॥ বারো ॥
জীবনের এতটা বছর শান্ত ছেলে, ভালো ছাত্র, ভদ্র মানুষ ইত্যাদি তকমা গায়ে এঁটে ছিলো রাশুর। স্কুলের রিপোর্ট কার্ড ভর্তি করে প্রশংসা নিয়ে আসতো বাসায়। হিংসুটে প্রতিবেশীরা বহু চেষ্টা করেও তার নামে একটা অভিযোগ সাজাতে পারেনি। কুসঙ্গের মায়াবী প্রলোভন সে এড়িয়ে গেছে অবলীলায়। বন্ধুদের প্ররোচনাতেও সে কখনো নেশার দরজাটা ঠেলে দেখেনি। সে জেনে এসেছিলো ভিতরে তার কোনো পশুর অস্তিত্ব নেই। কিন্তু শোভার প্রাণহীন বেআব্রু শরীরটা তার ভিতরের পশুটাকে উলঙ্গ করে দিয়েছে। তার সব অহংকার শোভার সাথে এক আঁচলে ফাঁস নিয়ে নিয়েছে। মাথা নিচু করে, পিঠ বাকিয়ে কুঁজো হয়ে থাকে সে, এতবড়ো অপরাধের বোঝা রাশুর ভদ্র, ভালোমানুষী কাঁধটা বইতে পারে না।
ঘর থেকে বের হলে রাশুর পিঠে কৌতূহলী মানুষের চোখ লেগে থাকে। এক খণ্ড মেঘ নিয়ে ঘোরে সে, যেদিকেই যায় পরিবেশ থমথমে হয়ে যায়। তার সামনে কেউ হাসে না, তার পেছনে গল্প করে নিচু গলায়। কেউ কেউ এসে সান্ত্বনার কাঁটা দিয়ে তাকে আরো রক্তাক্ত করে দিয়ে যায়। অনেকের কৌতূহল ভদ্রতার সীমা মানে না, বিয়েতে শোভার অমত ছিল কিনা, পুরনো কোনো প্রেমিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে কিনা, ইত্যাদি অসভ্য প্ৰশ্ন অবলীলায় করে যায়। গ্রাম থেকে আত্মীয়স্বজন এসে ঘরে ভিড় জমিয়েছে, তারা সারাদিন সবাইকে জেরা করে, কোথায় ফাঁস নিয়েছে, কখন ফাঁস নিয়েছে, কীভাবে ফাঁস নিয়েছে, জিহবা বের হয়ে গিয়েছিলো কিনা। ঘরে ঘরে অভিযান চালায় তারা, দিনরাত তদন্ত করে শোভাকেই দোষী সাব্যস্ত করে যায়। রাশুর অপরাধও কম নয়, তারা তো আগেই জানতো এমন কিছু একটা হবে, এই মেয়েকে বিয়ে না করতে রাশুকে কত ইঙ্গিতও দিয়েছিলো, কিন্তু রাও তো সেসব ইঙ্গিতের মান রাখলো না। দীর্ঘশ্বাস সহকারে জানিয়ে দেয়, তারা গরিব বলেই তাদের বিচক্ষণতার কোনো মূল্য কেউ দেয় না।
পরিচিত মানুষের চোখে অপরিচিত দৃষ্টি অসহ্য লাগে রাশুর। এইসব দৃষ্টির চাবুক তাকে মফস্বল থেকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় জনবহুল নগরে, যেখানে বেঁচে থাকাটাই মূল সংগ্রাম, টিকে থাকাটাই সাফল্য। অন্যের গোপন দুঃখ খুঁড়ে বের করার সময় এখানে কারো নেই। তবুও স্বস্তি পায় না রাশু, ব্যস্ত নগরও তার কাঁধের বোঝাটা হালকা করতে পারে না। এত এত মানুষ এই শহরে, কারো সাথে তার শাস্তিটা সে ভাগ করে নিতে পারে না।
অচেনা মুখে ভরা এই শহরে একদিন একটা চেনা মুখ দেখে থমকে যায় রাশু। একটা কফিশপের সামনে হাত নেড়ে হাসিমুখে কথা বলছে জহির। জহিরের প্রতি রাশুর ঘৃণা সব সময়েই জীবন্ত ছিল, কিন্তু এখন বেদনার জলে ভিজে সেই ঘৃণা ক্ষোভে পরিণত হয়েছে। ব্যস্ত রাস্তার পাশে দিনের আলোয় সেই মুহূর্তে একটা খুন করার ইচ্ছা জন্ম নেয় রাশুর বুকে।
চকচকে একটা ছুরি পকেটে পুরে তারপর সে বহুদিন জহিরের পেছনে ঘুরেছে। অস্ত্র তার ভোতা ছিল না, সঙ্কল্পটাও ছিলো ধারালো, তবুও সে খুনি হতে পারেনি। পকেটের তৃষ্ণার্ত ছুরির ঠান্ডা স্পর্শ তাকে বারবার তাগাদা দিয়েছে। নির্জনতা সে পেয়েছিলো, অন্ধকারও জুটে গিয়েছিলো বহুবার শুধু সাহসটা জোগাড় করতে পারেনি সে। জগতে সংযমী হলেই ভালো মানুষ হওয়া যায়, কিন্তু খুনী হতে হলে সাহসকে ডিঙ্গিয়ে দুঃসাহসী হতে হয়।
রাশু ভদ্র মানুষ, একটা জাগ্রত মানুষের ওপর অস্ত্রচালনার মতো হিংস্রতা সে করতে পারে না। ভদ্রভাবে পরিচ্ছন্ন উপায়ে জহিরকে খুন করার জন্য পরিকল্পনা সাজায় সে। চালাক মানুষকে বুদ্ধি দিয়ে পরাজিত করার জন্য বোকার মুখোশ পরতে হয়। বোকা সেজে বদ মানুষের সব অভ্যাস রপ্ত করতে থাকে সে। মদ, সিগারেটের প্রতি নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়, জুয়ার আসরে গিয়ে হাজিরা দিতে থাকে নিয়মিত, জুয়াড়িদের সাথে মিশে তাদের স্বভাব আয়ত্ত করে। নিজের জীবনে আমদানি করে অসংখ্য বঞ্চনার গল্প। সব প্রস্তুতি সেরে আনাড়ি সেজে প্রতারণার ফাঁদ পাতে রাশু, সেই ফাঁদে সহজেই ধরা দেয় জহির।
শত্রুর সাথে ধীরে ধীরে অন্তরঙ্গতা বাড়ায় রাশু, নিজের জীবনের গোপনতম কথাটাও জানিয়ে দেয় জহিরকে, কিন্তু জহির তার দরজা খুলে না। রাশু বুঝতে পারে, একটা বড়সড় প্রলোভন ছাড়া জহিরের অন্দরে ঢোকা যাবে না। তাই সে মোফাজ্জল মিয়ার গল্প হাজির করে।
জুয়ার আড্ডায় মোফাজ্জল মিয়ার সাথে তার পরিচয় হয়েছিল। লম্বা পাতলা লোকটা জাত জুয়াড়ি, টাকার জন্য একবার সে নিজের কোলের শিশুকে বেচে দিতে চেয়েছিলো সন্তানহীন এক দম্পতির কাছে। বউ বাগড়া দিয়েছে বলে একটা ভালো ব্যবসা হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিলো। এই নিয়ে রাশুর কাছে আফসোসও কম করেনি। সুতরাং বেশকিছু টাকার বিনিময়ে তেমন কোনো প্রশ্ন না করেই শার্ট প্যান্ট পরে পঙ্গু দোকানদার থেকে একটা পান কিনতে সে খুব সহজেই রাজি হয়ে গিয়েছিলো I
সেদিন জহির পার্কে বসে ছিল, তাকে কিছুক্ষণ অপেক্ষায় রেখে রাশু সফল অভিযানের প্রমাণ হাতে নিয়ে ফিরে এসেছিলো। রাশুর শার্টে লাগানো লাল রঙ, লালা মেশানো পানের পিকের চেহারা নিয়ে ঘটনাটা জহিরের কাছে আরো বিশ্বাসযোগ্য করেছিলো। জহিরকে ধোঁকা দেয়ার সব আয়োজন সেরে রেখেছিলো রাশু।
ব্যাগের গোপন প্রকোষ্ঠটাকে খুব বেশি গোপন রাখেনি রাশু, অল্প একটু ছলনা দিয়ে ঢেকে রেখেছিলো কেবল। খুব বেশি মূল্যবান না হলে এমনভাবে কেউ কিছু গোপন করে না। বাদামি চিনির গুড়া আর হেরোইন যেন যমজ বোন, অভিজ্ঞ চোখও পার্থক্যটা ধরতে পারে না, জহিরও পারলো না। রাশুর বিস্মিত দৃষ্টি আর তার দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের কারণে কয়েকশো টাকার বাদামি চিনি কোটি টাকার হেরোইন হয়ে গেল। জহিরের লোভে আচ্ছন্ন মনে সন্দেহ ঢোকার কোনো রাস্তা পেলো না ৷
অবশেষে জহির দরজা খুলে দিয়েছিলো রাশুর জন্য। রাশুকে মাতাল করার জন্য মদের বোতল খুললো জহির, রাশু খুলেছিলো পানির বোতল। মদ সেদিন অনেক গিলেছিলো রাশু, কিন্তু পানি খায়নি এক ফোঁটাও। একটা বৃদ্ধ বাল্বের ঝিমানো আলোর সুবাদে পানিতে ঘুম মিশিয়ে দিয়েছিলো সে। অনেক মদ খেয়েও তার সংকল্প টলেনি। এই রাত তার খুনী হওয়ার রাত, একটা পুরনো প্রতিশোধের ভার থেকে মুক্তির রাত, আগামীর ঘুমন্ত রাতগুলোর জন্য এই রাতটা তার জেগে থাকতে হবে।
অল্প একটু মদ আর অনেক পরিমাণ পানি খেয়েই জহির ঢুলতে লাগলো। জহিরের অর্ধবোজা চোখ দেখেই রাশুর শিরা উপশিরায় রক্ত নাচানাচি শুরু করে দিয়েছে, নিঃশ্বাসের ঘোড়াটা এমন বেগে ছুটেছে যে লাগাম ধরে রাখতে পারছে না সে। পকেটের ছুরিটা খোঁচা দিয়ে তার পিপাসা জানাচ্ছে। রাশুর বুকের খাঁচায় বন্দি পশুটা মুক্তির জন্য তোলপাড় করছে।
জহিরের ঘুমন্ত শরীরটাকে ভালো করে চেয়ে দেখে রাশু, বুকের ওঠানামা লক্ষ করে। তখন তার নিজের ভদ্র নিরীহ চেহারাটা মনে পড়ে গেল, গালে বসা মশাকে মেরেও যার মায়া হয়, হোক কয়েক মুহূর্তের জন্য তবুও অনুশোচনা তো হয়, তার পক্ষে কি একটা মানুষের প্রাণ নেয়া সম্ভব? আবার শোভার ঝুলন্ত দেহটা ভেসে ওঠে তার চোখে। ইশ! কী ঘৃণাই শোভা তাকে করেছে। এতটা ঘৃণা হয়তো শোভা জহিরকেও করেনি | শোভার ভালোবাসাহীন নির্লিপ্ততা হয়তো সে সইতে পারতো কিন্তু ঘৃণা কোনোমতেই সহ্য করতে পারছে না। জহিরের প্রতি কিছুটা হিংসা হয় তার, যে শান্তির ভাগ জহিরের প্রাপ্য তার পুরোটা ভোগ করতে হচ্ছে তাকে।
রাশুর পকেটের ছুরিটা তার হাতে উঠে আসে। মুক্ত বাতাসে পাঁচ ইঞ্চি ছুরিটা তার দেহের চাকচিক্য প্রদর্শন করে, তীক্ষ্ণ চাহনিতে রাশুকে প্ররোচনা দিতে থাকে অস্ত্রটা। রাশু চোখ বন্ধ করে একবার শোভার চেহারাটা মনে করার চেষ্টা করে, আশ্চর্য! শোভার দেহটাই মনে আছে কেবল, চেহারাটা কোনোমতেই মনে করতে পারলো না সে।
রাশু হঠাৎ চুপ হয়ে গেল, আচমকা পথ শেষ হয়ে গেলে পথিক যেমন থেমে যায়। জহির ব্যাকুল হয়ে তাগাদা দেয় রাশুকে, কিন্তু এইসব তাগাদা তাদের মধ্যের কয়েক ইঞ্চি দূরত্ব পার করতে পারে না। রাওকে খুব আনমনা দেখায়, যেন বিচ্ছিন্ন কোনো জনপদে সে একা বসে আছে। সে জানায়, ইদানিং অনেক কথা ভুলে যাচ্ছে সে। তার কাছে সবকিছু একটা দীর্ঘ দুঃস্বপ্নের মতো লাগছে। মৃত মানুষ দেখতে পায় স্বপ্নে, কী যেন হয়েছে তার, বোধহয় সে পাগল হয়ে যাচ্ছে। রাত জানায় সে এখনো শোভার চেহারাটা মনে করতে পারে না। অথচ সেদিন শোভাকে সে চোখের সামনে দেখেছে, সেই হাত, সেই পা, সেই স্তন কিন্তু চেহারাটা কাদা পানির মতো ঘোলা।
রাশুর প্রতিচ্ছবিটা নিশ্চল চেয়ে থাকে জহিরের দিকে। তার শান্ত চোখগুলো নিয়ে রাশু ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। একসময় বারন্দায় নিজেকে একা আবিষ্কার করলো জহির। একটা অস্বস্তিকর স্তব্ধতা ঘন কুয়াশার মতো পুরো বারান্দায় স্থির হয়ে আছে। জহিরের মনে সন্দেহ হয়, সে কি সত্যি রাশুকে দেখেছে? নাকি এসবই তার মনের কল্পনা?
জহিরের স্মৃতির অতল থেকে শোভা তার ভীত বালিকা চেহারাটা নিয়ে হাজির হয়। দৃশ্যটা সহ্য করতে পারে না জহির। তার হাত পা গুটিয়ে সে নিজের ভেতর সেঁধিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, একটা বিশাল অজগর তাকে পেঁচিয়ে ধরেছে। জহির ভাবে, সেই রাতে রাশু যদি তাকে খুন করতো তাহলে সে বেঁচে যেতো।
কোনো পূর্বাভাস ছাড়া হঠাৎ অন্ধকার নেমে আসে জহিরের চারপাশে। আলোর অভাবে লালচে ইটগুলো কালো হয়ে যেতে থাকে। জহির তবুও নড়ে না, নিজেকে অন্ধকারে ডুবিয়ে দিয়ে বসে থাকে। রাশুর প্রতিশোধটা বুক পেতে নিতে পারেনি বলে কষ্ট হয় জহিরের। হয়তো রাও চেষ্টা করেছিলো, জহিরের বেঁচে থাকার প্রবৃত্তি হয়তো ছুরিটাকে প্রতিহত করেছে, তারপর তা গেঁথে দিয়েছে রাশুর বুকে। কোনো এক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় স্মৃতির ঐ অংশটুকু হয়তো তার মাথা থেকে মুছে গেছে। বসে বসে অনেকগুলো ‘হয়তো‘র সমাবেশ ঘটায় জহির। কোনোটাই শেষ পর্যন্ত ‘সত্য’ হয়ে উঠতে পারে না।
ভ্রমর এসে বসেছে পাশে, তাকে আর কাক মনে হচ্ছে না, গা ভর্তি সবুজ পালক, এই আলোহীন বারান্দাতেও তার গা ঠিকরে বের হচ্ছে কচি পাতার চাকচিক্য। তার ঠোঁটে কিংবা কাঠির মতো পায়ে, কোথাও এক বিন্দু কলঙ্ক নেই। জহিরের ভিতরে সব ভেঙ্গেচুরে যাচ্ছে। আহত কণ্ঠে কাকটাকে জিজ্ঞাসা করলো, রাশুকে কি আমি খুন করেছি?
ভ্রমর বললো, না স্যার, রাশুকে কেউ খুন করেনি।
জহিরের বিভ্রান্ত দৃষ্টি কাকটার সবুজ পালকে পিছলে যায়। কাকটা হঠাৎ জহিরের কোলে এসে বসলো, তার তপ্ত বুকে নিজের ঠান্ডা সবুজ ঠোঁট ঘষলো কয়েকবার। বললো, এখন চোখ বন্ধ করুন স্যার, সত্য এবার ধরা দিবে I
ভ্রমরের ঠোটের ঠান্ডা সংক্রমিত হয়ে জহিরের পুরো বুকে শীতলতা ছড়িয়ে দিলো। জহির চোখ বন্ধ করলো। চোখের পাতায় অন্ধকার, কিছুই দেখতে পাচ্ছে না সে। বললো, ,
ভ্রমর আমি শুধু কালো দেখতে পাচ্ছি।
কাকটা বললো, কালোর মধ্যেই সব রঙ আছে স্যার, মনটাকে বেঁধে রাখবেন না।
অন্ধকারের কালো হিম শরীরটার মধ্যে বিচরণ করতে থাকে জহির, ঠান্ডায় কাঁপছে সে। হঠাৎ এক বিন্দু আলো অন্ধকার ফুঁড়ে বের হলো। অন্ধকারের মধ্যে ভেসে উঠলো একটা ঘর। জহির অবাক হয়ে দেখলো, তার চোখের সামনে উদ্ভাসিত হয়েছে আলমাস মিয়ার সেই খুপড়ি ঘরটা। ঘরের দরজা খোলা, বাতাসের কম্পনে মনে হচ্ছে এইমাত্র কেউ বের হয়ে গেছে। মেঝেতে উদ্ধত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা মদের বোতলে সোনালি তরল তখনো তলা ছোঁয়নি, সিগারেটের ধোঁয়া এখনো বাতাসে পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি, ঘরের সমস্ত বিশৃঙ্খলা অক্ষত আছে এখনো। এতসব এলোমেলোর মধ্যে বিছানায় শুয়ে থাকা লাশটাই শুধু পরিপাটি। বুকে ছুরিটাকে আগলে রেখে ডান কাত হয়ে শুয়ে আছে। লাশের মুখটাতে চোখ রেখে স্তম্ভিত হয়ে যায় জহির। চোখ বন্ধ অবস্থায় নিজেকে আগে কখনো দেখেনি সে। আলগা হয়ে লেগে থাকা চোখের পাতার নিচে পাথরের স্থবিরতা। ঠোঁট দুটো অল্প একটু ফাঁক হয়ে আছে, ত্বকের নিচে উষ্ণ রক্তধারা থমকে গিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে, মৃত্যুর ছাই রঙের প্রলেপ ছড়িয়ে পড়ছে সারা মুখে। তীব্র অবিশ্বাস নিয়ে জহির নিজের লাশটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে।
চোখ খুলেও জহিরের শীত কমে না। দুই হাত আড়াআড়ি করে নিজেকে জড়িয়ে ধরে কাঁপতে থাকে সে। ঠান্ডাকে কোনোমতেই কাবু করতে পারছে না সে, মনে হচ্ছে, মায়ের পুরনো শাড়ি দিয়ে সেলাই করা কাঁথা ছাড়া আর কোনো কিছুই তাকে উত্তাপ দিতে পারবে না। কাকটা বসে আছে তার সামনে। ঠান্ডায় জহিরের কণ্ঠেও আড়ষ্টতা নেমে এসেছে। কাকটাকে জিজ্ঞাসা করল, আমি কি সত্যিই মারা গেছি ভ্রমর?
জহিরের হতাশ কণ্ঠ পুরনো দেয়াল পুরোটা শুষে নিতে পারে না, প্রশ্নটা শেষ হলেও তার রেশ রয়ে গেল। বাতাসে জহিরের প্রশ্নটা পুরোপুরি মিলিয়ে যাওয়ার পর কাকটা বললো, না, মৃত্যু পর্যন্ত এখনো পৌঁছাতে পারেননি আপনি, কয়েকটা ক্ষণ অবশিষ্ট আছে।
ভ্রমরের পেছনে সেই অদ্ভুত নিরেট দরজাটা ভেসে উঠলো। দরজাটার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে সে বললো, এই দরজার ওপাড়ে মৃত্যুর সাথে দেখা হবে আপনার।
জহির কিছু বুঝতে পারে না, সে তো তার অস্তিত্ব নিয়ে এখানে বসে আছে, পৃথিবীর পথে ঘাটে কত হেঁটে এসেছে সে, সৌন্দর্য উপভোগ করেছে, ঘাসে শুয়ে শৈশব রোমন্থন করেছে, নিজের সন্তানকে দেখার সুখ এবং তাকে ছুঁতে না পারার বেদনা বুকে নিয়ে এসেছে, অসংখ্য অপরাধের জন্য মনে মনে শাস্তি পেয়েছে, এগুলো কি সত্য না?
ভ্রমর বলে, স্যার সত্য আর মিথ্যা, বাস্তব এবং অবাস্তবের মাঝখানেও অনেক কিছু থাকে। মানুষ মারা যাওয়ার আগে এক মুহূর্তে তার সমস্ত জীবনটা দেখতে পায়, সব সুখ একসাথে অনুভব করে, সব দুঃখগুলো তাকে একত্রে ব্যথা দেয়, সব পাপের জন্য সে অনুশোচনায় পোড়ে। কিন্তু মৃত্যুর আগে নিজের সুখ, দুঃখ আর পাপ উপলব্ধি করার মতো চেতনা আপনার নেই। তাই জীবনটাকে শেষবারের মতো অনুভব করার জন্য আপনি স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝামাঝি এই ভিন্ন জগতে এসেছেন।
ভ্রমর আরো বলে, এই জগত হচ্ছে একটা ছায়া, যাকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, কিন্তু তার অস্তিত্বকে অস্বীকারও করা যায় না। স্বপ্নের পথ ধরেই আপনি ছায়া পৃথিবীতে গিয়েছেন, সেখানে আপনার উপস্থিতি ছিলো বাতাসের মতোই। কেউ আপনাকে দেখেনি, কারো সাথে আপনার যোগাযোগ হয়নি।
জহির বলে, ইদ্রিস সমাদ্দারের সাথে তো দেখা হয়েছে আমার, কথাও হয়েছে। এটা কি যোগাযোগ না?
ভ্রমর বলে, আমার সাথে ইদ্রিস সমাদ্দার, গগণ বাবু, বিশ্বম্বর পাল, জোবায়ের আল মামুন কারো কোনো পার্থক্য নেই। আমরা আপনার স্বপ্নের চরিত্র কেবল।
জহির ভেবে দেখে, পৃথিবীর আলো বাতাসে সে শ্বাস নিয়েছে কিন্তু মানুষের জীবন সে যাপন করেনি। আলমাস মিয়ার ঘরের সেই রাতের পর তার আর ঘুম, খাবারের প্রয়োজন হয়নি। সেদিন চায়ের দোকানে বুড়ো ভিক্ষুক সবার কাছে ভিক্ষা চেয়েছে কিন্তু তার কাছে চায়নি। পাগলের মতো রাস্তায় পড়ে ছিল, কোনো কৌতূহলী চাহনি তাকে উৎপাত করেনি, উৎখাত করেনি কোনো কর্তৃপক্ষ। তাহলে রোমেনা সেদিন তাকে দেখে দরজা বন্ধ করেনি, কাউকে না দেখে বন্ধ করেছে। ছেলের মঙ্গলের জন্য সে ঘর ছেড়েছে, লুট হওয়ার আশঙ্কায় নয়। দিন রাতের কোনো হিসাব তার কাছে নেই, সময়ের সাথে তার বিচ্ছেদ ঘটেছে, স্বপ্নে তো তাই-ই হয়।
জহির ভাবে, কিন্তু কেন? তাকে অনুশোচনায় পোড়ানোর জন্য এত নাটকের কী প্রয়োজন ছিলো? এত জ্ঞানের আবির্ভাবের তো কোনো দরকার ছিল না, সহজভাবে তাকে তার অপরাধগুলো মনে করানো যেতো না? নিজের মৃত্যুসংবাদটা অন্তত দেয়া উচিত ছিল তাকে ৷
ভ্রমরের ঠোঁট নড়ে ওঠে, বলে, স্যার আপনার পথ আপনিই তৈরি করেছেন, এই পথ ছাড়া হয়তো আপনি গন্তব্যে পৌঁছাতে পারতেন না। আর মানুষের জীবনটাই তো নাটক স্যার, নাটক ছাড়া মানুষ সহজ কথা বোঝে না, সোজা পথ চিনে না। তাছাড়া জ্ঞানের উত্তাপ না দিলে মানুষের সব উপলব্ধি জাগেও না।
হঠাৎ রাশুর কথা মনে পড়ে জহিরের। জিজ্ঞাসা করে, রাশুর কী হয়েছে? সে এই জগতে কীভাবে এলো?
ভ্রমর বলে, দুই জগতের মানুষের যোগাযোগ হয়েছে একটা অসম্পূর্ণ স্বপ্নের মাধ্যমে।
জহিরের মাথা গুলিয়ে যায়, বলে, যদি বাস্তব জগতে আমি এখনো মারা গিয়ে না থাকি তাহলে ভবিষ্যতের রাশু আমার বর্তমানের স্বপ্নে কী করে এলো?
ভ্রমর বললো, এখানে সময় বাস্তব পৃথিবীর নিয়ম মেনে চলে না স্যার পৃথিবীতে অতীত থাকে পেছনে, ভবিষ্যত সামনে, কিন্তু এখানে অতীত ভবিষ্যত মিলেমিশে জড়াজড়ি করে চলে।
ঠান্ডা আরো বেড়েছে, প্রায় জমে যাচ্ছে জহির। তীব্র শীত সে সইতে পারছে না। চারপাশের দেয়ালগুলো হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠলো। ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে তারা। জহিরের পাঁজরের ভিতর একটা বুবুদ বড়ো হতে হতে তার পুরো বুক দখল করে ফেলছে। তার মনে হচ্ছে একটা জনহীন, প্রাণহীন অন্ধকার শূন্যে তাকে ফেলে রেখে সবাই মুখ ফিরিয়ে চলে যাচ্ছে। শিশুর মতো চিৎকার করছে সে কিন্তু কেউ ফিরে তাকাচ্ছে না। পৃথিবীর সব পাখি, সব প্রাণী, সব কীট, যতসব উদ্ভিদ সবাই তাকে ত্যাগ করেছে। যত সুবাস আর যত দুর্গন্ধ সব মিলিয়ে গেছে। সব আলো আর সব বাতাস ফুরিয়ে গেছে। যত লোভ, যত আক্ষেপ, যত দুঃখ সব নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, সব সুখ হারিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর সাথে তার সবধরনের বন্ধন ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এটাই কি তবে মৃত্যুযন্ত্রণা?
ভ্রমর বললো, চলুন স্যার। আপনার যাত্রা শেষ হয়েছে।
জহির উঠে গিয়ে দরজাটায় হাত রাখতেই জহিরের হাত গলে গেল ভিতরে। দরজায় একটা কুয়াশার পর্দা ছাড়া আর কিছুই নেই। জহির পা বাড়িয়ে ভিতরে ঢুকলো, মুহূর্তেই সমস্ত হিম বিদায় নিলো। জহিরের সামনে একটা বায়ান্ন (৫২)
উন্মাদ আশ্রম
নিস্তরঙ্গ পুকুর, পুকুর পাড়ে একটা ধবধবে বাঁধানো ঘাট। চারদিকে সোনালি আলোতে ঝলমল করছে কিন্তু আকাশে কোনো সূর্য নেই। ঘাটের পাশে শুয়ে আছে ঘাসে ঢাকা সবুজ পথ, তাতে নাম না জানা নানা রঙের ফুল ফুটে আছে, প্রজাপতি উড়াউড়ি করছে ফুল থেকে ফুলে। ঘাটের বিপরীতে শাখা প্রশাখা উদার ভঙ্গিতে মেলে ধরে আছে বেশ কয়েকটা ফুলবতী বৃক্ষ। মৃদু বাতাসে গাছের শাখা ধীর লয়ে দুলছে। গাছের ডালে বসে গায়ে রোদ মাখছে অনেকগুলো সবুজ পাখি, পলাশ গাছের ডালে বসে কয়েকটা পাখি একসাথে অদ্ভুত মায়াবি সুরে গান গাইছে। ভ্রমর উড়ে গিয়ে যোগ দিলো তাদের দলে, জহির এখন আর ভ্রমরকে আলাদা করতে পারছে না। পানিতে কোনো ঢেউ নেই, স্থির পানিতে গাছ থেকে খসে পড়া ফুলের পাপড়ি মনের আনন্দে ভাসছে। জহির ঘাটে পা ফেলে একটার পর একটা ধাপ নামছে। পানিতে পা ডোবালো সে, আশ্চর্য! স্থির পানিতে ঢেউয়ের কোনো প্রতিবাদ উঠলো না। পানি তাকে গ্রহণ করে নিয়েছে। জহির ধীরে ধীরে পুকুরের গভীরে নেমে যেতে লাগলো, পানি তার বুক ছেড়ে গলায় আসলো। স্বচ্ছ, স্থির পানিতে জহির ডুবে যাচ্ছে, তার চোখ দুটোকে পানি এখনো ছোঁয়নি। ফুলের পাপড়ি আর গাছের প্রতিবিম্বে পুকুরটাকে ভীষণ রঙিন দেখাচ্ছে। ডুবে যাওয়ার আগে জহির ভাবলো,
আহা! মৃত্যুই এত সুন্দর, জীবন না জানি কত সুন্দর ছিল!
***
