কচ্ছপী বীণার তার

কচ্ছপী বীণার তার

বৈশালী নগরীর মাথায় তখন দিনান্তের রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। দাবদাহ শুরু হলেও বৈশাখের বেলাশেষের এই লগ্ন বড় মনোরম! আলো নরম হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ঝিরি ঝিরি শীতল বাতাস প্রবাহিত হতে শুরু করে। আম্রকুঞ্জের পাতাগুলো মৃদু কেঁপে উঠতে শুরু করে সেই বাতাসে। এই আম্রকুঞ্জের নিবিড়ে শীতল ছায়ায় অবস্থান করছেন মহাজ্ঞানী। এই স্থান তাঁর বড় প্রিয়! পরিক্রমণ সেরে বার বার তাই তিনি ফিরে আসেন এই স্থানে পথশ্রমের ক্লান্তি দূর করতে।

বার্ধক্য ধীরে ধীরে গ্রাস করতে শুরু করেছে তাঁর শরীরকে। আজকাল পথ চলার সময় কখনও কখনও শিষ্য আনন্দর কাঁধে ভর দিয়েও হাঁটতে হচ্ছে তাঁকে। আম্রকাননের শীতল ছায়ায় কিছুদিন অতিবাহিত করে আবার পথে নামবেন তিনি। রাত্রিবাসও এই আম্রকুঞ্জেই করে থাকেন শাস্তা।

যদিও বৈশালী নগরীর রাজপ্রাসাদের দ্বার খোলা আছে তাঁর জন্য। যদি তিনি প্রাসাদে বিশ্রামলাভ করতে যান তবে ধন্য হবেন বৈশালীরাজ। কিন্তু রাজপ্রাসাদের ভোগবিলাস ত্যাগ করেই তো একদিন পথে নেমে ছিলেন তিনি মানুষের জাগতিক দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তিলাভের পথ খুঁজতে। তারপর ক্ষণিকের তরে বিশ্রামলাভের জন্য কোনও রাজপ্রাসাদেই আর প্রবেশ করেননি তিনি। কারণ পথই তাঁর জীবন। ধূলি-ধূসর মৃত্তিকা, কিংবা তৃণশয্যাই তাঁর বিশ্রামের পক্ষে উপযুক্ত স্থান।

অবশ্য বৈশালী নগরীর সংঘগৃহে বিশ্রামগ্রহণ ও রাত্রিবাস করতেই পারেন তিনি। যেমন পরিক্রমণে বেরিয়ে করে থাকেন। সংঘগৃহগুলি আড়ম্বরবিহীন। বৈশালীর সংঘগৃহও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু বৈশালী নগরীতে ফিরে এলে শাস্তা এই আম্রকুঞ্জকেই নির্বাচন করেন তাঁর বিশ্রামলাভের স্থান হিসাবে। মহাজ্ঞানীর এমন ইচ্ছার পিছনে কারণটা কিছুটা অনুমান করতে পারেন তাঁর ছায়াসঙ্গী ভিক্ষু আনন্দ।

এই আম্রকুঞ্জে তিনি নিভৃতে থাকতে চান শুধু বিশ্রামলাভের জন্য নয়—চিন্তা করার জন্য, তাঁর মনের কোনও বিষয় অমীমাংসিত রয়ে থাকলে তাঁর সমাধান খোঁজার জন্য। তিনি মহাজ্ঞানী বলেই হয়তো আজও এসব ভেবে চলেন। কারণ মহাজ্ঞানীরাই জানেন, জ্ঞান আহরণের কোনও শেষ নেই, পথ চলার কোনও শেষ নেই।

বৈশালী নগরীর আম্রকুঞ্জের অনতিদূরে পথপার্শ্বে অবস্থান করছে সংঘগৃহ। প্রস্তরনির্মিত, ক্ষুদ্রাকৃতি কিছু কক্ষসম্বলিত শুষ্ক পাতার ছাউনি দেওয়া এই সংঘগৃহই ভিক্ষুদের অবস্থান। মহাজ্ঞানীর দেহ অশক্ত হয়ে আসছে। তাই আনন্দ তাঁর সঙ্গেই রাত্রিবাস করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মহাজ্ঞানীই তাঁকে সংঘগৃহে রাত্রিবাস করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

কারণ, বহু মানুষ প্রতিদিন সংঘে এসে উপস্থিত হয় নানা সাহায্যের আকুতি নিয়ে, আবেদন নিয়ে। সংঘেরও নিজস্ব নানা কাজ থাকে। সংঘে আগত সাহায্যপ্রার্থীদের আবেদন ও সংঘের কাজ যাতে আনন্দর উপস্থিতিতে সুচারুভাবে সম্পন্ন হতে পারে, সে জন্যই মহাজ্ঞানী আনন্দকে সংঘে থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। সেই নির্দেশ পালন করছেন ভিক্ষু আনন্দ।

তবে দিবা অবসানে, প্রতি সন্ধ্যায় আম্রকুঞ্জে মহাজ্ঞানীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান তিনি। সেখানে গিয়ে দীপ জ্বালান। শাস্তা তাঁর থেকে সংঘের খবরাখবর গ্রহণ করেন, প্রয়োজনে সংঘের বিষয়ে অভিমত ব্যক্ত করেন। সংঘ ও ধম্মবিষয়ক আলোচনা হয় তাঁদের দু’জনের মধ্যে। বাক্যালাপ কোনওদিন মধ্যরাত পর্যন্ত পৌঁছায়। আনন্দ এরপর আম্রবৃক্ষের নীচে শুষ্ক তৃণে বোনা মাদুর বিছিয়ে শাস্তার নিদ্রার ব্যবস্থা করে ফিরে আসেন সংঘগৃহে।

দিবাভাগে সংঘপ্রাঙ্গণে বহিরাগত মানুষের সমাগম হলেও বিকাল

হওয়ার পূর্বেই তারা ফিরে যায়। সংঘগৃহ ও আম্রকুঞ্জসংলগ্ন পথ বৈশালী নগরীর প্রান্ত সীমায় অবস্থান করার কারণে সূর্য ডোবার আগেই তা জনশূন্য হয়ে যায়। শুধু দিনশেষে মাথার ওপর দিয়ে ঘরে ফেরা পাখির কূজন ব্যতিরেকে অশ্বশকটের শব্দ বা পথচারীদের পদচারণার শব্দও সে পথ থেকে মুছে যায়। শুধু কখনও কখনও নগরীর মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত রাজপ্রাসাদ থেকে ভেসে আসে অস্পষ্ট ঘণ্টাধ্বনি—বৈশালীবাসীকে সন্ধ্যারতির সময় জানাবার জন্য।

ঠিক এই সময়ই ভিক্ষু আনন্দ যাত্রা শুরু করেন আম্রকুঞ্জের শাস্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য। আজও এ নিয়মের ব্যতিক্রম হল না। মহাজ্ঞানীর কাছে যাওয়ার জন্য কাষায়বস্ত্র, উত্তরীয় পরিহিত মুণ্ডিতমস্তক শ্রমণ আনন্দ, অভ্যাসমতো শান্ত ধীর লয়ে পদচারণা করতে করতে নতমস্তকে এগোলেন সম্মুখের মৃত্তিকাপথের দিকে। যে পথ তাঁকে পৌঁছে দেবে আম্রকুঞ্জের

নিকটে।

সংঘগৃহ আর পথে ওঠার মধ্যবর্তী স্থানে এক বটবৃক্ষ আছে। দিবাভাগে চাঁদোয়ার মতো সে সুশীতল ছায়া দেয় পথচারীদের। দিনশেষে আসন্ন সন্ধ্যার প্রস্তুতিতে সেই বৃক্ষছায়া আরও নিবিড় হয়ে এসেছে। মাথার ওপর বৃক্ষশাখায় শোনা যাচ্ছে ঘরে ফেরা পাখিদের কলকাকলি। ভিক্ষু আনন্দ সেই স্থান অতিক্রম করে পথে উঠতে যাচ্ছিলেন। হঠাৎই গাছ থেকে নেমে আসা বটের ঝুরির আড়াল থেকে আত্মপ্রকাশ করলেন একজন।

আনন্দ থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন তাঁকে দেখে। কে উনি? অবগুণ্ঠনে আবৃত মুখ। এসময় তো কেউ সংঘে আসে না! অভ্যাসমতো সেই অবগুণ্ঠনধারীর উদ্দেশে মাথা নত করে সম্ভাষণ জানালেন ভিক্ষু আনন্দ। তিনিও মাথা ঝুঁকিয়ে একইভাবে প্রতিনমস্কার জানালেন তাঁকে। আনন্দ এরপর তাঁর পরিচয় জিগ্যেস করার আগেই তিনি তাঁর অবগুণ্ঠন সরিয়ে ফেললেন। কয়েক মুহূর্ত তাঁর দিকে তাকিয়েই তাঁকে চিনতে পারলেন মহাজ্ঞানীর পার্শ্বচর ভিক্ষু আনন্দ।

মহাজ্ঞানী তাঁর সম্যক জ্ঞানলাভ করার পর একবারের জন্যে ফিরে গিয়েছিলেন তাঁর জন্মভূমিতে। পাহাড়ি উপত্যকার রাজ্যে। আনন্দ সে যাত্রাতেও সঙ্গী হয়েছিলেন মহাজ্ঞানীর। সেখানেই আনন্দ দেখেছিলেন তাঁকে, যিনি আজ তাঁর সামনে এসে উপস্থিত হয়েছেন। অবগত হয়েছিলেন তাঁর পরিচয় সম্পর্কে।

ম্রিয়মাণ আলোকে আজ যিনি আনন্দর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি সেসময় পর পর তিনদিন উপস্থিত হয়েছিলেন শাস্তার সামনে—একটি

বিশেষ আবেদন নিয়ে। যদিও শাস্তা তাঁর সে আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ঘটনাটা বহু বৎসরকাল আগের, তবুও তাঁকে দেখে চিনতে ভুল হল না ভিক্ষু আনন্দর। বিস্মিতকণ্ঠে তিনি তাঁর উদ্দেশে বলে উঠলেন, ‘আপনি এ স্থানে? অত দূর দেশ থেকে আপনি কীভাবে কার সঙ্গে এ স্থানে এসে উপস্থিত হলেন?’

যাঁর উদ্দেশে আনন্দ কথাগুলো বললেন, তিনি বুঝতে পারলেন ভিক্ষু চিনতে পেরেছেন তাঁকে। তাঁর আর আত্মপরিচয়দানের প্রয়োজন নেই।

তিনি ভিক্ষুর উদ্দেশে বললেন, ‘শ্রমণ, আপনাকে ধন্যবাদ আপনি আমাকে স্মরণে রেখেছেন বলে। আমি আজই বৈশালী নগরীতে এসে উপস্থিত হয়েছি। তবে রথচক্রে নয়, পদব্রজে। শাস্তা যেমন কৃচ্ছ্রসাধন করে পথ পরিক্রমা করেন, ঠিক তেমনভাবেই। আমার সঙ্গে আমারই মতো আরও অনেকে এসেছেন। রাজপ্রাসাদসংলগ্ন কাননে আছেন তাঁরা।’

ভিক্ষু আনন্দ এরপর তাঁর কাছে জানতে চাইলেন, ‘আপনি কি শাস্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছেন?’

এ প্রশ্নের জবাবে তিনি ভিক্ষুকে বেশ অবাক করে দিয়ে বললেন, ‘শাস্তা তো সর্বদা আমার অন্তরেই অবস্থান করেন, প্রতি মুহূর্তেই আমি তাঁকে অবলোকন করি আমার অন্তরে। আমি এসেছি আপনার সঙ্গে বাক্যালাপ করতে, সাক্ষাৎ করতে।’

তাঁর উত্তর শুনে এবার আরও বিস্মিত হলেন আনন্দ। তিনি বললেন, ‘আমি তথাগতর একজন অনুগামী ভিক্ষু মাত্র! তাঁর মতো মহাজ্ঞানী আমি নই। তথাগত যখন নিজে এ স্থানে অবস্থান করছেন তখন আমার মতো নগণ্য ভিক্ষুর কাছে আপনার কী প্রয়োজন? এতদিন পর আপনার সাক্ষাৎ পেলে শাস্তা নিশ্চয়ই আনন্দিত হবেন।’

‘আবার একইসঙ্গে বিব্রতও হতে পারেন।’ আনন্দর কথা শুনে বলে উঠলেন তিনি।

একটু থমকে গিয়ে আনন্দ এরপর জানতে চাইলেন, ‘তিনি বিব্রত হবেন কেন?’

‘কারণ আমি তাঁর কাছে আবার একই আবেদন জানাব। আর সে আবেদন প্রত্যাখ্যান করবেন তিনি।’

ভিক্ষু আনন্দ চেয়ে রইলেন সামনের দণ্ডায়মান মানুষটির মুখের দিকে। দীর্ঘ পথপরিক্রমার ফলে ক্লান্ত মুখমণ্ডল তাঁর। বয়সের ভারে কিছুটা ন্যুব্জও বটে।

কয়েক মুহূর্ত নিঃশব্দে কেটে গেল। মাথার ওপর পাখিদের কলতানও শান্ত হয়ে গেছে। নৈঃশব্দ ভঙ্গ করে এরপর তিনি আনন্দর উদ্দেশে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি এসেছি আপনারই কাছে। এসেছি সেই একই আবেদন নিয়ে। যা বার বার প্রত্যাখ্যান করেছেন মহাজ্ঞানী। আপনি যদি একবার শেষ চেষ্টা করে দেখেন, আমার আবেদনটা উপস্থাপিত করেন তাঁর সামনে! হয়তো তিনি রাজি হয়ে যেতে পারেন। শুনেছি, ভিক্ষুকুলের মধ্যে আপনার ওপরেই সর্বাপেক্ষা অধিক আস্থা রাখেন তিনি, আপনাকেই সর্বাপেক্ষা স্নেহ করেন। তথাগত সংঘ পরিচালনাসহ ইত্যাদি নানা বিষয়ে আপনার মতামতকেই অধিক গুরুত্ব দেন।’

এবার তাঁর কথা শুনে বিব্রতবোধ করলেন ভিক্ষু আনন্দ। তিনি খানিক ইতস্তত করে বললেন, ‘হ্যাঁ, শাস্তা আমার প্রতি আস্থাশীল। আমার মতো নগণ্য মানুষের প্রতি তাঁর স্নেহ-করুণা আমার মানবজীবনকে ধন্য করেছে। কিন্তু তিনিই আমাদের সকলের পথপ্রদর্শক। আমরা কেউ নই। তাঁর ইচ্ছাই আমাদের ভিক্ষুদের কাছে নির্দেশসম। তিনি সংঘ পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনও মত দিলে আমরা সেটাই চূড়ান্ত বলে গণ্য করি। কারণ তিনি মহাজ্ঞানী।’

তাঁর এ কথা শুনে আগত মানুষটি এবার মৃদু ক্ষুব্ধভাবে বললেন, ‘আমরা কি তবে ভবিষ্যতের পাতায় শুধুমাত্র একটা নাম হয়ে বেঁচে থাকব? আমি তো ভবিষ্যতের পাতায় অমরত্ব চাই না। চাই কর্মের মাধ্যমে নির্বাণলাভ। সে অধিকার তিনি কেন দেবেন না আমাদের? তিনি তো সংহারক অজাতশত্রুকেও তাঁর আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত করেননি, তাঁকে ক্ষমা করেছিলেন, কলুষমুক্ত করেছিলেন বারবণিতা রাজনর্তকী আম্রপালিকেও। তবে আমরা কেন তাঁর কৃপা থেকে বঞ্চিত হব? কেন তিনি পূর্ণ করবেন না আমাদের মনস্কামনা?’

এ কথা শুনে কী প্রত্যুত্তর দেবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না বুদ্ধশিষ্য আনন্দ। যে প্রশ্নগুলো তাঁর উদ্দেশে ছুড়ে দেওয়া হল তার মধ্যে যুক্তি আছে ঠিকই! কিন্তু মহাজ্ঞানীর সিদ্ধান্তের পরিবর্তন তিনি ঘটাবেন কীভাবে?

এরপর সেই মানুষটি নিজের আবেগকে কিছুটা সংযত করে নিয়ে বললেন, ‘ভিক্ষু আমাকে মার্জনা করবেন। এটা তাঁর প্রতি আমার অভিযোগ নয়, তবে অনুযোগ বলতে পারেন। আপনার কী মনে হয়, এই অনুযোগের কি কোনও সারবত্তা নেই? একবার নিজের মনকে প্রশ্ন করুন আপনি।’

আনন্দ জানেন, এই অনুযোগ মিথ্যা নয়। তাঁর সামনে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন তিনি সাধারণ কেউ নন। কিন্তু এক্ষেত্রে নিজের মত ব্যক্ত করার অর্থই তো শাস্তার ভাবনার বিপক্ষে যাওয়া। তা আনন্দর পক্ষে সম্ভব নয়। তাই এবারও তিনি নিশ্চুপ হয়ে রইলেন। নিজের সমর্থন ব্যক্ত করলেন না।

এরপর সেই মানুষটি আনন্দর কাছে এসে তাঁর হাত দুটো ধরে বললেন, ‘শাস্তা সাহচর্যে আপনিও আজ জ্ঞানী। তবে আপনি আমার পুত্রবৎ। আমারই মতো আরও একজন একই আকাঙ্ক্ষায় লোকচক্ষুর আড়ালে দিন কাটাচ্ছে। সে বড় অভিমানী, তাই সে কোনওদিন তার দাবি নিয়ে শাস্তার সামনে উপস্থিত হননি।

‘শাস্তার বোধিলাভের কাহিনি আপনি জানেন। সত্যিই কি কচ্ছ বীণার বাকি দু’টি তার গুরুত্বহীন? আপনার কাছে আমার বিনীত অনুরোধ। আপনি একবার শেষ একটা চেষ্টা করে দেখুন। এই অশক্ত শরীর নিয়ে বড় আশা করে এসেছি আপনার কাছে। আপনিই আমাদের শেষ ভরসা।’

তাঁর স্পর্শ, আবেদন, মুখমণ্ডলে জেগে থাকা করুণ আকুতি এবার সত্যি স্পর্শ করল ভিক্ষু আনন্দর হৃদয়কে। তিনি বললেন, ‘আমি অবশ্যই চেষ্টা করব।’

আনন্দর কথা শুনে তাঁর বলিরেখাময় মুখমণ্ডল খানিক উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সূর্য ডুবে গেছে। সন্ধ্যা সমাগত। আনন্দ তাই এবার তাঁর উদ্দেশে বললেন, ‘আপনি এবার ফিরে যান। রাত্রি নামবে শীঘ্রই। আপনাকে যদি সংঘগৃহে প্রবেশাধিকার দেওয়ার ক্ষমতা আমার থাকত তবে আমি আপনাকে এ স্থানেই রাত্রিবাস করতে বলতাম। তবে আপনার জন্য কোনও সুসংবাদ সংগ্রহ করতে পারলে সে খবর আমি নিজেই আপনার নিকট পৌঁছে দেব। এবার আমাকে শাস্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যেতে হবে।’

তিনি এরপর ভিক্ষু আনন্দর হস্ত মুক্ত করে তাঁকে স্নেহের সুরে বললেন, ‘পুত্র, মনে রাখবে তুমিই আমার শেষ ভরসা। না, শুধু আমার নয়, আরও অনেকের।’

এ কথা বলে ধীর পায়ে বটবৃক্ষের আড়ালে অন্ধকারে হারিয়ে গেলেন তিনি। আর ভিক্ষু আনন্দও পথে উঠে এগোলেন আম্রকুঞ্জের দিকে।

২

তিনি অন্তর্হিত হলেও তাঁর বলা কথাগুলো ভাবতে ভাবতে এগোলেন ভিক্ষু আনন্দ, তাঁর কথাগুলো যেন অনুরণিত হতে লাগল ভিক্ষুর কানে—‘সত্যি কি কচ্ছ বীণার বাকি তার দুটো গুরুত্বহীন?’

বিশেষত এ কথাটাই যেন বার বার ধ্বনিত হতে লাগল ভিক্ষু আনন্দর কানে। তথাগতর জীবনে গৌতম থেকে মহাজ্ঞানী হওয়ার পিছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে ওই কচ্ছ বীণা বা কচ্ছপী বীণার। তিন তারের এই বীণার খোল, কচ্ছপের আকৃতির দেখতে বলে ওর নাম কচ্ছপী বীণা। ওই কচ্ছপী বীণার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে আনন্দকে কী বোঝাতে চাইলেন তিনি?—এ কথা ভাবতে ভাবতে এক সময় আম্রকুঞ্জের সামনে পৌঁছে গেলেন ভিক্ষু আনন্দ।

পথিমধ্যে তাঁর সঙ্গে বাক্যালাপ হওয়ার কারণে এ স্থানে পৌঁছাতে কিঞ্চিৎ বিলম্ব হল আনন্দর। তিনি যখন আম্রকুঞ্জে প্রবেশ করলেন, তখন অন্ধকার নেমে গেছে। তবে চেনা পথ, তাই চলতে অসুবিধা হল না তাঁর। তাছাড়া অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গে জোনাকির দলও পাতা, বৃক্ষকোটরের আড়াল থেকে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করেছে।

ভিক্ষু আনন্দ খানিক সময়ের মধ্যেই নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে গেলেন। আম্রবৃক্ষের গুঁড়ির তলে একটা শুষ্ক কাষ্ঠখণ্ডের ওপর বসে আছেন শাস্তা। আর তাঁর মাথার পশ্চাদ্ভাগে ঘূর্ণায়মান বৃত্ত রচনা করেছে উজ্জ্বল জোনাকির দল। দেখে মনে হচ্ছে যেন জ্যোতি বিচ্ছুরিত হচ্ছে শাস্তার শরীর থেকে। অর্ধ উন্মীলিত করুণাঘন অক্ষিপল্লব! ক্ষমাসুন্দর মুখমণ্ডলে ঠোঁটের কোণে আবছা জেগে আছে প্রেমময় হাসি।

ভিক্ষু আনন্দ বেশ কয়েক মুহূর্ত মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে রইলেন অমিতাভর সেই আশ্চর্য সুন্দর মূর্তির দিকে। শিষ্যের দিকে তাকিয়ে মহাজ্ঞানী তাঁর অক্ষিপল্লব ভালোভাবে প্রস্ফুটিত করতেই সম্বিৎ ফিরল ভিক্ষু আনন্দর। তিনি মাথা ঝুঁকিয়ে করজোড়ে শাস্তার উদ্দেশে প্রণাম জানিয়ে তাঁর সামনে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন।

করুণাময় কয়েক মুহূর্তের জন্য তাঁর দক্ষিণ হস্ত উত্থিত করলেন, আশীর্বাদ দানের জন্য। শাস্তা এরপর প্রতি সন্ধ্যার মতোই সংঘগৃহ আর ভিক্ষুরা কুশলে আছেন কিনা, প্রত্যেকে তাঁর নির্দিষ্ট কর্তব্য পালন করছেন কিনা তা জানতে চাইলেন। সাধ্যমতো তাঁর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করলেন শিষ্য আনন্দ। ভিক্ষু এরপর ভাবতে লাগলেন, খানিক আগে যাঁর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল তাঁর আগমনবার্তা শাস্তাকে জানাবেন কিনা। যদিও তিনি শুধু শাস্তার কাছে তাঁর নিবেদনটাই উপস্থাপিত করতে বলেছেন, আর ভিক্ষু আনন্দ তাঁকে কথা দিয়েছেন তাঁর আকুতি অমিতাভকে জানাবেন বলে।

কিন্তু কীভাবে তা শাস্তার সামনে উত্থাপিত করা যায়? ক্ষণিকের তরে নিস্তব্ধ হয়ে এ কথাটাই ভাবছিলেন আনন্দ। মহাজ্ঞানী সম্ভবত তাঁর মনের ভাব বুঝতে পেরে বললেন, ‘আনন্দ, তুমি কি কোনও কারণে বিচলিত বোধ করছ অথবা কোনও বিষয়ে চিন্তামগ্ন?’

কথাটা কানে যেতেই বুদ্ধশিষ্য আনন্দ বললেন, ‘আমাকে মার্জনা করবেন শাস্তা। আমি একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম।’

করুণাময় হেসে বললেন, ‘তোমার মন যে অন্য ভাবনায় ভাবিত তা আমি বুঝতে পেরেছি। অন্য দিন আমার সামনে আসনগ্রহণের পূর্বে তুমি মৃত্তিকা দীপ প্রজ্বলন করো। আজ তুমি সে কার্য থেকে বিস্মৃত হলে।’

এ কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে শিষ্য আনন্দ লজ্জা বোধ করে উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিলেন দীপশিখা জ্বালাবার জন্য। কিন্তু মহাজ্ঞানী তাঁকে নিরস্ত করে বললেন, ‘না, আজ আর দীপ জ্বালাবার প্রয়োজন নেই। কী সুন্দর জোনাকি জ্বলছে দ্যাখো! কী সুন্দর তাঁদের বিন্দু বিন্দু আলো! প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই এমন একটা করে জোনাকি জ্বলে। কিন্তু জাগতিক বহুবিধ আঁধার দ্বারা ঢেকে থাকে মানব মনের সেই আলো।

‘তোমরা আজকাল আমাকে অনেকে দেবতা ভাবো। কিন্তু আমি দেবতা নই। আমি একজন পথপ্রদর্শক মাত্র। মানুষের মনের অন্ধকার ঘুচিয়ে তার মধ্যে যে জোনাকি আছে তাকে এমনই উন্মুক্তভাবে উড়িয়ে দিতে চাই।

জোনাকি আমার বড় প্রিয়। প্রদীপের উজ্জ্বলতায় ওরা হয়তো দূরে সরে যেতে পারে।’

শাস্তার কথা শুনে ভিক্ষু আনন্দ আর স্থানত্যাগ করলেন না।

মহাজ্ঞানী এরপর জানতে চাইলেন, ‘তোমার মনকে কী ভাবনা আচ্ছন্ন করে রেখেছে? যদি মনের মধ্যে কোনও প্রশ্ন থেকে থাকে তবে আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি তা নিরসন করা যায় কিনা।’

শিষ্য ভিক্ষু আনন্দর মনমধ্যে সত্যি আবর্তিত হচ্ছিল সেই মানুষটির কথা যিনি তাঁর সঙ্গে বৃক্ষতলে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। শাস্তার প্রশ্নের জবাবে আনন্দর মুখ থেকে নিজের অজান্তেই যেন একটা শব্দ বেরিয়ে এল, ‘কচ্ছপী বীণা!’

‘কচ্ছপী বীণা!’—এ কথাটা শুনে তথাগত খানিকক্ষণের জন্য নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। তাঁর মন চলে গেল বহু যুগ আগে নৈরঞ্জনা নদীতীরের উরুবিলাতে। তিনি তখন দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে নদীতীরে এক বটবৃক্ষের নীচে কঠিন তপস্যায় বসেছেন। খাদ্য-পানীয় কোনও কিছু গ্রহণ না করে দিবারাত্রি কেবলই তপস্যা করে চলেছেন।

ভোরবেলা ব্রাহ্ম মুহূর্তে শুধু একবার মাত্র তিনি আসন ত্যাগ করে উঠতেন নদীতে স্নান করার জন্য। কারণ তাঁর আসনের মাথার ওপর বৃক্ষশাখা থেকে পক্ষীকুল বিষ্ঠাত্যাগ করত। সারাদিনে ওই একবারই কিছু সময়ের জন্য আসন ত্যাগ করতেন তিনি।

দিনের পর দিন, মাসের পর মাস তপস্যার কঠিন পরিশ্রম, অনাহার, অনিদ্রায় এক সময় তাঁর শরীর অশক্ত, কঙ্কালসার হয়ে এল। যেন ধ্যানে বসে থাকার মতো শক্তিও তিনি তখন হারিয়ে ফেলেছেন। একদিন সেই অশক্ত শরীর নিয়ে নৈরঞ্জনা নদীতে স্নান করে সূর্যোদয়ের সময় তিনি যখন আবার বটবৃক্ষের তলায় ফিরতে চলেছেন তখন তাঁর কানে এক সুমধুর বীণার শব্দ ভেসে এল। তিনি দেখলেন, কিছু দূরে নদীতীরে একজন দাঁড়িয়ে একটি বীণা বাজাচ্ছে।

সেই বীণার শব্দ যেন আহ্বান জানাচ্ছে নতুন প্রভাতকে। কৌতূহলী হয়ে গৌতম গিয়ে দাঁড়ালেন সেই ব্যক্তির সামনে। তিনি দেখলেন, বীণাবাদকের হাতে একটি কচ্ছপী বীণা। সেই সুমধুর ধ্বনিনির্গত বাদ্যযন্ত্র আকর্ষণ করল তাঁকে। তিনি খেয়াল করে দেখলেন, সেই কচ্ছপী বীণার তিনটি তার। এক পাশের একটি তার শক্ত করে টেনে বাঁধা, অন্য পাশের একটি আলগোছে বাঁধা, আর ওই দুই তাদের মধ্যবর্তী তারটি না কঠিন, না আলগোছে—নরম করে বাঁধা।

বাদক এই মধ্যবর্তী তারেই অঙ্গুলি সঞ্চালন করে আনন্দধ্বনি সৃষ্টি করছে। বাদকের সঙ্গে কোনও বাক্যবিনিময় হল না গৌতমের। নিজের মনে বাদ্য বাজাতে বাজাতে এক সময় সে স্থান থেকে অন্তর্হিত হল সেই বীণাবাদক। কিন্তু ওই কচ্ছপী বীণার তিন তার দেখে ও বীণা বাজানোর কৌশল দেখে গৌতমের মনে একটি ভাবনার জন্ম হল।

তিনি উপলব্ধি করলেন, সত্যের পথ খুঁজতে হলে বীণার কঠিন তারটির মতো কঠিন কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে সাধনা করা বা বীণার এলিয়ে পড়া তারটির মতো ভোগবিলাসে নিমজ্জিত হয়ে মুক্তির পথ খুঁজলে চলবে না। তাঁকে কচ্ছপী বীণার মাঝের তারটির মতো মধ্যবর্তী পথে চলতে হবে। অর্থাৎ ‘মঝঝিম’ পন্থা অবলম্বন করতে হবে। এ পথে সাধনা করলেই সুফল মিলবে।

এ কথা ভেবে নিয়ে তিনি তাঁর সাধনার স্থল পরিবর্তন করে, নতুনভাবে সাধনা করার জন্য কাছেই এক অশ্বত্থবৃক্ষের তলায় এসে উপবেশন করলেন। ঠিক সেই সময় সুজাতা নামের এক গোপী বধূ তার এক সহচরীর সঙ্গে সে স্থানে পরমান্নর থালা নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল, বৃক্ষদেবতাকে পুজো দেওয়ার জন্য।

গৌতমের চেহারা কঙ্কালসার হলেও তাঁর মুখমণ্ডল-গাত্রবর্ণ থেকে যে নির্মল আভা বিচ্ছুরিত হচ্ছিল, তা দেখে সুজাতা অনুমান করল, এই ব্যক্তি নিশ্চয় কোনও যোগী পুরুষ হবেন। তাই সে ওই পায়েস নিবেদন করল গৌতমকে।

তিনি ততক্ষণে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন যে তিনি ‘মঝঝিম’ পন্থা অবলম্বন করবেন। তাঁকে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে তাঁর শরীরকে যথাসম্ভব সজীব রাখতে হবে। কারণ তিনি অলৌকিক শক্তিধর কোনও দেবতা নন, তিনি রক্তমাংসের মানুষ। তাই তিনি সেই পরমান্ন গ্রহণ করে অশ্বত্থবৃক্ষের তলায় ধ্যানমগ্ন হলেন।

এর পরদিন থেকে সুজাতা প্রত্যহ পায়েস নিয়ে আসত তাঁর জন্য। তিনি তা ভক্ষণ করে ধ্যানে বসতেন। ধীরে ধীরে বল ফিরে এল তাঁর শরীরে। ধ্যানে একাগ্রতা বৃদ্ধি হল। তারপর একদিন বৈশাখী পূর্ণিমার রাত্রির তৃতীয় প্রহরে তিনি বোধি বা জ্ঞানলাভ করলেন। তিনি গৌতম থেকে বুদ্ধ হলেন। তাই তাঁর বোধিলাভের পিছনে ওই কচ্ছপী বীণার এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। ওই কচ্ছপী বীণাই তাঁকে তাঁর সাধনার পথের সন্ধান দিয়েছিল।

তথাগত যখন কচ্ছপী বীণার কথা শুনে নিশ্চুপভাবে স্মৃতি রোমন্থন করছিলেন তখন সেই অবসরে ভিক্ষু আনন্দও কচ্ছপী বীণার কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ যেন অনুমান করতে পারলেন যে, তাঁর সঙ্গে যিনি সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন তিনি কেন কচ্ছপী বীণার বাকি দু’টি তারের কথা উল্লেখ করলেন। আনন্দ বুঝতে পারলেন, কীভাবে বিষয়টি উপস্থাপিত করতে হবে তথাগতর সামনে। হয়তো বা মহাজ্ঞানী তাঁর কথা উপলব্ধি করতে পারবেন। শিষ্য আনন্দ চেয়ে রইলেন শাস্তার দিকে।

৩

কিছু সময় নিশ্চুপভাবে স্মৃতি রোমন্থন করার পর শাস্তা প্রথমে স্বগতোক্তি করলেন, ‘হ্যাঁ, ওই কচ্ছপী বীণার মধ্যের ধাতব সুতাটাই আমাকে “মঝঝিম” পন্থা গ্রহণের পথনির্দেশ করেছিল। তাই আমি “মঝঝিম” পন্থা অনুসরণ করে চলি। সবাইকে সেই পন্থা অনুসরণ করতে বলি জাগতিক দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তিলাভ করার জন্য। নির্বাণলাভ করার জন্য।’ এ কথা বলে তিনি আবারও কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন।

এরপর মহাজ্ঞানী তাঁর প্রিয় শিষ্যকে জিগ্যেস করলেন, ‘আচ্ছা ওই সুজাতা নামক নারীর কোনও সংবাদ তুমি জানো? যার পরমান্ন গ্রহণ করে অশ্বত্থবৃক্ষের নীচে আমি বজ্রাসনে ধ্যানে বসেছিলাম! বহু বছর আগের সেই ঘটনার পরবর্তীকালে যখন আমি উরুবিলাতে পুনরায় গমন করেছিলাম তখন কিন্তু সে আর আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেনি।’

শিষ্য আনন্দ ইতিমধ্যেই তাঁর কর্তব্য স্থির করে নিয়েছে। করুণাময়ের হৃদয়কে যদি আর্দ্র করে তোলা যায় তাহলে হয়তো তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেন। এটাই একমাত্র উপায় আনন্দর কাছে।

তথাগতর প্রশ্ন যেন ভিক্ষু আনন্দর কাছে সে সুযোগ উন্মোচিত করে দিল। তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, উরুবিলায় আপনার পুনরায় অবস্থানকালে তিনি আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেননি। তিনি এক সাধারণ নারী! আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে তাঁর বিপদ হয়তো বাড়ত।’

‘কীসের বিপদ?’ জানতে চাইলেন তথাগত।

শ্রমণ আনন্দ বললেন, ‘আপনি তো জানেনই উরুবিলাতে আপনার বোধিলাভের স্থান এখন “ধম্ম” গ্রহণকারীদের কাছে এক অতি পবিত্র তীর্থস্থান। বহু ভিক্ষু-শ্রমণ নিত্য সেই পুণ্যভূমিতে যাওয়া আসা করে। দেবী সুজাতার আপনাকে পরমান্ন নিবেদনের কাহিনিও সকলের কাছেই সুবিদিত। আমি কিছু দিন আগে কৌতূহলবশত উরুবিলাতে অবস্থানরত কয়েকজন ভিক্ষুর কাছে দেবী সুজাতার সম্পর্কে জিগ্যেস করেছিলাম। তাঁরা তাঁর সম্পর্কে যা বললেন, তা বড় বেদনাদায়ক। দেবী সুজাতা বর্তমানে একাকী এক পর্ণকুটিরে বাস করেন গ্রামের প্রান্তসীমার নদীতীরে।’

‘কেন? সে তো এক বর্ধিষ্ণু গোপ পরিবারের গৃহবধূ ছিল। তার সুরম্য অট্টালিকা ছিল, দাসী ছিল। সে এখন একাকী বাস করে কেন? সে নিজে গৃহ ত্যাগ করল, নাকি তার পরিজনরা তাকে?’ একটু উদ্বেলিত কণ্ঠে জানতে চাইলেন করুণাময়।

আনন্দ জবাব দিলেন, ‘এ বিষয়ে আমি উরুবিলাতে আমাদের যে সংঘগৃহ আছে, সেখানকার শ্রমণদের কাছে শুনেছি। তা হল, আপনি তো উরুবিলাতে বোধিলাভ করার পর সে স্থান ত্যাগ করে অনেক দূরে চলে গেছিলেন বরুণা নদীতীরের মৃগদাবতে ধম্মচক্রপ্রবর্তনের জন্য। কিন্তু দেবী সুজাতা নিজগ্রামেই রয়ে গেছিলেন। আপনি উরুবিলা ত্যাগ করে চলে আসার পরও গোপীবালা ওই অশ্বথবৃক্ষের তলে পরমান্ন রেখে আসতেন।

‘কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর স্বামী-পুত্র এ বিষয়টিকে আর সমর্থন করেননি। তাঁরা বিষ্ণুর উপাসক। আপনার প্রচলিত ধম্মমত তাঁদের ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাছাড়া গ্রামের একদল মানুষও নানা প্রশ্ন তুলতে শুরু করে, আপনার মতো এক অন্যদেশীয় পুরুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে। আপনার প্রতি তাঁর আকুলতা নিয়ে। পরিবার ও প্রতিবেশীদের তির্যক বাক্যবাণের শিকার হতে থাকেন দেবী সুজাতা।

‘আর যার ফলস্বরূপ তিনি গোপীগৃহ ত্যাগ করতে বাধ্য হন অথবা তাঁকে সে গৃহ থেকে বিতাড়িত করা হয়। হয়তো আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি গ্রামের কিনারে ওই পর্ণকুটিরে বাস করার অধিকারও হারাতেন।’ এ কথাগুলো একটানা বলে শ্রমণ আনন্দ তাকালেন করুণাময়ের মুখের দিকে।

ইতিমধ্যে চাঁদ উঠতে শুরু করেছে। আম্রকুঞ্জের শাখা-প্রশাখার ফাঁক গলে তার আলো খানিক এসে পড়েছে অমিতাভর মুখে। আনন্দর যেন মনে হল দেবী সুজাতার বর্তমান অবস্থা শ্রবণ করে যেন বিষণ্ণ ভাব জেগে উঠেছে করুণাময়ের চোখে।

আনন্দ এরপর বললেন, ‘দেবী সুজাতা আপনার চরণেই নিজেকে নিবেদন করতে চান। অংশ হতে চান আমাদের। উরুবিলার সংঘের কাছে তিনি এ প্রস্তাব জানিয়েছেন। কিন্তু সেখানে তো তাঁকে স্থান দেওয়া যায় না, তাই না? কিন্তু কালের নিয়মে একদিন রোগ-ব্যাধি গ্রাস করবে তাঁকে। এ সত্য তো আপনি শিখিয়েছেন সবাইকে। কোনও দৈবশক্তি বার্ধক্যকে প্রতিহত করতে পারে না, তবে গৃহত্যাগী নারী কার আশ্রয় গ্রহণ করবেন? জীবনের অন্তিম মুহূর্তে তাঁর শীর্ণ শরীরে চন্দনের প্রলেপ দেবে কে?’

মহাজ্ঞানী তাঁর প্রিয় শিষ্যের জবাবে এবারও নিরুত্তর রইলেন।

এরপর আরও কিছু সময় নিস্তব্ধভাবে কেটে গেল। তথাগত চেয়ে আছেন তাঁর প্রিয় শিষ্যের দিকে আর ভিক্ষু আনন্দ মাথা নিচু করে বসে আছেন তাঁর সামনে। মহাজ্ঞানী বুঝতে পারলেন, জোনাকির আলোয় আলোকোজ্জ্বল এই সন্ধ্যায় তাঁর কাছে আরও কিছু নিবেদন করতে চায় আনন্দ। তাই তিনি বললেন, ‘তোমার মনে যদি কিছু কথা, প্রকাশের অপেক্ষায় থাকে তবে তা ব্যক্ত করো, আমি শুনি। সঙ্কোচ কোরো না।’

আনন্দ বললেন, ‘হ্যাঁ, আপনার নিকটে আমার আরও কিছু কথা নিবেদন করার আছে। আপনি সর্বজ্ঞানী, সমস্ত বিষয় সম্পর্কেই আপনি জ্ঞাত আছেন, তবুও আপনাকে কিছু বলার ইচ্ছা হচ্ছে আমার। জানি না তা আপনার মনে বিরক্তির উদ্রেক করবে কিনা।’

শাস্তা এবার মৃদু হেসে বললেন, ‘আমার মনে কোনও মানুষের প্রতি বিরক্তির উদ্রেক ঘটে না। যা ঘটে তা হল প্রেম-ভালোবাসা-করুণার উদ্রেক—এ কথা কি তুমি বিস্মৃত হচ্ছ আনন্দ?’

শিষ্য আনন্দ বললেন, ‘আমাকে মার্জনা করবেন প্রভু। আমার শব্দচয়নে ত্রুটি হয়েছে। হ্যাঁ, আপনি তো সেই মহাজ্ঞানী করুণাময়। যিনি যাবতীয় হিংসা-ক্রোধ-বিরক্তির ওপর জয়লাভে সমর্থ হয়েছেন। ভালোবাসা, করুণাবারি সিঞ্চন করে জয় করেছেন সম্রাট অজাতশত্রুর মতো ধম্মবিদ্বেষী, বৌদ্ধ হন্তারককেও। তাই তো আজও অনেকে অপেক্ষা করে আছেন, প্রতীক্ষা করছেন আপনার কৃপালাভের আশায়।’

‘আমি কি আমার করুণা-ভালোবাসা থেকে কাউকে বঞ্চিত করেছি, করছি বলে তোমার মনে হয়?’ জানতে চাইলেন শাস্তা।

ভিক্ষু আনন্দ শাস্তার এ প্রশ্নের সরাসরি জবাব দিল না। তিনি বললেন, ‘খানিক আগে আমার মুখ থেকে “কচ্ছপী বীণা” কথাটা নির্গত হয়েছিল। ওই বীণার মধ্যম তার নিশ্চয়ই আপনি। যা প্রেমের সুর, করুণার সুর ছড়িয়ে চলেছে সারা পৃথিবীর বুকে। কিন্তু বাকি দু’টি তারের কথা মনে হলেই আমার মনে পড়ে যায় অন্য দু’জন মানুষকে। আপাত দৃষ্টিতে অপাঙ্েক্তয় মনে হলেও প্রতিটি অংশের নির্দিষ্ট কার্যকারিতা থাকে। বিনা প্রয়োজনে কোনও কিছুই তো সংযোজিত হয় না।’

শাস্তা তাঁর শিষ্যের কথা শুনে কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলেন, ‘কচ্ছপী বীণার বাকি দু’টি তার তোমার মনে কাদের কথা স্মরণ করায়? নিঃসঙ্কোচে তুমি তাদের কথা আমাকে বলতে পারো।’

মহাজ্ঞানী শাস্তার অভয়বাণী পেয়ে তাঁর প্রিয় শিষ্য আনন্দ আর নিজের মনের ভাব গোপন করলেন না। তিনি বলতে শুরু করলেন, ‘কচ্ছ বীণা বা কচ্ছপী বীণার যে এক তার আলগোছে বাঁধা থাকে, সেই ধাতব সুতাটি আমায় স্মরণ করায় কপিলাবস্তুর এক নারীর কথা।’

এ কথাটা শুনেই শাস্তা যেন মৃদু চমকে উঠলেন।

আনন্দ বলে চললেন, ‘যিনি বৈশাখী পূর্ণিমাতে আপনার জন্মদিবসের দিনই জন্মলাভ করেছিলেন। যিনি ছিলেন কোলীয় রাজা সুপ্পবুদ্ধ ও রানি অমিতার কন্যা। যিনি আপনাকে ভালোবেসে পিতার অমতে আপনাকে বিবাহ করেছিলেন। সে কারণে পিতা সুপ্পবুদ্ধ ও মাতা অমিতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিন্ন হয়।

‘যেদিন আপনার সন্তান জন্মলাভ করেন সে রাতেই যাতে মায়ার বন্ধনে আপনি আবদ্ধ না হন, তাই তাঁকে ও সদ্যোজাত শিশুপুত্রকে ত্যাগ করে মানবমুক্তির সন্ধানে প্রাসাদ ত্যাগ করে দূর উরুবিলায় গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। আর সেই দেবী একাকী প্রতিপালন করেছিলেন তাঁর সন্তানকে, তাঁর বিরহ যন্ত্রণাকে গোপন করে।

‘শুধু তাই নয়, মহারাজা শুদ্ধোধনের অনুরোধে আপনি যখন বোধিরূপে শেষ একবারের জন্য কপিলাবস্তু গিয়েছিলেন তখন পাছে তাঁকে দেখে আপনার মনে বেদনা জাগ্রত হয়—সেই আশঙ্কাতে তিনি আপনার সম্মুখে এসে উপস্থিত হননি।

‘আমি আর ভিক্ষু মৌদ্গল্যায়ন যখন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম, তখন তিনি আপনার সম্পর্কে কোনও অভিযোগ জানালেন না। উপরন্তু তাঁর শেষ সম্বল এক মাত্র পুত্রকে স্বেচ্ছায় আমাদের সঙ্গে পাঠিয়ে দিলেন “ধম্ম” গ্রহণ করার জন্য, তাঁর পিতার প্রদর্শিত পথে হাঁটার জন্য। রাজ-অন্ন পরিত্যাগ করে আমাদের মতো ভিক্ষালব্ধ কঙ্করমিশ্রিত তণ্ডুল গ্রহণের জন্য, সংঘের বাসিন্দা হয়ে দিনযাপনের জন্য।

‘এত বড় আত্মত্যাগ এ পৃথিবীতে আর কোনও স্ত্রী করতে পারবেন কিনা আমি জানি না। শুধু তাই নয়, আমরা যখন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম, তখন দেখেছিলাম, তিনি নিরাভরণ-অলংকারহীন। তিনি কাষায়বস্ত্র পরিধান করে আছেন, যেমন পরিধান করে থাকেন ভিক্ষুরা, সংঘবাসীরা।

‘শুনেছি আমরা যেমন মৃৎপাত্রে আহারগ্রহণ করে থাকি, তিনিও তেমনই করেন। নিজ হস্তে তণ্ডুল রন্ধনের পূর্বে তাতে কঙ্কর মিশিয়ে নেন। আপনার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি তৃণশয্যায় শয়ন করেন।

‘ভিক্ষাপাত্র হাতে ভিক্ষুরা যেমন আহার সংগ্রহের হেতু ক্রোশের পর ক্রোশ পথ অতিক্রম করে ঠিক তেমনই তিনিও প্রখর রৌদ্রে বা বর্ষণসিক্ত দিনে কপিলাবস্তুর রাজপ্রাসাদের বিশাল ছাদ প্রহরের পর প্রহর ধরে নগ্নপদে পরিক্রমা করেন।’ এ পর্যন্ত বলে শাস্তার মুখের দিকে চাইলেন আনন্দ। তিনি খেয়াল করলেন, শাস্তার মুখমণ্ডলে যেন ব্যাকুলতা ফুটে উঠতে শুরু করেছে।

শিষ্য আনন্দ বললেন, ‘আমার মনে হয় দেবী যশোধরা কচ্ছপী বীণার আলগোছে বাঁধা তন্ত্রীর মতো। যে আলগোছে থাকে। সে হল বীণার চিকারি। সে নিজেই কম্পিত হয়ে মধ্যবর্তী তারের ঝংকারের মিষ্টতা আনে, নীরবে কাজ করে চলে।’ এ কথা বলে আবারও ক্ষণিকের জন্য থামলেন ভিক্ষু আনন্দ।

মহাজ্ঞানীর মুখের দিকে চেয়ে বললেন, ‘তিনি তাঁর পিতা-মাতার কুল থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেছেন, তাঁর একমাত্র অবলম্বন, তাঁর সন্তান রাহুলকে তুলে দিয়েছেন সংঘের হাতে। তিনি ভিক্ষু-শ্রমণদের মতোই জীবন নির্বাহ করেন। কিন্তু ভবিষ্যতে তাঁর কী হবে? একদিন রোগ-জরা তাঁকেও গ্রাস করতে উদ্যত হবে।

‘এমন তো হতেই পারে, কপিলাবস্তুর সিংহাসনে নতুন কোনও নৃপতি আরোহণ করলেন। তিনি তখন দেবী যশোধরার দায়িত্বভার গ্রহণ করতে অস্বীকারও করতে পারেন। তখন কী হবে তাঁর? তিনি তো সংঘে আশ্রয় গ্রহণ করতে পারবেন না, তাই না!

‘অথচ কোনও সংঘবাসী ভিক্ষুর চেয়ে তাঁর ত্যাগ-তিতিক্ষা, আপনার ধম্মের প্রতি তাঁর আস্থা কোনও অংশ কম নয়। তিনি ধম্ম গ্রহণ করেছেন ঠিকই, কিন্তু ধর্মাচার পালন ছাড়া ধম্মের প্রতি তাঁর কোনও অধিকার নেই। যেমন অন্য ধর্মেও নারীকে সে অধিকার দেওয়া হয়নি এই ষোড়শ মহাজনপদে।’ এ কথা বলে মহাজ্ঞানীর বক্তব্য শোনার জন্য থেমে গেলেন ভিক্ষু আনন্দ।

তিনি দেখলেন, শাস্তার অক্ষিপল্লব দু’টি স্থির হয়ে গেছে। আনন্দ তাঁর দীর্ঘদিনের সহচর। বহু বৎসরকাল ধরে তিনি বহু পথ হেঁটেছেন মহাজ্ঞানীর সঙ্গে। তাই তাঁর চোখের ভাষা, প্রতিটি অঙ্গ সঞ্চালনের অর্থ পাঠ করতে পারেন তাঁর প্রিয়তম শিষ্য আনন্দ। তিনি জানেন, চক্ষু মুদে গভীরভাবে কিছু চিন্তা করার আগে শাস্তার অক্ষিপল্লব দু’টি অমন স্থির হয়ে যায়।

মহাজ্ঞানী তাঁর শিষ্যের কথা শুনে কোনও মন্তব্য করলেন না ঠিকই। কিন্তু আনন্দ বুঝতে পারলেন, মহাজ্ঞানী তাঁর বক্তব্যকে মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন ও তার অন্তর্নিহিত অর্থ নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন। আনন্দ তাই আবার বলতে শুরু করলেন, ‘এবার বলি কচ্ছপী বীণার অপর পার্শ্বের সেই শক্ত করে বাঁধা তারের কথা। যে তার সুরঝংকার তোলে না ঠিকই, কিন্তু সে তার শক্তভাবে ধরে থাকে বীণার কাঠামোকে। আর সে তারের কথা ভাবলে আমার মনে পড়ে আর এক শাক্যবংশীয়া নারীর কথা…মাতা গৌতমীর কথা—।’

আনন্দ খেয়াল করলেন এ কথা শোনার পরেই চোখ মুদলেন তথাগত। আনন্দ বলে চললেন, ‘হ্যাঁ, তিনি মাতা গৌতমী। প্রজাপতি গৌতমী। যিনি আপনার গর্ভধারিণী মায়াদেবীর মৃত্যুর পর আপনাকে নিজের কোলে টেনে গিয়ে গৌতমের মাতা গৌতমী রূপে পরিচয় লাভ করেছিলেন। নিজের স্তন্যপান করিয়ে আপনার জীবন রক্ষা করেছিলেন। যিনি আপনাকে প্রথম পাঠ দিয়েছিলেন, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে, জীবজগতের প্রতিটি প্রাণীকে ভালোবাসার! এ কথা তো আপনিই আমাদের বলেছেন শাস্তা।

‘এমনকী আপনার জন্য তিনি নিজের জীবনও বিপন্ন করেছিলেন। আপনার সঙ্গে মাতা যশোধরার সম্পর্কে বিষয়ে অসম্মতি প্রকাশ করে কোলীয়রাজ সুপ্পবুদ্ধ যখন আপনাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলেন, তখন প্রজাপতি গৌতমীই আপনাকে রক্ষা করার জন্য আপন অগ্রজ কোলীয়রাজের সম্মুখে তরোয়াল উন্মোচন করেছিলেন। যে কারণে নিরস্ত হন সুপ্পুবুদ্ধ। কারণ, আপনাকে হত্যা করার আগে তাঁকে হত্যা করতে হতো তাঁর ভগিনীর।

‘প্রজাপতি গৌতমী আজ বৃদ্ধা, লোলচর্মাবৃতা। তিনি আপনার কাছে মাতৃত্বের অধিকার নিয়ে বিলাসব্যসনের দাবি করেন না, শুধুই আবেদন জানান। তাঁর একটাই আবেদন, তিনি তাঁর পুত্রের মানবসেবার কর্মের অংশ হতে চান। অধিকার পেতে চান সক্রিয়ভাবে ধম্মপ্রচারের, প্রসারের, তার পরিকল্পনা রচনার। যা তিনি করতে পারেন না সংঘে তাঁর স্থান নেই বলে।’

এরপর ভিক্ষু আনন্দ কথাটা বলেই ফেললেন, ‘শুধু এই একটি মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্য সুদূর কপিলাবস্তু থেকে অশক্ত শরীর নিয়ে নগ্নপদে তিনি ছুটে এসেছেন এ স্থানে। হয়তো তিনি এবারও প্রত্যাখ্যাত হতে পারেন তা জেনেও ছুটে এসেছেন তাঁর শেষ আশাটুকুকে সম্বল করে। আমার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছে।’ আনন্দর মনে হল, এ কথা শুনে যেন মৃদু কম্পন হল মহাজ্ঞানীর মুদিত অক্ষিপল্লবে।

ভিক্ষু আনন্দ নিজের অজান্তেই আবেগতাড়িতভাবে এরপর তাঁর শেষ কথাগুলো বললেন, ‘মাতা গৌতমী, দেবী যশোধরা। নৈরঞ্জনা নদীতীরের দেবী সুজাতা শুধু নন, এমন আরও কত নারী আজ আশ্রয় খুঁজছেন তথাগতর চরণে। তাঁরা সবাই কচ্ছপী বীণার দু’পাশের তারগুলোর মতোই। যাঁরা নীরবে বীণার মধ্যবর্তী তারের মূর্ছনাকে ধরে রেখেছে। তাকে ছড়িয়ে দিয়েছে চারপাশে। তাঁরা কি সন্ন্যাসিনী রূপে সাধুত্বের বিভিন্ন স্তর উপলব্ধি করতে সক্ষম নন?’ এ কথা বলার পর কথা শেষ হল আনন্দর। তথাগতর মুখের দিকে চেয়ে রইলেন তিনি।

চাঁদ তখন আকাশের অনেকটাই উপরে উঠে গেছে। আর কয়েক দিন পরেই পূর্ণিমা। চাঁদের আলো এসে পড়েছে মহাজ্ঞানীর পবিত্র মুখমণ্ডলে। আনন্দর যেন মনে হল, শাস্তার মুদিত অক্ষিপল্লবের কোণ চাঁদের আলোতে চিকচিক করছে! অশ্রুবিন্দু! তবে কি আনন্দ তাঁর বাক্যের মাধ্যমে আঘাত দিয়ে ফেলেছেন মহাজ্ঞানীকে?

ভিক্ষু আনন্দ তাই উঠে দাঁড়ালেন হাতজোড় করে নতমস্তকে মহাজ্ঞানীর কাছে ক্ষমা চাইবার জন্য। ঠিক সেই সময় কোথা থেকে যেন সুরের মূর্ছনা এসে পৌঁছল আনন্দর কর্ণকুহরে। কচ্ছ বীণার ধ্বনি! হয়তো বা কোনও পথিক চন্দ্রালোকে আম্রকুঞ্জের পথ ধরে বীণা বাজাতে বাজাতে চলেছে। করুণাসিন্ধু সেই ধ্বনি শুনে অক্ষিপল্লব উন্মোচিত করলেন।

না, শিষ্য আনন্দকে কোনও ভর্ৎসনা নয়, হাজার হাজার বছর ধরে ষোড়শ মহাজনপদের অচলায়তন ভেঙে এই প্রথম কোনও মহাজ্ঞানী করুণাময় বলে উঠলেন, ‘আমি নারীদের ধম্মের সক্রিয় অংশরূপে গ্রহণ করলাম। তাঁদের আমি ভিক্ষুদের মতোই ধম্ম পরিচালনার অধিকার দিলাম। তুমি তাঁদের জন্য সংঘগৃহ নির্মাণের ব্যবস্থা করো। আর মাতা গৌতমীকে সংবাদ দাও তিনিই হবেন সংঘের প্রথম ভিক্ষুণী।

‘আজ আমি কচ্ছপী বীণার সত্য উপলব্ধি করতে পেরেছি। সে বীণার দু’পাশের দু’টি তারের উপস্থিতি ছাড়া সুরঝংকার তোলা মধ্যবর্তী তারটি মূল্যহীন। মূল্যহীন আমার “ধম্মভাবনা-মঝঝিম পন্থা”! তাঁর কথা শুনে ভিক্ষু আনন্দর চোখ দিয়ে আনন্দ অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *