॥ এক ॥
শহরে কিছু গতযৌবনা বাড়ি আছে, যাদের বয়স এত বেশি নয় যে প্রত্নতত্ত্বের স্বীকৃতি জুটবে, আবার অত কমও নয় যে একটু প্রসাধনী করলেই বার্ধক্য ঢাকা যাবে। তাদের চামড়া খসে হাড় পাঁজর সব বেরিয়ে পড়েছে, কপাটহীন উন্মুক্ত দেহ দেখে চোরেরাও প্রলুব্ধ হয় না। বাড়ির সামনের ঘাসগুলো আশকারা পেয়ে মাথা ছাড়িয়েছে, পথচারীদের করুণার দৃষ্টি ও এসে পৌঁছায় না এসব বাড়ির চৌকাঠে। দিনের বেলা সূর্যের দয়ায় একটু রোদ পায়, কিন্তু রাতের বেলায় আশেপাশের ঝাঁ চকচকে বাড়িগুলোর মাঝে মুখ কালো করে বসে থাকে, বিদ্যুতের জৌলুস তারা ভাগে পায় না।
তেমনি একটি বাড়ির সামনে মাথায় বিরাট বিপদ আর শূন্য পকেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জহির তরফদার। মানুষের আধুনিক দুই প্রভু, ফোন আর মানিব্যাগ তার সঙ্গ ছেড়েছে, তাই অসহায়ত্বের সীমা নেই তার। সময় দেখার জন্য অভ্যাস মতো বাম হাতটা তুলে কব্জিতে নজর দিলো সে, একমাত্র অলংকারটাও ফেলে এসেছে। ঘড়ি না দেখেও বুঝলো এখন গভীর রাত, যত গভীর হলে অনিদ্রা রোগীদেরও একটু ঝিমুনি পায়, নতুন দম্পতিও আর জেগে থাকার উৎসাহ পায় না, এখন তেমন রাত। বাড়ির সীমানায় ঢুকতেই পায়ের নিচে পচা পাতা আর ঘাসের নরম অস্বস্তি টের পেলো জহির। শহরের শক্ত পিচে হেঁটে অভ্যস্ত তার পা কিছুটা দ্বিধা করলেও ঘাসের প্রহরা সরিয়ে সে ঢুকে পড়লো বাড়ির আঙ্গিনায়। একটু লক্ষ করলে বোঝা যায়, তার হাঁটার মধ্যে কিছুটা অসামঞ্জস্য আছে, একটি পা তার বিমাতার সন্তানের মতো অপুষ্ট, হাঁটুর নিচ থেকে শুকিয়ে গেছে৷ খুব চেষ্টা করে সে তার এই দুর্বলতাটুকু লুকানোর কায়দা রপ্ত করেছে। এখন কেউ দেখছে না তাকে, তাই বাড়তি প্রচেষ্টা বাদ দিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতেই ভিতরে ঢুকলো সে। একটা পঁচা গন্ধ তাকে অভ্যর্থনা জানালো, কোথাও ইঁদুর মরে পড়ে আছে হয়তো। মানুষের মলমূত্রের গন্ধ না পেয়েকিছুটা আশ্বস্ত হলো জহির, কেউ এখানে বিষ্ঠা ত্যাগ করতেও আসে না। শ্যাওলামাখা দেয়াল সব আলো গিলে ফেলে অন্ধকারটাকে আরো গাঢ় করে ফেলেছে। জহিরের অসহায় চোখ আবছা কয়েকটা দেয়াল ছাড়া আর কিছুই ঠাহর করতে পারছে না। শহরের সব আঁধার বিদ্যুতের চাবুক খেয়ে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছে। ইটের ঠান্ডা দেহ হাতড়াতে হাতড়াতে বাড়ির ভিতরে ঢুকতে থাকলো জহির, মনে মনে কেবল একটাই ভয়, নরম কিছু না আবার ছুঁয়ে ফেলে! অথচ এই রাতের শুরু হয়েছিলো, নরম কিছু ছোঁয়ার প্রতিশ্রুতিতে।
বাড়ির খসে পড়া দেহ পায়ের নিচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, এইসব জঞ্জালের ঠোকর খেতে খেতে জহির এক খণ্ড মসৃণ মেঝে আবিষ্কার করলো। কংক্রিটের উপর, ধুলোর বিছানায় ঘুমানোর ইতিহাস তার আছে, তাই শুয়ে পড়তে কোনো অসুবিধা হলো না। ভাঁজ করা হাতের উপর মাথা রেখে ঘুমের কাছে আশ্রয় চাইলো সে। অনন্তকাল ধরে চলতে থাকা এই রাতটা পার করতে একটু ঘুম তার ভীষণ প্রয়োজন। একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বুকের কাঁপুনিটাকে বশ করলো জহির, চোখ ততক্ষণে অন্ধকারের সাথে সন্ধি করে ফেলেছে। হঠাৎ সে টের পেলো মাথার কাছে কী যেন একটা নড়ে উঠলো, কানকে অনুসরণ করে চোখ পাতলো সে। মনে হলো এক খণ্ড অমাবস্যা কাঠির মতো দুটো পা লাগিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে। কাছে আসতেই কালো ছায়াটা স্পষ্ট হলো, একটা কাক ঠোঁট ফাঁক করে ঘাড় বাঁকিয়ে ভীষণ কৌতূহল নিয়ে তাকে দেখছে। কাকটার মধ্যে স্বাভাবিক চঞ্চল ভীরুতা নেই, মানুষ দেখে না পালিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে। কাকটার শক্ত কালো ঠোঁট দুটো একটু নড়ে উঠলো, জহির একটা মোলায়েম কণ্ঠ শুনতে পেলো।
-এইখানে অনেক ইট আছে স্যার, মাথার নিচে দ্যান, ভালো ঘুম হবে।
জহির আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো, ঘরে তারা দুটি ছাড়া দৃশ্যমান আর কোনো জীবন্ত প্রাণী নেই। কাকটার ঠোঁট আবার নড়ে উঠলো।
-ভালো কিছু চিন্তা করেন স্যার, ধরেন কোনো সিনেমার গল্পে নিজেকে নায়ক কল্পনা করেন, গুন্ডাপান্ডা মেরে সোজা করে দিলেন, নায়িকার সাথে রঙঢং করলেন, নায়িকার বাপের সাথে বেয়াদবি করলেন, দেখবেন ঘুম চলে আসবে।
জহিরের বুকের কাঁপুনিটা ফিরে আসলো আবার। সে চোখ বন্ধ করলো ভয়ে আর মনে মনে প্রার্থনা করছে, এই অবাস্তব রাত শেষ হয়ে যাক। কাকটা বলে উঠলো, স্যার, ভয় পাবেন না। ভয়ের জন্যেই মানুষ টিইকা আছে দুনিয়ায়, এইটা ঠিক কিন্তু এই ভয়ের কারণেই কারো মনে শান্তি নাই।
এই নির্জন বাড়িতে এমন নির্ভয়ের বাণী জহিরের মনে ভয় আরো বাড়িয়ে দিলো, যদিও সে জানে এই নিশুতি রাত, অন্ধকার বাড়ি, মোলায়েম স্বরে কথা বলা কাক এই সবই স্বপ্ন। দুই হাতে প্রবলভাবে মুখ ঢেকে সে জেগে ওঠার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।
জহিরের চোখের পাতায় লাল আভা ফুটে উঠেছে, অন্ধকার এখন পৃথিবীর অন্য প্রান্তে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। ঘুমিয়েছে কিনা বুঝতে পারছে না জহির, কিন্তু জেগে উঠতে সাহস পাচ্ছে না। মনে মনে চাচ্ছে, চোখ খুলেই যেন আলমাস মিয়ার বাড়ির নিচতলার খুপরিঘরের উৎকট গোলাপি দেয়ালটা দেখতে পায়। নিচতলার ঘরটার দরজা কিশোর বালকদের মতো অবাধ্য, ছিটকিনি লাগাতে অনেক জ্যামিতি মিলানো লাগে। ছিটকিনি অধিকাংশ সময় অলসই পড়ে থাকে, তাই চোর ডাকাত ঢুকতে কোনো বাধা নেই, শুধু আলো বাতাস ঢোকার অনুমতি নেই। গুহার মতো সেই ঘরে প্রাচীন অধিবাসীদের গুহাচিত্রের কমতি নেই, অর্থবোধকের চেয়ে অনর্থবোধকই বেশি। বিভিন্ন অশ্লীল সাংকেতিক চিহ্নের সাথে প্রেমের ইতিহাসও লিপিবদ্ধ আছে দেয়ালে। তার পূর্ববর্তী ভাড়াটে নিজের নামের সাথে ইংরেজি ‘টি’ অদ্যাক্ষর যোগ চিহ্ন দিয়ে যুক্ত করেছে, পরে আবার ‘টি’ কেটে দিয়ে সেখানে ‘এম’ লিখেছে। ঘুম ভাঙলেই এই অসমাপ্ত সমীকরণ চোখে পড়ে জহিরের।
কানে অপরিচিত একটা ঠক ঠক শব্দ ভেসে আসলো জহিরের, মেঝের ওপর লাঠিতে ভর দিয়ে কেউ হাঁটছে। সে ভয়ে ভয়ে চোখ খুললো। চোখের সামনে ভাঙ্গা ইট ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, সবুজ শ্যাওলাতে তাদের লাল দেহ ঢাকা পড়েছে। তার কানের কাছ থেকে কিছু একটা সর সর শব্দে পালিয়ে গেল, টিকটিকি অথবা ইঁদুর হবে হয়তো। উপরে ছাদের পলেস্তারা খসে হাড় বেরিয়ে আছে, ছাদে তৈরি হওয়া গহ্বরে এক মুঠো আকাশ দেখা যাচ্ছে। দেয়ালের প্রত্যেক কোনে মাকড়সার দল ফাঁদ পেতে বসে আছে। জহিরের বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো, সে কি এখনো স্বপ্ন দেখছে? আশেপাশে তাকিয়ে কাকের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে না পেয়ে কিছুটা স্বস্তি পেলো সে। কিন্তু এই নির্জন বাড়িতে লাঠিতে ভর দিয়ে কে হাঁটে?
ধুলো আর পোকামাকড়ের সাথে বসে আছে জহির, শব্দটা দুশ্চিন্তার মতো এগিয়ে আসছে। নিঃশ্বাস চেপে ধরে সে তাকিয়ে আছে ক্রমবর্ধমান শব্দের দিকে। প্রথমে লাঠিটাই চোখে পড়লো তার, কালো লাঠিটার গা-ভর্তি সোনালি রঙের নকশা, মাঝে মাঝে কয়েকটা চকমকে পাথর চোখ টিপ মারছে। তারপর বেরিয়ে এলো লাঠির জৌলুসের সাথে একেবারে বেমানান এক মলিন বুড়ো। লোকটার গায়ে পোশাক বলতে কোমরে পেঁচিয়ে থাকা এক খণ্ড সাদা কাপড়, সিনেমার নায়িকাদের মতো তার এই পোশাক হাঁটু ছোঁয়ার আগেই শেষ হয়ে গেছে। কাপড়টা এত স্বচ্ছ যে মনে হচ্ছে এটা পোশাক না, নেহায়েত আনুষ্ঠানিকতা। লোকটার চামড়ার প্রতিটি গভীর ভাঁজ তার দীর্ঘায়ুর সাক্ষ্য দিচ্ছে। তাঁর হলদেটে সাদা দাড়ি বয়সের মতোই দীর্ঘ, বুক ছাড়িয়ে পেট ছুঁয়েছে। দাড়ির মতো চুলও শাসনমুক্ত, এলোমেলো। জহিরের মনে হলো, দামি লাঠির জায়গায় তার হাতে ভাঙ্গা থালা মানাতো বেশি। রেলস্টেশনে বসিয়ে দিলে মাসে ভালো পরিমাণ আয় করা যেত, ভিক্ষাশিল্পে বুড়ো মানুষদের চাহিদা ব্যাপক। তবে সাদা ভুয়ের নিচে তার চোখ দুটো ভীষণ তরুণ, চোখের মণিটা তার কুচকুচে কালো, বৃদ্ধ মানুষদের চোখের মতো কোনো কুয়াশা নেই তাতে। তার দেহের শুধু এই অংশটিতে কোনো বার্ধক্য নেই। জহিরকে দেখে একটুও অবাক হলো না লোকটা। আন্তরিক কণ্ঠে বললো, দুঃখিত, লাঠির শব্দে আপনার ঘুম ভেঙ্গে গেল।
তার মার্জিত ভাষা শুনে চমকে উঠলো জহির। বিস্মিত ভাবটা কাটতে তার কিছুটা সময় লাগলো। সে কথা বলার চেষ্টা করলো, কিন্তু সারা রাত ধরে গলায় জমা শ্লেষ্মার জালে কথাটা আটকে শুধু কয়েকটা অর্থহীন ধ্বনি বের হলো। গলা পরিষ্কার করে জিজ্ঞাসা করলো, আপনি কে?
লোকটার ঠোঁট দুটো গাম্ভীর্য বজায় রেখে অল্প একটু প্রসারিত হলো, চোখটাও যেন আরো একটু উজ্জ্বল হলো। বললো, এই প্রশ্নটা তো আমার করার কথা ছিলো। তবে প্রশ্নোত্তর পর্বটা আপাতত তুলে রাখলাম, আমি জানি আপনি বিপদগ্রস্ত। বিপদে না পড়লে কেউ এই বাড়িতে ঢোকে না। অন্দরমহলে আসুন, অতিথিদের আমরা বারান্দায় শুতে দিই না।
লোকটার বেশ এবং ভাষায় বিস্তর পার্থক্য। তাকে দেখতে যতটা উন্মাদ মনে হয় শুনতে ততটা লাগে না। জহির তার সমস্ত প্রশ্ন আর বিস্ময় ধামচাপা দিয়ে তাকে অনুসরণ করতে লাগলো। অন্দরমহলের ফটকে যথারীতি কোনো দরজা নেই, অন্দরমহল বলতে আরো কয়েকটা ইটের সারিবদ্ধ স্তূপ। নাছোড়বান্দা শিশুর মতো দেয়ালের কোল আকড়ে ধরে বড়ো হচ্ছে কিছু তরুণ বটগাছ। তিনপাশে খোলা বারান্দা, মাঝে বাঁধানো আঙ্গিনা, দেখতে অনেকটা মঞ্চের মতো। সাথে লাগোয়া ঘরগুলোতে ছাদ ছাড়া ঘরের আর কোনো বৈশিষ্ট্য অবশিষ্ট নেই। দরজা, জানালাহীন ঘরগুলোর চোখেমুখে কঙ্কালের শূন্যতা।
তারা যে ঘরে ঢুকলো সেখানে মানুষ বসবাসের অল্প বিস্তর চিহ্ন পড়ে আছে এদিক সেদিক। মেঝের ধুলো এখানে জাঁকিয়ে বসতে পারেনি। ঘরের একপাশে একটা ছেড়া চটের বস্তা বিছানো আছে। চটের বিছানার পাশে এই বৃদ্ধের চেয়েও জীর্ণ কয়েকটা বই অবহেলায় পড়ে আছে। টোল খাওয়া কলস, জং ধরা টিনের থালা, পোড়া মাটির উলটানো হাড়ি দেয়ালে হেলান দিয়ে গা ঘেষাঘেষি করে দাঁড়িয়ে আছে। এই কয়েকটা তৈজসপত্র মিলে অনেক চেষ্টা করেও ঘরটাকে সংসারি করতে পারেনি। ঘরের অন্য কোনে মিহি ছাইয়ের স্তূপ, বাতাস এলেই মাছির মতো উড়াউড়ি করে আবার নিচে লুটোপুটি খায়। লোকটা চটের একপাশে বসে জহিরকে বসতে ইশারা করলো। এই নীরব নির্দেশ অবজ্ঞা করতে পারলো না সে, চটে বসে সে বইগুলোকে খুঁটিয়ে দেখছিলো, বই আর বন্ধু দেখে মানুষের চরিত্র বোঝা যায়। তার আগ্রহ দেখে, লোকটা বললো, ওগুলো দেখে লাভ নেই, এগুলো পড়ার জন্য না, পোড়ানোর জন্য।
অবাক হলো জহির, তার বিস্ময় দেখে লোকটা হেসে বললো, যৌবনে বই পড়েছি অনেক, বই পড়ে জ্ঞানার্জনের বয়স আমার পার হয়ে গেছে। এই ঘরের দেয়াল ঢাকা ছিলো বইয়ে, সব পুড়িয়ে দিয়েছি, এই কয়টা বাকি আছে। পুড়ে যাওয়া বইগুলোর প্রতি আমি কৃতজ্ঞ, তারা আমাকে জ্ঞান কতটুকু দিয়েছে জানি না, কিন্তু ঠাণ্ডায় খুব আরাম দিয়েছে।
লোকটার বোধহয় কথা বলার বাতিক আছে। বলতে লাগলো, আমি এক সময় ভাবতাম, বই না পড়ে জ্ঞানী হওয়া যায় না, তাই বইয়ের মধ্যেই মুখ গুঁজে রাখতাম, চারপাশটা তাকিয়ে দেখিনি, কিন্তু মহান ইদ্রিস সমাদ্দার আমার ভুল ভেঙ্গে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অক্ষর যেমন মানুষের চিন্তাকে মুক্তি দিতে পারে, তেমনি পাশাপাশি বসে অক্ষর শিকলের মতো মানুষের চিন্তাকে বেঁধেও রাখতে পারে।
জহির জিজ্ঞাসা করলো, ইদ্রিস সমাদ্দার কে?
ইদ্রিস সমাদ্দার আমার দেখা অন্যতম জ্ঞানী দার্শনিক, ভাগ্য ভালো থাকলে হয়তো তার সাথে আপনার দেখা হয়ে যেতে পারে। তিনি মাঝে মাঝে আমার অতিথি হয়ে আসেন।
জহির আগ্রহবোধ করে। বলে, ইদ্রিস সাহেব কি কোনো ইউনিভার্সিটির প্রফেসর?
ছিহঃ তা হবে কেন? অধ্যাপক শুনলেই আপনারা কেন যে মহার্ঘ বস্তু মনে করেন বুঝি না, মূর্খ অধ্যাপকে জগত ভরে যাচ্ছে। ইদ্রিস সমাদ্দার ভিক্ষুক মানুষ।
এত জ্ঞানী লোক ভিক্ষা করে?
বৃদ্ধ লোকটা শান্ত গলায় বললো, জ্ঞানী মানুষদের ভিক্ষা করায় কোনো দোষ নেই৷
সচরাচর পাগল আর শিশুরাই এমন অভিনব কথা বলতে পারে। জহিরের মনে পড়লো, একবার একটা ছোটো বাচ্চার গলার সোনার চেইন খুলে নেয়ার আগে তাকে ভুলিয়ে রাখার জন্য জিজ্ঞেস করেছিলো, বলোতো সবচেয়ে বড় কে?
সে আশেপাশে তাকিয়ে কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দিয়েছিলো, গাছ।
চটের বিছানায় বসে থাকা এই অর্ধনগ্ন লোকটা শিশু নয় নিশ্চিত। এই লোকটা যে তার সাথে এত ভালো ব্যবহার করছে তা পাগলামি অথবা মাতলামি ছাড়া আর কিছু না। মনে একটা আশঙ্কা হলো তার, অতিথির মর্যাদা কতক্ষণই বা মাথায় থাকবে লোকটার? যে কোনো সময় নকশাদার লাঠি দিয়ে তাকে এখান থেকে তাড়িয়েও দিতে পারে, পাগলামির কোনো যুক্তি থাকে না, আর মাতলামি ক্ষণস্থায়ী। বাহিরের জগতের কথা চিন্তা করতেই গতরাতের স্মৃতি উড়ে এলো তার মনে, সবকিছু স্তিমিত হওয়ার আগে বাহিরে যাওয়াটা বোকামি হবে, কয়েকটা দিন তাকে এই ন্যাংটো বুড়োর সাথেই থাকতে হবে।
হঠাৎ একটা আর্তনাদ বাড়ির দেয়ালগুলোকে কাঁপিয়ে দিয়ে গেল। জহিরকে আঁতকে উঠতে দেখে বৃদ্ধ লোকটা নিস্পৃহ কণ্ঠে বললো, ভয় পাবেন না, উনি বিশিষ্ট চিত্রকর জোবায়ের আল মামুন, নতুন কোনো ছবি আঁকার চেষ্টা করছেন হয়তো। তাঁর সাথে আপনার পরিচয় করে দিবো পরে। এখন দেখা না করাই ভালো, ছবি আঁকার সময় তিনি কিছুটা হিংস্র হয়ে যান। একবার লেখক মোতালেব চৌধুরীকে কামড়ে দিয়েছিলেন, বেচারাকে বেশ কিছুদিন ভুগতে হয়েছিলো।
জহির তরফদার বাড়িটাকে যতটুকু নিরাপদ ভেবেছে বাড়িটা তত নিরাপদ নয়। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলো, এখানে ঠিককতজন মানুষ থাকে ?
জ্ঞানী এবং বিপদগ্রস্ত ছাড়া কাউকে আমি আশ্রয় দেই না, যাদের বোঝার ক্ষমতা সাধারণ মানুষদের নেই, যাদেরকে মানুষ পাগল বলে সমাজছাড়া করে দেয়, তারাই আমার অতিথি। এই মুহূর্তে এখানে আমি, আপনি আর জোবায়ের সাহেব ছাড়া আর একজন আছেন, কবি বিশ্বম্বর পাল, সম্ভবত ধ্যানে আছেন এখন।
জহির বললো, আমি তো জ্ঞানী না, আমাকে কেনো আশ্রয় দিলেন?
বিপদগ্রস্ত তো বটে, তাছাড়া আপনি আমাদের বিশেষ অতিথি।
বিশেষ অতিথি? কেন ?
সেটাও একসময় জানতে পারবেন।
পাগলদের সাথে চলতে হয় তাল মিলিয়ে, বেতাল হলেই বিপদ। তার ঘাড়ে নতুন বিপদের জন্য জায়গা নেই। কণ্ঠে সারল্য এনে জিজ্ঞাসা করলো, এটা আপনার পৈতৃক বাড়ি?
লোকটা হাতের লাঠিটার নকশায় হাত বোলাতে বোলাতে বললো, পৈতৃক না, মাতৃক ৷
তারপর লোকটা লাঠির সাহায্য ছাড়াই উঠে দাঁড়ালো, মনে হচ্ছে লাঠি তাকে বহন করে না, সে-ই লাঠিটা বহন করে। বার্ধক্য তার মেরুদণ্ডে খুব বেশি বাঁক আনতে পারেনি। চোখ বন্ধ করে সম্ভবত স্মৃতিতে এক পাক ঘুরে আসলো, তারপর কিছুটা নাটুকে ভঙ্গিতে বললো, যেহেতু আমি জন্ম নিয়েছি, সেহেতু আমার পিতা মাতা ছিল। এছাড়া আমার আর কোনো পরিবার নেই। বাবা মায়ের মতো আমার নামটাও টিকে আছে কাগজে কলমে, এই বাড়ির দলিলে আমার নাম গগণ লোধী, বাবার নাম ইলিয়াস লোধী এবং আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি তিনি ছিলেন নপুংসক।
কী অদ্ভুত কথা, কারো বাবা কি নপুংসক হয়? জহিরের অবাক দৃষ্টিকে অগ্রাহ্য করে গগন লোধী ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে বলতে লাগলো, এই বাড়ির মতো আমার জন্মের ইতিহাসেও কোনো গৌরব নেই। ব্রিটিশ ব্যবসায়ী জর্জ চ্যাডউইক এই বাড়ি বানিয়েছিলেন। তার জাহাজ ডোবার পর তিনি নিজেও ডুবেছিলেন মদ আর হতাশায়। চ্যাডউইক সাহেব ধার দেনার চাপে এই বাড়ি বিক্রি করে দেন রাজা রঞ্জিত বাহাদুরের ভাইয়ের ছেলে গগণ বাহাদুরের কাছে। বাড়ির দলিলে চ্যাডউইক সাহেবের পর গগণ বাহাদুর, তারপর ইসমত আরার নাম আছে। ইসমত আরা পাটনার বিখ্যাত বাইজি ছিলেন, তার আরেকটা অখ্যাত পরিচয় আছে, তিনি আমার মা। আমার মা এই বাড়ি কিনেননি, দানে পেয়েছিলেন। গগণ বাহাদুর স্বভাবে কিছুটা রঙিন ছিলেন। আমার মায়ের গানে মুগ্ধ অথবা প্রলুব্ধ হয়ে তাকে
পাটনার বাইজি বাড়ি থেকে ছিনিয়ে এই বাড়িতে এনে রাখলেন। বাড়িতে আমার মায়ের সাথে ঝাড়লণ্ঠন, রেশম আর মখমলও আসলো। তবলা, হারমোনিয়াম, সানাই, তানপুরায় ভরে গেল ঘরগুলো। নেশা হলো কিছুটা মদে বাকিটা আমার মায়ের কন্ঠে। এক খণ্ড পাটনা এখানে উঠিয়ে নিয়ে আসলো রাজার ভ্রাতুষ্পুত্র। গগণ বাহাদুর এখানে যে শুধু সংগীত পিপাসা মেটানোর জন্য আসতেন না, তার প্রমাণ হচ্ছি আমি। আমাকে প্রাণ দিলেও পরিচয় দেয়ার মতো সৎ সাহস গগণ বাহাদুরের ছিল না। পরিচয়ের জন্য নিজের অনুগত পাঠান পালোয়ান নপুংসক ইলিয়াস লোধীর নামটা ধার করতে হলো। আমি আমার বাবার নামের প্রথম অংশটা পেলাম, কিন্তু শেষটায় আমার কোনো অধিকার ছিল না।
তারপর লাঠিটা দুই হাতে ধরলো বৃদ্ধ গগণ। বললো, এই লাঠিটা হচ্ছে আমার বাবার শেষ উপহার। আমার মা পাগল হয়ে এই বাড়ির সব দেয়ালে মাথা ঠুকেছেন, অবহেলায় সব প্রাচুর্য খুইয়েছেন, কিন্তু এই লাঠিটা হাতছাড়া করেননি। রাজ বংশের অভিশাপ এই বাড়ি, এই লাঠি আর আমার শরীরে বয়ে চলা রক্ত, এইসব এখন আমাকে বহন করতে হচ্ছে।
গগণ বাবু একটু থামলো, তারপর আবার বলা শুরু করলো, খুব অল্প বয়সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আমার জীবন আমি ব্যয় করবো জ্ঞান অন্বেষণে। বিয়ে করিনি, বিলাস বিক্রি করে বই কিনেছি, কিন্তু তখনো জানতাম না শুধু কাগজে জ্ঞান পাওয়া যায় না।
জহির চুপচাপ বসে ছাইয়ের স্তূপটার দিকে তাকিয়ে দেখছে, রাজার রক্ষিতার সম্পদ এগুলো। তার বুকের তৃষ্ণাটা এখনো আছে কিন্তু আশ্চর্য পেটে এখনো ক্ষুধা টের পাচ্ছে না সে। গত সন্ধ্যায় কী খেয়েছিলো পেটের তো এতক্ষণ মনে থাকার কথা না !
আপনাদের খাওয়াদাওয়া হয় কী করে, মানে টাকা পয়সা ?
ভীষণ অস্বস্তি নিয়ে প্রশ্নটা করে জহির। গগণ বাবু জানালো টাকা পয়সা, আয় উন্নতি এবং ক্ষুধা নিয়ে কোনো চিন্তাভাবনা তাদের নেই। তার মতে সংসারি মানুষরাই কেবল না খেয়ে মরে, পাগলরা কখনো অনাহারে মরে না।
জহিরকে পুরো বাড়িতে ঘুরে বেড়াবার স্বাধীনতা দিয়ে গগনবাবু কোথায় যেন চলে গেছে। চিত্রকর জোবায়ের সাহেবের নজর এবং দাঁত এড়িয়ে জহির ঘুরে ঘুরে চ্যাডউইক সাহেবের শখের বাড়িটা দেখতে লাগলো। সে অবাক হয়ে দেখলো পুরো বাড়িতে শুধুমাত্র একটা দরজা এখনো অক্ষত আছে, দরজায় কোনো তালা নেই, ভিতরে কারো অস্তিত্বের আভাসও নেই, তবুও অনেক চেষ্টা করেও দরজাটা খুলতে পারলো না সে। গগণ বাৰু এখানে কী লুকিয়ে রেখেছে কে জানে!
স্যার, কী মনে হয় আপনার, বুইড়া কি সোনাদানা ভর্তি সিন্দুক রাখছে ভিতরে?
চমকে উঠে জহির দেখলো গতরাতের কাকটা ফিরে এসেছে, তার ব্যবহার অমায়িক কিন্তু জহিরের শরীর ঘেমে উঠলো কাকটাকে দেখে। দুই হাতে চোখ কচলে দৃষ্টির বিভ্রম দূর করতে চাইলো। কিন্তু ডলে কচলেও দৃষ্টি থেকে কাকটাকে সরানো গেল না। জহির ভাবলো, তাহলে কি আমিও পাগল হয়ে গেলাম?
বাড়িভর্তি পাগল, এখানে থাকাটা কি ঠিক হবে? কী মনে হয় স্যার?
কাকটা আবার বলে উঠলো। জহির বড়ো বড়ো পা ফেলে হাঁটতে শুরু করলো, পার্কের ভিক্ষুকদের মতো কাকটাকে অগ্রাহ্য করে এড়িয়ে যেতে চাইলো সে। কিন্তু কাকটা ডানা ঝাপটে ঠিক তার সামনে চলে আসছে। বললো, স্যার কি রাগ করলেন? এখন রাগ করার সময় না। বিপদের সময় রাগারাগি করলে বিপদ আরো বাড়ে।
জহির মাথা চেপে ধরে বসে পড়ে চোখ বন্ধ করে জপতে লাগলো, মিথ্যা, সবকিছু মিথ্যা।
উত্তেজিত হবেন না স্যার, আপনার আবার ব্লাড প্রেসারের সমস্যা আছে।
সহানুভূতির স্বরে বললো কাকটা। জহির আঁতকে উঠে মাথা তুলে কাকটার দিকে তাকালো, এতো কালো কাক আগে সে কোনোদিন দেখেনি। তার রক্তচাপের খবরও যে জানে, গতরাতের ঘটনাও কি সে জানে?
আমি স্যার আপনার সব কথাই জানি, সব সত্য জানি, সব মিথ্যাও জানি।
জহির কিছু একটা বলতে গিয়েও থমকে গেল। কথা বলে এই কাকটার অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দিতে চায় না সে। কিন্তু রাতের কথা মনে হতেই তার সারা শরীর অসাড় হয়ে গেল, দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করলো সে। আলমাস মিয়ার নিচতলার খুপরি ঘরটা ভেসে উঠলো মনে, আর ভেসে উঠলো তার বিছানায় রক্তাক্ত বৃত্তের উপর শুয়ে থাকা একটা লাশের ছবি।
