আবার অশুভ সঙ্কেত – ৪

চার

রোমে, নিজের হোটেল রুমে, ঘুম ভেঙে গেল ফ্রেডরিক আর্থারের টেলিফোনের আওয়াজে। বুকের ওপর থেকে আস্তে ধাক্কা মেরে স্ত্রীকে সরিয়ে দিল সে, হাত বাড়াল রিসিভারের দিকে। ফ্রেডরিকের সেক্রেটারি। হাই তুলতে তুলতে জানতে চাইল রাষ্ট্রদূত তার আলোচ্য বিষয়সূচিতে হঠাৎ কোন পরিবর্তন ঘটেছে কিনা। ঘটেনি শুনে বলল, ‘তাহলে কফির সাথে কাগজপত্রগুলো পাঠিয়ে দাও। আমি আধঘণ্টার মধ্যে আসছি।’

রিসিভার রেখে, গড়ান দিয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়ল ফ্রেডরিক আর্থার। শীলা অঘোরে ঘুমাচ্ছে। কাল রাতে বুনো হয়ে উঠেছিল মেয়েটা। ব্যাপারটা আর্থারের কাছে উপভোগ্য মনে হলেও মিলন পর্বটা আরও আনন্দদায়ক হয়ে উঠত যদি শীলার আবেগ প্রকাশের ভঙ্গীটা আরেকটু সংযত এবং অনুরাগপূর্ণ হত। শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে শিউরে উঠল আর্থার। ঠাণ্ডা জলের ছোঁয়ায় নয়, কাল রাতে ভালবাসাবাসির ফলে পিঠ আর বুকে জন্ম নেয়া আঁচড় আর কামড়গুলো সাবান লেগে জ্বালা করে ওঠার কারণে। রোম রোমান্টিক শহর, সন্দেহ নেই। কিন্তু এই রোমান্টিকতা শীলাকে যেন আরও যৌনবুভুক্ষু করে তুলেছে।

গোসল সেরে কাপড় পরল আর্থার। তারপর কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে চোখ বোলাতে লাগল তেল আবিব থেকে আসা লেটেস্ট ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টে। পশ্চিম তীর আর গাজায় সেনাবাহিনীর মুভমেন্ট সম্পর্কে সেই গৎ বাঁধা খবর যা ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছে আর্থার। ওদিকে পরিবর্তন খুব কমই হয়েছে। সেই একই বুলি বারবার, জায়গাটাও এক। এমনকি বোমা বর্ষণের ঘটনাতেও কোন বৈচিত্র নেই। সাম্প্রতিক পরিবর্তন বলতে হেবরনে হামলার ঘটনার পরে বিশ্ব-রাজনীতিতে টেনশনটা একটু বেড়েছে। আর লিবিয়ানদের হাতে বোমা আসার খবরে আশঙ্কা এবং ভয়টাও একটু বেশি কাজ করছে, এটুকুই যা।

ফ্রেডরিক আর্থার মনে মনে খুশি। কারণ এবারের রোম সফরে তাকে শুধু দর্শকের ভূমিকাই পালন করতে হবে। দুটো দিন শুধু দেখো, কথা শোনো এবং যোগাযোগ রক্ষা করে চলো-ব্যস, ফুরিয়ে গেল কাজ। প্রেস তাকে নিয়ে বেশি মাতামাতি শুরু করে দিয়েছে। তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানার জন্যে মুখিয়ে আছে স্বাই। স্রেফ ‘নো কমেন্ট’ বলে তাদেরকে পাশ কাটিয়েছে আর্থার। তাকে নিয়ে কার কি পরিকল্পনা রয়েছে জানে না আর্থার, তবে নিজের জন্যে পরিকল্পনা করে রেখেছে সে আগেই।

কফি শেষ করে স্ত্রীকে চুমু খেল আর্থার, তারপর বেরিয়ে পড়ল। নিজেকে খুব তাজা লাগছে, নতুন একটি দিন শুরু করার জন্যে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

.

মীটিংটা হলো পিএলও আর নেসেটের মধ্যে। বরাবর যা হয়ে আসছে, এবারও তাই হলো। কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। পিএলও-র তরুণ সদস্যদের কাছে ‘সমঝোতা’ শব্দটাই নাকি অশ্লীল মনে হয়। আর বোমা বর্ষণের পর থেকে নেসেটের আচরণও বদলে গেছে অনেক। বহিরাগত কোন পক্ষের পরামর্শ বা চাপকে তারা থোড়াই কেয়ার করছে।

ডিবেট রুমে দু’পক্ষের বক্তব্য শুনল আর্থার ধৈর্যের প্রতিমূর্তি হয়ে। যে যাই বলছে, তাতে শেষতক কোন সমাধান খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ একটা পরামর্শ দিলে ওটা নিয়ে আলোচনা শুরু হবার আগেই আরেকজন এমনভাবে আপত্তি তুলছে যে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার কোন অবকাশই থাকছে না।

মীটিং শেষ হলো ওভাবেই-অগোছাল এবং কোন সমাধান ছাড়াই। চিন্তিত মুখে মীটিং থেকে বেরুল আর্থার, তাই শুনতে পেল না একজন তার নাম ধরে ডাকছে। হঠাৎ আস্তিনে টান পড়তে ঝট্ করে ঘুরে দাঁড়াল সে। বেঁটেখাটো, মোটাসোটা এক লোক, হাতে মখমলের পাউচ।

‘সিনর আর্থার, আমার নাম পাভোত্তি, হোটেল সিকিউরিটি।’

মাথা ঝাঁকাল আর্থার।

‘আপনাকে বিরক্ত করার জন্যে দুঃখিত, স্যার। এক লোক বসে আছে আমাদের অফিসে। আপনার সাথে দেখা না করে নাকি যাবেই না।’

‘ওকে আমার—’

‘লোকটা বলছে সে নাকি সন্ন্যাসী,’ বলল পাভোত্তি। পাউচটা আর্থারের হাতে তুলে দিল সে। ‘এ জিনিসটি আপনাকে দিতে বলেছে সন্ন্যাসী।’

বটুয়াটার মুখ দড়ি দিয়ে বাঁধা। খুলতেই বেরিয়ে এল ক্ষুরধার এক ড্যাগার। দম বন্ধ করে ভয়ঙ্কর অস্ত্রটির দিকে তাকিয়ে রইল আর্থার। ফলাটা তিনকোনা, হাতলটা ক্রুশ আকারের, যীশুর মূর্তি খোদাই করা।

‘সদর দরজায় দাঁড়িয়ে সে হোটেল সিকিউরিটির খোঁজ করছিল,’ ব্যাখ্যা দিল পাভোত্তি। ‘আমার এক লোককে দেখে বলল আপনার সাথে দেখা করতে চায়। তারপর আমার লোকের হাতে ড্যাগারটা তুলে দেয় সে। ড্যাগার সম্পর্কে কি যেন বলতে চাইছে সে আপনাকে। আপনাকে আমরা বিরক্ত করতে চাইনি। কিন্তু-’

ফলাটায় আঙুল ছুঁইয়ে ধার পরীক্ষা করতে গেল আর্থার। গুঙিয়ে উঠল। কেটে গেছে আঙুল, এক ফোটা রক্ত বেরুল। ‘ওকে ওপরে পাঠিয়ে দাও, কেমন? আর ড্যাগারটা তোমার কাছেই থাকুক।’ বলল সে ধারাল ছুরিটা পাভোত্তির হাতে দিয়ে। তারপর রওনা হয়ে গেল লিফটের দিকে।

নিজের স্যুইটে ফেরার পথে বারবার হাত ঘষল আর্থার। রক্ত লেগে চটচটে হয়ে গেছে। শিউরে উঠল সে। ছেলেবেলা থেকে ছুরি-কাঁচিতে দারুণ ভয় আর্থারের। ইস্পাতের ছুরি চামড়া ভেদ করে মাংসের গভীরে ঢুকে গেছে, এমন দৃশ্য কল্পনা করলেও ওর বমি এসে যায়। এমন যন্ত্রণা নিশ্চয়ই সহ্যের অতীত। যীশুকে যেভাবে ক্রুশ বিদ্ধ করা হয়েছে…আবার শিউরে উঠল আর্থার। যীশু বা ধর্ম-কর্ম পালনের প্রতি খুব একটা আগ্রহ নেই আর্থারের। তার কাছে ধর্ম মানে স্রেফ একটা সাপ্তাহিক প্রার্থনা সভা। এ নিয়ে কখনও গভীরভাবে চিন্তাও করেনি। আর দু’হাজার সালে ধর্ম নিয়ে মাতামাতিটাকে তার কাছে মনে হয় নিতান্তই অযৌক্তিক।

ঘরে নেই __ চিরকুট রেখে গেছে। ডিনারের সময় ফিরবে। টেবিলে কিছু টেলেক্স মেসেজও আছে। ওগুলো মাত্র পড়া শুরু করেছে আর্থার, নক্ হলো দরজায়। দরজা খুলল সে। বাদামী আলখেল্লা আর স্যান্ডেল পায়ে এক তরুণ সন্ন্যাসীকে নিয়ে এসেছে পাভোত্তি। লোকটির চেহারায় শিশুসুলভ সারল্য, বেশ সুদর্শন। তবে তাকে খুব আড়ষ্ট এবং উদ্বিগ্ন লাগল। বুড়ো মানুষের হতাশা আর ক্লান্তি ফুটে আছে চোখে।

এক পাশে সরে লোকটিকে ভেতরে ঢোকার সুযোগ করে দিল আর্থার, হাত তুলল পাভোত্তির দিকে তাকিয়ে। নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত লোকটা অস্বস্তিভরে কাঁধ ঝাঁকিয়ে পিছিয়ে গেল।

‘ভয় নেই,’ তাকে আশ্বস্ত করল আর্থার। ‘কোন সমস্যা হবে না।’

হাসার চেষ্টা করল সন্ন্যাসী। ‘আমি ব্রাদার ডেভিড,’ স্পষ্ট উচ্চারণে ইংরেজীতে বলল সে। ‘সুবিয়াকো থেকে এসেছি।’

‘আমার হাতে সময় কিন্তু খুব কম,’ একটা চেয়ার দেখিয়ে বলল আর্থার।

‘আমি বেশি সময় নেবও না,’ বলল সন্ন্যাসী। ‘আমি যা বলতে এসেছি তা আপনার বিশ্বাস হবে কিনা জানি না। তবে আমার কথা আপনাকে বিশ্বাস করতেও বলছি না।’ একটু বিরতি দিল সে। ‘কতদিনের জন্যে রোমে এসেছেন মি. আর্থার?’

‘কাল চলে যাচ্ছি।’

দীর্ঘশ্বাস ফেলল সন্ন্যাসী। ‘কালকের যাত্রাটা বাতিল করুন। আমার সাথে এক জায়গায় চলুন। আমাকে ফাদার ডি কার্লো নামে এক সন্ন্যাসী পাঠিয়েছেন। ওঁর নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই?’ শেষ প্রশ্নে রীতিমত আবেদন ফুটে উঠল তার কণ্ঠে।

‘না। আমি মানে ঠিক-

‘বাইরে যাবার মত অবস্থা নেই ডি কার্লোর। বুড়োমানুষ তার ওপর ভগ্নস্বাস্থ্য। ওঁকে আপনার সাহায্য করতেই হবে। কারণ গোটা মানবজাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এর ওপরে। কথাটা কি খুব বেশি ইয়ে হয়ে গেল—মানে, কি যেন শব্দটা?’

‘নাটকীয়?’

‘জ্বী। জ্বী। তবে সব কথা খুলে বললে হয়তো আমাকে পাগল ঠাউরে বসবেন। আপনার কাছে অনুরোধ একটাই-একটা চিঠি নিয়ে এসেছি। ওটা পড়ন। পড়ার সময় মনে হতে পারে পাগলী এক বুড়ির আবোল-তাবোল লেখা পড়ছি, আসলে তা নয়।’ একটু থেমে সে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কি ধর্ম-কর্ম করেন, মি. আর্থার?’

‘শুধু রোববারে গির্জায় যাই,’ জবাব দিল আর্থার। অবাক হয়ে ভাবল কথাটা ক্ষমাপ্রার্থনার সুরে কেন বলল সে। ‘আপনি প্রটেস্টান্ট?’

‘জ্বী।’

‘একটা কোট করছি শুনুন,’ প্রার্থনার ভঙ্গিতে হাত তুলল সন্ন্যাসী। ‘যখন দেখিবে সৈন্যবাহিনী পরিবেষ্টিত করিয়া ফেলিয়াছে জেরুজালেমকে, নিশ্চিত জানিবে ঊষর সময় সমাগত… ইহা হইবে প্রতিশোধ গ্রহণ করিবার দিন, যাহা লিখিত আছে তাহা পূরণ হইতে পারে।’ সেইন্ট লিউক থেকে বললাম।’

ঘড়ি দেখল আর্থার। ‘দুঃখিত, আমাকে একটু…’ অনেক হয়েছে। এসব সন্ন্যাসী হলো বসতে পেলে শুতে চাইবার মত। একে প্রশ্রয় দেয়াই ঠিক হয়নি।

উঠে দাঁড়াল আর্থার, তার সাথে ব্রাদার ডেভিডও। আমার কথাগুলো হয়তো আপনার কাছে পাগলের প্রলাপ মনে হচ্ছে,’ বলল সে। ‘ফাদার ডি কার্লো আঠারো বছর আগে ইংল্যান্ডে এসেছিলেন। যীশুর দ্বিতীয় আগমনকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন তিনি। শয়তান পুত্রের শারীরিক কাঠামোকে ধ্বংস করেছিলেন।’

ক্লান্ত ভঙ্গিতে হাসল আর্থার, সন্ন্যাসী হাত ধরে পা বাড়াল দরজার দিকে।

‘কিন্তু যীশুর শত্রুর শক্তি এখনও বেঁচে আছে, মি. আর্থার। শুধু ড্যাগারগুলো দিয়ে তাকে ধ্বংস করা যাবে।’

দরজা খুলল আর্থার।

‘অনুগ্রহ করে চিঠিটি একবার পড়বেন। আমি কাল আপনাকে ফোন করব।’

‘পাভোত্তি,’ হাঁক ছাড়ল রাষ্ট্রদূত। দৌড়ে এল সিকিউরিটি, খপ করে চেপে ধরল সন্ন্যাসীর আলখেল্লা, হিড়হিড় করে টেনে বের করল ঘর থেকে।

‘বিদায়, ব্রাদার ডেভিড,’ বলল আর্থার।

‘শয়তানের বংশধর এখনও বেঁচে আছে, মি. আর্থার। তাকে হত্যা করতেই হবে।’

গম্ভীর চেহারা নিয়ে দরজা বন্ধ করল আর্থার। দূর থেকে ভেসে এল সন্ন্যাসীর গলা।

‘ঈশ্বরের নামে আপনার অবিশ্বাস বিসর্জন দিন…’

ঘণ্টাখানেক পর, কয়েকটা ফোন সেরে চেয়ারে গা এলিয়ে দিল রাষ্ট্রদূত। হাত বাড়িয়ে খামটা নিল। হাই তুলতে তুলতে ভেতর থেকে বের করল ছ’টা ফটোকপি। কাগজগুলোর সাথে একটা চিরকুটও আছে। তাতে লেখা:

‘এই মহিলা যা বলেছে সব সত্যি। ঈশ্বর আমাদের সাহায্য করুন। অনুগ্রহ করে চলে আসুন।’

নিচে দস্তখত: ফাদার ডি কার্লো, সুবিয়াকো।

প্রথম পাতার লেখাটা শুরু হয়েছে এভাবে:

‘ক্ষমা করুন, ফাদার, যে পাপ আমি করেছি…’ প্রথম পাতাটা পড়ে ফেলল আর্থার, অবিশ্বাসে ডানে-বামে মাথা নাড়ছে। হাত বাড়াল স্কচের বোতলের দিকে।

‘জেসাস ক্রাইস্ট অলমাইটি,’ বিড়বিড় করল সে, তারপর হাসতে শুরু করল।

.

ফ্রেডরিক আর্থারকে সস্ত্রীক দাওয়াত দিয়েছেন বাঙালী সাংবাদিক জামশেদুর রহমান। ফ্লিট স্ট্রীটের সবচে’ খ্যাতনামা ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টদের একজন তিনি। পত্রিকাটির প্রায় জন্ম লগ্ন থেকে এর সাথে আছেন। অত্যন্ত প্রভাবশালী মানুষ। রাজনৈতিক অঙ্গনের রথী-মহারথীরা তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। অফ দা রেকর্ডে অনেক কথাই হয় তাঁদের সাথে জামশেদুর রহমানের। রাজনীতিবিদদের সম্মান বাঁচিয়ে এমন দক্ষতার সাথে তিনি গোপন কথাগুলো বলে দেন যে রথী-মহারথীরা তাঁর ওপর কখনোই রাগ বা অভিমান করার সুযোগ পান না। এ ব্যাপারটা তাঁর কলিগদের ঈর্ষান্বিত করে তোলে। এ গুণটি আছে বলে জামশেদুর রহমান চোখ কপালে ওঠার মত একটি অঙ্কের বেতন পেয়ে থাকেন। শৌখিন স্বভাবের এই বৃদ্ধ মানুষটিকে আজ পর্যন্ত কেউ বাটনহোলে তাজা গোলাপ ছাড়া দেখেনি।

হোটেলের রেস্টুরেন্টে আর্থার ডিনার সারল জামশেদুর রহমানের সাথে। খাবারটা সুস্বাদু। সাথে কালো পোশাকে তার মোহনীয় স্ত্রী। সময়টা ভালই কাটছে ফ্রেডরিক আর্থারের। তবে কথা বলার চেয়ে শ্রোতার ভূমিকা পালন করতেই বেশি পছন্দ শীলার। বাঙালী সাংবাদিক আর স্বামীর খেলাধুলা, রাজনীতি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক উপভোগ করছে সে।

শ্যাম্পেনের গ্লাসে চুমুক দিয়ে চেয়ারে হেলান দিলেন জামশেদুর রহমান। এতক্ষণে সময় হয়েছে প্রশ্নটা করার। ‘শুনলাম এক পাদ্রি নাকি আজ আপনার সাথে দেখা করেছে,’ হালকা গলায় বললেন তিনি।

মাথা দোলাল আর্থার। জামশেদ ব্যাপারটা জানেন বলে অবাক হলো না সে। এই লোকটি কিভাবে যেন সব খবর আগেভাগে পেয়ে যান।

‘কোন্ এক মনাস্টেরি থেকে এসেছে,’ বলল সে। ‘জ্বালিয়ে মেরেছে।’

ড্যাগারের কথা খুলে বলল আর্থার। টের পেল বগলের নিচ দিয়ে ঠাণ্ডা ধারায় ঘাম গড়িয়ে পড়ছে।

‘এই পাগলা সন্ন্যাসীটা চায় কি?’ জিজ্ঞেস করলেন জামশেদুর রহমান।

কাঁধ ঝাঁকাল আর্থার। ‘বিস্তারিত বর্ণনা করে আড্ডার মেজাজটা নষ্ট করতে চাই না। বলছে শয়তানের বংশধর বেঁচে আছে, ইংল্যান্ডে নাকি বাস করছে।’

‘মাই গড়’ হা হা করে হেসে উঠলেন জামশেদ।

‘এক বুড়ি মনাস্টেরিতে চিঠি লিখেছে…থাক্, বাদ দিন তো এসব।’

‘আরে, বলুন না,’ বললেন জামশেদ। ‘গল্পটা হয়তো ন্যাশনাল এনকুইরারে চালিয়ে দিতে পারব।’

‘আমার এসব শুনতে ভাল লাগছে না,’ এতক্ষণে মুখ খুলল শীলা। ‘আর কোন প্রসঙ্গ নেই?’

এরপর ওরা অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলেন।

ঘণ্টাখানেক পর, বিছানায় উঠে শীলা আর্থার জানতে চাইল স্বামীর কাছে, ‘ডিনারে কোন্ বুড়ির গল্প বলছিলে তুমি?’

‘ও কিছু না, অশ্লীল ব্যাপার।’ হাই তুলল আর্থার। ঘুম পাচ্ছে। ‘তবু আমি শুনতে চাই,’ জেদ ধরল শীলা। ‘বলো আমাকে।

শীলার সাথে তর্ক করতে ইচ্ছে করল না। অনিচ্ছাসত্ত্বেও সে বলল, ‘বুড়ি লিখেছে আমার এক পূর্বসুরি, ডেমিয়েন থর্নের সাথে বিবিসি’র এক মেয়ের দৈহিক সম্পর্ক হয়েছিল।’

‘তারপর?’

‘কয়েক মাস পর হার্ট অ্যাটাকে মারা যায় থর্ন। সম্ভবত অতিরিক্ত খাটাখাটনির কারণে। মেয়েটা সন্তানের জন্ম দেয়-’ হাসল আর্থার। ‘-তবে জরায়ু থেকে বাচ্চা বের হয়নি।’

আর্থার ভেবেছিল কথাটা শুনে শীলা হয় হাসবে না হলে মুখ কোঁচকাবে। কিন্তু কিছুই করল না সে। চুপ করে থাকল। একটু পর ফিসফিসিয়ে বলল, ‘ডেমিয়েন থর্নের মত সুদর্শন পুরুষ জীবনে দেখিনি আমি।

চোখ ট্যারা করে আর্থার চাইল স্ত্রীর দিকে, ‘তার সাথে তোমার সাক্ষাৎ হয়েছে? জানতাম না তো!’

‘আমি ওকে ছবিতে দেখেছি। স্কুলে পড়ার সময় ডেমিয়েন থর্নকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম।’

আবার নীরব হয়ে গেল দু’জনে। আর্থারের দিকে পিঠ ফিরিয়ে শুলো শীলা।

‘মেয়েটার নাম কি?’

‘কেট,’ বলল আর্থার। ‘কেট কি যেন।’

‘কেট,’ ফিসফিস করল শীলা। ‘ক্যাথলিন, ক্যাথি, ক্যাটেরিন। আমাকে কেট বলে ডাকবে।’ স্বামীর দিকে ফিরল সে, জড়িয়ে ধরল তাকে। ‘আমার নাম কি বলো?’

‘কেট।’ বলল আর্থার।

এরপর প্রেম করল ওরা। উদ্দাম ঝড় শুরু হয়ে গেল বিছানায়। এক পর্যায়ে উন্মাদিনী শীলা অসম্ভব সব কাণ্ড করতে বলল ওকে নিয়ে, ফ্যাসফেঁসে গলায় আর্থারকে বারবার ডাকল ‘ডেমিয়েন’ বলে; আর্থার ওর কাঁধের ওপর দিয়ে জানালার দিকে তাকাল। শীলা স্বামীর চোখে চোখ রাখল। আর্থারের মনে হলো এটা আসলে আলোর কারসাজি: তারার আলো পড়েছে শীলার চোখে, হলুদ, ম্লান দুটি বিন্দুর মত লাগল চোখ জোড়া।

পরদিন সকালে হোটেলে এল আলখেল্লা পরা এক তরুণ। চেহারায় উদ্বেগ। তার দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল হোটেল-ক্লার্ক।

‘আমার নাম ব্রাদার ডেভিড… শুরু করল সে।

‘ও, আচ্ছা,’ বলল ক্লার্ক। আপনার জন্যে একটা প্যাকেজ আছে।’ কাউন্টারের নিচে হাত বাড়িয়ে একটা কাউচ আর একটা খাম বের করল সে। খামের মুখ টেপ দিয়ে আটকানো। ওটা খুলল সন্ন্যাসী, একবার চোখ বোলাল, তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

‘আমি কি একবার মি. আর্থারের সাথে কথা বলতে পারি, প্লীজ। স্যুইট নং চৌত্রিশ…’

‘উনি চলে গেছেন, স্যার।’

‘কোন মেসেজ রেখে গেছেন আমার জন্যে?’

‘জ্বী, না, স্যার। শুধু আপনার হাতের জিনিস দুটো দিয়ে গেছেন।’

চোখ বুজল সন্ন্যাসী, কান্না থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কি করে প্রীস্টকে বলবে সে ব্যর্থ হয়েছে।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *