমাচ্ছে, রাতের অন্যসব শহুরে শব্দ ছাপিয়ে নিঃশ্বাসের গাঢ় গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে আশেপাশে। জহিরের সেই গুনগুন করা ভাবনাটাও তার ঘুম এত রাত পর্যন্ত ঠেকিয়ে রাখতে পারে না, আজ তাকে জাগিয়ে রেখেছে রাস্তার অন্যপাশে শুয়ে থাকা সালেহার কোমরে গুজে রাখা কয়েকটা বড়ো নোট। সকালের জুতা চুরির উত্তেজনাটা স্তিমিত হয়ে গেছে তার, এখন কাউকে না লুটলে শান্তি হচ্ছে না।
সালেহার হাত পা সব ঠিক থাকলেও চেহারায় এত এত অসামঞ্জস্য ভরা যে এই চেহারা দেখিয়েই ভিক্ষা আদায় করে সে। চোখ তার মারাত্মক ট্যারা, উপরের পাটির উচ্চাভিলাষী কয়েকটি দাঁত ভীষণ মুক্ত, ঠোঁটের বন্ধনে আবদ্ধ থাকে না তারা। গালের একপাশ পোড়া, স্বামীর সোহাগের চিহ্ন। অন্যপাশ খোস পাঁচড়ায় ঢাকা, এটা নিজস্ব অপরিচ্ছন্নতার ফল। তার থুতনিতে গজিয়ে ওঠা কয়েক গাছি দাড়ি দেখলে নির্লোম কিশোর ছেলেরাও লজ্জা পায়।
সালেহার ছেলে আছে একটা, কী যেন এক কঠিন অসুখ তার হয়েছে, রোগটার নামও সালেহা উচ্চারণ করতে পারে না। তার চিকিৎসার জন্যই ভিক্ষা করে টাকা জমাচ্ছে। টাকা রাখার জন্য নিজের কোমর ছাড়া আর কাউকে বিশ্বাস করে না সে। জহির চুপি চুপি উঠে চারপাশে তাকিয়ে সালেহার পাশে গিয়ে বসলো। সালেহার নাক প্রতিনিয়ত জানান দিচ্ছে যে সে ঘুমাচ্ছে। নাকের উপর ভরসা করে জহির নোংরা কম্বলের নিচে হাত ঢুকিয়ে সালেহার কোমরে হাত দিলো। নোটগুলো সে রেখেছে সালোয়ারের ভিতরের গোপন পকেটে। তাকে লুট করতে হলে সালোয়ারের ফিতা আলগা করতে হবে। সালোয়ারের গিট খুলতে গিয়ে জহির বুঝলো এরচেয়ে ব্যাংকের তালা ভাঙ্গা সহজ। হঠাৎ সালেহার নাক নিশ্চুপ হয়ে গেল, তার জাগ্রত হাত চেপে ধরলো জহিরের বিব্রত হাতকে। সালেহা চোখ খুলে জহিরের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত মুখভঙ্গি করলো, হাসার প্রচেষ্টা বলেই মনে হলো। জহিরের হাত ছেড়ে দিয়ে নিজেই গিট খুলতে লাগলো আর গলায় যথাসাধ্য আহ্লাদ ঢেলে বললো, একশডা ট্যাহা দেওন লাগবো কইলাম।
লাভ করতে এসে এমন ক্ষতির মুখে পড়তে হবে ভাবেনি জহির। সে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করলো। পেছন থেকে সালেহার আকুতি শোনা গেল, আইচ্ছা ফঞ্চাস ট্যাহাই দিছ।
‘ এত সস্তায় সদাই করতেও প্ররোচিত হলো না জহির। রাস্তা পার হওয়ার সময় জমে থাকা পানিতে নিজের ছায়া দেখতে পেলো জহির, নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো, সেইবা কোন রাজপুত্তুর! তারপর আবার সালেহার কাছে ফিরে গেল সে। খোলা আকাশের নিচে আবর্জনা এবং দুর্গন্ধের মধ্যে প্রথমবারের মতো পরিণত নারী দেহের সাথে পরিচয় হলো জহিরের।
নগরে থেকেও যারা সভ্যতার ছোঁয়া পায়নি, কুকুর বেড়ালের মত যারা চেয়েচিন্তে খায়, ঘুমায়, সঙ্গম করে তাদের একজনের ভিতরে প্রবেশ করে জহির বুঝলো, সে হয়তো রাজার কুমার নয় কিন্তু সে তাদের একজনও নয়। কেমন যেন কটু একটা স্বাদ তার মুখে লেগে রয়েছে, কুলি করেও যাচ্ছে না। নিজের গায়ের গন্ধ নিজের কাছেই অসহ্য লাগছে তার। রাস্তায় থেকে থেকে নিজেও সে জঞ্জাল হয়ে যাচ্ছে। পরদিন পুকুরে গিয়ে দশ টাকায় কেনা সাবান পুরোটা ক্ষয় করে গোসল করলো জহির। নাপিতের কাচির নিচে চুল দাড়ি পেতে দিলো। তারপর পরিষ্কার জামা কাপড় পরে একটা বাসস্থানের খোঁজে নামলো। পথে উচ্ছিষ্ট খেয়ে হজম করতে করতে সে ভুলে যেতে বসেছিলো, এই পৃথিবী থেকে করুণা ছাড়াও আরো বহু কিছু পাওনা আছে তার। বদহজম হয়েছে বলেই শোধ নেয়ার স্পৃহা তার ফিরে এসেছে। মাত্র পঞ্চাশ টাকার বিনিময়ে রাস্তার কুৎসিত আলিঙ্গন থেকে মুক্তি পেয়েছে সে।
