তারা দেবী

তারা দেবী

তিনি বুদ্ধভক্ত। তবে তিনি সংঘরামে অবস্থানকারী কোনও সাধারণ ভিক্ষু নন। প্রকৃত অর্থেই তিনি অন্বেষণ করে চলেছেন বুদ্ধকে, তাঁর দর্শনকে। তথাগতর প্রতিটা চিহ্নকে স্পর্শ করতে চান তিনি। তাই তো তিনি তাঁকে খোঁজার জন্য তাঁরই মতো ঘর ছেড়েছেন। আর সত্যি কথা বলতে কী, তিনি ইতিমধ্যেই তথাগতর চেয়েও বেশি পথ পরিভ্রমণ করে ফেলেছেন—সেই মহামানব সম্পর্কে যেসব অজানা তথ্য আজও লুকিয়ে আছে নানা বৌদ্ধ পুঁথির গোপন পাতায়, তারই সন্ধানে।

হ্যাঁ, ইতিমধ্যে প্রায় দশ হাজার লি পথ অতিক্রম করে ফেলেছেন তিনি। উপস্থিত হয়েছেন একদা ষোড়শ মহাজনপদে—ভগবান বুদ্ধের কর্মভূমিতে। দেখার চেষ্টা করছেন নানা জনপদ-সংঘরাম, অমিতাভর স্মৃতিবিজরিত স্থানগুলি। আর তার খুঁটিনাটি তথ্য লিপিবদ্ধ করছেন কাগজে। সেইসঙ্গে সংগ্রহ করছেন বৌদ্ধশাস্ত্র সম্পর্কিত নানা প্রাচীন পুঁথি।

তাঁর এই যাত্রা বিবরণী আর সংগৃহীত পুঁথি একদিন সমকালীন ভারতভূমি সম্পর্কে চিনতে সাহায্য করবে ভবিষ্যতের মানুষকে। আরও গভীরভাবে জানাতে পারবে করুণাময়ের ভাবনা-দর্শনকে। বিশেষত তাঁর নিজের দেশের সঙ্গে আরও নিবিড় যোগসূত্র স্থাপিত হবে শাক্যমুনির ভাবনার।

যদিও গৌতম বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পর হাজার বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। সনাতন ধর্মের আবার পুনরুত্থান ঘটেছে, রাজা হর্ষবর্ধন ছাড়া তাঁর কর্মভূমিতে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী নৃপতি আর কেউ নেই, অশোকের মতো ‘ধম্ম’- প্রচারক সম্রাটও কেউ নেই। বৌদ্ধ ধর্মের লোকেরাও নানা মতে নিজেদের মধ্যে বিভক্ত। সনাতন দেব-দেবী-তন্ত্রের অনুপ্রবেশ ঘটেছে বৌদ্ধদের ধর্মভাবনাতে—

তবুও এই পরিক্রমণকারীর দৃঢ় বিশ্বাস একদিন ভগবান বুদ্ধের ভাবনাই আলোকবর্তিকা হয়ে পথ দেখাবে সারা পৃথিবীকে। তাই তো হাজার হাজার লি পথ পরিক্রমা করে চলেছেন এই চৈনিক ভিক্ষু।

বুদ্ধ সম্পর্কে জ্ঞান আহরণের জন্য এই কর্মভূমিতে প্রবেশ করা তাঁর পক্ষে সহজ ছিল না। পথও ছিল অত্যন্ত দুর্গম আর কঠিন! কারণ তাঁর নিজের দেশ চিন রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে চলেছে বেশ কয়েক বৎসরকাল ধরে। চিন সম্রাট তাঁর নাগরিকদের দেশত্যাগ করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তাই কয়েক বৎসরকাল আগে গোপনে দেশত্যাগ করেছেন এই বৌদ্ধ ভিক্ষু। জলপথে সম্ভব নয় বলে তাঁকে স্থলপথই বেছে নিতে হয়েছিল দেশ ছাড়ার জন্য। বড় দুর্গম সে পথ।

প্রথমে তাঁকে অতিক্রম করতে হয়েছে গোবি মরুভূমি, তারপর সেখান থেকে আবারও কখনও মরুভূমি, কখনও বা দুর্গম গিরিবর্ত্ম অতিক্রম করে উপস্থিত হন গান্ধার রাজ্য ও পুরুষপুরে। সে স্থান থেকে সোয়াত উপত্যকা অতিক্রম করে সিন্ধু নদ পেরিয়ে পৌঁছান তক্ষশীলাতে। সে স্থানের বৌদ্ধ মঠ পরিভ্রমণ করেন তিনি।

তারপর কুলু উপত্যকা পেরিয়ে মথুরা নগরী ও গঙ্গা অতিক্রম করে কনৌজে পৌঁছাবার পর কিছুটা স্বস্তিবোধ করেন তিনি। কনৌজের নৃপতি হর্ষবর্ধন জ্ঞান ও বৌদ্ধ ধর্ম—উভয়েরই পৃষ্ঠপোষক। তাই তিনি এই বৌদ্ধ ভিক্ষুকে অর্থ ও অন্যান্য সাহায্য দিতে কোনও কার্পণ্য করেননি। বরং এ কাজের জন্য তিনি মানসিকভাবে উৎসাহিত করেছেন।

অতঃপর ভিক্ষু গমন করেন বুদ্ধের জন্মস্থান লুম্বিনীতে। সেখান থেকে ফিরে দর্শন করেন কুশীনগর। যে স্থানে মহাপরিনির্বাণলাভ করেছিলেন মহাজ্ঞানী। তারপর তিনি যান কাশী রাজ্যের অন্তর্গত সেই মৃগদাবতে। যে স্থানে ‘ধম্মচক্রপ্রবর্তন’ করেছিলেন মহাজ্ঞানী বুদ্ধ।

তাঁর এই সুদীর্ঘ যাত্রাপথে নানান কিছু দেখেছেন এই বৌদ্ধ ভিক্ষু। মরুভূমির গায়ে, পাহাড়ের গায়ে দেখেছেন বিশালাকৃতি প্রাচীন বুদ্ধমূর্তি, দেখেছেন তক্ষশীলার প্রাচীন মঠগুলোতে রক্ষিত পুঁথির ভাণ্ডার। লুম্বিনী, কুশীনগর, বারাণসীর মৃগদাবতে দেখেছেন—বুদ্ধের স্মারক চিহ্ন, তাঁর উদ্দেশে নির্মিত স্তূপ-স্তম্ভ। বিভিন্ন মঠগুলোতে ঘুরে ঘুরে দেখেছেন, কীভাবে নানারূপে আরাধনা করা হচ্ছে বুদ্ধদেবকে।

চমকিত হয়েছেন রক্ষাকর্তারূপী অস্ত্রধারী বুদ্ধমূর্তি দেখে; এমনকী দেখেছেন, নারীরূপী তারা দেবীকে মহাযান ধর্মাবলম্বীদের এক মঠে বোধিসত্ত্বরূপে পূজিত হতে।

আর এই দর্শন আর জ্ঞানলাভের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন স্থান থেকে তিনি সংগ্রহ করেছেন, বৌদ্ধ ধর্মবিষয়ক বেশ কিছু অমূল্য পুঁথি। অতঃপর তাঁর বর্তমান যাত্রা নৈরঞ্জনা নদীতীরে যে অশ্বত্থবৃক্ষের তলে সিদ্ধার্থ মহাজ্ঞানলাভ করেছিলেন, সে স্থান দর্শন করে রাজগৃহ পৌঁছানো। এবং সর্বশেষে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে সে স্থানে শিক্ষাগ্রহণ। কারণ, বহু প্রাচীন পুঁথি রক্ষিত আছে সে স্থানে। যার সমতুল্য জ্ঞানভাণ্ডার এ পৃথিবীতে আর কোথাও নেই।

তাই এবার ভিক্ষু যাত্রারম্ভ করেছেন পূর্ব দিকে। এ পথ বড় সহজ নয়। কখনও তাঁকে এগোতে হচ্ছে বিপৎসংকুল অরণ্যসমৃদ্ধ দুর্গম পথ পদব্রজে অতিক্রম করে, আবার কখনও ঘূর্ণায়মান, তীব্রগতিতে প্রবাহমান জলপথে নৌকাযোগে।

চৈনিক ভিক্ষুর সঙ্গী বলতে পাঁচজন লোক মাত্র! স্থানীয় দু’জন বৌদ্ধ ভিক্ষু যাঁরা রাজগৃহর পথ চেনেন, যারা ইতিপূর্বে সে স্থানে গিয়েছিলেন, আর বাকি তিনজন ভৃত্য স্থানীয় লোক। যাঁরা পুঁথির পেটিকা বহন করে, রন্ধন ইত্যাদি কার্যে নিয়োজিত থাকে, প্রয়োজনে দোভাষীরও কাজ করে। তারাও এদেশেরই মানুষ।

২

গতকাল এক নদীতীরবর্তী জনপদে এসে পৌঁছেছেন পরিব্রাজক চৈনিক ভিক্ষু। রাত্রিবাস করার পর নদীর ঘাটে এসে পৌঁছালেন তিনি। ক্ষুদ্র তরঙ্গিণী। তবে এ নদীই অরণ্যের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মিলিত হয়েছে গঙ্গাতে। আর একবার গঙ্গা নদীতে পৌঁছাতে পারলেই জলপথে তাঁর গন্তব্যপথ অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে।

ইতিপূর্বে চৈনিক ভিক্ষুর যে দু’জন সঙ্গী এ পথে গিয়েছিলেন তাঁরা জানিয়েছেন যে ভোরবেলা এ নদীপথে রওনা হলে সূর্যাস্তের আগেই গঙ্গার ঘাটে পৌঁছানো যাবে। বড় ঘাট সেটি। সে স্থান থেকে নানা ধরনের দ্রুতগামী জলযান পাওয়া যাবে তাঁদের গন্তব্যে পৌঁছাবার জন্য।

তাঁদের পরামর্শমতোই ভোরবেলায় ছোট নদীর ঘাটে সঙ্গীদের নিয়ে এসে উপস্থিত হলেন চৈনিক ভিক্ষু। ঘাটে বেশ কিছু লোকজন আর কয়েকটা নৌকা বাঁধা আছে। তিনি এ স্থানে এসে উপস্থিত হতেই স্থানীয় লোকজন আর মাঝিরা কৌতূহলী হয়ে ঘিরে ধরল তাঁদের। পরিব্রাজকের পরনে স্থানীয় মানুষদের মতো পোশাক বা পাগড়ি নেই। তাঁর পরনে চৈনিক পোশাক, মুখমণ্ডলের গঠনও চিনাদের মতো। তাই তিনি স্থানীয় মানুষদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হলেন।

তাছাড়া আরও একটি ব্যাপার ছিল। পুঁথি বোঝাই চর্মবিষয় পেটিকাগুলোও তাঁদের কৌতূহলী দৃষ্টি আকর্ষণ করল। হয়তো তাদের মনে হল যে এই পেটিকার মধ্যে ধনরত্ন আছে। কারণ, তারা এসে চৈনিক ভিক্ষু আর তাঁর সঙ্গীদের বহন করে আনা পেটিকাগুলোর দিকে তাকাতে লাগল।

চৈনিক ভিক্ষু নৌকা ভাড়া করার জন্য তাঁর সঙ্গীদের মাধ্যমে মাঝিদের সঙ্গে বাক্যালাপ শুরু করলেন। ভিক্ষুর কথা শুনে কয়েকজন মাঝি জানাল, আজ রাতে অমাবস্যা, তাই তারা যাবে না। পরদিন যাত্রা করলে তারা নিয়ে যাবে। যাত্রাপথে অহেতুক সময় নষ্ট করতে রাজি নন চৈনিক ভিক্ষু। তাই তিনি বললেন, ‘অমাবস্যা তো কী হয়েছে? তোমরা তো আমাদের বিকালবেলায় গঙ্গার ঘাটে পৌঁছে দিতে পারবে। রাতটা না হয় সে স্থানে কাটিয়ে পরদিন এখানে ফিরে আসবে।’

তাঁর কথার জবাবে একজন মাঝি বলল, ‘আজ দেবী কালী মাতার পুজো আছে। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বেশ অনেকটা পথ যেতে হবে। আজ সে পথে না যাওয়াই ভালো।’

দেবীপুজোর সঙ্গে ওই নদীপথে না যাবার কী সম্পর্ক তা বুঝে উঠতে পারলেন না ভিক্ষু। তাই তিনি এর কারণ জানতে চাইলেন। কিন্তু তারা এ কথার কোনও জবাব দিল না। বেশ কিছুক্ষণ ধরে মাঝিদের তাঁদের পৌঁছে দেবার জন্য অনুরোধ করতে লাগলেন পরিব্রাজক। প্রাথমিক অবস্থায় কেউই রাজি হতে চাইল না। সেই একই কথা বলতে লাগল, আজ অমাবস্যা, আজ দেবী কালীর পুজো। আগামীকাল হলে নিয়ে যেতে পারি।

বেশ অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টার পর শেষ পর্যন্ত একজন বৃদ্ধ মাঝি আর তার সহকারীকে তিনগুণ ভাড়ার বিনিময়ে রাজি করিয়ে ফেলতে সমর্থ হলেন চৈনিক ভিক্ষু। পুঁথির পেটিকাগুলো ও অন্যান্য সামগ্রী আর সঙ্গীদের নিয়ে ভিক্ষু পরিব্রাজক উঠে বসলেন নৌকাতে। ঝলমল আলোকোজ্জ্বল পরিবেশে ছোট নদী বেয়ে যাত্রা শুরু করল নৌকা।

খানিকক্ষণ চারপাশের দৃশ্য উপভোগ করার পর বৌদ্ধ শ্রমণ নৌকার ছইয়ের ভিতর কাগজ-কলম নিয়ে বসলেন যাত্রাপথের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করার জন্য। যে পথ তিনি অতিক্রম করেন তার প্রতিটা খুঁটিনাটি বিষয়ই তিনি লিপিবদ্ধ করে রাখেন। ছইয়ের ভিতর থেকে বাইরের দিকে তাকিয়ে নতুন যা যা দেখছেন, তা লিখতে লাগলেন চৈনিক ভিক্ষু।

সময় এগিয়ে চলল। যাত্রাপথে মাঝে মাঝে কাছে দূরে ছোট ছোট জনবসতি চোখে পড়লেও ধীরে ধীরে এক সময় তা হারিয়ে গেল। নদীর দু’পাশে শুরু হল জনমানবহীন জঙ্গল। ক্রমশ গভীর হতে শুরু করল সেই অরণ্য। নদীর দু’পাশে উঁচু-নিচু ভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা সেই জঙ্গলের ভিতর থেকে কখনও বা কোনও ক্ষুদ্রকায় নদী এসে মিলেছে নৌকার যাত্রাপথে।

জঙ্গলের মধ্যে নদীর নানা বাঁক পেরিয়ে এগোতে লাগল নৌকা। সকাল যখন দুপুরে পৌঁছাল, তখন দু’পাশের জঙ্গল এত গভীর হয়ে এল যে, দু’পাড়ের পাঁচ হাত ভিতরে কী আছে তা দেখা যায় না। সামনে একটা বাঁক আসছে, যদি সেখানে কিছু দেখা যায়—এইভেবে ছইয়ের বাইরে এসে বসলেন চৈনিক ভিক্ষু। বাঁকের দিকে এগিয়ে চলল নৌকা।

চারপাশে কেমন যেন নিঝুম একটা পরিবেশ। অতি দ্রুত দাঁড় চালাচ্ছে মাঝি দু’জন। জায়গাটি তারা দ্রুত অতিক্রম করার চেষ্টা করছে। একসময় বাঁকের মুখে পৌঁছে গেল নৌকা। আর বাঁক ঘুরতেই কোথা থেকে যেন একটা জিনিস উড়ে এসে ঠক করে বিদ্ধ হল নৌকার গলুইতে। একটা তিরের ফলা! আর সেটা দেখা মাত্রই দাঁড় টানা থামিয়ে মাঝি দু’জন ঝাঁপ দিল জলে!

চৈনিক ভিক্ষু দেখতে পেলেন, পাড় লাগোয়া একটা জায়গা থেকে বেশ কয়েকটা দ্রুতগামী ছিপ নৌকো ছুটে আসছে তাঁদের দিকে। তাতে অস্ত্রধারী লোকজন রয়েছে। মাঝিরা নৌকা ছেড়ে জলে ঝাঁপ দেওয়াতে নৌকার গতি শ্লথ হয়ে গিয়েছিল। কাজেই তাঁদের নৌকাকে ধরতে কোনও সমস্যাই হল

না ছিপ নৌকাগুলোর। তারা চারপাশ দিয়ে ঘিরে ফেলল চৈনিক ভিক্ষুর নৌকাকে।

ছিপ নৌকার লোকগুলোর তৈলমর্দিত পেশিবহুল চেহারা। পরনে একটিমাত্র বস্ত্র মালকোঁচা দিয়ে পরা, ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত! কারও কপালে রক্ততিলক বা কারও কপালের কাছে লাল ফেট্টি দিয়ে চুল বাঁধা। হাতে খড়্গ, তির-ধনুক বা বর্শা।

ভিক্ষু চৈনিকের এ লোকগুলোর পরিচয় বুঝতে অসুবিধা হল না। এরা দস্যু-ডাকাত! কয়েকজন ডাকাত চৈনিক পরিব্রাজকের নৌকাতে উঠে পড়ল। কয়েকজন দস্যু অস্ত্র তাগ করে রইল ভিক্ষুদের উদ্দেশে। দু’জন ডাকাত বৈঠা হাতে নিয়ে অন্য নৌকাগুলোর ঘেরাটোপে পুঁথির পেটিকা সমেত নৌকাকে নিয়ে চলল পাড়ের দিকে।

পাড়ে পৌঁছে চৈনিক পরিব্রাজক আর তাঁর সঙ্গীদের নৌকা থেকে নামাল। ইতিমধ্যে আরও কয়েকজন দস্যু জঙ্গলের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে। তাঁদের মধ্যে একজন দলপতি। বিশালাকৃতি, কৃষ্ণবর্ণ চেহারা তার। রক্তাভ-হিংস্র চোখ। হাতে উদ্যত খড়্গ। সে তাকিয়ে আছে চৈনিক ভিক্ষুর দিকে। তিনি বুঝতে পারলেন এদের সঙ্গে বাক্‌বিতণ্ডায় গেলে প্রাণ সংশয়ের আশঙ্কা আছে। তাই তিনি তাঁর সঙ্গীদের নির্দেশ দিলেন যাঁর কাছে যা মুদ্রা আছে, তা দস্যুদের হাতে তুলে দেবার জন্য।

দস্যু দলপতি এবার পেটিকা খুলতে হুকুম দিল তার সঙ্গীদের। পেটিকা খুলে ধন-রত্ন-মুদ্রার পরিবর্তে প্রাচীন পুঁথিগুলো দেখে বেশ হতাশই হল তারা। চৈনিক সন্ন্যাসী ইতিপূর্বে একবার মরু দস্যুদের কবলে পড়েছিলেন গোবি মরুভূমিতে আর একবার লুম্বিনীর জঙ্গলে। উভয়ক্ষেত্রেই মূল্যবান সামগ্রী, মুদ্রা সে সকল ডাকাতদের হাতে তুলে দেবার পর তারা তাঁকে মুক্তি দিয়েছিল। এক্ষেত্রে সেই আশাই করেছিলেন পরিব্রাজক।

কিন্তু এবার তা হল না। পেটিকাতে ধন-রত্ন বা মুদ্রা না পাওয়ার পর দস্যু দলপতি চৈনিক শ্রমণের দিকে তাকিয়ে অন্য দস্যুদের উদ্দেশে দেশীয় ভাষায় কিছু কথা বলল। চৈনিক ভিক্ষু আর তাঁর সঙ্গীদের এরপর তারা বল্লমের খোঁচা দিতে দিতে নিয়ে চলল জঙ্গলের ভিতরে একটা শুঁড়ি পথ দিয়ে। জঙ্গলের ভিতর এক জায়গায় কিছুটা উন্মুক্ত স্থান রয়েছে। সেখানে পৌঁছে গাছের গুঁড়ির সঙ্গে বেঁধে ফেলা হল চৈনিক পরিব্রাজক আর তাঁর সঙ্গীদের।

কয়েকজন দস্যু তাঁদের পাহারায় বহাল রইল। দস্যু দলপতি বাকিদের নিয়ে এগোল অন্য দিকে। সেখানে গাছের আড়ালে একটা প্রাচীন মন্দির দেখা যাচ্ছে। দস্যুদল সেদিকে অন্তর্হিত হবার পর বহু পথ পেরিয়ে আসা চৈনিক ভিক্ষু তাঁর সঙ্গীদের প্রহরারত ডাকাতদের জিগ্যেস করতে বললেন, মুদ্রা, দামি জিনিস লুণ্ঠন করার পরও তাঁদের মুক্তি দেওয়া হচ্ছে না কেন?

চৈনিক পরিব্রাজকের এক সঙ্গী একজন দস্যুকে সে প্রশ্ন জিগ্যেস করায় সে চৈনিক সন্ন্যাসীকে দেখিয়ে বলল, ‘ওই ভিনদেশি লোকটাকে আমাদের চাই। আজকে কালী মায়ের পুজো আছে।’

চৈনিক পরিব্রাজক বললেন, ‘আমি তো বৌদ্ধ ভিক্ষু। আমি ভিন্ন ধর্মের পুজো উপাসনাতে কীভাবে কাজে লাগব?’

এ প্রশ্নের কোনও জবাব মিলল না। দস্যুরা হাসল শুধু। সময় এগিয়ে চলল। রজ্জু-আবদ্ধ অবস্থাতে বন্দী হয়ে রইলেন পরিব্রাজক আর তার সঙ্গীরা। সময় এগিয়ে চলল। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হল, তারপর সন্ধ্যা নামতে শুরু করল অচেনা নদীতীরের গহীন জঙ্গলে।

৩

ঘোর অমানিশি। চারপাশে এক বিন্দু আলো নেই। শুধু অন্ধকার নামার পর গাছের আড়ালে মন্দিরের দিকে কয়েকটা মশাল জ্বালানো হয়েছে। লোকজনের কণ্ঠস্বরও ভেসে আসতে শুরু করেছে সেদিক থেকে। সম্ভবত পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে সেখানে।

তবে চৈনিক পরিব্রাজক আর তাঁর সঙ্গীদের চারপাশে নিকষকালো অন্ধকার। কোনও এক অজানা আতঙ্কে নিস্তব্ধভাবে প্রহর গুনতে শুরু করল পরিব্রাজকের সঙ্গীরা। আর তিনি ভাবতে লাগলেন, দেবী কালীর পুজোতে তাঁর মতো ভিন্নধর্মী বৌদ্ধকে কোন কাজে লাগতে পারে?

রাত্রি যখন মধ্যযামে পৌঁছাল, তখন চর্মবাদ্য বাজতে শুরু করল মন্দিরের দিকে। আর তার খানিক পরই মশালের আলো এগিয়ে আসতে লাগল। একদল সঙ্গীকে নিয়ে বন্দীদের কাছে এসে উপস্থিত হল দস্যু দলপতি। মশালের আলোতে দস্যু দলপতি ও তার সঙ্গীদের চেহারা যেন আরও ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে। চৈনিক পরিব্রাজকের দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘তোমাকে এখন দেবীর কাছে নিয়ে যাব। তার আগে তোমার শেষ ইচ্ছা কী তা জানাও।’

বুদ্ধভক্ত চৈনিক এবার অনুমান করলেন, তাঁর জীবনে ভয়ঙ্কর কিছু ঘটতে চলেছে এবার। হয়তো তাঁর প্রাণ যেতে চলেছে। কিন্তু তাঁর প্রাণের চেয়েও সংগৃহীত প্রাচীন পুঁথিগুলো তাঁর কাছে অনেক বেশি দামি। রক্ষা করতে হবে পুঁথিগুলোকে। তাই তিনি জবাব দিলেন, ‘আমার সঙ্গে থাকা পুঁথিগুলো তোমাদের কোনও কাজে আসবে না। ওই পুঁথিগুলো সঙ্গে নিয়ে আমার সঙ্গীদের তোমরা চলে যেতে দাও। যাতে তারা সেগুলো রাজগৃহ—নালন্দায় গিয়ে রেখে আসতে পারে।’

নিজের মুক্তির বদলে, প্রাণভিক্ষা চাইবার বদলে এই ভিনদেশি বন্দীর মুখ থেকে এ কথা শুনে বড় বিস্মিত হল দস্যু সর্দার। সে বলল, ‘আচ্ছা তোমার শেষ ইচ্ছা পূরণ করা হবে। পুজো শেষ হলে তোমার সঙ্গীদের মুক্তি দেওয়া হবে।’

দস্যুরা এরপর চৈনিক পরিব্রাজকের বাঁধন খুলে দিল। একজন একটা কাঠের বালতিতে জল এনে ঢেলে দিল ভিক্ষুর দেহে। অপর এক দস্যু তাঁর গলায় একটা লাল ফুলের মালা পরিয়ে তাঁর হাত দুটো পিছন দিকে বেঁধে দিল। তারপর চৈনিক পরিব্রাজককে নিয়ে দস্যুরা এগোল মন্দিরের দিকে।

প্রাচীন মন্দিরপ্রাঙ্গণ মশালের আলোতে আলোকিত। আরও বেশ কিছু দস্যু উপস্থিত সেখানে। চর্মবাদ্য বাজানো হচ্ছে। বুদ্ধ উপাসককে এনে দাঁড় করানো হল গর্ভগৃহের দরজার কাছে। সেখানে মাটিতে পোঁতা আছে একটা যূপকাষ্ঠ বা হাড়িকাঠ। আর তার পাশেই খড়্গ হাতে দাঁড়িয়ে আছে এক ভীমাকৃতি দস্যু। সেই যূপকাষ্ঠ দেখে চৈনিক পরিব্রাজকের বুঝতে অসুবিধা হল না যে কী ঘটতে চলেছে। তিনি শুনেছেন, এ দেশে নাকি অনেক জায়গায় দেব-দেবীর উদ্দেশে নরবলি দেওয়া হয়। তিনি বুঝলেন, এখন বলি দেওয়া হবে তাঁকে।

বুদ্ধ-অনুরাগী পরিব্রাজক মৃত্যুভয়ে ততটা ভীত নন, যতটা তিনি চিন্তিত পুঁথিগুলোর সুরক্ষার বিষয় নিয়ে।

চর্মবাদ্য এবার দ্রুত লয়ে বাজতে শুরু করল। একজন দস্যু তাঁকে হাত ধরে টেনে এনে দাঁড় করাল ঠিক যূপকাষ্ঠের সামনে। মন্দিরের গর্ভগৃহের ভিতরটা এবার দৃশ্যমান হল ভিক্ষুর কাছে। ঘরের ভিতর একটা প্রদীপ জ্বলছে। ধুনো জ্বলছে। বেদির ওপর দাঁড়িয়ে আছেন কষ্টিপাথরের তৈরি এক দেবীমূর্তি। তাঁর কণ্ঠে নরমুণ্ডমালা। হাতে খড়্গ। মূর্তিটা দেখে চৈনিকের মনে হল, ঠিক এমন ধরনের মূর্তি যেন তিনি ইতিপূর্বে দেখেছেন।

ধুনোর ধোঁয়াতে মাঝে মাঝে ঢেকে যাচ্ছে দেবীমূর্তির শরীর, তারপর আবার তিনি আত্মপ্রকাশ করছেন। গর্ভগৃহের ভিতর কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পরই চৈনিকের কাঁধ ধরে তাঁকে হাঁটু মুড়িয়ে যূপকাষ্ঠের সামনে বসিয়ে দিল সেই দস্যু।

অন্তিম মুহূর্ত সমাগত বুঝতে পেরে পরিব্রাজক শেষ বারের মতো বলে উঠলেন, ‘বুদ্ধং শরনং গচ্ছামি।’

দস্যু এরপর চৈনিকের ঘাড় চেপে ধরে তাঁর মাথাটা হাড়িকাঠের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে গেল। খড়্গ হাতে আর এক দস্যু এগিয়ে এল তাঁর মুণ্ডচ্ছেদ করে দেবীর উদ্দেশে নিবেদন করবে বলে। ঠিক সেই মুহূর্তে পায়ের তলার মাটি হঠাৎ দুলতে শুরু করল। আচম্বিতে আশেপাশের বৃক্ষশাখায় যেন প্রচণ্ড ঝড় উঠল।

যে দস্যু চৈনিকের ঘাড় চেপে ধরে হাড়িকাঠের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে যাচ্ছিল, সে কম্পমান মেদিনীতে নিজের ভারসাম্য ধরে রাখতে না পেরে ছিটকে পড়ল এক পাশে। যার হাতে খড়্গ ধরা ছিল, বাতাসের দাপটে সেই ভারী খড়্গটা তার হাত থেকে খসে গিয়ে দূরে ছিটকে পড়ল। গর্ভগৃহ থেকে নির্গত ধোঁয়া বাতাসের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। উপস্থিত দস্যুদের মধ্যে তীব্র আতঙ্কিত কোলাহল শুরু হল। আর তারপরই এক প্রচণ্ড বাতাসের দাপটে সব মশালগুলো একসঙ্গে নিভে গেল।

নিগূঢ় অন্ধকার গ্রাস করল সে স্থানে। আর তারপরই চৈনিক ভিক্ষু পদশব্দ শুনে বুঝতে পারলেন, দস্যুরা আতঙ্কিতভাবে চিৎকার করতে করতে সে স্থান ত্যাগ করে পালাচ্ছে। উঠে দাঁড়ালেন পরিব্রাজক, তিনি বুঝতে পারলেন না তার কী করা উচিত!

বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলল প্রচণ্ড ঝড়। তারপর এক সময় হঠাৎই তা থেমে গেল। দস্যুদের পদশব্দ বা কণ্ঠস্বরও শোনা গেল না আর। তারা সকলে পালিয়েছে। এবার গর্ভগৃহের দিকে তাকালেন চৈনিক। ভিতরটা ধোঁয়াময় হয়ে থাকলেও বাইরে আর ধোঁয়া নির্গত হচ্ছে না।

হঠাৎই দেবীমূর্তির গা থেকে ধোঁয়ার আবরণ যেন সরে গেল, আর মুহূর্তর জন্য তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল এক অকল্পনীয় আশ্চর্য দৃশ্য—দেবী কালীর মূর্তি যে স্থানে দণ্ডায়মান ছিল সে স্থানে এখন রয়েছে ভগবান বুদ্ধের বরাভয়মূর্তি! শুধু মুহূর্তকাল সময়ের জন্যই এ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলেন বুদ্ধভক্ত। তারপর আবার ধোঁয়ার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল সেই বুদ্ধমূর্তি।

কখন কীভাবে যেন তাঁর হাতের বাঁধন খসে গেছে, তা জানা নেই পর্যটকের। হাত দুটো বুকের কাছে জড়ো করে, চোখ বন্ধ করে বুদ্ধনাম স্মরণ করতে করতে বুদ্ধভক্ত পরিব্রাজক ভাবতে লাগলেন, তিনি যা দেখলেন তা কি সত্যি? নাকি নিছক দৃষ্টিবিভ্রম মাত্র! এভাবেই বাকি রাত অতিবাহিত হয়ে গেল।

৪

এক সময় ভোরের আলো ফুটে উঠতে শুরু করল। পাখিদের কলতানে মুখোরিত হল চারিদিক। চোখ মেললেন চৈনিক পর্যটক। তার চারপাশে দস্যু দলের কোনও চিহ্ন নেই। শুধু গত রাতের চিহ্ন হিসাবে সামনে উপড়ে পড়ে আছে হাড়িকাঠ আর সেই দস্যুর হাত থেকে খসে পড়া খড়্গটা। গর্ভগৃহের ভিতর ধোঁয়াও আর নেই। ভোরের আলো প্রবেশ করেছে সেখানে। আর বেদির ওপর দাঁড়িয়ে আছে দেবী কালীর মূর্তি।

ভালো করে সে মূর্তিকে দেখার পর চৈনিক পরিব্রাজকের মনে পড়ে গেল, এমন মূর্তি তিনি ইতিপূর্বে কোথায় দেখেছেন। একবার তিনি এক পর্বতাঞ্চলের বৌদ্ধ মঠে গিয়েছিলেন। সে মঠের বৌদ্ধরা মহাযান বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের এক উপগোষ্ঠী, যাঁরা তন্ত্রাচার করেন। সেখানেই তিনি দেখেছিলেন এমন এক দেবীমূর্তি। সেই মঠের বৌদ্ধরা বলেছিলেন, ওই মূর্তি হল ‘তারা দেবী’-র। তারা দেবীকে বোধিসত্ত্বরূপে পুজো করেন তাঁরা।

বোধিসত্ত্বর নারীরূপ সেই মূর্তি। বুদ্ধভক্ত এবার বুঝতে পারলেন, যিনি দেবী কালী, তিনিই দেবী তারা। বৌদ্ধ তন্ত্রাচারীদের কাছে তিনিই আবার পূজিত হন বোধিসত্ত্বর নারীরূপ হিসাবে। পরিব্রাজকের এবার মনে হল, মুহূর্তের জন্য তিনি যে মূর্তি প্রত্যক্ষ করেছিলেন তা মিথ্যা নয়। দেবী কালীর উদ্দেশে প্রণাম জানিয়ে তিনি ফিরে চললেন তাঁর সঙ্গীদের কাছে।

যে বৃক্ষের সঙ্গে তাঁদের বেঁধে রাখা হয়েছিল, তারা সে স্থানেই অপেক্ষা করছিল। যে মাঝি দু’জন দস্যুদের ভয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পালিয়ে গিয়ে জঙ্গলের অন্য স্থানে আত্মগোপন করেছিল, তারা দস্যুদলকে পালিয়ে যেতে দেখে এ স্থানে উপস্থিত হয়ে বন্ধনমুক্ত করেছিল পরিব্রাজকের সঙ্গীদের।

চৈনিক ভিক্ষু জীবিত আছেন দেখে বড় বিস্মিত আর আনন্দিত হলেন তাঁর সঙ্গীরা। পুঁথির পেটিকাগুলো নৌকাতে তুলে নিয়ে পুনরায় যাত্রা শুরু করার পর পরিব্রাজকের একজন সঙ্গী তাঁকে জিগ্যেস করলেন, ‘আপনাকে তো দস্যুরা বলি দেবার জন্য নিয়ে গিয়েছিল। আপনার জীবনরক্ষা করল কে?’

চৈনিক পরিব্রাজক, বুদ্ধভক্ত হিউ-এন-সাং বুকের কাছে দু’হাত জড়ো করে জবাব দিলেন, ‘তারা দেবী—বোধিসত্ত্ব।’

লেখকের নিবেদন—পরিব্রাজক হিউ-এন-সাং তাঁর নিজের জবানিতেই তাঁর ডাকাতদের হাতে ধরা পড়া ও তাঁকে বলি দেবার সময় অলৌকিক উপায়ে মুক্তিলাভের কথা লিখে গেছেন। এ ব্যতীত জেমস ফোবস ও কিম ওয়াগানারের লেখাতেও এ ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। ত্রাণকর্ত্রীরূপে তারা দেবী পূজিত হন। পঞ্চম শতকে রচিত প্রাচীন বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ‘মঞ্জুশ্রীকল্প’-এ তারা দেবীকে বোধির দয়ার প্রতিমূর্তি হিসাবে দেখানো হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *