উন্মাদ আশ্রম – ৪

॥ চার ॥

জহির আবার মেসে ওঠে, ভিক্ষা করে জমানো টাকায় কেনে হাল ফ্যাশনের জামা কাপড়। নতুন বেশে তার পুরনো পরিচয় ঢাকা পড়ে যায় অনেকটাই, রাস্তায় থেকে চেহারায় যে বজ্জাতিটা যোগ হয়েছে, সেটা আড়াল করলো চশমা দিয়ে। খুঁড়িয়ে হাঁটলে তার অভিজাত পোশাকের মর্যাদা রক্ষা হয় না, তাই একটা ক্রাচ কিনলো সে। পুরাতন মধ্যবিত্ত নামটি তার নতুন চালচলনের সাথে বেমানান, নিজেই একটা নাম রাখলো নিজের। নিজের মরা বাপকে বানালো আর্মির বড় অফিসার, অবসরে তিনি এখন ভাইয়ের সাথে লুক্সেমবার্গে আছেন। মায়ের পরিচয় যেহেতু গৌণ, তাকে কবর থেকে ওঠানোর প্রয়োজন পড়লো না, তিনি শান্তিতে কবরেই শুয়ে রইলেন। শহরের যে অঞ্চলে শুধু ধনাঢ্যরাই বাস করতে পারে, সেখানে তাদের বহুতল বাড়ি তৈরি হচ্ছে, শুধু সেজন্যই সে মেসে এসে উঠেছে। অর্ধকোটির গাড়িটা তার বন্ধুর গ্যারেজে পড়ে আছে, ড্রাইভার ছুটিতে গিয়ে বউয়ের অসুস্থতার জন্য গ্রামে আটকে পড়েছে। আপাতত গাড়ি ত্যাগ করে সাধারণ মানুষের মতো খোলা বাতাস গায়ে মেখে চলতেই তার ভালো লাগছে, অহংকার করার ক্ষমতা যাদের আছে কেবল তারাই এমন নিরহংকার হতে পারে। মেসে ওঠা নিয়ে তার ব্রিগেডিয়ার পিতার সঙ্গে একপ্রস্থ যুদ্ধ হয়ে গেছে তার, বাপের পদের সম্মান রক্ষার্থে তাকে আপাতত একটা বিলাসবহুল এ্যাপার্টমেন্টে উঠতে বলা হয়েছিলো, কিন্তু একা থাকতে তার ভালো লাগে না। তাই সে মধ্যবিত্ত মেসমালিকের প্রতি দয়া দেখিয়ে এবং এখানে বসবাসরত হতভাগ্য গরীবগুলোকে সাহচর্য দিয়ে ধন্য করার জন্য মেসে এসে উঠেছে।

জহির ডান হাতে সাদা ব্যান্ডেজ পেঁচিয়ে সারাদিন বিভিন্ন ব্যাংকে ঘুরে বেড়ায়। ব্যাংকের শীতল পরিবেশে বসে টাকার বান্ডেলের আনাগোনা দেখে। এত টাকা চোখের সামনে দেখে হাত তার নিশপিশ করে। ভাগ্য ভালো এক পা তার অকেজো, দুই পা ঠিক থাকলে হয়তো টাকা ছিনিয়ে নিয়ে দৌড় দেয়ার লোভ সে সামলাতে পারতো না। পায়ের অভাব মেটানোর জন্যই মাথাটাকে তার একটু বেশি খাটাতে হয়। সে অপেক্ষা করে চেকবই নিয়ে কলম খুঁজতে থাকা বৃদ্ধদের জন্য। সারাদিন ঘুরলে দুই একজনকে পাওয়া যায়। জহির নিজের মুখে বিগলিত হাসি ফুটিয়ে কলম এগিয়ে দেয়। সাহায্যের প্রতিদানে সে নিজেও সাহায্য চায়, আহত হাতটা দেখিয়ে অনুরোধ করে ডিপোজিট স্লিপটা লিখে দেয়ার জন্য। তার হাতের অস্থায়ী এবং পায়ের স্থায়ী অসুস্থতা দেখে সমবেদনা দেখায় কেউ কেউ, খুব আগ্রহ করে লিখে দেয় তার জমা রশিদ। এই সময়ে অসাবধানে অনেকে ভুলে যায় তার চেকবইয়ের কথা। সেই সুযোগে জহির ভেতর থেকে একটা দুইটা খালি পাতা ছিড়ে নেয়। কাজটা করে সে অতিদ্রুত, ধরা পড়লে কী বলবে তাও ভেবে রাখে সে। চশমাটা নাকের উপর ঠেলে দিয়ে ব্ৰিত কণ্ঠে বলবে, ও এটা আপনার? সরি সরি, আমি ভেবেছি আমার। দুইবার সরি বললে এই শহরে এরচেয়ে অনেক বড়ো অপরাধও মাফ হয়ে যায়। একটাও ‘সরি’ ব্যয় না করে গত এক সপ্তাহে মোট পাঁচটি চেকের পাতা সংগ্রহ করেছে সে।

জহিরের মেসের মালিক বেলায়েত পোদ্দার তিনতলায় সপরিবারে থাকে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জহির তার দরজায় কড়া নাড়ে। দরজা খুলে জহিরকে দেখে বেলায়েত পোদ্দারের চেহারায় একটা গদগদ ভাব চলে আসে, বড়োলোক বাপের নিরহংকার ছেলেকে দেখে যতটুকু আসা উচিত তার চেয়েও একটু বেশি। মেসের লোকজনের উপরে উঠে আসাটা পছন্দ না বেলায়েতের, মেয়েটা তার বড়ো হচ্ছে, বউকেও সন্দেহ কম করে না। দেহব্যাপী অভাবের চিহ্ন নিয়ে কমবয়সি ছোকরা মেস মেম্বাররা যখন উপরে আসে তাদেরকে চোখ রাঙায় সে, কিন্তু জহিরকে দেখে বিগলিত হাসি হেসে দুই হাত কচলাতে থাকে। এখনো কৈশোর না পেরুনো মেয়েটাকে নিয়ে আফসোস হয় তার, মেয়েটা আরেকটু বড়ো হলেই পারতো, একটা ষড়যন্ত্র ঘটিয়ে ফেলা যেতো। অবশ্য বড়ো তো মেয়েটা হবেই, বড়োজোর এক কি দুই বছর, ততদিন বড়লোকের পঙ্গু ছেলেটা কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাদের কুদৃষ্টি থেকে বেঁচে থাকলেই হয়। চা দেয়ার জন্য বউকে না ডেকে মেয়ের নামের ভদ্র সংস্করণ ধরে হাঁক দেয় বেলায়েত পোদ্দার, কিশোরি মুখের লালিত্যও যদি ব্রিগেডিয়ারের ছেলের মনে দাগ কেটে রাখে। তর্জনী দিয়ে নাকের ছিদ্রে কীসের যেন সন্ধান করতে করতে মেয়েটা সামনে এসে দাঁড়ায়। বেলায়েতের এমন রাগ হয়, মেয়েটার গালে একটা চড় দেয়ার ইচ্ছাটাকে বহুকষ্টে দমন করে।

চা খেতে আপত্তি খুব বেশি করে না জহির, মধ্যবিত্তের ঘরে আতিথ্য গ্রহণ করাও তার উদারতা। চায়ে চুমুক দিয়ে সে বেলায়েত পোদ্দারকে কৃতাৰ্থ করে দেয়। চায়ের কাপ নামিয়ে রাখতে রাখতে বলে, আসলে একটা বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি। বলতে লজ্জাও লাগছে।

ভূমিকা করে জহির। বেলায়েত কৃত্রিম অভিমান দেখায় ৷

আরে কী কন, লইজ্জা কীয়ের! এমনে কইলে তো মনে কষ্ট লাগে, আমারে কি আপনা মানুষ মনে করেন না?

জহির বিব্রত কণ্ঠে বলে, আসলে আজকে ওয়ার্কারদের ছোটো একটা পেমেন্ট করতে হবে, আমার কাছে ক্যাশ নেই এই মুহূর্তে। চেক আছে, কিন্তু রবিবারের আগে তো আর সেটা ক্যাশ করা যাচ্ছে না। সেজন্যই আপনার কাছে আসলাম।

মনে মনে খুশি হয় বেলায়েত, উপকারের বড়শি দিয়েই যদি পাত্রটাকে গাঁথা যায়। জিজ্ঞাসা করলো, কতো টাকার চেক ?

খুব বেশি না, এক লাখ টাকা।

বেলায়েত পোদ্দারের মুখে চিন্তার ভাঁজ দেখে কিছুটা শঙ্কিত হয় জহির। কিছুক্ষণ ভেবে বেলায়েত বলে, এক লাখ ট্যাকা তো ক্যাশ নাই ঘরে, সব মিলায়া পঞ্চাশ হাজারের মতো আছে।

আচ্ছা, সমস্যা নেই, আমার এতেই চলবে, আপনি এই চেকটা রাখেন, বাকি টাকা থাকুক আপনার কাছে, মাসে মাসে কেটে রাখবেন, বেশ কয়েকদিন তো এখানে থাকতেই হবে আমার।

বেলায়েত পোদ্দার হাসিমুখে কৃতজ্ঞতার সাথে পঞ্চাশ হাজার টাকা জহিরের হাতে তুলে দিলো, পুরো টাকাটা দিতে না পেরে মনে তার একটু অস্বস্তি রয়ে গেছে। জহির এক লাখ টাকার চেক বেলায়েতের হাতে দিয়ে তাকে ঋণী করে দিয়ে গেল। এই ঋণ শোধ করার সুযোগ বেলায়েত আর পায়নি, জহিরকে সেই মেসে আর কখনো দেখা যায়নি।

একই দর্শকের সামনে এক জাদু দুইবার দেখাতে নেই। জহির তাই শহর পরিবর্তন করে, নতুন শহরে গ্রহণ করে নতুন নাম, সাথে তার জীবন বৃত্তান্তেও যোগ হয় নতুনত্ব। তার কেরানি বাপকে কখনো সরাসরি যুগ্ম সচিব পদে প্রমোশন দেয়, ক্লাস এইটের গণ্ডিতে আটকে যাওয়া মাকে বানায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, কখনো তার ভাই হয়ে যায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের বড়ো পদধারী, কাল্পনিক বোনের কাল্পনিক বোনজামাইকে রাষ্ট্রদূত বানিয়ে বিদেশে পাঠায় অহরহ। নিজের জীবনে এত সমৃদ্ধি আমদানি করে যে, বুকটা তার ফুলে ওঠে গর্বে। মাঝে মাঝে নিজের মিথ্যা নিজেই বিশ্বাস করতে শুরু করে। চাকরি কিংবা মামলার জন্য তদবীর করতে আসা অনুগ্রহপ্রার্থীদের সাথে দুর্ব্যবহারও করে বসে, এত এত প্রভাবশালী আত্মীয়স্বজন যার, মেজাজ তো তার একটু চড়া হবেই।

এটিএম টাকা নেয়ার সময় জহির ধনী গরীবে কোনো বৈষম্য করে না, বুথের চকচকে টাকা যেমন নেয়, ঘাম আর মাটি লেগে থাকা টাকাও সে সমান আগ্রহে গ্রহণ করে। কত বউয়ের গলা খালি হয়েছে তার জন্য, কত বোনের মাটির ব্যাংক ভেঙ্গেছে সে। বৃদ্ধ বাপের পেনশন, ছেলের চিকিৎসার টাকা, ব্যবসার পুঁজি কোনো কিছুকেই অবজ্ঞা করেনি সে। পুলিশের খাতায় নামও উঠেছে তার, কিন্তু সেই নামের যেহেতু আকিকা হয়নি, ছুড়ে ফেলতেও অসুবিধা হয় না। পুলিশ বেশি উৎপাত করলে কিছুদিন অবসর যাপন করে। এরকম অবসরে ফোনে কমবয়সি মেয়েদের মাথা খায় সে।

তারপর সুযোগমতো একদিন দেখা করে কোনো একটা রেস্টুরেন্টে। মেয়েদের বাপদের ঘোল খাওয়ায় সে, মেয়েদের খাওয়ায় চিকেন ফ্রাই। কিন্তু বেশি জড়ায় না জহির, প্রথম দেখার শেষপ্রান্তে মেয়েটাকে জানায় তার ফোনে চার্জ নেই, মাকে একটা কল করতে হবে। মেয়েটা অর্ঘ্যের মতো ফোন এগিয়ে দেয় দেবতার সামনে। বাহিরে এসে মাকে ‘কল’ করে না জহির, যেহেতু তার মা ‘কল’ ধরার অবস্থায় নেই। সে হাতের ইশারায় রিকশা ডাকে, তারপর ফোনটাকে বন্ধ করে সেখান থেকে চলে আসে। মেয়েগুলো বাসায় ফিরে সজল চোখে জানায় তার ফোন হারিয়ে গেছে। মেয়ের চোখে জলের ধারা দেখে অতিসত্বর তাকে আরেকটা ফোন কিনে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। তিন দিন পার না হতেই কিনে দেয়া হয় আরেকটা ফোন কিন্তু নতুন ফোন পেয়েও মেয়েটা কেন দিনরাত কাঁদে বাপ-মা তা বুঝতে পারে না।

নতুন কোনো শহরে গেলে সেই শহরের পথেঘাটে হেঁটে ঘুরে বেড়ায় জহির। রাস্তায় মানুষের চেহারা দেখে, হাসিমুখের সাথে গোমড়া মুখের তুলনা করে। মানুষের শরীরে পুষ্টি মাপে, সাধারণত অপুষ্ট মানুষের পকেট অপুষ্ট হয়। বাজার ফেরত মানুষের ব্যাগের স্বাস্থ্য, দোকানে পণ্যের বৈচিত্র্য দেখে অর্থনীতির আকার বুঝে নেয় সে। রাস্তার কুকুরের পাঁজরের হাড় গুনে শহরের মানুষের মনে দয়ার পরিমাপ করে। একজন প্রতারক পথে পথে যত গবেষণা করে, বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে সারা বছরেও অত হয় না।

ফুটপাত ধরে হাঁটছিলো জহির। কিছু মানুষ দ্রুতগতিতে তাকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে, এরা অফিস ফেরত চাকুরে। এদের সব সময় তাড়া থাকে, মাথা নিচু করে হাঁটে তারা, পথে সুন্দরী নারী দেখার সময়ও তাদের নেই। এই প্রজাতির প্রধান খাদ্য হচ্ছে বকা, অফিসে বসের বকা খায়, কারণ যোগ্যতার তুলনায় বেশি বেতন পায়। বাসায় বউয়ের বকা খায়, কারণ প্রয়োজনের তুলনায় কম বেতন পায়। জহির ছুটে চলা চাকুরেদের পিঠে লেপ্টে থাকা ঘামে ভেজা শার্ট দেখতে থাকে। ঠিক তখন হাতে কোদাল আর ঝুড়ি নিয়ে একটা ছেলে এগিয়ে আসে।

একটা কথা কইতাম স্যার।

‘কথা’ বলতে দুঃখের কথা, জহির বোঝে। কিন্তু এত লোককে এড়িয়ে তাকেই কেনো ‘কথাটা’ শোনাতে চায় ছেলেটা, তার চেহারায় কি ইদানিং দয়ালু ভাব চলে এসেছে? জহির ভালো করে লক্ষ করে ছেলেটাকে কোমরে বাঁধা একটা নতুন গামছা শার্ট আর লুঙ্গির সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছে। ফুল হাতা শার্টের ভিতর থেকে ছেলেটার সুস্বাস্থ্য উঁকি মারছে, চামড়ায় রোদের রঙ নেই, হাতে ঝুড়ি কোদাল, ঝুড়িটা হয়তো আজকেই কেনা হয়েছে, কোদালের দাঁত ঝকঝক করছে, নিকট অতীতে মাটি কামড়েছে বলে মনে হয় না। প্রেমিকার গালে সুড়সুড়ি দেয়া কোমল হাতে কোদালের বাট খুব বেমানান লাগছে। ছেলেটাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে শ্রমিক না, শ্রমিক সেজেছে।

সারাদিন কোনো কাম পাই নাই, কয়ডা টাকা দিলে বাজার কইরা ঘরে যাইতাম, পোলামাইয়া না খাইয়া রইছে।

করুণ মুখে নিজের আবেদন জানায় ছেলেটা। নিজের দুর্দশার কথা বলতে এত ভূমিকা করলে কেউ শুনবে কেন? কারো এত সময় নেই এখানে। কিন্তু জহিরের সময়ের কোনো কমতি নেই। বড়ো শহরে এই চাতুরি অনেক পুরনো হয়ে গেছে। পুরনো খেলা দেখে কিছুটা স্মৃতিকাতর হয় জহির। ছেলেটার আনাড়িপনায় সে আগ্রহ এবং কৌতুক অনুভব করে। ফুটপাতের একপাশে দাঁড়িয়ে তার দুঃখের গল্প শোনে। আরেকজনের বানানো দুঃখ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে জহির। গল্প শেষ হলেও জহিরের পেট ভরে না, সে আরো শুনতে চায়। ছেলেটাকে তার পরিবার নিয়ে অনেক প্রশ্ন করে খুটিনাটি সব জানতে চায়। জহির দেখতে চায়, ছেলেটার কল্পনার দৌড় কতটুকু। পরিবারে কে কে আছে, বড়ো মেয়ের নাম কী, ছোটো ছেলের বয়স কত, বোনের এখনো বিয়ে হলো না কেন, শ্বশুর বাড়ি কোথায়, বিয়ে হয়েছে কবে, মেয়ে কোন ক্লাসে পড়ে? সব জিজ্ঞেস করে জেনে নিলো। এত প্রশ্নের তোড়ে সময়ের হিসাবটা ঠিক রাখতে পারেনি ছেলেটা, দেখা গেল বিয়ের দুই বছর আগে তার বড়ো মেয়ের জন্ম হয়েছে। তাছাড়া তার গ্রামের ঠিকানা দিয়েছে উত্তরে কিন্তু ভাষায় আঞ্চলিকতা দক্ষিনের। জহির খুশি হয়, বউরা রান্নায় ভুল করলে শাশুড়িরা যেমন হয়। বললো, চলো, তোমাকে কাজ দিবো।

ছেলেটা ইতস্তত করছে। শ্রমিকের কাজ করার ইচ্ছা কিংবা ক্ষমতা কোনোটাই নেই তার। বলে, স্যার সারাদিন কিছু খাই নাই, ঘরে পোলাপান না খাওয়া, কিছু সাহায্য করলে বাজার কইরা ঘরে যাইতাম।

আচ্ছা, চলো আগে তোমাকে কিছু খাওয়াই।

আপত্তি করতে পারে না ছেলেটা। একটা চায়ের দোকানে গিয়ে বসলো তারা। চা বিস্কুট এলো, ছেলেটা অনিচ্ছায় চায়ের মধ্যে বিস্কুট ডোবাচ্ছে। সারাদিন যে কিছু খায়নি বিস্কুটের প্রতি তার এত অনীহা থাকার কথা না। জহির কিছু খাচ্ছে না, বসে বসে ক্ষুধার্তের কাচা অভিনয় দেখছে।

নাম কী তোমার?

ভেজানো বিস্কুটের অর্ধেকটা টুপ করে চায়ে পড়ে গেল। বিস্কুট চাবানোর দায়িত্ব চায়ের সাথে ভাগাভগি করে কিছুটা স্বস্তি পেলো ছেলেটা। উত্তর দিলো, সোলায়মান।

মুখে তীর্যক হাসি আর চোখে কাঠিন্য এনে জহির তাকালো ছেলেটার দিকে। গম্ভীর কণ্ঠে বললো, আসল নামটা বল, যেটা বাপ-মা রাখছে।

জহিরের কন্ঠে কোনো আর্দ্রতা নেই। ভদ্রতার সূচকে এক ধাপ নিচে নেমে ছেলেটা ‘তুমি’ থেকে ‘তুই’ হয়ে গেল। এমন অবনমনে কিছুক্ষণ বিহ্বল হয়ে রইলো ছেলেটা তারপর সাবধানে চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখলো, কৃপা প্রার্থনার জন্য দুই হাত প্রয়োজন। হাত জোড় করে বললো, স্যার আমি গরীব মানুষ, মিছা কতা কমু ক্যান।

জহির একটা অবজ্ঞার হাসি হাসলো। বললো, মানুষের পকেট থেকে টাকা বের করা এত সোজা না, তোকে দেখে মনে হচ্ছে সিনেমার শুটিং থেকে পালিয়ে এসেছিস। জীবনে কোনো লেবারের এমন পরিষ্কার কাপড়চোপর দেখেছিস? শ্রমিকের চুলও এত কালো থাকে না, মাটি আর রোদ লেগে থাকে চুলে। ফোস্কা পড়ে পড়ে শ্রমিকের হাত সিমেন্টের আস্তরের মতো খসখসে হয়ে যায়, এমন মোলায়েম হয় না। আর বিয়ের দুই বছর আগে বাচ্চা হলে তারা এমন গর্ব করে প্রচার করে না।

জহিরের কণ্ঠে শাসন ছিল, আক্রমন ছিল না, তাই ছেলেটা ভীত হলো না। কিন্তু লজ্জিত হলো ঠিকই। ফেল করা ছাত্রের মতো মাথা নত করে চায়ের দোকানের সাবেক গ্রাহকের ফেলে যাওয়া এক দলা থুতু মনোযোগ সহকারে নিরীক্ষণ করতে থাকলো। তারপর নিচু গলায় বললো, আমার নাম কাদের, বাপ-মার দেয়া নাম না, নাম রাখছে দাদায়।

জহির কাদেরের পিঠে হাত রেখে উৎসাহ দেয়।

চা-টা শেষ কর।

পিঠে রাখা হাতে জহিরের সাথে সংযোগ অনুভব করে কাদের, অপরিচয়ের দূরত্বটা কমে আসে। বলে, না ভাই, দুপুরে বিরিয়ানি খাইছিলাম, গ্যাস হইতাছে।

তোর ছেলেমেয়ে ভাত খেতে পায় না, আর তুই খাস বিরিয়ানি !

জহিরের রসিকতায় কাদের হাসে, তার আড়ষ্টভাব কেটে গেছে। নিজেকে উন্মোচন করতে সে আর কোনো বাধা পায় না।

জীবনে যারা দারিদ্র মেনে নিতে পারে না, কিন্তু অর্থোপার্জনের জন্য ধৈর্যও যাদের নেই, কাদের তাদেরই একজন। স্কুলে থাকতেই টিফিনের টাকা জমিয়ে লটারির টিকেট কিনতো সে, খেলা নিয়ে ধরতো বাজি। বাজির টাকা পরিশোধ করার জন্য অল্প বিস্তর চুরিও শিখেছিলো। কিন্তু তার চৌর্যবৃত্তির পরিধি কখনো ঘরের বাহিরে বিকাশ হয়নি, বাপের মানিব্যাগ আর মায়ের আঁচলেই তা সীমাবদ্ধ ছিল। বড়ো হয়ে জেনেছে সে, অল্পসময়ে বড়লোক হওয়ার জন্য ব্যবসাই হচ্ছে সবচেয়ে সহজ পন্থা, তাকে প্রলুব্ধ করার জন্য আশেপাশে সফল ব্যবসায়ীর উদাহরণের কমতি ছিল না। ব্যবসার টাকার জন্য ঘরে সে শুরু করেছিলো বিদ্রোহ, একটামাত্র লাঠিতেই সেই বিদ্রোহ দমন করে ফেলেছিলো তার বাবা। টাকার জন্য যখন সে উপবাস শুরু করলো, বাবা করলো উপহাস। কিন্তু এবার মা গেল গলে। গয়না বেচে টাকা দিলো ছেলেকে। আরো কয়েকজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী অপদার্থ বন্ধুদের সাথে মিলে সে কিনেছিলো মশলা গুড়ো করার মেশিন। সেই মেশিনে মশলার চেয়ে তাদের স্বপ্নই গুড়ো হয়েছিলো বেশি।

ব্যবসার ক্ষতি দ্রুত পুষিয়ে নিতে আরো সহজ পথ সে আবিষ্কার করে, জুয়া। সফল জুয়াড়িদের উদাহরণ তেমন না পেলেও, উৎসাহ তার দমে না। তারপর থেকে জুয়ার আসরে নিয়মিত দেখা যায় তাকে। জুয়ার টেবিলের পুঁজির জোগান দেয়ার জন্য ঘরের টেলিভিশনটা একদিন গৃহহীন হয়ে যায়। তারপর একে একে বাবার বিয়ের ঘড়ি, বোনের আঙটি, দামি তৈজসপত্র আর ঘরের সুখ শান্তি সব বিক্রি হতে থাকে। অবশিষ্ট সম্পদ বাঁচাতে মায়ের চোখের জল, বোনের অনুরোধ, নিজের পিতৃস্নেহ ইত্যাদিকে অবজ্ঞা করে বাবা তাকেই একদিন গৃহহীন করে দিলো। বন্ধুবান্ধব থেকে ধারকর্য করে জুয়ায় ঢেলেও সেই অতল গহ্বর থেকে কিছুই উত্তোলন করতে পারেনি কাদের। অবশেষে ধারের টাকা যখন গলা চেপে ধরেছে, তখন পালিয়ে এসে এখানে শ্রমিক সেজেছে। দয়ালু এবং বোকা মানুষ যেহেতু এখনো কিছু আছে, মাঝে মাঝে একবেলা বিরিয়ানি সে খেতে পারে।

কাদেরের মধ্যে প্রবৃত্তি যত আছে বুদ্ধি তত নেই, আবেগের ছায়ায় বুদ্ধিটা ঠিক পেকে উঠতে পারেনি। পিঠে একটু হাত ছোঁয়াতেই নিজের জীবনের সব অন্ধকার খুলে দেখিয়ে দিলো। এমন ছেলেকে কাজে লাগানো যায়, মাথা খাটাবে না, শুধু কথা শুনবে। জহির কাদেরকে বলে, সহজে বড়োলোক হওয়ার উপায় তার জানা আছে, তাকে সে সেই পথ দেখিয়ে দিবে কিন্তু তার আগে একটা পরীক্ষা দিতে হবে। ‘অল্পসময়ে বড়োলোক’, এইটুকুই যথেষ্ট কাদেরের জন্য, সে রাজি হয়ে গেল।

জহির কাদেরকে নতুন পরিচয়ের সাথে নতুন একটা গল্পও দেয়। হাসপাতালের সামনের রাস্তায় সে কিছু একটা খুঁজতে থাকবে। আশেপাশে মানুষজনকে জিজ্ঞাসা করবে, একটা নেভি ব্লু ব্যাগ দেখেছে কিনা। এই খোঁজাখুজির মধ্যে আকুলতা থাকতে হবে। ব্যাগে তার ফোন, টাকা, মায়ের প্রেসক্রিপশন, টেস্টের রিপোর্ট সব ছিল। সে এসেছে পাশের উপজেলার একটা গ্রাম থেকে, মাকে বসিয়ে এসেছে ডাক্তারের চেম্বারের সামনে। ব্যাগটা না পেলে তার সর্বনাশ হয়ে যাবে। যথেষ্ট লোকের আগ্রহ জোটাতে পারলে তাকে আসল অস্ত্রটা ছাড়তে হবে, চোখের জল। কারো কাছে কিছু চাইতে হবে না, আবেদন কিংবা নিবেদন কোনো কিছুর প্রয়োজন হবে না। যথেষ্ট অশ্রু ঢালতে পারলে লোকজন টাকা বের করে তার পকেটে গুঁজে দিয়ে যাবে।

জহিরের নির্দেশনা মনোযোগ সহকারে শুনলো কাদের।

কিন্তু চোখে পানি ক্যামনে আনবো ভাই?

মনে কর, সত্যি সত্যি তোর মায়ের অসুখ, ডাক্তার দেখানোর পয়সা নাই তোর কাছে।

তারচাইতে চিন্তা করি, একটা লাল গোলামের অভাবে আমার সাড়ে তিনলাখ টাকা নাই হইয়া গেল। আসলেই সেইদিন খুব কষ্ট পাইছিলাম ভাই, এত কষ্ট জীবনেও পাই নাই, ইশ একটা হরতনের গোলাম !

জহির দেখে কাদেরের চোখ সত্যিই ছলছল করছে।

আচ্ছা যা, আমি এখানে বসে ঘড়ি ধরলাম, আধাঘণ্টার মধ্যে আমাকে পাঁচশো টাকা এনে দিবি, এটা হচ্ছে গল্পের দাম, বাকি কিছু থাকলে সেটা তোর।

কাদের ফিরে আসলো বিশ মিনিট পরেই। তার ঠোঁটে বিজয়ের হাসি, চোখের পাপড়িতে অশ্রু লেপ্টে আছে এখনো। ধার করে যাকে জুয়া খেলতে হয় অভিনয় তার না জানলে চলে না। অল্প একটু অভিনয় আর কয়েক ফোঁটা চোখের জলের যে এত দাম ভাবতেই পারেনি সে। পকেট থেকে তেরোশো বিশ টাকা বের করে সে জহিরের হাতে দিলো। জহির পাঁচশো টাকা রেখে বাকিটা কাদেরকে ফিরিয়ে দেয়। তারপর থেকে এটাই তাদের রীতি হয়ে উঠলো। কিন্তু সেদিন একটা গুরত্বপূর্ণ প্রশ্নের মীমাংসা করতে ভুলে গিয়েছিলো জহির, কী এমন ছিল তার চেহারায় যে এত লোক থাকতে তার কাছেই সাহায্য চেয়েছিলো কাদের?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *