হে তথাগত – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
হে তথাগত – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
প্রথম প্রকাশ জানুয়ারি ২০২৬
অলংকরণ রঞ্জন দত্ত
HE TATHAGATA
Illuminating Novels, Stories and Essays on Gautam Buddha
by Himadrikishore Dasgupta
.
আনন্দময় চতুর্দশ
দলাই লামার
পাদপদ্মে
.
ভূমিকা
তিনি শাক্যবংশীয় রাজকুমার শাক্যমুনি, গৌতমীপুত্র গৌতম, সিদ্ধার্থ। তিনি যশোধরা-পতি। তিনি আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে নৈরঞ্জনা নদীতীরে এক পিপল বৃক্ষতলে ‘মার’ নামক মানুষের মনের দুঃখদায়ী প্রবৃত্তিগুলোকে জয় করে, মহাজ্ঞান লাভ করেছিলেন। হয়েছিলেন সিদ্ধার্থ থেকে ‘বুদ্ধ’।
তারপর তিনিই সেই মহাজ্ঞান, অর্থাৎ জাগতিক দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তিলাভ বা নির্বাণলাভের উপায় বা পথ দেখিয়েছিলেন এ পৃথিবীর মানুষকে। মানুষ ও জীবজগতের প্রতি ভালোবাসা, প্রেম-ক্ষমা-করুণা-অহিংসা সে পথের ভিত্তি। তাঁর মৃত্যুর শত সহস্র বছর পরেও আধুনিক পৃথিবীর কাছে তাঁর প্রদর্শিত পথ সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
তবে এই বই বৌদ্ধ ধর্মকথার তাত্ত্বিক বই নয়। তাঁর জীবন ও দর্শনের আলোয় আলোকিত দশটি কাহিনির সংকলন। এই দশটি কাহিনির কোনোটির ভিত্তি ঐতিহাসিকদের বস্তুনিষ্ঠ রচনা, কোনোটির ভিত্তি প্রাচীন বৌদ্ধ শাস্ত্র, পালি সাহিত্য। আবার কোনোটি রচিত হয়েছে বুদ্ধের পাদস্পর্শে ধন্য নানাস্থানের লোককথা বা উপকথার ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ সব কাহিনিই ‘বুদ্ধ’ কেন্দ্রিক।
এ বইয়ের গল্প উপন্যাসগুলিকে তিনভাগে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম, মহামানবের জীবিতকালের কাহিনি। অর্থাৎ তাঁর সিদ্ধার্থ থেকে বুদ্ধ হয়ে ওঠা। তাঁর মহাপরিক্রমণ ও মহাপরিনির্বাণ পর্যন্ত সময়কালের কাহিনি, যাকে নির্ভর করে এ বইয়ের অধিকাংশ গল্প-উপন্যাস রচিত হয়েছে।
দ্বিতীয়, তাঁর মহাপরিক্রমণ ও মহাপরিনির্বাণের পরবর্তীকালে প্রাচীন ও মধ্যযুগের সূচনা লগ্নে ইতিহাসবিদ ও পর্যটকদের রচনার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা কাহিনি। তৃতীয় হল, সমকালে অর্থাৎ আমাদের এই সময়ে বৌদ্ধ ধর্মের অবস্থান ও দর্শনকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা কাহিনি।
পাঠক-পাঠিকারা হয়তো এ বইয়ের কাহিনিগুলির ক্ষেত্রে এক কাহিনির সঙ্গে অন্য কাহিনির কিছু ঘটনাক্রম ও দর্শনগত ভাবনার পার্থক্য লক্ষ্য করতে পারেন। এর কারণ হল কাহিনিগুলির উৎস। অনেকক্ষেত্রেই ঐতিহাসিকদের রচনা ও ধর্মবিষয়ক শাস্ত্রের মধ্যে ফারাক রয়েছে বুদ্ধের জীবন কথা নিয়ে। এমনকী, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন শাখার মধ্যেও বুদ্ধের জীবন ও ধম্মের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত বিষয়ে বিভিন্ন মতপার্থক্য রয়েছে।
যেমন, বৌদ্ধ ধর্মসম্প্রদায়ের কিছু মানুষ মনে করেন, তিনি মহামানব, মানবমুক্তির পথপ্রদর্শক, মহাজ্ঞানী ছিলেন। সে জন্যই তাঁকে অনুসরণ করা উচিত। তবে তিনি ঈশ্বর বিশ্বাসী ছিলেন না, তিনি কখনও নিজেকে ঈশ্বর বলে দাবি করতেন না। তিনি একজন মহাদার্শনিক, তাঁর কোনও অলৌকিক ক্ষমতা বা অতিপ্রাকৃত শক্তি ছিল না।
অন্য এক অংশের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা বলেন, ‘বুদ্ধ হলেন সাক্ষাৎ দেবতা, মানব মুক্তির জন্য তিনি এ পৃথিবীতে মনুষ্য শরীর নিয়ে জন্মেছিলেন।’
ঠিক যেমন, হিন্দু পুরাণ কথায় বুদ্ধকে ভগবান বিষ্ণুর অবতার বলে কোথাও কোথাও বর্ণনা করা হয়েছে, ঠিক তেমনই তাঁদের বিশ্বাস বা উপলব্ধি।
শেষোক্ত বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকেরা এও দাবি করে থাকেন, গৌতম বুদ্ধ নানা অলৌকিক শক্তির অধিকারী ছিলেন। ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের নানা দেশে গিয়ে আমি দেখেছি বুদ্ধসংক্রান্ত নানা কাহিনিগুলিও স্থানভেদে নানাভাবে প্রচারিত হতে।
আমি ঐতিহাসিক নই, এ বই ইতিহাস বইও নয়। আমি চেষ্টা করেছি বুদ্ধের জীবনের নানা চমকপ্রদ ঘটনা ও স্বল্পপঠিত কাহিনিগুলো বিভিন্ন উৎস থেকে তুলে এনে পাঠকদের উপহার দিতে। তাই উৎসের ভিন্নতার জন্য কিছু কাহিনির মধ্যে ঘটনার বৈপরীত্য আছে।
যে দশটি গল্প-উপন্যাস এখানে প্রকাশিত হয়েছে, তার অধিকাংশ ইতিপূর্বে প্রকাশিত হয়েছে— কিশোর ভারতী, বর্তমান, আজকাল, প্রতিদিন, নবকল্লোল ইত্যাদি বহুলপ্রচারিত পত্রিকার শারদ সংখ্যা বা বিশেষ সংখ্যাতে। তবে এ বইয়ের সূচিপত্রে তার ব্যতিক্রম ঘটানো হয়েছে, যাতে পূর্বকথনের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য।
নানা সময়ে এ গল্পগুলি রচনাকালে আমাকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন বুদ্ধ গবেষক, অধ্যাপক ভিক্ষু সুমনপাল। লেখার প্রয়োজনে কখনও তিনি পালি ভাষার বঙ্গানুবাদ করে দিয়েছেন আমাকে। কখনও বা বুদ্ধের মুখনিঃসৃত বাণী, যাকে ‘সূত্ত’ বলা হয়, তার ব্যাখ্যা জানিয়েছেন আমাকে। লেখার জন্য দিয়েছেন উৎসাহ। এ বইয়ের একটি উপন্যাসে যশোধরার মুখনিঃসৃত ‘নরসিংহ গাথা’, পালি থেকে বাংলায় তাঁরই অনুবাদকৃত। তাঁর কাছে আমি ঋণী।
এই প্রসঙ্গে সবিনয়ে আর একটি আনন্দ সংবাদ জানাই, বুদ্ধদেবকে নিয়ে আমি বিশ্ববিখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অ্যাকাডেমিক অনলাইন কোর্সে স্বেচ্ছায় ভর্তি হয়েছিলাম, আপনাদের শুভেচ্ছায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছি।
পরিশেষে, ধন্যবাদ জানাই পত্রভারতী কর্তৃপক্ষকে। যাঁরা এই বুদ্ধ কাহিনিমালা এক মলাটে তুলে দিলেন পাঠক-পাঠিকাদের হাতে।
‘হে তথাগত।’
নমঃ বুদ্ধ।
হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত






Leave a Reply