উন্মাদ আশ্রম – ৬

॥ ছয় ॥

পায়ে রোদের উষ্ণ স্পর্শ পেয়ে ঘড়ি না দেখেও জহির বুঝতে পারলো এখন দুপুরবেলা। গগণ বাবুর বাড়ির ভাগ্যবান ইটগুলো রোদ শুষে নিচ্ছে। জহির বসে বসে চিন্তা করছে, কাদেরের লাশটা কি এখনো তার বিছানায় কাত হয়ে পড়ে আছে? লাল বৃত্তটা শুকিয়ে নিশ্চয়ই এতক্ষণে খয়েরি হয়ে গেছে, একটা লাশ পেয়ে পোকামাকড়েরা হয়তো তাদের ভাগ নিতে এসে পড়েছে। পিঁপড়াদের ব্যস্ত দল হয়তো তার নাকে কানে ঢুকে এবড়ো সৌভাগ্যে আত্মহারা হয়ে গেছে, মাছিরা নিশ্চিন্তে নাকমুখের উপর বসছে, শুকনো রক্তের উপর নাচানাচি করছে। অথবা পাশের রুমের চোর স্বভাবের লোকটা দরজা খোলা পেয়ে পা টিপে ঘরে ঢুকেই আঁতকে উঠেছে। আবার সকালবেলা আলমাস মিয়া ব্রাশটা মুখে পুরে ভাড়ার জন্য তাগাদা দিতেও আসতে পারে। তাদের কোলাহলে কিছু পোকামকড় সাহস করে লাশে নিজেদের দখল বজায় রাখলেও, মহিলাদের চিৎকারে বাকিরাও পালাতে বাধ্য হবে। স্তিমিত, নিস্তেজ লোকালয়ের পানসে সকালটা একটা হত্যাকাণ্ডে পুরো রঙিন হয়ে যাবে। আলমাস মিয়ার কুৎসিত বাড়িটা হয়ে যাবে দর্শনীয় স্থান। মানুষের ভিড় লেগে যাবে বাড়ির সামনে। সারাদিন বাড়িতে বাসন কোসন মাজা, রান্নাবান্না করা গৃহিণীরা তাদের নিরুত্তাপ জীবনে একটু উত্তেজনা আনার জন্য লাশ দেখতে চলে আসবে। তাও আবার খুন হওয়া লাশ। ও মাগো!’ সঙ্গম বঞ্চিত এইসব মহিলারা লাশ দেখে ঘন ঘন শিহরিত হয়।

পুলিশ এসে ভিড় কমাতে চাইবে, তাতে মানুষের কৌতূহল আরো বেড়ে যাবে, কেউ নড়বে না। সাংবাদিকরা এসে ক্যামেরা মাইক্রোফোন নিয়ে পুলিশের চেয়ে বেশি ছোটাছুটি করবে। তারা খুনের মধ্যে কোনোভাবে নারী কেলেংকারি অথবা রাজনীতির রঙ চড়াতে না পেরে একটা চটকদার খবর হাতছাড়া হওয়ার হতাশায় ঘন ঘন সিগারেট টানবে আর ক্যামেরাম্যানকে বকবে। আলমাস মিয়া তিনমাসের ভাড়ার শোক সইতে না পেরে যেতো পুলিশ আর সাংবাদিকদের কাছে বারবার আবদার, অভিযোগ করলে। এতসব উৎসব উত্তেজনার মধ্যে তার মুখটাকেই সবচেয়ে বেশি তোপ দেখাবে, তার নিরীহ বাড়িটা কিছু না করেই শুধু শুধু কলঙ্কিত হলো, তার ওপর তিনমাসের অনাদায়ী ভাড়া।

জহির নিজের চিহ্ন ঘরব্যাপী ছড়িয়ে রেখে এসেছে। অতি বুদ্ধিমান মানুষ ও এমন পরিস্থিতিতে বোকা হয়ে যায়। পুলিশ এবং উপস্থিত সবাই তাকেই এতক্ষণে অপরাধী সাব্যস্ত করে ফেলেছে। কেউ তাকে বিশ্বাস করবে না।

স্যার কী মনে হয়, কামটা কে করতে পারে? মোফাজ্জল মিয়া না তো?

কাকটা কখন এসে তার পায়ের কাছে বসে রোদ পোহাচ্ছে, জহির টের পায়নি। সে মোফাজ্জল মিয়ার কথা ভেবেছে একবার, কিন্তু সেই সম্ভাবনা একেবারেই কম। মোফাজ্জল মিয়া যে পান খেয়েছে তাতে দুইদিনেও তার ঘুম ভাঙবে না, তিনদিন লাগবে নিজের নাম মনে করতে। আর সে কিংবা তার পেছনে যারা আছে, তারা যদি মারতেই চায় শুধু কাদেরকে কেন, তাকেও কেন মারলো না? কাকটা আবার বলে উঠলো, এইটাও ঠিক। জ্ঞানী মানুষের সাথে একটু পরামর্শ করবেন নাকি? কবি বিশ্বম্বর পালের ধ্যান মনে হয় শেষ হইছে।

কাকটা কি তার মনের কথাও বুঝে ফেলছে? জহিরের ইচ্ছা করছে কাকটাকে একটা লাথি মেরে সরিয়ে দিতে। কিন্তু পারছে না, কাকটা বসেছে তার পঙ্গু পায়ের কাছে, ভালো পায়ের নাগালের বাহিরে।

কোনোভাবেই কাক থেকে মুক্তি না পেয়ে জহির দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। কাকদের কাজ হচ্ছে টোকাইদের সাথে মিলে ডাস্টবিনে গিয়ে খাবার খোঁজা, স হলে মানুষের মাথায়, নিদেনপক্ষে জামা কাপড়ে মল ত্যাগ করা, পিপাসা লাগলে কলসিতে পাথর ফেলা, গায়ের কুসংস্কারাচ্ছন্ন বধুর মনে কুলক্ষণ জাগানো, ইলেক্ট্রিক তারে বসে কাকবন্ধুদের সাথে মিলে কারণে অকারণে কা কা করা। কিন্তু মানুষের সাথে মানুষের ভাষায় কথা বলা কাকদের জন্য কেবল অনুচিতই নয়, রীতিমত অন্যায়।

প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের বরখেলাপ করা এই বেয়াদব কাকটাকে এড়ানোর জন্য জহির উঠে দাঁড়ালো, দেয়াল ধরে সে চলে এলো একেবারে শেষমাথার একটা ঘরে। এই ঘরেও কিছুটা রোদ চৌকানা হয়ে পাপোশের মতো মেঝেতে পড়ে আছে। এইটুকু আলোর জন্য ঘরের বাকি অংশ একটু বেশিই অন্ধকার লাগছে। আলো আঁধারের বৈষম্য চোখে সয়ে আসার পর ঘরে মনুষ্যবসতির বিভিন্ন চিহ্ন চোখে পড়লো জহিরের। কাপড়ের বোচকা, মেঝেতে গলে যাওয়া মোম, হাড়ি পাতিল, বিছানা, সভ্যতার এইসব নিদর্শন দেখে কিছুটা স্বস্তি পেল জহির। দক্ষিণের দেয়ালের দিকে তাকাতেই জহির দেখলো, একটা মধ্যবয়স্ক লোক চোখ বন্ধ করে পিঠ ঠেকিয়ে সোজা হয়ে বসে আছে। মানুষের চিহ্ন দেখে যে স্বস্তি সে পেয়েছিলো, মানুষ দেখে তার অধিকাংশই উবে গেল। লোকটা আপাদমস্তক নগ্ন, এতসব জড় সভ্যতার মধ্যে লোকটা যেন জ্বলজ্যান্ত অসভ্যতা। গগণ বাবুও এই লোকটার তুলনায় কিছুটা পর্দাশীল। কাপড়চোপড়ের সাথে এদের কী এমন শত্রুতা, জহির ভেবে পায় না। এই লোকটাই সম্ভবত কবি বিশ্বম্বর পাল। যেহেতু এই ঘরে ছবি আঁকার কোনো সরঞ্জাম চোখে পড়ছে না, লোকটাকে দেখে যথেষ্ট শাস্ত মনে হচ্ছে, কামড়ে দেয়ার মতো কোনো লক্ষণও তার মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। বিশ্বম্বর পাল দেয়ালের সাথে এমনভাবে মিশে গেছে যে ভালো করে না দেখলে তার অস্তিত্ব আলাদা করে বোঝা যায় না। জহির চলে যাবে নাকি থাকবে এই সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে দাঁড়িয়ে উশখুশ করছে। ঠিক সেই সময় চোখ খুললো কবি বিশ্বম্বর পাল, একটা নগ্ন লোকের চোখের দিকে তাকাতে পারছে না জহির, আবার চোখ ছাড়া অন্যদিকে তাকানোর কোনো উপায়ও লোকটা রাখেনি। আড়ষ্ট হয়ে সে এদিক সেদিক তাকাচ্ছে।

লজ্জা পাবেন না, বসুন।

বিশ্বম্বর পালের কণ্ঠে কোনো বিচলন নেই। জহিরকে দেখে সে অবাক হলো না, লজ্জাও পেলো না, যেন তার অপেক্ষাতেই বসে ছিল। তার কন্ঠে এমন দৃঢ়তা ছিল যে কথাটা অনেকটা আদেশের মতো শোনালো। সেই আদেশ অমান্য করতে পারলো না জহির। তাছাড়া একটা কাকের সাথে কথা বলার চেয়ে নগ্ন মানুষের সাথে আলাপ করাও বেশি স্বস্তিদায়ক। জহির বসলো কিন্তু বিশ্বম্বর পালের দিকে তাকাতে পারছে না এখনো।

বিশ্বম্বর পাল বললো, আপনি যদি আমার মুখের দিকে না তাকান, তাহলে আমি অপমানিত বোধ করবো।

ঘরের ছাদ, দেয়াল পেরিয়ে জহিরের দৃষ্টি বিশম্বর পালের মুখে স্থির হলো। কিন্তু তার চোখের মণি দুটো এত ভারী হয়ে গেছে যে, সেগুলোকে উপরের দিকে তুলে ধরে রাখতে অনেক কসরত করতে হচ্ছে। পরিচ্ছন্ন মুখে একটা ব্রণ হলে চোখ যেমন বারবার ব্রণের দিকেই চলে যায়, জহিরের চোখও নিচের দিকে চলে যেতে চাচ্ছে। বিশ্বম্বর পাল হাসলো।

পোশাক আমি পরিনি, অথচ লজ্জা আপনি পাচ্ছেন। কেন? আমার চামড়া দেখা যাচ্ছে তাই?

জহির কিছু বলতে পারলো না। চুপচাপ সে চোখের কসরত করতে লাগলো। বিশম্বর পাল বললো, চামড়া দেখে এত ব্ৰিত আপনি হননি, যদি আমার পুরো গা নগ্ন থাকতো কেবল আমার দুই উরুর মাঝে জননাঙ্গটাকে কিছু একটা দিয়ে ঢেকে রাখতাম, তাহলে আপনি এত লজ্জা পেতেন না। ঐ একটা অঙ্গতেই আপনার এত লজ্জা, অথচ হাত পায়ের মতো সেটাও একটা স্বাভাবিক অঙ্গ। শুধু

স্থির হয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকার পর লজ্জার প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে জহিরের চিন্তা করার ক্ষমতা ফিরে এলো। বললো, হাত পা আমরা প্রতিদিন দেখি, এই অঙ্গটা সবাই ঢেকে রাখে, দেখে অভ্যাস নেই, তাই লজ্জা পাই।

ঠিক বলেছেন, সেজন্যই আমি অভ্যাস করছি, প্রতিদিন কিছু সময় নগ্ন হয়ে প্রকৃতির সাথে মিশে যাই, প্রথম প্রথম আমারও লজ্জা লাগতো, এখন আর লাগে না। কিন্তু মানুষ খুব অদ্ভুত, যে অঙ্গ সে প্রতিদিন নিজের অথবা সঙ্গীর দেহে দেখে, একই অঙ্গ আরেকজনের দেহে দেখে লজ্জা পায়, ভয় পায়, আঁতকে ওঠে, চিৎকার করে, লাঠি দিয়ে মারতেও আসে। আমাকে মারলে অন্যায় হয় না, কারণ পোশাক ত্যাগ করে আমি পশু হয়েছি। অথচ বুকের মধ্যে ঘৃণা আর হিংস্রতা জমিয়ে রেখেও শুধু পোশাক পরার কারণে তারা সভ্য মানুষ।

কিছুটা অভিযোগের মতো শোনায় বিশ্বম্বর পালের কথাগুলো। তবুও কী যেন একটা অভিনবত্ব আছে কথাগুলোয়, জহিরের মাথায় ঢুকে কোথায় যেন একটু নাড়িয়ে দিলো। আগে তো কখনো এমন হয়নি। মস্তিষ্কের যেসব অংশে মায়া মমতা আছে, অনুশোচনা আছে, সৌন্দর্য আছে, লৌকিকতার বাহিরে চিন্তা করার ক্ষমতা আছে সেইসব অংশ তার ইস্পাতে মোড়ানো ছিল। যে কথায় লাভ ক্ষতির হিসাব নেই, লোভের রঙ নেই, স্বার্থের সুবাস নেই এমন কথা মাথায় ঢুকে টুং টাং শব্দ করে বেরিয়ে যেতো।

বিশম্বর বাবু জিজ্ঞাসা করলো, কবিতার সাথে পরিচয় আছে?

জহির ভাবলো, কবিরা সবশেষে নারী আর কবিতাতেই ফিরে আসে। কবিতার সাথে কিছুটা পরিচয় তার ছিল, কৈশোরে মুদি দোকানির মেয়ে কবিতাকে এক প্যাকেট চকলেট হাতে দিয়ে একটা কুপ্রস্তাব দিয়েছিলো সে। সেই থেকে কবিতা আর কখনো তার সাথে কথা বলেনি। কিন্তু বিশ্বম্বর পাল নিশ্চয়ই সেই কবিতার কথা বলেনি। সে মাথা নেড়ে কবিতা সম্পর্কে নিজের অজ্ঞতা জানালো, আর মনে মনে শঙ্কিত হয়ে থাকলো। এবার হয়তো বিশ্বম্বর পাল তাকে কবিতা বোঝানোর জন্য স্বরচিত দুইটা কবিতা শুনিয়ে নির্যাতন শুরু করবে।

কবিতা শোনানোর কোনো লক্ষণ বিশ্বম্বর পালের মধ্যে দেখা গেল না। বললো, কবিদের সাথে নিশ্চয়ই পরিচয় আছে?

কবিতার সাথে পরিচয় না থাকলেও কবিদের সাথে জহিরের কিঞ্চিৎ পরিচয় আছে। রাস্তাঘাটে চলতে গেলে দুই একজন কবির সাথে ধাক্কা লেগেই যায়। কিছু কবি খদ্দরের পাঞ্জাবি আর পাটের ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে নিজের কবিত্বের বিজ্ঞাপন করে বেড়ায়। এমন কবিরা অবশ্য বিলুপ্তির পথে, এখন কবিরা ইউনিফর্ম পরে না, কাঁধে ব্যাগ ঝোলায় না, চোখেমুখে বিরক্তি আর হতাশা ঝুলিয়ে রাখে। দুইটা প্রশংসা আর একটা সিগারেটের বিনিময়ে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বকবক করতে পারে। জহির সাধারণত কবিদের এড়িয়ে চলে, তাদের পকেটে টাকা থাকে না, কিন্তু দেহভর্তি থাকে অহংকারে।

আপনি কোনো সুখী কবি দেখেছেন?

জহির মনে করতে পারে না। বিশ্বম্বর পাল বলে, যৌবনে কবিতা লিখতাম আমি, মানুষ সেসব কবিতা নিয়ে মাতামাতি করেছে। কিন্তু আমার মনে হয় যেসব কবিতা আমি লিখিনি, সেগুলোই আমার ভালো কবিতা। কবিদের সাথে দীর্ঘদিন উঠাবসা করেছি, আড্ডা দিয়েছি, কার কবিতা হয় না, কে ছোটো কবি, কে অকবি তা নিয়ে গবেষণা করেছি। কবিতার চেয়ে আমরা কুৎসা রচনা করেছি বেশি। আমি আমার আশেপাশে কখনো কোনো সুখী কবি দেখিনি। আমি ভাবতাম, কবিরা সবসময় এত অসুখী হয় কেন? পরে দেখলাম, কবিরা খুবই হিংসুটে আর নার্সিসিস্ট স্বভাবের হয়। সে চায় শুধু তাকে নিয়েই মাতামাতি হোক, সব পুরস্কার শুধু তাকেই দেয়া হোক, তার শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়ে অন্য কবিরা তাকে রাজকবি হিসেবে বরণ করে নিক। রাজকবি হতে না পেরে তারা নারাজ কবি হয়ে থাকে।

আপনিও কি অসুখী?

জহিরের দিকে তাকিয়ে আরেকবার হাসলো বিশ্বম্বর পাল, হাসির ব্যাপারে লোকটা অকৃপণ। বললো, প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির হিসাব থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি বহু আগে। যখন কালো সরিয়ে আলো দেখা শুরু করলাম, তখন কবি বিশ্বম্বর পাল থেকে আমি হয়ে গেলাম বিশু পাগলা। যদি আমার কবি পরিচয় বহাল থাকে, তাহলে আপনার ভাগ্য ভালো, একজন সুখী কবি আপনার সামনে বসে আছে।

ঠিক তখন জহির দেখলো, কাকটা হেঁটে হেঁটে তার পাশে এসে বসেছে। বিজ্ঞের মতো বললো, পাগল না হইলে মনে হয় সুখী হওয়া যায় না, কী কন স্যার?

কাকের কথা শুনে জহিরের মুখের আবহাওয়া বদলে গেল। চেহারায় মেঘ জমেছে, চোখে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, নাকে জমেছে বিন্দু বিন্দু দুশ্চিন্তা। সে বিশ্বম্বর পালের দিকে ঝুকে গলা নিচু করে বললো, কাকটা কী বললো শুনতে পারলেন?

বিশম্বর পাল ভ্রু কুঁচকে চেহারায় বিভ্রান্তি ফুটিয়ে তুললো। তার মুখ দেখেই জহির বুঝতে পারলো সে ছাড়া কাকটাকে আর কেউ দেখতে পাচ্ছে না।

উন্মাদ হওয়ার লক্ষণ স্পষ্ট। আকুতিমাখা কণ্ঠে সে বললো, আমাকে একটু হেল্প করেন প্লিজ, আমি মনে হয় পাগল হয়ে যাচ্ছি।

মরিয়া হয়ে গেলে মানুষ কতকিছুই করে, জহির পাগল হওয়া থেকে রক্ষা পেতে সাহায্য চাইছে তার সামনে নগ্ন হয়ে বসে থাকা একজন স্বীকৃত পাগলের কাছে। বিশ্বম্বর পাল শান্ত গলায় বললো, পাগল হওয়া এত সোজা না, আপনি শান্ত হন। আপনি কি কোনো কাক দেখতে পাচ্ছেন এখানে?

জ্বী ৷

কাকটা কি আপনার সাথে কথা বলে?

জ্বী।

কাকের ভাষায় বলে?

না, সেটাই তো সমস্যা। বেয়াদবটা মানুষের মতো মানুষের ভাষায় কথা বলে।

ভাষায় আঞ্চলিকতা আছে?

আছে, কিছুটা।

আপনি ছোটোবেলায় যে অঞ্চলে বড়ো হয়েছেন, সে অঞ্চলের ভাষায়?

এবার জহির থমকে গেল। তাইতো, কাকটা তার ভাষাতেই কথা বলছে, যে ভাষাতে সে চিন্তা করে। বিশ্বম্বর পাল কিছুক্ষণ ভেবে বললো, দেখুন আমাদের সবার মধ্যেই অন্ধকার আছে, আপনারটা হয়তো কোনোভাবে বেরিয়ে এসেছে।

জহিরের মধ্যে আকস্মিক স্থিরতা দেখা গেল, থমথমে মুখে সে বললো, এখন আমি কী করবো?

ইউ শুড লিসেন টু দ্যাট ক্রো।

কী বলেন! একটা কাকের সাথে কথা বলবো? তাও আবার কাল্পনিক কাক।

হ্যাঁ, আমার মনে হয় আপনার উপকার হবে তাতে এবং চাইলে কাকটার জন্য একটা নামও ঠিক করতে পারেন।

জহির চুপ করে রইলো, আড়চোখে কাকটাকে দেখে বিরক্তি বাড়ছে তার। বিশ্বম্বর পাল কিছুক্ষণ নিজের দাড়ি চুলকে নিজেই একটা নাম বের করে আনলো। বললো, ভালো একটা নাম পেয়েছি, কাকটার নাম হবে ভ্রমর, জিনিসটা আপনার ভ্রম এবং তা কালো।

কাকটা ডান পায়ে মেঝেটা দুইবার আঘাত করলো। উচ্ছ্বসিত গলায় বললো, নাম পছন্দ হইছে স্যার।

একটা নামের কারণে বাস্তব এবং অবাস্তবের ব্যবধান অনেকখানি কমে আসে। ভ্রমরকে আর অগ্রাহ্য করে না জহির, এই কাকটার অস্তিত্বকে সে স্বীকৃতি দিয়েছে। রাতে ঘুম আসে না জহিরের, ভ্রমরের সাথে আলাপ করে তখন। তারা অধিকাংশ সময় কাদেরকে নিয়ে কথা বলে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, কাদেরকে নিয়ে কোনো একজনের সাথে কথা বলতে পেরে জহির স্বস্তি পায়। হোক কাল্পনিক কাক, ভ্রমর হয়ে ওঠে তার প্রিয় সঙ্গী। আলাপের এক পর্যায়ে ভ্রমর বলে, জুয়াড়িদের অনেক শত্রু থাকে স্যার, তাদের মধ্যে কেউ একজন হয়তো খুনটা করছে।

জহির মাথা নাড়ে।

এমন কোনো শত্রু থাকলে কাদেরের মতো বাঁচাল একবার অন্তত বলতো আমার কাছে, আর খুন যেই করুক, একই ঘরে একজনকে খুন করবে, আরেকজনের ঘুমও নষ্ট করবে না, এইটা কেমন কথা !

আপনারে না মারলে তাদেরই সুবিধা, একজনকে মারলো, আরেকজনকে ফাসাইলো I

যুক্তি অস্বীকার করতে পারে না জহির। তারপরও খটকা রয়ে যায়, একটা মানুষ তার পাশে খুন হয়ে গেল, সে টেরও পেলো না? ঘুম ভেঙ্গে আবছা আলোতে ঘরের মধ্যে প্রতিরোধের কোনো চিহ্ন দেখতে পায়নি জহির। শুয়ে থাকা অবয়বটা দেখে মনে হয়েছে, লাশের সাথে খুনির সমঝোতা হয়েছে। এত পরিপাটি একটা হত্যাকাণ্ড কীভাবে ঘটানো হলো?

কাকটা ধীর পায়ে পায়চারি করছে, দেখে মনে হচ্ছে কী যেন চিন্তা করছে। দৃশ্যটা অদ্ভুত, কিন্তু জহিরের কাছে একটুও অস্বাভাবিক লাগছে না। কাকটা থামলো হঠাৎ। বললো, কাদেরের যদি শত্রু না থাকে, তাতে কী হইছে, আপনার তো শত্রুর অভাব নাই। কেউ হয়তো, ভুলে কাদেরকে মারছে। আর যদি ভুল না কইরা থাকে, তাইলে আপনারে ফাসানোর জন্যই খুনটা করছে।

আমার শত্রু কে আবার?

ভ্রমর হাসলো, স্যার কি ভুইলা গেছেন?

ভ্রমরের হাসিটা ব্যঙ্গের মতোই শোনালো। কত মানুষের সর্বনাশ করেছে জহির, সর্বস্ব লুটে নিয়ে নিঃস্ব করে দিয়েছে, কত স্বপ্ন নষ্ট হয়েছে তার কারণে, কত বিশ্বাস যে সে ভেঙ্গেছে, কয়েকদিন আগেও সেইসব হিসাব করে গর্ব হতো জহিরের। ঠিকই তো, বহু হাত নিশপিশ করছে প্রতিশোধের আশায়, জহিরকে নাগালে না পাওয়ায় অনেক ভদ্র মানুষ হন্তারক হয়ে উঠতে পারছে না।

কে তাহলে?

জহিরের মস্তিষ্কে একের পর এক শিকার তাদের বোকা চেহারা নিয়ে হাজির হয়। জহির খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে, ক্ষোভ আর ক্ষতির পরিমাণ মেপে সম্ভাব্য শত্রু শনাক্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু একটা ব্যাপার লক্ষ করে অবাক হয় জহির, এই প্রথম এইসব মানুষের হতাশ, তাজ্জব মুখগুলো কল্পনা করে তার কোনো আনন্দ হচ্ছে না। জহির বুঝে উঠতে পারে না, কিন্তু কিছু একটা বদলে গেছে তার মধ্যে।

জহির দিনের বেলা ঘুরে ঘুরে চ্যাডউইক সাহেবের শখের ধ্বংসাবশেষ দেখে। কল্পনায় বাড়ির এই কঙ্কালটাতে আস্তর চড়িয়ে রঙ করে, কারুকাজ করা কাঠের দরজা জানালা লাগায়, আসবাব দিয়ে ভরিয়ে ফেলে ঘরগুলো, ঝোপঝাড় ছেঁটে বাগানে ফুল ফোটায়। চ্যাডউইক সাহেব বসে থাকে ভিতরের বারান্দার আর্মচেয়ারে, বুকে তার ডানা মেলে শুয়ে থাকে একটা ইংরেজি উপন্যাস। আবার মাঝে মাঝে মদের গ্লাস হাতে আরক্ত চোখে সন্ধ্যার অন্ধকারে মিলিয়ে যায় ব্রিটিশ সাহেব। এই বাড়ির মাঝখানে খোলা মঞ্চে ইসমত আরা বাই গান গায়, মল বাজিয়ে নাচে, মণিমুক্তার মাঝে জ্বলজ্বল করে রাজার ভাতুষ্পুত্রের কামার্ত চোখ। নিজের কল্পনায় ডুবে গিয়ে আবার ভেসে ওঠে জহির, মাঝে মাঝে ভাসতে পারে না সে, তলিয়েই যেতে থাকে। এই বাড়ির অতীত চরিত্রগুলো আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে তখন, কোনো কোনোদিন তাদের সাথে চোখাচোখি হয়ে যায়। চ্যাডউইক সাহেব একদিন বিস্মিত হয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করেছে, হু আর ইউ? আরেকদিন ইসমত আরা বাই তাকে অন্দরমহলে দেখে চোখ রাঙিয়ে ধমকে বলেছিলো, নিকাল যাও ইয়াহা সে।

একটা অবাস্তব কাক তখন জহিরকে বাস্তবতায় টেনে আনে।

স্যার, আপনার লক্ষণ তো সুবিধার না, এই বাড়িতে বেশিদিন থাকলে ভালো মানুষও পাগল হইয়া যাইবো।

কিন্তু যখনই জহির ভাবে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে, তখন কী একটা আকর্ষণ তাকে সেই বন্ধ দরজার সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। এই আকর্ষণ লোভ কিংবা কৌতূহলের না, তারচেয়েও তীব্র কিছুর। দরজায় কোনো তালা নেই, আংটা নেই, মনে হয় যেন ভিতর থেকে কেউ বন্ধ করে রেখেছে। স্পর্শ করেও সে বুঝতে পারে না, কাঠ, লোহা নাকি অন্যকিছু দিয়ে তৈরি এই দরজা। গগণ বাবুকে একদিন জিজ্ঞাসা করেছিলো সে। গগণ বাবু রহস্য ভাঙ্গেনি, শুধু বলেছিলো, সঠিক সময়ে অবশ্যই জানতে পারবেন।

বিশ্বম্বর বাবুকে জিজ্ঞাসা করায়, সেও মাথা নাড়লো, আই নো নাথিং অফ ইট।

চিত্রকর জোবায়ের আল মামুনের সাথেও দেখা হয়েছে জহিরের। গগণ বাবু আর বিশ্বশ্বর বাবুর মতো এই লোকটা পোশাকবিরোধী না। বরং একটু অতিরিক্ত পোশাকপ্রীতি আছে তার। গায়ে তার তিন চারটা জামা চাপানো, নিচে লুঙ্গি পরা, লুঙ্গির নিচ দিয়ে ছাই রঙের প্যান্ট বেরিয়ে থাকে।

ছোটোখাটো লোকটার জামার ভিতর থেকে বের হয়েছে দুটো শুকনো নড়বড়ে হাত, মাথায় পাতলা চুলের আড়ালে টাক দেখা যায়, ভাঙা এবরোথেবড়ো গালে কাঁচাপাকা ফিনফিনে দাড়ি, কপালের নিচে চোখ দুটো যেন তাড়াহুড়া করে কোনোমতে বসানো হয়েছে। তার দেহের সবচেয়ে মজবুত অঙ্গ হচ্ছে তার সাদা ঝকঝকে দাঁত। জোবায়ের সাহেবের হাত কয়লার খনির মজদুরের মতো কালো হয়ে আছে। দেয়াল আর মেঝেতে কয়লা দিয়ে হিবিজিবি আঁকা, দেখে মনে হচ্ছে কোনো শিশু মায়ের শাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে স্বাধীনতার সর্বোচ্চ প্রয়োগ করেছে।

বুঝতে পারছেন কিছু?

ক্লান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে জোবায়ের সাহেব। জহির চারদিকে চেয়ে কাঁধ ঝাকায়, কয়লার কালি ছাড়া আর কিছুই দেখতে পারছে না সে।

দৃষ্টি থাকলে বুঝতে পারতেন এটাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ছবি।

কীসের ছবি এটা?

সময়ের ছবি

জহির আরেকবার তাকায় চারপাশে, সময় তো দূরের কথা, একটা ঘড়ির কাটাও খুঁজে পায় না সে। হতাশ হয়ে বলে, সব তো কালো, কীভাবে বুঝবো? কোনো রঙ নেই।

কালো কি কোনো রঙ না? শুনুন, কালোর ভিতরেই সব রঙ আছে, কালোর চেয়ে রঙিন আর কিছু নেই।

প্রলাপ হজম করা জহির শিখে গেছে, কিছু বললো না সে। কয়লা দিয়ে যে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ছবিটা এঁকে ফেলেছে জহির তাকে সেই বন্ধ দরজার কথা জিজ্ঞেস করেছিলো। জোবায়ের সাহেব বললো, ঐ দরজার রহস্য আবিষ্কার করতে আপনাকে আরো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।

জোবায়ের সাহেব জহিরকে অদ্ভুত সব কথা শোনায়, বলে, পৃথিবীতে নাকি কোনো রঙ নেই, সব রঙ আমাদের মাথায়। দুইজন মানুষ নাকি একই রঙকে দুইভাবে দেখে, তাই দুইজন মানুষের পৃথিবী কখনো এক রকম হয় না।

কী আশ্চর্য কথা! ভ্রমর বলে, সব পাগলামি 1

হতে পারে কিন্তু কথাগুলো জহির মাথা থেকে সরাতে পারে না, তার মাথায় ইস্পাতের প্রলেপটা খসে পড়েছে। সূচালো সব কথা গেঁথে যাচ্ছে।

ইদানিং চোখ বন্ধ করলেই কিছু মুখ করুণ চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে, জহির ঘুমাতে পারে না। কাকটাকে বলে, ভ্রমর আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি?

ভ্রমর বলে, বেশি বাকি নাই স্যার।

কী করা যায়?

এখান থেকে বাহির হইতে হইবো।

কই যাবো? আমার কোনো বন্ধু নাই।

বন্ধু না স্যার, আমরা যাবো শত্রু খুঁজতে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *