উন্মাদ আশ্রম – ১১

॥ এগারো ॥

মৃত মানুষদের সাথে জহিরের যোগাযোগের ইতিহাস আছে, তাদেরই একজনকে বসে থাকতে দেখে অবাক হওয়ার কী আছে? তবুও কাদেরের আকস্মিক আবির্ভাবে জহির খানিকটা বিচলিত হয়ে পড়ে। সামলে নিতেও সময় লাগে না, মনটা তার ভোতা হয়ে গেছে, কোনো চমকই তাকে বেশিক্ষণ বিহবল রাখতে পারে না।

কাদেরকে দেখে বরং কিছুটা স্বস্তিই হয় তার। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে পরিচিত বন্ধুর মতো কাদেরের পাশে বসে সে। কাদের জহিরের দিকে এমনভাবে তাকায় যেন দূর থেকে অস্পষ্ট কিছু দেখছে। তার চোখভরা বিভ্রান্তি আর বেদনা। জহিরের ভোতা মনেও মমতার ঢেউ ওঠে

তোমার জন্য খুব মায়া হচ্ছে কাদের।

কাদের সচকিত হয়, কিছুক্ষণ চুপ করে চেয়ে থাকে, তার দৃষ্টি জহিরের মুখ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছে, ঠিক যেন মুখের ওপর তাক করতে পারছে না। একসময় দৃষ্টি তার স্থির হয়, বলে, আমি সরি জহির ভাই, আপনাকে অনেক মিথ্যা বলেছি, আমার নাম কাদের না।

কণ্ঠ শুনে মনে হচ্ছে দেয়ালের ঐপাশ থেকে কেউ কথা বলছে। বেঁচে থাকতে এত মার্জিত ভাষায় কথা বলেনি কাদের। তাদের দুজনের মধ্যে একটা স্বচ্ছ স্থিতিস্থাপক পর্দা দুলছে, মাঝে মাঝে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে তারা। কাদেরের স্বীকারোক্তি শোনার পর জহির বুঝলো, কেন কাদেরের কোনো হদিস সে খুঁজে পায়নি। পুরনো একটা অমীমাংসিত প্রশ্নও জেগে উঠলো জহিরের মাথায়, সেদিন রাস্তায় এত লোক থাকতে কাদের কেনো তার কাছেই সাহায্য চেয়েছিলো?

বিশ্বাসভঙ্গ হওয়ার বেদনা ছাপিয়ে কৌতূহল বাড়লো জহিরের। জিজ্ঞাসা করলো, নাম কী তোমার?

নাম বললে হয়তো আপনি আমাকে চিনবেন, আমার নাম রাশু।

রাশু নামটা জহিরের পরিচিত লাগে, কিন্তু হাজার হাজার স্মৃতির ভিড়ে নামটার পরিচয় সে উদ্ধার করতে পারে না। রাশুর ব্যগ্র কণ্ঠ শোনা যায়, জহির ভাই, প্লিজ চলে যাবেন না। আপনাকে সব বলতে হবে আমার, প্লিজ ভাই ৷

পর্দাটার ঐপাশে রাশুর বিচলিত অস্থির দৃষ্টি উপরে নিচে ডানে বামে ঘুরে বেড়াচ্ছে। জহির বলে, আমি এখানেই আছি রাশু, তুমি বলো।

একটা গভীর শ্বাস নিয়ে রাশু তার গল্প বলে যায়। দুই পাড়ের দুজন মানুষের মহাজাগতিক এই আলাপ থেকে নিচের গল্পটি উদ্ধার করা হয়েছে।

সময়ের অভিশাপে জহিরের শৈশবের সমাপ্তি হয়েছে তখন। কৈশোরের সাথে শৈশবের যেটুকু রেশ লেগে ছিলো, বয়ঃসন্ধির কূটচালে সেটুকুও মুছে গেছে। তার নাকমুখ ফুঁড়ে বের হয়েছে পৌরুষের গৌরব রেখা। দেহে পেশীর সাথে সাথে মনে কৌতূহলও বেড়েছে তার, সেই কৌতূহল এত গোপন এবং উদ্ভট যে তা প্রকাশও করতে পারে না। শিশু বয়সের অজ্ঞতা ছিলো নিষ্পাপ সরলতা, তা এখন হয়েছে লজ্জাকর মূর্খতা। পশম আর পেশীতে সেই মূর্খতা পুরোপুরি ঢাকতে পারা যায় না।

দেহমন সব বড়ো হয়ে উঠলেও জহিরের একটা পা বড়ো হতে অস্বীকৃতি জানালো, গোঁয়ার পা-টা নিয়ে জহিরের হীনম্মন্যতার সীমা ছিলো না। তার সমস্ত গৌরব একটা পঙ্গু পায়ে এসে চুপসে যেতো। পুরুষের খাতায় নাম উঠাতে হলে যতটুকু অনিষ্ট করা দরকার, তিন হাতপা দিয়ে করে সে কুলিয়ে উঠতে পারছিলো না। আরেকটু বড়ো হওয়ার পর সে বুঝতে পেরেছিলো নারীরা স্বীকৃতি না দিলে বালকেরা পুরুষ হতে পারে না, এখানেও অপুষ্ট পায়ের ভারে সে পিছিয়ে পড়েছিলো। মেয়েদের চোখে তার জন্য সহানুভূতি যতটা ছিল প্রেম ততটা ছিল না। সহানুভূতির ভাণ্ডার তার উপচে পড়ছিলো কিন্তু প্রেমের ভাণ্ডারে শুধু ঘাটতিই ছিল।

দুষ্ট বালকেরা মিয়াজি বাড়ির উঁচু প্রাচীরে বসে গোসলখানার ফোঁকর দিয়ে নারী দেহের গোপন সব রহস্য ভেদ করে আসলো। দুষ্ট জহিরও কম নয় কিন্তু পঙ্গু পা নিয়ে অত উঁচুতে সে চড়তে পারে না। চাক্ষুষ না করে দুষ্ট বালকদের মুখের ভাসা ভাসা বর্ণনা আর অপাঠ্য বইয়ের কালো হরফ দিয়ে নারীদেহের বাস্তব চিত্র আর কতটুকুই বা আঁকা যায়?

কৌতূহল মেটাতে সে গিয়েছিলো কবিতার কাছে, চকলেটের প্রলোভন দেখিয়েছিলো তাকে। কিন্তু দোকানির মেয়ে কী আর চকলেটে প্রলুব্ধ হয়! জহিরের প্রস্তাবের বিনিময়ে তাকে কটাক্ষ ফিরিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছিল কবিতা। জহির ভাবলো, এইসব পাকা মেয়েগুলো ভীষণ বজ্জাত। একটু দেখালে কী এমন ক্ষতি হতো?

পাকা মেয়েদের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে জহির নজর দিলো অবুঝ কাচা মেয়েদের দিকে। ভাবলো, সাপ ছোটো হলেও সাপ, বড় হলেও সাপ। ছোটো মেয়েগুলো অত সহজে এতবড় চকলেটের প্যাকেটকে অবহেলা করতে পারবে না।

প্রলোভনটা পকেটে পুরে জহির হানা দেয় রত্নগড়ের মাঠে। বিকালে শাসনের বাঁধন কিছুটা শিথিল হলে ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা এখানে এসে সন্ধ্যা পর্যন্ত স্বাধীনতা উদযাপন করে। একটা খেলা গুছিয়ে উঠতে উঠতেই অনেক সময় স্বাধীনতার মেয়াদ ফুরিয়ে যায়। খেলার চেয়ে হইহল্লাই বেশি হয়, তবুও উল্লাসের কমতি হয় না তাদের। একটা উচ্ছৃঙ্খল বিকাল তাদের যে পরিমাণ আনন্দ দেয়, বড়ো মানুষেরা সারাজীবন ব্যয় করেও ততটা পায় না। এইসব বাচ্চাদের মধ্যে কবির পাটোয়ারির মেয়ে শোভাই সবচেয়ে চঞ্চল। পায়ে বিদ্যুৎ লাগিয়ে ছুটে বেড়ায় মেয়েটা, বয়স এখনো দুই অঙ্কে পৌঁছায়নি তার, উচ্ছ্বাসের আতিশয্যে এই বয়সেই পাড়ায় কিছু নিন্দুক জুটিয়ে ফেলেছে শোভা। শোভার পেটভর্তি হাসি, এতো হাসে তবুও ফুরায় না। গোমড়ামুখী মহিলারা মুখ বাঁকা করে, মেয়েমানুষের এত কীসের হাসি?

মাঠে দুইটা চক্কর দেয়ার পর শোভার চেয়ে উপযুক্ত আর কাউকেই খুঁজে পায় না জহির। শোভাকে ডাক দিতেই তিন লাফ দিয়ে সে হাজির হয়। জহিরকে সে চিনে, উপরের ক্লাসে পড়ে। উঁচু ক্লাসের এইসব দেবতাদের রীতিমতো ভক্তি এবং ঈর্ষা করে সে। ইচ্ছে হলেই দলবেঁধে তারা স্কুল পালায়, কড়া স্যারদের বিভিন্ন ব্যঙ্গাত্মক নামের প্রচলন করে তাদেরকে কৌতুকে পরিণত করে, স্কুলের পেছনে গিয়ে জোট বেঁধে কী যে বীরত্বের পরিকল্পনা করে শোভা জানে না, শুধু মাঝে মাঝে জটলা থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখে। তাদেরই একজন তাকে তার নাম ধরে ডেকেছে, বিস্ময় আর উৎসাহের সীমা থাকে না শোভার। উপরের ক্লাসের একজন মহামানব তাকে কিছু একটা দেখানোর জন্য নিয়ে যাচ্ছে, এতজন ছেলেমেয়ের মধ্যে আর কাউকে না শুধু তাকেই এই সুযোগ দেয়া হয়েছে, নিজের সৌভাগ্যে তার নিজেরই বিশ্বাস হতে চায় না।

জহিরের পেছন পেছন শোভা এসে হাজির হয় রতন বসাকের কলাবাগানের পেছনে একটা ভগ্নপ্রায় মঠের সামনে। শোভা দেখে একটা দুষ্ট বটগাছ ডালপালা মেলে দিয়ে মঠের ঘাড়ে চড়ে বসে আছে, ভদ্র বৃক্ষের মতো মাটিতে নামার কোনো লক্ষণ তার নেই। ভূতের আড্ডাখানা হিসেবে এই মঠের সুনাম আছে পাড়ায়। রত্নার মরা ঠাকুরদা নাকি সন্ধ্যার পরে মঠের চারপাশে সাদা ধবধবে ধুতি পরে ঘুরে বেড়ায়, পানিতে ডুবে মরার পর সনিয়া আপা নাকি এখানে বসেই রাত বিরাতে কাঁদে, গলায় দড়ি দেয়া ওসমান মির্জা গভীর রাতে এখান থেকেই প্রেমিকার নাম ধরে আর্তনাদ করে। শোভার যে একটু ভয় করে না তা নয়, কিন্তু রোমাঞ্চও কম হয় না। জহির ভিতরে ঢোকে, ইশারায় শোভাকেও ঢুকতে বলে। গুরুজনের আদেশ অমান্য করতে পারে না শোভা। তাছাড়া সাহসী এই অভিযাত্রার গল্প করে তিন্নি, মিলিকে কতটা চমকে দেয়া যাবে, এই চিন্তা করেই তার গর্ব হতে লাগলো।

বিকালের মোলায়েম আলো কলা গাছের পাতা আর পুরনো ইটের ফাঁক গলে অল্পই ঢুকতে পেরেছে মঠের ভিতরে, তাতে অন্ধকারটা শুধু পাতলা হয়েছে। মঠে ঢুকে একটু হতাশই হলো শোভা, কী এক অজানা দেখার উত্তেজনা ছিল তার মধ্যে, কিন্তু মেঝেতে সিগারেটের প্যাকেট আর ফিল্টার ছাড়াও ইহজগতের নানা চিহ্নের ছড়াছড়ি। চিপস, জুসের রঙচঙে চুপসানো প্যাকেট আর ওষুধের বোতলের আশেপাশে সিরিঞ্জও দেখা গেল কয়েকটা। শোভা কপাল কুঁচকে ভাবে ভূতেরাও কি সিগারেট খায়? তাদেরও কি অসুখ বিসুখ হয়, সুঁই দেয়া লাগে?

শোভাকে এতদূর পর্যন্ত আনতে যেহেতু প্রলোভনটার প্রয়োগ করতে হয়নি, বাকি কাজ হয়তো বিনা চকলেটেই হতে পারে। চকলেটটা দিবে কি দিবে না তা নিয়ে কিছুক্ষণ দ্বিধা করে জহির। নষ্ট করার মতো সময় জহিরের নেই, তাই সে উদার হয়। শোভার হাতে চকলেটটা দেয়, দেবতার উপহার শোভা সানন্দেই নেয়। জহির হাত দিয়ে মেঝেটা একটু পরিষ্কার করে শোভাকে বসতে বলে। সেই ‘কিছু একটা’ দেখার প্রত্যাশায় বসে পড়ে শোভা, ভাবে এটাই বোধহয় রীতি I

কিন্তু জহির যখন তার নিরীহ ফ্রকটা নিয়ে টানাটানি শুরু করে, শোভা এই অদ্ভূত কাণ্ডের কোনো অর্থই বের করতে পারে না। জহিরের নির্লজ্জ হাত আরো অবাধ্য হয়ে উঠছে, আর শোভার অবুঝ শরীর আরো আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ঘটনার অভিনবত্বে শোভা বিমূঢ় হয়েছিলো কিছুক্ষণ, হাত থেকে খসে পড়েছে উপঢৌকনের চকলেট। শোভা তার দুই হাত দিয়ে জহিরকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু যে হাত মাটি নিয়ে খেলা করে, যে হাত পুতুলের চুল বাঁধে, যে হাত এখনো সখীর সাথে আড়ি নেয়, ভাব করে সে হাত দিয়ে এমন অদম্য লালসা সে কীভাবে আটকাবে ?

শোভার সমস্ত যুদ্ধ জহিরের তিন হাত পায়ের শক্তির কাছে পরাজিত হয়। জহির চেয়ে দেখে একটা বালকের সাথে এই দেহের পার্থক্য সামান্যই। সেই সামান্য পার্থক্যটুকুতেই সে তার পুরুষত্ব জাহির করতে চায়। শোভা চিৎকার করার চেষ্টা করেও পারে না, শুধু একটা গোঙানির মতো শব্দ হয়। জহির বহুভাবে চেষ্টা করে কিন্তু একটা অপরিপক্ক দেহে পুরুষ হওয়ার প্রক্রিয়াটা সম্পন্ন করতে পারে না। শোভার একটার পর একটা আর্তনাদ বুকে আটকে যাচ্ছে, গলা দিয়ে বের হচ্ছে না। অবশেষে হতাশ হয়ে উঠে পড়ে জহির। শোভার ভীত দেহটা নিস্তেজ পশুর মতো পড়ে থাকে। প্যান্টের বোতাম লাগিয়ে কাউকে কিছু না বলার আদেশ দিয়ে জহির বেরিয়ে যায়। জহির জানতেও পারলো না, একটা কোমল হৃদয়কে দুমড়ে মুচড়ে স্থায়ীভাবে বিকৃত করে রেখে গেছে সে। চিরদিনের জন্য শোভার সমস্ত হাসি ছিনিয়ে নিয়ে চলে গেছে জহির।

মঠের দেয়ালে গাঁথা পুরনো ইট, নিম্নস্তরের কিছু কীট পতঙ্গ, বিকালের অবসন্ন আলো, সন্ধ্যার আসন্ন অন্ধকার আর আকাশের ওপাড়ে বাস করা অদৃশ্য ঈশ্বর ছাড়াও শোভার এই দুর্দশার আরো একজন সাক্ষী সেদিন ছিলো। মঠের আলগা ইটের ফাঁক দিয়ে সমস্তটাই দেখেছে বালক রাও।

রত্নগড়ের মাঠে শোভার চঞ্চল পা দুটো আর ছুটে বেড়ায় না। পাখিদের সাথে পাল্লা দিয়ে যে সারাক্ষণ কিচির মিচির করতো, ঘুম আর ধমক ছাড়া যাকে থামানো অসম্ভব ছিল, তাকে এখন প্রশ্ন করলেও জবাব পাওয়া যায় না, যদি দেয় তাও এক শব্দের বেশি খরচ করে না। বাক্যব্যয়ে এত কৃপণ সে কী করে হলো কেউ বুঝতে পারে না। যার হাসির শব্দ গোমড়ামুখো মহিলাদের গায়ে জ্বালা ধরাতো, তার হাসি হঠাৎ কী করে বিলুপ্ত হয়ে গেল ? সেদিনের মঠের আবছা অন্ধকার তার চামড়ার মধ্যে ঢুকে গেছে, পৃথিবীতে ভোর হয়, দুপুর আসে, কিন্তু শোভার মুখে সন্ধ্যা চিরস্থায়ী হয়েছে।

শোভার বিমর্ষ, বিষণ্ণ মুখটা দেখে প্রতিবেশীরা খুশি হয়, মেয়ে মানুষ এমন লক্ষী না হলে হয়? অন্য বালিকাদের জন্য শোভা একটা উদাহরণ হয়ে ওঠে। মেয়েদের মায়েরা অবাক হয়ে যায়, কী জাদুবলে মেয়েটা এমন শান্ত হয়ে গেল? তারা মনে মনে প্রার্থনা করে উপরওয়ালা তাদের মেয়েকেও যেন এমন কৃপা করে।

একটা আতঙ্ক বুকে পুষে শোভা ধীর পায়ে ঘাড় নুয়ে স্কুলে যায়। নিজেকে সে এমনভাবে গুটিয়ে নেয় যে তার অস্তিত্ব আলাদাভাবে লক্ষ করা যায় না। সবার মধ্যে সে অদৃশ্য হয়ে থাকে। কিন্তু এক জোড়া চোখ তাকে অনুসরণ করে যায়। শোভার ফিতাবিহীন মলিন দুটো বেণী, একটা হাতের আশ্রয়ে আরেকটা হাতকে রেখে পথচলা, ভীত হরিণীর মতো সন্ত্রস্ত চাহনি সবকিছুই আড়াল থেকে লক্ষ করে রাশু। শোভার সামনে এসে সে দাঁড়াতে পারে না, নিজেকে তার দোষী মনে হয়। কী অপরাধ তার হয়েছে সে জানে না, কিন্তু শাস্তি সেও পাচ্ছে।

বছরের পর বছর এসে চলে যায়, কয়েক সহস্র নতুন সূর্য ওঠে, কিন্তু শোভার মুখের অন্ধকার তবুও দূর হয়না। ইতোমধ্যে শোভার শরীরে বয়স আক্রমন করে, তার দেহ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে শুরু করে যৌবনের নানাবিধ চিহ্ন। শোভা কী দিয়ে এই আক্রমন ঠেকাবে বুঝে উঠতে পারে না, বুকের দুটি অভিশাপ তার রক্ত মাংস খেয়ে বড়ো হচ্ছে, কন্ঠের কমনীয়তা কমে মোহনীয়তা বাড়ছে, ছেলেমানুষীর পরিধিতে কোনো অঙ্গকেই আর আটকে রাখা যাচ্ছে না। নিজের শরীরের নতুনত্ব আবিষ্কার করে আতঙ্ক তার বাড়তে থাকে। নিজেকে আরো বেশি সংকুচিত করে নেয় সে। বান্ধবীদের ফিসফিসানিতে সে অংশ নেয় না, মেয়েরা যখন মুচকি হেসে ছেলেদের মাথা খায়, সে তখন মাটির সাথেই চোখাচোখি খেলে। তারা চিঠি দেয়, হাত ধরে, প্রেম করে, চুমু খায়, বয়সের ষড়যন্ত্রে আরো অনেক দুঃসাহসিক অভিযাত্রা সম্পন্ন করে আসে। শোভা যৌবনের এইসব উদযাপন থেকে ইস্তফা দিয়ে নিজের চারপাশে একটা দেয়াল তৈরি করে তারমধ্যে ভীত হয়ে বসে থাকে।

এরমধ্যে রাশুর স্কুলব্যাগ নামে কাঁধ থেকে, নীল দেয়া সাদা ইউনিফর্ম আশ্রয় নেয় স্মৃতিতে, শাসনের পাহারা দুর্বল হতে শুরু করে, যৌবন অবারিত সম্ভাবনা নিয়ে তাকেও হাতছানি দেয়। কিন্তু রাশু সব হাতছানি উপেক্ষা করে, শোভার দিকেই চেয়ে থাকে। এই দুটি মানুষের অদৃশ্য সংযোগ অব্যাহত থাকে।

বয়সের সাথে সাথে রাশুর অপরাধবোধ এবং শোভার প্রতি তার মমতা দুটোই বাড়তে থাকে। শোভার মুখে অন্তত একবার সেই উচ্ছ্বল হাসি না দেখলে বোধহয় তার বালক বয়সের ভীরুতার অপরাধটার প্রায়শ্চিত্ত হবে না।

পরীক্ষার খাতায় নম্বরের ভালো ফলন ফলায় রাশু, ভালো ছাত্র হিসেবে তার সুনাম ছিল। একটা চাকরি জুটিয়ে রাশু উপযুক্ত পাত্রের পদে উন্নীত হয়। মাথার ওপর একটা চাকরির ছায়া না থাকলে শোভার মতো লক্ষী মেয়ের বাপমায়েরা মেয়েকে হাতছাড়া করে না। বিয়ের কথা শোনামাত্র শোভার দম আটকে আসে, অজানা ত্রাসে চোখ বেয়ে নামে জলের ধারা। বাপ মা, বান্ধবীদের জেরা করে, মেয়ে গোপনে কাউকে কথা দেয়নি তো আবার? বান্ধবীরা হেসে কূল পায় না, চোখের জলের তর্জমা করে, বাপমায়ের প্রতি মায়া। একটু কাঁদা ছাড়া শোভা বিশেষ আপত্তি করতে পারে না, যৌবনের এইসব পরিণতি তাকে ভোগ করতেই হবে। একটা চাকরির ছাতার নিচে শোভা তার দেয়ালটাকে সঙ্গে করে রাশুর ঘরে চলে আসে।

শোভার অবনত মুখের দিকে তাকিয়ে রাশুর মায়া হয়। বহুবছর আগে যে অন্যায় সে ঠেকাতে পারেনি, এবার তার প্রতিকার করবে। রাশুর প্রেমের স্পর্শে নিজেকে কেঁচোর মতো গুটিয়ে নেয় শোভা, তার কাছে পুরুষের সব স্পর্শই লালসার স্পর্শ। রাও নিজের অধৈর্য হাতকে সংযত করে, সংযমের বাধ দিয়ে প্রেমের বান আটকায়। একটা পুরুষ লোকের পাশে শুয়ে শোভার ঘুম আসে না ভয়ে। মাঝখানে কোলবালিশের পাহারাও তাকে নিশ্চিন্ত করতে পারছে না। সামান্যতম শব্দেও সে জেগে উঠছে আতঙ্কে

রাশুর সব প্রেম শোভার অদৃশ্য দেয়ালে বাধা পেয়ে ফিরে আসে, তার আদর যত্নও শোভার প্রাচীর ডিঙাতে পারে না। রাশুর সামনে শোভার নত মস্তক কোনো সময় উন্নত হয় না। রাশু ভাবে সময়ের সাথে সাথে এই দেয়াল ক্ষয়ে যাবে, কোলবালিশের অলঙ্ঘনীয় বাধ একসময় নিজেই তুলে দিবে শোভা। শোভার হাতের মেহেদি ঝাপসা হয়ে গেছে, পায়ের আলতা মুছে গেছে, কিন্তু তার আতঙ্ক একটুও কমেনি। রাও তাকে নিয়ে গেছে পাহাড়ে, সমুদ্রে, বনে কিন্তু শোভার চোখ নিজের পা ছাড়া আর কিছুই দেখার উৎসাহ পায়নি। প্রথম প্রথম সবাই ভেবেছে, রাশুর বউ খুব লাজুক। পরে বিভিন্ন লক্ষণে প্রকাশ পেয়েছে, বউ আসলে লাজুক না, ভীতু। পুরুষ লোকের কণ্ঠ শুনলেই কেমন মুষঢ়ে পড়ে, এমনকি ফেরিওয়ালার হাঁক শুনলেও ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়।

শোভার আচরণ মাঝে মাঝে অপমানজনক লাগে রাশুর কাছে, সেদিন রাশু হাত ধরাতে শোভার শ্বাসটান উঠে গিয়েছিলো, অফিস থেকে ফিরে রাও হঠাৎ দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকতেই ভয়ে শোভা হাত থেকে চায়ের কাপটা ফেলে রীতিমতো কাঁপতে থাকে। আধুনিক কী একটা দিবসকে উপলক্ষ করে রাও সেদিন ফুল আর চকলেট এনেছিলো, তা দেখে শোভা প্রায় অর্ধেক রাত পর্যন্ত বাথরুম থেকে বের হয়নি। ফুলের প্রতি তার কোনো মোহ নেই, চকলেটে আছে ভীতি।

মাঝে মাঝে হতাশ লাগে রাশুর। ভাবে, সে চাইলেই কোলবালিশের দুর্বল দেয়ালটাকে উচ্ছেদ করতে পারে। প্রেমে যাকে জয় করা যায় না, তাকে শক্তি দিয়ে অনায়াসে নিজের করা যায়। জোর করে একবার অধিকার স্থাপন করলে হয়তো শোভা নিজেই নিজেকে সপে দেয়া শিখবে। এই ভাবনাটা প্রতিদিন তার সংযমের বাধে একটু একটু করে ফাটল ধরায়। একদিন রাতে প্রেমের জোয়ারে রাশুর অধৈর্য হাত কোলবালিশের নিষেধ অমান্য করে ঐপাড়ে চলে আসে। শোভা যেভাবে সংকুচিত হয়, তাতে লজ্জার চেয়ে ভয় আর ঘৃণাই মিশে থাকে বেশি। ঘৃণাটাই শুধু দেখে রাশুর পুরুষ চোখ, ক্ষুণ্ণ হয় সে। মুহূর্তেই কোলবালিশটাকে বহিষ্কার করে পাঠিয়ে দেয় বিছানার অপর প্রান্তে। স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে রাশুর সবগুলো অঙ্গ, নিজ নিজ অধিকার স্থাপনে তারা শোভার শরীর দখল করতে থাকে। রাশুর উগ্র চুমুগুলোকে বিষাক্ত ছোবলের মতো লাগছে শোভার। সে কিছুক্ষণ লড়াই করার চেষ্টা করে, কিন্তু পুরুষের শক্তির কাছে সে আরেকবার অসহায় হয়ে যায়। হাত মুঠো করে সে আড়ষ্ট দেহ নিয়ে পড়ে থাকে কোনোমতে। শোভার আর্তনাদগুলো আবারও গলায় আটকে শুধু গোঙানিটা বের হয়। মঠের বাহিরে দাঁড়িয়ে এই ব্যর্থ আর্তনাদগুলো একদিন রাশু শুনেছিলো, কিন্তু আজ এতকাছে থেকেও সেগুলো তার কান পর্যন্ত পৌঁছায় না।

শোভার পুরো দেহে বিজয় নিশানা উড়িয়ে রাশু নিজের আহত পুরুষত্বের প্রতিকার করলো। একটা সান্ত্বনার চুমু খায় সে শোভার গালে, চুমুটা কেনো যেন নোনতা লাগে তার কাছে, শোভা কাঁদছে? হাসাতে গিয়ে শোভাকে সে কাঁদিয়েই ছাড়লো? রাশুর মনের ভিতর একটা বেদনা পাক দিয়ে ওঠে, কিন্তু সঙ্গমক্লান্তির কারণে সহানুভূতিটা মুহূর্তেই ঝিমিয়ে পড়ে। সকাল হোক, সব ঠিক করে নিবে সে। শোভার লজ্জা, ভয় ভাঙ্গার জন্য এইটুকু ব্যথা না দিয়ে তার উপায় ছিলো না, কিছুদিন পরে হয়তো এইটুকু অত্যাচারের জন্য শোভা তার প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে থাকবে। কোলবালিশটাকে জড়িয়ে ধরে পরিতৃপ্তি নিয়ে ঘুমিয়ে যায় রাশু।

সকালে ঘুম ভেঙ্গে বিছানার অন্য পাশে শূন্যতা দেখে অবাক হয় রাশু। রাতের পাতলা ঘুম ভোরবেলা একটু গাঢ় হয় শোভার। চোখ খুলে শোভার ঘুমন্ত মুখ দেখা রাশুর একরকম অভ্যাস হয়ে গেছে। বালিশে শোভার মাথার ছাপ লেগে আছে এখনো, রাশু হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেখে বালিশ বিছানায় কোনো উত্তাপ নেই। শোভার পরাজিত জামাকাপড় ধ্বংসাবশেষের মতো লুটিয়ে পড়ে আছে এদিক সেদিক। বিছানার নিচের দিকে একটা বেতের মোড়া কাত হয়ে শুয়ে আছে, তার ঠিক তিন ইঞ্চি উপরে শোভার পায়ের পাতা দুটো টানটান হয়ে আছে, যেন বিছানা ছোঁয়ার চেষ্টা করছে। রাশু হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে দেখে, সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলে আছে শোভার নগ্ন দেহ। পৃথিবীর সমস্ত পুরুষ, যারা তার লজ্জার আবরণ ভাঙতে চেয়েছে, নির্লজ্জ হয়ে তাদের প্রতি কী নির্মম উপহাসটাই করলো শোভা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *