যশোধরা গাথা

যশোধরা গাথা

নীল নভোতলে পান্না সবুজ পাহাড়ের বেষ্টনী। আর তার মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে রোহিনী নদী। এ নদী দুই রাজ্যের সীমানা নির্ধারণ করে। এক পাশে কপিলাবস্তু আর অন্য পাশে কোলীয় রাজ্য। দুই রাজ্যের মধ্যে কপিলাবস্তু আকারে বৃহৎ তবে এই দুই জনপদের নৃপতিই ইক্ষাকু বংশের উত্তরসূরি এবং তাঁরা বৈবাহিক সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ।

রোহিনী নদীর অনতিদূরে এক মহাবৃক্ষতলে দাঁড়িয়ে ছিল দুই কিশোর-কিশোরী। চারপাশের পরিবেশ শান্ত-ছায়াময়। নদীর জলস্রোতের মৃদু তরঙ্গ

আর মাঝে মাঝে ভেসে আসা ময়ূরের ডাক ছাড়া আর কোথাও কোনও শব্দ নেই। হাতে হাত রেখে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল তারা। একজন রাজপুত্র, আর একজন রাজকন্যা। তারা দু’জনেই ষোড়শবর্ষীয়। ঘটনাচক্রে তাদের জন্মও একই দিনে ও একই তিথিতে—বৈশাখী পূর্ণিমাতে। সে অর্থে তারা এখনও যৌবনে পদার্পণ করেনি, তবে যৌবনের চিহ্ন ধীরে ধীরে পরিস্ফুট হচ্ছে তাদের শরীরে-মননে।

চন্দ্রবিম্বর মতো শান্ত-স্নিগ্ধ সৌন্দর্যমণ্ডিত মুখমণ্ডল ষোড়শী রাজকন্যার। তাই তার সখীরা তাকে বিম্বাসুন্দরী বলে ডাকে! আর তার সামনে যে কিশোর দাঁড়িয়ে আছে, তার কাঁধ পর্যন্ত নেমে এসেছে তরঙ্গায়িত কেশরাশি। কোমল সূর্যকিরণ এসে পড়েছে তার আননে। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছে আবছা হাসির রেখা। সে কপিলাবস্তুরাজ শুদ্ধোধন-পুত্র সিদ্ধার্থ।

খানিক আগেই তারা রোহিনী নদীর নির্জন তটে এই বৃক্ষতলে এসে মিলিত হয়েছে। কয়েক মুহূর্ত দু’জনে করযুগল স্পর্শ করে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকার পর রাজকুমার রাজকন্যাকে বললেন, ‘মনে পড়ে, এই বৃক্ষতলেই আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল? তুমি এ স্থানে সখীদের সঙ্গে এসেছিলে পুষ্পচয়নের জন্য। আর আমি এসেছিলাম হরিণ শাবক সংগ্রহ করতে। সেদিন আমি যখন মুগ্ধদৃষ্টিতে তোমার দিকে চেয়েছিলাম তখন সেই অন্যমনস্কতার সুযোগে হরিণ শিশুটি আমার কোল থেকে লাফিয়ে পড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। তাই দেখে হেসে উঠেছিল তোমার সখীরা। মনে পড়ে সেদিনের কথা?’

রাজকন্যা সলজ্জ হাসি হেসে উত্তর দিলেন, ‘সে কথা আমি ভুলি কেমন করে? আমিও তো অপলক চেয়েছিলাম আপনার চোখের দিকেই। সখীদের হাসি শুনে সম্বিৎ ফিরেছিল আমার।’

রাজপুত্র বললেন, ‘গণনা করে দেখলাম সেই ঘটনার এক বৎসরকাল পূর্ণ হল আজ।’

বিম্বাবতী বললেন, ‘হ্যাঁ, এক বৎসর অতিক্রান্ত হল। কিন্তু…।’ এই বলে হঠাৎ থেমে গেল সে।

‘কিন্তু কী রাজকুমারী?’ প্রশ্ন করলেন সিদ্ধার্থ।

একটু চুপ করে থেকে রাজকুমারী বললেন, ‘আমার আশঙ্কা, পিতা হয়তো আর কিছু দিনের মধ্যেই আমার নগরীর বাইরে আসা নিষিদ্ধ করে দেবেন। তখন আমাদের সাক্ষাৎ হবে কীভাবে?’

যুবরাজ জানতে চাইলেন, ‘এমন আশঙ্কার কারণ?’

রাজকুমারী উত্তর দিলেন, ‘আমি আর এখন নিতান্ত বালিকা নই। কন্যা বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব পিতাই তার নিরাপত্তাবিধান করতে চায়। আমার পিতাও তার ব্যতিক্রম নন। আর তাছাড়া শুনছি, আপনার জ্ঞাতি ভ্রাতা শাক্যবংশীয় দেবদত্তর সঙ্গে নাকি আমার বিবাহ প্রস্তাব আসতে চলেছে। হয়তো বা পিতা সে প্রস্তাবে সম্মতও হবেন।’

রাজকন্যার জবাব শুনে সিদ্ধার্থ বললেন, ‘কিন্তু তুমি তো পূর্বজন্মের কথা জানো, তা স্মরণ করতে পারো।’

রাজনন্দিনী বললেন, ‘হ্যাঁ, তা পারি। কিন্তু বিধাতা পুরুষ যদি তাঁর মত পরিবর্তন করেন? অথবা এমনও তো হতে পারে যে, পূর্বজন্মে আমাকে দেওয়া আপনার প্রতিশ্রুতি সত্যি হল ঠিকই, কিন্তু যখন হল তখন বার্ধক্য, জরা, ক্লান্তি গ্রাস করেছে আমাদের শরীর-মনকে? তখন সে বিবাহ কি মঙ্গলদায়ক হবে? নারী-জীবনের, মনের, শরীরের স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা কি পূর্ণ হবে তাতে? তাছাড়া দীর্ঘদিন আপনার অদর্শন, সঙ্গলাভ থেকে বঞ্চিত হওয়া—আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারব না।’

যুবরাজ খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, ‘তোমার অদর্শনে আমিও ব্যাকুল হয়ে উঠব প্রিয়া। আমি আজই প্রাসাদে ফিরে গিয়ে পিতাকে অনুরোধ করব, যাতে তিনি কোলীয়রাজের নিকট আমার সঙ্গে তোমার বিবাহের প্রস্তাব পাঠান।’

রাজকুমারী বললেন, ‘কিন্তু কপিলাবস্তুরাজ শুদ্ধোধন কি আপনার প্রস্তাবে সম্মত হবেন? তিনি তো ধনে-মানে, রাজ-ঐশ্বর্যে আমার পিতার তুলনায় অনেক বড়।’

সিদ্ধার্থ এ কথা শুনে তাকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘তাঁর অসম্মতির কোনও কারণ তো দেখছি না। তোমার মাতা কোলীয় রানি অমিতা তো তাঁরই ভগিনী। কোলীয় রাজপরিবারে কন্যা সম্প্রদান করেছেন তিনি। তাহলে কোলীয় রাজকন্যাকে পুত্রবধূরূপে গ্রহণ করতে তিনি আপত্তি করবেন কেন? সর্বোপরি কোলীয়বংশীয়া মাতা গৌতমীকেও তো তিনি নিজে গ্রহণ করেছেন।’ এ কথা বলার পর একটু থেমে যুবরাজ রাজকুমারীর দু’হাত ধরে বললেন, ‘তুমি নিশ্চিন্ত থাকো, শাক্যকুলপতি এ বিষয়ে নিশ্চয়ই রাজি হবেন। আমার কোনও ইচ্ছা কোনোদিন অপূর্ণ রাখেননি তিনি।’

যুবরাজের কথা শুনে কিছুটা আশ্বস্ত বোধ করলেন রাজকুমারী। তারপর একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘তাহলে আমিও আজ পিতার কাছে আমার মনোবাসনার কথা প্রকাশ করব।’

যুবরাজ সিদ্ধার্থ বললেন, ‘বেশ, তবে তাই করো। আমার পিতার প্রস্তাব বা দেবদত্তর প্রস্তাব—দুইই পৌঁছনোর পূর্বে আমাদের বিষয়টা কোলীয়রাজকে তোমার জানিয়ে রাখা প্রয়োজন।’

বিম্বাবতী বললেন, ‘হ্যাঁ, তাই হবে। যুবরাজ, এবার তবে আমায় বিদায় দিন। সহচরীরা আমার জন্য প্রতীক্ষা করছে। সূর্যদেব পশ্চিমে যাত্রা শুরু করেছেন। বিকাল হবার পূর্বেই আমাকে প্রাসাদে ফিরতে হবে। সন্ধ্যায় আমি পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করব।’

যুবরাজ মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন প্রেয়সীর কথায়। বিদায়ের প্রাকমুহূর্তে আলিঙ্গনবদ্ধ হলেন তাঁরা। রাজকন্যার ওষ্ঠাধরে নেমে এল ভালোবাসার নিবিড় চুম্বন। তারপর সেই বৃক্ষতল থেকে দু’জনে নিজ নিজ রাজ্যের দিকে এগিয়ে গেলেন।

নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই কোলীয় রাজপ্রাসাদে ফিরে এলেন রাজকুমারী। নিজ কক্ষে ফিরে গিয়ে তিনি দাঁড়ালেন উন্মুক্ত বাতায়নের সামনে। প্রাসাদের সর্বোচ্চ তলে বসবাস করেন কোলীয়রাজ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। আর নিম্নের তলগুলি ব্যবহৃত হয় রাজসভা ও অন্যান্য কাজে।

রাজকুমারীর কক্ষের বাতায়ন থেকে বহু যোজন দূর পর্যন্ত দৃষ্টিগোচর হয়। দেখা যায়, উচ্ছল রোহিনী নদী, তার ওপারের পাহাড়শ্রেণী, আর কপিলাবস্তু রাজ্য। যেখানে কিছুক্ষণ আগেই ফিরে গেছেন তাঁর প্রেমিক। রাজকুমার সিদ্ধার্থ। শুধু এজন্মে নয়, গতজন্ম থেকেই তাঁকে মন-প্রাণ সমর্পণ করেছেন কোলীয়রাজ সুপ্পবুদ্ধ-কন্যা যশোধরা।

এক সময় সূর্যদেব পাহাড়ের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে নিলেন। সিংহদুয়ারে বিষাণ বেজে উঠল। সেই ধ্বনি জানান দিল আজকের মতো রাজকার্য সমাপ্ত হয়েছে। কোলীয়রাজ সুপ্পবুদ্ধ এবার রাজসভা ত্যাগ করে প্রাসাদের উপরিতলে আসবেন।

পিতার সামনে গিয়ে দাঁড়াবার জন্য নিজের মনকে প্রস্তুত করতে শুরু করলেন যশোধরা। এরপরও বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হল। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামল। প্রাসাদসংলগ্ন মন্দিরে সন্ধ্যারতির ঘণ্টাধ্বনি বেজে উঠল। দাসীরা কক্ষে কক্ষে প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়ে গেল। প্রাসাদের প্রাকারে জ্বলে উঠল মশাল। শঙ্খনাদের মাধ্যমে সন্ধ্যারতি যখন শেষ হল তখন রাজকুমারী নিজ কক্ষ ত্যাগ করে রওনা হলেন পিতার কক্ষের উদ্দেশে।

নিজ কক্ষে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন কোলীয়রাজ সুপ্পবুদ্ধ। অন্য দিনের মতোই তিনি রাজবেশ, অলংকার, অস্ত্র পরিত্যাগ করে আরামদায়ক সুতিবস্ত্র পরিধান করে মখমলনির্মিত আসনে অর্ধশায়িত অবস্থায় ছিলেন। এসময় তিনি সুরা পান করে রাজকার্যের যাবতীয় ক্লান্তি দূর করেন। দাসীরা তাঁর জন্য স্ফটিকপাত্রে স্বর্ণমাধ্বী প্রস্তুত করছিল।

এ সময় সাধারণত কোলীয়রাজ নিজের সমস্ত চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু আজ রাজা সুপ্পবুদ্ধের মনে একটা চিন্তার উদয় হয়েছে। মন থেকে তিনি তা দূর করতে পারছেন না।

রোহিনী নদীর জল বণ্টনকে কেন্দ্র করে বেশ কিছুকাল ধরে কোলীয় ও কপিলাবস্তুর মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। উভয় দেশই চাইছে, রোহিনী নদী থেকে খাল খনন করে বেশি পরিমাণ জল চাষের কাজে ব্যবহার করতে। তাই সুপ্পবুদ্ধ আজ তাঁর এক গুপ্তচরকে নদীর সীমান্তে পাঠিয়েছিলেন, সে পর্যবেক্ষণ করার জন্য। গুপ্তচর ফিরে এসে তাঁকে সেই স্থানের অবস্থা বিবৃত করার সঙ্গে সঙ্গে অন্য একটি সংবাদও পরিবেশন করেছে। আর সেই সংবাদই উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে রাজা সুপ্পবুদ্ধের মনে।

সংবাদটি হল, রোহিনীতট পরিদর্শন করবার সময় সেই গুপ্তচর আড়াল থেকে দেখতে পেয়েছে, তটসংলগ্ন এক বৃক্ষতলে রাজকন্যা যশোধরা নিবিড়ভাবে বাক্যালাপ করছেন এক পুরুষের সঙ্গে। সেই পুরুষের পোশাক আর কোমরবন্ধনী দেখে তাকে কপিলাবস্তুবাসী বলেই মনে হয়েছে গুপ্তচরের।

এখন প্রশ্ন হল কে ওই পুরুষ? যার সঙ্গে নিভৃতস্থানে একাকী মিলিত হয়েছেন রাজকন্যা যশোধরা? আত্মজাকে বড় স্নেহ করেন সুপ্পবুদ্ধ। ওই পুরুষ কোনও দুষ্ট প্রকৃতির কেউ নয়তো? খবরটা শোনার পর থেকেই নিজ কন্যার নিরাপত্তার কথা ভেবে শঙ্কা জেগেছে তাঁর মনে। তাঁর কন্যা রূপসী, তদুপরি সে ক্রমশ যৌবনের দিকে ধাবিত হয়ে চলেছে। এই সময়কাল রাজকন্যার পক্ষে নিরাপদ নয়।

দাসীর দল মদিরাপাত্র, ফল, কুক্কুট মাংস ইত্যাদি খাদ্যদ্রব্য নিয়ে উপস্থিত হল রাজার সম্মুখে। মদিরাগ্রহণের পূর্বে সুপ্পবুদ্ধ ভেবে নিলেন, পরদিন প্রভাতে তিনি রাজকন্যাকে একান্তে ডেকে ওই পুরুষের পরিচয় ও তার সঙ্গে রাজকন্যার নিভৃৎ সাক্ষাতের কারণ জিগ্যেস করবেন। এসব ভাবনার মধ্যে দ্বারী এসে বার্তা দিল, রাজকুমারী যশোধরা তাঁর সাক্ষাৎপ্রার্থী। সাধারণত এই সন্ধ্যালগ্নে রাজার বিশ্রামকালে তাঁর সঙ্গে কেউ সাক্ষাৎ করতে আসেন না। তবে কেন যশোধরা এ সময় পিতার কক্ষে এলেন? যদিও মুহূর্তকাল আগে সুপ্পবুদ্ধ তাঁর কথাই ভাবছিলেন। এ কি তবে কোনও সমাপতন?

মদিরার স্ফটিকপাত্র আর মুখে তুললেন না কোলীয়রাজ। তিনি দ্বারীকে নির্দেশ দিলেন, যাতে রাজকন্যাকে অবিলম্বে এ কক্ষে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়। আর দাসীদের নির্দেশ দিলেন কক্ষের বাইরে যাওয়ার জন্য। কারণ তিনি এখন নিভৃতে বাক্যালাপ করতে চান তাঁর কন্যার সঙ্গে।

দাসীরা কক্ষত্যাগ করার পর সে কক্ষে প্রবেশ করলেন রাজকুমারী যশোধরা। পিতার আসনের সামনে উপস্থিত হয়ে প্রথমে তিনি নতজানু হয়ে প্রণাম করলেন পিতাকে। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।

তবে রাজকুমারী কিছু বলার আগেই কোলীয়রাজ বললেন, ‘তোমার প্রার্থনা শোনার পূর্বে আমার কিছু জিজ্ঞাস্য আছে। ভেবেছিলাম কাল প্রভাতে তোমাকে ডেকে পাঠাব। তবে তুমি যখন নিজেই উপস্থিত হলে তখন তোমাকে কয়েকটা প্রশ্ন করা দরকার।’ এ কথা বলার পর সুপ্পবুদ্ধ একটু থেমে নতশির রাজকন্যাকে প্রশ্ন করলেন, ‘আজ দ্বিপ্রহরে রোহিনী তীরবর্তী বৃক্ষতলে তুমি কি কোনও পুরুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলে?’

‘হ্যাঁ, পিতা।’ মাথা নত করেই উত্তর দিলেন যশোধরা।

‘কী তার পরিচয়?’ জানতে চাইলেন সুপ্পবুদ্ধ।

‘তিনি কপিলাবস্তুর রাজকুমার সিদ্ধার্থ।’ জবাব দিলেন রাজকন্যা।

যশোধরার কথা শুনে বিস্মিত হলেন কোলীয়রাজ। রোহিনী নদীর সীমানা অতিক্রম করে কেন এ রাজ্যে প্রবেশ করেছিল কপিলাবস্তুর রাজকুমার? সুপ্পবুদ্ধ পুনরায় কন্যাকে জিগ্যেস করলেন, ‘তার সঙ্গে তোমার সাক্ষাৎ কি আকস্মিক? নাকি পূর্বনির্ধারিত ছিল?’

যশোধরা তাঁর পিতাকে বললেন, ‘না, আকস্মিক নয়। গত এক বৎসরকাল ধরে আমরা ওই স্থানে মিলিত হই।’

কন্যার এ কথা শুনে কয়েক মুহূর্ত বাকরুদ্ধ হয়ে রইলেন কোলীয়রাজ। তারপর জানতে চাইলেন, ‘বৎসরকাল ধরে কপিলাবস্তুর রাজকুমারের সঙ্গে তোমার সাক্ষাতের কারণ?’

পিতার প্রশ্ন শুনে এবার যাবতীয় সংকোচ থেকে মুক্ত হয়ে যশোধরা বলেই ফেললেন, ‘পিতা, আমি ও রাজকুমার সিদ্ধার্থ ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি। তিনি আমাকে বিবাহ করতে চান, আর আমিও তাঁকে। কপিলাবস্তুরাজ শুদ্ধোধন শীঘ্রই এ প্রস্তাব প্রেরণ করবেন আপনার কাছে। আপনি অনুগ্রহ করে তাতে সম্মতি প্রদান করবেন। এ প্রার্থনা জানাবার জন্যই আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছি আমি।’

ষোড়শী রাজকন্যার বক্তব্য শুনে চমকে উঠলেন কোলীয়রাজ। আবারও ক্ষণিকের তরে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন তিনি। তারপর দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, ‘না, এ প্রস্তাবে আমি কিছুতেই সম্মতি প্রদান করতে পারব না। এ বিবাহ হতে পারে না।’

সুপ্পবুদ্ধ যশোধরার পিতা হলেও তিনি একজন রাজা। তাঁর মতের বিরুদ্ধে কেউ কোনওদিন প্রশ্ন করার ধৃষ্টতা দেখায় না। রাজকন্যাও ইতিপূর্বে তা করেননি কোনওদিন। কিন্তু প্রেমের এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে, নারী-পুরুষের প্রকৃত ভালোবাসা অনেক সময় অসম্ভবকেও সম্ভব করে তোলে। রাজকুমারী প্রকৃত অর্থেই ভালোবাসেন রাজকুমার সিদ্ধার্থকে। আর সে ভালোবাসাই যশোধরার মনে সাহস আর শক্তি সঞ্চয় করল।

এই প্রথমবার পিতার দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘এ বিবাহ হতে পারে না কেন পিতা? কপিলাবস্তুর রাজপরিবারের সঙ্গে তো আমরা বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ। উভয় পরিবারই ইক্ষাকু বংশের দু’টি শাখা। ইতিপূর্বে উভয় রাজপরিবারই একে অপরকে কন্যা সম্প্রদান করেছে। তবে এ ক্ষেত্রে আপনার অমতের কারণ কী?’

যশোধরার স্থানে অন্য কেউ হলে কোলীয়রাজ তাকে এই মুহূর্তেই কারাগারে নিক্ষেপের আদেশ দিতেন। কিন্তু নিজ কন্যাকে বড় ভালোবাসেন তিনি। তাই যশোধরার ধৃষ্টতা মার্জনা করে সুপ্পবুদ্ধ বললেন, ‘যুবরাজ সিদ্ধার্থ আর তোমার জন্ম একই দিনে, বৈশাখী পূর্ণিমাতে। তোমরা দু’জন সমবয়সি। কোলীয় ও কপিলাবস্তুর রাজপরিবারের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রচলন থাকলেও আমাদের ব্রাহ্মণসমাজে সমবয়স্ক রাজপুত্র-রাজকন্যাদের মধ্যে বিবাহের প্রচলন নেই। ক্ষাত্রধর্ম পালন করলেও আমরা দুই পরিবারই ব্রাহ্মণ বংশজাত।’

পিতার কথা শুনে বিদুষী ষোড়শী রাজকন্যা যশোধরা বলল, ‘আমাকে মার্জনা করবেন পিতা। সমবয়সি ব্রাহ্মণ রাজপুত্র-রাজকন্যার মধ্যে বিবাহ না হওয়া তো নিছক সামাজিক রীতি মাত্র। এ তো ধর্মের নির্দেশ নয়। আর সামাজিক নিয়ম-অনুশাসন তো রচনা করেন নৃপতিরাই! আপনি ইচ্ছা করলেই সে রীতির পরিবর্তন করতে পারেন। আপনি তো রাজা!’

কোলীয়রাজ সুপ্পবুদ্ধ তাঁর কন্যার যুক্তি অস্বীকার করতে না পেরে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি রাজা। আমি প্রচলিত রীতি পরিবর্তন করতে পারি ঠিকই, কিন্তু এক্ষেত্রে আমি তা করব না। কারণ পিতা হয়ে আমি আমার কন্যাকে অনিশ্চিত জীবনের পথে যেতে দিতে পারি না। তার বৈবাহিক জীবনের সুখ-শান্তি, সমৃদ্ধি যাতে অক্ষুণ্ণ থাকে, একজন পিতা হিসাবে তা নিশ্চিত করা আমার কর্তব্য।’

যশোধরা বললেন, ‘পিতা, কপিলাবস্তু আমাদের চারিপাশে অবস্থানকারী রাজ্যগুলির মধ্যে সর্ববৃহৎ রাজ্য। তাদের ধন-সম্পদ-সৈন্যদলও অন্য সকল শাক্যবংশীয় রাজ্যের তুলনায় অধিক। যুবরাজ সিদ্ধার্থ কপিলাবস্তুর সিংহাসনের উত্তরাধিকারী। তবে তাঁকে বিবাহ করলে আমার সুখ-শান্তির অভাব হবে কেন?’

কোলীয় নৃপতি এবার ভর্ৎসনার স্বরে যশোধরাকে বললেন, ‘অযথা তর্ক কোরো না। মাত্র ষোড়শ বৎসর বয়স তোমার, জগৎ সম্পর্কে হিতাহিত জ্ঞান হয়নি এখনও। আবেগতাড়িত হয়ে এমন কোনও কাজ করতে যেও না, যার জন্য ভবিষ্যতে তোমার জীবনে নিদারুণ কষ্ট নেমে আসে।’

পিতার মুখে প্রথমবার এমন রূঢ় ভাষণ শুনে জল নেমে এল যশোধরার দু’চোখে। আর তা লক্ষ্য করে কোলীয়রাজের মনও ব্যথিত হল। তিনি অনুভব করলেন, এ বিবাহে সম্মতিদান না করার পিছনে প্রকৃত কারণটা রাজকন্যাকে বুঝিয়ে বলা দরকার। তা জানলে যশোধরা নিশ্চয়ই তার ভাবনা থেকে সরে আসবে।

সুপুবুদ্ধ যশোধরার প্রতি স্নেহের সুরে বললেন, ‘শোনো যশোধরা, তোমাকে একটা ঘটনার কথা বলি। তা হলে হয়তো তুমি বুঝতে পারবে কেন আমি এ বিবাহে সম্মতি প্রদান করতে পারছি না। সে ঘটনা হল, কপিলাবস্তুর যুবরাজের জন্মের সপ্তম দিবসে তার মাতা মায়াদেবীর মৃত্যু হয়। আর তারপর রাজা শুদ্ধোধন লুম্বিনী নগরীতে আটজন ব্রাহ্মণকে আমন্ত্রণ জানান সদ্যোজাত পুত্রের ভবিষ্যৎগণনা ও নামকরণের জন্য। সেই পণ্ডিত, ভবিষ্যৎদ্রষ্টা ব্রাহ্মণরাই যুবরাজের নাম রেখেছিলেন সিদ্ধার্থ।

‘সেই ব্রাহ্মণদলের মধ্যে সর্বাপেক্ষা জ্ঞানী ছিলেন পর্বত দেশ থেকে আগত ব্রাহ্মণ আসিত। তিনি ব্রাহ্মণদলের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন। এবং অপরজন ছিলেন তাঁদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ কিন্তু সর্বশ্রেষ্ঠ ভবিষ্যদ্বক্তা। তাঁর নাম কৌণ্ডিন্য।

‘নবজাতকের ললাট পর্যবেক্ষণ করে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্রাহ্মণ অসিত বলেছিলেন, “এই শিশু ভবিষ্যতে রাজচক্রবর্তী অর্থাৎ সম্রাট হবেন অথবা সিদ্ধপুরুষ বা সন্ন্যাসী হবেন।” আর কৌণ্ডিন্য স্পষ্টই বলে দেন, “এই শিশু ভবিষ্যতে গৃহত্যাগী হবে এবং মহাজ্ঞান বা বুদ্ধত্ব লাভ করবেন।” ব্রাহ্মণ কৌণ্ডিন্যের ভবিষ্যদ্বাণী কোনওদিন মিথ্যা হয়নি। তুমি বলো, সিদ্ধার্থ একদিন গৃহত্যাগ করবে জেনেও কীভাবে তার হাতে আমি কন্যা সম্প্রদান করব?’

পিতার কথা শুনে যশোধরা বললেন, ‘এ কাহিনি আমি জানি পিতা। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি রাজকুমার সিদ্ধার্থকেই বিবাহ করতে চাই। আমার সঙ্গে যে তাঁর জন্ম-জন্মান্তরের সম্পর্ক! তাঁকে বিবাহ না করলে আমার এ জীবন ব্যর্থ হয়ে যাবে।’

যশোধরা এরপর আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু কোলীয়রাজ সুপ্পবুদ্ধ আর তাঁর ক্রোধ সংবরণ করতে পারলেন না। তিনি ক্রুদ্ধস্বরে চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘না, আমি এ বিবাহ কিছুতেই হতে দেব না! আজ থেকে তোমার প্রাসাদের বাইরে যাওয়া নিষেধ। শাক্য রাজকুমার দেবদত্ত তোমাকে বিবাহ করতে আগ্রহী বলে আমি জেনেছি। তাঁর সঙ্গেই আমি তোমার বিবাহ দেব। এ বিষয়ে আমি তোমার সঙ্গে আর কোনও বাক্যালাপ করব না।’

এ কথা বলার পর তিনি আবারও চিৎকার করে উঠলেন, ‘দাসী? দাসী? কে কোথায় আছিস? রাজকুমারীকে তার কক্ষে নিয়ে যা।’ রাজার আদেশ শুনেই দরজা খুলে প্রবেশ করল দুই দাসী।

২

আর সেই শব্দেই ঘুম ভেঙে গেল শয়নে থাকা রাজবধূ রাহুলমাতা যশোধরার। এতক্ষণ তবে তিনি স্বপ্ন দেখছিলেন! না, ঠিক স্বপ্ন নয়, বিংশতি বছর আগের এক সত্যি ঘটনাই তাঁর ঘুমের মধ্যে এসে ধরা দিয়েছিল। যেমন পূর্বজন্মের স্মৃতিও বিস্ময়করভাবে কখনও কখনও ধরা দেয় তাঁর মনে। তবে দ্বার খোলার শব্দটা মিথ্যা নয়। পাশ ফিরে তিনি দেখলেন, তাঁর সপ্তমবর্ষীয় বালকপুত্র রাহুলের হাত ধরে একজন দাসী প্রবেশ করল ঘরে।

পুত্রকে দেখে উঠে বসলেন রাহুলমাতা। দাসী রাহুলকে কক্ষে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে অন্তর্হিত হল। বালকপুত্র এসে উপবেশন করল মাতৃক্রোড়ে। যশোধরা তার মস্তকে চুম্বন করে জানতে চাইলেন, ‘তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে পুত্র?’

বালক জবাব দিল, ‘প্রাসাদকাননে হরিণ শাবকের সঙ্গে খেলা করছিলাম মাতা। হঠাৎ সে স্থানে তার মাতা-পিতা এসে উপস্থিত হতেই সেই হরিণ শাবক খেলা ত্যাগ করে তাদের সঙ্গে চলে গেল। আর তখনই আমার তোমার কথা মনে পড়ল। আমি চলে এলাম তোমার কাছে।’

এ কথা বলার পর রাহুল তার মাতার কণ্ঠদেশ আলিঙ্গন করে বলল, ‘হরিণশিশুর পিতা আছে, সবারই পিতা আছে, আমার কেন পিতা নেই? তিনি কোথায় আছেন মাতা?’

বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আজকাল রাহুল প্রায়শই এই প্রশ্ন করে তার মাতাকে।

প্রশ্ন শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে অন্যবারের মতোই যশোধরা জবাব দিলেন, ‘তিনি গঙ্গা তীরবর্তী এক দূরদেশে থাকেন। সে স্থানে তিনি এক বিশেষ কার্যে নিয়োজিত আছেন।’

‘কী কার্য? রাজকার্য?’

‘না, মানবসেবার কার্য।’ জবাব দিলেন যশোধরা।

‘সেই গঙ্গাদেশীয় রাজ্য কি এতদূর যে সেখান থেকে এ রাজ্যে আসা যায় না! তিনি কবে আসবেন এ স্থানে?’ জানতে চাইল রাহুল।

রাহুলের এই প্রশ্নের উত্তর জানা নেই যশোধরার। তিনি একটু চুপ করে থেকে জবাব দিলেন, ‘তোমার পিতা একজন ব্যস্ত মানুষ। গঙ্গা তীরবর্তী নানা স্থানে পরিক্রমণ করেন। বহু মানুষের সঙ্গে মিলিত হতে হয় তাঁকে।’

বালক বলে উঠল, ‘আমরাও তো মানুষ। তবে তিনি কেন মিলিত হন না আমাদের সঙ্গে? আমার যে বড় দেখতে ইচ্ছা করে তাঁকে।’

বালকপুত্রের পিতাকে দেখার ইচ্ছা হলেও, তার পিতা কেন একবারের জন্যেও পুত্রের সঙ্গে মিলিত হতে আসেননি তা কেমন করে এই শিশুপুত্রকে জানাবেন যশোধরা! তিনি চান রাহুলের তাঁর পিতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, ভালোবাসা অটুট থাকুক। যশোধরার নিজেরও কোনোদিন কোনও রাগ-অসম্মানের উদ্রেক ঘটেনি নিজের স্বামীর প্রতি। বরং যশোধরার মনে তাঁর জন্য অসীম শ্রদ্ধা বিরাজমান।

কারণ অপরিসীম কৃচ্ছ্রসাধন করে মানবকল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন রাহুলের পিতা। বহু মানুষ এই জাগতিক পৃথিবীর দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তিলাভের জন্য তাঁকে অনুসরণ করে চলেন। তিনি আজ শুধু কপিলাবস্তুর রাজকুমার নন, তিনি মহাজ্ঞানী, তিনি বুদ্ধ।

যশোধরা শুনেছেন কেউ কেউ তাঁকে ‘মহামানব’ নামেও সম্বোধন করে থাকেন। তবে গৃহত্যাগী স্বামীর প্রতি অসীম শ্রদ্ধা থাকলেও একটা জিনিস কিন্তু সত্যিই যশোধরার বুকে জমে আছে, তা হল অভিমান। যা তিনি কোনোদিন কারও কাছে প্রকাশ করেননি।

সরলমতি বালক, সহজভাবেই প্রশ্ন করেছে তার মাতাকে। কিন্তু সে প্রশ্নের জবাব দেওয়া বড় কঠিন তার মাতার পক্ষে, তাই পুত্রের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার জন্য তিনি অন্য প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বললেন, ‘তুমি গুরুর কাছে নিয়মিত পাঠাভ্যাস করতে যাও তো? তোমার সহপাঠীদের সঙ্গে মধুর আচরণ করো? তুমি শাক্য রাজবংশের সন্তান বলে কাউকে লঘু দৃষ্টিতে দ্যাখো না তো?’

বালক জবাব দিল, ‘না, মাতা, আমি কদাপি আমার সহপাঠীদের সঙ্গে বিরূপ আচরণ করি না। গুরুগৃহে আমি মন দিয়ে শাস্ত্রশিক্ষা করি। পাঠ সমাপ্ত হওয়ার পর আমার সহপাঠীদের সঙ্গে খেলা করি।’

এই বলে বালক রাহুল তাঁর সহপাঠীদের সঙ্গে ক্রিড়ার মাধ্যমে কীভাবে আনন্দ উপভোগ করে তা উৎসাহের সঙ্গে বিবৃত করে চলল। যশোধরা আনমনে শুনে যেতে লাগলেন পুত্রের কথা। আজকাল যশোধরার বড় চিন্তা হয় তাঁর পুত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে। রাহুলের পিতা কোনওদিন পুত্রের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে দেওয়ার জন্য কপিলাবস্তু ফিরে আসবেন কিনা জানা নেই।

একথা ঠিকই যে মহারাজা শুদ্ধোধন অপরিসীম স্নেহ যত্নে লালন করছেন তার পৌত্রকে। পিতামহ যতদিন জীবিত আছেন, ততদিন রাহুলের চিন্তার কোনও কারণ নেই। কিন্তু তিনি এখন বৃদ্ধ হচ্ছেন। প্রকৃতির নিয়মেই একদিন তাঁকে এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। কিন্তু তারপর কী হবে পিতাহীন, পিতামহহীন রাহুলের! হয়তো তখন কপিলাবস্তুর রাজসিংহাসনে নতুন কেউ অধিষ্ঠান করবেন। তিনি কি রাজা শুদ্ধোধনের মতো রাহুলের প্রতি সদয় থাকবেন? রাহুল কি পাবে নিজের প্রাপ্য অধিকার?

এমনও তো হতে পারে, নবনির্বাচিত রাজা রাহুলকে তার প্রাপ্য সম্মানের অধিকার থেকে, সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করবে! তখন কী হবে? এ ছাড়াও একটা বড় আশঙ্কার বিষয় আছে। অন্য কোনও রাজবংশধর যাতে ভবিষ্যতে রাজসিংহাসনের দাবি করতে না পারে, তার জন্য অনেক সময় রাজারা সেই রাজার বংশধরকে গুপ্তহত্যা করিয়ে থাকেন। রাহুল যদি তেমন কোনও প্রকার ষড়যন্ত্রের শিকার হয়? এ ভাবনা মনে এলেই বুকটা কেঁপে ওঠে রাহুল মাতা যশোধরার।

হ্যাঁ, কোলীয়রাজ সুপ্পবুদ্ধ এখনও জীবিত। যে স্বপ্ন খানিক আগে যশোধরা দেখছিলেন তা সত্য হলেও শেষ পর্যন্ত একপ্রকার বাধ্য হয়েই কোলীয় নৃপতি কন্যা সম্প্রদান করেছিলেন কপিলাবস্তুতে। যদিও জামাতার গৃহত্যাগের কারণে তিনি অত্যাধিক ক্রুদ্ধ! বুদ্ধকে তিনি জ্ঞানী বলে স্বীকারও করেন না। এমনকী কোলীয় রাজ্যে মহাজ্ঞানী প্রবর্তিত ‘ধম্ম’ পালনও নিষিদ্ধ।

তবে সুপ্পবুদ্ধ তাঁর কন্যা ও দৌহিত্রের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল। কন্যা যশোধরা একদা তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করলেও, জামাতার প্রতি তাঁর বিদ্বেষ থাকলেও কোলীয়রাজ ক্ষমা করে দিয়েছেন তাঁর কন্যাকে। তিনি কন্যা যশোধরা ও দৌহিত্র রাহুলের মঙ্গলকামনার জন্য সর্বদা ভাবিত হন। তাই তিনি একাধিকবার যশোধরাকে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন, রাহুলকে নিয়ে কোলীয় রাজ্যে ফিরে যাওয়ার জন্য।

কিন্তু সে প্রস্তাবে সম্মত হতে পারেননি রাজবধূ রাহুলমাতা যশোধরা। এ প্রস্তাবে অসম্মত হওয়ার তিনটে কারণ আছে। প্রথমত, যশোধরা যদি বর্তমানে রাহুলকে নিয়ে কোলীয় রাজ্যে ফিরে যান তবে এটাই প্রমাণিত হবে যে ষোড়শী যশোধরা সেদিন তার পিতার অমতে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল তা সবৈর্ব ভুল ছিল। আর তার পিতাই সঠিক ছিলেন। কোলীয়বাসীদের কাছে বা অন্য কারও কাছে এ বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হোক তা চান না যশোধরা।

কারণ, যশোধরা আজও মনে করেন না, সেদিন সিদ্ধার্থকে বিবাহ করা তাঁর ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। তিনি তো নিজের পূর্বজীবনের কথা জানতেন। এও জানতেন তাঁর স্বামী সংসারত্যাগী হবেন। স্বামীর সন্ন্যাসগ্রহণ নিয়ে কোনোদিন কোনও অভিযোগ করেননি তিনি, বরং স্বামীর পদাঙ্ক অনুসরণ করতে চেয়েছেন। তবে স্বামীর প্রতি অভিমান আছে যশোধরার। যাওয়ার পূর্বে যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়ে গিয়েছিলেন তা পালন করলেন না কেন? এইটুকুই শুধু তাঁর প্রতি অনুযোগ।

দ্বিতীয়ত, কোলীয়রাজ সুপ্পবুদ্ধ যশোধরার স্বামীর প্রতি, রাহুলের পিতার প্রতি প্রভূত ঘৃণা পোষণ করেন। যে দেশের রাজা তার পিতার প্রতি ঘৃণা পোষণ করেন সে দেশে গিয়ে কীভাবে মাথা উঁচু করে বড় হবে রাহুল? অর্থ, নিরাপত্তার পাশাপাশি ভবিষ্যতে কোলীয় দেশের সিংহাসনেও হয়তো বা আরোহণ করবে রাহুল। কিন্তু মানুষ কি তাকে শ্রদ্ধা করবে, সম্মান করবে? একদিন গ্লানিতে আচ্ছন্ন হবে না তো রাহুলের মন? সে অভিযোগ জানাবে না তো তার মাতার প্রতি?

এ প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ার প্রধান কারণ হল, কোনও কোনও সময় তাঁর মনে হয় যে কখনও হয়তো মহাজ্ঞানী কপিলাবস্তুতে ফিরে আসতে পারেন। সন্ন্যাসধর্ম ত্যাগ না করলেও তিনি হয়তো কপিলাবস্তুকেই তাঁর ‘ধম্ম’ প্রচারের কেন্দ্রস্থল হিসাবে বেছে নিলেন! তখন কী হবে!

যশোধরা যদি একবার রোহিনী নদী অতিক্রম করে পুত্রকে নিয়ে ফিরে যান তবে কোলীয়রাজ যতদিন জীবিত আছেন ততদিন তিনি তাঁর কন্যা আর দৌহিত্রকে কোনওভাবেই কপিলাবস্তুতে ফিরতে দেবেন না। আর মহাজ্ঞানীকেও তাঁর রাজ্যে প্রবেশ করতে দেবেন না।

কপিলাবস্তুরাজ শুদ্ধোধন বয়সের ভারে অশক্ত হয়ে পড়ছেন। তিনি আর যুদ্ধে অবর্তীণ হতে পারবেন না। আর মহাজ্ঞানী এই জীবনে একবারই মাত্র অস্ত্রধারণ করেছিলেন। তিনি তখন যুবরাজ সিদ্ধার্থ ছিলেন। বুদ্ধ হবার পর তিনি অস্ত্রধারণের, হিংসার বিপক্ষে তাঁর ধম্মমত প্রচার করেন। তাই তিনি আর কোনওদিন অস্ত্রধারণ করবেন না। তিনি উদ্ধার করতে পারবেন না তাঁর স্ত্রী-পুত্রকে।

যশোধরা জানেন তথাগত আজ সর্বস্থানে মহাজ্ঞানী বুদ্ধরূপে পরিচিত হলেও তিনি যশোধরার স্বামী, রাহুলের পিতা, ষোড়শী বিম্বাবতীর ভালোবাসা। যে ভালোবাসা আজও যশোধরাকে তাঁর পিতার প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করার শক্তি জোগায়।

বালক রাহুল তখনও বলে চলেছে তার সহপাঠীদের কথা। এক সময় কক্ষের আলো কমে এল। বাইরে সূর্য ডুবে গিয়ে সন্ধ্যা নেমে গেল। দুইজন দাসী প্রবেশ করল কক্ষে। একজন রাহুলকে নিয়ে যাওয়ার জন্য, তার সান্ধ্য পাঠগ্রহণের সময় হয়ে এসেছে।

আর দ্বিতীয় দাসী প্রবেশ করল প্রদীপ প্রজ্বলনের জন্য। রাজপরিবারের বধূ যশোধরার এ কক্ষে কোনও আসবাব বা বাহুল্যের চিহ্নমাত্র নেই। শূন্য কক্ষ। শুধু আছে ঘরের কোণে মৃত্তিকানির্মিত একটা জলের কলস, খাদ্যগ্রহণের জন্য একটা মাটির পাত্র আর প্রদীপদণ্ডের ওপর রাখা মৃৎপ্রদীপ।

যশোধরা পুত্রের ওষ্ঠ চুম্বন করে তাকে দাসীর হাতে সমর্পণ করলেন। দাসী রাহুলকে নিয়ে কক্ষ থেকে অন্তর্হিত হল। দ্বিতীয় দাসী চকমকি পাথর দিয়ে প্রদীপ প্রজ্বলন করবার পর প্রতিদিনের মতোই জানতে চাইল, ‘মাতা, আপনার জন্য আহার আনব কি?’

যশোধরার ধারণা কপিলাবস্তুরাজ শুদ্ধোধনের নির্দেশেই দাসী প্রতি সন্ধ্যায় এই প্রশ্ন করে যশোধরাকে। আসলে শুদ্ধোধন অতীব স্নেহ করেন তাঁর পুত্রবধূকে। তিনি চান, তাঁর কন্যাসমা যশোধরা অন্য সকলের মতো অন্তত দু’বেলা আহারটুকু করুক। এ অনুরোধ তিনি নিজেও জানিয়েছিলেন তাঁর পুত্রবধূকে।

কিন্তু যশোধরা রাজি হননি। তিনি তাঁর পরিব্রজক স্বামীর মতোই একবেলা শুধু তণ্ডুলসিদ্ধ গ্রহণ করেন। তাই দাসীর প্রশ্নের উত্তরে প্রতি সন্ধ্যার মতোই যশোধরা একই জবাব দিলেন, ‘না, আমার খাদ্যের প্রয়োজন নেই।’

জবাব শুনে দাসী কক্ষত্যাগ করল।

৩

বাইরে অন্ধকার নেমেছে। নিরাভরণ কক্ষে সেই কাষায়বস্ত্র পরিহিত যশোধরা ভূমিতে বসে প্রজ্বলিত প্রদীপশিখার দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলেন সেই মহাজ্ঞানীর কথা—তিনি এখন কী করছেন? তিনি কি সারাদিন পরিক্রমণ, মাধুকরী সারার পর সংঘগৃহের এমনই নিরাভবণ কোনও কক্ষে মৃত্তিকা আসনে বসে প্রদীপের আলোতে তাঁর শিষ্যদের ধম্মপাঠ শোনাচ্ছেন? শোনাচ্ছেন অহিংসার কথা? ভালোবাসা দিয়ে পৃথিবীকে জয় করার কথা? জাগতিক দুঃখ-কষ্ট থেকে মানুষের মুক্তিলাভের কথা?

যশোধরা এবার ভাবতে লাগলেন তাঁর স্বামী গৌতমের কথা—ষোলো বছর বয়সে কপিলাবস্তুর যুবরাজের সঙ্গে বিবাহ হয় তাঁর। আর তিনি গৃহত্যাগ করেন উনত্রিশ বছর বয়সে। শেষের কয়েকটি মাস যখন যশোধরা গর্ভবতী আর যুবরাজের মনেও তখন বৈরাগ্য দেখা দিতে শুরু করেছে, সে ক’টি মাস বাদ দিলে মধ্যবর্তী তেরো বছরের দাম্পত্য জীবন কী মহাসুখেই না কাটিয়েছেন যশোধরা! সেসময় যশোধরার কোনও ইচ্ছাই অপূর্ণ রাখেননি যুবরাজ সিদ্ধার্থ।

তিনি তখন মহাজ্ঞানী বুদ্ধ ছিলেন না, ছিলেন কপিলাবস্তুর যুবরাজ। দেহ-মনে জাগতিক চাহিদাসম্পন্ন এক পুরুষ। যাঁর স্ত্রীর প্রতি, নারীর প্রতি, তার শরীরের প্রতি আকর্ষণ ছিল অন্য সাধারণ পুরুষদের মতোই। না, রাহুলের জন্ম কোনও দৈব ঘটনার ফলে হয়নি। হয়েছে সিদ্ধার্থ আর যশোধরার

প্রগাঢ় ভালোবাসার ফলে, তাঁদের শারীরিক মিলনের ফলে। ঠিক যেভাবে এ পৃথিবীতে প্রতিটি শিশুর জন্ম হয়, ঠিক সেভাবেই জন্ম নিয়েছিল তাঁদের পুত্র রাহুল।

একটু পরে বাইরে চাঁদ উঠবে। সেসময় যখন চাঁদ উঠত তখন সিদ্ধার্থ তাঁর প্রিয়তমা পত্নীকে নিয়ে উপস্থিত হতেন প্রাসাদসংলগ্ন বাগিচায়। সে স্থানে মর্মর নির্মিত একটা ছত্রি আছে। তার তলায় গিয়ে বসতেন দু’জনে। ফুলের সুগন্ধ ভেসে আসত বাগানের চারপাশ থেকে। চাঁদের নরম আলো ছড়িয়ে পড়ত সমগ্র কাননে। ছত্রতলে বসে আলিঙ্গনবদ্ধভাবে কত কথা বলতেন তাঁরা! তারপর রাত এক সময় গভীর হয়ে আসত। নিস্তব্ধ হয়ে যেত সমগ্র রাজপ্রাসাদ। নিভু নিভু হয়ে আসত প্রাসাদ প্রাকারের আলোগুলো। আর যুবরাজের ওষ্ঠ তখন নেমে আসত যশোধরার শশিকলার ন্যায় মুখমণ্ডলে। কী মধুর ছিল সেই রাত! এখন সেসব যশোধরার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হয়!

ভাবছিলেন যশোধরা। কখনও মহাজ্ঞানীর বুদ্ধের কথা, কখনও তাঁর স্বামী সিদ্ধার্থর কথা। দ্বার খোলার শব্দে চিন্তাজাল ছিন্ন হল তাঁর। মাতা গৌতমী প্রবেশ করলেন পুত্রবধূর কক্ষে। সিদ্ধার্থর জন্মের সপ্তম দিবসে তাঁর গর্ভধারিণী মায়াদেবীর মৃত্যু হয়। তারপর সেই শিশুপুত্রকে বুকে তুলে নিয়েছিলেন মাতা গৌতমী। নিজের স্তন্য পান করিয়ে শুধু সিদ্ধার্থকে বড় করে তোলাই নয়, নানান বিপদ থেকে তিনি বুক দিয়ে আগলেছেন যুবরাজ সিদ্ধার্থকে।

আজকে যিনি মহাজ্ঞানী বুদ্ধ, তাঁর জীবনে যাঁর অবদান সব চাইতে বেশি—তিনি হলেন মাতা গৌতমী। কিন্তু তিনিও ধরে রাখতে পারেননি তথাগতকে। তড়িৎশিখাকে কি আর মুঠোবন্দি করে রাখা যায়?

মাতা গৌতমীকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে প্রণাম জানালেন যশোধরা। রাজমাতা আশীর্বাদের ভঙ্গিতে তাঁর দক্ষিণ হস্ত মৃদু উত্থিত করলেন। তারপর জানতে চাইলেন, ‘কেমন আছ তুমি?’

যশোধরা জবাব দিলেন, ‘মহাজ্ঞানী আমাকে যেমন রাখতে চেয়েছেন তেমনই।’

মাতা বললেন, ‘তোমার মনের বেদনা-যন্ত্রণা আমি অনুভব করতে পারি।’

যশোধরা বললেন, ‘না মাতা, কোনও যন্ত্রণা নেই। তা থাকলে আমি কি স্বেচ্ছায় তাঁর পথকে অনুসরণের চেষ্টা করতাম? আপনি জানেন, যেদিন আমি প্রথম শুনলাম তিনি সমস্ত অলংকার ত্যাগ করে কাষায়বস্ত্র পরিধান করেছেন, সেদিন থেকেই আমিও সব অলংকার ত্যাগ করে একই বস্ত্র গ্রহণ করেছি।

‘যেদিন আমি জেনেছি তিনি মস্তক মুণ্ডন করেছেন, ভূমিতে শয্যা গ্রহণ করেন, ভিক্ষালব্ধ তণ্ডুলে একবেলা আহার গ্রহণ করেন সেদিন থেকে আমি সে কাজই করে চলেছি। মহারাজ শুদ্ধোধন এবং আপনি আমার স্বাস্থ্যের বিষয়ে শঙ্কিত হয়ে এসব থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করলেও আমি আমার ভাবনা থেকে বিচ্যুত হইনি।’

যশোধরা মুখে যাই বলুন না কেন, তাঁর মনের ভিতর যে একটা নিদারুণ যন্ত্রণা লুকিয়ে আছে তা জানেন মাতা গৌতমী। কারণ তিনি মাতা, তিনি নারী। পুত্রের অদর্শন মাতা গৌতমীর মনকেও ব্যথিত করে। যশোধরার মতো কৃচ্ছ্রসাধন না করলেও সিদ্ধার্থর গৃহত্যাগ করবার পর থেকে মাতা গৌতমী যাবতীয় রাজসুখ পরিত্যাগ করে অতি সাধারণ জীবনযাপন করেন।

মাতা এরপর বললেন, ‘তোমাকে একটা সংবাদ জানাতে এলাম।’

‘কী সংবাদ মাতা?’ প্রশ্ন করলেন যশোধরা।

মাতা গৌতমী বললেন, ‘মহাজ্ঞানী পথপরিক্রমা করতে করতে বর্তমানে বৈশালী নগরীতে এসে উপস্থিত হয়েছেন, সে স্থানে তাঁর কিছু ভক্তবৃন্দকে প্রব্রজ্যা দান করবেন বলে। এ সংবাদ এক শ্রেষ্ঠীর কাছে জ্ঞাত হওয়ার পর মহারাজ শুদ্ধোধন মহাজ্ঞানীর নিকট তাঁর বাল্যবন্ধু কলুদায়ীকে পাঠিয়েছেন, অন্তত একবারের জন্যে যাতে তিনি কপিলাবস্তুতে ফিরে আসেন সে অনুরোধ জানাবার জন্য। কলুদায়ী তাঁকে জানাবেন তাঁর অদর্শনে আমাদের বেদনার কথা। এও জানাবেন, আমরা তাঁর প্রবর্তিত “ধম্ম” অনুসরণ করতে চাই।’

মাতা গৌতমীর কাছে এ সংবাদ পেয়ে বহুদিন পর কয়েক মুহূর্তের জন্য উজ্জ্বল হয়ে উঠল যশোধরার মুখমণ্ডল। তারপরই এক আশঙ্কা দানা বাঁধল তাঁর মনে। সিদ্ধার্থর গৃহত্যাগের পর পুত্রের অন্তর্ধানে কাতর মহারাজ শুদ্ধোধন চতুর্দিকে লোক পাঠিয়েছিলেন পুত্রকে অনুসন্ধান করে ফিরিয়ে আনার জন্য।

শেষ পর্যন্ত বৎসরকাল অতিবাহিত হওয়ার পর তাঁর সন্ধান মেলে বারাণসী নগরীর নিকটে মৃগদাবতে। উরুবিলাতে বোধিলাভের পর সে স্থানে গিয়ে মহাজ্ঞানী প্রথম সংঘের অধিবেশন করেন ও তাঁর আদি পাঁচ শিষ্য কৌণ্ডিন্য, অসাজি, ভদ্দীয়, ভাপ্পা ও মহানামাকে প্রথম ধর্মশিক্ষা দিয়েছিলেন বা ‘ধম্মচক্রপ্রবর্তন’ করেছিলেন।

মৃগদাবতে পুত্রের সন্ধান পেয়ে রাজা শুদ্ধোধন কপিলাবস্তুর একদল বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সে স্থানে পাঠিয়েছিলেন তাঁকে ঘরে ফিরিয়ে আনার জন্য। কিন্তু মহাজ্ঞানী ফিরতে রাজি হননি—এ কথা স্মরণ করে যশোধরা জানতে চাইলেন, ‘তিনি কি পিতার আহ্বানে সাড়া দেবেন?’

মাতা গৌতমী বললেন, ‘মহারাজ এর পূর্বে মহাজ্ঞানীকে তাঁর সন্ন্যাসজীবন ত্যাগ করিয়ে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আজ আমরা প্রত্যেকেই জানি যে তিনি আর গৃহস্থ জীবনে আবদ্ধ হবেন না। মহারাজ তাই সে প্রচেষ্টা না করে এবার তাঁর কাছে কলুদায়ীকে পাঠিয়েছেন শুধু এই বার্তা দিয়ে যে তিনি অন্তত একবার এসে তাঁর পদধূলিতে ধন্য করুন এই কপিলাবস্তুর মাটিকে।

‘কারণ, এখন তিনি রাজকুমার সিদ্ধার্থ নন, তিনি মহাজ্ঞানী বুদ্ধ, তিনি অমিতাভ। তাঁকে ধরে রাখবার ক্ষমতা আমাদের কারও নেই। শুধু একবার তিনি এখানে এসে উপস্থিত হলে, আমরা, কপিলাবস্তুবাসীরা তাঁর দর্শন লাভ করে পুণ্য অর্জন করি।

‘মহারাজ শুদ্ধোধন এ বার্তাও তাঁকে দিতে বলেছেন যে কপিলাবস্তুতে মহাজ্ঞানীর পদাপর্ণের নিমিত্ত তাঁর যে-কোনও শর্ত বা নির্দেশ পালন করতে তিনি রাজি। কলুদায়ী সিদ্ধার্থর বাল্য সহচর। আশা করি সে সমস্ত বিষয়টা মহাজ্ঞানীকে বুঝিয়ে বলতে পারবে।’

একথা বলার পর একটু থেমে মাতা গৌতমী বললেন, ‘তবে কী জানো, তুমি তাঁর স্ত্রী হতে পারো, আমি তাঁর মাতা হতে পারি, রাজা শুদ্ধোধন তাঁর পিতা হতে পারেন, কেউ বা সম্পর্কসূত্রে তাঁর ভ্রাতা বা ভগিনী হতে পারেন, কিন্তু আমরা সবাই আসলে সাধারণ মানুষ। আর তিনি মহাজ্ঞানী বুদ্ধ। তাঁর মনের তল পাওয়া, তাঁকে সম্পূর্ণরূপে বোঝা কি আমাদের মতো নগণ্য মানুষের পক্ষে সম্ভব? আমি জানি না তিনি কী সিদ্ধান্ত নেবেন।’

যশোধরা বললেন, ‘খানিক পূর্বে সন্ধ্যা নামার আগে পুত্র রাহুল আমার কক্ষে এসেছিল। আজকাল সে প্রায়শই জানতে চায় তার পিতা কোথায়! তিনি কেন দর্শন দেন না তাকে। সে অবোধ শিশু। সব কিছু বোঝার বয়স হয়নি তার। আজও সে একই প্রশ্ন করেছিল আমাকে। আমি সে প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারিনি। পিতাকে একবার দেখার জন্য সে বড় ব্যাকুল হয়ে আছে।’

পুত্রবধূর কথা শুনে গৌতম মাতা মৃদু হেসে প্রশ্ন করলেন, ‘আর তুমি কি ব্যাকুল নও?’

প্রশ্ন শুনে মাথা নিচু করে নিশ্চুপ রইলেন যশোধরা। তাঁর মতো ব্যাকুল আর কে আছেন সেই মানুষটার জন্য? কিন্তু এ কথা মুখ ফুটে শ্বশ্রূমাতার সামনে বলতে সংকোচ বোধ করলেন যশোধরা।

কিন্তু গৌতমী নিজেই তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বললেন, ‘আমি জানি এ পৃথিবীতে তুমি তাঁকেই সবচাইতে বেশি ভালোবাসা। তাঁর জন্য তুমি কোলীয়রাজের বিরুদ্ধাচরণ করেছ। সিদ্ধার্থর সন্ন্যাসগ্রহণের পর সুপ্পবুদ্ধ তোমাকে ফিরিয়ে নিতে যেতে চাইলেও তুমি সে প্রস্তাবে সম্মত হওনি। কুমার দেবদত্ত তোমাকে বারংবার তার সঙ্গে বিবাহের প্রস্তাব দিলেও তা তুমি প্রত্যাখ্যান করেছ, আর আজ যে অপরিসীম কৃচ্ছ্রসাধনা তুমি করে চলেছ তা তো সবই তাঁর জন্য।’

এরপর যশোধরার সঙ্গে সামান্য কিছু বাক্যালাপ করে কক্ষত্যাগ করলেন মাতা গৌতমী।

তিনি চলে গেলেন ঠিকই, কিন্তু যশোধরার মনে এক আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়ে গেলেন। যদি তিনি ফিরে আসেন? যশোধরার কথা কি একবারও মনে পড়বে না তাঁর? যশোধরার সঙ্গে তাঁর প্রেম তো শুধু এক জন্মের নয়, গতজন্মের কাল থেকেই তো তাঁর সঙ্গে যশোধরার ভালোবাসার বন্ধন। ধ্যানে বসলেই যশোধরা ইচ্ছা করলে প্রত্যক্ষ করতে পারেন তাঁর গতজন্মের ঘটনাক্রম। আর এই ক্ষমতা গতজন্মে তিনিই প্রদান করেছিলেন তাঁকে।

৪

সেদিন সন্ধ্যায় মাতা গৌতমীর কাছ থেকে সংবাদলাভের পর এক পক্ষকাল প্রায় অতিক্রান্ত হতে চলেছে। এই এক পক্ষকাল ধরে যশোধরা সর্বক্ষণ ভেবে চলেছেন মহাজ্ঞানীর কথা। তিনি আশায় আশায় আছেন যে মহাজ্ঞানী ফিরে এসেছেন এ সংবাদ শীঘ্রই তাঁর কর্ণগোচর হবে।

রাতে তাঁর ঘুম আসে না এই সুসংবাদ শোনার প্রতীক্ষায়। অস্থির হয়ে উঠেছে তাঁর মন-প্রাণ। সে রাতের শেষ প্রহরে মনের অস্থিরতা প্রশমিত করার জন্য ধ্যানে বসলেন যশোধরা। তিনি চেয়েছিলেন মনকে শান্ত করতে। কিন্তু চক্ষু মোদার কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি ফিরে গেলেন অন্য এক পৃথিবীতে। দেখতে পেলেন অন্য এক নগরীর কিছু দৃশ্য।

এ নগরীর নাম পদুম নগরী। শান্ত-সুন্দর এ নগরীতে প্রতিটি দীঘিতে, পুষ্করিণীতে পদ্ম ফোটে। ভ্রমরের দল অবিরত গুঞ্জন করে চলে সেই পদ্মবনে। ফুলের সৌরভে মাতোয়ারা হয়ে থাকে চারিদিক।

আজ এ নগরীতে উৎসবের আমেজ। মহাজ্ঞানী দীপঙ্কর বুদ্ধ আজ পদার্পণ করেছেন নগরীতে। তিনি তাঁর পরবর্তী বুদ্ধের অন্বেষণ করছেন। তারই সন্ধানে তিনি মহাজনপদগুলির বিভিন্ন নগরীতে পরিভ্রমণ করছেন। দীপঙ্কর বুদ্ধের সাক্ষাৎলাভের আশায়, তাঁর আশীর্বাদ পেতে পদুম নগরীর রাজা থেকে সাধারণ প্রজাকুল, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। শুধু এই নগরীর বাসিন্দারাই নয়, দীপঙ্কর বুদ্ধের আগমনবার্তা পেয়ে কাছে-দূরের বিভিন্ন রাজ্য থেকেও বহু মানুষ এসে উপস্থিত হয়েছে এখানে।

তাদের মধ্যে আছে সুমেধ নামের এক ব্রাহ্মণ যুবক। দীপঙ্কর বুদ্ধের আশীর্বাদ গ্রহণের জন্য সে পদুম নগরীতে এসে উপস্থিত হয়েছে সুদূর পর্বতঘেরা এক নগরী থেকে। তার কোমরে বাঁধা একটি অজিন—অনেকটা পথ অতিক্রম করে সেই ব্রাহ্মণ যুবক পদুম নগরীতে যখন এসে পদার্পণ করল তখন দ্বিপ্রহর।

ইতিমধ্যেই বহু মানুষ দীপঙ্করের আশীর্বাদ গ্রহণ করছেন। রাজপ্রাসাদসংলগ্ন তপোবনে অধিষ্ঠান করছেন তিনি। মহাজ্ঞানীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে তাঁর পাদপদ্মে পদ্ম বা পুষ্পার্ঘ নিবেদন করাই রীতি। তাই সেই যুবক সন্ধান করতে লাগল পদ্মের। কিন্তু নগরীর নানা স্থান ঘুরে সে একটিও পুষ্প বা পদ্মের সন্ধান পেল না। কারণ সে জানতে পারল, পদুম নগরীর রাজা ইতিমধ্যেই সমস্ত পদ্ম-পুষ্প ক্রয় করে নিয়েছেন দীপঙ্করের পায়ে অর্পণ করার জন্য।

ক্লান্ত সুমেধ পথপার্শ্বে এক বৃক্ষতলে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল, এখন তবে কী করণীয়? মহাজ্ঞানী দীপঙ্কর আগামীকালই হয়তো যাত্রা করবেন অন্য নগরীর উদ্দেশে। তবে কি তাঁর পদতলে পুষ্পার্ঘ নিবেদন করা হবে না সুমেধের?

এ নগরীর এক চপলা কিশোরী সুমিত্রা। নগরীর সকলের মতো সেও দীপঙ্কর বুদ্ধের আশীর্বাদপ্রার্থী। তাঁর গৃহের ক্ষুদ্র জলাশয়ে সাতটি পদ্ম ফুটেছিল আজ। তা নিয়ে সে একাকী রওনা হল, মহাজ্ঞানীর দর্শন লাভের জন্য। যে পথ ধরে সে যাচ্ছে সে পথের পাশেই বৃক্ষতলে দাঁড়িয়ে ছিল সুমেধ। সে স্থান অতিক্রম করতে গিয়ে সুমিত্রা দেখতে পেল, এক গৌরবর্ণের যুবক বৃক্ষতলে চিন্তিতমুখে দাঁড়িয়ে আছে।

যুবকের মস্তকবন্ধনী, পোশাক দেখে সুমিত্রার মনে হল যুবক অন্য রাজ্যের বাসিন্দা। তাকে দেখে কৌতূহলবশত সুমিত্রা মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। সেই যুবকও তাকাল সুমিত্রার দিকে। দৃষ্টি বিনিময় হল দু’জনের। আর তারপরই সেই যুবক হাত তুলে দাঁড়াতে বলল সুমিত্রাকে। থেমে গেল সুমিত্রা। সে এগিয়ে এসে দাঁড়াল সুমিত্রার সামনে।

কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধভাবে তারা পরস্পরের দিকে চেয়ে রইল। বেলা শেষের আলো এসে পড়েছে যুবকের মুখমণ্ডলে। তার দীঘল চোখে যেন এক অদ্ভুত গভীরতা আছে। অনেকটা জ্ঞানী ব্যক্তিদের মতো। যদিও যুবকের পোশাক দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আসার জন্য ধূলি-ধূসর, তবুও যেন এক আশ্চর্য আভা নির্গত হচ্ছে তার শরীর থেকে। প্রথম দর্শনেই সে আকৃষ্ট করল সুমিত্রাকে।

সুমিত্রা জানতে চাইল, ‘তুমি কোন দেশ থেকে এসেছ? তুমি কি মহাজ্ঞানী দীপঙ্করের আশীর্বাদপ্রার্থী?’

যুবক জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, আমি তাঁর আশীর্বাদ লাভের জন্য, তাঁকে দর্শন করবার জন্যই বহু দূরের এক পাহাড়ি দেশ থেকে পদুম নগরীতে এসেছি।’

সুমিত্রা বলল, ‘কিন্তু তুমি আমার গতিরোধ করলে কেন? মহাজ্ঞানী কোন স্থানে অবস্থান করছেন তা কি তুমি জানো না? আমি সে স্থানেই যাচ্ছি। ইচ্ছা হলে তুমি আমাকে অনুসরণ করতে পারো।’

যুবক বলল, ‘তিনি কোন স্থানে অবস্থান করছেন তা আমি লোকমুখে জেনেছি। আমি তোমার গতি স্তব্ধ করলাম তোমার হাতের ওই পদ্মগুলো দেখে। মহাজ্ঞানীকে তো পুষ্পার্ঘ নিবেদন করতে হবে। বহু অনুসন্ধান করেও আমি পুষ্প সংগ্রহ করতে পারিনি। তুমি যদি তোমার পুষ্পগুলো আমাকে বিক্রয় করো তবে আমি তা দীপঙ্কর বুদ্ধের চরণে নিবেদন করতে পারি।’

যুবতী বলল, ‘কিন্তু আমি তো পুষ্প বিক্রেতা নই। এই পদ্ম আমি নিয়ে যাচ্ছি মহাজ্ঞানীর চরণে নিবেদন করে তাঁর আশীর্বাদ গ্রহণের জন্য।’

যুবক তা শুনে স্বগতোক্তির স্বরে বলল, ‘তবে কি তাঁর চরণে পুষ্প নিবেদন করা হবে না আমার?’

যুবক অপরিচিত হলেও কোমলহৃদয় সুমিত্রা যুবকের মনের ব্যাকুলতা অনুভব করতে পারল। সে বলল, ‘ঠিক আছে এই সাতটি পদ্মের মধ্যে পাঁচটি পদ্ম আমি তোমাকে দেব।’

যুবক বলল, ‘তুমি তো ফুল বিক্রয় করবে না। এর বিনিময়ে আমি কী দেব তোমাকে? কী চাও তুমি?’

যুবতীর মনে এবার চপলতা জেগে উঠল, সে হাসতে হাসতে বলে উঠল, ‘এই পাঁচটি পদ্মের বিনিময়ে তুমি আমাকে বিবাহ করবে।’

এ কথার উত্তরে সুমেধ মৃদু চুপ করে থাকার পর বলল, ‘আচ্ছা, তাই হবে।’

সুমেধের কথা শুনে সুমিত্রা ভাবল, সে যেমন কৌতুক করে কথাটা তাকে বলেছে, যুবকও নিশ্চয়ই তেমনই কৌতুকের ছলেই তার প্রস্তাবে সম্মত হয়েছে।

এদিকে বেলা বয়ে যাচ্ছে। সূর্য পশ্চিমে ঢলতে শুরু করেছে। এ স্থানে দাঁড়িয়ে বাক্যালাপে কালক্ষেপ করলে নির্দিষ্ট সময় মহাজ্ঞানীর নিকট পৌঁছানো যাবে না। তাই সুমিত্রা সুমেধের হাতে পাঁচটি পদ্ম সমর্পণ করে বলল, ‘চলো আমার সঙ্গে।’

চলতে চলতে তার সঙ্গে বাক্যালাপের মাধ্যমে সুমিত্রা জানতে পারল, এই যুবক ব্রাহ্মণসন্তান এবং এক ধনাঢ্য ব্যক্তির পুত্র। তবে ভোগবিলাসে তার কোনও আগ্রহ নেই। নানাস্থানে পরিক্রমা করে বেড়ায় সে। জ্ঞানী ব্যক্তিদের দর্শন করে। তাঁদের কাছ থেকে জ্ঞান আহরণের চেষ্টা করে।

সুমিত্রা তাকে বলল, ‘যাঁরা দীপঙ্কর বুদ্ধের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছেন তাঁরা অনেকেই নিজেদের মনস্কামনা পূর্ণ করার জন্য তাঁর আশীর্বাদ চাইছেন। রাজার কামনা তিনি যেন রাজা থেকে রাজচক্রবর্তী হন। কারও কামনা রাজা হওয়া বা প্রভূত ধন-সম্পদের অধিকারী হওয়া, কারও কামনা সুন্দরী রমণী। এই যেমন আমার কামনা একজন সর্বশ্রেষ্ঠ স্বামী, যে আমাকে সত্যিই ভালোবাসবে। আচ্ছা তোমার কামনা কী?’

সুমেধ হেসে জবাব দিল, ‘মহাজ্ঞানীর কাছে আমার কোনও জাগতিক কামনা নেই। তিনি যেন আমাকে এই আশীর্বাদ করেন যাতে আমি এই বিশ্ব- প্রকৃতির সত্য অনুসন্ধানে সফল হই, জ্ঞান অর্জন করতে পারি।’

যাত্রাপথে সুমিত্রা আরও কিছু প্রশ্ন করল যুবককে। ধীরে ধীরে সে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিল সুমেধ। আর তার সেই উত্তরগুলো শুনে সুমিত্রার মনে হল, এই যুবক যেন এক ব্যতিক্রমী পুরুষ। ইতিপূর্বে সুমিত্রা যেসব পুরুষের সঙ্গে বাক্যালাপ করেছে তাদের মতো এ যুবক যশোলোভী, অর্থলোভী বা নারীলোভী নয়।

সংক্ষিপ্ত যাত্রাপথে সদ্য পরিচিত যুবকের সঙ্গে বাক্যবিনিময় করতে করতে সত্যিই তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ল সুমিত্রা।

তারা যখন তপোবনে গিয়ে পৌঁছাল তখন দর্শনার্থীদের সমাগম অনেকটাই কমে গেছে। মাত্র কয়েকজন আশীর্বাদপ্রার্থী তখন সে স্থানে উপস্থিত। বৃক্ষতলে কাষ্ঠাসনে কয়েকজন শিষ্যকে নিয়ে বসে আছেন দীপঙ্কর বুদ্ধ। যারা তাঁর সামনে গিয়ে প্রণাম জানাচ্ছে, তিনি তাদের পর্যবেক্ষণ করছেন। আশীর্বাদ করছেন। কখনও বা তাদের মনস্কামনা জানতে চাইছেন।

সারাদিন অসংখ্য মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন তিনি। তাদের আশীর্বাদ করেছেন, ধর্ম উপদেশ শুনিয়েছেন আর বোঝার চেষ্টা করেছেন তাদের মধ্যে কেউ ভবিষ্যতের বুদ্ধ কিনা। আর কিছু সময় পরেই সূর্য ডুবে গিয়ে সন্ধ্যা নামবে। ধ্যানে বসবেন তিনি। পরদিন প্রভাতেই আবার রওনা হয়ে যাবেন নতুন জনপদের উদ্দেশে।

যে বৃক্ষতলে তিনি উপবেশন করেছেন তার কিছুটা তফাতে গিয়ে দাঁড়াল সুমেধ আর সুমিত্রা। শেষ কয়েকজন মানুষ তখন আশীর্বাদগ্রহণ করছে মহাজ্ঞানী দীপঙ্করের কাছ থেকে। তাদের আশীর্বাদপ্রদান যখন সমাপ্ত হল তখন সুমেধ সুমিত্রাকে বলল, ‘তুমি আগে যাও। মহাজ্ঞানীর আশীর্বাদগ্রহণ করো। সর্বশেষে আমি তাঁর আশীর্বাদ গ্রহণ করতে যাব।’

সুমিত্রা এগিয়ে গিয়ে মহাজ্ঞানীর পদতলে দুটো পদ্ম নিবেদন করে ভূমিষ্ঠ হয়ে তাঁকে প্রণাম জানিয়ে মনে মনে তার আকাঙ্ক্ষার কথা ব্যক্ত করল। মহাজ্ঞানী সুমিত্রার মনের কথা পাঠ করতে পারলেন। মৃদু হাসি ফুটে উঠল তাঁর ঠোঁটের কোণে। তিনি সুমিত্রাকে কোনও প্রশ্ন করলেন না, শুধু দক্ষিণ হস্ত উত্থিত করে তাকে আশীর্বাদ জানালেন। মহাজ্ঞানীকে নমস্কার জানিয়ে কিছুটা দূরে গিয়ে দাঁড়াল সুমিত্রা।

এবার সুমেধ ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল দীপঙ্কর বুদ্ধের সামনে। তার প্রাথমিক কর্তব্য ছিল বুদ্ধের চরণে পদ্মগুলি নিবেদন করে তাঁকে প্রণাম করা। কিন্তু দীপঙ্কর বুদ্ধের সামনে উপস্থিত হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে সুমেধ বিস্মৃত হল তার কর্তব্যের! কী অপূর্ব এক পুরুষ বসে আছেন তাঁর সামনে! জ্ঞান-প্রজ্ঞার দীপ্তি ছড়িয়ে পড়ছে তাঁর মুখমণ্ডল থেকে।

ইতিপূর্বে বহু সন্ন্যাসী-ঋষি, জ্ঞানী মানুষকে দর্শন করেছে সুমেধ কিন্তু এমন উজ্জ্বল, ব্যক্তিত্বময় পুরুষ সে কোনওদিন দেখেনি। অপলক দৃষ্টিতে সব কিছু ভুলে সে চেয়ে রইল দীপ্তিমান দীপঙ্কর বুদ্ধের দিকে। আর বুদ্ধও চেয়ে রইলেন যুবকের দিকে। কোন কোন লক্ষণ দ্বারা ভবিষ্যতের বুদ্ধকে শনাক্ত করা যাবে তা পূর্ববর্তী বুদ্ধরা বলে যান পরবর্তী বুদ্ধকে। দীপঙ্কর বুদ্ধকে তাঁর পূর্ববর্তী বুদ্ধ সে কথা বলে গেছেন।

যুবকের পোশাক দেখে দীপঙ্কর বুদ্ধ বুঝতে পারলেন, তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা যুবক পার্বত্য উপত্যকা অঞ্চলের বাসিন্দা, তার প্রশস্ত ললাট জ্ঞানধারণের ক্ষমতার ইঙ্গিতবাহী, মস্তকবন্ধনীর আড়াল থেকে বেরিয়ে আসা দীর্ঘ কর্ণলতিকা বুদ্ধিমত্তার প্রতীক, তার ধূলি-ধূসর পদযুগল দীর্ঘ পথ পরিক্রমণের ক্ষমতাবাহী, আর কোমরে গোঁজা অজিন সন্ন্যাসের প্রতীক। কারণ সন্ন্যাসীরা অজিনে উপবেশন করে ধ্যানে মগ্ন হন।

মহাজ্ঞানী দীপঙ্কর বুদ্ধ দেখলেন, তাঁর পূর্ববর্তী বুদ্ধরা ভবিষ্যতের বুদ্ধকে চিহ্নিতকরণের জন্য তাঁকে লক্ষণের যে কথা বলে গেছেন তা হুবহু মিলে যাচ্ছে এই যুবকের সঙ্গে। বুকের কাছে পদ্মগুচ্ছের ডাঁটি ধরে দাঁড়িয়ে আছে যুবক। দীপঙ্কর বুদ্ধ গুনে দেখলেন পাঁচটি পদ্ম আছে তার হাতে। পূর্ববর্তী বুদ্ধ দীপঙ্কর বুদ্ধকে এ কথাও বলেছিলেন ভবিষ্যত বুদ্ধ তাঁর সঙ্গে পাঁচটি পদ্ম নিয়েই সাক্ষাৎ করতে আসবেন।

মহাজ্ঞানী দীপঙ্কর বুদ্ধ বুঝতে পারলেন, যাঁকে অনুসন্ধান করবার জন্য তিনি এ নগরী থেকে ও নগরী পরিভ্রমণ করছেন, তিনি নিজেই এসে উপস্থিত হয়েছেন তাঁর সামনে। তবুও সন্দেহ নিরসনের জন্য তিনি যুবককে প্রথম প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কি বিত্তশালী হতে চান? তবে আমি আপনাকে সেই আশীর্বাদ প্রদান করব।’

সুমেধ জবাব দিল, ‘না আমি বিত্তের আকাঙ্ক্ষা করি না।’

‘আপনি কি তবে রাজসিংহাসনের অধিকারী হতে চান?’

‘না, আমি রাজসিংহাসনের প্রত্যাশী নই।’

‘তবে কি আপনার আকাঙ্ক্ষা আরও বড়? আপনি রাজাদের রাজা রাজচক্রবর্তী হতে চান? সারা পৃথিবী শাসনের ক্ষমতা, কর্তৃত্ব লাভ করতে চান? তাহলে আমি আপনাকে সে ক্ষমতাও প্রদান করব।’

‘না, আমি কোনও শাসন ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব লাভ করতে চাই না।’ জবাব দিল সুমেধ।

দীপঙ্কর বুদ্ধ এ তিনটি প্রশ্ন করবার পর তাঁর শেষ প্রশ্ন করলেন, ‘তবে আপনি কী চান?’

সুমেধ উত্তর দিল, ‘আমি কেবল জ্ঞানলাভ করতে চাই। যে জ্ঞান সমস্ত জীবজগতের জন্য কল্যাণকর।’

এবার এ যুবকের পরিচয় সম্পর্কে নিঃসংশয় হলেন দীপঙ্কর বুদ্ধ।

যুবক সুমেধ নিজের সম্বিৎ ফিরে পেয়ে তার হাতের পদ্মগুলো নামিয়ে রাখতে যাচ্ছিল মহাজ্ঞানীর পদতলে। কিন্তু তার আগেই দীপঙ্কর বুদ্ধ হাত বাড়িয়ে পদ্মগুলো গ্রহণ করলেন। তারপর তিনি তাঁর শিষ্যদের উদ্দেশে বললেন, ‘আমার অনুসন্ধান পর্ব সম্পন্ন হল আজ। আমার সামনে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন তিনিই ভবিষ্যৎ বুদ্ধ। পরজন্মে তিনি বুদ্ধত্ব লাভ করবেন।’

এরপর তিনি সুমেধের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কাল সূর্যোদয়ের পূর্বেই আপনাকে নিয়ে আমি এ নগরী ত্যাগ করে রওনা হব, সুদূরে নিভৃত এক স্থানের উদ্দেশে। যে স্থানে গিয়ে আমি পূর্ববর্তী বুদ্ধদেব থেকে আহরিত জ্ঞান আপনাকে প্রদান করব। আর এই মুহূর্ত থেকে আপনি কিছু বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী হলেন।’

ভবিষ্যতের বুদ্ধ পাদস্পর্শ করলেন বর্তমান বুদ্ধের। খানিকটা তফাতে দাঁড়িয়ে থাকা সুমিত্রা দেখল, একটা আলোকরশ্মি সুমেধের ললাটে মুহূর্তের জন্য জেগে উঠল। আর তারপরই সূর্য ডুবে গেল। দীপঙ্কর বুদ্ধ ধ্যানস্থ হলেন।

সুমেধ কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে একপাশে সরে দাঁড়াল। তারপর তার দৃষ্টি পড়ল সুমিত্রার ওপর। বিস্মিতভাবে সে চেয়ে আছে সুমেধের দিকে। তবে সুমিত্রাকে এবার নিজ গৃহে ফিরতে হবে। শীঘ্রই সন্ধ্যা নামবে। সুমেধ বুঝতে পারল, সুমিত্রা তার জন্যই প্রতীক্ষা করে আছে। তাকে ফিরে যেতে বলতে হবে।

সে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল সুমিত্রার সামনে। তারপর বলল, ‘তুমি তো আমাদের বাক্যালাপ শুনলে! আমাকে এখন এই স্থানেই থাকতে হবে। তারপর কাল এ নগরী ত্যাগ করে চলে যেতে হবে মহাজ্ঞানী দীপঙ্কর বুদ্ধের সঙ্গে জ্ঞান অর্জনের জন্য। তোমার দেওয়া পদ্মগুলোই আমার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করল। আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ। এবার তুমি নিজ গৃহে ফিরে যাও।’

সুমিত্রা বলল, ‘কিন্তু আপনি যে বললেন আমাকে বিবাহ করবেন?’

ভবিষ্যতের বুদ্ধ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে জানতে চাইলেন, ‘তুমি সত্যিই আমাকে বিবাহ করতে চাও?’

সুমিত্রা বলল, ‘হ্যাঁ, আমি এই ক্ষণিককালের মধ্যেই বুঝতে পেরেছি— আপনিই হলেন সেই পুরুষ যাঁকে আমি সঙ্গীরূপে পেতে চাই।’

ভবিষ্যতের বুদ্ধ কয়েক মুহূর্ত স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন সুমিত্রার আবেগঘন মুখমণ্ডলের দিকে।

তারপর বললেন, ‘ঠিক আছে, আমি তোমাকে পরজন্মে বিবাহ করব যদি তুমি এ কথা জেনে সম্মত হও যে পরজন্মে আমি সন্ন্যাসী হব, গৃহত্যাগী হব।’

সুমিত্রা বলল, ‘যদি সত্যিই আপনি আমাকে পরজন্মে বিবাহের প্রতিশ্রুতি দেন তবে সব কিছু জেনেও আমি আপনাকে বিবাহ করবার জন্য প্রতীক্ষা করে থাকব।’

ভবিষ্যতের বুদ্ধ বললেন, ‘তবে তাই হবে। পরজন্মে আমরা স্বামী-স্ত্রী হব।’

সুমিত্রা বলল, ‘কিন্তু সেজন্মে আমি আপনাকে চিনব কীভাবে?’

ব্রাহ্মণ যুবক সুমেধ বলল, ‘আমি তোমাকে এই ক্ষমতা প্রদান করলাম যে পরজন্মেও পূর্বজন্মের স্মৃতি মনে থাকবে তোমার। তুমি আমি একই দিনে দুই পৃথক রাজপরিবারে জন্মলাভ করব, এবং আমরা অবশ্যই পরস্পরকে চিনতে পারব।’

ভবিষ্যতের বুদ্ধের কথা শুনে সুমিত্রা বুঝতে পারল দীপঙ্কর বুদ্ধের সঙ্গে সাক্ষাতের ফলে ইতিমধ্যেই কিছু ঐশ্বরিক ক্ষমতা এসেছে তাঁর মধ্যে। তিনি সুমিত্রাকে যা প্রতিশ্রুতি দিলেন তা মিথ্যে হবে না।

সুমিত্রা নতজানু হয়ে ভবিষ্যত বুদ্ধের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। তিনি আশীর্বাদের ভঙ্গিতে হাত তুললেন। চারপাশে দ্রুত অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। সুমিত্রা রওনা হল ঘরে ফেরার জন্য।

কিন্তু হঠ্যাৎ তার কানে কিছু কোলাহল ভেসে আসতে লাগল। আর সেই শব্দই ধ্যানভঙ্গ করল পূর্বজন্মের সুমিত্রার, বা এজন্মের যশোধরার।

৫

চোখ মেলে যশোধরা বুঝতে পারলেন ধ্যানমগ্ন অবস্থায় পূর্বজন্মে ফিরে গিয়েছিলেন তিনি। ইতিমধ্যে ভোরের আলো ফুটে গেছে। খোলা বাতায়ন দিয়ে আলো প্রবেশ করছে তাঁর কক্ষে। তবে যশোধরার শোনা কোলাহলটা মিথ্যা নয়। প্রাসাদের নীচে অনেক মানুষ সমবেত হয়েছে। তাদের কোলাহলই ওপরে উঠে এসে উন্মুক্ত বাতায়ন দিয়ে কক্ষে প্রবেশ করছে।

এ কীসের কোলাহল? ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন যশোধরা। তাঁর কক্ষসংলগ্ন একটা প্রশস্ত অলিন্দ আছে। তিনি গিয়ে দাঁড়ালেন সেই অলিন্দের সামনে। প্রাসাদের কিছুটা তফাতে একটি রাজপথ আছে। যশোধরা নীচের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, সেই পথ আর প্রাসাদের মধ্যবর্তী স্থানে সমবেত হয়েছে বেশ কিছু নারী-পুরুষ। তাদের পোশাক দেখে যশোধরা অনুমান করলেন, তারা প্রাসাদেরই লোক।

কিন্তু হঠাৎ কী কারণে তারা এমন সময় প্রাসাদের বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে? তাদের কোলাহল শুনে মনে হচ্ছে তারা বেশ উত্তেজিত।

এই জনসমাগমের কারণ জানার জন্যে তিনি ডাক দিলেন দাসী কঙ্কাকে। দাসী কক্ষে প্রবেশ করল। যশোধরা প্রাসাদের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা জনতাকে দেখিয়ে জানতে চাইলেন, ‘ওরা প্রাসাদের সামনে সমবেত হয়েছে কেন?’

দাসী কঙ্কা যশোধরাকে প্রণাম জানিয়ে যে সংবাদ পরিবেশন করল, তা শুনে পুলকিত হয়ে উঠলেন যশোধরা। সে বলল, ‘মহাজ্ঞানী তথাগত বুদ্ধ, মধ্যরাতে কপিলাবস্তুতে পদার্পণ করেছেন। তাঁর দর্শনের জন্যই সকলে এস্থানে সমবেত হয়েছে।’

এ সংবাদ শুনে যশোধরা আনন্দে, আবেগে কয়েক মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। তারপর জানতে চাইলেন, ‘কোথায়? প্রাসাদের কোন কক্ষে অবস্থান করছেন তিনি? এ বার্তা আমাকে আগে জানাসনি কেন?’

দাসী জবাব দিল, ‘রাজমাতা গৌতমী আমাকে পূর্বেই এ সংবাদ জানাতে বলেছিলেন আপনাকে। কিন্তু তা জানাবার জন্য আমি দ্বার খুলে দেখলাম আপনি ধ্যানে নিমগ্ন। আপনার ধ্যান ভঙ্গ করা উচিত হবে কিনা তা বুঝতে না পেরে আমি আপনার ধ্যানভঙ্গের অপেক্ষায় ছিলাম। মহাজ্ঞানী প্রাসাদে আসেননি।’

‘তবে কোথায় তিনি?’ জানতে চাইলেন যশোধরা।

দাসী কঙ্কা জানাল, ‘যিনি তাঁকে নিয়ে এসেছেন সেই কলুদায়ীর গৃহসংলগ্ন একটি পর্ণকুটির আছে। সে স্থানেই মহাজ্ঞানী অবস্থান করছেন তাঁর শিষ্যদের সঙ্গে। খানিক পরেই তিনি নগর পরিক্রমায় বেরোবেন ভিক্ষাপাত্র হাতে। রাজপ্রাসাদের সামনের পথ ধরেই তিনি নগরীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে যাবেন। তাঁর দর্শন লাভের জন্য, আশীর্বাদ লাভের জন্যই প্রাসাদের বাইরে বেরিয়েছে সকলে।’

কথাটা শুনে যশোধরার মনে হল, তিনিও এখনই ছুটে প্রাসাদের নীচে গিয়ে দাঁড়ান। কিন্তু তারপরেই তিনি ভাবলেন, এ কাজ করা তাঁর পক্ষে উচিত হবে না। কারণ স্বামীর আগমনবার্তা পেয়ে ইতিমধ্যেই তাঁর চোখ দিয়ে আনন্দ অশ্রু ঝরে পড়ার উপক্রম হয়েছে। দাসীর সামনে তিনি তা সংবরণ করে রেখেছেন।

কিন্তু দীর্ঘদিনের অদর্শনের পর স্বামীকে দেখে তিনি হয়তো আর নিজেকে সংযত রাখতে পারবেন না, কান্নায় ভেঙে পড়বেন, অথবা এমন কিছু করে বসবেন যা বিব্রত করতে পারে তাঁর স্বামীকে। তিনি তো আর এখন শুধু তাঁর স্বামী নন, রাজকুমার সিদ্ধার্থ নন, তিনি এখন বুদ্ধ—অমিতাভ।

তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে যশোধরার মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন জমে আছে। যা তিনি প্রথম সাক্ষাতেই জিগ্যেস করতে চান মহাজ্ঞানীকে। কিন্তু জনসমক্ষে সে প্রশ্ন করা যাবে না। তথাগত হলেও তিনি তাঁর স্বামী। তিনি নিশ্চয়ই ভুলে যাননি তাঁদের প্রেমগাথা, দাম্পত্য জীবনের সেই মুহূর্তগুলোর কথা! তিনি নিশ্চয়ই একবার দেখা করতে আসবেন যশোধরার সঙ্গে। এসব কথা ভেবে নিজের আবেগকে সংবরণ করে তিনি দাসীকে বললেন, ‘তুই পুত্র রাহুলকে আমার কাছে নিয়ে আয়।’

দাসী রাজবধূ যশোধরার আজ্ঞা পালনের জন্য চলে গেল। অলিন্দ ছেড়ে ঘরে প্রবেশ করলেন যশোধরা। এবার তাঁর কান্না বাঁধ মানল না। আনন্দ অশ্রুতে ভিজে যেতে লাগল তাঁর বক্ষ। তিনি সম্বিৎ ফিরে পেলেন দাসী কঙ্কা, পুত্র রাহুলকে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করাতে। তিনি হাতের ইশারায় দাসীকে কক্ষের বাইরে চলে যেতে বললেন। রাহুল এসে জড়িয়ে ধরল তার মা’কে। সদ্য জাগ্রত বালক রাহুলকে দাসী পৌঁছে দিয়ে গেছে তাঁর কাছে। তার ঘুমের রেশ এখনও ভালো করে কাটেনি। তবু সে মায়ের চোখের অশ্রু প্রত্যক্ষ করে বলল, ‘মাতা, তুমি কাঁদছ কেন?’

যশোধরা তাড়াতাড়ি বস্ত্রের খুঁট দিয়ে চোখের জল মুছে নিয়ে বললেন, ‘ও কিছু নয় পুত্র। আমি আজ তোমার এক কৌতূহলের নিরসন ঘটাব। চলো আমরা অলিন্দে যাই।’ এই বলে তিনি পুত্রের হাত ধরে অলিন্দে এসে দাঁড়ালেন। ইতিমধ্যে আরও বহু নর-নারীর সমাগম হয়েছে প্রাসাদের নীচে।

শুধু যে প্রাসাদের লোকেরা উপস্থিত হয়েছে তাই নয়, বহু সাধারণ মানুষও উপস্থিত হয়েছে পথের দু’পাশে। তাদের কারও হাতে মালা, পুষ্পপাত্র বা অন্য সামগ্রী। সবাই পথের এক দিকে চেয়ে কলরব করছে। যশোধরা দেখলেন, মহারাজ শুদ্ধোধন ও মাতা গৌতমীও প্রাসাদের বাইরে এসে দাঁড়িয়েছেন। মহারাজ শুদ্ধোধনের মাথায় আজ রাজছত্র নেই। তাঁর হাতে ধরা আছে একখানা স্বর্ণপাত্র। সম্ভবত তণ্ডুল রয়েছে তাতে।

বালক রাহুল জানতে চাইল, ‘মাতা, প্রাসাদের সামনে এত মানুষ সমবেত হয়েছে কেন? আজ কি কোনও উৎসব আছে?’

যশোধরা জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, আজ সকল নগরবাসীর কাছেই আনন্দ উৎসবের দিন। তার কারণটা খানিক পরেই তুমি প্রত্যক্ষ করতে পারবে।’

সময় এগিয়ে চলল, আর তার সঙ্গে ধীরে ধীরে জনসমাগম বাড়তে লাগল কপিলাবস্তুর রাজপ্রাসাদের সামনের সড়কের দু’পাশে। এক সময় জনতা পথের একপ্রান্তের দিকে তাকিয়ে তীব্র কোলাহল করে উঠল ‘তিনি আসছেন! ওই তিনি আসছেন’ বলে! সেই কোলাহল আকাশের দিকে নিক্ষিপ্ত হয়ে, প্রাসাদের ভিতর প্রবেশ করে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। তা শিহরন জাগিয়ে তুলল যশোধরার শরীরে ও মনে।

এবার যেদিকে জনসাধারণের দৃষ্টি সেদিকে তাকালেন যশোধরা। হ্যাঁ, একদল মানুষ এগিয়ে আসছেন রাজপথ ধরে। পীতবস্ত্র ধারণকারী সেই দলটা আরও একটু এগিয়ে আসতেই জনগণের কোলাহল একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। হয়তো তাঁর প্রতি শ্রদ্ধার কারণে, অথবা তাঁকে দর্শনের বিস্ময়ের কারণে।

যশোধরা চেয়ে রইলেন পীতবস্ত্র ধারণকারী সন্ন্যাসীদের দিকে। এক সময় প্রাসাদের একদম কাছাকাছি চলে এলেন তাঁরা। আর তাঁদের মধ্যে অগ্রবর্তী ব্যক্তিকে চিনতে পেরে আনন্দ, শিহরন ছড়িয়ে পড়ল যশোধরার শরীরে। মুণ্ডিতমস্তক চীবরপরিহিত এক ব্যক্তি। উন্মুক্ত পদযুগলে শান্ত ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে এসেছেন তিনি। তাঁর হাতে ধরা ভিক্ষাপাত্র। পথপার্শ্বে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের ভিক্ষা ও প্রণাম গ্রহণ করতে করতে এগিয়ে আসছেন তিনি।

তাঁকে এ পোশাকে ইতিপূর্বে কোনওদিন দেখেননি যশোধরা। যে রাতে যশোধরার সঙ্গে তাঁর শেষ সাক্ষাৎ হয়েছিল তখন তিনি বুদ্ধত্ব লাভ করেননি। তখন তিনি কপিলাবস্তুর রাজকুমার। তখন তাঁর পরনে ছিল যুবরাজের পোশাক, অঙ্গ সজ্জিত ছিল বহুমূল্য স্বর্ণ ও হীরক অলংকারে। তবে আজ তাঁর পরনে সোনায় বোনা রাজপোশাক বা অলংকার না থাকলেও যেন এক শুভ্র জ্যোতি বিচ্ছুরিত হচ্ছে তাঁর শরীর থেকে—জ্ঞানের জ্যোতি। মাঝে নয় বছরের ব্যবধান, তবুও তাঁকে দেখে চিনতে একটুও ভুল হল না যশোধরার। হ্যাঁ, তিনিই তাঁর স্বামী, রাহুলের পিতা, একদা যিনি পরিচিত ছিলেন যুবরাজ সিদ্ধার্থ নামে, আর আজ যিনি মহাজ্ঞানী বুদ্ধ, যিনি শাস্তা, যিনি অমিতাভ!

যশোধরা অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন তাঁর দিকে। পথপার্শ্বের জনতা কেউ তাঁর অথবা তাঁর ভিক্ষু সঙ্গীদের পাত্রে ভিক্ষা প্রদান করছে, কেউ বা তাঁদের পদতলে পুষ্প বিছিয়ে দিচ্ছে। তথাগতর দশনার্থী জনতার মধ্যে সর্বস্তরের মানুষ আছে। যেমন আছে মুক্তাহারে সজ্জিত ধনবান শ্রেষ্ঠী, তেমনই আছে বল্কল পরা নিষাদ। মানুষের মধ্যে ধনী-দরিদ্র বা জাতির ভেদাভেদ নেই মহাজ্ঞানীর কাছে। সবার কাছ থেকেই ভিক্ষা গ্রহণ করছেন তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা, তথাগত আশীর্বাদ করছেন সবাইকে।

এক সময় রাজপ্রাসাদের ঠিক সামনে এসে দাঁড়ালেন তাঁরা। তবে কি তিনি ক্ষণেকের জন্য হলেও প্রাসাদে প্রবেশ করবেন? তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে যশোধরা আর রাহুলের? আবারও উত্তেজনায় কেঁপে উঠল যশোধরার শরীর।

তবে মহাজ্ঞানীর প্রাসাদের সামনে এসে থমকে দাঁড়াবার কারণ, তিনি দেখতে পেয়েছেন মহারাজ শুদ্ধোধন তাঁকে ভিক্ষা প্রদানের জন্য দণ্ডায়মান। তিনি থামতেই কপিলাবস্তুরাজ তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন ভিক্ষা প্রদানের জন্য। এবার সম্বিৎ ফিরল যশোধরার। পুত্র রাহুলকে পিতৃদর্শন করাতে হবে। তিনি রাহুলকে কোলে তুলে নিলেন।

মহারাজ শুদ্ধোধন যখন মহাজ্ঞানীর ভিক্ষাপাত্রে তণ্ডুল ঢেলে দিচ্ছেন তখন যশোধরা তাঁকে দেখিয়ে বললেন, ‘ওই যে মুণ্ডিতমস্তক গৌরবর্ণের মানুষটি মহারাজের কাছ থেকে তণ্ডুল গ্রহণ করছেন, উনিই তোমার পিতা।’ মুণ্ডিতমস্তক, চীবর পরা মানুষটিকে তার পিতা বলে চিহ্নিত করাতে রাহুলের শিশুমনে মৃদু সন্দেহের উদ্রেক হল মুহূর্তের জন্য।

ভিক্ষা প্রদান করার পর মহারাজ শুদ্ধোধন প্রণাম করলেন তথাগতকে। কারণ তিনি এখন কপিলাবস্তুরাজের পুত্র সিদ্ধার্থ নন, তিনি মহাজ্ঞানী বুদ্ধ-অমিতাভ। রাহুল বলল, ‘শুনেছি আমার পিতা রাজপুত্র। তবে তাঁর পরনে এ পোশাক কেন? পিতামহই বা প্রণাম জানালেন কেন তাঁকে?’

যশোধরা জবাব দিলেন, ‘তাঁর পরনে এ পোশাক কারণ তিনি সন্ন্যাসী। মহারাজ তাঁকে প্রণাম করলেন কারণ তিনি তাঁর পুত্র হলেও এখন তিনি মহাজ্ঞানী বুদ্ধ। তুমিও প্রণাম জানাও তোমার পিতার উদ্দেশে।’

মা’র মুখে এ কথা শুনে এবার সন্দেহমুক্ত হল রাহুল। রাহুল তার ক্ষুদ্র করদ্বয় জড়ো করল তার পিতাকে প্রণাম জানাবার জন্য।

মহাজ্ঞানীর দিকে তাকিয়ে যশোধরা তাঁর উদ্দেশে বললেন, ‘হে করুণাময়, আপনি একবার মুখ তুলে তাকান আপনার পুত্রের দিকে। তাকে আশীর্বাদ করুন।’

কিন্তু যশোধরার এ মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হল না। তিনি মুখ তুলে চাইলেন না তাদের দিকে, এমন কী প্রাসাদের দিকেও তাকালেন না, যে প্রাসাদে তিনি প্রায় তিরিশটি বছর অতিবাহিত করেছেন। মহারাজ শুদ্ধোধনের সঙ্গে কয়েকটা বাক্যালাপ করলেন তিনি। সে কথা কানে এল না যশোধরার। মহাজ্ঞানী অমিতাভ এরপর চারপাশের জনতার উদ্দেশে আশীর্বাদের ভঙ্গিতে হাত তুললেন। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে চললেন তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে। উপস্থিত জনতাও তাঁদের অনুসরণ করল। একসময় তিনি হারিয়ে গেলেন যশোধরা ও রাহুলের দৃষ্টিপথের আড়ালে।

মহাজ্ঞানী নিজ পথে অগ্রসর হবার পর রাহুলকে নিয়ে অলিন্দ থেকে কক্ষে ফিরে এলেন যশোধরা। তিনি খেয়াল করলেন, দূর থেকে প্রথমবার পিতাকে দেখার পর রাহুলের চোখে-মুখে বিস্ময় আর কৌতূহল ফুটে উঠেছে। নেহাতই বালক সে। অন্যরা তার পিতা সম্পর্কে যা জানে বোঝে, তা সে বুঝে উঠতে পারছে না। রাহুল এরপর যশোধরাকে প্রশ্ন করল, ‘আমি প্রথমবার আমার পিতাকে দেখলাম। তাঁর সম্পর্কে জানার জন্য কৌতূহল বোধ করছি আমি। মহাজ্ঞানী কারা? তাঁরা কী করেন? আমার পিতা কেমন মানুষ?’

অনেক দিন পর স্বামীকে দর্শনের প্রাথমিক বিহ্বলতা কাটিয়ে যশোধরা বুঝতে পারলেন এবার পুত্রকে তাঁর পিতা সম্পর্কে ধারণা দান করা প্রয়োজন। এমন ধারণা যা পিতার প্রতি রাহুলের শ্রদ্ধার উদ্রেক ঘটাবে। মহাজ্ঞানী যখন কপিলাবস্তুতে এসেছেন, তখন নিশ্চয়ই পিতা-পুত্রের সাক্ষাৎ ঘটবে। আর সেই সাক্ষাতের সময় যেন মহাজ্ঞানীকে অপরিচিত বলে মনে না হয় রাহুলের। আর বিশেষত সেই সাক্ষাৎলগ্নে রাহুল যাতে তার পিতার পরিচিতি সম্পর্কে পূর্বেই অবগত হয়, তাঁর প্রতি অন্য সকলের মতো শ্রদ্ধাশীল হয়—তারও ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

কিন্তু কীভাবে তা করা সম্ভব? একটা ভাবনা এল যশোধরার মনে। এক সময় তিনি প্রকৃতি ও তাঁদের দু’জনের ভালোবাসাকে কেন্দ্র করে শ্লোক রচনা করে শোনাতেন যুবরাজ সিদ্ধার্থকে। সেদিনের যুবরাজ সিদ্ধার্থ তাঁর শ্লোক রচনার প্রশংসাও করতেন। যদিও সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগ করবার পর যশোধরা আর কখনও শ্লোক রচনা করেননি! তবে চেষ্টা করলে তিনি এখনও পারবেন। কেমন হয় যদি যশোধরা শ্লোকের মাধ্যমে মহাজ্ঞানীর সম্পর্কে ধারণা বিবৃত করেন তাঁর পুত্রের কাছে!

শেষ পর্যন্ত এই ভাবনাতেই উপনীত হলেন যশোধরা। তিনি পুত্রকে বললেন, ‘সূর্যাস্তের পূর্বে তুমি আমার কাছে আসবে। আমি সেসময় তোমার পিতা সম্পর্কে তোমাকে সম্যক পরিচয় দান করব।’ এরপর তিনি দাসী কঙ্কাকে ডেকে পুত্র রাহুলকে তার কক্ষে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বললেন এবং সে কার্য সম্পাদনের পর লেখার জন্য রেশম বস্ত্রখণ্ড, মসিদানি আর হাঁসের পালকের কলম আনতে বললেন।

কিছু সময়ের মধ্যেই আবেগমথিত হয়ে শ্লোক রচনা করতে বসলেন যশোধরা।

৬

এক সময় বিকাল হল। দাসী রাহুলকে পৌঁছে দিয়ে গেল তাঁর কক্ষে। ইতিমধ্যে শ্লোক রচনার কাজ সম্পন্ন করেছেন যশোধরা। নয়টি শ্লোক নিয়ে রচনা করেছেন ‘নরসিংহ গাথা’।

কক্ষের ঠিক মধ্যবর্তী স্থানে যেখানে বাতায়ন দিয়ে আলো প্রবেশ করেছে, সেখানে যশোধরা তাঁর পুত্রকে মৃত্তিকা আসনে বসিয়ে নিজে তার মুখোমুখি আসনে বসলেন। বেলাশেষের আলো এসে পড়েছে সিদ্ধার্থসন্তান বালক রাহুলের মুখমণ্ডলে। তার চোখের দৃষ্টি বলে দিচ্ছে যে, সে উদ্‌গ্রীব হয়ে আছে পিতার সম্পর্কে জানার জন্য।

সেই সুন্দর মুখমণ্ডলের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর যশোধরা তার মস্তক চুম্বন করে বললেন, ‘শোনো, আমি একটি গাথার মাধ্যমে তোমার মহান পিতার সম্পর্কে বিবৃত করব তোমাকে। আমি তোমাকে মূল শ্লোকগুলি একটি একটি করে শোনাব, আর তারপর শ্লোকের অর্থ জানাব।’

যশোধরা শ্লোকগুলি বস্ত্রখণ্ডের ওপর রচনা করলেও এমনভাবে তা যশোধরার হৃদয়ে গেঁথে রয়েছে যে সেগুলি আর দেখে পাঠ করার প্রয়োজন হল না। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর তিনি ‘নরসিংহ গাথা’-র প্রথম শ্লোকটি শোনালেন রাহুলকে—

‘চক্ক-বরঙ্কিত-রও-সুপাদো
লকখণ-মণ্ডিত-আযতপন্থি।
চামর-ছত্ত-বিভূসিত-পাদো-শরীরো
এসহি তুয্হ পিতা নরসিহো।’

শ্লোকটি শোনাবার পর যশোধরা বললেন, ‘এই শ্লোকের অর্থ হল—

‘যাঁর রক্তবর্ণ চরণ চক্র দ্বারা অলঙ্কৃত, যাঁর দীর্ঘ জঙ্ঘা শুভ লক্ষণসম্পন্ন, যাঁর চরণ শঙ্খ ও ছত্র দ্বারা অঙ্কিত হয়ে সুশোভিত হয়েছে, যিনি হলেন নরের মধ্যে সিংহ, তিনিই হলেন তোমার পিতা।’

যশোধরা এরপর একটার পর একটা শ্লোক ধীরে ধীরে আবৃত্তি করবার পর তার অর্থ বলতে লাগলেন পুত্র রাহুলকে।

দ্বিতীয় শ্লোক—

‘সক্য-কুমার-বরো সুখুমালো
লকখণ চিত্তিক-পুণ্ণ-সরীরো।
লোকহিতায গত নরবীরো
এসহি তুয্হ পিতা নরসিহো।’

‘অর্থাৎ, এ যে কুমার, তিনি হলেন শ্রেষ্ঠ শাক্য সুকুমার। এ যে সুন্দর চিহ্ন দ্বারা যুক্ত, সুন্দর শরীর দ্বারা সম্পন্ন, যিনি লোকহিতের জন্য গৃহত্যাগ করেছেন, এবং যিনি নরের মধ্যে সিংহ, তিনিই হলেন তোমার পিতা।’

তৃতীয় শ্লোক—

‘পুণ্ণ-সসঙ্ক-নিভো মুখবণ্ণো,
দেব-নরান পিযো নরনাগো।
মও গজিন্দ-বিলাসিত-গামী,
এসহি তুয্হ পিতা নরসিহো।’

‘অর্থাৎ, যাঁর মুখমণ্ডল পূর্ণচন্দ্রসম প্রকাশিত, যিনি নরের মধ্যে গজতুল্য, যিনি দেবতা ও নরের মধ্যে প্রিয়, যিনি প্রফুল্লিত গজরাজের মতো চলেছেন এবং যিনি নরের মধ্যে সিংহ, তিনিই হলেন তোমার পিতা।’

চতুর্থ শ্লোক—

‘খত্তিয-সম্ভব-অগ্গকুলীনো।
দেব-মনুস্স-নমস্সিত-পাদো।
সীল-সমাধি-পতিটিঠিত-চিত্তো,
এসহি তুয্হ পিতা নরসিহো।’

‘অর্থাৎ, এই যে যিনি অগ্র ক্ষত্রিয়কুলে জন্মগ্রহণ করেছেন, যাঁর চরণদ্বয় দেব-মনুষ্য সকলেই বন্দনা করে, যাঁর চিত্ত শীলসমাধিতে সুপ্রতিষ্ঠিত, এবং যিনি নরের মধ্যে সিংহ, তিনিই হলেন তোমার পিতা।’

পঞ্চম শ্লোক—

‘আযত-যুত্ত-সুসণ্ঠিত-নাসো,
গোপমুখো অভিনীল সুনেত্তো,
ইন্দ্রধনু-অভিনীল-ভমুকো,
এসহি তুয্হ পিতা নরসিহো।’

‘অর্থাৎ, যাঁর নাক হল চওড়া এবং সুডৌল, বাছুরের মতো যাঁর সুনীল পলক, যাঁর চক্ষুদ্বয় সুনীলবর্ণ, যাঁর ভ্রু-যুগল ইন্দ্র-ধনুর মতো এবং যিনি নরের মধ্যে সিংহ, তিনিই হলেন তোমার পিতা।’

ষষ্ঠ শ্লোক—

‘বট্ট-সুবট্ট-সুসণ্ঠিত-গীবো,
সীহহনু মিগরাজ সরীরো।
কঞ্চন-সুচ্ছবি-উত্তম বণ্ণো,
এসহি তুয্হ পিতা নরসিহো।’

‘অর্থাৎ, যাঁর ঘাড় বা গ্রীবা হল গোলাকৃতি ও সুগঠিত, যাঁর পৃষ্ঠদেশ মৃগরাজের মতো সমান, যাঁর বর্ণ হল সুবর্ণের মতো আকর্ষক, এবং যিনি নরের মধ্যে সিংহ, তিনিই হলেন তোমার পিতা।’

সপ্তম শ্লোক—

‘সিনিদ্ধ-সুগম্ভীর-মঞ্জু-সুঘোসো,
হিঙ্গুলবদ্ধ-সুরত্ত-সুজিবেহা।
বীসতি বীসতি সেত সুদন্তো,
এসহি তুয্হ পিতা নরসিহো।’

‘অর্থাৎ, যাঁর বাণী স্নিগ্ধ, গম্ভীর, সুন্দর, যাঁর জিহ্বা সিন্দুরের মতো রক্তবর্ণ, যাঁর মুখে বিশটি বিশটি দন্তের দু’টি সারি রয়েছে, এবং যিনি নরের মধ্যে সিংহ, তিনিই হলেন তোমার পিতা।’

অষ্টম শ্লোক—

‘অঞ্জন-বণ্ণ-সুনীল-সুকেসো,
কঞ্চন-পট্ট-বিসুদ্ধো-নলাটো,
ঔসধি-পণ্ডর-সুদ্ধ-সুবণ্ণো,
এসহি তুয্হ পিতা নরসিহো।’

‘অর্থাৎ, যাঁর কেশরাজি সুরমার মতো সুনীলবর্ণ, যাঁর ললাট হল কাঞ্চনের ন্যায় দীপ্তিমান, যাঁর ভ্রু-যুগলের মাঝখানের লোম ঔসধি তারার ন্যায় শুভ্রবর্ণ, এবং যিনি নরের মধ্যে সিংহ, তিনিই হলেন তোমার পিতা।’

নবম এবং অন্তিম শ্লোক—

‘গচ্ছন্তি নীলপথে বিয চন্দো,
তারগণা-পরিবেঠিত-রুপো।
সাবক-মজ্ঝাগতো সমণিন্দো,
এসহি তুয্হ পিতা নরসিহো।’

‘অর্থাৎ, যিনি আকাশে তারাঘেরা চন্দ্রের তুল্য অগ্রসর হচ্ছেন, যিনি শ্রমণদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ভিক্ষুদের দ্বারা চন্দ্রের মতো বেষ্টিত রয়েছেন, যিনি হলেন নরের মধ্যে সিংহ, তিনিই হলেন তোমার পিতা।’

গাথা শোনাবার পর পুত্রের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করার জন্য নিশ্চুপ হয়ে তার দিকে চেয়ে রইলেন যশোধরা। দিনের শেষ সূর্যকিরণে বড় স্নিগ্ধ লাগছে তাকে। পিতার সঙ্গে পুত্রের মুখমণ্ডলের বেশ খানিকটা সাদৃশ্য আছে। পিতা সম্পর্কে জানার পর সে বিস্ময়ে আনন্দে উদ্বেল, উদ্ভাসিত! কিছু সময়ের জন্য সে বাকরুদ্ধ হয়ে রইল। তারপর বলল, ‘আমি তবে সিংহপুত্র।’

যশোধরা জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, নরের মধ্যে তিনি শ্রেষ্ঠ মানব, তিনিই সিংহ, তিনি মহামানব মহাজ্ঞানী বুদ্ধ। তুমি তাঁরই পুত্র।’

রাহুল এরপর ব্যাকুল স্বরে জানতে চাইল, ‘পিতার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হবে না?’

যশোধরা বললেন, ‘নিশ্চয়ই হবে। তিনি যখন এ নগরীতে এসেছেন তখন তিনি নিশ্চয়ই প্রাসাদে আসবেন। তখন তোমার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হবে।’

‘তিনি কবে আসবেন প্রাসাদে?’ ব্যগ্রভাবে জানতে চাইল সিদ্ধার্থপুত্র রাহুল।

যশোধরা একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘বহুদিন পর মহাজ্ঞানী বুদ্ধরূপে তিনি ফিরে এসেছেন কপিলাবস্তুতে। তাঁর দর্শন লাভের জন্য, আশীর্বাদ গ্রহণের জন্য, তাঁর কাছ থেকে ধম্মকথা শোনার জন্য বহু মানুষ উপস্থিত হবেন তাঁর কাছে। তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাতের অবসরে তিনি নিশ্চয়ই তাঁর সময়ানুযায়ী কোনও একদিন কোনও এক সময় এ প্রাসাদে আসবেন।’

যশোধরা এ কথা বলার পর বেশ খানিকক্ষণ রাহুলের সঙ্গে বাক্যালাপ করলেন মহাজ্ঞানীর বিষয়ে। এক সময় সূর্যদেব পাটে গেলেন। ছায়াময় হয়ে উঠল সমগ্র কক্ষ। দাসী কঙ্কা যশোধরার কক্ষে প্রবেশ করল রাহুলকে তার পাঠকক্ষে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। পুত্রকে তার সঙ্গে পাঠাবার আগে তিনি কঙ্কার কাছে জানতে চাইলেন, ‘মহাজ্ঞানীর সম্পর্কে আর কিছু জানতে পারলি?’

কঙ্কা বলল, ‘হ্যাঁ, তাঁর কথাই তো সবাই আলোচনা করছে। শুনলাম, তিনি মধ্যাহ্ন পর্যন্ত নগরী পরিক্রমা করে, ভিক্ষা গ্রহণ করে তাঁর পর্ণকুটিরে ফিরে গেছেন। শুধু তণ্ডুল নয়, তাঁর এবং অন্য ভিক্ষুদের ভিক্ষাপাত্র বহুমূল্য উপহারে পূর্ণ হয়েছে।

‘শুনলাম, পরিক্রমণকালে এক শ্রেষ্ঠীর বধূ নাকি তার কণ্ঠ থেকে “মহাপ্রসাধনী” নামের এক হীরকমালা খুলে মহাজ্ঞানীর পদতলে অর্পণ করেন। অমন দুর্মূল্য রত্নমালা নাকি শাক্যবংশীয় কোনও রানি কোনোদিন ধারণ করবার সৌভাগ্য লাভ করেননি। তথাগত সেই মালা গ্রহণ করবার পর অপর একজনের হাতে তুলে দিয়ে তাঁকে নির্দেশ দিয়েছেন ওই মালার বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে যেন রোহিনী নদীতীরের অনাথ শিশু ও পঙ্গুদের জন্য বাসস্থান ও খাদ্যের ব্যবস্থা করা হয়।

‘তিনি নিজের ও তার সঙ্গী ভিক্ষুদের জন্য সামান্য কিছু তণ্ডুল রেখে ভিক্ষালব্ধ অন্য যাবতীয় সামগ্রী তুলে দিয়েছেন তাকে দর্শন করতে আসা গরীব মানুষদের হাতে। সবাই বলছেন তাঁর মতো দয়াশীল দানশীল মানুষ এ পৃথিবীতে আর দ্বিতীয় কেউ নেই।’

দাসীর মুখে এ কথাগুলো শ্রবণ করে গর্বে ফুলে উঠল ছোট্ট রাহুলের হৃদয়। যশোধরা মনে মনে মহাজ্ঞানীকে প্রণাম জানিয়ে মনে মনে বললেন, আমার মতো ভাগ্যবতী নারী আর কে আছে! যিনি আপনাকে পতিরূপে পেয়েছেন। নিজ কক্ষে চলে যাওয়ার পূর্বে রাহুল বলে গেল, ‘আমি কিন্তু পিতার সঙ্গে সাক্ষাতের প্রতীক্ষায় রইলাম।’ শুধু রাহুলের নয়, প্রতীক্ষা শুরু হল যশোধরারও!

৭

দেখতে দেখতে তিন দিবস অতিক্রান্ত হয়ে গেল। স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রতীক্ষা করে চলেছেন যশোধরা। পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার জন্য পুত্র রাহুলও যারপরনাই আকুল হয়ে পড়েছে। প্রতি বিকালেই সে এসে ‘নরসিংহ গাথা’ শোনে, তারপর যশোধরার কাছে জানতে চায়, ‘পিতার সঙ্গে কবে সাক্ষাৎ হবে মা? আমার যে পাঠে মন বসছে না।’

দাসী কঙ্কার মুখ থেকে ও অন্যদের মুখ থেকে সুযোগ পেলেই মহাজ্ঞানীর সম্পর্কে, তাঁর স্বামীর সম্পর্কে সংবাদ গ্রহণের চেষ্টা করছেন যশোধরা। তিনি জানতে পেরেছেন প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত অজস্র নগরবাসী তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছেন। তার মধ্যে ধনী থেকে গরীব, পুরুষ থেকে নারী সবাই আছেন। এমনকী পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলি থেকে, বহু দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে উপস্থিত হচ্ছেন তাঁর দর্শন লাভের জন্য।

বুদ্ধ তাঁদের কাউকে জীবনের দুঃখ থেকে মুক্তিলাভের পরামর্শ দান করছেন, ধম্ম উপদেশ দিচ্ছেন, প্রব্রজ্যা দান করছেন, মার্গদর্শন করাচ্ছেন। করুণাময়কে সব সময় ঘিরে থাকছেন তাঁর ভক্ত-ভিক্ষুসহ অসংখ্য সাধারণ মানুষ। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত অতিক্রম করেও তাঁর কাজের বিরাম নেই।

যশোধরার অনুমান, তিনি বহু বছর পর নগরীতে পদার্পণ করেছেন বলেই প্রাথমিক দিনগুলোতে এত জনসমাগম হচ্ছে তাঁকে দর্শনলাভের জন্য। নিশ্চয়ই আর কয়েক দিনের মধ্যে এই দর্শনপ্রার্থীদের ভিড় সামান্য কমবে। আর অবসর পেলেই তিনি নিশ্চয়ই সাক্ষাৎ করতে আসবেন তাঁর স্ত্রী-পুত্রের সঙ্গে।

সন্ধ্যার কিছু পরে যশোধরার কক্ষে এসে প্রবেশ করলেন মাতা গৌতমী। খানিক আগেই পুত্র রাহুল বিদায় নিয়েছে তাঁর কক্ষ থেকে। প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়েছে দাসী। রাহুল কক্ষ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর ভূমিতেই শুয়ে ছিলেন কাষায়বস্ত্র পরিহিতা, মুণ্ডিতমস্তক যশোধরা। মাতাকে কক্ষে প্রবেশ করতে দেখে তিনি উঠে দাঁড়িয়ে প্রণাম জানালেন। মাতা গৌতমী হেসে বললেন, ‘এখনও কি তুমি কাষায়বস্ত্র পরিধান করে থাকবে? ভূমিশয্যা গ্রহণ করে থাকবে? কিছু দিনের জন্য হলেও তো তিনি এখন কপিলাবস্তুতে এসে উপস্থিত হয়েছেন।’

যশোধরা বললেন, ‘আগে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হোক। তিনি আমাকে কী বলেন দেখি। তারপর তাঁর নির্দেশমতোই আমি পরিচালিত হব।’

‘তুমি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছ না কেন?’ জানতে চাইলেন রাজমাতা।

শ্বশ্রূমাতাকে সত্যি কথাই বলে ফেললেন যশোধরা, ‘যাচ্ছি না এতদিন পর তাঁকে সামনে থেকে দেখে যদি আমি আমার আবেগ, আনন্দাশ্রু নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি সেই আশঙ্কাতে। সব সময় ভিক্ষুদল ও সাক্ষাৎপ্রার্থী দ্বারা পরিবৃত হয়ে থাকেন তিনি। আমার আচরণে তিনি বিব্রত বোধ করতে পারেন। আর তা হোক আমি চাই না।’

যশোধরা অবশ্য আর একটা কথা বললেন না মাতা গৌতমীকে। তা হল, মহাজ্ঞানীর বুদ্ধত্বলাভের পর থেকেই মহাজ্ঞানীর নিকট যশোধরার একটি প্রশ্ন করার আছে। যা জনসমক্ষে করা সম্ভব নয়।

যশোধরা এরপর বললেন, ‘পুত্র রাহুলও বড় ব্যাকুল হয়ে উঠেছে তার পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার জন্য।’

গৌতমমাতা বললেন, ‘হ্যাঁ, তার ব্যাকুলতা আমিও প্রত্যক্ষ করেছি। সে আমার কাছেও জানতে চেয়েছে পিতার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ কবে হবে।’

যশোধরা জানতে চাইলেন, ‘আপনার সঙ্গে আপনার পুত্রের সাক্ষাৎ হয়েছে কি?’

মাতা গৌতমী বললেন, ‘না, সে অর্থে তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ বা বাক্যালাপ হয়নি। আমি তাঁর পরিক্রমণকালে তাঁকে দর্শন করেছি মাত্র। সে সময়ে মুহূর্তের জন্য তাঁর সঙ্গে আমার দৃষ্টি বিনিময় হয়েছে। তিনি তো এখন শুধু আমার পুত্র নন, কপিলাবস্তুর যুবরাজ সিদ্ধার্থ নন, তাঁর পরিচয় তিনি এখন মহাজ্ঞানী বুদ্ধ। সময়াভাবে তিনি হয়তো বা আমার সঙ্গে বা তোমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসতে পারছেন না। তবে আমি আর তাঁর আসার জন্য বেশি দিন প্রতীক্ষা করব না। কয়েক দিনের মধ্যে তিনি প্রাসাদে না এলে আমি নিজেই পুত্রের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাব বিশেষ এক অনুরোধ নিয়ে।’

‘কী অনুরোধ মাতা? আপত্তি না থাকলে জানতে পারি কি?’

মাতা গৌতমী বললেন, ‘না, আপত্তির কিছু নেই। আমি তাঁর কাছে এই অনুরোধ রাখব যে তিনি আমাকে ভিক্ষুণী হবার জন্য তাঁর সম্মতি প্রদান করুণ। আমি তাঁর ধম্ম গ্রহণ, প্রতিপালন ও প্রচার করতে চাই। ভিক্ষুণী সংঘের প্রতিষ্ঠা করতে চাই। তাঁর সঙ্গে পথপরিক্রমণে যেতে চাই যেমন অন্যান্য ভিক্ষুরা যায়।’

কথাটা শুনেই যশোধরা বললেন, ‘আমিও তো মহাজ্ঞানীর পথের পথিক হতে চাই, ভিক্ষুণী হতে চাই। আমি তো ভিক্ষুদের মতোই জীবন অতিবাহিত করি। তিনি যদি ভিক্ষুণীদের জন্য সংঘ তৈরি করবার অনুমতি দেন, তবে আমিও সংঘের সদস্য হব। মহাজ্ঞানীর সঙ্গে পথপরিক্রমা করব। এর চাইতে বেশি প্রাপ্তি আমার জীবনে কী আছে?’

রাজমাতা বললেন, ‘হ্যাঁ, তিনি যদি ভিক্ষুণী সংঘ প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেন, আমাদের ভিক্ষুণী হিসাবে গ্রহণ করেন তবে তার চাইতে আনন্দের আর কিছু হবে না। মহাজ্ঞানীর সাহচর্যে আমরাও একদিন নির্বাণলাভ করব।’

এ কথা বলে একটু থেমে তিনি বললেন, ‘কিন্তু আমি তুমি দু’জনেই যদি ভিক্ষুণী হই তবে রাহুলের কী হবে? তার ভবিষ্যতের কথাও তো চিন্তা করা প্রয়োজন। সে তো এখনও নিতান্তই বালক মাত্র।’

এ প্রশ্ন শুনে একটু থমকে গেলেন যশোধরা। তারপর ভেবে নিয়ে বললেন, ‘মহারাজ শুদ্ধোধন তো আছেনই। তিনি অত্যন্ত স্নেহ করেন রাহুলকে এবং সব সময় সতর্ক দৃষ্টি রাখেন তার প্রতি। শিক্ষকগণ আছেন, দাসীরা আছে, তারা কি আমার পুত্রকে বড় করে তুলতে পারবে না? পুত্র কাছে না থাকলে আমার কিছুটা বেদনা হবে ঠিকই! কিন্তু প্রয়োজনে পুত্রের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে তো কোনও বাধা নেই। মহারাজ শুদ্ধোধনের আদেশ-নির্দেশ অমান্য করবার ক্ষমতা এ প্রাসাদে কারও নেই। তিনি নিশ্চয়ই রাহুলকে উত্তম মানুষ রূপে গড়ে তুলবেন।’

মাতা গৌতমী বললেন, ‘মহারাজ শুদ্ধোধন প্রতিদিনই পুত্রের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছেন। বলা ভালো পুত্র নয়, মহাজ্ঞানী বুদ্ধের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছেন। মহাজ্ঞানীর “ধম্মকথা” শুনে তাঁর “ধম্মের” প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন কপিলাবস্তুর অধীশ্বর রাজা শুদ্ধোধন। তাঁর সঙ্গে আমার কিছু বাক্যালাপ হয়েছে। রাজার কথা শুনে আমার মনে হয়েছে তিনিও “ধম্ম” গ্রহণ করতে চান এবং বুদ্ধপ্রদর্শিত পথে চলে নির্বাণলাভ করতে চান।

‘অর্থাৎ রাজপ্রাসাদের ভোগবিলাস ত্যাগ করে সাধারণ মানুষের মতো কিংবা বুদ্ধের ইচ্ছাক্রমে সংঘজীবন কাটাতে চান শেষ বয়সে। সেক্ষেত্রে তিনি হয়তো তাঁর পুত্রদের সম্পত্তি বুঝিয়ে দিয়ে রাজপ্রাসাদ, রাজমুকুট এ সবই পরিত্যাগ করবেন। শাক্য প্রজাবর্গ পুনরায় আবার নতুন রাজা নির্বাচন করবে যেমন তারা নির্বাচন করেছিল মহারাজ শুদ্ধোধনকে।’

রাজা শুদ্ধোধনের সাম্প্রতিক ভাবনার কথা জানা ছিল না যশোধরার। তিনি উৎকণ্ঠার সঙ্গে বললেন, ‘মহাজ্ঞানী যদি ভিক্ষুণী সংঘ গঠনের অনুমতি দেন তবে কি পুত্র রাহুল যতদিন না বয়ঃপ্রাপ্ত হচ্ছে ততদিন সে সংঘে যুক্ত হতে পারব না আমি?’

মাতা গৌতমী জবাব দিলেন, ‘আগে দেখা যাক মহাজ্ঞানী কী বলেন! তারপর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।’

যশোধরা এবার নিশ্চুপভাবে ভাবতে লাগলেন রাজা শুদ্ধোধন যদি সত্যিই রাজমুকুট ত্যাগ করার সংকল্প গ্রহণ করেন, রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করেন তবে বালক রাহুলের কী হবে? এতদিন তো তাঁর আশ্রয়েই প্রতিপালিত হয়েছে সে।

এই একই প্রশ্ন সম্ভবত জেগে উঠল মাতা গৌতমীর মনেও। কারণ তিনিও একজন মাতা। পুত্রস্নেহ কাকে বলে তা তিনি জানেন।

বেশ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইলেন মাতা গৌতমী ও যশোধরা। তারপর রাজমাতা বললেন, ‘তোমাকে একটা উপদেশ দিই। তুমি কাল রাহুলকে তার পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পাঠাও। আর তাকে বলো সে যেন পিতার কাছে তার সম্পত্তির উত্তরাধিকার দাবি করে।’

এ কথা শুনে যশোধরা মৃদু বিস্ময়প্রকাশ করে জানতে চাইলেন, ‘মহাজ্ঞানীর কাছে সে সম্পত্তির উত্তরাধিকার দাবি করবে?’

মাতা গৌতমী বললেন, ‘রাজা শুদ্ধোধনের অবর্তমানে তাঁর সম্পত্তি নিয়মানুসারে তাঁর তিন সন্তান সিদ্ধার্থ, নন্দ ও নন্দার মধ্যে বণ্টিত হওয়া উচিত। রাহুল সিদ্ধার্থর সম্পত্তির অধিকার চেয়ে নিক। তিনি এখন বুদ্ধ। তাঁর আর বৈষয়িক সম্পত্তির বিষয়ে কোনও আগ্রহ নেই। তিনি পিতা শুদ্ধোধনের থেকে তাঁর সম্পত্তির অংশ বুঝে নিয়ে তা প্রদান করুন নিজপুত্র রাহুলকে। অথবা তিনি রাজা শুদ্ধোধনকে বলুন, যে রাজসম্পত্তিতে তাঁর অংশ যেন রাহুলকে প্রদান করেন মহারাজ।’

এ কথা বলে একটু চুপ করে থেকে মাতা গৌতমী বললেন, ‘তোমার মনে নিশ্চয়ই এ প্রশ্নের উদয় হচ্ছে, যে আমি হঠাৎ কেন সম্পত্তির অধিকারের প্রসঙ্গ উত্থাপন করলাম? এর পিছনে কিছু কারণ আছে। শাক্যকুলে যেমন সিদ্ধার্থর মতো মহাজ্ঞানী জন্মগ্রহণ করেছেন তেমন দেবদত্তর মতো কপট মানুষও জন্মেছে।

‘দেবদত্ত বরাবর ঈর্ষা করে এসেছে সিদ্ধার্থকে। সিদ্ধার্থ বোধিলাভ করবার পর তাঁর খ্যাতি ও সম্মান বৃদ্ধি তাকে আরও ঈর্ষান্বিত করে তুলেছে। তোমার প্রতিও তার আক্রোশ কম নয়। কারণ, তুমি দেবদত্তকে প্রত্যাখ্যান করে সিদ্ধার্থর গলায় বরমাল্য দিয়েছিলে।

‘দেবদত্ত শুধু মহাজ্ঞানীরই নয়, সমগ্র রাজপরিবারের ক্ষতি কামনা করে। সে হয়তো ভবিষ্যতে নন্দ ও নন্দাকে কোনও কু-পরামর্শ দিল। আর তারা দু’জন এই দাবি করে বসল সে সিদ্ধার্থ যখন নিজে তাঁর সম্পত্তির অংশ গ্রহণ করেননি তখন সেই অংশ রাহুলকে বঞ্চিত করে তাদের দু’জনের মধ্যে বণ্টিত হোক।

‘তাছাড়া এমনও তো হতে পারে, মহারাজ শুদ্ধোধন সিংহাসন ত্যাগ করবার পূর্বেই দেহত্যাগ করলেন। তিনি তো ধীরে ধীরে বার্ধক্যের দিকে এগোচ্ছেন। প্রকৃতির নিয়মে এ ঘটনা অস্বাভাবিক কিছু নয়। মহাজ্ঞানী বুদ্ধ তো বলেন যে জরা ও মৃত্যুকে প্রতিহত করবার ক্ষমতা এ পৃথিবীতে কোনও জীবিত প্রাণীর নেই, এমনকী তাঁরও নেই।

‘রাজা শুদ্ধোধন দেহত্যাগ করলে বা তাঁর সিংহাসন পরিত্যাগের পর যিনি নতুন রাজা নির্বাচিত হবেন তিনি রাহুলের সম্পত্তির অধিকার নাও মানতে পারেন। কাজেই এখন যখন মহাজ্ঞানী ও মহারাজ দু’জনেই কপিলাবস্তুতে অবস্থান করছেন তখন পিতার কাছ থেকে রাহুলের নিজের সম্পত্তির অধিকার বুঝে নেওয়াই শ্রেয়। আর রাহুল সেই সম্পত্তি লাভ করলে আমাদের অবর্তমানে তার ভবিষ্যৎ জীবন সুরক্ষিত থাকবে।’ একটানা কথাগুলো বলে থামলেন মাতা গৌতমী।

এসব শুনে পুত্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এবার সত্যিই শঙ্কা জাগল যশোধরার মনে। তিনি কখনও এ বিষয়ে এত বিস্তৃতভাবে ভাবেনি। বিশেষত ওই ‘দেবদত্ত’ নামটা যশোধরার মনের শঙ্কাকে যেন দ্বিগুণ বৃদ্ধি করল। সে করতে পারে না এমন কুকর্ম নেই, সে বড়ই প্রতিহিংসাপরায়ণ। মাতা গৌতমী সঠিক কথাই বলেছেন। সে সুযোগ পেলেই প্রতিশোধগ্রহণের চেষ্টা করবে। শঙ্কিত যশোধরা জানতে চাইলেন, ‘তবে কি আমি কালই পুত্রকে মহাজ্ঞানীর নিকট প্রেরণ করব?’

মাতা বললেন, ‘হ্যাঁ, তাই করো।’

৮

পরদিন প্রভাতে পুত্র রাহুলকে নিজের কক্ষে আনয়ন করালেন যশোধরা। তিনি তাকে বললেন, ‘আজ তুমি তোমার পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাবে।’

কথাটা শোনামাত্র বালক রাহুল অতিশয় উৎফুল্ল হয়ে উঠল। দাসীদের সাহায্যে স্নান করিয়ে তাকে সোনার সুতোয় বোনা রেশমবস্ত্রে সজ্জিত করলেন যশোধরা। স্বর্ণ অলংকারও পরিধান করালেন তাকে। যাতে নিজ পুত্রকে দেখে তার পিতা বুঝতে পারেন যে তাঁর অবর্তমানে পুত্র রাহুলকে সযত্নে লালন করেছেন যশোধরা। তারপর তিনি পাঁচটি পদ্ম বালক রাহুলের হাতে ধরিয়ে দিয়ে তাকে বললেন, ‘এই পদ্মগুলো তুমি তোমার পিতার চরণে নিবেদন করে তাঁকে প্রণাম জানাবে। মহাজ্ঞানীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে তাঁদের চরণে পুষ্প নিবেদন করাই প্রথা।’

কিন্তু যশোধরা পুত্রের হাতে পাঁচটি পদ্ম দিলেন মহাজ্ঞানীকে একটি বিশেষ ঘটনা স্মরণ করাবার জন্য। যাতে যশোধরার সঙ্গে তাঁর পূর্বজন্মের সেই প্রথম সাক্ষাতের কথা মনে পড়ে। তারপর তিনি রাহুলকে বললেন, ‘তুমি পিতার সঙ্গে বাক্যালাপের সময় তাঁর কাছ থেকে তাঁর সম্পত্তির উত্তরাধিকার দাবি করবে।’

বালক পুত্র যশোধরার এ নির্দেশের অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবন করতে পারল না। সে ভাবল, পিতার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎকারে সম্পত্তির দাবি করাটাই মনে হয় রীতি। সে উৎসাহের সঙ্গে বলল, ‘অবশ্যই করব মাতা।’

যশোধরা পুত্রের মস্তক চুম্বন করে বললেন, ‘এবার তুমি পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার জন্য রওনা হও। তিনি মহাজ্ঞানী। তাঁর প্রতিটা কথা তুমি মনোযোগ সহকারে শুনবে। আর প্রাসাদে ফিরে এসে সে কথা আমাকে জানাবে।’

রাহুল জানতে চাইল, ‘তুমি আমার সঙ্গে যাবে না?’

যশোধরা একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘না পুত্র, তুমি যাও। পিতার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য তুমি অতি ব্যাকুল হয়ে উঠেছ বলে তোমাকে তাঁর নিকট পাঠাচ্ছি। অবসরে যখন তিনি প্রাসাদে আসবেন তখন আমি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করব।’

রাহুল আর কোনও বাক্যালাপ না করে মাতাকে প্রণাম জানিয়ে কক্ষ ত্যাগ করল। পুত্রের যাওয়ার জন্য সব ব্যবস্থাই করে রেখেছিলেন যশোধরা। অলিন্দ থেকে তিনি দেখলেন কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি ক্ষুদ্রাকৃতি অশ্বের পিঠে চেপে কয়েকজন দাসী ও রক্ষী পরিবৃত হয়ে রাহুল রওনা হয়ে গেল তার মহাজ্ঞানী পিতার উদ্দেশে।

নির্মল আলোকোজ্জ্বল দিন। নগরীকে ঘিরে থাকা সবুজ পাহাড়শ্রেণী সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে। আর তাদের পশ্চাদ্ভাগে যে সব গগনচুম্বী পর্বত শৃঙ্গগুলি আকাশকে স্পর্শ করেছে, তাদের কিরীটসমূহ সূর্যালোকে রক্তিমবর্ণ ধারণ করেছে। কুলুকুলু শব্দে প্রবাহিত হচ্ছে তটিনী। পক্ষীকুলের মিষ্ট কলতান ছড়িয়ে পড়েছে বাতাসে।

বৃক্ষতলে অবস্থান করছিলেন মহাজ্ঞানী। ভিক্ষুদল ঘিরে আছে তাঁকে। সূর্যসম আভা যেন বিচ্ছুরিত হচ্ছে মহাতাপসের শরীর থেকে। করুণাঘন অক্ষিপল্লব তার, মুখমণ্ডলে জেগে আছে স্নিগ্ধ প্রশান্তি। এখনও তেমন বেলা না হওয়ায় দর্শনার্থীর সংখ্যা বেশি নেই। কয়েকজন শুধু তাঁর সামনে বসে ধম্মকথা, তাঁর জীবনকথা শুনছিল।

বুদ্ধবাণীর সবচাইতে আকর্ষণীয় দিক হল তার সরলতা। যা নিরক্ষর বা অতি সাধারণ মানুষেরাও বুঝতে পারেন। নিজের জীবনের ছোট ছোট ঘটনা বিবৃত করে মহাজ্ঞানী তা সাধারণ মানুষদের বোঝাবার চেষ্টা করেন।

আজও এই সুন্দর প্রভাতকালে ভক্তদের উদ্দেশে তেমনভাবেই তাঁর ‘ধম্ম’ বোঝাচ্ছিলেন অমিতাভ। এমন সময়ে সেখানে বালক রাহুল উপস্থিত হয়ে অশ্ব থেকে নেমে এক পাশে দাঁড়াল। অবাকদৃষ্টিতে সে তাকিয়ে দেখতে লাগল মহাজ্ঞানীকে। আর স্মরণ করতে লাগল ‘নরসিংহ গাথা’-র কথা। হ্যাঁ, তার মাতা সে গাথাতে তার পিতার সম্পর্কে যা বিবৃত করেছেন তিনি ঠিক তেমনই। এমন উজ্জ্বল, স্নিগ্ধ পুরুষ ইতিপূর্বে সে কখনও দেখেনি।

মহাজ্ঞানী তখন তাঁর ভক্তদের উদ্দেশে বলছিলেন, ‘প্রেম আর ভালোবাসাই হল মানবজীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ। হিংসা পরিত্যাগ করে ভালোবাসা দিয়ে পৃথিবীর সব কিছু জয় করা যায়। শুধু মানুষের ক্ষেত্রে নয়, জীবজগতের অন্য সকল প্রাণীর ক্ষেত্রেও এ সত্য প্রযোজ্য।

‘তোমাদের একটা কাহিনি শোনাই। তোমরা হয়তো জানো যে উরুবিলাতে জ্ঞানলাভ করবার পর সে স্থান থেকে আমি বারাণসী রাজ্যের অধীনে অবস্থিত মৃগদাবতে যাই, এবং সে স্থানে অহল্যাপূজার পূর্ণিমার রাতে “ধম্মচক্রপ্রবর্তন” করি। অর্থাৎ আমার পাঁচ সঙ্গীকে আমি প্রথম আমার “ধম্ম” বিষয়ক জ্ঞান প্রদান করি এবং সে স্থানেই প্রথম সংঘ প্রতিষ্ঠা হয়।

‘ওই অঞ্চলকে আমি ধম্মচক্রপ্রবর্তনের স্থান হিসাবে নির্বাচন করেছিলাম তার স্থান মাহাত্ম্যের কারণে। বহুকাল পূর্বে ওই স্থান জঙ্গলাকীর্ণ ছিল। অন্যান্য নানা প্রাণীদের মধ্যে মৃগকুলও বিচরণ করত সেই জঙ্গলে। কিন্তু তারা নিরাপদ ছিল না। ব্যাধেরা চর্ম-মাংসের লোভে তাদের শিকার করত, রাজা ও রাজপুরুষরা মৃগয়া ক্রিয়ার জন্য তাদের নির্বিচারে হত্যা করত।

‘একদা কাশীরাজ সে স্থানে মৃগয়ায় গিয়েছিলেন। সারাদিন নানা পশু-পাখিদের বধ করবার পর সূর্যাস্তের পূর্বে তিনি যখন বন থেকে বাহির হতে যাচ্ছেন তখন তিনি বিশালাকার এক হরিণীর দেখা পেলেন। কী সুন্দর তার চামড়ার উজ্জ্বল রং, ঠিক যেন সোনার হরিণী!

‘রাজা তাকে বধ করবেন বলে স্থির করলেন। হরিণীটা তাঁকে দেখে পালাতে সক্ষম হল না। কারণ, কাছেই এক ঝোপের মধ্যে তার সদ্যোজাত সন্তান ছিল। রাজা তাকে দেখেননি। সারাদিন মৃগয়ার পর কাশীরাজের তূণীরে তখন একটামাত্র তির অবশিষ্ট ছিল। তিনি যখন ধনুকে তির যোজন কারে লক্ষ্যস্থির করলেন ঠিক তখনই গাছের আড়াল থেকে বিশালাকৃতি এক পুরুষ হরিণ এসে তার স্ত্রীর শরীর আগলে দাঁড়িয়ে রইল রাজার দিকে চেয়ে।

‘যেন সে বলছে, “চাইলে তুমি আমাকে বধ করো, কিন্তু আমার স্ত্রীকে নয়।” হরিণের চোখের দৃষ্টি যেন পাঠ করতে পারলেন কাশীরাজ। হরিণ মানুষ নয়, সামান্য পশু মাত্র। কিন্তু স্ত্রীর প্রতি তার ভালোবাসা দেখে বিগলিত হয়ে উঠল রাজার হৃদয়। হিংসা পরিত্যাগ করলেন তিনি। বুঝতে পারলেন, প্রেমই এই জগতের শ্রেষ্ঠ বস্তু।

‘তিনি সংকল্প করলেন তিনি আর কখনও মনোরঞ্জনের জন্য প্রাণীহত্যা করবেন না। শুধু তাই নয় ওই স্থানটিকে তিনি “মৃগদাব” বলে ঘোষণা করলেন। যেখানে নির্ভয়ে বিচরণ করতে পারবে হরিণেরা।

‘ওই বনে তিনি যে-কোনও ধরনের পশু-পাখি শিকারও নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন। সেই হরিণ তার পত্নীর প্রতি নিজের জীবনের বিনিময়ে ভালোবাসা প্রদর্শন করে জয় করেছিল কাশীরাজের হৃদয়কে। ওই মৃগদাবের সঙ্গে ভালোবাসার মাধ্যমে হিংসাকে জয় করবার কাহিনি জড়িয়ে আছে বলেই আমি ওই স্থানে ধম্মচক্রপ্রবর্তন করেছিলাম।’

এ কথা বলার পর মহাজ্ঞানী শ্রোতাদের উদ্দেশে বললেন, ‘তোমরা কখনও প্রেম ভালোবাসার পথ ত্যাগ কোরো না, কদাপি হিংসার আশ্রয় গ্রহণ কোরো না, এমনকী তোমাদের শত্রুদের প্রতিও নয়। তাদেরও তোমরা প্রেম ভালোবাসা দিয়ে, ক্ষমা দিয়ে জয় করবার চেষ্টা করবে। আমার “ধম্মের” সার কথা হল এই।’

তথাগতর মুখনিঃসৃত এই চমৎকার কাহিনি শুনে উপস্থিত সবাই বলে উঠল, ‘সাধু! সাধু!’ এ কাহিনি শ্রবণ করে বালক রাহুলও চমৎকৃত বোধ করল।

এরপর সে ধীর পায়ে তার পিতার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার মুখমণ্ডল, শরীরের গঠন ও তার হাতের পাঁচটি পদ্ম দেখে প্রথম দর্শনেই নিজ পুত্রকে চিনতে পারলেন মহাজ্ঞানী। বালককে তার পরিচয় জিগ্যেস করবার প্রয়োজন হল না। সস্নেহে পুত্রের দিকে চেয়ে তাকে নিরীক্ষণ করতে লাগলেন। পিতাকে প্রথমবার দর্শনের ঘোর কাটিয়ে, পদ্মগুলি তাঁর চরণতলে রেখে তাঁকে প্রণাম জানিয়ে নিজের পরিচয় জানাতে বালক বলল, ‘আমি রাহুল। আমার মাতার নাম যশোধরা। আমি আপনার পুত্র।’

এ কথা শুনে মহাজ্ঞানী কৌতুকের ছলে পুত্রকে বললেন, ‘তুমি আমাকে তোমার পিতা বলে চিনলে কীভাবে?’

রাহুল জবাব দিল, ‘আমার মাতার মুখ থেকে আমি আপনার বিরবণ শুনেছি। তিনি আপনার সম্পর্কে নয়টি শ্লোকসম্পন্ন গাথা রচনা করে আমাকে শুনিয়েছেন। তাই আপনিই যে আমার পিতা, তা আমি বুঝতে পেরেছি, চিনতে পেরেছি আপনাকে।’

মহাজ্ঞানীর পূর্বাশ্রমকালে তাঁকে শ্লোক রচনা করে শোনাতেন স্ত্রী যশোধরা। সব কথাই স্মরণে আছে তাঁর। তিনি কৌতূহলী হয়ে পুত্রকে বললেন, ‘কী শ্লোক? শোনাও দেখি।’

পিতার নির্দেশ শুনে গাথার প্রথম শ্লোক আবৃত্তি করল সিদ্ধার্থপুত্র রাহুল—

‘যাঁর রক্তবর্ণ চরণ চক্র দ্বারা অলঙ্কৃত,
যাঁর দীর্ঘ জঙ্ঘা শুভ লক্ষণসম্পন্ন,
যাঁর চরণ শঙ্খ ও ছত্র দ্বারা অঙ্কিত হয়ে সুশোভিত হয়েছে,
যিনি হলেন নরের মধ্যে সিংহ,
তিনিই তোমার পিতা।’

যশোধরার বলা শ্লোকগুলো যেন গেঁথে বসেছিল পুত্র রাহুলের মনে। তাই এরপর রাহুল ধীরে ধীরে বাকি শ্লোকগুলোও আবৃত্তি করে শোনাল তার পিতাকে। তা শ্রবণ করবার পর কিছু সময় স্তব্ধ হয়ে মহাজ্ঞানী করুণাঘন চোখে চেয়ে রইলেন পুত্রের দিকে। তারপর আশীর্বাদের ভঙ্গিতে রাহুলের উদ্দেশে দক্ষিণ হস্ত উত্থিত করলেন। তিনি তাকে জিগ্যেস করলেন, ‘তুমি কি শুধুই আমাকে দর্শন করতে এসেছ, নাকি পিতার কাছে তোমার কোনও প্রার্থনা আছে?’

পুত্র রাহুল, পিতার মুখ থেকে এ কথা শুনে মাতা যশোধরার শিখিয়ে দেওয়া প্রার্থনার কথা বলল, ‘পিতা, শাক্য রাজপরিবারের সন্তানরূপে আপনার সম্পত্তির যে অংশ আছে তা আপনি আমাকে দান করুন। মাতা আমাকে আপনার নিকট এ অধিকার দাবি করতে বলেছেন।’

‘আমি সন্ন্যাসী। আমি যেদিন থেকে কপিলাবস্তুর রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করেছি সেদিন থেকেই আমি এই সম্পত্তির ওপর আমার সমস্ত অধিকার মন থেকে পরিত্যাগ করেছি। যে অংশ বা অধিকার আমার নেই তা কীভাবে তোমাকে দান করি পুত্র! আর এই পীতবসন, ভিক্ষাপাত্র আর ভ্রমণদণ্ড ব্যতীত আমার নিজস্ব বলতে আর কিছুই নেই।

‘অনেক মানুষ অনেক সময় আমার এই ভিক্ষাপাত্রে অর্থ, স্বর্ণ বা রত্ন প্রদান করেন ঠিকই। তবে সে সকল বস্তু আমার নয়। তা সংঘের সম্পদ হিসাবে নির্ধারিত হয়। সংঘের ভিক্ষু মণ্ডলী সে সম্পদ জনহিতকর কার্যে ব্যবহার করেন। তোমাকে দেওয়ার মতো জাগতিক সম্পদ আমার কিছুই নেই পুত্র। আর ভবিষ্যতেও আমার পক্ষে তা লাভ করা সম্ভব নয়।’

পিতা তার দাবি প্রত্যাখ্যান করায় তার কী বলা উচিত তা বুঝতে না পেরে বালক রাহুল চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

মহাজ্ঞানী বুদ্ধ এরপর নরমস্বরে তাকে বললেন, ‘শোনো পুত্র, আমার ব্যক্তিগত জিনিস বলতে যা আছে তা হল জ্ঞান। তুমি যদি তা গ্রহণ করতে চাও তবে তা অবশ্যই আমি তোমাকে দিতে পারি। তার জন্য তোমাকে নবীন সন্ন্যাসীরূপে অন্তত কিছুকাল আমার সঙ্গে বা ভিক্ষু সংঘে কাটাতে হবে। তুমি এখনও নিতান্তই বালক। এ সিদ্ধান্তগ্রহণের সামর্থ্য তোমার নেই।

‘তোমার মাতা যদি তোমাকে নবীন সন্ন্যাসী হওয়ার অনুমতি দেন তবে সংঘ তোমাকে নিশ্চয়ই গ্রহণ করবে। একটা সত্য জেনো পুত্র, জ্ঞানের চেয়ে বড় সম্পদ এ পৃথিবীতে আর কিছু নেই। আগামী পরশু কয়েকজনকে উপসম্পদা প্রদানের মাধ্যমে সংঘে গ্রহণ করা হবে। তোমার মাতা যদি সম্মত হন তবে সেদিন তোমাকেও উপসম্পদা প্রদানের ব্যবস্থা করব।’

রাহুল বলল, ‘আমি প্রাসাদে ফিরে অবশ্যই মাতাকে এ কথা জানাব।’

এরপর এক বিশাল ভক্তকুল সে স্থানে এসে উপস্থিত হল। তাঁরা ‘বুদ্ধকথা’ শুনতে এসেছে বহুদূর থেকে। তাদের প্রতি এবার মনোনিবেশ করতে হবে মহাজ্ঞানীকে। বালক হলেও বিষয়টা অনুমান করতে পারল রাহুল। সে পিতাকে প্রণাম জানিয়ে প্রাসাদে ফেরার পথ ধরল।

৯

নিজ কক্ষে পুত্রের প্রত্যাবর্তনের জন্য অস্থিরভাবে পদচারণা করছিলেন রাহুলমাতা যশোধরা। রাহুল প্রাসাদে ফিরে তাঁর কক্ষে প্রবেশ করতেই যশোধরা তাকে আলিঙ্গন করে মৃদু উত্তেজিতভাবে জানতে চাইলেন, ‘পিতার সঙ্গে তোমার সাক্ষাৎ হয়েছে? কী বললেন তিনি?’

‘হ্যাঁ মাতা, সাক্ষাৎ, বাক্যালাপ দুই-ই হয়েছে। তুমি যেমন বলেছিলে তেমনই মধুর স্বভাবের মানুষ তিনি।’

নিজের অজান্তেই যশোধরা পুত্রকে জিগ্যেস করে বসলেন, ‘তিনি আমার সম্পর্কে তোমাকে কিছু জিগ্যেস করেছেন?’

রাহুল উত্তর দিল, ‘না, মাতা। তবে তোমার কথা আমি তাঁর কাছে উল্লেখ করে তাঁকে “নরসিংহ গাথা” শুনিয়েছি।’

‘তিনি কি তোমাকে তাঁর রাজসম্পত্তির অংশ প্রদান করতে সম্মতি প্রকাশ করেছেন?’

রাহুল বলল, ‘তিনি বলেছেন, রাজসম্পদের অংশ দান করতে তিনি অপারগ। তবে তার চেয়েও বড় সম্পদ তিনি আমাকে দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।’

‘রাজসম্পত্তির চেয়েও বড় সম্পদ! তা কী পুত্র?’ বিস্মিতভাবে জানতে চাইলেন যশোধরা।

রাহুল বলল, ‘পিতা বলেছেন, সর্বাপেক্ষা বড় সম্পদ হল জ্ঞান। যা তিনি আমাকে প্রদান করতে সম্মত হয়েছেন।’

রাহুলের এ কথা যশোধরার মনে কৌতূহলের উদ্রেক ঘটাল। তিনি রাহুলকে বললেন, ‘তুমি আমাকে মহাজ্ঞানীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও তাঁর সঙ্গে তোমার কথোপকথন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবৃত করো।’

সে কাজই করল রাহুল। বুদ্ধসমীপে উপস্থিত হওয়ার পর থেকে মহাজ্ঞানী যে কাহিনি তাঁর ভক্তদের শুনিয়েছেন, সেই হরিণ-হরিণী থেকে শুরু করে, তারপর পিতা-পুত্রের মধ্যেকার বাক্যালাপ—সব কিছুই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সে ব্যক্ত করল মাতা যশোধরার কাছে।

মৃগদাবতে মহাজ্ঞানীর ধম্মচক্রপ্রবর্তনের কথা জানেন যশোধরা। কিন্তু তা শুনে নিজের মনে লুকিয়ে থাকা প্রশ্নটা আবার উঁকি দিল। যদিও তিনি তা পুত্রের সামনে প্রকাশ করলেন না। এরপর যশোধরা জানতে চাইলেন, ‘তুমি কি উপসম্পদা গ্রহণ করতে চাও?’

রাহুল পিতার সুযোগ্য পুত্রের মতো উত্তর দিল, ‘আমি জ্ঞান আহরণও করতে চাই, আবার পিতা-মাতা দু’জনেরই সান্নিধ্য লাভ করতে চাই।’

‘রাহুল’ শব্দের অর্থ হল ‘বন্ধন।’ এ বন্ধন কি ছিন্ন করতে পারবেন যশোধরা? তিনি বুঝতে পারলেন এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে তাঁর কিঞ্চিৎ ভাববার প্রয়োজন আছে।

তিনি রাহুলকে বললেন, ‘তোমার পিতা সঠিক কথাই বলেছেন। জ্ঞানই হল জগতের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। তবে আমার সিদ্ধান্তের কথা আমি নির্দিষ্ট সময়ে জানিয়ে দেব তোমাকে।’

সময় মধ্যাহ্নে উপনীত হয়েছে। যশোধরা দাসীকে ডেকে রাহুলকে অন্নগ্রহণের জন্য পাঠিয়ে দিলেন।

রাহুল কক্ষ ত্যাগ করার পর মহাজ্ঞানীর দেওয়া প্রস্তাব নিয়ে ভাবতে শুরু করলেন রাজবধূ যশোধরা। মহাজ্ঞানীর মতো শিক্ষক এ পৃথিবীতে আর কে আছেন? তিনি যদি পুত্রকে শিক্ষা দান করেন তবে সে শিক্ষা সর্বোত্তম হবে। কিন্তু পুত্র রাহুল যে তাঁর একমাত্র অবলম্বন! তাঁর কী করা উচিত, সে বিষয়ে ভাবতে লাগলেন যশোধরা।

দুপুর গড়িয়ে বিকাল হল একসময়। রাহুল দ্বিতীয়বারের জন্য তার মাতার কক্ষে প্রবেশ করল। মায়ের ক্রোড়ে আসীন হয়ে সে তার পিতাকে প্রথমবার দর্শনের অনুভূতির কথা ব্যক্ত করতে লাগল। তার কথা শুনে যশোধরা বুঝতে পারলেন, বালক হলেও পিতাকে প্রথমবারই দর্শন করে, তাঁর করুণাময় রূপ দর্শন করে, তাঁর বাণী শ্রবণ করে মহাজ্ঞানীর প্রতি যথেষ্ট আকর্ষণ বোধ করছে পুত্র রাহুল। পিতার সঙ্গলাভের বিষয়ে যথেষ্ট আগ্রহ বোধ করছে সে।

ইতিমধ্যে যশোধরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন যে তিনি মহাজ্ঞানীর প্রস্তাবে সায় দেবেন কিনা। কিন্তু যশোধরার মনে হল, রাহুলকে তাঁর সিদ্ধান্ত জানাবার পূর্বে একবার মাতা গৌতমীর সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়া প্রয়োজন। কারণ তিনিও এক অর্থে রাহুলের অভিভাবিকা, আর তিনিই তো রাহুলকে তাঁর পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার জন্য পাঠাতে বলেছিলেন, রাহুলকে তার পিতার কাছে রাজসম্পত্তির অধিকার দাবি করতে বলেছিলেন। তাই রাহুলকে তাঁর সিদ্ধান্তের কথা তখনই জানালেন না যশোধরা।

সূর্য ডুবে গেল। দাসীরা এসে প্রদীপ প্রজ্বলন করে রাহুলকে তার পাঠকক্ষে নিয়ে গেল। প্রজ্বলিত প্রদীপশিখার দিকে চেয়ে রাহুলের মুখ থেকে শোনা মহাজ্ঞানীর কথা ভাবতে লাগলেন যশোধরা। বিশেষত হরিণ-হরিণীর কাহিনিটি শুনে বেশ চমৎকৃত বোধ করেছেন তিনি। হয়তো মহাজ্ঞানী বলেই তিনি এমন সরল সুন্দর কাহিনির মাধ্যমে নিজের বক্তব্য শিষ্যদের সামনে উপস্থিত করতে পেরেছেন।

বেশ খানিকটা সময় নিজ কক্ষে বসে তাঁর স্বামীর কথা ভেবে সময় অতিবাহিত করার পর যশোধরা নিজ কক্ষ ত্যাগ করে চললেন মাতা গৌতমীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য।

রাজমাতার কক্ষের দ্বারে এসে উপস্থিত হলেন যশোধরা। মাতার কক্ষটি প্রাসাদের নির্জন স্থানে অবস্থিত। প্রতি সন্ধ্যায় কিছু সময়ের জন্য ধ্যানে বসেন মাতা গৌতমী। এ স্থানে লোকসমাগম নেই বলে, ধ্যানের বিঘ্ন ঘটবে না বলে দ্বার উন্মুক্ত রেখেই চক্ষু মুদে ধ্যানে বসেছিলেন মাতা।

যশোধরা কক্ষের ভিতর উঁকি দিয়ে দেখলেন, মাতা গৌতমীর ধ্যান তখনও ভঙ্গ হয়নি। কক্ষে একটি প্রদীপ জ্বলছে, তার উজ্জ্বল আভা ছড়িয়ে পড়েছে মাতার মুখমণ্ডলে। শান্ত-সমাহিত লাবণ্যময় সেই মুখমণ্ডল! যা দেখে মনে হয় তিনি শুধু সিদ্ধার্থর পালকমাতা নন, তিনি জগন্মাতা। সবার মঙ্গলকামনা করেন তিনি।

সিদ্ধার্থ তাঁর গর্ভজাত সন্তান নন ঠিকই। তবু সিদ্ধার্থর জন্মদাত্রী মাতা মায়াদেবীর মৃত্যুর পর তাঁকে বুকে তুলে নিয়েছিলেন মাতা গৌতমী। নিজের গর্ভজাত আরও দুই সন্তান থাকা সত্ত্বেও সিদ্ধার্থকেই সর্বাপেক্ষা অধিক ভালোবাসা দিয়েছেন তিনি। তা দেখে অনেকেই ভাবতেন, সিদ্ধার্থ নিশ্চয়ই তাঁর গর্ভজাত সন্তান। সে কারণে গৌতমী পুত্র হিসাবে সিদ্ধার্থ পরিচিত হন ‘গৌতম’ নামে। এবং সিদ্ধার্থ অপেক্ষা ‘গৌতম বুদ্ধ’ নামেই মহাজ্ঞানী বিশেষ পরিচিত।

শুধু সিদ্ধার্থকে নিজ স্তন্য পান করিয়ে তাঁর জীবনদানই নয়, নিজের জীবন বিপন্ন করেও তিনি রক্ষা করেছিলেন গৌতমকে। সিদ্ধার্থর গৃহত্যাগ প্রচণ্ড ক্রোধের জন্ম দিয়েছিল কোলীয়রাজ সুপ্পবুদ্ধের মনে। মাতা গৌতমী সম্পর্কে সুপ্পবুদ্ধের ভগিনী। গৃহত্যাগের পর সিদ্ধার্থ যখন বুদ্ধ হলেন তখন একবার তিনি পথপরিক্রমা করতে করতে উপস্থিত হয়েছিলেন কোলীয় রাজ্যের সীমান্তবর্তী অন্য এক রাজ্যে। সে খবর পৌঁছে গিয়েছিল সুপ্পবুদ্ধের কানে।

মদ্যপান করে সুপ্পবুদ্ধ যখন সে রাজ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন বুদ্ধকে হত্যা করার জন্য তখন কোলীয়রাজ আর তাঁর বাহিনীর গতিরোধ করেন মাতা গৌতমী। তিনি একাকী সুপ্পবুদ্ধের সামনে উপস্থিত হয়ে বলেন, ‘আমাকে হত্যা না করে আপনি আর এক পা-ও অগ্রসর হতে পারবেন না।’ তাঁর এই আচরণের জন্য সেসময় বুদ্ধহত্যার পরিকল্পনা স্থগিত রাখতে বাধ্য হন রাজা সুপ্পবুদ্ধ।

কুমার দেবদত্তও একবার বিষপ্রয়োগের মাধ্যমে গুপ্তহত্যার চেষ্টা করেছিলেন সিদ্ধার্থকে। তার সেই কূট চালও ব্যর্থ করে দেন মাতা গৌতমী। তিনি অসীম স্নেহ করেন যশোধরাকেও। সিদ্ধার্থর সঙ্গে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হবার পর, স্বামীর গৃহত্যাগের পর পিতা সুপ্পবুদ্ধের শত অনুরোধ সত্ত্বেও কোনোদিন কোলীয় রাজ্যে পা রাখেননি যশোধরা। ফলে তাঁর আর সুযোগ ঘটেনি নিজের জন্মদাত্রী মাতা অমিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার। তাঁর এই অপূর্ণতা পূর্ণ করেছেন শ্বশ্রূমাতা গৌতমী।

মাতা গৌতমীর শান্ত স্নিগ্ধ মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে এসব কথাই ভাবছিলেন যশোধরা। এক সময় ধ্যান ভঙ্গ হল রাজমাতার। চোখ মেললেন তিনি। দ্বারপ্রান্তে পুত্রবধূকে দেখতে পেয়ে ইশারায় তাঁকে কক্ষে প্রবেশ করতে বললেন। কক্ষে প্রবেশ করে মাতাকে প্রণাম জানিয়ে যশোধরা উপবেশন করলেন তাঁর সামনে।

মাতা গৌতমী বললেন, ‘শুনলাম পিতা-পুত্রের সাক্ষাৎ ঘটেছে। মহাজ্ঞানী কি রাহুলকে তাঁর সম্পত্তির অংশ প্রদান করতে রাজি হয়েছেন?’

যশোধরা বললেন, ‘না, মাতা, তিনি তাকে বলেছেন যে একবার যখন তিনি প্রাসাদ ত্যাগ করে সন্ন্যাসজীবন গ্রহণ করেছেন তখন আর তিনি রাজসম্পত্তিতে তাঁর অংশ দাবি করতে পারেন না। তাই তিনি তা তাঁর পুত্রকে দিতে অপারগ।’

এ কথা শুনে মাতা মৃদু চুপ করে থেকে বললেন, ‘আমার এ বিষয়টা পূর্বে অনুমান করা উচিত ছিল। তিনি সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী। সন্ন্যাসীরা কখনও পূর্বাশ্রমের অংশীদারিত্ব দাবি করেন না। এ আমারই ভুল।’

যশোধরা বললেন, ‘তবে তিনি তাঁর পুত্রকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ প্রদান করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আর সে বিষয়েই আমি আপনার পরামর্শ গ্রহণ করতে এসেছি।’

এ কথা বলে তিনি পিতা-পুত্রের কথোপকথন ব্যক্ত করলেন মাতা গৌতমীকে।

সব কথা শোনার পর মাতা গৌতমী জানতে চাইলেন, ‘তুমি কি পুত্র রাহুলকে তুলে দেবে সংঘের হাতে?’

যশোধরা বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি তেমনই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখন আপনার আর মহারাজের অনুমতির অপেক্ষা!’

যশোধরার উত্তর শুনে মৃদু বিস্ময় প্রকাশ করে মাতা গৌতমী বললেন, ‘কিন্তু সে যে তোমার একমাত্র সন্তান! তোমার এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণ কী?’

বিদুষী পুত্রবধূ যশোধরা বললেন, ‘অনেক ভেবে আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি। আমার সিদ্ধান্তের পশ্চাতে বেশ কয়েকটি কারণ আছে। প্রথমত, মহাজ্ঞানীর চেয়ে বড় শিক্ষক এ জগতে আর কে আছেন? তিনি নিজে তাঁর পুত্রকে জ্ঞানদানের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। পিতার থেকে শিক্ষাগ্রহণের মাধ্যমে পুত্র রাহুলও নিশ্চয়ই একদিন জ্ঞানী মানুষ হয়ে উঠবে। সবাই তাকে সম্মান করবে, ভালোবাসবে।

‘দ্বিতীয়ত, মহাজ্ঞানী তাকে রাজসম্পত্তির অংশ দিতে অপারগ। পুত্র রাহুল যদি সংঘের হাতে সমর্পিত হয় তবে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের কোনও শঙ্কা থাকবে না। সংঘে রাজভোগের ব্যবস্থা না থাকলেও তণ্ডুলের ব্যবস্থা অন্তত আছে। আর মহাজ্ঞানী নিশ্চয়ই সেখানে তার নিরাপত্তার দিকেও দৃষ্টি রাখবেন। কুমার দেবদত্তর মতো কূট ব্যক্তিদের চক্রান্ত স্পর্শ করতে পারবে না তাকে।

‘তৃতীয়ত, আমরা যদি রাহুলকে সংঘের হাতে সমর্পণ করি তবে মহাজ্ঞানী নিশ্চয়ই অনুভব করবেন আমরা তাঁর আদর্শের প্রতি, সংঘের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল। আর এ কথা উপলব্ধি করে তিনি নিশ্চয়ই ভিক্ষুণী সংঘ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সম্মত্তি প্রদান করবেন। রাহুল ভিক্ষু হবে, আমি আপনি ভিক্ষুণী হব। হয়তো মহাজ্ঞানীর সঙ্গে আমরা সকলে মিলে ভিক্ষাপাত্র হাতে পথ-পরিক্রমায় বেরোব, তাঁর প্রবর্তিত “ধম্ম” প্রচার করব। আর বালক রাহুলও একই সঙ্গে পিতা-মাতা উভয়েরই সান্নিধ্যলাভের সুযোগ পাবে। যা থেকে এতদিন বঞ্চিত ছিল। এই হল আমার সম্মতিদানের প্রধান কারণ। আর চতুর্থ কারণ হল—’

চতুর্থ কারণ বলার আগে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন যশোধরা। তিনি খানিক ইতস্তত বোধ করতে লাগলেন।

মাতা গৌতমী তা দেখে বললেন, ‘সংকোচ কোরো না। তুমি বলো, চতুর্থ কারণটা কী?’

যশোধরা মাথা নামিয়ে একটু লজ্জিতভাবে বললেন, ‘আমার অনুমান তিনি নিজে আসবেন রাহুলকে প্রাসাদ থেকে নিয়ে যাবার জন্য। তখন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটবে আমার।’

স্বামী সঙ্গে স্বাক্ষাৎ করার জন্য যশোধরার মনে যে ব্যাকুলতা সৃষ্টি হয়েছে তা অনুভব করতে পারলেন মাতা গৌতমী। রাহুলকে সংঘের হাতে সমর্পণ করবার পিছনে যশোধরার যুক্তিগুলোও সঠিক বলে মনে হল তাঁর। একটু ভেবে নিয়ে তিনি বললেন, ‘রাহুলকে সংঘর হাতে সমর্পণ করার ক্ষেত্রে আমিও সম্মতি প্রকাশ করলাম। আর মহারাজ শুদ্ধোধনও এ বিষয়ে আপত্তি করবেন বলে মনে হয় না। আমি তাঁকে এ সম্পর্কে অবগত করবার এবং তাঁর সম্মতি লাভের দায়িত্ব গ্রহণ করছি।’

যশোধরা বললেন, ‘তবে কি আমি পুত্র রাহুলকে অবগত করব এ বিষয়ে? সংঘের নিকট বার্তা পাঠাব?’

মাতা গৌতমী বললেন, ‘হ্যাঁ, তাই করো।’

১০

যশোধরা পরদিনই এক রাজকর্মচারীর মাধ্যমে সংবাদ প্রেরণ করলেন মহাজ্ঞানীর কাছে। সে ফিরে এসে জানাল, মহাজ্ঞানী বলেছেন, পরদিন ভোরবেলা পুত্রকে প্রস্তুত রাখার জন্য। এ কথা শুনে উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন যশোধরা। তাঁর মনে হতে লাগল শাস্তা নিশ্চয়ই নিজে তাঁর পুত্রকে গ্রহণ করতে আসবেন। কতদিন পর আবার সাক্ষাৎ হবে তাঁদের দু’জনের! যশোধরা তাঁর মনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জেগে থাকা প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইবেন মহাজ্ঞানীর কাছে। এবার তিনি নিশ্চয়ই সে প্রশ্নের জবাব দেবেন যশোধরাকে।

রাজকর্মচারীকে বিদায় জানাবার পর তিনি তাঁর কক্ষে আনয়ন করলেন পুত্র রাহুলকে। তিনি তাকে বললেন, ‘তোমাকে পিতার কাছ থেকে জ্ঞানগ্রহণের সম্মতিদান করছি আমি। এ বড় দুর্লভ সুযোগ এসে উপস্থিত হয়েছে তোমার সামনে! তবে একটা কথা তোমাকে জানাই, এ প্রাসাদে যে সুখভোগের সুযোগ তুমি লাভ করেছ, সংঘে তা তুমি পাবে না।

‘রাজভোগের পরিবর্তে তোমাকে হয়তো তণ্ডুলসিদ্ধ গ্রহণ করতে হবে, রেশমবস্ত্র পরিধানের বদলে কাষায়বস্ত্র পরিধান করতে হবে। যেমন তোমার পিতা সর্বপ্রকার ভোগবিলাস ত্যাগ করেছেন, কৃচ্ছ্রসাধন করেছেন। অন্য ভিক্ষুরাও যা করে থাকেন। সে কাজ তুমি করতে পারবে তো?’

রাহুল বলল, ‘নিশ্চয়ই পারব মা। পিতা আর তুমি যখন সিদ্ধ তণ্ডুল গ্রহণ করো, কাষায়বস্ত্র পরিধান করো তখন আমিও সে জীবন গ্রহণ করতে পারব।’

পুত্রের কথা শুনে গৌরবান্বিতা মাতা যশোধরা তাঁর মস্তক চুম্বন করে বললেন, ‘কাল প্রভাতে তোমাকে প্রস্তুত থাকতে হবে। হয়তো তোমার পিতা তোমাকে নিতে আসবেন।’

রাহুল জানতে চাইল, ‘তুমি আমার সঙ্গে যাবে না মাতা?’

যশোধরা তাকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘এখন নয়, ভিক্ষুণী সংঘ প্রতিষ্ঠা হবার পর আমি তোমাদের পিতা-পুত্রের সঙ্গে যোগদান করব।’

এদিন আর পুত্রকে কাছছাড়া করলেন না যশোধরা। ভিক্ষুণী সংঘ তৈরি করতে নিশ্চয়ই কিছু দিন সময় লাগবে। ততদিন আর মাতা-পুত্রের সাক্ষাৎ হবে না। তাই এদিন যশোধরা নিজের হাতে পুত্রের পরিচর্যা করলেন, নিজে পঞ্চব্যঞ্জন রন্ধন করে খাওয়ালেন পুত্রকে। আর এসব কার্যের পর যশোধরা ভাবতে লাগলেন, পরদিন নিশ্চয়ই তাঁর স্বামী পুত্রকে গ্রহণ করবার জন্য উপস্থিত হবেন। কেমন হবে তাদের নয় বৎসরের পরবর্তী সেই সাক্ষাৎ?

মহাজ্ঞানী নিশ্চয়ই যশোধরার পরনে কাষায়বস্ত্র দেখে, ভিক্ষুকদের মতো মুণ্ডিতমস্তক দেখে, তাঁর নিরাভরণ, বাহুল্যবর্জিত জীবনযাপন দেখে আনন্দিত হবেন। অতঃপর তিনি নিশ্চয়ই মাতা গৌতমীকে ভিক্ষুণী সংঘ প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেবেন।

দিন কেটে গিয়ে সন্ধ্যা নামল এক সময়, তারপর রাত নামল। পুত্রকে বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন যশোধরা।

সেদিন রাত্রিতে নানা সুমধুর স্বপ্ন দেখলেন তিনি। ভিক্ষুণী সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যশোধরাও ভিক্ষুণী সংঘে যোগ দিয়েছেন। মহাজ্ঞানী বুদ্ধ তাঁর ‘ধম্ম’ প্রচারের উদ্দেশ্যে এক নগরীতে গিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। ভিক্ষু, ভিক্ষুণীদের নিয়ে তিনি ভিক্ষা সংগ্রহের জন্য নগর পরিক্রমণে বেরিয়েছেন।

ভিক্ষুণী যশোধরা, নবীন ভিক্ষু বালক রাহুলও ভিক্ষাপাত্র নিয়ে বেরিয়েছেন তাঁর সঙ্গে। সে কী অপূর্ব আনন্দঘন পরিবেশ! স্বামী-স্ত্রী-পুত্র একসঙ্গে ভিক্ষাপাত্র নিয়ে পরিক্রমা করছে পথে পথে! রাস্তার দু’পাশে সার বেঁধে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে জীবন্ত দেবতাকে দর্শন করবার জন্য, তাঁর আশীর্বাদ গ্রহণের জন্য।

কেউ কেউ মহাজ্ঞানীকে ভিক্ষাদান করে ধন্য হচ্ছেন, কেউ বা পুষ্পবৃষ্টি করছেন মহাজ্ঞানীর উদ্দেশে। বাতাসে উড়তে উড়তে সেই পাপড়ি কখনও পুত্র রাহুল কখনও বা যশোধরার মস্তকে এসে পড়ছে। মহাজ্ঞানীর সঙ্গী হবার সুবাদে পুণ্য অর্জন করছেন রাহুল আর যশোধরাও।

যশোধরা এও দেখলেন, অন্য ভিক্ষু-ভিক্ষুণীদের সঙ্গে বসে মহাজ্ঞানীর থেকে ‘ধম্ম’ পাঠ গ্রহণ করছেন তিনি আর রাহুল। তিনি আর্য সত্য শোনাচ্ছেন তাঁদের। তিনি বলছেন—‘জীবন মানেই দুঃখ, জন্মলগ্ন থেকেই দুঃখের সূচনা হয়, দুঃখের কারণও আছে, তা হল বাসনা বা আকাঙ্ক্ষা। দুঃখ নিবৃত্তি করা সম্ভব, আর তার জন্য মার্গ বা পথও আছে…।’

এরপর আরও কিছু স্বপ্ন দেখতে দেখতে এক সময় ভোরের আলো ফুটল। যশোধরার ঘুম ভাঙল। রাহুলেরও ঘুম ভাঙালেন তিনি। তারপর তাকে স্নান করিয়ে রাজবস্ত্রে ও অলংকারে সজ্জিত করলেন। রাহুলের এই শেষবারের মতো রাজবস্ত্র বা অলংকার ধারণ! কারণ এরপর তো তাকে কাষায়বস্ত্র পরিধান করতে হবে। তাই শেষবারের মতো সেই বস্ত্র অলংকার পরিধান করিয়ে রাহুলের মস্তকে চুম্বন করলেন। তারপর তাঁকে নিয়ে সেই কক্ষ ত্যাগ করে প্রাসাদ তোরণে উপস্থিত হলেন।

কিছু সময়ের মধ্যেই সে স্থানে এসে উপস্থিত হলেন রাজা শুদ্ধোধন আর রাজমাতা গৌতমী। তাঁদের সঙ্গে নানান সামগ্রী বহন করে আনল ভৃত্যরা। পুষ্প, তণ্ডুল, ফল, ছত্র, বস্ত্র আরও নানা কিছু। যা দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হবে মহাজ্ঞানীকে। এসব সামগ্রী প্রদান করা হবে তাঁর সঙ্গী ভিক্ষুদের।

সকলে শাস্তার আগমনের প্রতীক্ষা করতে লাগল। যশোধরার উত্তেজনাই তাঁর মধ্যে সকলের চাইতে বেশি। এই বুঝি তিনি এসে পড়লেন!

কিছু সময় পর তাঁরা এক বৌদ্ধ ভিক্ষুকে প্রাসাদে আসতে দেখলেন। যশোধরার মনের ভিতর আনন্দ-আকাঙ্ক্ষা আরও গাঢ় হল। ভিক্ষু নিশ্চয়ই মহাজ্ঞানীর আগমনবার্তা বহন করে আনছেন।

সেই ভিক্ষু এসে উপস্থিত হলেন তাঁদের সামনে। সে বয়সে তরুণ, শান্ত-সৌম্য তাঁর মুখমণ্ডল। মহাজ্ঞানীর সঙ্গী বলে তাঁর চেহারা থেকেও যেন জ্ঞানের জ্যোতি বিচ্ছুরিত হচ্ছে।

বিনয়ের সঙ্গে মাথা ঝুঁকিয়ে হাত জোড় করে সকলের উদ্দেশে প্রণাম জানালেন সেই সন্ন্যাসী। তারপর আত্মপরিচয় জ্ঞাপন করে বললেন, ‘আমি বুদ্ধশিষ্য ভিক্ষু আনন্দ। আমাকে তিনি পাঠিয়েছেন পুত্র রাহুলকে তাঁর নিকট নিয়ে যাবার জন্য। আজ তিনি পুত্র রাহুলকে নবীন সন্ন্যাসীরূপে সংঘে গ্রহণ করবেন।’

কথাটা শুনেই যশোধরা মৃদুস্বরে বলে উঠলেন, ‘তিনি আসবেন না পুত্রকে নিয়ে যাবার জন্য?’

আনন্দ জবাব দিলেন, ‘না, মাতা, আজ তাঁর পক্ষে এ স্থানে আসা সম্ভব নয়। কিছুক্ষণ পরেই মহাজ্ঞানীর উপস্থিতিতে রাহুলসহ আরও বেশ কিছু মানুষের উপসম্পদা অনুষ্ঠান সম্পন্ন হতে চলেছে। একে একে সকলের উপসম্পদা সম্পন্ন হতে বিকাল হয়ে যাবে। আগামীকাল মহাজ্ঞানী অবসর যাপন করবেন। এ স্থানে ধম্ম প্রচারের কাজ ও সংঘের কাজ আপাতত সম্পন্ন করেছেন তিনি। আগামীকাল এ স্থানে তাঁর সাত দিন অতিবাহিত হয়ে যাবে। পরশু প্রাতঃকালে সূর্যোদয় হলেই তিনি কপিলাবস্তু ছেড়ে বৈশালী নগরীর উদ্দেশে যাত্রা করবেন “ধম্ম” প্রচারের জন্য।’

কথাটা শুনে কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে গেলেন যশোধরা। তারপর সেই ভিক্ষুকে বললেন, ‘তবে তিনি সত্যিই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পরশু কপিলাবস্তু ত্যাগ করবেন!’

আনন্দ বললেন, ‘হ্যাঁ, মাতা। আর মহাজ্ঞানী তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবেন না। তিনি আমাদের প্রস্তুত হতে বলেছেন এক দিবস পর কপিলাবস্তু নগরী ত্যাগ করবার জন্য।’

একথা বলার পর ভিক্ষু আনন্দ বললেন, ‘এবার আমাদের রওনা হতে হবে। মহাজ্ঞানী আমাদের জন্য প্রতীক্ষারত।’

এরপর আর কিছু বলার রইল না যশোধরার। পুত্রকে সংঘের কাছে তুলে দেবার জন্য তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পুত্রর মস্তকে বিদায়ী চুম্বন দিয়ে তিনি বললেন, ‘এবার তুমি ভিক্ষু আনন্দর সঙ্গে তোমার পিতা মহাজ্ঞানীর নিকট যাও।’

রাহুল একে একে যশোধরা, মহারাজ শুদ্ধোধন ও মাতা গৌতমীর চরণ স্পর্শ করল। তারপর ভিক্ষু আনন্দ তাকে নিয়ে রওনা হলেন সংঘের উদ্দেশে। কয়েকজন রাজকর্মচারীও উপহার সামগ্রী নিয়ে তাঁদের সঙ্গে গেল। আশাভঙ্গ হল সকলেরই। যশোধরা, মাতা গৌতমী আর রাজা শুদ্ধোধন তোরণের সামনেই দাঁড়িয়ে রইলেন যতক্ষণ না রাহুল তাঁদের দৃষ্টিপথের আড়ালে চলে যায়।

তাঁরা নিশ্চুপভাবে প্রাসাদের অভ্যন্তরেই প্রবেশ করতে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময় তাঁরা কয়েকজন অশ্বরোহীকে দেখতে পেলেন। কিছুটা কাছে আসতেই তাঁরা অগ্রবর্তী অশ্বরোহীকে চিনতে পারলেন। কুমার দেবদত্ত!

রাজবংশধর হিসাবে এ প্রাসাদের বহির্দেশে তাঁর একটা বাসস্থান আছে। যদিও তিনি সেখানে থাকেন না। নগরীর অন্য অংশে নিজ প্রাসাদে বসবাস করেন। কদাচিৎ এ প্রাসাদে আসেন। আজও কোনও কারণে হয়তো বা এখানে এসেছেন।

প্রাসাদের কাছে এসে পড়লেন দেবদত্ত আর তাঁর অনুচরেরা। তোরণের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা যশোধরাদের দেখেও না দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে চলে যাবার সময় তিনি তাঁর অনুচরদের উদ্দেশে বললেন, ‘কে যেন বলছিল সেই ভণ্ড সন্ন্যাসী নাকি প্রাসাদে আসবে! যে পুরুষ একবার তার স্ত্রীকে পরিত্যাগ করে চলে যায় তার কি আর সে নারীর প্রতি টান থাকে? আমার অবশ্য কোনও নারীকেই গ্রহণ করতে আপত্তি নেই।’

দেবদত্তর বলা কথাগুলো যে যশোধরাকে উদ্দেশ্য করেই বলা তা বুঝতে অসুবিধা হল না তাঁর। দেবদত্তর প্রতি ঘৃণাতে ভূমির ওপর নিষ্ঠীবন নিক্ষেপ করে যশোধরা নিজ কক্ষে ফেরার জন্য রওনা হলেন।

১১

স্বামীর দর্শন না পাওয়াতে অত্যন্ত আশাহত হলেন যশোধরা। বেশ কিছুক্ষণ ধরে বিষণ্ণতা ছেয়ে রইল তাঁকে। কিন্তু এরপরই শ্রমণ আনন্দর বলা একটা কথা মনে পড়ায় আশার সঞ্চার হল তাঁর মনে। ভিক্ষু আনন্দ বলে গেলেন, আগামীকাল মহাজ্ঞানী অবসর যাপন করবেন। আজ কর্মব্যস্ততার কারণে আসতে না পারলেও, আগামীকাল তিনি নিশ্চয়ই প্রাসাদে আসবেন।

পুত্র রাহুলকে তুলে দেওয়া হল সংঘের হাতে। তিনি মহাজ্ঞানী, তিনি নিশ্চয়ই উপলব্ধি করবেন, স্বামীর আদর্শের প্রতি কতখানি শ্রদ্ধা ভালোবাসা থাকলে একজন মাতা তাঁর একমাত্র সন্তানকে সংঘের হাতে তুলে দিতে পারেন!

হ্যাঁ, তিনি নিশ্চয়ই নগর পরিত্যাগের পূর্বে একবার স্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসবেন। এ কথা ভেবে যশোধরার মন থেকে হতাশার মেঘ ধীরে ধীরে মুছে যেতে লাগল।

যারা রাহুলকে বুদ্ধসমীপে পৌঁছে দেবার জন্য গিয়েছিল তারা দ্বিপ্রহরের পর প্রাসাদে ফিরে এল। তাদেরই একজন যশোধরাকে সে স্থানের সংবাদ দেবার জন্য তাঁর কক্ষে উপস্থিত হল। সে জানাল, মহাজ্ঞানীর উপস্থিতি ও তত্ত্বাবধানে তাঁর অন্যতম প্রধান শিষ্য সারিপুত্ত, সংঘ ও ধম্মের প্রতি রাহুল দায়বদ্ধ থাকবে এই অঙ্গীকার করিয়ে তাকে উপসম্পদা প্রদান করেছেন। অর্থাৎ রাহুলকে সংঘের অধীনস্থ একজন নবীন সন্ন্যাসী বা ভিক্ষুরূপে গ্রহণ করা হয়েছে।

উপসম্পদা গ্রহণের পর পিতা ও অন্যান্য সন্ন্যাসীদের পাদস্পর্শ করেছে রাহুল। মহাজ্ঞানী রাহুলের মাথায় হাত রেখে তাকে আশীর্বাদ করে বলেছেন, ‘ভবিষ্যতে তুমি “ধম্মের” ও “সংঘের” শ্রেষ্ঠ পালকরূপে আত্মপ্রকাশ করবে।’

মহাজ্ঞানী তাঁর পুত্রকে সংঘে গ্রহণ করার পর এই আশীর্বাদ প্রদান করেছেন শুনে যারপরনাই আনন্দিত হলেন যশোধরা। কারণ মহাজ্ঞানীদের আশীর্বাদ, ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা হয় না।

তবুও যশোধরার মায়ের মন, তিনি জানতে চাইলেন, ‘মাতৃ বিচ্ছেদের কারণে পুত্র রাহুলের মুখ কি মলিন দেখাচ্ছিল?’

রাজকর্মচারী জবাব দিল, ‘কদাপি নয়। বরং উপসম্পদা প্রদানের পর যখন তাঁর রাজবেশ খুলে, অলংকার খুলে নিয়ে পীতবস্ত্র পরিধান করানো হচ্ছিল তখন ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল রাহুলের মুখ। তাঁকে মহাজ্ঞানী আশীর্বাদ করার পর এক সন্ন্যাসী কুমারকে নির্দেশ দিলেন, যে বৃক্ষতলে মহাজ্ঞানী অধিষ্ঠান করছেন সে স্থানে যেসব শুষ্ক পত্র পড়ে আছে তা সংগ্রহ করার জন্য। কুমার রাহুল হাসিমুখে সে কাজ করতে শুরু করলেন।’

যদিও এ সংবাদ যশোধরাকে ব্যথিত করল না বরং তিনি আনন্দিত হলেন।

রাজকর্মচারী বার্তা দিয়ে চলে গেল। যশোধরা পুনরায় তাঁর ভাবনাতে নিমজ্জিত হলেন।

বিকাল হতেই মাতা গৌতমী এসে উপস্থিত হলেন যশোধরার কক্ষে। তিনি বললেন, ‘আমি মনস্থির করলাম, আজ সন্ধ্যায় আমি মহাজ্ঞানীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাব। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, উপসম্পদা প্রদানের কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়ে গেছে। দর্শনার্থীরাও আজ সন্ধ্যার আগে ফিরে যাবে। তারপর নিভৃতবাস করবেন তিনি। ওই সময়ই তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাব আমি। আমি তাঁর কাছে ভিক্ষুণী সংঘ প্রতিষ্ঠার জন্য অনুমতি চাইব। আমি তাঁকে জানাব তোমার কৃচ্ছ্রসাধনের কথা। বলব, তুমি ভিক্ষুণী না হয়েও ভিক্ষুণীর মতোই জীবনচর্চা করো।’

মাতার কথা শুনে যশোধরা বললেন, ‘হ্যাঁ, আপনি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আমাদের মনোবাসনা ব্যক্ত করুন। তিনি আজ পুত্র রাহুলকে সংঘে গ্রহণ করেছেন, তিনি নিশ্চয়ই আমাদেরও গ্রহণ করবেন। আমি আপনার ফিরে আসার প্রতীক্ষা করে থাকব।’

এরপর মাতা গৌতমী পুত্রবধূকে কিছু প্রয়োজনীয় কথা জানিয়ে কক্ষ ত্যাগ করলেন।

খানিক সময় পরই সূর্য ডুবে গেল। যশোধরা অলিন্দে দাঁড়িয়ে দেখলেন মাতা গৌতমী একাকী রওনা হলেন, মহাজ্ঞানীকে তাঁর প্রার্থনা জানাবার জন্য, যশোধরার কথা জানাবার জন্য।

তথাগত যে স্থানে অবস্থান করছেন সে স্থান এই ক’দিন তাঁর সাক্ষাৎপ্রার্থীদের সমাগমে পরিপূর্ণ থাকলেও এখন তা জনশূন্য।

মহাজ্ঞানী ভিক্ষু একাকী বসে ছিলেন বৃক্ষতলে। আর তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন শিষ্য ভিক্ষু সারিপুত্ত-আনন্দ-কৌণ্ডিন্য সেই বৃক্ষতল থেকে কিছু দূরে তাঁদের পরবর্তী পরিক্রমণের বিষয়ে আলোচনাতে নিমগ্ন ছিলেন। আগামীকালের মধ্যেই সেই যাত্রার প্রস্তুতি সম্পন্ন করার ভার তাদের ওপরেই ন্যস্ত।

মাতা গৌতমী যখন সে স্থানে পৌঁছলেন তখন অন্ধকার নেমে গেছে। সন্ন্যাসীত্রয় মাতা গৌতমীকে দেখলেন। ইতিমধ্যেই তাঁরা রাজমাতার পরিচয় সম্পর্কে অবগত। প্রথম যেদিন কপিলাবস্তুতে এসে মহাজ্ঞানী ভিক্ষাগ্রহণের জন্য পথে বেরিয়ে রাজপ্রাসাদের সামনে উপস্থিত হয়েছিলেন, তখন মাতা গৌতমীও সে স্থানে উপস্থিত ছিলেন। বুদ্ধবান্ধব কলুদায়ী তখন মাতা গৌতমীর পরিচয় দান করেছিলেন আনন্দ-সারিপুত্ত প্রমুখের সামনে।

বুদ্ধমাতাকে দেখে তাঁরা উঠে দাঁড়িয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানালেন। তবে তাঁরা তাঁকে কোনও প্রশ্ন করলেন না। কারণ, মাতা তাঁর পুত্রের সঙ্গে কী কারণে সাক্ষাৎ করতে এসেছেন তা জিগ্যেস করা অনুচিত। তাই তাঁরা মাতাকে অনুসরণ করলেন না। ভিক্ষু আনন্দ শুধু অঙ্গুলিনির্দেশ করে চিনিয়ে দিলেন সেই বৃক্ষতল যে স্থানে একাকী অবস্থান করছেন মহাজ্ঞানী। মাতা গিয়ে উপস্থিত হলেন সেই বৃক্ষতলে।

পাতার চাঁদোয়ার তলে চোখ মুদে বসে আছেন মহাজ্ঞানী অমিতাভ। একটা মৃৎপ্রদীপ জ্বলছে সেই স্থানে। সেই আলোয় একইসঙ্গে গাম্ভীর্য আর প্রশান্তি প্রস্ফুটিত হচ্ছে মহাজ্ঞানীর মুখমণ্ডলে। জোনাকির দল বৃত্তাকারে আবর্তিত হচ্ছে তার মাথার ঠিক পিছনে। হঠাৎ দেখলে মনে হয় যেন এক জ্যোতির্বলয় বিচ্ছুরিত হচ্ছে অমিতাভর মস্তক থেকে।

বহুদিন পর পুত্রের মুখপানে চেয়ে রইলেন মাতা গৌতমী। মনে মনে হিসাব করলেন বুদ্ধের বয়ঃক্রম। তাঁর বয়স এখন আটত্রিশ। অর্থাৎ তিনি মধ্যবয়সি। এখনও সুঠাম চেহারার অধিকারী তিনি। বুদ্ধত্ব লাভ করার জন্য সিদ্ধার্থ নৈরঞ্জনা নদীর তীরে যে কঠিন তপস্যায় বসেছিলেন সে সময় তাঁর চেহারা কঙ্কালে রূপান্তরিত হয়েছিল বলে শুনেছেন মাতা গৌতমী। তারপর গোপীবালা সুজাতার পায়েস ভক্ষণের মাধ্যমে সিদ্ধার্থ তাঁর চেহারা ফিরে পান, তারপর বুদ্ধত্ব লাভ করেন।

অমিতাভ যখন পরিক্রমণ শুরু করেন তখন বহু ক্রোশ দূরত্ব তিনি নগ্নপদে অতিক্রম করেন, একবেলা আহার গ্রহণ করেন। তিনি সংযমী জীবন পালন করেন বলেই সময় এখনও তাঁর অঙ্গে ছাপ ফেলতে পারেনি। যুবার মতোই এখনও তাঁর হস্ত-পদের মাংসপেশী।

মহাজ্ঞানীর সামনে দাঁড়িয়ে খানিক বিস্মিত বোধ করলেন মাতা গৌতমী। মাতার ভাবতে বেশ অবাক লাগছিল, তাঁর সামনে ধ্যানস্থ ভঙ্গিমাতে যিনি আসীন তাঁকেই তিনি একদিন স্তন্যপান করিয়েছেন, নিজ ক্রোড়ে আশ্রয় দিয়েছেন। বালক সিদ্ধার্থ অসুস্থ বোধ করলে তিনি শুশ্রূষা করেছেন, আবার প্রয়োজনবোধে শাসনও করেছেন।

সেই সিদ্ধার্থই আজ তার জ্ঞানের দীপ্তি দিয়ে শত শত মানুষের মনোজগতকে শাসন করছেন। কত রাজা, রাজচক্রবর্তীরা এমনকী শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতরাও আজ তাঁর সামনে মাথা ঝোঁকাচ্ছেন, তাঁর ধম্ম গ্রহণ করে জাগতিক দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তিলাভ-নির্বাণলাভ করতে চেষ্টা করছেন।

মাতা গৌতমীর ভাবনার মাঝেই ধীরে ধীরে চক্ষু উন্মীলিত করলেন মহাজ্ঞানী। মাতা-পুত্র কয়েক মুহূর্ত পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কে কাকে এবার প্রণাম জানাবেন? পুত্র মাতাকে? নাকি মাতা পুত্রকে? কিন্তু সিদ্ধার্থ নিছক তাঁর পুত্র নন, তিনি এখন সর্বজ্ঞানী বুদ্ধ। তাই মাতা গৌতমীই মাথা ঝুঁকিয়ে হাত জোড় করে প্রণাম জানালেন তথাগতকে।

মহাজ্ঞানী হলেও তিনি তাঁর পুত্র—এ কথা বিবেচনা করে মাতাকে প্রণাম করতে দেখে মৃদু অস্বস্তি বোধ করলেন শাস্তা। তিনি নিজেও আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে, মাথা ঝুঁকিয়ে মাতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলেন। দীর্ঘ নয় পর বছর সাক্ষাৎ হল মাতা ও পুত্রের।

বাক্যালাপ শুরু হবার আগে দু’জনের মুখেই হাসি ফুটে উঠল। মহাজ্ঞানী এরপর মৃদু কৌতুকের স্বরে জানতে চাইলেন, ‘আপনি কার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছেন মাতা? পুত্রের সঙ্গে, নাকি সন্ন্যাসী বুদ্ধের সঙ্গে?’

মাতা গৌতমী হেসে জবাব দিলেন, ‘দু’জনের সঙ্গেই।’

পুত্র বললেন, ‘তবে মাতা-পুত্রর মধ্যেই প্রথম বাক্যবিনিময় হোক। আপনার শরীর স্বাস্থ্য কেমন আছে মাতা?’

গৌতমী বললেন, ‘আমার স্বাস্থ্য ভালোই আছে। বরং আপনার স্বাস্থ্য নিয়েই মাঝে মাঝে চিন্তা হয় আমার। আপনি কত পরিশ্রম করেন, কত পথপরিক্রমা করেন—এ কথা যখন কানে আসে তখন পুত্রের স্বাস্থ্যের বিষয়ে মায়ের মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে।’

মায়ের কথা শুনে পুত্র হেসে বললেন, ‘আমার স্বাস্থ্য ঠিক আছে মাতা। যখন প্রাসাদে থাকতাম তখন সামান্য যেটুকু অলসতা আমার মধ্যে ছিল, আর মনের মধ্যে যদি অজ্ঞানতাবশত কিছু অন্ধকার সেসময় থেকে থাকে, সেই অলসতা, অন্ধকারকে আমি মুছে ফেলতে সমর্থ হয়েছি। তাই মনের মধ্যে আমি যুবকের উদ্দীপনাকে ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছি, আর শরীরের সামর্থ্যকেও বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছি।

‘মনই তো শরীরকে পরিচালনা করে। তাই বহু পথ অতিক্রম করতেও আমার ক্লেশ হয় না। তবে হ্যাঁ, এ কথা সত্যি যে একদিন বার্ধক্য স্বাভাবিক নিয়মেই আমার শরীরকে গ্রাস করবে, শরীর জীর্ণ হয়ে পড়বে, তখন আমার পথ চলতে অসুবিধা হবে। কিন্তু আপাতত আমার শরীর নিয়ে চিন্তা করে অযথা মনকে ভারাক্রান্ত করবেন না মাতা।’

মাতা গৌতমী বললেন, ‘আপনাকে নিয়ে আরও একটি শঙ্কার উদয় হয় মনে। বহু মানুষ যেমন “ধম্ম” গ্রহণ করেছেন, বহু রাজা যেমন আপনার সম্মুখে তাঁদের রাজমুকুট খুলে রেখেছেন, তেমন বহু মানুষ আছেন যাঁরা আপনার প্রবর্তিত নতুন ধম্মের বিরোধিতা করছেন। কেউ কেউ আছেন যাঁরা আপনার প্রতি ঈর্ষান্বিত। তাঁরা যদি কেউ আপনার ক্ষতিসাধন করেন? যেমন বেদ-ব্রাহ্মণ পূজারি মগধ সম্রাট অজাতশত্রু অথবা শাক্যকুমার দেবদত্ত প্রমুখ ব্যক্তিরা?’

মহাজ্ঞানী মৃদু হেসে বললেন, ‘এ নিয়েও আপনি ভাবিত হবেন না মাতা। ক্ষতিসাধন বলতে আপনি যদি আমাকে হত্যার কথা বলেন, তবে বলব তারা শুধু এই জাগতিক শরীরটাকেই হত্যা করতে পারবে, আমার ভাবনাকে নয়। কারণ দয়া, ধর্ম, প্রেম, করুণা, ক্ষমা—এদের মৃত্যু হয় না। আমি বেঁচে থাকব আমার ভাবনার মধ্যে দিয়ে। আপনি জানবেন, আপনার পুত্র মৃত্যুঞ্জয়ী।’

এরপর মাতা-পুত্রের কথোপকথন বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলল। পুত্র সম্পর্কে মাতার যাবতীয় শঙ্কা মুছে দেবার চেষ্টা করলেন পুত্র। আলোচনাতে উঠে এল অতীতের স্মৃতিচারণাও। শিশু বয়সে হরিণ শাবককে ক্রন্দন করতে দেখলে গৌতম কেমনভাবে ক্রন্দন করতেন, মাতা তখন কীভাবে ক্রোড়ে তুলে নিয়ে শান্ত করতেন তাঁকে, বালক সিদ্ধার্থ কীভাবে বিভিন্ন পশু-পাখির স্বর নকল করে মাতাকে চমকে দিতেন, এসব স্মৃতিও উঠে এল তাঁদের বাক্যালাপে।

মাতা গৌতমী খেয়াল করে দেখলেন, সেসব কথা কিছুই ভোলেননি তাঁর পুত্র। বাক্যবিনিময় করতে করতেই এক সময় ধীরে ধীরে আলোকিত হয়ে উঠল চারপাশ। পূর্ণিমার চাঁদ উঠল গগনে। চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল কপিলাবস্তু নগরীর সর্বত্র।

মহাজ্ঞানী এবার খেয়াল করলেন, সন্ধ্যা নামার পর ইতিমধ্যেই অনেকটা সময় অতিবাহিত হয়েছে। একদিন পরই আবার ভিক্ষাপাত্র নিয়ে পথে নামবেন তিনি ও অন্য ভিক্ষুরা। অনেকটা পথ যেতে হবে তাঁদের। সেই পরিক্রমণের বিষয়ে তাঁকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করতে হবে শিষ্যদের সঙ্গে। শিষ্য ভিক্ষুরা সে আলোচনার জন্য অনতিদূরে প্রতীক্ষারত। আর তাঁর মাতাকে প্রাসাদে ফিরতে হবে। তাই তিনি তাঁর মাতাকে বললেন, ‘মাতা-পুত্রের আলোচনা তো হল, এবার আপনি বলুন ‘‘বুদ্ধের’’ সঙ্গে আপনি কী কারণে সাক্ষাৎ করতে এসেছেন?’

পুত্র নয়, এবার মহাজ্ঞানী বুদ্ধের সঙ্গে কথোপকথন শুরু করলেন কপিলাবস্তুর রাজমহিষী গৌতমী। তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, এবার আমি মহাজ্ঞানী বুদ্ধের নিকট আমার বক্তব্য নিবেদন করব। হে তথাগত, আমি, আপনার “ধম্ম” ও নির্দেশাবলি পালন করে বাকি জীবন অতিবাহিত করতে চাই।’

রাজমহিষী গৌতমীর কথা শুনে বুদ্ধ বললেন, ‘এ তো অতি উত্তম ভাবনা। আমার ধম্ম অনুসরণ করতে তো গৃহী অর্থাৎ যাঁরা সংসার যাপন করেন তাঁদের কোনও বাধা নেই। এমনকী আমার ধম্মমত অনুসরণ করে অনেক রাজাও সংসারধর্ম ও রাজকার্য সম্পাদন করেন। আমার ধম্ম কয়েকটি সরল সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই ধনাঢ্য ব্যক্তি থেকে নিষাদ, নারী থেকে পুরুষ কারোরই আমার ধম্মমত অনুসরণ করতে কোনও বাধা নেই। প্রেম-ভালোবাসা-করুণার যে আলোর সন্ধান আমি পেয়েছি আমি চাই সে আলোতে প্রতিটি গৃহ আলোকিত হোক।’

এ কথা বলার পর তিনি বললেন, ‘ধম্ম সম্পর্কে শিক্ষাদান করতে পারেন এমন কয়েকজন ভিক্ষুকে আমি কপিলাবস্তুতে রেখে যাচ্ছি আমার “ধম্ম” প্রচারের জন্য। আমি তাঁদের বলব, তাঁরা যেন প্রাসাদে গিয়ে আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা আপনাকে জানাবেন কোন পথে চললে মানব জীবনের দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তিলাভ করা সম্ভব।’

মাতা গৌতমী এবার তাঁর আসল বক্তব্য উপস্থাপিত করলেন। তিনি বললেন, ‘শুধু আপনার ধম্মমত অনুসরণ করাই নয়, আমি চাই আপনার ধম্মপ্রচারে অংশ গ্রহণ করতে। আমি চাই ভিক্ষুণী সংঘ প্রতিষ্ঠা হোক। আপনি আমাকে সে অনুমতি দিন। ভিক্ষু শ্রমণদের মতো কৃচ্ছ্রসাধন করে আমরা ভিক্ষুণীরাও সক্রিয় ভাবে “ধম্ম” প্রচারে ব্রতী হব, “ধম্ম”-র অংশ হবে ভিক্ষুণী সংঘ।’

কপিলাবস্তুর রানির কথা শ্রবণ করে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর মহাজ্ঞানী বললেন, ‘না, ভিক্ষুণী সংঘ প্রতিষ্ঠা করবার অনুমতি দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’

মহাজ্ঞানীর এই বাক্য শুনে শুদ্ধোধনপত্নী বলে উঠলেন, ‘কেন? সম্ভব নয় কেন?’

মহাজ্ঞানী আবারও বললেন, ‘না, এ অনুমতি আমি দিতে পারি না। এবং আমার এই সিদ্ধান্তের পিছনে বেশ কিছু কারণও আছে।’

রাজমহিষী বললেন, ‘কী কারণ? আপনি কি মনে করেন ভিক্ষুণীরা ভিক্ষুকদের মতো কৃচ্ছ্রসাধন করতে সক্ষম হবেন না? তবে আমি রাজবধূ যশোধরার কথা আপনাকে জানাই—।’

যশোধরা নামটা শুনেই মহাজ্ঞানী তাঁর দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন এক বিশেষ দিকে। তাঁর দৃষ্টি অনুসরণ করে মাতা গৌতমী দেখলেন, মহাজ্ঞানী যেদিকে তাকিয়ে আছেন সেদিকে চাঁদের আলোয় দূরে রাজপ্রাসাদের শীর্ষদেশ দেখা যাচ্ছে। যে প্রাসাদের কোনও এক কক্ষে রয়েছেন সিদ্ধার্থপত্নী যশোধরা। তাই কি যশোধরার নাম শ্রবণ করে প্রাসাদের দিকে মুখ ফেরালেন মহাজ্ঞানী! তেমনই মনে হল মাতা গৌতমীর।

রাজমাতা বলতে শুরু করলেন, ‘আপনি গৃহত্যাগ করবার পর থেকেই কন্যা যশোধরা ভিক্ষুদের মতোই তাঁর জীবন পালন করছে। যেদিন সে জেনেছে আপনি মস্তক মুণ্ডন করিয়েছেন, সেদিনই সে তার মেঘের মতো ঘন কেশরাশি বর্জন করে মুণ্ডিতমস্তক হয়েছে। যেদিন সে জেনেছে, আপনি সব অলংকার, রাজবস্ত্র ত্যাগ করে চীবর পরিধান করেছেন, সেদিন থেকে সেও সব অলংকার ত্যাগ করে কাষায়বস্ত্র পরিধান করতে শুরু করেছে।

‘আপনি শুধু একবেলা ভিক্ষালব্ধ তণ্ডুল গ্রহণ করেন বলে, ভূমিশয্যায় শায়িত থাকেন বলে সেও একই কাজ করে। যখন কেউ সংবাদ আনে যে প্রখর রৌদের মধ্যে আপনি নগ্নপদে পরিক্রমায় বেরিয়েছেন, তখন খর গ্রীষ্মের দুপুরে যশোধরা আপনার মতোই কষ্টগ্রহণের জন্য নগ্নপায়ে প্রাসাদের তপ্ত ছাদে পদচারণা করে। সেও চায় ভিক্ষুণী সংঘ প্রতিষ্ঠা হোক।

‘যশোধরার জীবনযাপনের কথা শুনেও কি আপনার মনে হয় যে নারীরা ভিক্ষুণী সংঘ গঠনের ব্যাপারে অনুপযুক্ত? আমি রাজমহিষী, কিন্তু আমার শরীরে কোনও অলংকার নেই, আমিও অতি সাধারণ নারীর মতোই জীবন প্রতিপালন করি। কৃচ্ছ্রসাধনেও আমার কোনও সমস্যা হবে না, তবে কেন আপনি ভিক্ষুণী সংঘ গঠনের অনুমতি দেবেন না?’ এ প্রশ্ন করার সময় যেন মৃদু ক্ষোভ ঝরে পড়ল কপিলাবস্তুর রানির কণ্ঠ থেকে।

মহাজ্ঞানী আরও বেশ খানিকক্ষণ নির্বাকভাবে চেয়ে রইলেন রাজপ্রাসাদের দিকে। তা দেখে মাতা গৌতমীর মনে হল যে যশোধরার কৃচ্ছ্রসাধনের কথা নিশ্চয়ই মহাজ্ঞানীর মনে প্রভাব বিস্তার করেছে, এ কথা শোনার পর তিনি নিশ্চয়ই বলবেন, ‘আমি ভিক্ষুণী সংঘ প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিলাম।’

কিন্তু রাজমহিষীর দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘এই মহাজনপদগুলিতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ধর্মগুলোতে, এমন কী আমারই মতো নবীন ধর্ম, জৈন ধর্মতে নারীকে ধর্মের আচার পালনের অনুমতি দেওয়া হলেও তাকে ধর্মের অংশরূপে বা ধর্মকে নিয়ন্ত্রণ করবার অধিকার দেওয়া হয়নি।’

কপিলাবস্তুর মহারানি বললেন, ‘কিন্তু আপনি যে অন্য ধর্মের জগদ্দল পাথরকে চূর্ণ করে নতুন ‘‘ধম্ম” প্রতিষ্ঠা করেছেন! আপনি না হয় এক্ষেত্রেও নতুন ভাবনার পথপ্রদর্শক হবেন। শুধু ধর্মাচার পালন নয়, ধর্মের অংশ হিসাবে গ্রহণ করবেন নারীকে।’

মহাজ্ঞানী বললেন, ‘আমার ধর্ম নবীন বলেই আমি এখন ভিক্ষুণী সংঘ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে অনুমতি দিতে অপারগ। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সমাজব্যবস্থাকে অনেকে ভাঙতে চান না, কারণ তাতে তাঁদের শাসনব্যবস্থা পরিচালনার ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে। এদের মধ্যে অনেকেই আমার ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন, নানাভাবে আমাকে সাহায্য করছেন। কখনও বা সংঘকে অর্থ দিয়ে, কখনও বা কোনও রাজ্যে আমাকে ধর্মপ্রচারের সুযোগ দিয়ে।

‘আমি ভিক্ষুণী সংঘ প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিলে তাঁরা অনেকে ক্ষুব্ধ হয়ে আমার পাশ থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন। তাতে আমার ‘‘ধম্ম’’ প্রচারের কাজ ব্যাহত হবে। ভিক্ষুণী সংঘ প্রতিষ্ঠা অপেক্ষা ষোড়শ মহাজনপদের প্রতিটি কোনায় ধম্মমতকে পৌঁছে দেওয়াই আমার প্রধান লক্ষ্য।’

এ কথা বলার পর তিনি বললেন, ‘ভিক্ষুণী সংঘের প্রতিষ্ঠা হলে ভিক্ষু সংঘের ক্ষেত্রেও সমস্যা নেমে আসবে। সম্মিলিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ভিক্ষু সংঘ পরিচালিত হয়। আমি তাঁদের পরামর্শ দিই মাত্র! আমার সিদ্ধান্ত কখনও জোর করে সংঘের ওপর প্রতিষ্ঠা করি না। ভিক্ষুণী সংঘ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ভিক্ষু সংঘ অনুমোদন দেবে না।

‘কারণ, সংঘে এখন অনেক ভিক্ষু আছেন যাঁরা এক সময় বৈবাহিক জীবন বা গার্হস্থ্য জীবন পালন করেছেন। তাঁদের অনেকেরই বৃদ্ধ পিতা মাতা বা শিশু সন্তান আছে। তাদের নারীদের তত্ত্বাবধানে রেখেই তাঁরা গৃহত্যাগ করে ভিক্ষুজীবন গ্রহণ করেছেন। একই কথা যাঁরা ভবিষ্যতে ভিক্ষু সংঘে যোগ দেবেন, তাঁদের অনেকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পুরুষ-নারী সবাই যদি ভিক্ষু-ভিক্ষুণী হন তবে পরিবারের বৃদ্ধ-বৃদ্ধা বা শিশুদের কী হবে? এ কারণবশত ভিক্ষু সংঘ ভিক্ষুণী সংঘ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অনুমোদন দেবে না।

‘আর আমি সংঘের প্রতিষ্ঠাতা হলেও বর্তমানে আমি তাঁর অংশমাত্র! কাজেই বর্তমান পরিস্থিতিতে আমি আপনাকে ভিক্ষুণী সংঘ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অনুমতি দিতে অপারগ।’ এ কথা বলে মহাজ্ঞানী বুকের কাছে হাত জোড় করে নমস্কার করলেন রাজমহিষীকে। মাতা গৌতমী মহাজ্ঞানীর কথা শুনে আর তাঁর নমস্কার করার ভঙ্গি দেখে বুঝতে পারলেন তথাগত তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবেন না, এবং এ বিষয়ে তাঁর কথা বলা শেষ হয়ে গেছে।

মহাজ্ঞানীর সময় অতি দামি, শিষ্যরা তাঁর সঙ্গে কথোপকথনের জন্য প্রতীক্ষা করছেন। মাতা গৌতমী এরপর মহাজ্ঞানীকে নমস্কার জানিয়ে ধীর পদক্ষেপে রওনা হলেন প্রাসাদে ফেরার জন্য।

১২

মাতা গৌতমী প্রাসাদে ফিরে এসে নিজ কক্ষে প্রবেশ করবার পূর্বে যশোধরার কক্ষে উপস্থিত হলেন। তাঁকে দেখেই কৌতূহলী যশোধরা জানতে চাইলেন, ‘তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হল? তিনি অনুমতি দিলেন?’

বিষণ্ণ হেসে মাতা গৌতমী বললেন, ‘পুত্রের সঙ্গেও সাক্ষাৎ হল, মহাজ্ঞানীর সঙ্গেও হল। পুত্র হলে হয়তো মায়ের আবেদনকে নির্দেশ মেনে তিনি ভিক্ষুণী সংঘ প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নিতেন। কিন্তু আমি আমার আবেদন জানিয়েছিলাম পুত্রের কাছে নয়, মহাজ্ঞানীর কাছে। মহাজ্ঞানী আমার সে আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন। ভিক্ষুণী সংঘ প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিতে তিনি নারাজ।’

‘নারাজ কেন?’ বিস্মিত াবে প্রশ্ন করলেন যশোধরা।

মাতা গৌতমী এরপর মহাজ্ঞানীর অসম্মতির বিষয়ে তাঁর মুখ থেকে শোনা যুক্তিগুলো বিবৃত করলেন যশোধরার কাছে।

‘মহাজ্ঞানী কি আমার সম্পর্কে কিছু জানতে চাইলেন আপনার কাছে?’ মাথা নত করে প্রশ্ন করলেন যশোধরা। রাজমাতা বললেন, ‘না, তিনি তোমার কথা কিছু জানতে চাননি। তবে আমি আলোচনাক্রমে তাঁকে জানিয়েছি

তোমার কৃচ্ছ্রসাধনের কথা। ভিক্ষুণী না হয়েও যে তুমি ভিক্ষুদের মতো কৃচ্ছ্রসাধন করো সে কথা। তবুও তিনি অনুমতি দিলেন না। তবে…।’ এই বলে থামলেন মাতা গৌতমী।

‘তবে কী মাতা?’ বলে উঠলেন যশোধরা।

মাতা গৌতমী বললেন, ‘তবে আমি যখন তোমার প্রসঙ্গ অবতারণা করলাম তখন তিনি মুখ ফিরিয়ে তাকিয়ে ছিলেন চাঁদের আলোয় জেগে থাকা এই প্রাসাদের দিকে। যতক্ষণ আমি তোমার সম্পর্কে কথা বলছিলাম ততক্ষণ এদিকে চেয়েই তিনি আমার কথা শুনছিলেন। আমার যেন মনে হয়েছে এ প্রাসাদের দিকে চেয়ে তিনি তোমার কথাই ভাবছিলেন।’

কথাটা শুনে যশোধরার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। তিনি শ্বশ্রূমাতার উদ্দেশে বললেন, ‘তবে আমি নিশ্চিত তিনি আপনাকে একদিন ভিক্ষুণী সংঘ গঠনের অনুমতি দেবেন।’

মাতা গৌতমী বিস্মিতস্বরে বললেন, ‘তুমি কীভাবে নিশ্চিত হলে?’

যশোধরা বললেন, ‘আপনি জানেন কিনা জানি না, মহাজ্ঞানী ছেলেবেলা থেকেই তাঁর পূর্বজীবনের কথা স্মরণ করতে পারেন। তাঁর মুখ থেকেই তাঁর পূর্বজন্মের, বোধিসত্ত্ব জীবনের নানা কাহিনি শুনেছি আমি। পূর্ববর্তী বুদ্ধদেবের কাহিনিও শুনেছি। তারই মধ্যে একটি কাহিনি ছিল আপনার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

‘আপনার পুত্র গৌতম বুদ্ধের পূর্বে যে উনত্রিশ জন মহাজ্ঞানী বা বুদ্ধ এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেন তাঁদের মধ্যে একজন হলেন পদুমুত্তর বুদ্ধ। তিনি ছিলেন ত্রয়োদশ বুদ্ধ। আপনি তখন হংসবতী দেশের এক ধনী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। আপনি সে জন্মেও ভিক্ষুণী হবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। পদমুত্তর বুদ্ধও প্রথমে আপনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন যেমন করলেন গৌতম বুদ্ধ।

‘কিন্তু আপনি আশাহত না হয়ে সাত বৎসর ধরে পদুমুত্তর বুদ্ধ এবং অন্য ভিক্ষুদের সেবায় নিয়োজিত থাকেন। আপনার সেবা ও ভিক্ষুণী হবার আকাঙ্ক্ষা শেষ পর্যন্ত পদুমুত্তর বুদ্ধের মনকে বিগলিত করে। তিনি আপনাকে আশীর্বাদ প্রদান করেন যে গৌতম বুদ্ধের সময়কালে আপনার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবে। পদুমুত্তর বুদ্ধের কথা কি বিফলে যেতে পারে?’

মাতা গৌতমীর পূর্বজন্মের কথা স্মরণ করার ক্ষমতা নেই। এজন্মে তিনি জানতেন না তাঁর পূর্বজন্মের কথা। পুত্রবধূর মুখে এ কথা স্মরণ করে তিনি বিস্মিতভাবে বললেন, ‘তবে তুমিও তো ভিক্ষুণী সংঘে যোগ দিতে পারবে।’

যশোধরা জবাব দিলেন, ‘আমি শুধু পূর্বের কিছু কথা জানি। ভবিষ্যতের কথা আমার জানা নেই। তা একমাত্র জানেন মহাজ্ঞানী বুদ্ধ।’

এ কথা বলার পর যশোধরা তাঁকে বললেন, ‘রাত গভীর হচ্ছে, এবার আপনার বিশ্রাম প্রয়োজন। আপনি বিশ্রাম গ্রহণ করুন মাতা।’

মাতা গৌতমী ধীরে ধীরে বার্ধক্যর দিকে এগোচ্ছেন। এতটা পথ পদব্রজে যাওয়া আসা করাতে খানিকটা ক্লান্ত বোধ করছিলেন তিনি। যশোধরার উদ্দেশে তিনি বললেন, ‘তোমার কথাই যেন সত্যি হয়।’ এ কথা বলে তিনি যশোধরার বলা কথাগুলো ভাবতে ভাবতে রওনা হলেন নিজ কক্ষের উদ্দেশে।

যশোধরা ধ্যানের মাধ্যমে পূর্বজন্মে ফিরে যেতে পারলেও ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতা তাঁর নেই। মাতা গৌতমী তাঁকে জানালেন যে তিনি যখন যশোধরার কৃচ্ছ্রসাধনের কথা মহাজ্ঞানীকে বলছিলেন তখন মহাজ্ঞানী চেয়েছিলেন এ প্রাসাদের দিকেই। মাতা এও বললেন, তাঁর অনুমান, যশোধরার কথা শুনে তিনি প্রাসাদের দিকে চেয়ে যশোধরার কথাই ভাবছিলেন!

মাতা গৌতমীর মুখ থেকে শোনা এ কথাগুলোই যশোধরাকে আশাহত হতে দিল না। তাঁর মন বলতে লাগল তথাগত নিশ্চয়ই কপিলাবস্তু নগরী ছেড়ে চলে যাবার পূর্বে আগামীদিনের অবসরে একবার তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসবেন।

রাত্রি গভীর হয়ে এল এক সময়। পরদিন মহাজ্ঞানীর সঙ্গে সাক্ষাতের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তাঁর কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লেন যশোধরা। শেষ রাতের দিকে গৃহত্যাগের পূর্বে সিদ্ধার্থর সঙ্গে তাঁর কথোপকথন স্বপ্ন হয়ে ধরা দিল তাঁর মনে। তিনি দেখলেন, সিদ্ধার্থ তাঁর প্রিয় শ্বেত অশ্ব কন্থকের পিঠে চেপে মধ্যরাত্রিতে প্রাসাদ ত্যাগ করছেন।—এই স্বপ্ন দেখতে দেখতেই এক সময় ভোর হয়ে গেল।

না, কন্থক ফিরে এসেছিল ঠিকই কিন্তু সিদ্ধার্থ ফেরেননি। যিনি ফিরে এলেন তিনি সিদ্ধার্থ নন, মহাজ্ঞানী বুদ্ধ। তবে বুদ্ধ হলেও তিনি যশোধরার স্বামী। তাঁর সন্তান রাহুলের পিতা। পূর্বজন্ম থেকেই তাঁর সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক যশোধরার। তাই ভোরের আলো ফোটার আগেই তিনি বাতায়নের সামনে গিয়ে প্রতীক্ষা করতে লাগলেন তাঁর স্বামীর জন্য।

শুধু যশোধরাই নন, এ প্রতীক্ষা করছিলেন মাতা গৌতমী আর মহারাজ শুদ্ধোধনও। পরদিন প্রত্যুষে কপিলাবস্তু ছেড়ে চলে যাবেন মহাজ্ঞানী, তাঁর আগে আজকের এই অবসরে তিনি নিশ্চয়ই কোনও না কোনও সময় প্রাসাদে আসবেন পিতা-মাতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য। সর্বোপরি পত্নী যশোধরার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য। যিনি আকুল হয়ে প্রতীক্ষা করছেন স্বামীর দর্শন লাভের আশায়।

ভোরের আলো ফোটার পরেই অলিন্দে এসে দাঁড়ালেন যশোধরা। সামনের রাজপথের জনজীবন ধীরে ধীরে সচল হতে শুরু করল। পদাতিক, অশ্বারোহী কত মানুষ যাতায়াত শুরু করল প্রাসাদসংলগ্ন পথ ধরে। যশোধরা চেয়ে রইলেন সেদিকে। প্রতি মুহূর্তেই তাঁর মনে হতে লাগল, এই বুঝি দেখা যায় তিনি আসছেন।

সূর্য ক্রমশ মধ্যগগনে পৌঁছে গেল। তবে যশোধরার কাছে এ প্রতীক্ষা তেমন কঠিন কিছু নয়। তিনি তো এক জন্ম প্রতীক্ষা করেছেন সিদ্ধার্থকে স্বামীরূপে পাবার জন্য, দীর্ঘ নয় বছর প্রতীক্ষা করেছেন তাঁর কপিলাবস্তু ফিরে আসার জন্য। মধ্যাহ্ন উপস্থিত, কিন্তু মহাজ্ঞানী এলেন না।

যশোধরা এক সময় দেখতে পেলেন কুমার দেবদত্তকে। তিনি তাঁর অনুচরদের নিয়ে খুব উৎফুল্লভাবে প্রাসাদ ত্যাগ করছেন। প্রাসাদ চত্বর ত্যাগ করে পথে নামার পূর্বে তিনি একবার প্রাসাদের দিকে তাকিয়ে তাঁর অনুচরদের উদ্দেশে কী যেন একটা বলে অট্টহাস্য করলেন। সে শব্দ কানে এল যশোধরার। দেবদত্তকে দেখে আর তাঁর অট্টহাস্য শুনে একটা শঙ্কার উদয় হল যশোধরার মনে।

দেবদত্ত একবার কৌশলে সিদ্ধার্থর নখের ডগায় কী মিশিয়ে হত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন সিদ্ধার্থকে। সেইবার দীর্ঘকাল অসুস্থ হয়ে থাকার পর ভাগ্যদেবীর কৃপায় জীবন রক্ষা পায় সিদ্ধার্থর। এবারও দেবদত্ত তেমন কোনও চক্রান্ত করেননি তো? অথবা মহাজ্ঞানী অসুস্থ হয়ে পড়েননি তো? যশোধরার মনে এ শঙ্কা সৃষ্টি হবার কিছুক্ষণের মধ্যেই যশোধরার জন্য তণ্ডুলসিদ্ধ নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করল দাসী কঙ্কা।

যশোধরা তাকে বললেন, ‘আমার মন বড় উতলা হচ্ছে মহাজ্ঞানীর জন্য। তুই এখনই একবার সে স্থানে গিয়ে খবর নিয়ে আয় তিনি সুস্থ আছেন কিনা। এটুকুই শুধু আমার জানার দরকার।’

খাদ্য ঘরে রেখে দিয়ে দাসী কঙ্কা রওনা হল রাজবধূ যশোধরার নির্দেশ পালনের জন্য। যশোধরা সে খাদ্য মুখে তুললেন না। অস্থিরভাবে তিনি কখনও অলিন্দে অথবা কক্ষে পদচারণা করতে লাগলেন। বিকাল হবার আগে মহাজ্ঞানীর সংবাদ নিয়ে ফিরল কঙ্কা। সে জানাল, মহাজ্ঞানী সুস্থই আছেন। সে তাঁকে দেখেওছে। মধ্যাহ্নের আহার গ্রহণ করবার পর তিনি কয়েকজন ভিক্ষুকে নিয়ে পর্ণকুটিরের দাওয়ায় বসে বাক্যালাপ করছেন। দাসীর কথা শুনে যশোধরা আশ্বস্ত বোধ করলেন।

আবার অলিন্দে দাঁড়িয়ে মহাজ্ঞানীর জন্য প্রতীক্ষা শুরু করলেন যশোধরা। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হল এক সময়। তার পর বিকাল অতিক্রান্ত হয়ে সন্ধ্যাও নামল। সারাদিন কেটে গেল, কিন্তু তথাগত এলেন না। সন্ধ্যায় কক্ষে প্রবেশ করে দাসী প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়ে গেল। সেই প্রদীপের আলোও এক সময় তেল ফুরিয়ে নিভে গেল। অলিন্দ থেকে ধীর পায়ে অন্ধকার কক্ষে ফিরে ভূমিশয্যা গ্রহণ করলেন সিদ্ধার্থপত্নী যশোধরা।

১৩

ভোরের প্রথম আলো প্রবেশ করল যশোধরার কক্ষে। নিদ্রাহীন রাত্রিযাপন করেছেন তিনি। আলো ফোটার কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজার বাইরে পদশব্দ শুনতে পেয়ে উঠে দাঁড়ালেন যশোধরা। দরজা খুলে প্রথমে কক্ষে প্রবেশ করলেন মাতা গৌতমী। যশোধরাকে দেখে তিনি তাঁর পশ্চাতে থাকা একজনকে ইঙ্গিত করলেন কক্ষে প্রবেশ করার জন্য। এবার কক্ষে প্রবেশ করলেন কপিলাবস্তুরাজ শুদ্ধোধন।

রাজা কখনও তাঁর পুত্রবধূর কক্ষে প্রবেশ করেন না। তিনি কক্ষে প্রবেশ করতেই যশোধরা বুঝতে পারলেন, কোনও বিশেষ কারণবশত এ কক্ষে তাঁর আগমন ঘটেছে। মাতা গৌতমী আর মহারাজ শুদ্ধোধন, দু’জনের মুখমণ্ডলেই বিষণ্ণতা জেগে আছে। যশোধরা এগিয়ে গিয়ে তাঁদের দু’জনের পাদস্পর্শ করে প্রণাম জানালেন।

কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর মাতা গৌতমী বললেন, ‘আর কিছু সময়ের মধ্যেই মহাজ্ঞানী কপিলাবস্তু নগরী ত্যাগ করবার জন্য রওনা হবেন।’

যশোধরা বললেন, ‘আমি জানি মাতা।’

রাজমাতা বললেন, ‘মহাজ্ঞানীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার জন্য তোমার মনের ব্যাকুলতা আমি অনুভব করি।’

মহারাজ শুদ্ধোধন এবার বললেন, ‘তিনি চলে যাচ্ছেন। নগরীর প্রান্তসীমা পর্যন্ত আমরা তাঁর সঙ্গী হব তাঁকে বিদায় জানানোর জন্য। আমরা চাই তুমিও আমাদের সঙ্গে চলো। তাই আমরা তোমাকে নিতে এসেছি।’

প্রস্তাবটা শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে যশোধরা বললেন, ‘আমাকে মার্জনা করবেন আপনারা, আমি প্রাসাদ পরিত্যাগ করব না। আমি তো আমার শেষ সম্বলটুকুও সমর্পণ করেছি তাঁকে। পুত্র রাহুল এখন নিশ্চয়ই তাঁর দীর্ঘ যাত্রাপথের সঙ্গী হবে।’

মাতা গৌতমী যশোধরার কথা শুনে বললেন, ‘তোমার মনের ক্ষোভ, অভিমান আমি বুঝতে পারছি কন্যা। আর তা হওয়াই স্বাভাবিক। তবুও তুমি যদি আমাদের সঙ্গী হও তবে একবার হলেও সাক্ষাৎ হতো তোমাদের দু’জনের।’

যশোধরা বললেন, ‘না, মাতা, আপনারা তাঁকে বিদায় জানিয়ে আসুন। তাঁর প্রতি আমার কোনও ক্ষোভ-অভিমান নেই। আমি যাব না কারণ, আমি নিজেকে নিয়ে এক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে চাই।’

‘কীসের পরীক্ষা?’ জানতে চাইলেন রাজমহিষী।

যশোধরা উত্তর দিলেন, ‘মহাজ্ঞানীর জন্য আমার ত্যাগ-ভালোবাসা, তিতিক্ষা, প্রতীক্ষা সত্যি কিনা তা আমি পরীক্ষা করে দেখতে চাই। তা যদি সত্যি হয় তাহলে নিশ্চয়ই আমাদের দু’জনের সাক্ষাৎ হবে।’

মাতা গৌতমী বললেন, ‘কিন্তু সেই সাক্ষাৎ কবে হবে তা তো অনিশ্চিত। মহাজ্ঞানী আর কোনওদিন কপিলাবস্তুতে ফিরে আসবেন কিনা, তাঁর পথচলা কোথায় গিয়ে শেষ হবে তা তো আমাদের কারোরই জানা নেই।’

যশোধরা মৃদু হাসলেন। তারপর বললেন, ‘যদি সুযোগ হয় তবে আজ বিদায়কালে তাঁকে জানাবেন, আমি যে তাঁকে পাবার জন্য এক জন্মকাল প্রতীক্ষা করেছিলাম তা অতি নগণ্য। যশোধরা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য হাজার হাজার বছর ধরে প্রতীক্ষা করে থাকবে। সেই প্রতীক্ষাকালে যে-কোনও দুঃখ-কষ্ট সে হাসিমুখে গ্রহণ করতে প্রস্তুত।’

মাতা গৌতমী কিংবা রাজা শুদ্ধোধন যশোধরার এ কথা শুনে আর অনুরোধ জানালেন না তাঁকে। মহাজ্ঞানীর যাত্রারম্ভের সময় সমাগত। নিশ্চুপভাবে কক্ষত্যাগ করলেন তাঁরা। যশোধরা মনে মনে বললেন, যাত্রা শুভ হোক। তারপর দ্বারের পাল্লা দুটো আলতো করে বন্ধ করে ভূমিশয্যা গ্রহণ করলেন।

রাত্রি জাগরণের ফলে হয়তো বা ঘুম নেমে আসতে চাইছিল যশোধরার চোখে। হয়তো বা মৃদু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন তিনি। হঠাৎই একটা শব্দ তাঁর এই তন্দ্রা ভঙ্গ করল। শব্দটা চিনতে পারলেন তিনি। নীচে অশ্বশালা থেকে ভেসে আসা হ্রেষারব। অন্য ঘোড়ার ডাকের চেয়ে এ ডাকের আলাদা একটা গাম্ভীর্য আছে। আর সে জন্যই যে ডাকছে তাকে শনাক্ত করতে পারলেন তিনি। এ ডাক কন্থকের! যে অশ্বের পিঠে চড়ে একদিন এ প্রাসাদ পরিত্যাগ করেছিলেন সিদ্ধার্থ।

বারকয়েক ডাকবার পর থামল কন্থক। যশোধরা উঠে বসে ভাবলেন, বহুদিন পর সে এমনভাবে ডেকে উঠল কেন? মহাজ্ঞানীকে পৌঁছে দিয়ে ফিরে আসার পর থেকে তার ডাক আর কোনওদিন শোনেননি যশোধরা। তারপর হঠাৎই একটা পরিচিত সৌরভ যশোধরার নাকে এসে লাগল। পদ্মের সৌরভ! সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। আর তারপরই দ্বার ঠেলে যশোধরার কক্ষে প্রবেশ করলেন তিনি—যশোধরার স্বামী সিদ্ধার্থ—মহাজ্ঞানী বুদ্ধ-অমিতাভ।

কক্ষের মধ্যবর্তী স্থানে এসে দাঁড়ালেন তথাগত। উন্মুক্ত গবাক্ষ দিয়ে প্রভাতি আলো এসে পড়েছে তাঁর শরীরে, মুখমণ্ডলে। শান্ত-স্নিগ্ধ করুণাময়ের মুখমণ্ডল! ঠোঁটের কোণে যেন লেগে আছে আবছা হাসি। যশোধরা চেয়ে রইলেন তাঁর মুখের দিকে। বিস্ময়ের ঘোর কাটতে বেশ কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল যশোধরার। তারপর তিনি মহাজ্ঞানীর শঙ্খ-অঙ্কিত চরণ স্পর্শ করে উঠে দাঁড়িয়ে অস্ফুটকণ্ঠে বললেন, ‘আমি জানতাম আপনি আসবেন। তবে আজ এই প্রভাতে আপনার দর্শন পাব তা আমি ভাবিনি।’

বুদ্ধ হেসে বললেন, ‘ভেবেছিলাম, আমি আর দ্বিতীয়বার এ প্রাসাদে প্রবেশ করব না। কিন্তু তোমার ত্যাগ-তিতিক্ষা-ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত বিদায়কালে আমাকে এ কক্ষে এনে উপস্থিত করল।’

যশোধরা বললেন, ‘আপনি যদি আজ নাও আসতেন তাহলেও আমি জন্ম-জন্মান্তর ধরে আপনার জন্য প্রতীক্ষা করে থাকতাম। আমি জানি আপনি মানবসেবায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তার চেয়ে মহৎ কাজ এ পৃথিবীতে আর কী আছে? অনেকে আমার সম্পর্কে বলেন, আমি নাকি আপনার প্রতি অভিমানিনী। কারণ, আপনি চলে যাবার পূর্বে আমাকে বলে যাননি, এমনকী সদ্যোজাত পুত্রের মুখও দর্শন করেননি, পাছে আপনি মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যান…সেই শঙ্কায়।

‘হয়তো বা এ ঘটনার পশ্চাতে আমারও খানিক দায় আছে। আমি কাউকে জানাইনি যে আপনি সে রাতে গৃহত্যাগ করবেন তা আমাকে আগেই জানিয়েছিলেন। আপনি জানিয়েছিলেন, কোন পথে যাবেন আপনি। গৃহত্যাগের রাতে আপনি আমার কক্ষে প্রবেশ করে ঘুমন্ত পুত্রের মুখদর্শন করেছিলেন, বিদায়কালে আমি বাক্যালাপ করেছিলাম আপনার সঙ্গে।

‘এ কথা আমি কাউকেই জানাইনি কারণ তাহলে মহারাজ পরদিন ভোরেই আপনার সন্ধানে অশ্বারোহীদের পাঠাতেন, আপনার যাত্রা বিঘ্নিত হতো, উদ্দেশ্য বিঘ্নিত হতো। এক দিবস এক রাত্রি যখন আপনি প্রাসাদে ফিরলেন না, তার পরদিন যখন কন্থক একাকী ফিরে এল তখন মহারাজ শুদ্ধোধন অনুসন্ধানকারীদের পাঠিয়েছিলেন। সে সময়ের মধ্যে আপনি অনেক দূরে চলে গেছেন।

‘তাঁরপর একদিন আপনি বুদ্ধত্ব লাভ করলেন। আপনার বুদ্ধত্বলাভে আমার চেয়ে খুশি আর গৌরববতী কেই বা হয়েছে? তাই আপনার প্রতি অভিমান, ক্ষোভ বা অনুযোগ কোনওটাই আমার নেই। যা আছে তা হল, আপনার ও আপনার “ধম্মের” প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। আর তাই তো আমি আরও হাজার বছর প্রতীক্ষা করে থাকতে পারতাম আপনার জন্য।’ একটানা কথাগুলো বলে থামলেন যশোধরা।

মহাজ্ঞানী সর্বজ্ঞ। যশোধরার কথা শুনে তিনি বললেন, ‘তা আমি জানি, নইলে তুমি পুত্র রাহুলকে সংঘের কাছে সমর্পণ করতে না। আমি এও জানি, তুমি কেন সাক্ষাৎ করতে যাওনি আমার সঙ্গে। তোমার কি আমার কাছে কোনও প্রশ্ন জিগ্যেস করার আছে?’

যশোধরা একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘হ্যাঁ, গৃহত্যাগের সময় বিদায়বেলাতে আপনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন যে “বুদ্ধত্ব” লাভ করবার পর সে জ্ঞান আপনি প্রথম প্রদান করবেন আমাকে। কিন্তু আপনি মৃগদাবতে অন্য পাঁচজনকে প্রথম সেই জ্ঞান প্রদান করলেন। তবে কি আমি তা গ্রহণের উপযোগী করে নিজেকে গড়ে তুলতে পারিনি? আমার কি কোনও ত্রুটি ঘটেছিল? যে কারণে আপনি কথা দিয়েও তা রাখলেন না?’

বুদ্ধ এবার হাসলেন, তিনি বললেন, ‘আমি কথা রেখেছি যশোধরা। আমরা দু’জন ভিন্ন দেহধারী হলেও মনের দিক থেকে আমরা দু’জন অভিন্ন সত্তা। তাই আমার মহাজ্ঞানলাভের সঙ্গে সঙ্গে তোমারও সে জ্ঞানলাভ হয়েছে। এই যে তোমার কাষায়বস্ত্র পরিধান করা, মস্তক মুণ্ডন করানো, একবেলা আহার গ্রহণ বা ভূমিশয্যা গ্রহণ—এসব আমাকে নিছক অনুসরণের কারণে নয়।

‘আমার আত্মার মধ্যে তোমার আত্মার অবস্থান, তাই তুমি এ কাজে সমর্থ হয়েছ। তাই আমার মতো ভিক্ষু না হয়েও তুমি ভিক্ষুণী। সে কারণে যে জ্ঞান আমি লাভ করেছি তা আলাদাভাবে তোমার কাছে ব্যক্ত করবার আর প্রয়োজন হয়নি।’

মহাজ্ঞানীর কথা শুনে যশোধরা এবার সার সত্য উপলব্ধি করতে পারলেন। সে সত্যের নাম হল প্রেম। যে সত্য সর্বক্ষেত্রে বাইরে ব্যক্ত করার মধ্যে দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে না, যে অদৃশ্য। হৃদয়ের অন্তস্তল দিয়ে তাকে অনুভব করতে হয়। যশোধরার অবস্থান মহাজ্ঞানীর হৃদয়ের অন্তস্তলে। তাঁকে কোনও পৃথক সত্তা বলে মনে করেন না মহাজ্ঞানী। নিজের প্রশ্নের সদুত্তর পেয়ে গেলেন যশোধরা।

মহাজ্ঞানী এবার বললেন, ‘এবার আমাকে ফিরতে হবে। আমার যাত্রার সময় হয়েছে। ভিক্ষু সঙ্গীরা আমার জন্য অপেক্ষা করছেন।’

যশোধরা হেসে বললেন, ‘না, সে রাতের মতো আজও আমি আপনাকে যেতে বাধা দেব না। কারণ আমি এখন জানি, আমি আপনার অনন্তকালের পথপরিক্রমার সাথী। আমি হেঁটে চলেছি আপনার সঙ্গেই।’ এই বলে যশোধরা তাঁর স্বামী মহাজ্ঞানীর পাদস্পর্শ করলেন। মহাজ্ঞানী প্রেমময় বুদ্ধ হাত উত্থিত করে আশীর্বাদ করলেন তাঁর অবিচ্ছিন্ন সত্তা, জন্ম-জন্মান্তরের সঙ্গী যশোধরাকে।

কোলীয়, বা কোলীয় রাজ্য, বর্তমান নেপালের তেরাই অঞ্চলে অবস্থিত ছিল। কোনও কোনও প্রাচীন পুঁথিতে তাকে ষোড়শ মহাজনপদের কোশল রাজ্যের করদ রাজ্য বলে বর্ণিত করা হয়েছে।

উপসম্পদা প্রদান—ভিক্ষু সংঘে অন্তর্ভুক্তকরণের আচার অনুষ্ঠান।

হংসাবতী দেশ—বর্তমানে মায়ানমারের অন্তর্গত একটি অঞ্চলের প্রাচীন নাম।

প্রাচীন বৌদ্ধ গ্রন্থতে আর্যপর্যেষণা সূত্র, মধ্যম নিকায় স্পষ্ট বলা হয়েছে সিদ্ধার্থ যশোধরাকে জানিয়ে গৃহত্যাগ করেছিলেন।

নরসিংহ ‘গাথা’-টি পালি ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেছেন অধ্যাপক, বৌদ্ধশাস্ত্র গবেষক শ্রী সুমনপাল ভিক্ষু। তাঁকে আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *