বুদ্ধ যেদিন অস্ত্রধারী
আকাশে চাঁদ নেই। মধ্যরাতের গাঢ় অন্ধকার আচ্ছন্ন করে রেখেছে রোহিনী নদীর তীরবর্তী জঙ্গলাকীর্ণ এই তটভূমিকে। নদীর এ পারে কোলীয় রাজ্য আর অন্য পারে কপিলাবস্তু। এই নদী দু’রাজ্যের মধ্যে সীমানা নির্ধারণ করে।
নদীর দু’পাশের নগরী এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তমসাবৃত বনানীতে শুধু একটিমাত্র স্থানে আলোক বর্তমান—একটি গাছের কোটরে প্রোথিত একটি জ্বলন্ত মশালদণ্ড। বিশেষ কারণে ওই একটিমাত্র মশাল জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে এ স্থানে। যাতে নদী পেরিয়ে এ স্থানে যাঁর উপস্থিত হওয়ার কথা তিনি মশালের আলো দেখে স্থানটি চিনতে পারেন।
যে বৃক্ষের গায়ে মশালটি প্রোথিত, তার সামনে অস্থিরভাবে পদচারণা করছেন এক ব্যক্তি। তাঁর পরনে বহুমূল্য রাজপোশাক। মাঝে-মাঝে মশালের আলো এসে পড়ছে সেই প্রৌঢ় ব্যক্তির গম্ভীর চিন্তাক্লিষ্ট মুখমণ্ডলে। তাঁর কয়েকজন বিশ্বস্ত অনুচর, কিছুটা দূরে অন্ধকারের মধ্যে নিজেদেরকে আড়ালে রেখে দাঁড়িয়ে আছে।
যিনি পদচারণা করছেন তিনি কোলীয় নৃপতি সুপ্পবুদ্ধ। এক গভীর সংকটে নিমজ্জিত তিনি। প্রতীক্ষা করতে করতে তিনি ভাবছিলেন, না, এ প্রস্তাবে সম্মত হওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। একটা শেষ চেষ্টা করতেই হবে, যাতে অকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটা না ঘটে তার জন্য। যে আসছে সে হয়তো বিষয়টির নিষ্পত্তি ঘটাতে পারবে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই রাত্রির নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে নদীর বুক থেকে একটা শব্দ ভেসে এল নৃপতির কানে। রোহিনী নদীর গভীরতা বেশি নয়। বর্ষাকাল ব্যতীত অন্য সময় তার জলপ্রবাহ বেশি না থাকার কারণে নদী অতিক্রম করার জন্য কোনও জলযানের প্রয়োজন হয় না। এখন বর্ষা ঋতু নয়, তাই অশ্বপৃষ্ঠে অক্লেশে এ নদী অতিক্রম করা যায়। হ্যাঁ, অশ্বের নদী অতিক্রম করার শব্দই শুনতে পেরেছেন নৃপতি।
একসময় সেই শব্দ থেমে গেল। অর্থাৎ অশ্বারোহী এপারে কোলীয় রাজ্যে পৌঁছে গেছেন। আর মৃদু সময় অতিক্রান্ত হবার পর নদীর পাড়ের দিকের অন্ধকার থেকে আত্মপ্রকাশ করলেন অশ্বারূঢ় এক ব্যক্তি। কালো অশ্বের মতো তাঁর পোশাকের রংও কৃষ্ণবর্ণ। মস্তকবন্ধনী দিয়ে আচ্ছাদিত মুখমণ্ডল। দীর্ঘ তরবারি ঝুলছে তাঁর কোমর বন্ধন থেকে।
বৃক্ষতলে পৌঁছে তিনি ঘোড়া থেকে নামলেন। দীর্ঘ চেহারা ও সুগঠিত বাহু। কোলীয়রাজ সুপ্পবুদ্ধের সামনে উপস্থিত হয়ে, মুখের আচ্ছাদন একটু সরিয়ে সেই ব্যক্তি রাজার উদ্দেশে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানিয়ে বললেন, ‘কোলীয়রাজ, আপনি আমার প্রণাম গ্রহণ করুন।’
সেই ব্যক্তির কথার প্রত্যুত্তরে রাজা সুপ্পবুদ্ধ দক্ষিণ হস্ত উত্থিত করে বললেন, ‘শাক্য রাজকুমার দেবদত্ত, আপনিও আমার আশীর্বাদ গ্রহণ করুন। এক বিশেষ প্রয়োজনে, আলোচনা করবার জন্য এ স্থানে আপনাকে আহ্বান জানিয়েছি। বিষয়টি অত্যন্ত গোপনীয়।’
কুমার দেবদত্ত বললেন, ‘তা আমি পূর্বেই অনুমান করেছি। গোপনীয় না হলে এই মধ্যরাতে আপনি আমাকে আহ্বান জানাতেন না।’
সুপ্পবুদ্ধ বললেন, ‘তবে কথা শুরু করা যাক?’
দেবদত্ত অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং সতর্ক ব্যক্তি। বলা যায় না, তাঁর নিজ রাজ্য কপিলাবস্তুর কোনও গুপ্তচর এই আলোকরেখা দেখে এ স্থানে এসে উপস্থিত হতে পারে। এবং সেটা হলে এই গোপন সাক্ষাৎকারের সংবাদ তৎক্ষণাৎ পৌঁছে যাবে কপিলাবস্তু নৃপতি শুদ্ধোধনের কানে। তাই তিনি বললেন, ‘ওই মশালের আর আবশ্যিকতা নেই। আলোটা নিভিয়ে ফেলা উচিত।’
কুমারের এ কথা বলার কারণ অনুমান করে সুপ্পবুদ্ধ বললেন, ‘হ্যাঁ, আলোটা এবার নিভিয়ে দেওয়াই শ্রেয়।’
কুমার দেবদত্ত এগিয়ে গিয়ে বৃক্ষকোটর থেকে মশালটা খুলে নিয়ে মাটিতে ফেলে সেটা পদাঘাতে নিভিয়ে দিলেন। গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে গেল বৃক্ষতল। তার ভিতর হারিয়ে গেলেন দুজনে। শুরু হল তাঁদের গোপন কথোপকথন।
কীভাবে শাক্যকুমারের সঙ্গে কথা শুরু করবেন, তা আগেই ভেবে রেখেছিলেন নৃপতি সুপ্পবুদ্ধ। চারপাশ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবার পর তিনি কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ থেকে বললেন, ‘কুমার দেবদত্ত, লোকমুখে শুনেছি, আপনি আমার ষোড়শী কন্যা যশোধরাকে বিবাহ করতে অতিশয় আগ্রহী। এ কথা কি সত্যি?’
অন্ধকারের মধ্যে থেকে উত্তর এল, ‘হ্যাঁ, সঠিকই শুনেছেন। এ প্রস্তাব নিয়ে আমি কয়েক দিবসের মধ্যেই আপনার নিকট উপস্থিত হতাম। কিন্তু তার পূর্বেই আপনি আমাকে ডেকে পাঠালেন।’
নৃপতি সুপ্পবুদ্ধ বললেন, ‘তাহলে আপনাকে দুটো ঘটনার কথা বলি। কয়েক দিন আগে আমি গুপ্তচর মারফত সংবাদ পাই যে, আমার কন্যা যশোধরা এই রোহিনী নদীতীরের জঙ্গলে নিভৃতে সাক্ষাৎ করছে আপনার জ্ঞাতি ভ্রাতা, কপিলাবস্তুর যুবরাজ সিদ্ধার্থর সঙ্গে। আমি যশোধরাকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলে সে আমাকে জানিয়েছে যে সে সিদ্ধার্থর সঙ্গে প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ। এবং তারা পরস্পরকে বিবাহ করতে চায়। আমি যেন অবিলম্বে সে ব্যবস্থা করি…।’
সুপ্পবুদ্ধের একথা শুনেই ক্ষোভ প্রকাশ করে কুমার দেবদত্ত বলে উঠলেন, ‘আপনি আমার সঙ্গে আপনার কন্যার বিবাহ দেবেন না, এ সংবাদ দেবার জন্যই কি গভীর রাত্রে আমাকে এ স্থানে ডেকে পাঠিয়েছেন?’
সুপ্পবুদ্ধ বললেন, ‘না, কুমার। আমি চাই আপনি আমার কন্যাকে স্ত্রী রূপে গ্রহণ করুন। আপনিই তার স্বামী হিসাবে উপযুক্ত।’
এ কথা শুনে দেবদত্ত বললেন, ‘তবে এই কথা জানাবার জন্য এত গোপনীয়তা কীসের?’
নৃপতি বললেন, ‘কারণ আছে। আমার দ্বিতীয় কথাটি শুনলেই তা বুঝতে পারবেন। কন্যার মুখ থেকে ঘটনাটি জানবার পর আমি তাকে নানাভাবে নিরস্ত করবার চেষ্টা করি। এমনকী তাকে এ কথাও জানাই যে সিদ্ধার্থর জন্মের পর ভবিষ্যদ্বক্তা সন্ন্যাসী কৌণ্ডিন্য এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে সে গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী হবে। এ কথা জানার পর কোনও পিতা নিজের একমাত্র কন্যাকে তার হাতে তুলে দেবেন কীভাবে?
‘কিন্তু তা শুনেও যশোধরা নিজের সিদ্ধান্তে অনড়। আমি তার রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করবার ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছি। ভেবেছিলাম দীর্ঘদিন যদি তাকে সিদ্ধার্থর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে না দেওয়া হয়, তবে সে তাকে একদিন ভুলে যাবে। আর তারপর আমি যশোধরাকে অন্য কোনও সুপাত্রের সঙ্গে বিবাহ দেব। যিনি আপনার মতো বলশালী কেউ।’
এ পর্যন্ত শুনে দেবদত্ত ব্যগ্রভাবে জানতে চাইলেন, ‘কিন্তু এতে সমস্যা কোথায়?’
নৃপতি এবার আসল ঘটনা ব্যক্ত করলেন। তিনি বললেন, ‘সমস্যা অন্য স্থান থেকে উপস্থিত হয়েছে। সে বড় কঠিন সমস্যা। গতকাল কপিলাবস্তু নৃপতি শুদ্ধোধন তাঁর প্রধান সেনাপতি গড়ুরকে আমার নিকট পাঠিয়েছিলেন আমার কন্যার সঙ্গে সিদ্ধার্থর বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে। এবং তিনি চান যত দ্রুত সম্ভব এ বিবাহ সম্পন্ন হোক। শুনেছি রাজা শুদ্ধোধন তাঁর পুত্রের যে-কোনও ইচ্ছা যেনতেনপ্রকারেণ পূরণ করবার চেষ্টা করেন।
‘কপিলাবস্তুর সামরিক শক্তি আমার তুলনায় অনেক বেশি। এখন আমি তাঁর প্রস্তাবে সম্মত না হলে, তিনি হয়তো আমার রাজ্য আক্রমণ করে যশোধরাকে হরণ করে তার পুত্রের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করবেন। কারণ সাধারণত কুলপুরোহিত বা ব্রাহ্মণদের মাধ্যমেই বিবাহের প্রস্তাব পাঠানো হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে তিনি প্রধান সেনাপতির মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন, যা ইঙ্গিতবাহী।
‘আমার মনে হয় আপনিই একমাত্র মানুষ যিনি এই সংকট থেকে আমাকে উদ্ধার করতে পারেন। আমি কথা দিচ্ছি সংকট মোচন হলে আমি আপনাকে অবশ্যই জামাতা হিসেবে গ্রহণ করব।’
কুমার দেবদত্ত এবার এই গোপনীয় আলোচনার গুরুত্ব অনুভব করতে পারলেন। দীর্ঘক্ষণ তাঁরা নিশ্চুপ হয়ে রইলেন। বেশ খানিকক্ষণ ধরে দেবদত্ত ভাবলেন, তাঁর পরবর্তী কৌশল নিয়ে। এমন সময়ে বন্য শৃগালের দল যখন নদীর পাড় থেকে ডেকে উঠল, তখন কুমার দেবদত্ত বললেন, ‘আমার পরামর্শ আপনি মন দিয়ে শুনুন রাজন। আপনি কপিলাবস্তুরাজকে জানান যে, তাঁর প্রস্তাবে আপনার কোনও আপত্তি নেই, বরং আপনি এটাই চান। কিন্তু আপনি একটি নীতিগত সমস্যায় পড়েছেন।
‘কুমার দেবদত্ত ইতিপূর্বেই আপনার নিকট একই প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। তিনিও শাক্য রাজবংশের সন্তান ও সিদ্ধার্থর অগ্রজ। তাই এ ক্ষেত্রে সমস্যা সমাধানের উপায় হল, দু’জনের মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বা অস্ত্রযুদ্ধ। আর তাতে যিনি বিজয়ী হবেন তিনিই বরমাল্য ধারণ করবেন। আপনি চান যে, এই চিরাচরিত প্রথা মেনেই আপনার ধর্মসংকটের সমাধান হোক।’
এরপর ধূর্ত কুমার আবার বললেন, ‘রাজা শুদ্ধোধন নিশ্চয়ই এ প্রস্তাব শুনে শাক্যবংশীয় প্রথা থেকে বিচ্যুত হবার কলঙ্ক গায়ে মাখবেন না। তখন তাঁর সামনে মাত্র দুটো পথ খোলা থাকবে। এক, নিজের প্রস্তাব ফিরিয়ে নেওয়া। আর দুই, আমার সঙ্গে সিদ্ধার্থর অস্ত্র প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা।
‘শুদ্ধোধন যদি তাঁর প্রস্তাব ফিরিয়ে নেন তবে আপনার কন্যা বুঝতে পারবে, যাকে সে স্বামী রূপে গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে সে আসলে একজন কাপুরুষ। এ কথা জেনে তার মনে সিদ্ধার্থর প্রতি ঘৃণা জন্মাবে। আর সিদ্ধার্থ যদি আমার সঙ্গে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয় তবে আমি অনায়াসে তাকে পরাস্ত করব, এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকুন। সে তো অস্ত্র ধরতেই জানে না। আপনার সংকট দূর করবার জন্য এই একটাই পথ খোলা আছে।’
কোলীয়রাজ সুপ্পবুদ্ধ বুঝতে পারলেন, যুবরাজ দেবদত্ত যে পরামর্শ দিচ্ছেন, তা ভিন্ন অন্য কোনও উপায় নেই। এই পন্থাই অবলম্বন করতে হবে তাঁকে। কৌশলে পরাস্ত করতে হবে রাজা শুদ্ধোধনকে। সুপ্পবুদ্ধ সম্মত হলেন দেবদত্তর প্রস্তাবে।
এরপর বেশ কিছুক্ষণ ধরে তাঁরা দু’জন তাঁদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করলেন। তারপর কোলীয়রাজ রওনা হলেন তাঁর নগরীর দিকে। আর কুমার দেবদত্ত পুনরায় রোহিনী নদী অতিক্রম করে নিজ রাজ্য কপিলাবস্তুতে ফিরে গেলেন।
২
নিজ কক্ষে বসে উন্মুক্ত বাতায়নের বাইরে তাকিয়ে ছিলেন কপিলাবস্তু নৃপতি শুদ্ধোধন। সূর্যকিরণে ঝলমল করছে সমগ্র পৃথিবী। কাষ্ঠ ও প্রস্তরনির্মিত সার সার অট্টালিকা দাঁড়িয়ে আছে মাথা তুলে। শাক্যবংশীয় নৃপতিদের রাজ্যগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম নগরী হল এই কপিলাবস্তু। ওই সুদৃশ্য প্রাসাদগুলি তারই সাক্ষ্য বহন করছে।
কিছুটা দূরে তাকালে দেখা যায় সবুজ পাহাড়শ্রেণী। পাহাড়ের পাদদেশেই কপিলাবস্তুর অবস্থান। ক’দিন হল রাজা শুদ্ধোধনের মন বেশ উৎফুল্ল। কুমার সিদ্ধার্থ বিবাহে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সে নিজেই তার ইচ্ছার কথা জানিয়েছে পিতার কাছে। আর সে কথা জানামাত্রই কপিলাবস্তুরাজ আর কালক্ষেপ না করে কোলীয়রাজ সুপ্পবুদ্ধকে তাঁর কন্যা যশোধরার সঙ্গে সিদ্ধার্থর বিবাহের প্রস্তাব পাঠিয়েছেন।
যদিও কুমার সিদ্ধার্থর বয়স মাত্র ষোলো, তবুও রাজা শুদ্ধোধন এ বিষয়ে আর বিলম্ব করতে চান না। কুমার সিদ্ধার্থর জন্মের পর থেকেই তাকে নিয়ে উৎকণ্ঠায় ভোগেন তিনি। কারণ, সদ্যোজাত সন্তানকে দেখে সন্ন্যাসী কৌণ্ডিন্য ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী হবে। আর সেই আশঙ্কা থেকেই পিতা শুদ্ধোধন আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেন, সিদ্ধার্থকে সংসারের প্রতি মোহমুগ্ধ করে রাখার।
লোকে বলে, কৌণ্ডিন্যের ভবিষ্যদ্বাণী কখনও মিথ্যা হয় না। কিন্তু তিনি যত বড় ভবিষ্যৎদ্রষ্টাই হন না কেন, তিনি বিধাতা পুরুষের ঊর্ধ্বে তো নন। স্বয়ং বিধাতাই হয়তো মত পরিবর্তন করেছেন! তাই সিদ্ধার্থ মাত্র ষোলো বছর বয়সে নিজে থেকেই বিবাহের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
যে বন্ধনগুলো মানুষকে সংসারে আবদ্ধ করে রাখে, তার মধ্যে সবচাইতে সুদৃঢ় বন্ধন হল বৈবাহিক সম্পর্কের বন্ধন, আর তার থেকে উৎপন্ন মায়া। সিদ্ধার্থ বিবাহ করবে, তার সন্তান জন্ম নেবে। তখন সেই অপত্যস্নেহ অতিক্রম করে সিদ্ধার্থ নিশ্চয়ই সংসারত্যাগ করতে পারবে না।
উন্মুক্ত বাতায়নের বাইরে তাকিয়ে রাজা শুদ্ধোধন ভাবছিলেন, এ বিবাহ এমন আড়ম্বরের সঙ্গে তিনি সম্পন্ন করবেন—যা দেখে আশ্চর্য হয়ে যাবেন সম্রাট বা রাজচক্রবর্তীরাও। বিবাহ উপলক্ষ্যে তিনি মহা সমারোহে হোম-যজ্ঞ করবেন, ঋষি-ব্রাহ্মণদের পরিতুষ্ট করবেন, যাতে দেবতারা আশীর্বাদ বর্ষণ করেন নবদম্পতিকে।
এই সব কথাই ভাবছিলেন তিনি, এমন সময় দ্বারী এসে সংবাদ দিল, কোলীয়রাজ সুপ্পবুদ্ধ এক ব্রাহ্মণকে পত্র দিয়ে পাঠিয়েছেন তাঁর কাছে। কথাটা শুনেই আরও উৎসাহিত হয়ে উঠলেন তিনি। সুপ্পবুদ্ধ নিশ্চয়ই ব্রাহ্মণের মাধ্যমে তাঁর সম্মতিপত্র পাঠিয়েছেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে সেই বার্তাবাহক ব্রাহ্মণকে তাঁর নিকট উপস্থিত করানোর নির্দেশ দিলেন।
ব্রাহ্মণ প্রবেশ করলেন রাজকক্ষে। নৃপতিকে প্রণাম জানিয়ে তিনি কোলীয়রাজ সুপ্পবুদ্ধের পত্র তুলে দিলেন তাঁর হাতে। শুদ্ধোধন ব্রাহ্মণকে তাঁর উপযুক্ত পুরস্কার দিয়ে বিদায় জানাবার নির্দেশ দিলেন। ব্রাহ্মণ সেই কক্ষ ত্যাগ করবার পর রাজা শুদ্ধোধন মহা আগ্রহের সঙ্গে পত্রটি উন্মোচন করলেন।
পত্রের প্রথম ছত্রে রাজা শুদ্ধোধনকে যথাপূর্ব শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে কোলীয়রাজ লিখেছেন যে তিনি কপিলাবস্তুরাজের প্রস্তাবে অত্যন্ত আনন্দলাভ করেছেন এবং নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছেন। এ বিবাহ যদি সম্পন্ন হয়, তবে তা অপেক্ষা আনন্দদায়ক ঘটনা আর কিছু হবে না।—এ স্তবক পাঠ করে শুদ্ধোধন মনে মনে ভাবলেন, সত্যিই তবে বিধাতা পুরুষ আমার প্রার্থনা শুনেছেন।
তারপর তিনি পত্রের পরবর্তী অংশগুলো পাঠ করতে শুরু করলেন। এবং তার সঙ্গে সঙ্গেই ধীরে ধীরে তাঁর মুখমণ্ডলের যাবতীয় ঔজ্জ্বল্য,
উৎফুল্লতা ম্লান হয়ে যেতে লাগল। তিনি যখন পত্রপাঠ শেষ করলেন তখন তাঁর হৃদয়ের সব আনন্দ হারিয়ে গিয়ে ললাটে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফুটে উঠেছে। তিনি প্রত্যাশা করেননি, পত্রে এ ধরনের কথা লেখা থাকবে।
কুমার দেবদত্ত যে কোলীয় নৃপতির নিকট অগ্রিম বিবাহের প্রস্তাব পাঠিয়েছেন, তা এই পত্রের মাধ্যমেই তিনি জানলেন এবং বিস্মিত হলেন। হতে পারে, এটা কোলীয়রাজের মিথ্যা ভাষণ। তবে সুপ্পবুদ্ধ তাঁর পত্রে কুমার দেবদত্তর প্রসঙ্গ উত্থাপিত করে যে প্রস্তাব শুদ্ধোধনের কাছে রেখেছেন, তা রাজপরিবারের প্রচলিত নিয়ম অনুসারে যুক্তিযুক্ত। তা খণ্ডন করা যায় না।
সুপ্পবুদ্ধ তাঁর প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করলে, শুদ্ধোধন কোলীয়
রাজ্য আক্রমণ করে যশোধরাকে নিজ রাজ্যে নিয়ে আসতেন। বিবাহ দিতেন কুমার সিদ্ধার্থর সঙ্গে। সে ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা ছিল না। ক্ষাত্রধর্মে তার অনুমোদন আছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তা করা যায় না। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা প্রথাকে সেক্ষেত্রে অস্বীকার করা হবে। কালিমালিপ্ত হবে সমগ্র কপিলাবস্তু।
চিন্তান্বিত রাজা শুদ্ধোধন ভাবতে লাগলেন, তিনি এবার কী করবেন! শাক্যকুমার দেবদত্ত বয়সে যুবক। অসীম শক্তিধর। তাঁর সমতুল্য অস্ত্রধারী কপিলাবস্তুতে আর কেউ নেই বললেই চলে। অপরপক্ষে কুমার সিদ্ধার্থকে এখনও বালকই বলা যায়। অস্ত্রশিক্ষাতে অনাগ্রহের কারণে সে কোনোদিন অস্ত্রধারণ করেনি।
তবে এখন উপায় কী? কুমার দেবদত্তর সঙ্গে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হলে কুমার সিদ্ধার্থর পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। দুশ্চিন্তার কালো মেঘ ক্রমশ গ্রাস করতে লাগল রাজা শুদ্ধোধনকে। অস্থিরভাবে পদচারণা করতে লাগলেন তিনি।
বেলা বয়ে চলল, কিন্তু এই চক্রব্যূহ থেকে মুক্ত হবার কোনও উপায় বার করতে পারলেন না রাজা শুদ্ধোধন। শেষ পর্যন্ত তিনি ভাবলেন, কুমার সিদ্ধার্থকে বিষয়টা সম্পর্কে অবগত করা প্রয়োজন। তাই তিনি একজন রক্ষীর মাধ্যমে ডেকে পাঠালেন কুমারকে।
সিদ্ধার্থ এসে উপস্থিত হলেন তাঁর কক্ষে। পিতার মুখমণ্ডল দেখে তিনি অনুমান করলেন গুরুতর কিছু একটা ঘটেছে। তিনি পিতাকে প্রণাম জানিয়ে বললেন, ‘আপনাকে এত চিন্তাক্লিষ্ট লাগছে কেন পিতা?’ এ প্রশ্নের জবাবে মুখে কিছু না বলে কোলীয়রাজ-প্রেরিত পত্রটা রাজা শুদ্ধধন পাঠ করবার জন্য তুলে দিলেন সিদ্ধার্থর হাতে। তিনি সেটা পাঠ করে পিতার মুখের দিকে চাইলেন।
কপিলাবস্তুরাজ বললেন, ‘এমতাবস্থায় আমি কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব তা বুঝে উঠতে পারছি না। তুমি বলো আমার কী করা উচিত?’
পিতার প্রশ্নের জবাবে সিদ্ধার্থ বললেন, ‘শাক্য বংশের প্রচলিত রীতি অনুসারে যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন আপনি তাই করুন।’
‘তাহলে তো আমাকে অস্ত্র প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে হয়! কিন্তু তুমি তো কোনোদিন অস্ত্রই ধারণ করোনি। তোমার পরাজয় সেক্ষেত্রে অবশ্যম্ভাবী। আবার যদি তা না করি তবে বিবাহের প্রস্তাব প্রত্যাহার করতে হবে।’
সিদ্ধার্থ আবার বললেন, ‘আপনি ক্ষাত্রধর্ম পালন করুন পিতা।’
‘তুমি আমাকে কী সিদ্ধান্ত নিতে বলছ পুত্র? অস্ত্র প্রতিযোগিতার আয়োজন? নাকি বিবাহের প্রস্তাব প্রত্যাহার করা? দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তোমার-আমার দু’জনেরই সম্মানহানি হবে। তুমি ভীরু বলে প্রতিপন্ন হবে। আর সব থেকে বড় কথা, যশোধরার সঙ্গে তোমার বিবাহ হবে না।’
এটুকু বলে থামলেন কপিলাবস্তুরাজ।
এরপর হঠাৎ এক পরিকল্পনার উদয় হল তাঁর মাথায়। তিনি বললেন, ‘তবে একটা কাজ করা যাক। আমি অস্ত্র প্রতিযোগিতার দিন স্থির করি। কিন্তু তুমি প্রতিযোগিতার স্থানে উপস্থিত হবে না। তার জন্য প্রয়োজনে কোনও কারণ উপস্থাপিত করা যাবে। প্রচলিত প্রথা অনুসারে, পর পর তিনবার যদি প্রতিযোগী অনুপস্থিত থাকে, তবেই অপরপক্ষকে বিজয়ী বলে ঘোষণা করা হয়।
‘প্রথমবার যদি তুমি অনুপস্থিত থাকো, তবে দ্বিতীয়বার প্রতিযোগিতা আহ্বানের জন্য মধ্যবর্তীকালে এক পক্ষকাল সময় পাওয়া যাবে। সে সময়কালকে কাজে লাগিয়ে আমি চেষ্টা করব, অন্য কোনও সমাধানসূত্র পরিকল্পনা করবার! কোনোভাবে দেবদত্তকে দিয়ে তার প্রস্তাব প্রত্যাহার করানোর ব্যবস্থা করতে হবে।’
পিতার এ কথা শুনে মৌন রইলেন সিদ্ধার্থ।
শুদ্ধোধন কুমার সিদ্ধার্থর সেই মৌনতা দেখে ধারণা করলেন, তাঁর এই পরিকল্পনাতে হয়তো সম্মতি রয়েছে কুমারের। তিনি এরপর ফিরে যেতে বললেন কুমার সিদ্ধার্থকে।
পরদিনই কপিলাবস্তুরাজ দূত মারফত অস্ত্র প্রতিযোগিতার দিনক্ষণ নির্দিষ্ট করে পত্র লিখে পাঠিয়ে দিলেন কোলীয়রাজ সুপ্পবুদ্ধের কাছে। কোলীয়বাসী আর কপিলাবস্তুবাসীর কাছেও এ সংবাদ পৌঁছাতে বিলম্ব হল না, যশোধরাকে বিবাহ করবার জন্য অস্ত্র প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে চলেছেন—দুই শাক্য রাজকুমার সিদ্ধার্থ ও দেবদত্ত।
৩
নির্জন অলিন্দে একাকী দাঁড়িয়েছিলেন ষোড়শী রাজকন্যা যশোধরা। বিকাল হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। কিছুক্ষণ আগে সখীরা এসে উপস্থিত হয়েছিল তাঁকে প্রাসাদকাননে নিয়ে যাওয়ার জন্য। যশোধরা আজও তাদের ফিরিয়ে দিয়েছেন, যেমন ফিরিয়ে দিচ্ছেন কিছু দিন ধরে।
পিতার নির্দেশে তাঁর প্রাসাদ ত্যাগ করা নিষিদ্ধ হলেও প্রাচীরবেষ্টিত কাননে যেতে কোনও বাধা নেই। কিন্তু তাঁর মন এখন কোনও আনন্দ আহ্বানে সাড়া দিতে চায় না, কলহাস্যে অংশগ্রহণ করতে চায় না।
এক অদ্ভুত বিষণ্ণতায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে যশোধরার মন-প্রাণ, আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রবল উৎকণ্ঠা। যে উৎকণ্ঠা গত তিন দিন ধরে চরমে পৌঁছেছে। আগামীকালই তো সেই অস্ত্র প্রতিযোগিতার দিন! ওই যে দূরে রোহিনী নদী দেখা যাচ্ছে তার ওপারে কপিলাবস্তু রাজ্যের কোনও এক স্থানে সেই প্রতিযোগিতা হবে।
দাসী-সখীদের মুখে শাক্য রাজকুমার দেবদত্ত সম্পর্কে যশোধরা যতটুকু জেনেছেন তা হল, কুমার দেবদত্ত অত্যন্ত কপট এক ব্যক্তি এবং সেইসঙ্গে অস্ত্রবিদ্যাতেও পারদর্শী। কপিলাবস্তুর সিংহাসন আরোহণের জন্য তিনি অত্যন্ত আগ্রহী। যে কারণে তিনি প্রবল ঈর্ষা করেন রাজা শুদ্ধোধনপুত্র সিদ্ধার্থকে। আর কুমার সিদ্ধার্থ?
একদিন যশোধরা সিদ্ধার্থকে দেবদত্ত সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন। কুমার সিদ্ধার্থ তাঁর প্রশ্ন শুনে হেসে বলেছিলেন, ‘তিনি আমার জ্ঞাতি ভ্রাতা, আমি সম্মান করি তাঁকে। আর আপাতদৃষ্টিতে যাঁকে শঠ-খল বলে মনে হয়, তাঁর মধ্যেও একজন ভালো মানুষ লুকিয়ে থাকে। জল সিঞ্চন করলে যেমন রুক্ষ ভূমির ভিতর থেকে চারাগাছ আত্মপ্রকাশ করে তেমনই ভালোবাসা সিঞ্চন করলে কঠিন মানুষের ভিতর লুকিয়ে থাকা আসল মানুষ আত্মপ্রকাশ করে।’
সিদ্ধার্থ কদাপি কারও সমালোচনা করেন না, কারও সম্পর্কে কটুবাক্য প্রয়োগ করেন না। সেই সরল মনের মানুষ কীভাবে পরাজিত করবেন অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী কপট দেবদত্তকে! সবচাইতে বড় কথা, রাজকুমার হলেও তিনি কোনওদিন অস্ত্রধারণ করেননি।
তবে কি যশোধরাকে দেওয়া সিদ্ধার্থর বিবাহ প্রতিশ্রুতি, ভালোবাসা সব এক লহমায় মিথ্যা হয়ে যাবে? যশোধরাকে বিবাহ করতে হবে কুমার দেবদত্তকে? কিন্তু যশোধরার পক্ষে তা কীভাবে সম্ভব? কুমার সিদ্ধার্থর সঙ্গে যশোধরার তো শুধু এজন্মের সম্পর্ক নয়, গতজন্ম থেকেই যশোধরা প্রতীক্ষা করে আছেন তাঁকে বিবাহ করবেন বলে।
যবে থেকে যশোধরার প্রাসাদ ত্যাগ করা বন্ধ হয়েছে তবে থেকে তিনি এই নিভৃত অলিন্দে এসে চেয়ে থাকেন রোহিনী নদীর ওপারে কপিলাবস্তুর দিকে। যে স্থানে রয়েছেন তাঁর ভালোবাসার মানুষ সিদ্ধার্থ। অলিন্দে দাঁড়িয়ে আশঙ্কিত মন নিয়ে আগামীকাল প্রত্যুষে কী ঘটবে তা ভেবে চললেন যশোধরা।
এক সময় তিনি এও ভাবতে লাগলেন, কুমার সিদ্ধার্থ যদি প্রতিযোগিতায় পরাজিত হন তবে সে সংবাদ পাওয়ামাত্রই প্রাসাদশীর্ষের এই অলিন্দ থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহনন করবেন তিনি। দু’জন্ম ধরে যখন তিনি সিদ্ধার্থর জন্য প্রতীক্ষা করেছেন তখন আরও একজন্ম তিনি প্রতীক্ষা করতে পারবেন তাঁর ভালোবাসার মানুষের জন্য।
একই সময়ে কুমার সিদ্ধার্থ অবস্থান করছিলেন কপিলাবস্তুর প্রাসাদকাননে। এ উদ্যানে বেশ কিছু পশু-পাখি আছে। শুধু মানুষ নয়, এই জীবজগতের প্রতিটি প্রাণীর ওপরেই অসীম মমত্ববোধ তাঁর। একটি পাত্রে দুগ্ধ নিয়ে সদ্য মাতৃহারা এক হরিণ শাবককে শান্ত মনে তা পান করাচ্ছিলেন তিনি। তাঁর মুখমণ্ডলে তখন উত্তেজনার কোনও চিহ্নমাত্র নেই।
পাহাড়শ্রেণীর আড়ালে সূর্য ডুবে গেল নির্দিষ্ট সময়ে। অন্ধকার নামতে শুরু করল চারদিকে। যশোধরা তাঁর নিজ কক্ষে ফিরে এলেন। এরপরই দাসী কঙ্কা তার কক্ষে প্রবেশ করল প্রদীপ জ্বালাবার জন্য। প্রদীপ প্রজ্বলন করার পর যশোধরা তাকে বললেন, ‘কালই তো অস্ত্র প্রতিযোগিতার দিন, তাই না?’
কঙ্কা জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, রাজকুমারী। এ রাজ্য থেকে বহু মানুষ সেই প্রতিযোগিতা দেখতে কপিলাবস্তু যাবে।’
দাসী কঙ্কা শুধুমাত্র দাসী নয়, সে রাজকুমারীর বিশ্বস্ত সঙ্গীও বটে। সে যশোধারার মনের খবর রাখে।
সে রাজকুমারীর মনে ভরসা দেবার জন্য বলল, ‘রাজকুমারী, আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না। কুমার দেবদত্ত অস্ত্রচালনায় পারদর্শী হতে পারেন ঠিকই, কিন্তু এ নগরীর সবাই কামনা করছে, কুমার সিদ্ধার্থই যেন প্রতিযোগিতায় জয়ী হন। এমনকী কপিলাবস্তুবাসীরাও নাকি একই কামনা করছে। কারণ, কুমার দেবদত্ত একজন শঠ-দাম্ভিক ব্যক্তি বলে পরিচিত।’
কঙ্কার কথা শুনে আশঙ্কিত যশোধরা বলে উঠলেন, ‘কিন্তু আমি যতটুকু জানি, কুমার সিদ্ধার্থ কোনওদিন অস্ত্রধারণ করেননি। তিনি কীভাবে জয়ী হবেন?’
এ প্রশ্নের উত্তর জানা নেই দাসী কঙ্কার। সে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
রাজকন্যা যশোধরা এরপর তাকে বললেন, ‘কাল তুইও ওই রাজ্যে যাবি প্রতিযোগিতা দেখতে। জয়-পরাজয়ের ফলাফল ঘোষিত হবার পর যথাসম্ভব দ্রুত ফিরে এসে সেই সংবাদ আমাকে দিবি। কোনও বিলম্ব যেন না হয়।’
কঙ্কা বলল, ‘ঠিক আছে রাজকুমারী, তাই হবে।’
দাসী ফিরে যাওয়ার আগে যশোধরা তাকে পুনরায় ডেকে বললেন, ‘প্রদীপটা নিভিয়ে দিয়ে যা তো! আলোটা চোখে বড় জ্বালা ধরাচ্ছে।’
আজ্ঞাপালন করে প্রদীপ নিভিয়ে কক্ষত্যাগ করল কঙ্কা।
গাঢ় অন্ধকারে নিমজ্জিত হল সারা কক্ষ। পালঙ্কে শুয়ে আশঙ্কা আর দুশ্চিন্তার অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হতে লাগলেন কোলীয় রাজকুমারী সিদ্ধার্থ- প্রেয়সী যশোধরা।
৪
রোহিনী নদীর নিকটে অবস্থিত এক উন্মুক্ত স্থানকে অস্ত্র প্রতিযোগিতার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই সমগ্র কপিলাবস্তুবাসী সমবেত হতে লাগল সে স্থানে। শুধু তারাই নয়, রোহিনী নদী অতিক্রম করে কোলীয় রাজ্যের বাসিন্দারাও দলে দলে উপস্থিত হতে লাগল। দাসী কঙ্কাও উপস্থিত হল যথাসময়ে।
তারপর রক্ষী ও অনুচর পরিবৃত হয়ে সে স্থানে আবির্ভূত হলেন রাজা শুদ্ধোধন। তাঁর অনুচরেরা কুমার সিদ্ধার্থর জন্য বহন করে এনেছে ধনুর্বাণ আর অসি। যদিও রাজা শুদ্ধোধন জানেন যে, এই অস্ত্রগুলোর কোনও প্রয়োজন হবে না। কারণ পরিকল্পনা অনুযায়ী, সিদ্ধার্থ উপস্থিতই হবে না এ স্থানে।
নৃপতি উপস্থিত হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই একদল ঘোড়সওয়ার বাহিনীকে নদী অতিক্রম করে এপারে আসতে দেখা গেল। অর্থাৎ কোলীয় নৃপতি আসছেন। তাঁকে যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শনের ব্যবস্থা পূর্বেই করে রেখেছেন রাজা শুদ্ধোধন। বাদ্যকারের দল বাদ্য বাজাতে লাগল কোলীয়রাজকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য।
কিছু সময়ের মধ্যেই পাত্র মিত্র সভাসদদের নিয়ে সে স্থানে এসে উপস্থিত হলেন সুপ্পবুদ্ধ। কপিলাবস্তুরাজ তাঁকে সমাদরের সঙ্গে চাঁদোয়ার নীচে নিজ আসনের পাশের আসনটিতে বসালেন। সুপ্পবুদ্ধের মুখমণ্ডলে ফুটে উঠেছে এক নিরুদ্বেগ ভাব। কারণ, এ প্রতিযোগিতার ফলাফল সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত।
কিছু সময় অতিক্রান্ত হবার পর সমবেত জনতার মধ্যে উত্তেজিত কলরব দেখা গেল। অশ্বপৃষ্ঠে কয়েকজন অনুচরকে নিয়ে উপস্থিত হলেন কুমার দেবদত্ত। অস্ত্রসাজে সজ্জিত হয়ে এসেছেন তিনি। কাঁধে ধনুক, পিঠে তূণীর, কোমর থেকে ঝুলছে দীর্ঘ তরবারি।
অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে তিনি চাঁদোয়ার তলে এসে প্রথানুসারে মাথা ঝুঁকিয়ে দুই রাজাকে অভিবাদন জানলেন। তারপর কিছুটা তফাতে, তাঁর জন্য নির্দিষ্ট করে রাখা আসন গ্রহণ করলেন। দ্রুতগতিতে তিনি ঘূর্ণায়মান দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে লাগলেন চারপাশে।
প্রতিযোগিতার জন্য নির্দিষ্ট সময় যত এগিয়ে আসতে লাগল, তত জনতার ভিড় ও তাদের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে লাগল। তবে কুমার সিদ্ধার্থ অনুপস্থিত। রাজা শুদ্ধোধন জানেন যে তাঁর পুত্র আসবেন না। তাই তাঁর মধ্যে কোনও উত্তেজনার ভাব নেই। কিন্তু সিদ্ধার্থর অদর্শনে সুপ্পবুদ্ধ ও কুমার দেবদত্তর মুখমণ্ডলে মৃদু অস্থির ভাব ফুটে উঠল।
প্রতিযোগিতার নির্দিষ্ট সময় উপস্থিত হল। চর্মবাদ্যে ঘা দিয়ে সময় জানানো হল। কিন্তু কুমার সিদ্ধার্থ তখনও উপস্থিত হননি। রাজা সুপ্পবুদ্ধ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন, রাজা শুদ্ধোধনের দিকে। পাছে সুপ্পবুদ্ধের মনে কোনও সন্দেহ না জাগে, সে জন্য শুদ্ধোধন তাঁকে বললেন, ‘কোনও কারণে হয়তো কুমার সিদ্ধার্থর উপস্থিত হতে বিলম্ব হচ্ছে। শীঘ্রই এসে পড়বে নিশ্চয়ই।’
সিদ্ধার্থ নির্দিষ্ট সময় উপস্থিত না হওয়াতে কুমার দেবদত্তর মুখে স্পষ্ট বিরক্তির ভাব ফুটে উঠল। কারণ অস্ত্র প্রতিযোগিতার দ্রুত নিষ্পত্তি চান তিনি। এবার নিজ আসন ছেড়ে উঠে তিনি অস্থিরভাবে পদচারণা করতে লাগলেন।
আরও বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হল, কিন্তু তখনও যখন কুমার সিদ্ধার্থ উপস্থিত হলেন না তখন আর নিজের ধৈর্য ধরে রাখতে না পেরে দেবদত্ত দুই রাজার সামনে গিয়ে বললেন, ‘আর অপেক্ষা করে সময় নষ্ট করবার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। আমার মনেও একটা অনুমান ছিল যে সিদ্ধার্থ হয়তো উপস্থিত হবে না। কারণ, সে ভীরু, কাপুরুষ। যে কোনওদিন অস্ত্রশিক্ষাই গ্রহণ করল না সে আমার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হবে কীভাবে?’
রাজা সুপ্পবুদ্ধ বললেন, ‘আমারও মনে হচ্ছে, কুমার সিদ্ধার্থ আর আসবেন না। তাই কুমার দেবদত্তকেই বিজয়ী বলে ঘোষণা করা হোক।’
তাঁদের কথা শুনে নৃপতি শুদ্ধোধন এবার জানাতে যাচ্ছিলেন যে, নিয়ম অনুসারে আরও দু’বার অস্ত্র প্রতিযোগিতার সুযোগ দিতে হবে। তখনও যদি সিদ্ধার্থ উপস্থিত না হয় তখন দেবদত্তকে বিজয়ী বলে ঘোষণা করা হবে। ঠিক এমন সময় জনতার মধ্যে আবার কোলাহল জেগে উঠল। তা শুনে রাজা শুদ্ধোধন সামনে তাকিয়ে বিস্মিতভাবে দেখলেন, কুমার সিদ্ধার্থ এগিয়ে আসছেন তাঁদের দিকে!
তিনি দুই রাজার সামনে এসে মাথা ঝুঁকিয়ে তাঁদের প্রণাম জানিয়ে বললেন, ‘আমার উপস্থিত হতে বিলম্ব হল বলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আমি নির্দিষ্ট সময়ই প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়েছিলাম এ স্থানে উপস্থিত হব বলে। কিন্তু আমি যখন প্রাসাদকানন অতিক্রম করছি তখন চোখে পড়ল, একটি পক্ষীশাবক গাছের মাথায় করা বাসা থেকে মাটিতে পড়ে গেছে। সে তখনও উড়তে শেখেনি। সেই পক্ষীশাবককে তার বাসায় তুলে দিয়ে আসার কারণেই এই বিলম্ব।’
সিদ্ধার্থকে দেখেই দেবদত্তর মনে ঘৃণা আর হিংসা জেগে উঠল। দেবদত্ত ব্যঙ্গের সুরে সিদ্ধার্থর উদ্দেশে বললেন, ‘এখন আর আপনার মহানুভবতার কাহিনি শুনিয়ে কালক্ষেপ করবার প্রয়োজন নেই। উপস্থিত যখন হয়েছেন, তখন চলুন আমরা অস্ত্র প্রতিযোগিতার দিকে অগ্রসর হই।’
সিদ্ধার্থ তাঁর বক্রোক্তি শুনে স্মিতমুখে বললেন, ‘অগ্রজ, আমি তার জন্য প্রস্তুত।’
এবার কুমার সিদ্ধার্থ তাঁর পিতা শুদ্ধোধনকে হতবাক করে দিয়ে ধনুর্বাণ আর তরবারি হাতে তুলে নিলেন। এই প্রথম তাঁকে অস্ত্রধারণ করতে দেখা গেল। তুমুল হর্ষধ্বনি উঠল জনতার মধ্যে। কারণ, প্রতিযোগিতা শুরু হবে।
প্রতিযোগিতা মূলত তিরন্দাজীর। লক্ষ্যভেদ করবার ক্ষমতা, দূর পর্যন্ত শর নিক্ষেপ করবার ক্ষমতা—এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়ে থাকে। কিন্তু তাতে যদি জয় পরাজয়ের নিষ্পত্তি না ঘটে তখন অসিযুদ্ধের আয়োজন করা হয়। তবে অসিযুদ্ধের এক ভয়ঙ্কর বিপদের দিকও আছে। প্রচলিত রীতি অনুসারে বিজয়ী যোদ্ধা ইচ্ছা হলে পরাজিতকে বধও করতে পারে।
চাঁদোয়ার তলা থেকে বেরিয়ে দুই রাজা, দুই রাজপুত্র আর তাদের অনুচররা এগোল তিরন্দাজী প্রতিযোগিতার জন্য। উপস্থিত জনতাও তাঁদের অনুসরণ করল। কিছুটা এগিয়ে এসে তারা দেখতে পেল, একটা সুউচ্চ বৃক্ষের মাথায় একটা পাখি বসে আছে। তা দেখতে পেয়ে সুপ্পবুদ্ধ বললেন, ‘প্রথমে তবে লক্ষ্যভেদের পরীক্ষা হোক। দেখা যাক কার তির ওই পক্ষীকে মাটিতে নামিয়ে আনতে পারে!’
তাঁর কথা শুনে যুবরাজ সিদ্ধার্থ ধীরকণ্ঠে বললেন, ‘নিরীহ একটি পাখি ছাড়া কি অন্য কিছুকে লক্ষ্যবস্তু হিসাবে নির্বাচন করা যায় না?’
দেবদত্ত বলে উঠলেন, ‘নৃপতি সুপ্পবুদ্ধ যখন ওই পাখিকে লক্ষ্যবস্তু হিসাবে নির্বাচন করেছেন, তখন ওইটাই আমাদের ভেদ করতে হবে।’ তিনি ধনুকে শর রচনা করে প্রস্তুত হলেন। অগত্যা সিদ্ধার্থও সে পথ অনুসরণ করতে বাধ্য হলেন। সমবেত জনতা অধীর আগ্রহে চেয়ে রইল, কী ঘটে তা দেখার জন্য।
একজন সংকেতবাহক তার গলায় একটা ছোট বাদ্যযন্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে। দুই রাজকুমার লক্ষ্যভেদের জন্য নিশানা স্থির করে দাঁড়াবার পর সে তার বাদ্যযন্ত্রে ঘা দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে দু’জনের তির ছুটে গেল গাছের মাথায় যেখানে পাখিটা বসে আছে সেদিকে!
সিদ্ধার্থর তির আগে গিয়ে বিদ্ধ হল পাখি যে ডালে বসেছিল সে ডালে। ডাল কেঁপে উঠল, পাখি উড়ে গেল। দেবদত্তর শর পাখির গায়ে বিদ্ধ হল না। দেবদত্ত নিশ্চিত যে পাখিটি উড়ে না গেলে, তার শরেই বিদ্ধ হতো। কারণ, সিদ্ধার্থর তির পাখিকে বিদ্ধ করেনি, ডালে গিয়ে বিদ্ধ হয়েছে। সিদ্ধার্থর ঠোঁটের কোণে তখন ধূর্ত হাসি, যেন তিনি পাখি নয়, ওই ডাল লক্ষ্য করেই তির নিক্ষেপ করেছেন।
অন্য দিকে সিদ্ধার্থর তির যে ওই ডালে গিয়েও বিদ্ধ হতে পারে, এতটুকু আশাও ছিল না শুদ্ধোধনের মনে। তিনি ভাবলেন, এটা নিশ্চয়ই কাকতালীয় ঘটনা। কিন্তু একমাত্র সিদ্ধার্থই জানতেন, এটি কোনও কাকতালীয় ঘটনা নয়। নিরীহ পাখিটিকে যাতে হত্যা না করা হয়, সে জন্যই তিনি তির নিক্ষেপ করেছিলেন ওই ডাল লক্ষ্য করে। এমতাবস্থায় প্রতিযোগিতার প্রথম পর্যার ফলাফল অমীমাংসিত রইল।
এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ে কে কত দূর পর্যন্ত তির ক্ষেপণ করতে পারে, তারই পরীক্ষা হবে। সবাই এমন এক স্থানে এসে দাঁড়াল, যেখানে বেশ কয়েক যোজন উন্মুক্ত স্থান রয়েছে। তারপর রয়েছে উত্তুঙ্গ পাহাড়শ্রেণী। কুমার সিদ্ধার্থ আর কুমার দেবদত্ত নির্দেশানুসারে সে স্থানে এসে তাঁদের বাণ তুলে ধরলেন। আবার সেই বাদ্য ধ্বনিত হল।
দু’জনের তিরই আকাশের দিকে উৎক্ষিপ্ত হয়ে হারিয়ে গেল লোকচক্ষুর আড়ালে। তিরদ্বয় অনুসন্ধানের জন্য অশ্বপৃষ্ঠে ধাবিত হল দুই রাজার অনুচরেরা। শুদ্ধোধন আর সুপ্পবুদ্ধ দু’জনেই ভাবলেন, এবার নিশ্চয়ই ফলাফলের নিষ্পত্তি হবে।
কুমার দেবদত্তরও মনে হল, আর কিছুক্ষণের মধ্যে ফলাফল জানা যাবে। সম্ভাব্য বিজয়ীর হাসি ফুটে উঠল তাঁর মুখে। অন্য দিকে কুমার সিদ্ধার্থর ঠোঁটের কোণেও হাসির রেখা দেখা গেল। কিন্তু তার কারণ জানতে পারল না কেউ।
যারা তিরগুলির অনুসন্ধানে গিয়েছিল, তাদের ফিরতে বেশ বিলম্ব হল। একটিমাত্র তির নিয়ে ফিরে এল তারা। আর সেটা কুমার দেবদত্তর তির। অনুসন্ধানকারীরা জানাল, বেশ কয়েক যোজন দূরে পাহাড়ের পাদদেশে কুমার দেবদত্তর তির খুঁজে পেয়েছে তারা। শুধু বহু অনুসন্ধান করেও কুমার সিদ্ধার্থর তিরের কোনও খোঁজ মেলেনি।
এ সংবাদ বিস্মিত করল সকলকে। দেবদত্ত পরিহাস করে বললেন, ‘তবে কি কুমার সিদ্ধার্থর তির পর্বতমালার তুষারধবল শৃঙ্গ অতিক্রম করে তার ওপারে গিয়ে পৌঁছেছে? পর্বতগ্রাত্র থেকে নেমে আসা নদীগুলো যে সকল জলাশয় সৃষ্টি করেছে, তাতেই গিয়ে পড়েছে সিদ্ধার্থর তির? তাই তা পাওয়া যাচ্ছে না?’
সিদ্ধার্থই শুধু জানতেন যে তাঁর শর সত্যিই পর্বতমালা অতিক্রম করে গেছে। তাই তা পাওয়া যায়নি।
সবাই চাইছিলেন, তির ক্ষেপণের দূরত্ব মেপেই প্রতিযোগিতার নিষ্পত্তি হোক। এমনকী রাজা শুদ্ধোধনও তাই চাইছিলেন। কারণ, তিনি কোনওভাবেই বিষয়টি অসিযুদ্ধ পর্যন্ত এগোতে দিতে চান না। পুত্রের প্রাণ রক্ষাই তাঁর কাছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।
দেবদত্ত সুনিপুণ অস্ত্রধারী, অসিবিদ্যায় পারদর্শী। শঠ দেবদত্তকে বিশ্বাস নেই। সে হয়তো সিদ্ধার্থকে পরাজিত করবার পর তাকে হত্যা করতেও দ্বিধা বোধ করবে না। যতই সে তার জ্ঞাতি ভ্রাতা হোক না কেন!
কিন্তু তির অনুসন্ধান করতে অনেক বিলম্ব হওয়ায় ধৈর্য হারিয়ে কুমার দেবদত্ত বলে উঠলেন, ‘যখন লক্ষ্যভেদ আর শর ক্ষেপণের মাধ্যমে প্রতিযোগিতার নিষ্পত্তি হল না, তবে আমি কুমার সিদ্ধার্থকে অসিযুদ্ধের জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।’
দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করা যে-কোনও রাজবংশীয়র পক্ষেই কাপুরুষতার পরিচয়বাহী। কিন্তু পুত্রের প্রাণ সংকটের আশঙ্কায় কপিলাবস্তুরাজ শুদ্ধোধন কোলীয়রাজ সুপ্পবুদ্ধকে বলতে যাচ্ছিলেন যে ‘প্রতিযোগিতা এবার সমাপ্ত হোক, আমি আমার প্রস্তাব ফিরিয়ে নিচ্ছি।’ কিন্তু তার আগেই কুমার সিদ্ধার্থ তাঁকে সচকিত করে বললেন, ‘আমি অসিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।’
আর কিছু বলার রইল না রাজা শুদ্ধোধনের। রাজা সুপ্পবুদ্ধ বললেন, ‘তবে তাই হোক। বেলা বয়ে যাচ্ছে। আমাকে নিজ রাজ্যে ফিরতে হবে। অসিযুদ্ধের মাধ্যমেই এবার প্রতিযোগিতার নিষ্পত্তি হোক।’
উপস্থিত জনতাও উত্তেজনার স্বাদ গ্রহণ করার জন্য সমবেতস্বরে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, অসিযুদ্ধ হোক।’
উন্মুক্ত স্থানে রজ্জু দিয়ে এক বৃত্তাকার বেষ্টনী রচনা করা হল। তার মধ্যে প্রবেশ করলেন কুমার দেবদত্ত ও কুমার সিদ্ধার্থ। বৃত্তের দু’প্রান্তে গিয়ে দাঁড়ালেন দু’জনে। কোষ থেকে প্রথমে অসি উন্মুক্ত করলেন কুমার দেবদত্ত। তাঁর মুখমণ্ডলে ফুটে উঠল নিষ্ঠুরতা। এবার আর নিস্তার নেই সিদ্ধার্থর। শুধু সিদ্ধার্থকে পরাজিত করাই নয়, তাকে হত্যা করে কপিলাবস্তুর সিংহাসন দখলের পথ নিষ্কণ্টক করতে হবে—এ কথাও ভেবে নিলেন তিনি।
সূর্যালোকে ঝিলিক দিয়ে উঠল তাঁর ক্ষুরধার দীর্ঘ অসি। যা ইতিপূর্বে কোনওদিন পরাস্ত হয়নি। দ্বন্দ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে কয়েক মুহূর্তের জন্য চক্ষু মুদলেন কুমার সিদ্ধার্থ। তা দেখে দেবদত্ত মনে মনে ভাবলেন, নিজের মৃত্যু নিকটে জেনে হয়তো শেষ মুহূর্তে দেবতাদের নিকট স্বর্গলাভের প্রার্থনা করছেন সিদ্ধার্থ।
এরপর সিদ্ধার্থ চোখ মেলে তাঁর তরবারি উন্মোচন করবার সঙ্গে সঙ্গেই ডঙ্কা বেজে উঠল। শুরু হল দ্বন্দ্বযুদ্ধ। আতঙ্কে চক্ষু মুদলেন রাজা শুদ্ধোধন, আর নিজের পরিকল্পনা সফল হতে দেখে হাসি ফুটে উঠল কোলীয়রাজ সুপ্পবুদ্ধের মুখে। উদ্যত তরোয়াল হাতে পরস্পরের দিকে এগিয়ে গেলেন প্রতিদ্বন্দ্বীরা।
শুরু হল সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত অসিযুদ্ধ। রাজা সুপ্পবুদ্ধ ভেবেছিলেন, কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই এই লড়াই শেষ হয়ে যাবে। এমনই ধারণা ছিল দেবদত্তরও। কিন্তু তাঁদের বিস্মিত করে দেবদত্তর প্রতিটি আঘাত প্রতিহত করতে লাগলেন কুমার সিদ্ধার্থ। অস্ত্রের ঝনঝনিতে মুখরিত হয়ে উঠল চারপাশ। উপস্থিত জনতা নিস্তব্ধ হয়ে প্রত্যক্ষ করতে লাগল দুই রাজকুমারের লড়াই।
সিদ্ধার্থ অবশ্য নিজে আক্রমণ হানছিলেন না। আঘাত হানছিলেন দেবদত্তই, সিদ্ধার্থ তরবারির সাহায্যে তা প্রতিহত করছিলেন মাত্র। কিছুক্ষণ ধরে নিজ অস্ত্রের সংঘর্ষের শব্দ শোনবার পর চোখ মেললেন শুদ্ধোধনও। তিনি দেখলেন, তাঁর পুত্র কখনও ক্ষিপ্রগতিতে সরে গিয়ে দেবদত্তর প্রতিটি আঘাত এড়াচ্ছে অথবা অসির সাহায্যে তা প্রতিহত করছে।
বেশ কিছুক্ষণ ধরে একই অবস্থা চলার পর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন কুমার দেবদত্ত, শঠতা প্রকাশ পেল তাঁর। এই যুদ্ধে কোমরের নীচে আঘাত করা অনুচিত। কিন্তু সেই কাজই করবার চেষ্টা করলেন দেবদত্ত। তিনি সিদ্ধার্থর বাম ঊরু লক্ষ্য করে অস্ত্র চালনা করলেন। কিন্তু সিদ্ধার্থ বিদ্যুৎগতিতে সরে গিয়ে সেই আঘাত এড়ালেন। এবং তার পরক্ষণেই এই প্রথমবার তিনি অসীম আঘাত হানলেন দেবদত্তর তরবারিতে।
সেই আঘাতে দেবদত্তর হাত থেকে তার অসি ছিটকে পড়ল রজ্জুবেষ্টনীর বাইরে। হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি। উত্তেজিত জনতা চিৎকার করে উঠল, ‘হত্যা করো, হত্যা করো ওই কপটাচারী দেবদত্তকে!’
কিন্তু কুমার সিদ্ধার্থ সে কাজ করলেন না। প্রাথমিক বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে শুদ্ধোধন নিজ আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমি এই অস্ত্র প্রতিযোগিতায় কুমার সিদ্ধার্থকে বিজয়ী বলে ঘোষণা করলাম।’ তুমুল হর্ষধ্বনি দিয়ে উঠল জনতা।
দাসী কঙ্কা আর কালক্ষেপ না করে রওনা হল রাজকুমারী যশোধরাকে এ সুসংবাদ দেবার জন্য। এবার নৃপতি শুদ্ধোধন তাঁর পাশে বসা হতভম্ব সুপ্পবুদ্ধকে বললেন, ‘এবার নিশ্চয়ই রাজকুমারী যশোধরার সঙ্গে যুবরাজ সিদ্ধার্থর বিবাহ দিলে আপনার কোনও আপত্তি নেই?’
নিরুপায় কোলীয়রাজ ঢোক গিলে বললেন, ‘না, কোনও আপত্তি নেই।’
সিদ্ধার্থ তাঁর হাতের তরোয়াল রজ্জুবন্ধনীর বাইরে এসে নামিয়ে রাখলেন। তিনি এরপর ধীর পায়ে এগিয়ে এসে দুই রাজাকে প্রণাম জানিয়ে তাঁদের অনুমতি নিয়ে তিনি রওনা হলেন প্রাসাদের উদ্দেশে।
রাজা শুদ্ধোধন ভাবলেন, তাঁর পুত্রের এই বিজয় নিশ্চয় কাকতালীয় ঘটনা, আর পরাজিত দেবদত্ত এবং কোলীয়রাজ ভাবলেন, কুমার সিদ্ধার্থ নিশ্চয়ই গোপনে অস্ত্রশিক্ষা গ্রহণ করেছেন।
কিন্তু সেসবই ভ্রান্ত ধারণা মাত্র, সিদ্ধার্থ এজন্মে কোনওদিন গোপনে অস্ত্রশিক্ষা গ্রহণ করেননি। আসলে শুদ্ধোধন, সুপ্পবুদ্ধ বা দেবদত্ত কেউই জানতেন না, কুমার সিদ্ধার্থর পূর্বজন্মের কথা স্মরণ করবার ক্ষমতা আছে। বহু জন্ম পূর্বে সিদ্ধার্থ একদা জন্মগ্রহণ করেছিলেন কাশী নৃপতি ব্রহ্মদত্তের পরিবারে। সেই বোধিসত্ত্বজন্মে তিনি সর্ববিদ্যায় শিক্ষালাভ করেছিলেন তক্ষশীলাতে।
অস্ত্রবিদ্যাও ছিল তার মধ্যে। দেবদত্তর সঙ্গে অসিযুদ্ধের পূর্বে তিনি চক্ষু মুদে পূর্বজন্মের সেই অস্ত্রশিক্ষার জ্ঞানের কথাই স্মরণ করছিলেন। আর তারই ফলে পরাজয় ঘটল দেবদত্তর। যশোধরাকে ভালোবাসার জন্য বোধিসত্ত্বজন্মের অভিজ্ঞতার সাহায্যে এই বুদ্ধজন্মে প্রথম ও শেষ বারের জন্য অস্ত্রধারণ করলেন কুমার সিদ্ধার্থ, ভবিষ্যতের মহাজ্ঞানী, অহিংসার পূজারি বুদ্ধ।
