রাঙামাটির বুদ্ধ
শৌভিক আর নিরুপমবাবু দু’জনেই গাড়ি থেকে নেমে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলেন। যে পথে তাঁদের ফেরার কথা সে পথে গাড়ির দীর্ঘ সারি দাঁড়িয়ে আছে। তাঁদের গাড়ির পিছনেও অন্য গাড়ি এসে দাঁড়াতে শুরু করেছে। এ জায়গা থেকে পাকদণ্ডী বেয়ে আরও দু’তিনটে রাস্তা এদিক-ওদিকে উঠেছে নেমেছে। হয়তো সেসব রাস্তা গিয়ে শেষ হয়েছে অজানা-অচেনা কোনও গ্রামে।
নিরুপমবাবু আর শৌভিক দু’জনেরই আজ গ্যাংটক ফেরার কথা। তবে মধ্যবয়সি নিরুপমবাবুর সঙ্গে শৌভিকের পরিচয় মাত্র ঘণ্টাখানেক আগে, উত্তর সিকিমের একটা ছোট্ট বাসস্ট্যান্ডে। পেশায় ফটোগ্রাফার শৌভিক এখানে এসেছিল, একটা ভ্রমণ ম্যাগাজিনের জন্য শীতের সিকিমের ছবি তুলতে। আর নিরুপম পেশায় অধ্যাপক ও শিল্প গবেষক। তিনি এসেছিলেন, এখানে যে প্রাচীন বৌদ্ধ গুম্ফা বা মনাস্ট্রি আছে তার মধ্যে কয়েকটা মনাস্ট্রির বুদ্ধমূর্তি ও শিল্পকর্ম দেখার জন্য।
গত রাতে একই স্থানে রাত্রিবাস করেছিলেন তাঁরা। যদিও ভিন্ন ভিন্ন হোমস্টেতে। আজ সকালে বাসস্ট্যান্ডে এসে দু’জনেই জানতে পারেন যে গত রাতে গ্যাংটক ফেরার প্রধান রাস্তায় ধস নেমেছে। তাই সে রাস্তায় গাড়ি বা বাস চলাচল বন্ধ। তাঁরা দু’জনেই একটা চায়ের দোকানে বসে প্রতীক্ষা করছিলেন—কখন রাস্তা খুলবে, বাস চলাচল শুরু হবে। কিন্তু দুপুরেও যখন রাস্তা খুলল না তখন চা দোকানির কাছ থেকে তাঁরা জানতে পারলেন যে গ্যাংটক ফেরার আর একটা রাস্তা আছে।
তবে সে রাস্তা দিয়ে বাস চলাচল করে না। ছোট গাড়ি ভাড়া নিয়ে যেতে হয়। সে কথা জেনে শৌভিক আর নিরুপমবাবু দু’জনে মিলে ছোট একটা গাড়ি শেয়ারে ভাড়া করে রওনা হয়েছিলেন অন্য পথে গ্যাংটক ফেরার জন্য। কিন্তু এ জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে পড়তে হল তাঁদের।
ড্রাইভার ছেলেটাও গাড়ি থেকে নেমে সামনে এগিয়ে দেখতে গিয়েছিল রাস্তার ব্যাপারটা। সে ফিরে এসে বলল, ‘আপাতত আর এগোনো যাবে না স্যার। এদিক দিয়েও ফেরার রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। তবে শুনলাম, আর্মির লোকেরা ইতিমধ্যেই রাস্তা পরিষ্কারের কাজ শুরু করে দিয়েছে। তবে এদের কাজ শেষ হতে হয়তো রাত হয়ে যাবে।’
কথাটা শুনে নিরুপম চিন্তিতভাবে বললেন, ‘মনে হচ্ছে আজ আর আমাদের ফেরা হবে না।’ এ কথা বলার পর তিনি ড্রাইভার ছেলেটাকে জিগ্যেস করলেন, ‘এখানে কাছাকাছি কোনও হোমস্টে বা হোটেল আছে?’
শৌভিকও বলল, ‘হ্যাঁ, তেমনই কিছু একটা খুঁজে নেওয়া দরকার। বাইরে শীতের পাহাড়ে রাত কাটাব কীভাবে?’
ড্রাইভার ছেলেটা বলল, ‘হোমস্টেগুলো তো আমরা কুড়ি কিলোমিটার পিছনে ফেলে এসেছি। ওয়ান-ওয়ে রোড, সেখানে তো আর ফেরার উপায় নেই। আর এখান থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে কয়েকটা হোমস্টে আছে। তবে সরু রাস্তা, গাড়ি যাবে না। পায়ে হেঁটে চড়াই ভেঙে উঠতে হবে। সেখানে গেলে থাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আমার কাছে একটা হোমস্টের ফোন নম্বর আছে। ফোন করব স্যার?’
ড্রাইভারের কথা শুনে নিরুপম প্রায় আঁতকে উঠে বললেন, ‘আমার হাঁটুর যা অবস্থা তাতে পাঁচ কিলোমিটার পথ চড়াই ভাঙা আমার পক্ষে অসম্ভব।’
ছেলেটা বলল, ‘তাহলে দরকার হলে রাতে আমার গাড়ির ভেতরেই থাকতে হবে আপনাদের।’
কী করা যায় তা চিন্তিতমুখে ভাবতে লাগলেন শৌভিক আর
নিরুপমবাবু।
এমন সময় ড্রাইভার ছেলেটা হঠাৎ বলল, ‘বৌদ্ধ মঠে থাকবেন স্যার? এখান থেকে কিছুটা দূরে অন্য রাস্তাতে রাঙামাটি মঠ নামে একটা ছোট মঠ আছে। গাড়ি যাবে ও পথে।’ এই বলে আঙুল তুলে সে অন্য একটা ছোট রাস্তা দেখাল।
শৌভিক বলল, ‘গাড়িতে রাত কাটানোর চাইতে মঠে রাত কাটানো অনেক ভালো।’
নিরুপম বললেন, ‘যা পরিস্থিতি দেখছি, তাতে রাস্তা খোলার কোনও নিশ্চয়তা নেই। রাতে মাথার ওপর একটা ছাদের দরকার। তাছাড়া সেখানে গেলে হয়তো কোনও প্রাচীন শিল্পকর্মও আমার চোখে পড়তে পারে।’
এ কথা বলার পর তিনি ড্রাইভার ছেলেটাকে বললেন, ‘কিন্তু মঠে আমাদের থাকতে দেবে কেন?’
ছেলেটা বলল, ‘যিনি মঠ চালান তাঁর নাম শাসন লামা। তিনি বাঙালি আর আপনারাও বাঙালি। শাসন লামার সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। মাঝে মধ্যে তিনি আমাদের ট্যুরিজম কোম্পানির গাড়ি ভাড়া নেন গ্যাংটক শহরে কাজে যাবার জন্য। আমিই তাঁকে নিয়ে যাই। আমি বললে তিনি হয়তো থাকতে দেবেন। আমিও তবে ওখানেই থাকব। রাস্তা খোলার খবর পেলে আপনাদের গ্যাংটকে নিয়ে যাব।’
শৌভিক আর নিরুপমবাবু দু’জনে আলোচনা করে ড্রাইভার ছেলেটার প্রস্তাবেই সম্মত হলেন। কারণ, যা পরিস্থিতি তাতে এ সুযোগ গ্রহণ না করলে হয়তো গাড়ির মধ্যেই তাঁদের সারারাত কাটাতে হতে পারে। তাই তাঁরা রওনা দিলেন মঠের উদ্দেশে। গাড়ি সে রাস্তা ছেড়ে অন্য রাস্তা ধরল। এঁকে বেঁকে পথ এগিয়েছে। দু’পাশে ঘন পাইনবন। শ্যাওলা আর গুল্ম আচ্ছাদিত তাদের গুঁড়িগুলো। শীতল বাতাস আর ঝিঁঝি পোকার ডাক ভেসে আসছে সেখান থেকে।
শৌভিকের বেশ লাগছিল গোটা পথটা। যদিও বাধ্য হয়েই তাকে এগোতে হচ্ছে সে পথে। তবে নিরুপমবাবুর সঙ্গে পরিচয় হবার পর শৌভিক তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা বলে যতটুকু বুঝেছে তাতে নিরুপমবাবুর শিল্পকলায় যতটা আগ্রহ আছে ততটা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে নেই। তিনি চলার পথে ড্রাইভার ছেলেটাকে বললেন, ‘শুনেছি, বর্ষায় পাহাড়ে ধস নামে। এই শীতকালে ধস নামল কেন?’
ছেলেটা বলল, ‘যেখানে ধস নেমেছে সেখানে কিছু দিন আগে রাস্তা চওড়া করার জন্য পাহাড়ের দেওয়াল কিছুটা কাটা হয়েছিল। হয়তো সেসময় অন্য পাথরগুলোও আলগা হয়ে গিয়েছিল।’
এসব নানা কথাবার্তার মধ্যেই একটা ছোট পাথুরে চত্বরে উঠে এল গাড়ি।
২
গাড়ি যেখানে পৌঁছাল সেখানে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটা বৌদ্ধ গুম্ফা বা মনাস্ট্রি। ঢালু ছাদ আর পাথরের দেওয়ালসমৃদ্ধ মনাস্ট্রির চিত্রশোভিত প্রবেশ তোরণের মাথায় একটা সাইনবোর্ডে লেখা—‘রাঙামাটি মনাস্ট্রি’।
মঠ চত্বরে সাত-আটজন বাচ্চা ছেলে খেলা করছিল। তাঁরা তিনজন গাড়ি থেকে নামতেই ছেলেগুলো তাঁদের কাছে ছুটে এল। বাচ্চাগুলোর হাত-মুখ খড়ি ওঠা। পরনে পীতবর্ণের পোশাক। যেমন পোশাক পরে থাকেন বৌদ্ধ ভিক্ষুরা। সেই পোশাকেরই ক্ষুদ্র সংস্করণ বলা যায়! গায়ে শীতবস্ত্র বলতে কারও কারও গায়ে একই রঙের চাদর। মুণ্ডিতমস্তক সেই বালকেরা কৌতূহলের দৃষ্টিতে চাইল তাঁদের দিকে। ড্রাইভার ছেলেটা তাদের একজনকে জিগ্যেস করল, ‘শাসন লামা মঠে আছেন?’
মাথা নেড়ে বাচ্চা ছেলেটা জবাব দিল, ‘হ্যাঁ।’
ড্রাইভার শৌভিকদের বলল, ‘আসুন আমার সঙ্গে।’ শৌভিকরা তাকে অনুসরণ করলেন। আর বালক ভিক্ষুর দলও তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে চলল। দরজা খোলাই ছিল। মঠের ভিতর প্রবেশ করল সকলে। একটা উঠানকে কেন্দ্র করে তার চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কিছু ছোট বড় ঘর। আর বেশ কয়েকটা বারান্দাও চলে গেছে এদিক-ওদিক। বারান্দা ধরে এগিয়ে একটা ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল ছেলেটা।
ঘরের দরজা খোলা। বাইরে থেকে সে ঘরটাকে মঠের অফিসঘর বলেই মনে হয়। ঘরের দেওয়ালের গায়ে আলমারিতে পুঁথি, বইপত্র, ব্যাগ ইত্যাদি রয়েছে। ঘরের মাঝখানে একটা টেবিলকে ঘিরে বেশ কয়েকটা চেয়ারও রয়েছে। দরজার দিকে মুখ করা একটা চেয়ারে বসে মুণ্ডিতমস্তক, বৃষস্কন্ধ এক মধ্যবয়স্ক চীবর পরিহিত বৌদ্ধসন্ন্যাসী বসে কথা বলছিলেন দণ্ডায়মান এক যুবক ভিক্ষুর সঙ্গে।
ড্রাইভার ছেলেটা শৌভিকদের চোখের ইশারায় দেখিয়ে বুঝিয়ে দিল, চেয়ারে বসে থাকা সেই কৃষ্ণকায় বৌদ্ধ সন্ন্যাসীই মঠাধ্যক্ষ শাসন লামা বা শাসনপাল ভিক্ষু। কথা বলতে বলতে শাসন লামার চোখ পড়ল ঘরের দরজার দিকে। তিনি অন্য ভিক্ষুর সঙ্গে কথা বলা থামিয়ে দিলেন। তারপর শৌভিকদের উদ্দেশে বললেন, ‘আসুন, ভিতরে আসুন।’
ড্রাইভার ছেলেটার সঙ্গে শৌভিক আর নিরুপমবাবু ঘরের ভিতর প্রবেশ করলেন। তবে বাচ্চা ছেলেগুলো ভিতরে ঢুকল না। তারা দরজার বাইরেই দাঁড়িয়ে রইল। শাসন লামা শৌভিক আর নিরুপমবাবুকে বললেন, ‘বসুন।’
বেশ ভরাট গলা তাঁর। মুখমণ্ডলেও মৃদু কাঠিন্য বা কর্তৃত্বের ভাব আছে। বসার আগে শৌভিক আর নিরুপমবাবু হাত জোড় করে নমস্কার করলেন মঠাধ্যক্ষ শাসন লামাকে। তিনিও প্রতিনমস্কার জানিয়ে তাকালেন তাঁর পরিচিত ড্রাইভার ছেলেটার দিকে।
সে মাথা ঝুঁকিয়ে লামাকে প্রণাম জানিয়ে বলল, ‘ওনারা কলকাতা থেকে এখানে এসেছেন। আমার গাড়িতে গ্যাংটক ফিরবেন। শুনেছেন নিশ্চয়ই, ধস পড়ে গ্যাংটক ফেরার প্রধান রাস্তা বন্ধ! কিন্তু এখন এদিকের রাস্তাটাও বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ। কখন রাস্তা খুলবে বা পাথর সরানো হবে জানা নেই। রাতটা যদি ওনাদের এখানে থাকতে দেন তবে বড় উপকার হয়। আর আমিও থাকব এখানে। মঠের ভিতরে না হলে দরজার বাইরে গাড়িতেই থাকব।’ একটানা কথাগুলো বলে থামল ড্রাইভার ছেলেটা।
শাসন লামা শৌভিকদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনাদের পরিচয়টা একটু বলবেন?’
শৌভিক আর নিরুপমবাবু নিজেদের নাম-পরিচয় দিলেন। নিরুপমবাবু এরপর সেই সন্ন্যাসীকে বললেন, ‘আমাদের দু’জনের কাছে পরিচয়পত্রও আছে। আপনি চাইলে দেখাতে পারি। আপনি যদি আপনার মঠে রাত্রিবাসটুকু করতে দেন তবে বিপদমুক্ত হই আমরা।’
শাসন লামা একটু ভেবে নিয়ে বললেন, ‘এসেই যখন পড়েছেন তখন ফেরাই কীভাবে! বুদ্ধবাণীও বলে, আশ্রয়হীনকে আশ্রয় দেবার কথা। কিন্তু এটা একটা ছোট ও অতি সাধারণ মঠ। আরামদায়ক কোনও ব্যবস্থাই নেই এখানে। শুধু চৌকি-বালিশ আর কম্বল দিতে পারি আপনাদের। থাকতে পারবেন তো?’
শৌভিক বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, কোনও সমস্যা হবে না। রাতটুকু কাটাতে পারলেই হল।’
শাসন লামা তাঁর সামনে দাঁড়ানো ভিক্ষুকে বললেন, ‘ওনারা যে ঘরে থাকবেন, তুমি সে ঘরটা গিয়ে পরিচ্ছন্ন করে দাও। তারপর এসে ওনাদের ঘরে নিয়ে যাও।’
তিনি যখন সহকারী ভিক্ষুকে এ কথা বলছেন তখন নিরুপমবাবু হাতের ইশারায় শৌভিককে বললেন, রাতে খাওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য শাসন লামাকে অনুরোধ করতে। তাঁরা সেই কোন সকালে হোমস্টে থেকে প্রাতরাশ সেরে রওনা দিয়েছিলেন, তারপর চা-পান করা ছাড়া আর কিছু খাওয়া হয়নি। শৌভিকের সঙ্গে কোনও খাবার নেই। নিরুপমবাবুর সম্বল একটামাত্র বিস্কুটের প্যাকেট। আসলে এমন অবস্থার মধ্যে যে পড়তে হবে তা তাঁরা কেউই অনুমান করতে পারেননি।
শৌভিক শাসন লামাকে বলল, ‘আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিলেন বলে আমরা আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। আর একটা ছোট্ট অনুরোধ আছে। আপনি যদি আমাদের জন্য সাধারণ কিছু খাবারের ব্যবস্থা করে দেন তবে খুব ভালো হয়। আসলে দুপুরেও খাওয়া হয়নি আমাদের। সাধারণ দুটো ডাল-ভাত বা যা ব্যবস্থা করবেন তাতেই চলবে।’
কথাটা শুনে শাসন লামা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, ‘আমাকে মার্জনা করবেন। এখানে থাকতে হলে রাতটা আপনাদের অভুক্তই থাকতে হবে। সামান্য মুড়িও আমাদের কাছে নেই। আসলে যে লোকটা পনেরো দিন অন্তর চাল, ডাল ইত্যদি রসদ দিয়ে যায়, তার তিন দিন আগেই রসদ পৌঁছে দিয়ে যাবার কথা ছিল। কিন্তু অসুস্থতার কারণে সে আসতে পারেনি।
‘রাস্তা না খুললে সে আসতে পারবেও না। চাল-ডাল কাল দুপুরেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। শুকনো খাবার যা একটু ছিল তা দিয়ে বাচ্চা ছেলেগুলোকেও পেট ভরে খেতে দিতে পারিনি। ওরা অর্ধভুক্ত আর আমি আর আমার দু’জন সহকারী ভিক্ষুরা অভুক্ত অবস্থায় আছি। যদিও বৌদ্ধ ভিক্ষুরা এক বেলাই অন্নগ্রহণ করেন। তবে আপনাদের মুখে খাবার তুলে দিতে পারছি না বলে ক্ষমা করবেন আমাকে।’
কথাটা শুনে শৌভিক বলল, ‘না, না, ওভাবে ক্ষমা চাইবেন না। আপনি যে মাথা গোঁজার ব্যবস্থাটুকু করে দিলেন সেটাই অনেক বড় ব্যাপার। তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। একটা রাত প্রয়োজন হলে না হয় জল খেয়েই কাটিয়ে দেব।’
শাসনপাল এবার তাকালেন ঘরের দরজার দিকে। বাচ্চাগুলোর উদ্দেশে তিনি মৃদু ধমকের স্বরে বললেন, ‘তোমরা এখানে এসে দাঁড়িয়ে আছ কেন? আমাদের কথা শুনে তোমরা কী করবে?’
ধমক খেয়েই সঙ্গে সঙ্গে ছিটকে সরে গেল ছেলের দল। নিরুপমবাবু এরপর শাসন লামাকে বললেন, ‘রাঙামাটি নামে বাংলাদেশে একটা জেলা আছে বলে শুনেছি। আপনার এ মঠের নাম “রাঙামাটি মঠ” কেন?’
শাসনপাল বললেন, ‘ঠিকই শুনেছেন। বাংলাদেশের রাঙামাটি জেলায় রাজবন নামে এক প্রসিদ্ধ বৌদ্ধ বিহার বা মঠ আছে। তাছাড়া আরও বেশ কিছু বৌদ্ধ মঠ আছে সেখানে। সেই মঠগুলোরই একটি শাখা এটা। হিন্দু মঠের সন্ন্যাসীরা যেমন দেশের বাইরে গিয়ে জনসেবার জন্য মঠ প্রতিষ্ঠা করেন তেমন আমরা বৌদ্ধরাও তা করে আসছি বহু শতাব্দী ধরে। বাংলাদেশের রাঙামাটির একটি মঠের শাখা বলে এর নাম “রাঙামাটি মঠ”। আপনারা বোধগয়াতে গিয়ে থাকলে দেখে থাকবেন যে সেখানে নানা দেশের বৌদ্ধ বিহার বা মঠ আছে।’
নিরুপমবাবু বললেন, ‘আপনাদের মঠের বুদ্ধমূর্তিটা একবার দর্শন করব। মূর্তি, শিল্পকলা এসব ব্যাপারে আমার বিশেষ আগ্রহ আছে।’
শাসন লামা বললেন, ‘নিশ্চয়ই দেখবেন। আমার সহকারী আপনাদের প্রেয়ার হলটা দেখিয়ে দেবে।’
আরও দু’একটা কথাবার্তার পর শাসন লামার সহকারী সেই ভিক্ষু এসে হাজির হল শৌভিকদের ঘরে নিয়ে যাবার জন্য।
৩
যুবক ভিক্ষু একটা ঘরে নিয়ে গেলেন তাঁদের। সাধারণ ঘর। কয়েকটা চৌকি আছে তাতে। দুটো চৌকিতে তাঁদের জন্য চাদর, বালিশ, কম্বলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভিক্ষু জানালেন, ড্রাইভারের জন্য অন্য আর একটা ঘরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি চলে যাবার আগে নিরুপমবাবু জানতে চাইলেন, ‘আপনাদের মঠের বুদ্ধমূর্তিটা কোথায় আছে?’
ভিক্ষু দরজার বাইরে কিছুটা দূরে একটা ঘরের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বললেন, ‘ওটা আমাদের প্রেয়ার রুম। ওখানেই তাঁর মূর্তি আছে। দরজা খোলা আছে। দেখে আসতে পারেন।’
ভিক্ষু যুবক চলে যাবার পর ড্রাইভার ঘরে এসে তাঁদের মালপত্র পৌঁছে দিয়ে গেল। শৌভিকের জিনিস বলতে ক্যামেরা আর টুকিটাকি জিনিস রাখার জন্য একটা ছোট ব্যাগ, পোশাক ইত্যাদির জন্য লাল রঙের একটা ব্যাকপ্যাক। আর নিরুপমবাবুর সঙ্গে আছে দুটো সুটকেস।
ড্রাইভার ঘর থেকে বেরোবার সময় বলে গেল, সন্ধ্যার আগেই যদি রাস্তা খুলে যায় তবে সে তাঁদের দু’তিন ঘণ্টার মধ্যে গ্যাংটক নামিয়ে দেবে। আর যদি রাস্তা খুলতে রাত আটটা-ন’টা বেজে যায় তবে পরদিন ভোর বেলা সে রওনা হবে। সে মোবাইল ফোনে অন্য ড্রাইভারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে, রাস্তা খোলা হয়েছে কিনা তা জানার জন্য।
ড্রাইভার ছেলেটা চলে যাবার পর কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে শৌভিক বলল, ‘ঘরে বসে আর কী করবেন? চলুন মঠের সামনের চত্বরটাতে গিয়ে বসি।’
নিরুপমবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ, চলুন। তবে যাবার আগে একবার বুদ্ধমূর্তিটা দেখে যাই। অনেক সময় ছোটখাটো জায়গায় আশ্চর্য সব শিল্পকীর্তি লুকিয়ে থাকে।’
ক্যামেরার ব্যাগটা নিয়ে নিরুপমবাবুর সঙ্গে ঘরের বাইরে বেরোল শৌভিক। তাঁরা প্রথমে প্রবেশ করলেন প্রেয়ার হলে। মাঝারি আকৃতির একটা হলঘর। মেঝের এক পাশে পর পর বেশ কয়েকটা জলচৌকি আর তার ওপর ধর্মপুস্তক রাখা আছে। ওখানে বসেই সম্ভবত পাঠগ্রহণ করে ভিক্ষু বালকরা। দেওয়ালের গায়ে আঁকা আছে বুদ্ধের জীবন সংক্রান্ত নানা ছবি।
আর হলঘরের শেষ প্রান্তে উঁচু বেদির ওপর রয়েছে পাথরের তৈরি একটা প্রমাণ আকৃতির বুদ্ধমূর্তি। তাঁরা এগিয়ে গেলেন সেই বেদিটার সামনে। ধ্যানরত বুদ্ধমূর্তির সামনে প্রদীপ আর ধূপ জ্বলছে। রয়েছে জলপাত্র আর একটা থালাতে একটা আপেল—দেবতার নৈবেদ্য। স্নিগ্ধ ধ্যানস্থ বুদ্ধমূর্তিটা দেখে শৌভিকের ভালো লাগলেও তা নিরাশ করল নিরুপমবাবুকে।
তিনি আক্ষেপের সুরে বললেন, ‘ভেবেছিলাম হয়তো নতুন ধরনের কোনও শিল্পকর্ম দেখার সম্ভবনা আছে। কিন্তু এই ধ্যানমগ্ন বুদ্ধমূর্তি তো হামেশাই দেখা যায় এখানে ওখানে। শিল্পকর্মের দিক থেকে বিচার করলেও এ মূর্তি অতি সাধারণ! আর দেওয়ালচিত্রগুলোও মামুলি ধরনের।’
শৌভিক এরপর নিরুপমবাবুর সঙ্গে বেদির সামনে থেকে সরে আসতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই সে দেখতে পেল একজনকে। মুণ্ডিতমস্তক এক বালক ভিক্ষু। ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে সে। তাকিয়ে আছে বেদিটার দিকেই। শৌভিকের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই সে হাসল। শৌভিকও হাসল তার দিকে তাকিয়ে।
প্রেয়ার রুম আর মঠ ছেড়ে এরপর সদর দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন শৌভিক আর নিরুপমবাবু। কয়েকটা বাচ্চা ছেলে আবার মঠ থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে ছোটাছুটি করে খেলছে। ড্রাইভার তার গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে।
চত্বরের সামনে একটা পাথরের ওপর বসলেন শৌভিক আর নিরুপমবাবু। তাঁরা বাচ্চা ছেলেগুলোকে দেখছিলেন। তাদের রোঁয়া ওঠা পোশাক, মলিন শরীর দেখে শৌভিক অনুমান করল, নিতান্তই কোনও বাধ্যবাধকতার কারণে এ মঠে তাদের আশ্রয় নিতে হয়েছে। তবে ভিক্ষু হলেও তারা বালক শিশু। তাই হয়তো এখানেই আনন্দ খুঁজে নেবার চেষ্টা করে তারা।
ইতিমধ্যে বিকাল হয়ে গেছে। ড্রাইভার ছেলেটা তাঁদের কাছাকাছি এসে দাঁড়াতেই নিরুপম তাকে জিগ্যেস করলেন, ‘কোনও খবর পেলে?’
সে জবাব দিল, ‘কাজ চলছে। তবে যা খবর পেলাম তাতে আটটা-ন’টার আগে রাস্তা খুলবে না। রাতটুকু এখানেই থাকতে হবে আপনাদের।’
নিরুপমবাবু বললেন, ‘কী আর করা যাবে! তবে কাল সকালে উঠেই রওনা হব।’
কাকতালীয়ভাবে এখানে এসে পড়লেও চারপাশটা দেখে কিন্তু বেশ ভালোই লাগছে শৌভিকের। চারপাশে ঘন পাইনবনে ছাওয়া এই মঠ আর চত্বরটা। বাচ্চাগুলো ছোটাছুটি করে খেলছে। বেলাশেষের আলো এসে পড়েছে তাদের গায়ে। ছেলেগুলোর ছবি তুলবে বলে ক্যামেরা বার করতে করতে শৌভিক জানতে চাইল, ‘এই বাচ্চাগুলোর পরিচয় কী?’
ড্রাইভার বলল, ‘ওরা কেউ অনাথ, কারও বাবা-মা খুব গরিব বলে তাকে মঠে রেখে গেছে যাতে অন্তত খেতে পড়তে পারে সে জন্য। দেখছেন না, ভালো গরম পোশাকও নেই ওদের গায়ে। খুব গরিব ওরা।’
শৌভিক বেশ কয়েকটা ছবি তুলল বাচ্চাগুলোর। কিছু সময় পরে সূর্য ঢলে পড়ল পাইনবনের আড়ালে। শৌভিকের ফটোগ্রাফারের চোখ। সে ঘুরে ঘুরে ছবি তুলতে লাগল। একে শীতকাল, তার ওপর পাহাড়ি অঞ্চল। সূর্য পাহাড়ের আড়ালে যেতে বেশি সময় লাগল না। নিরুপমবাবু উঠে দাঁড়িয়ে শৌভিককে হাঁক দিয়ে বললেন, ‘চলুন এবার ভিতরে ঢোকা যাক। নইলে ঠান্ডা লেগে যেতে পারে।’
শৌভিক নিরুপমবাবুর কাছে ফিরে এল। ছেলের দল আগেই মঠে ঢুকে গেছে। ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে নিরুপমবাবু শৌভিককে বললেন, ‘আপনি তো বেশ ছবি-টবি তুলে নিলেন। কিন্তু এ মঠের বুদ্ধমূর্তিটা ঠিক আমার মন ভরাতে পারল না। নিতান্তই মামুলি একটা মূর্তি!’
শৌভিক বলল, ‘আমরা তো এখানে মূর্তি বা ছবি তোলার জন্য আসিনি। মাথা গোঁজার জন্য এসেছিলাম। আমি ছবি তোলার সুযোগ পেলাম, সেটা আমার বাড়তি পাওনা হল।’
নিরুপমবাবু বললেন, ‘আমার মনেও বাড়তি পাওনার আশা ছিল। ভেবেছিলাম সুন্দর বা নতুনরকমের কোনও বুদ্ধমূর্তি বা শিল্পকর্ম হয়তো দেখতে পাব।’
শৌভিকরা ঘরে ফিরে আসার পরই সন্ধ্যা নামতে শুরু করল। একজন বৃদ্ধ ভিক্ষু এসে একটা জ্বলন্ত হ্যারিকেন বাতি দিয়ে গেল তাঁদের ঘরে। কিছুক্ষণ পর প্রেয়ার রুম থেকে বাচ্চা ছেলেগুলোর প্রার্থনাসঙ্গীত ভেসে আসতে লাগল। শৌভিক আর নিরুপমবাবু সময় কাটাবার জন্য নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব শুরু করলেন। সন্ধ্যা এগোতে থাকল রাতের দিকে।
৪
রাত আটটায় শৌভিকদের ঘরে এল ড্রাইভার। সে জানাল, রাস্তা খুলেছে। পরদিন সকাল সাতটার মধ্যেই সে রওনা হবে গ্যাংটকের দিকে।
সে চলে যাবার পর শৌভিকের একটা কথা মাথায় এল। সে নিরুপমবাবুকে বলল, ‘খাবার না পেলেও এ মঠে এক রাত থাকার জায়গা তো পেলাম। সামান্য হলেও কিছু আর্থিক অনুদান দেওয়া উচিত মঠকে। এই অনাথ বাচ্চা ছেলেগুলোর জন্য হয়তো কাজে লাগবে টাকাটা। কী বলেন?’
নিরুপমবাবু বললেন, ‘আমার আপত্তি নেই। হাজার টাকা করে দু’জনে মিলে দু’হাজার টাকা দিয়ে দিই। অবশ্য যদি টাকাটা নিতে অস্বীকার না করেন শাসন লামা।’
এ কথা বলার পর তিনি বললেন, ‘চলুন তাহলে এখনই তবে কাজটা সেরে ফেলি। ভোরবেলার জন্য আর ফেলে রাখব না।’
কাচে ঢাকা একটা তেলের বাতি জ্বালিয়ে নিজের চেয়ারে বসে কাগজপত্র নিয়ে কাজ করছিলেন শাসন লামা। শৌভিকরা ঘরে ঢুকতেই মুখ তুলে তাকালেন তিনি।
শৌভিক বলল, ‘এ সময় আপনাকে বিব্রত করতে এসেছি বলে কিছু মনে করবেন না। রাস্তা খুলে গেছে। কাল ভোরেই আমরা ফেরার জন্য রওনা হব। তার আগে আমরা সামান্য কিছু অনুদান দিয়ে যেতে চাই ওই বাচ্চাগুলোর জন্য। আপনি তা গ্রহণ করলে আমাদের ভালো লাগবে।’
শাসন লামা যেন খুশিই হলেন কথাটা শুনে। তিনি বললেন, ‘দিন। আমরা ভিক্ষু। আমাদের তো তেমন কোনও আয় নেই। দানের অর্থেই এই মঠ, এই অনাথ শিশুদের প্রতিপালন করা হয়।’
শৌভিক তাঁদের দু’জনের পক্ষ থেকে দু’হাজার টাকা বাড়িয়ে দিলেন শাসনপালের দিকে। তিনি টাকাটা গ্রহণ করে বললেন, ‘বসুন, রসিদ নিয়ে যান।’
শৌভিক আর নিরুপমবাবু চেয়ারে বসলেন। মঠাধ্যক্ষ শাসন লামা রসিদ কাটতে শুরু করেছেন, ঠিক সেই সময় তাঁর দু’জন সহকারী সেই যুবক আর বৃদ্ধ ভিক্ষু এক ভিক্ষু বালককে নিয়ে ঘরের ভিতর ঢুকল। যুবক ভিক্ষু বলল, ‘এই যে নিয়ে এসেছি ওকে।’
রসিদ লেখা থামিয়ে সেই বালক ভিক্ষুর দিকে তাকালেন লামা। শৌভিকরাও তাদের দিকে তাকাল। আনুমানিক বছর দশেক বয়স হবে ছেলেটার। একটু জড়সড়ভাবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে সে। এই প্রবল ঠান্ডায় তার গায়ে কোনও শীতবস্ত্র নেই।
ভিক্ষু তার উদ্দেশে বললেন, ‘সন্ধ্যাবেলা যখন প্রার্থনা চলছিল, তখন তুমি কোথায় ছিলে?’
অস্ফুটকণ্ঠে ছেলেটা জবাব দিল, ‘ও ঘরের বাইরে ছিলাম।’
শাসন লামা এরপর তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘দেবতার সামনে থালায় যে আপেলটা ছিল সেটা তুমি না বলে নিয়েছ?’
বৃদ্ধ লামা বললেন, ‘ওই নিয়েছে, ওকে আমি বিকালবেলা প্রেয়ার হল থেকে বাইরে বেরোতে দেখেছি। সম্ভবত অন্য ছেলেরা যখন প্রার্থনা করছিল তখন ও কোথাও বসে আপেলটা খাচ্ছিল।’
শৌভিক এবার চিনতে পারল ছেলেটাকে। হ্যাঁ, এই ছেলেটাই ছিল প্রেয়ার রুমে! সে তাকিয়ে ছিল বেদির দিকে, হয়তো বা থালায় রাখা আপেলটার দিকে।
শাসনপাল আবার ছেলেটার উদ্দেশে বললেন, ‘আপেলটা তাহলে তুমিই চুরি করেছ?’
ছেলেটা আগের মতোই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। বাচ্চা ছেলেটার নীরবতা আর মাথা নিচু করার ভঙ্গি যেন জানিয়ে দিল যে সেই কাজটা করেছে।
শাসনপাল ছেলেটার দিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, ‘বুদ্ধ বলেছেন, পাপকাজ থেকে বিরত থাকতে। চুরি করা একটি পাপকাজ। আর এর জন্য তোমাকে শাস্তি পেতে হবে। কাল ভোরবেলা
উঠে তুমি তিন ঝোরা থেকে এক বালতি জল এনে তা দিয়ে প্রেয়ার হলের বেদিটা মুছে পরিষ্কার করবে। নির্দেশ অমান্য করলে আরও বড় শাস্তি পেতে হবে।’
এরপর শাসন লামা সহকারী ভিক্ষুদের বললেন ছেলেটাকে নিয়ে যাবার জন্য।
‘তিন ঝোরা’ কথাটার অর্থ তিনটে ছোট ঝর্ণা। শাসনপালের কথায় জায়গাটা সম্বন্ধে শৌভিকের মনে আগ্রহ সৃষ্টি হল। সে জানতে চাইল, ‘তিন ঝোরা জায়গাটা কোথায়?’
শাসনপাল বললেন, ‘এখান থেকে তিন-চার কিলোমিটার দূরে নীচের দিকে।’
শৌভিক এবার ছেলেটার শাস্তির পরিমাণটা অনুমান করতে পারল। ছেলেটাকে ভোরবেলা এই ঠান্ডার মধ্যে এত দূর গিয়ে জলভর্তি বালতি ওপরে তুলে আনতে হবে। সম্ভবত খিদের জ্বালায় বাচ্চা ছেলেটা এ কাজ করে ফেলেছে। তার জন্য এমন কঠিন শাস্তি পেতে হচ্ছে তাকে! ব্যাপারটা ভেবে বেশ খারাপ লাগল শৌভিকের।
সে শাসন লামাকে বলল, ‘কিছু মনে করবেন না, একটা কথা জিগ্যেস করছি। বুদ্ধ তো বলেছেন “ক্ষমাই শ্রেষ্ঠ ধর্ম”। তবে আপনি ছেলেটাকে ক্ষমা না করে শাস্তির নির্দেশ দিলেন কেন?’
শাসন লামা স্থিরদৃষ্টিতে কয়েক মুহূর্ত শৌভিকের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘হ্যাঁ, বুদ্ধবাণীতে এ কথা বলা আছে ঠিকই। কিন্তু মঠ পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু অনুশাসন মেনে চলতে হয়। মঠাধ্যক্ষ হিসাবে আমার কর্তব্য, কোনও অন্যায়কে প্রশ্রয় না দেওয়া। এই অনাথ বালকদের চরিত্রগঠনও আমার কর্তব্য। আমি যদি ওকে শাস্তি না দিই তবে ও হয়তো ভবিষ্যতে আবারও চুরির মতো পাপকার্যে লিপ্ত হতে পারে, বুদ্ধের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হতে পারে।’
গম্ভীরভাবে এ কথা বলার পর তিনি আর কোনও কথা না বলে
রসিদ কেটে শৌভিককে দিলেন। মঠাধ্যক্ষ শাসন লামাকে ধন্যবাদ জানিয়ে নিজেদের ঘরে ফেরার সময় নিরুপমবাবু বললেন, ‘মঠাধ্যক্ষ ঠিক কাজই করেছেন। শাস্তি না পেলে ছেলেটা হয়তো ভবিষ্যতে আরও বিগড়ে যেতে পারে।’
শৌভিক তাঁর কথায় কোনও মন্তব্য করল না।
ঘরে ঢুকে জল আর বিস্কুট খেলেন তাঁরা। শৌভিকের আর ইচ্ছা হল না পোশাক পরিবর্তন করতে। গায়ে যে পোশাক ছিল সে পোশাক পরেই কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল সে।
৫
ভোর সাড়ে ছ’টার সময় ড্রাইভার ডাকতে এল। কিছুক্ষণের মধ্যেই মঠের বাইরে এলেন তাঁরা। প্রবল ঠান্ডা বাইরে। হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছে! নিরুপমবাবুর সুটকেস দুটো ডিকিতে রাখা হল। শৌভিকের সঙ্গে দুটো ছোট ব্যাগ। সে ব্যাগ দুটো সঙ্গে নিয়েই ড্রাইভারের পাশের সিটে গিয়ে বসল সে।
নিরুপমবাবু গাড়ির পিছনের সিটে উঠে বসে বললেন, ‘রাতে ঠান্ডায় ভালো করে ঘুমোতে পারিনি। এখন একটু ঘুমিয়ে নিই।’ এই বলে চোখ
বন্ধ করলেন তিনি। গাড়ি চলতে শুরু করল। শৌভিকের হঠাৎ মনে পড়ল, তিন ঝোরা নামের জায়গাটার কথা। হয়তো সে জায়গায় ছবি তোলা যেতে পারে। তাই সে ড্রাইভারকে জিগ্যেস করল, ‘তিন ঝোরা জায়গাটা কোথায় জানো?’
সে জবাব দিল, ‘পথেই পড়বে। নীচের দিকে।’
শৌভিক বলল, ‘ওখানে গাড়িটা একটু থামিও। ছবি তুলতে পারি।’
ঢালু পাকদণ্ডী বেয়ে নীচের দিকে নামতে শুরু করল গাড়ি। চোখ বোজার পরই মৃদু নাক ডাকতে শুরু করেছেন নিরুপমবাবু। মিনিট দশেকের মধ্যেই গাড়ি গিয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ল। ড্রাইভার বলল, ‘এটাই তিন ঝোরা স্যার।’
শৌভিক দেখল, কাছেই পাহাড়ের গা বেয়ে তিনটে জলস্রোত সামনের রাস্তা ভিজিয়ে নীচের দিকে নেমে যাচ্ছে। বাইরে প্রবল ঠান্ডা! তাই গাড়ি থেকে না নেমে জানলার কাচ নামিয়ে ছবি তোলার জন্য ক্যামেরা বার করে লেন্স ঠিক করতে লাগল সে।
ঠিক এই সময় একজন এসে দাঁড়াল জানলার সামনে। শৌভিক তাকিয়ে দেখল, তার সামনে গাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আছে গতকাল রাতের সেই বাচ্চা ছেলেটা! তার হাতে বেশ বড় একটা জলভরা বালতি রয়েছে। মঠাধ্যক্ষ শাসন লামার আদেশ মেনে জল নিয়ে ফিরে যাচ্ছে ছেলেটা। সে শৌভিকের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ‘তোমরা ফিরে যাচ্ছ?’
শৌভিকও হেসে বলল, ‘হ্যাঁ।’
ছেলেটার হাতের বালতিটা দেখে বেশ খারাপ লাগল শৌভিকের। একে প্রবল ঠান্ডা। তার ওপর ভারী জলের বালতি নিয়ে তাকে ওপরে উঠতে হবে।
ছেলেটা এবার জানতে চাইল, ‘আপেলটা খেয়েছিলে?’
শৌভিক বিস্মিতস্বরে জিগ্যেস করল, ‘কোন আপেল?’
বালক ভিক্ষু বলল, ‘তুমি তো বলেছিলে তোমার খিদে পেয়েছে। তাই তো আমি আপেলটা নিয়ে তোমার ওই লাল ব্যাগে রেখে এসেছিলাম। বুদ্ধ বলেছেন, ক্ষুধার্থকে খাবার দিতে।’
বাচ্চা ছেলেটার কথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেল শৌভিক। সে তার লাল রঙের ব্যাগটা খুলতেই দেখতে পেল, তার মধ্যে রাখা আছে একটা আপেল! যে আপেল চুরি করার অপরাধে ছেলেটাকে শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে। শৌভিক মুখ তুলে দেখল, ছেলেটা আবার হাঁটতে শুরু করেছে।
গ্যাংটক শহরে ঢোকার মুখে ঘুম ভাঙল নিরুপমবাবুর। তিনি শৌভিককে জিগ্যেস করলেন, ‘রাস্তায় ভালো কিছু দেখলেন নাকি?’
শৌভিক জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, দেখলাম, অপূর্ব এক বুদ্ধমূর্তি। রাঙামাটির বুদ্ধ।’
তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘ছবি তুলেছেন?’
শৌভিক বলল, ‘সব ছবি ক্যামেরায় তোলা যায় না। কিছু ছবি মনের ক্যামেরায় ধরা থাকে।’
