ঈশ্বর আছেন, ঈশ্বর নেই
১
বর্ষা ঋতুর তিন মাস পদব্রজে যাত্রা করেন না অমিতাভ ও তাঁর সহচর ভিক্ষুরা। এই সময় বুদ্ধদেবের পথচলা স্থগিত রাখার একটা বিশেষ কারণ আছে। এ সময় নতুন নতুন ঘাস জন্মায়। মাটি ফুঁড়ে বাইরে এসে বেরিয়ে সূর্যের প্রথম আলো দেখে বৃক্ষ-সন্তানেরা, প্রায় নিষ্প্রাণ হয়ে যাওয়া লতা-গুল্মরা আবার সজীব হয়ে ওঠে। মহাজ্ঞানী চান না, তাঁর ও ভিক্ষুকুলের দ্বারা তারা কেউ পদদলিত হোক।
কারণ, তাদেরও তো প্রাণ আছে। এ পৃথিবীতে মানুষের মতো তাদেরও বেঁচে থাকার অধিকার আছে। এ জগতের সব জীবের প্রতিই অসীম মমত্ববোধ প্রেমময় শাক্যমুনির।
বর্ষা ঋতুর তিন মাস দুই ভিন্ন ভিন্ন স্থানে অতিবাহিত করেন তথাগত। এক, মগধসম্রাট বিম্বিসারের উপহার দেওয়া জলাশয়সমৃদ্ধ বেণুবন।
দুই, কোশল রাজ্যের অন্তর্গত বৈশালীতে অবস্থিত জেতবন। সরোবর ও আম্রকুঞ্জসমৃদ্ধ এই জেতবনেই বর্তমানে বেশ কয়েকটি বর্ষা ঋতু অতিবাহিত করেন মহাজ্ঞানী।
এ উদ্যানের নামকরণ করা হয়েছিল কোশলরাজ প্রসেনজিতের পুত্র ‘জেত’-এর নামানুসারে। এ স্থান জেতের বড় প্রিয় ছিল। বুদ্ধ-অনুরাগী শ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডক এই উদ্যানকে নির্বাচন করেন, বুদ্ধদেবের বর্ষাবাসের স্থান
হিসাবে। তিনি যুবরাজ জেতের কাছ থেকে এই উদ্যান ক্রয় করবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
প্রাথমিক অবস্থায় যুবরাজ জেত তাঁর অতিপ্রিয় এই জেতবন বিক্রয় করতে রাজি ছিলেন না। তবে সরাসরি অনাথপিণ্ডকের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে না পেরে তিনি এক কৌশলের আশ্রয় নেন। তিনি অনাথপিণ্ডককে জানান যে, রাজপ্রাসাদের সম্মুখবর্তী বিশাল প্রাঙ্গণ যদি অনাথপিণ্ডক স্বর্ণখণ্ড দিয়ে আবৃত করে দিতে পারেন, তবে তিনি এই জেতবন তাঁর হাতে তুলে দেবেন।
বুদ্ধের সান্নিধ্যলাভ করার জন্য সে কাজই করেন বুদ্ধ-অনুরাগী অনাথপিণ্ডক। তিনি তাঁর যাবতীয় ধন-সম্পদ স্বর্ণে রূপান্তরিত করে সেই স্বর্ণ ঢালতে থাকেন প্রাসাদ-প্রাঙ্গণে। তথাগতর প্রতি অনাথপিণ্ডকের এই শ্রদ্ধা দেখে বিস্মিত হন রাজপুত্র জেত। এবং শেষ পর্যন্ত উদ্যান তিনি তাঁর হাতে তুলে দেন। মনস্কামনা পূর্ণ হয় বুদ্ধভক্ত অনাথপিণ্ডকের।
যে তিন মাস মহাজ্ঞানী জেতবনে অবস্থান করেন, সেই তিন মাস অনাথপিণ্ডক প্রত্যহ শাস্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। তাঁর বাণী শুনে, তাঁর পাদস্পর্শ করে, তাঁর সান্নিধ্যলাভ করে পরিতৃপ্ত হন।
এ বৎসরও বর্ষা ঋতু জেতবনেই অতিবাহিত করেছেন অমিতাভ। তবে আর কিছু দিনের মধ্যেই বর্ষা বিদায় নেবে। তার আভাস মিলছে।
মাঝে-মাঝেই মেঘের চাদর সরিয়ে সূর্য আত্মপ্রকাশ করছে। নীল আকাশ উঁকি দিচ্ছে নানা দিকে। বর্ষাঋতু শেষ হলেই মহাজ্ঞানী তাঁর সঙ্গী ভিক্ষুদের নিয়ে আবার যাত্রা শুরু করবেন ষোড়শ মহাজনপদের ধূলিমাখা পথে পথে। পৌঁছে দেবেন মানবমুক্তির বার্তা।
২
প্রতিদিনের মতোই এদিন প্রভাতে জেতবনের সরোবরে অবগাহন করে এক আম্রবৃক্ষতলে উপবেশন করলেন বুদ্ধদেব। সঙ্গে তাঁর শিষ্য ভিক্ষু আনন্দ। পাখির কূজন ধ্বনি হচ্ছে চারপাশে। বৃষ্টিস্নাত আম্রপল্লবগুলো আরও নবীন, আরও সবুজ হয়ে উঠেছে।
বৃক্ষশাখার ফাঁক গলে প্রভাতি সূর্যকিরণ এসে পড়েছে প্রস্তরাসনে উপবিষ্ট তথাগতর শরীরে। দেখে মনে হচ্ছে, যেন এক স্নিগ্ধ মনোরম আলোকচ্ছটা বিচ্ছুরিত হচ্ছে মহাজ্ঞানীর শরীর থেকে!
অনাথপিণ্ডক প্রতিদিন যেমন আসেন, এদিনও তেমনই এলেন। হাতের পদ্মফুল মহাজ্ঞানীকে নিবেদন করে তাঁর চরণতলে উপবিষ্ট হলেন। বুদ্ধদেব উজ্জ্বল সূর্যকিরণের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী সুন্দর আলোকময় প্রভাত! আর কয়েক দিনের মধ্যেই শরতের আগমন ঘটবে। আনন্দ, তুমি যাত্রারম্ভের প্রস্তুতি শুরু করো। আমি বারাণসীর মৃগদাবর পথে রওনা হব।’
শাস্তার বিদায়কাল সমাগত হলেই বুদ্ধ অদর্শনে ব্যথিত হয়ে ওঠে শ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডকের মন। বললেন, ‘মহাজ্ঞানীর নিকট আমার একটি নিবেদন আছে।’
‘কী নিবেদন?’ জানতে চাইলেন শাস্তা।
অনাথপিণ্ডক বললেন, ‘আপনার অনুপস্থিতি, আপনার অদর্শন আমাকে বড় কাতর করে তোলে। তাই আমি আপনার মূর্তি নির্মাণ করাতে চাই। এ স্থানে আপনার অনুপস্থিতিতে, ওই মূর্তি দর্শন করলে আমার এবং আমার মতো আরও অনেকেরই মনে হবে—আপনি এ স্থলেই আছেন। ঈশ্বর বা দেবতার সান্নিধ্যলাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি না আমরা। আপনি আপনার মূর্তি নির্মাণের অনুমতি দিন।’
ভক্তের অনুরোধ শুনে করুণাময় হেসে বললেন, ‘এ অনুমতি আমি তোমাকে দিতে পারি না। ইতিপূর্বে কাউকেই দিইনি, আর ভবিষ্যতেও আমার জীবদ্দশায় কাউকে দেব না। কারণ, আমি ঈশ্বর বা দেবতা কোনোটাই নই। আমি একজন রক্ত-মাংসের মানুষ মাত্র!
‘যে মানুষ মানবমুক্তির জন্য, নির্বাণলাভের জন্য জ্ঞান আহরণ করেছে এবং তা সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা করছে। আমি একজন পথপ্রদর্শক মাত্র! তার চাইতে বড় কেউ নই। তুমি যেমন মানবসেবায় নিয়োজিত আছ, তেমনই থাকো। দেখবে আমার উপস্থিতি সর্বদা তোমার সঙ্গেই আছে।’
কিছু সময় পর এক ব্যক্তি এসে উপস্থিত হলেন মহাজ্ঞানীর কাছে। তাঁকে প্রণাম জানিয়ে তাঁর সামনে হাঁটু মুড়ে বসে তিনি বললেন, ‘আপনার নিকট আমার একটি জিজ্ঞাস্য আছে। আপনি বুদ্ধ, মহাজ্ঞানী। আপনি নিশ্চয়ই আমার কৌতূহলের অবসান ঘটাতে পারবেন।’
প্রেমময় বললেন, ‘বলো, কী প্রশ্ন?’
সেই ব্যক্তি বললেন, ‘হে তথাগত, ঈশ্বর কি সত্যিই আছেন?’
উত্তর দেবার আগে করুণাময় হেসে জানতে চাইলেন, ‘এ বিষয়ে উত্তর দেবার পূর্বে, আমি ঈশ্বরের উপস্থিতি সম্পর্কে তোমার মতামত জানতে চাই।’
সেই ব্যক্তি এবার বললেন, ‘আমার তো মনে হয় ঈশ্বর নিশ্চয়ই আছেন। তিনিই এই জগৎ-সংসার পরিচালনা করেন।’
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে তাঁকে অবাক করে দিয়ে মহাজ্ঞানী হেসে জবাব দিলেন, ‘না, ঈশ্বর বলে কেউ নেই। ঈশ্বরের ধারণা ভ্রান্ত।’
সেই ব্যক্তি আর কোনও তর্কে গেলেন না। মহাজ্ঞানীকে প্রণাম করে নিঃশব্দে জেতবন ত্যাগ করলেন।
সময় এগিয়ে চলল। আরও কয়েকজন ব্যক্তি সাক্ষাৎ করতে এলেন তথাগতর সঙ্গে। বুদ্ধদেব তাঁদের কাউকে ধম্মতত্ত্ব বিবৃত করলেন, কাউকে সঠিক পথে চলবার পরামর্শ দিলেন।
এরপর সূর্য যখন মধ্যগগনে, ঠিক তখনই এক ব্যক্তি এসে উপস্থিত হলেন তথাগতর সামনে। তিনি তাঁকে প্রণাম জানিয়ে বললেন, ‘হে তাপস! লোকে বলে আপনি মহাজ্ঞানী। তাই আমি এক কৌতূহলের নিরসন করার জন্য আপনার কাছে এসেছি।’
আলোকময় জানতে চাইলেন, ‘কী কৌতূহল?’
সেই ব্যক্তি পূর্বের আগত ব্যক্তির ন্যায় প্রশ্ন করলেন, ‘ঈশ্বর আছে কি নেই?’
বুদ্ধদেব পূর্বের ন্যায় এই ব্যক্তিকেও বললেন, ‘আগে এ বিষয় সম্পর্কে তোমার মতামত শুনি, তারপর তোমার প্রশ্নের জবাব দেব।’
এ কথা শুনে সেই ব্যক্তি বেশ দৃঢ়ভাবে জবাব দিলেন, ‘আমি বহু দেবালয় পরিক্রমা করেছি। বহু যাগযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু কোথাও ঈশ্বরের সাক্ষাৎ পাইনি। আমার বিশ্বাস ঈশ্বর বলে কেউ নেই। সবটাই মানুষের অলীক কল্পনা।’
তথাগত জবাব দিলেন, ‘ঈশ্বর অবশ্যই আছেন। এ পৃথিবীতে তিনিই তো প্রধান সত্য। তুমি তাঁকে খোঁজার চেষ্টা করো।’ এ কথা শুনে শুধু সেই ব্যক্তিই নয়, তার থেকেও বেশি অবাক হলেন বুদ্ধভক্ত অনাথপিণ্ডক এবং ভিক্ষু আনন্দ। কারণ, কিছু সময় পূর্বেই মহাজ্ঞানী সম্পর্ণ বিপরীত কথা বলেছেন!
দ্বিতীয় ব্যক্তিও আর কোনও প্রশ্ন না করে জেতবন ত্যাগ করলেন।
তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে মহাজ্ঞানী এবার বৃক্ষতল ছেড়ে সংঘগৃহতে প্রবেশ করে, তণ্ডুল গ্রহণ করলেন। কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে যখন আবার সেই বৃক্ষতলে উপবিষ্ট হলেন, তখন বিকাল হয়ে এসেছে। আনন্দ, রবি এবং অনাথপিণ্ডকের সঙ্গে তিনি ধর্মীয় আলোচনা শুরু করলেন। তারপর সূর্য ডুবতে শুরু করল।
দিনান্তের শেষ আভা ছড়িয়ে পড়ল তথাগতর শরীরে। অনতিদূরে সংঘগৃহে প্রদীপ জ্বালাবার প্রস্তুতি শুরু হল। ঠিক সেই সময় এক ব্যক্তি এসে উপস্থিত হলেন মহাজ্ঞানীর কাছে।
নতমস্তকে তথাগতকে প্রণাম জানিয়ে তিনি বললেন, ‘মহাজ্ঞানী, আপনার নিকট আমি একটা প্রশ্ন নিয়ে এসেছি। বহু দিন ধরে সে প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে আমি বড় বিচলিত হয়ে আছি। সে প্রশ্ন হল, ঈশ্বর আছেন? নাকি তিনি নেই? আমি তাঁকে খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু পাচ্ছি না। আপনি আমার এই দ্বিধা দূর করুন।’
তথাগত কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইলেন সেই ব্যক্তির দিকে। তারপর কোনও কথা না বলে ধীরে ধীরে চক্ষু মুদলেন। সূর্য অস্ত গেল। সংঘগৃহ থেকে ভেসে আসতে লাগল প্রার্থনাসঙ্গীত। ধ্যানস্থ হলেন বুদ্ধদেব। আর নিজের প্রশ্নের জবাব না পেয়ে হতাশ হয়ে সেই ব্যক্তি ফিরে গেলেন।
৩
এক সময় মহাজ্ঞানীর ধ্যান ভঙ্গ হল। তখন আম্রকুঞ্জের মাথার ওপর চাঁদ উদিত হয়েছে। ঝোপঝাড়ের আড়ালে জোনাকি জ্বলছে। ইতিমধ্যে ভিক্ষু আনন্দ একখানা মৃৎপ্রদীপ জ্বালিয়ে এনেছেন। তার আলোকরশ্মি গিয়ে পড়েছে মহাজ্ঞানীর মুখমণ্ডলে। সেই স্নিগ্ধ-শান্ত মুখমণ্ডল থেকে যেন জ্ঞানের জ্যোতি বিচ্ছুরিত হচ্ছে।
করুণাঘন অক্ষিপল্লব উন্মোচিত করে তথাগত তাকালেন সামনে আসীন অনাথপিণ্ডক ও আনন্দর দিকে। অনাথপিণ্ডককে দেখে তিনি তাঁকে জিগ্যেস করলেন, ‘তুমি কি আমাকে কিছু বলতে চাও?’
অনাথপিণ্ডক করজোড়ে বললেন, ‘হ্যাঁ মহাজ্ঞানী। ঈশ্বর আছেন কি নেই—এ বিষয়ে আপনার পরস্পরবিরোধী বক্তব্য বুঝতে আমি অপারগ। আপনি এক ব্যক্তিকে বললেন, ঈশ্বর নেই! অপর ব্যক্তিকে বললেন, তিনি আছেন! দয়া করে এই বিপরীতধর্মী বক্তব্যের কারণ আমাকে বুঝিয়ে দিন।’
ভক্ত অনাথপিণ্ডকের কথা শুনে মহাজ্ঞানী মৃদু হাসলেন। তারপর বললেন, ‘প্রথম যে ব্যক্তি আমাকে ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিল, সে এই বিশ্বাস নিয়েই আমার নিকট এসেছিল যে ঈশ্বর আছেন। আমি যদি তার বিশ্বাসের স্বপক্ষে কথা বলতাম, তবে সে খুশি হতো ঠিকই! কিন্তু সে নিজে আর ঈশ্বরকে অন্বেষণ করত না। ঈশ্বরকে অন্বেষণ করা মানে তো নিজের অন্তরকে, পারিপার্শ্বিক সব কিছুকে উপলব্ধি করা।
‘ঈশ্বরকে মানা ও জানার মধ্যে পার্থক্য আছে। কোনও কিছুকে নিঃশর্তভাবে মেনে নেওয়ার অর্থ হল, মানসিক স্থবিরতার সৃষ্টি হওয়া। সে ব্যক্তি তখন আর কিছু খুঁজতে চেষ্টা করে না। তার জ্ঞানের বিস্তার ঘটে না।
‘আমি ওই ব্যক্তির মধ্যে জ্ঞান আহরণের প্রদীপ নির্বাপিত হতে দিতে চাইনি। তাই আমি তাকে বলেছি, ঈশ্বর নেই। আমি চেয়েছি যেন সে অন্বেষণের মাধ্যমে সত্যের নিকট পৌঁছাতে পারে।
‘দ্বিতীয় যে ব্যক্তি আমাকে একই প্রশ্ন করেছিল, তার দৃঢ় বিশ্বাস যেহেতু সে ঈশ্বরের দর্শন পায়নি, তাই ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই। আমি যদি তার কথা সমর্থন করতাম, তবে সেও আর ঈশ্বরের অন্বেষণ করত না। এটাও একটা বিপরীতধর্মী স্থবিরতা। যা আত্মানুসন্ধান ও জ্ঞান আহরণের পথকে স্তব্ধ করে দেয়। আমি ওই দ্বিতীয় ব্যক্তির ভাবনার বিপক্ষে কথা বলেছি যাতে তার মনের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়।
‘আর সেই দ্বন্দ্ব থেকেই সে অন্বেষণ করতে শুরু করবে। জ্ঞান আহরণ করে সত্যের নিকট পৌঁছাবার চেষ্টা করবে। আমি ওই ব্যক্তির মনের মধ্যে জ্ঞানের দীপশিখা জ্বালাবার চেষ্টা করেছি। তাই আমি তাঁকে বলেছি, ঈশ্বর নেই।’
ভিক্ষু আনন্দ বললেন, ‘হে মহাজাতক, প্রথম দুই ব্যক্তির ক্ষেত্রে আপনি বিপরীতধর্মী উত্তর দিয়েছেন, তা আমরা বুঝতে পারলাম। কিন্তু তৃতীয় ব্যক্তির প্রশ্নে আপনি নিরুত্তর রইলেন কেন?’
শাস্তা বললেন, ‘তৃতীয় যে ব্যক্তি আমার নিকট এসেছিল, সে ইতিমধ্যে দ্বন্দ্বের মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ, সে ঈশ্বরের অনুসন্ধানের জন্য যাত্রা শুরু করেছে। আমি যদি তাকে “হ্যাঁ” বা “না” এমন কোনও একটা উত্তর দিতাম, তবে সে হয়তো নির্দিষ্ট একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে আর ঈশ্বরকে খোঁজবার চেষ্টা করত না। তার জ্ঞানান্বেষণের পথ স্তব্ধ হয়ে যেত। সে আর সত্যের নিকট পৌঁছাতে পারত না।
‘আমি পর্থপ্রদর্শক। আমি চেষ্টা করি, মানুষের জ্ঞান আহরণের ইচ্ছা, সত্যের নিকট পৌঁছাবার প্রচেষ্টা যেন রহিত না হয়। তাই আমি তৃতীয় ব্যক্তির ক্ষেত্রে নিরুত্তর থেকেছি।’
তারপর একটু থেমে মহাজ্ঞানী হেসে বললেন, ‘ঈশ্বরকে মানা সহজ, কিন্তু জানা কঠিন। তাঁকে চোখে দেখা যায় না। যদি কেউ ঈশ্বর বলে নিজেকে দাবি করেন, যদি তাঁকে চন্দ্র-সূর্যের ন্যায় চোখে দেখা যায়, তবে তিনি ঈশ্বর নন। তাঁকে দেখা যায় না, তাঁকে অনুভব করতে হয়। ক্রমাগত পথচলার মাধ্যমে, জ্ঞান আহরণের মাধ্যমে সত্যের নিকট পৌঁছাতে হয়।’ এই বলে মহাজ্ঞানী বুদ্ধ আবার চক্ষু মুদে ধ্যানস্থ হলেন।
কয়েক দিনের মধ্যেই বর্ষা ঋতু শেষ হল। মহাজ্ঞানী আবার তাঁর শিষ্য ভিক্ষুদের নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন। অনাথপিণ্ডক তথাগতর নির্দেশমতো বৈশালী নগরীতেই রয়ে গেলেন মানবসেবার উদ্দেশে।
ব্যক্তিপূজার বিরোধী মহাজ্ঞানী চাইতেন না কেউ তার মূর্তি নির্মাণ করে তাঁকে দেবতারূপে আরাধনা করুক। তিনি চাইতেন, তাঁর আহরিত জ্ঞান ও সত্যকে মানুষ উপলব্ধি করুক। তাই তিনি শ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডককে তাঁর মূর্তি স্থাপনের অনুমতি দেননি।
কিন্তু ভিক্ষু আনন্দর পরামর্শ অনুযায়ী বুদ্ধ-অনুরাগী অনাথপিণ্ডক, বোধিবৃক্ষের একটি চারা এনে সেটিকে জ্ঞানের প্রতীক হিসাবে রোপণ করেছিলেন জেতবনে। তার দিকে চেয়ে অনাথপিণ্ডক বুদ্ধবাণী স্মরণ করতেন। আর প্রতীক্ষা করে থাকতেন, আবারও একটি বর্ষা ঋতুর আগমনের জন্য।
