উন্মাদ আশ্রম – ৫

॥ পাঁচ ॥

একজন অনুগত শিষ্য পেয়ে লোক ঠকানোর নিত্য নতুন উপায় আবিষ্কার করতে থাকলো জহির। একটা অক্ষম পায়ের কারণে তাকে চিহ্নিত করা সহজ ছিল এতদিন, নিজের প্রতিভার পুরোটা ব্যয় করতে পারছিলো না সে। এখন কাদেরকে পেয়ে জহিরের যেন নতুন এক জোড়া হাত পা গজিয়েছে। বিস্তর টাকার আমদানি হতে থাকে, সাথে বাড়তে থাকে কাদেরের ভক্তি। জহিরের কাছে নিজেকে সে উজাড় করে দেয়, প্রথম প্রেমিকার স্তন কীভাবে স্পর্শ করেছে, সেই ঘটনা পর্যন্ত বাদ দেয় না। অথচ জহির তার চারপাশে একটা অলঙ্ঘনীয় দেয়াল তুলে রেখেছে, কাদেরের আবেগ সে দেয়ালে মাথা ঠুকে আহত হয়। জহির কোনোদিন কাদেরকে তার ঘরে নিয়ে যায়নি, এই নিয়ে এক ধরনের নীরব অভিমান আছে কাদেরের মধ্যে। এমনকি জহির তার আসল নামটাও জানায়নি কাদেরকে। তার ভিতরে অন্ধকার এতোটাই গাঢ় যে, মানুষকে বিশ্বাস করার মতো বিন্দু পরিমাণ আলো সেখানে অবশিষ্ট নেই ৷

এইটুকু দূরত্ব নিয়ে পথ চলতে তাদের অসুবিধা হচ্ছিলো না। কিন্তু গরীব লুটে আর কতই বা ঐশ্বর্য জমানো যায়! ছুঁচো শিকারে কাদেরের আর তৃপ্তি হয় না, সে হাতি মেরে একবারে বিত্তবান হতে চায়। পার্কের শক্ত বেঞ্চে বসে, লোক ঠকানো কয়েকটা টাকা পকেটে নিয়ে কোটি টাকার স্বপ্নে হারিয়ে যায় কাদের, আনমনে বলতে থাকে, প্রথমেই মায়েরে গয়না বানাইয়া দিমু, যা নিছি তার তিনগুণ, এরপর ক্যামনে মুখ কালা কইরা রাখে দেখুমনে। আব্বারে একটা সোনার ঘড়ি কিন্যা দিমু, তার বিয়ার ঘড়ি বেইচ্যা দিছিলাম দেইখা বুড়া কী হা-হুতাশ যে করছিলো! বইনেরে বিয়া দিমু দুই হাজার মানুষ খাওয়াইয়া, আব্বা যেদিন আমারে ঘর থেইকা বাইর কইরা দিছিলো বইনডা খুব কানছিলো। টিনশেড ঘর ভাইঙ্গা ডুপ্লেক্স বাড়ি তুলমু। গাড়ি কিনমু নতুন মডেলের, বেনসন কালার। সুলতানা আর সুলাতানার পোস্ট অফিসে চাকরি করা জামাইটা যখন রিকশা খুঁজবো, আমি গাড়ি থামায়া লিফট দিমু। পিছনের সিটে বসা সুলতানার দীর্ঘশ্বাস শুনমু।

জহিরের ধমকে সুলতানার দীর্ঘশ্বাস বাতাসে মিশে যায়। কিন্তু জহিরের শাসনও কাদেরকে বেশিক্ষণ মাটিতে রাখতে পারে না, কাদের মাঝে মাঝেই তার কাল্পনিক প্রাচুর্য নিয়ে অতীতের অবজ্ঞার প্রতিশোধ নিতে চলে যায়।

ছোটোখাটো শিকারের ফাঁকে ফাঁকে তারা খুঁজতে থাকে একটা মস্ত হাতি ৷ কাদেরের চেষ্টাই বেশি, সুলতানার দীর্ঘশ্বাস শোনার জন্য সে ব্যাকুল হয়ে আছে। অবশেষে সে নিজেই একদিন হাতির সন্ধান নিয়ে আসে।

হাতির নাম মোফাজ্জল মিয়া, তার দৈর্ঘ্য প্রস্থে যে অসামঞ্জস্য আছে তাতে তাকে দেখলে হাতি তো নয় বড়োজোর জিরাফ বলেই মনে হয়, তাও আবার অপুষ্ট জিরাফ। মাথাভর্তি ঘন লম্বা চুল ছাড়া দেহের আর কোথাও ঘন কিছু নেই, সবই পাতলা। তোবড়ানো গাল, সরু হাত, চুপসানো বুক নিয়ে গড়া তার দেহের নড়বড়ে কাঠামোটা শীর্ণ পায়ের উপর কোনোমতে দাঁড়িয়ে থাকে। তার পেট আর পিঠের মাঝে ব্যবধান সামান্য। গোঁফটা তার ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে কোনোমতে নাকের নিচে ঝুলে আছে। শরীরের যেসব হাড় জামাকাপড়ে ঢাকা যায় না সেগুলো নির্লজ্জের মতো চামড়ার সীমানা ঠেলে উঁকি দিয়ে থাকে। তার হাঁটাচলা মানেই হাড়গোড় নিয়ে বাতাসের সাথে লড়াই। পান খাওয়ার অভ্যাস আছে তার, কিন্তু পান কোনোদিন সাথে রাখে না, এইটুকু অতিরিক্ত ভারও সে বহন করতে পারে না, দোকান থেকে কিনে খায়। পানের বদৌলতে ফ্যাকাশে ত্বকে একমাত্র ঠোঁট দুটি তার রঙিন।

বছরখানেক আগেও মোফাজ্জল মিয়া বড় বাজারে আলু পটল বেচতো, বউ বাচ্চাসহ মোট ছয়জন মিলে গাদাগাদি করে শহরতলিতে দুই রুমের টিনশেড ঘরে ভাড়া থাকতো। তারপর কী যে জাদুর প্রদীপ পেয়েছে কে জানে! নিজের পাঁচতলা বাড়ি উঠেছে, বাচ্চাকাচ্চার গায়ে নতুন পোশাক চড়েছে, বউ তার আরো স্কুল হয়েছে। নিজের স্বাস্থ্য ছাড়া জীবনে আর সবদিকে সে উন্নতি করেছে।

কেউ বলে মাছের ব্যবসায় মোফাজ্জলের কপাল ফিরেছে, কেউ বলে ভাগ্য মাছে ফিরেনি, পীরের কেরামতি আছে। কিন্তু সেই পীরের নামধাম কেউ এখনো বের করতে পারেনি। তবে পীরের আস্তানাটা কাদের চিনে বাজারের পেছনে প্রায় পরিত্যক্ত রঙহীন যে বাড়িটা আছে, সেটার নিচতলায় মৎস্যজীবী সমিতির অফিস, ইঁদুরের বংশবৃদ্ধি ছাড়া তেমন কোনো কার্যক্রম নেই সেই সমিতির, অন্ধকারে কিছু চেয়ার টেবিল ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে থাকে। এমন নির্জীব নিচতলার উপরে দোতলায় বসে রঙের আসর। সেই বাড়ির একটা ঘরে একশো ওয়াটের বাল্বের নিচে বহুবার নিঃস্ব হয়েছে কাদের! জুয়াড়িদের সেই তীর্থস্থানে মোফাজ্জলকে মাঝে মাঝে দেখা যেতো। জুয়ার টেবিলে তাকে কখনোই বসতে দেখা যায়নি, সে এবং তার কণ্ঠার হাড় দুজনে উঁকি দিয়ে কৌতূহল নিয়ে টাকাপয়সার লেনদেন দেখতো, তারপর একসময় ভিতরের ঘরের অন্ধকারে হারিয়ে যেতো।

সারাজীবন লুঙ্গি পরতে অভ্যস্ত মোফাজ্জল মিয়া মাসের শেষ বৃহস্পতিবার প্যান্ট আর শার্ট পরে উশখুশ করে। চুলে তেল দিয়ে চিরুনি চালায়, গলার নিচে পাউডারের স্পর্শ দৃশ্যমান হয়। সকাল দশটা বাজলেই সে গিয়ে ঢোকে বাজারের পেছনে মৎস্যজীবী সমিতির অফিসে, একটা কালো ব্যাগ নিয়ে সে বের হয়ে আসে একটু পরেই। বাজারের মুখে বাদশাহ মিয়ার দোকান থেকে পান কিনে। তারপর রিকশা নিয়ে বাস স্ট্যান্ডে চলে যায়। সেখান থেকে সে মেঘনার বাসে ওঠে। বাসে উঠে পান মুখে দেয় সে। পান না খেলে বাসে বমি হয় তার। বাসের মাঝামাঝি বাম দিকে জানালার পাশে বসে সে। জানালার পাশে বসার জন্য ঝগড়া করতেও পিছপা হয় না, মুখে পান থাকলেও বমির আশঙ্কা তার পুরোপুরি যায় না। মেঘনার ঘাটে নেমে নৌকায় চড়ে সে, তারপর দুইদিনের জন্য তার আর কোনো হদিস থাকে না। জিজ্ঞাসা করলে বলে, পুকুরের জন্য পোনা কিনতে যায়। দুইদিন পর হাসিমুখের সাথে অনেক উপঢৌকন নিয়ে ফিরে আসে সে, কিন্তু কালো ব্যাগটি তার হাতে আর দেখা যায় না।

কাদের নিশ্চিত মোফাজ্জলের পাঁচতলার বাড়ি আর তার বউয়ের লাগামছাড়া স্থূলতার রহস্য সেই কালো ব্যাগেই আছে। ব্যাগটা কোনোমতে হস্তগত করতে পারলে হয়তো তাদের আর রাস্তায় ঘুরে শিকার খোঁজা লাগবে না।

জহির অবশ্য খুব বেশি আগ্রহ দেখায় না, আবার একেবারে অগ্রাহ্যও করে না। একটা পরিকল্পনা মাথায় ভাঁজতে থাকে সে ৷

কাদেরের সাথে জহিরের সাক্ষাৎ কমে আসে, দেখা হলেও মোফাজ্জলের বিষয়ে আর কোনো আলাপ জহির করে না। কাদের তাকে প্রায়ই তাড়া দেয়, প্রলুব্ধ করে, নিজেও প্রলুব্ধ হয়, টাকা পেলে কী কী উপায়ে সেগুলো অপচয় করবে বিশদভাবে বর্ণনা করে, জহির তাকে নিবৃত্ত করে না। শুধু থমথমে মুখে বসে কী যেন ভাবতে থাকে ৷

তারপর একদিন জহিরের মুখ থেকে মেঘ সরে রোদ আসে। সিগারেটে আয়েশ করে টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়লো সে, মুখের সামনে সিগারেটের ধোঁয়াগুলো অলস ভঙ্গিতে আড়মোড়া ভাঙছে। ধোঁয়ার আড়াল থেকে জহির হাসিমুখে তাকালো কাদেরের দিকে।

মোফাজ্জল মিয়া তোকে চিনে?

মনে হয় না।

রাত নয়টার আগে মৎস্যজীবী সমিতির দোতলায় কোনো আলো জ্বলে না, এখানে যারা যায় সবাই নিশাচর প্রাণী। দিনের আলোয় তাদের খুব একটা দেখা যায় না, দেখা গেলেও রাতের সহযাত্রীকে দিনের আলোয় অপরিচিতই লাগবে, তাদের পরিচয়ে রাতের একটা সংযোগ আছে। মোফাজ্জলকে কাদেরের মনে আছে তার বিশেষ দৈহিক বৈশিষ্ট্য এবং তার অলৌকিক উন্নতির কারণে। জহির আবার কী যেন ভাবে। জিজ্ঞাসা করে, পান দোকানদার বাদশাহ মিয়ার সাথে খাতির আছে?

বাদশাহ মিয়ার সাথে যতটুকু যোগাযোগ কাদেরের আছে তাকে ঠিক খাতির বলা যাবে না। মৎস্যজীবী সমিতির দোতলা থেকে শূন্য পকেট আর পরিপূর্ণ হতাশা নিয়ে সে বের হয়ে আসতো। বাদশাহ মিয়ার দোকানে এসে সিগারেট ধরিয়ে সেই হতাশা উদযাপন করতো। টাকা দিতে না পেরে প্রায়ই প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে সিগারেট কিনতো সে। সেই প্রতিশ্রুতি আজ অব্দি রক্ষা করা হয়নি, তাই খাতিরের ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারে না কাদের। জহির হেসে বলে, বাদশাহ মিয়ার কপাল ভালো, তার দেনা শোধ করার টাইম চইলা আসছে, মিষ্টিসহ।

জহির নিশ্চয়ই কিছু একটা ভেবে রেখেছে। তার ভাবনাটার নাগাল না পেয়ে কাদের বিভ্রান্ত হয়। জিজ্ঞাসা করে, মিষ্টি ক্যান?

জহির জানায়, কারণ কাদেরের চাকরি হয়েছে, সাথে হয়েছে সুবুদ্ধি। তাই ঋণের বোঝা সে আর বইতে চায় না, তাছাড়া চাকরি প্রাপ্তির মতো একটা সুখবর খবর খালি হাতে দেয়া ঠিক না। এইটুকু জানিয়ে জহির চুপ করে যায়। কাদেরের মনে আরো অনেক প্রশ্ন ঘুরঘুর করে, কিন্তু প্রশ্ন করলে হয়তো তার বুদ্ধির উপর জহিরের ভরসা আরো কমে যাবে, তাই প্রশ্নগুলো সিগারেটের ধোঁয়ার সাথে গিলে ফেলে। জহিরের চোখে সেই কঠিন দুর্বোধ্যতা এখন আর নেই, শুশুকের মতো কালো একটা রহস্য তার চেহারায় ভেসে উঠে আবার ডুব দিচ্ছে।

বুধবার সন্ধ্যায় কালো প্যান্টের মধ্যে সাদা শার্ট গুঁজে চাকুরে সেজে বাদশাহ মিয়ার পান সিগারেটের দোকানে হাজির হলো কাদের। রাতের খদ্দেরকে সন্ধ্যায় দেখে প্রথমে চিনতেই পারেনি বাদশাহ মিয়া। কাদেরের জামা কাপড়ের মতো কপালেও কোনো ভাঁজ নেই, ঘাড়ের উপর খোঁচা খোঁচা দাড়ির হতাশ মুখটাও অনুপস্থিত, শক্ত ঠোঁটে চাপা ক্ষোভ নেই, স্মিতহাস্যমুখি মসৃণ গালের কাদেরকে চিনতে তার ভালোই বেগ পেতে হলো। কাদেরের প্রতিশ্রুতিগুলো বাদশাহ মিয়া একদলা থুতু আর অনেকগুলো গালির সাথে মুক্ত করে দিয়েছিলো। অপ্রত্যাশিত টাকা আর মিষ্টি পেয়ে সে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে রইলো। মুখে অনেক দোয়া আশীর্বাদ করলো, আর মনে মনে গালিগুলোর জন্য হলো অনুতপ্ত

কাদেরের কাছ থেকে খুটিনাটি সব শুনে নিলো জহির। এখন একটা আশাই সে মনে মনে করছে, বাদশাহ মিয়ার মিষ্টিতে অরুচি কিংবা ডায়বেটিসের কঠোর প্রহরা না থাকলেই হলো।

বৃহস্পতিবার সকালে একটা অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটলো। ঝড় বৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এড়িয়ে, হরতাল অবরোধের মতো কৃত্রিম দুর্যোগকে পরোয়া না করে বাদশাহ মিয়া তার পান সিগারেটের দোকানটা খুলে বসতো সকাল আটটার মধ্যেই। কোনোদিন এক মিনিট দেরি হয়নি তার। কিন্তু আজ নয়টা বেজে গেল, বাদশাহ মিয়ার দোকানটা শীতার্ত বৃদ্ধের মতো তেরপল মুড়ি দিয়ে জবুথবু হয়ে বসে আছে। বাজারের মুখে প্লাস্টিকের কাউন্টারের পেছনে টুলে বসা ব্যস্ত বাদশাহ মিয়াকে পান সিগারেট বিতরণ করতে সেদিন আর দেখা গেল না। বাজারে আসা লোকজন প্রথমে পরিবর্তনটা বুঝতে পারে না, তবুও তাদের চোখে একটা অস্বস্তি লেগে থাকে, কী যেন একটা নেই। পরে জানা গিয়েছিলো, বাদশাহ মিয়া সপরিবারে উদরাময়ে আক্রান্ত হয়েছে, তার সমস্ত ব্যস্ততা সেদিন অন্য কাজে ব্যয় হয়েছিলো। কী জানি কী ছাইপাশ তারা খেয়েছিলো!

সকাল দশটায় মোফাজ্জল অভ্যাস মতো বাদশাহ মিয়ার পান দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায়। বন্ধ দোকান দেখে সে কিছুটা বিহ্বলতায় আক্রান্ত হয়। কী যেন তার এলোমেলো হয়ে গেছে, বকের মতো লম্বা গলা দিয়ে সে এদিক সেদিক তাকায়। খালি মুখে পেট্রোল বিহীন গাড়ির মতো সে নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইলো। ঠিক সেই মুহূর্তে তাকে সংকট থেকে মুক্তি দিলো একজন ভ্রাম্যমান পান সিগারেটের দোকানদার, লোকটার একটা পা শুকিয়ে মরা ডালের মতো শীর্ণ হয়ে গেছে। কাঠের ট্রে গলায় ঝুলিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সে পান সিগারেটের গ্রাহকদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে। ট্রেতে অনেকগুলো সিগারেটের প্যাকেট সৈন্যর মতো সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সিগারেটের প্যাকেটগুলোর সতর্ক পাহারা সত্ত্বেও ভেজা লাল কাপড়ে মোড়া সবুজ পানগুলোকে আড়াল করা যাচ্ছে না। তাজা পানের মোহে মোফাজ্জল মিয়া তৃষ্ণার্ত মরুযাত্রীর মতো ছুটে গেলো সেই পান বিক্রেতার কাছে। বাদশাহ মিয়ার হাতের জাদু এই পানে নেই, কিন্তু মোফাজ্জলের জীবন তো বাঁচলো। একটা রিকশা ডেকে সে চলে যায় বাস স্ট্যান্ডে।

জহির তার পান সিগারেটের ব্যবসার ইতি টেনে পার্কে বসে কাদেরের জন্য অপেক্ষা করছে। এতক্ষণে চলে আসার কথা, কিছুটা দুশ্চিন্তাও হচ্ছিলো জহিরের। তাকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিয়ে কিছুক্ষণ পর কাদের উদয় হলো, কাদেরের চোখেমুখে চাপা উত্তেজনা, হাতে কালো ব্যাগ, বাম কাঁধ রক্তাক্ত। কাঁধের দিকে ইঙ্গিত করে জহির জিজ্ঞাসা করলো, কোনো ঝামেলা হয় নাই তো?

কাদের আড়চোখে তার শার্টে অস্ট্রেলিয়ার ম্যাপের আকৃতির একটা লাল দাগ দেখলো।

হেসে বললো, পান খাইয়া ব্যাটা আমার কান্ধে ঘুমাইয়া লোল ফালাইছে।

কাদের স্থির হয়ে বসে তার নিঃশ্বাসের লাগাম ধরলো। নিঃশ্বাসকে বাগে আনতেই মুখের লাগাম ছুটে গেল, সবকিছু বিস্তারিত না বলে সে শাস্তি পাচ্ছে না।

বাসের ঠিক মাঝের সারিতে বাম পাশের জানালার সিটটা ফাঁকা রেখে কাঙ্খিত যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করছিলো কাদের। অন্যান্য যাত্রীদের দৃষ্টি থেকে সিটটাকে সে নিষ্ঠার সাথে রক্ষা করে চলেছে। পান আত্মসাৎ করতে করতে মোফাজ্জল মিয়া বাসে উঠলো, পানের লাল রস তার চিকন গোফের প্রান্ত ধরে গড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করছে। জানালার পাশের ফাঁকা সিটটা দেখে খুশিতে চোখ তার চকচক করে উঠলো, বাসর ঘরে নতুন বউ দেখলেও কারো এত আনন্দ হয় না। সিটে বসে জানালাটা ফাঁক করে দিতেই প্রশাস্তিতে লাল দাঁত বেরিয়ে পড়লো তার। নিজের সিটে কাদের জড়বস্তুর মতো পড়ে রইলো, তার উপস্থিতি মোফাজ্জলের স্মৃতিতে যতটা ঝাপসা রাখা যায় তত ভালো। বাস ছাড়ার আধাঘণ্টার মধ্যেই মোফাজ্জলের চোখে দুর্দমনীয় ঘুম নেমে আসলো। একটার পর একটা হাই তুলছিলো সে, বহু যুদ্ধের পর অবশেষে ঘুমের কাছে পরাজয় বরণ করে কালো ব্যাগটাকে বুকে জড়িয়ে কাদেরের কাঁধে ঘাড় ফেলে দিলো মোফাজ্জল। কাদেরের শার্টের এক পাশ মোফাজ্জলের রঙিন লালায় লাল হয়ে গেল। কাদের মোফাজ্জলের মাথা জানালার দিকে ঠেলে দিয়ে ব্যাগটাকে তার বাহু থেকে মুক্ত করলো। তারপর মাঝামাঝি কোনো একটা স্টপেজে নেমে পড়লো সে।

কাজটা এত সহজে হয়ে গেল যে, জহিরের মনে একটা সুপ্ত অস্বস্তি রয়েই গেল। এই কালো ব্যাগে করে কী বিপদ এসেছে কে জানে?

ব্যাগের পেটের মধ্যে শার্ট, প্যান্ট, লুঙ্গি, গামছা, আন্ডারওয়ায়্যার আষ্টেপৃষ্ঠে জড়াজড়ি করে পড়ে আছে। জিপার খুলে দিনের আলো পড়তেই কাপড়গুলো ব্ৰিত ভঙ্গিতে স্থির হয়ে রইলো। জামা কাপড় সেঁচে ফেলে ব্যাগে মোফাজ্জল মিয়ার উন্নয়ন রহস্যের কোনো সমাধান পাওয়া গেল না।

কাপড়চোপড় ছাড়া অন্য সম্পত্তি বলতে প্লাস্টিকের গোলাপি রঙের চিরুনি পাওয়া গেল একটা, টাকা কিংবা সোনার কোনো চিহ্ন নেই। পালা করে দুজনেই ব্যাগটা হাতালো, উল্টে পাল্টে ঝাড়লো, উপরে নিচে চড় থাপ্পড় প্রয়োগ করলো, আরো বহুভাবে অত্যাচার করেও ব্যাগটা থেকে এক বিন্দু সোনা বের করতে পারলো না।

কাদেরের মুখে মেঘ জমছে ধীরে ধীরে, ডুপ্লেক্স বাড়ি, চকচকে গাড়ি, মায়ের গয়না মোড়ানো ঝলমলে হাসি, সুলতানার চোখে ভেসে ওঠা আফসোস সব বিলীন হয়ে যাচ্ছে। জহির ব্যাগটাকে পাশে রেখে স্থির হয়ে কী যেন ভাবছে। কিছুক্ষণ ভেবে ব্যাগটা আবার হাতে নিয়ে তলায় টিপেটুপে কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করলো। কাদেরের থমথমে চেহারায় হতাশ চাহনি।

হ, টিপ্পা দেখাটাই বাকি রইছে।

জহির কাদেরের হতাশাকে অবজ্ঞা করে, মানিব্যাগ থেকে একটা ভাঙ্গা ব্লেড বের করলো। ব্যাগের তলায় একটা জায়গায় সেলাইয়ে যে সুতা ব্যবহার করা হয়েছে তা অন্য সুতা থেকে একটু কম কালো। সুতাটাতে ব্লেড ছোঁয়াতেই উপরের কাপড়টা ফাঁক হয়ে গেল। কাপড়ের কান ধরে টান দিতেই হালকা প্রতিবাদ করে সেটা উঠে চলে আসলো হাতে। জহির আর কাদের চেয়ে দেখলো, একটা পলিব্যাগে বাদামি রঙের পাউডার জাতীয় কিছু একটা আরাম করে শুয়ে আছে। কাদেরের কোঁচকানো ভ্রুতে প্রশ্ন।

কী জিনিস ?

এত গোপনে কেউ চিনি কিংবা লবণ নিয়ে যায় না নিশ্চয়ই। কাদের পলিব্যাগটাকে ছুঁয়ে দেখতেই মুখ তার উজ্জ্বল হয়ে গেল।

হিরু ভাই, নিশ্চিত হিরু।

প্যাকেটটাকে হাতে নিয়ে পরিমাণ বোঝার চেষ্টা করলো।

কমসে কম দেড় কেজি হইবো। জায়গা মতো বেঁচতে পারলে কয়েক কোটি কোনো ব্যাপার না।

কোটি টাকার কথা শুনেও জহিরের কপাল থেকে চিন্তার ভাঁজটা সরলো না।

মোফাজ্জল তাহলে হাতি না, আসল হাতি অন্য কেউ।

কাদেরের উচ্ছ্বাস তাতে কমে না। জহির কাদেরের হাত থেকে প্যাকেটটা নিয়ে ব্যাগের ভিতরে রেখে কাপড়চোপড় দিয়ে কবর দিলো। আজ তাদের ভাগাভাগির রীতিটা মানা যাচ্ছে না। জহির ব্যাগটা কাদেরের হাতে দিতে চায় না। কোটি টাকার প্রশ্নে কাদেরের মনেও অবিশ্বাস এসেছে কিছুটা, সেও ব্যাগটাকে দৃষ্টির আড়াল করতে চায় না। কাদেরের অবিশ্বাস দেখে জহির তার দিকে সপ্রশংস দৃষ্টি তাকিয়ে হাসলো।

সাবাস, টাকার ব্যাপারে কাউকে বিশ্বাস করবি না, নিজের বাপকেও না।

এই প্রথম কাদেরের কাঁধে জহির তার আন্তরিক হাত রাখলো। উচ্ছ্বাসের সাথে বললো, চল, আজকে তোরে আমার ঘরে নিয়া যাই।

জহিরের স্বাভাবিক গাম্ভীর্য, অস্বাভাবিক দূরত্ব সব মিলিয়ে গেল। উচ্ছসিত গলায় সে জানালো, এত বড়ো সাফল্য উদযাপন না করলে পাপ হবে। জহিরের আগ্রহে পর্যাপ্ত আমিষ এবং এক বোতল বিদেশি মদ সংগ্রহ করে তারা আলমাস মিয়ার দোতলা বাড়ির নিচতলায় চলে আসলো। আপাতত এটাই জহিরের অস্থায়ী আবাসস্থল।

ঘরে আসবাব বলতে তেমন কিছু নেই। একটা চৌকি মলিন চাদরে ঢেকে বুক পেতে দিয়ে আছে, একটা কাঠের নড়বড়ে চেয়ার পরিধেয় এবং অপরিধেয় সব জামাকাপড়ে নিচে চাপা পড়ে আছে। সন্ধ্যা নেমেছে ততক্ষণে, জহির মদের বোতল খুললো, আর কাদের খুললো পানির বোতল। ঘরে একটা মাত্র বাল্ব থেকে জহির আর কাদেরের মুখ বেশি উজ্জ্বল। প্লাস্টিকের কাপে অনেক পানির সাথে অল্প একটু মদ ঢাললো জহির। কাদেরের উচ্ছ্বাস আরো বেশি, মদের সাথে সে একটু পানিও মেশাবে না। এক চুমুকে অনেকটুকু মদ গলায় ঢালার পর মাংস মুখে দিলো কাদের। শুধু মদে তার উদযাপন সম্পূর্ণ হয় না। বলে, ভাই গরম মাংস তো খাইতাছি, রাইতে নরম মাংসের ব্যবস্থা করা যায় না?

জহির প্রশ্রয়ে মাথা ঝাঁকায়। নিজের কাপে আলতো চুমুক দিতে দিতে সে কাদেরের মদ খাওয়া দেখে। তার ঠোঁট দুটো একটা কুটিল হাসি চেপে যাচ্ছে। এভাবে মদ গিললে বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারবে না কাদের। ঘুম থেকে উঠে কাদের মদের বোতল আর ঘরের বিশৃঙ্খলা ছাড়া আর কাউকেই পাবে না। দেড় কেজি হেরোইন আর কাদেরের ভাগ্য দুটোই ছিনিয়ে নিয়ে জহির ততক্ষণে বহুদূর চলে যাবে।

রাত বাড়ছে, কাদেরের কথা জড়িয়ে আসছে, জহিরের অপেক্ষাও বাড়ছে। কাদের মাতাল হয়েছে কিন্তু এখনো বেহুঁশ হয়নি। কিন্তু কেন যেন ঘরের আলো ধীরে ধীরে কমে আসছে, তেল ছাড়া প্রদীপের মতো বাল্বটা আলোর ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে। কতরাত শুয়ে শুয়ে ঘুমকে সে আহবান করেছে, ঘুম ধরা দেয়নি। আজ জেগে থাকার জন্য বসে আছে, এখন সব বাধা ঠেলে হুড়মুড় করে ঘুম ঢুকে পড়ছে চোখে, চোখের পাতা টেনে নামিয়ে দিচ্ছে। একসময় সব অন্ধকার হয়ে গেল। জহিরের আর কিছু মনে নেই।

গভীর রাতে যখন জহিরের ঘুম ভাঙলো, ঘর তখনো অন্ধকার, তবে আবছা একটা আলো ছড়িয়ে আছে ঘরময়। ঘরের দরজাটা উৎকটভাবে খোলা, কপাট দুটো দুই দিকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। ভাস্কর্যের মত একটা নিশ্চল দেহ কাত হয়ে পড়ে আছে চৌকিতে। কাদের ঘুমাচ্ছে মনে হচ্ছে, কিন্তু শরীরে নিশ্বাসের জোয়ার ভাটা নেই। জহির লক্ষ করলো কাদেরের শরীরের নিচ থেকে বিছানার চাদরে একটা কালো ভেজা বৃত্ত ধীরে ধীরে বড় হয়ে তাকে ছুঁতে আসছে। কাঁধের পাশ থেকে কাদেরের বুকে গাঁথা ছুড়ির কালো অবয়ব সে দেখতে পেলো। জহির বুঝলো, অন্ধকারে যে বৃত্তটাকে কালো দেখাচ্ছে সেটার রঙ আসলে লাল। কাদেরের এই ঘুম আর কখনো ভাঙবে না।

জহির এক মুহূর্ত দেরি না করে সেই ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় চলে আসলো। তার জিনিসপত্র, মোফাজ্জলের কালো ব্যাগ কিছুই মাথায় নেই তার, প্রবৃত্তি তাকে ঠেলে রাস্তায় নামিয়ে নিয়ে এসেছে। রাস্তায় আশ্চর্যরকমের নীরবতা। জহির উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে চলছে, গন্তব্য সে জানে না, দেড় পায়ের উপর ভরসা করে এই শহরের জনশূন্য রাস্তায় সে একটা গোপন আশ্রয় খুঁজছে। কৃষ্ণপক্ষের ক্ষয়ে যাওয়া বুড়ো চাঁদটা ছাড়া আর কেউ তাকে দেখতে পায়নি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *