আবার অশুভ সঙ্কেত – ১৬

ষোলো

বিবিসি প্রেস অফিসারের মত মেট্রোপলিটান পুলিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার টেড উইলিসও আমেরিকান এমব্যাসী থেকে ফ্রেডরিক আর্থারের দাওয়াত পেয়ে অবাক হয়ে গেল। আরও বেশি অবাক লাগল যখন রাষ্ট্রদূত নানা রাজনৈতিক সমস্যা, ট্রাফালগার স্কোয়ার বিপর্যয় এবং শেষে উইলিসের প্রিয় বিষয় সকার নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। এসব ফালতু জিনিস নিয়ে কথা বলার জন্যে অ্যামব্যাসাডর নিশ্চয়ই ওকে ডাকেননি, সন্দেহ হলো উইলিসের। ওর ধারণা সত্যি। একথা সেকথার পর ড্যাগার প্রসঙ্গ উত্থাপন করল আর্থার।

ভুরু কুঁচকে গেল টেড উইলিসের। ‘পাঁচটা ড্যাগার?’

‘হ্যাঁ। আপনাদের ব্ল্যাক মিউজিয়ামে আছে। শিকাগোতে কয়েক বছর আগে ওগুলোর সন্ধান পাওয়া যায়। আমাদের মিউজিয়ামের ড্যাগারগুলো দরকার স্বল্প সময়ের একটা শো-র জন্যে। তারপর আবার ওগুলো ফেরত পাবেন।’

তাহলে এই ব্যাপার? পেশিতে ঢিল পড়ল উইলিসের। ‘ড্যাগারগুলো দেয়া যাবে। কোন অসুবিধে নেই। তবে যত্নে এবং সাবধানে রাখতে হবে।’

‘সে ব্যাপারে পূর্ণ নিশ্চয়তা আপনাকে দিচ্ছি।’

‘বেশ। তাহলে আমাদেরও দিতে কোন অসুবিধে নেই।

‘ধন্যবাদ। অনেক ধন্যবাদ। আমাদের মিউজিয়াম খুব খুশি হবে ওগুলো পেলে।’

এরপর আবার সকারের গল্পে ফিরে গেল ওরা। মিনিট বিশেক পর অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনারকে বিদায় দিল আর্থার। বাড়ি ফেরার পথে মনটা খচখচ করতে লাগল টেড উইলিসের।

রাষ্ট্রদূতের ব্যাখ্যা মনঃপূত হয়নি তার। বলেছে মিউজিয়ামের জন্যে ড্যাগারগুলো চাই। আসলেও কি তাই? তবে কথা যখন দিয়ে ফেলেছে ড্যাগার দিতেই হবে। অবশ্য যথাসময়ে ওগুলো ফেরত পাবে বলে আর্থারের ওপর আস্থা আছে তার। কারণ ফ্রেডরিক আর্থারকে সে পছন্দ করে, বিশ্বাসও করে।

.

‘শীলা!’ গলা চড়িয়ে ডাকল আর্থার। আজ অবশ্য শীলার বাড়ি থাকার কথা নয়। শপিং-এ যাবে শুনেছে আর্থার। সাড়া না পেয়ে বুঝল শপিংয়েই গেছে শীলা। খুশি হলো ও। শীলা বাড়িতে না থেকে ভাল হয়েছে। বাড়ি থাকলে ড্যাগার নিয়ে নানা প্রশ্ন করত এবং আর্থারের জবাবে হয়তো তাকে সন্তুষ্ট করতে পারত না।

গ্লাস ভরে ব্রান্ডি নিল আর্থার, হলঘরে পায়চারি করছে। বেশি পান করে ফেলছে, বুঝতে পারছে। তাতে কি যায় আসে? ‘চলে এসো, চলে এসো,’ বিড়বিড় করছে আর্থার। উইলিস বলেছে ছ’টার মধ্যে প্যাকেজটা পাঠিয়ে দেবে।

বেজে উঠল ডোরবেল। দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলল আর্থার। এক পুলিশ একটা প্যাকেজ দিল ওকে, দস্তখত করতে বলল। তারপর স্যালুট মেরে চলে গেল। আর্থার দরজা বন্ধ করে চলে এল স্টাডিতে। র‍্যাপিং পেপারটা শক্ত করে আটকানো। খুলতে কষ্ট হচ্ছে আর্থারের। ছুরি দিয়ে কাটতে শুরু করল পেপার। তারপর দু’হাত দিয়ে ছিঁড়ে ফেলল কাগজ। উহ করে উঠল। ছুরির খোঁচা খেয়েছে তালুতে। ফেলে দিল প্যাকেট, সরু ধারায় বেরিয়ে আসছে রক্ত, চুষতে লাগল আর্থার।

মেঝেতে ছড়িয়ে পড়েছে লেবেল লাগানো ড্যাগারগুলো। একটা খাড়া ভাবে বিঁধে গেছে মেঝেতে, বাঁটটা মৃদু দুলছে, লেবেলটাকে পতাকার মত লাগল।

হাত বাড়াল আর্থার ড্যাগারটাকে তুলে নেয়ার জন্যে, আঙুলের ফাঁক বেয়ে বাঁটে, রক্তের ফোঁটা পড়ল। বাথরুমে ছুটল ও, দ্রুত ব্যান্ডেজের বাক্স টেনে নিল। হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধছে, লক্ষ করল তালুর ভাঁজের রেখাটা কেটে গেছে ড্যাগারের খোঁচায়। জ্যোতিষীরা ওই রেখাটাকে বলে লাইফ লাইন। রেখাটা ওর মাঝবয়সটাকে যেখানে ইঙ্গিত করছে ঠিক সেই জায়গাটায় কেটে গেছে।

ব্যান্ডেজ বেঁধে স্টাডিতে ফিরে এল আর্থার। ড্যাগারটা এখনও দুলছে, বাঁটে রক্ত। ছুরিটা টেনে ওঠাল ও, টিস্যু দিয়ে রক্ত মুছল। যীশুর সারা শরীরে লেগে গেছে রক্ত। বাথরুমে গিয়ে ড্যাগারটা ভাল করে ধুলো আর্থার, তোয়ালে দিয়ে মুছে আবার চলে এল পড়ার ঘরে। ডেস্কের ড্রয়ার খুলে বের করল ডি কার্লোর দেয়া ড্যাগারটা, তারপর অন্যগুলোর সাথে ওটাকে সহ একটা ক্রুশের আকার দিল।

যীশুর ছয়টি যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখ চেয়ে আছে আর্থারের দিকে। ফাঁকা চোখে ওদিকে তাকিয়ে রইল সে, দৃষ্টি ফেরাতে পারছে না। যেন সম্মোহন করা হয়েছে ওকে।

কতক্ষণ ওভাবে দাঁড়িয়ে ছিল বলতে পারবে না আর্থার, সংবিৎ ফিরে পেল সদর দরজা খোলার শব্দে। দ্রুত ড্যাগারগুলো ঢুকিয়ে ফেলল দেরাজে। শীলা এসে পড়েছে।

.

ভীষণ গরম পড়েছে। রেডিওতে ঘোষণা করা হয়েছে স্মরণকালের উষ্ণতম দিন আজ। বুহের আর ছেলেটা পেরিফোর্ডের বাগানে হাঁটছে, তাদের সাথে ছায়ার মত লেগে আছে কুকুরটা।

‘মীটিং-এ আর কিছু করার আছে?’ ছেলেটা হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করল বুহেরকে।

‘না,’ জবাব দিল বুহের। ‘সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন।’

‘বেশ। এবার সময় এসেছে কিছু ঘটার।’

বুহের জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল কি ঘটবে, হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল ছেলেটা, যেন ধাক্কা খেয়েছে। ঘুরে দাঁড়াল সে, তাকাল গাছের সারির দিকে। বুহের অনুসরণ করল তার দৃষ্টি। আধা মাইল দূরে, জঙ্গলের মধ্যে ঝিক্ করে উঠল সূর্য রশ্মি।

মৃদু গলায় গরগর শব্দ করল কুকুরটা।

সে তার লোক পাঠিয়েছে আমার জন্যে,’ বলল ছেলেটা। ‘ঈশ্বরের পুত্রের এজেন্ট এসেছে আমাকে ধ্বংস করতে।’

নড়ে উঠল কুকুরটা, পা বাড়াল জঙ্গলের দিকে। ছেলেটা দেখল ওকে।

‘আমি তার উপস্থিতি টের পাই সবখানে,’ ফিসফিস করল সে।

‘সে আমার আত্মা ছিদ্র করে ঢুকে পড়ছে। তার ধর্মানুরাগ চুইয়ে চুইয়ে ঢুকছে আমার হাড়ের মজ্জায়।’

শিউরে উঠল বুহের। ছেলেটার মনের অবস্থা সে বুঝতে পারছে। কারণ ঈশ্বর পুত্রের শক্তি সে-ও টের পায়। প্রতি রাতে তার কণ্ঠ শোনে সে, সকালে অদৃশ্য হয়ে যায় কণ্ঠটা স্বপ্নের মত।

ঝোপের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেছে কুকুর, ছেলেটা ফিরল বাড়ির দিকে। ‘আমার জন্যে প্রার্থনা করুন, পল। শিষ্যদের বলুন প্রার্থনা করতে। সবার সম্মিলিত শক্তি আমার প্রয়োজন।’

ছেলেটা চলে যাচ্ছে, দেখছে ওকে বুহের। বুড়ো মানুষের মত ক্লান্ত ভঙ্গিতে পা ফেলছে। তারপর চোখ ফেরাল পাহাড়ের দিকে। গাছের সারির আড়াল থেকে এখনও ঝিলিক দিচ্ছে সূর্য। এক মুহূর্ত ওদিকে তাকিয়ে রইল বুহের, তারপর ঘুরে অনুসরণ করল ছেলেটাকে। এত গরমের মধ্যেও হঠাৎ শীত লাগছে ওর।

.

বিনকিউলার নামিয়ে রাখল আর্থার, গভীর শ্বাস নিল। স্যাঁতসেঁতে বাতাস ঢুকে গেল ফুসফুসে। শরীর কাঁপছে ওর। অমন চোখ জীবনে দেখেনি সে। মরা মানুষের চোখ, অভিব্যক্তিশূন্য। দেয়ালের ওপর দাঁড়িয়ে আছে ও। ঘাড় ঘুরিয়ে জঙ্গলের দিকে তাকাল। ওখানে একটা হ্যাভারস্যাকে পাঁচটা ড্যাগার রেখে এসেছে। ছয় নম্বরটা ওর হাতে। বুঝতে পারছে প্রীস্ট ওকে যা বলেছে সে কাজ জীবনেও করতে পারবে না ও। এ অসম্ভব। ওরকম কথা ভাবাই তো পাগলামি।

দেয়ালের ওপর থেকে লাফ দিতে যাচ্ছে আর্থার, এমন সময় ঝোপের আড়াল থেকে লাফ মেরে বেরিয়ে এল কুকুরটা। এমন বিশাল জানোয়ার কোনদিন দেখেনি ও। শক্তি যেন ফুঁড়ে বেরুচ্ছে গা থেকে। চট করে পা-টা টেনে নিল আর্থার দেয়ালের ওপর, উবু হয়ে বসল। লাফিয়ে লাফিয়ে আসছিল কুকুরটা, চলার ছন্দে বিরতি না দিয়ে শূন্যে গা ভাসিয়ে দিল ওটা। প্রকাণ্ড লাফে আর্থারের কাছে এসে পড়ল, সামনের থাবা জোড়া বাড়ি খেল দেয়ালে, তিন ফুট দূরে সশব্দে বন্ধ হলো প্রকাণ্ড চোয়াল।

আতঙ্কে বিস্ফারিত হয়ে উঠল আর্থারের চোখ, চোয়াল আর হলুদ চোখ জোড়া দেখছে। লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয়ে ছিটকে পড়ল কুকুরটা, আবার লাফ দিল। কোন শব্দ করছে না, শুধু দাঁতে দাঁত ঘষা খাওয়ার শব্দ হচ্ছে।

দুলে উঠল আর্থার দেয়ালের ওপর, অদম্য ইচ্ছে হলো লাফিয়ে পড়ে। মাঝে মাঝে সমুদ্র ভ্রমণে, জাহাজের ডেকে দাঁড়ালে যেমন পানিতে লাফিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে, ঠিক তেমনি। চোখ বুজে ফেলল ও। ক্রুশের ওপর সেই শিশুর ছবিটা ভেসে উঠল সামনে।

মাথা ঝাঁকাল আর্থার, ছবিটাকে দূরে সরিয়ে দিতে চাইছে, নাক কুঁচকে উঠল

বোটকা একটা গন্ধে। কুকুরটার গা থেকে আসছে। ড্যাগারের বাঁট চেপে ধরল ও, ধরেই থাকল। যীশুর মুকুটের কাঁটাগুলো ফুটে গেল হাতের তালুতে। ব্যথাটা আবার সচেতন করে তুলল ওকে। চাইল চোখ মেলে। সাথে সাথে হ্যালুসিনেশন থেকে মুক্ত হলো আর্থার।

ফোঁস করে শ্বাস ফেলল ও, তাকাল কুকুরটার দিকে। নড়ছে না ওটা, কটমট করে তাকিয়ে আছে আর্থারের দিকে। আর্থার দ্বিতীয়বার আর তাকাল না ওটার দিকে। দ্রুত এগোল দেয়ালের দূর প্রান্তে, নেমে পড়ল। হ্যাভারস্যাকটা কাঁধে ঝোলাচ্ছে, শুনতে পেল প্রলম্বিত একটা চিৎকার। ব্যর্থ আক্রোশে করুণ সুরে ডাকছে কুকুরটা।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *