কলঙ্কিত বুদ্ধ
সংঘগৃহের সম্মুখ ভাগে বেশ কিছু দিন ধরে মূষিকের উৎপাত শুরু হয়েছে। যে বৃক্ষতলে মহাজ্ঞানী অমিতাভ বসে তাঁর শিষ্য-দর্শনার্থীদের সঙ্গে বাক্যালাপ করেন, সেই মহাবৃক্ষের কোটরেই তাদের বাসস্থান। খাদ্যের লোভে তারা এ স্থানকে নিজেদের বাসস্থান রূপে নির্বাচন করেছে।
কারণ, মহাজ্ঞানীর সঙ্গে যাঁরা সাক্ষাৎ করতে আসেন তাঁরা প্রায়শই নানা উত্তম খাদ্যসামগ্রী বহন করে আনেন তথাগতকে নিবেদন করবার জন্য।
ক্ষুধা নিবারণের জন্য অতি সামান্য আহার গ্রহণ করে থাকেন তথাগত ও তাঁর অনুগামীরা। তাই উপহারলব্ধ আহারসামগ্রীর বেশিভাগটাই বণ্টন করে দেওয়া হয় দুঃস্থ, ক্ষুধার্ত নগরবাসীদের মধ্যে।
মূষিকের দল যে শুধু ভাঁড়ারকক্ষে হানা দেয় তাই নয়, কখনও কখনও দর্শনার্থীদের আনা বা ক্ষুধার্তদের মধ্যে বণ্টিত খাদ্যদ্রব্যের কণা মাটিতে পড়ে গেলে মূষিককুল সেটাও গ্রহণ করে। তথাগত বৃক্ষতলে যে বেদিতে অবস্থান করেন, কখনও কখনও সেই বেদিতেও উঠে পড়ে তারা।
মূষিকদের এমন আচরণে মহাজ্ঞানীর প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় আছে। তাদের দেখে তাঁর ঠোঁটের কোণে কৌতুকের হাসি ফুটে ওঠে। তবে মূষিককুলের এহেন আচরণ দেখে ভিক্ষু সারিপুত্ত ও মৌদ্গল্যায়নের ভয় হয়। যখন তথাগত একাকী ধ্যানস্থ থাকেন, তখন কোনও মূষিক তাকে দংশন করতে পারে!
এদিন মধ্যাহ্নে মহাজ্ঞানীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছেন এক শ্রেষ্ঠী। তার এক হাতে মৃত্তিকাভাণ্ডে তথাগতর জন্য আনা খাদ্যসামগ্রী। কিন্তু বৃক্ষতলে এসে সেই ব্যক্তি তথাগতর শান্ত-সৌম্য-স্নিগ্ধ রূপ দর্শন করে বিহ্বল হয়ে পড়লেন। বাকরুদ্ধ হয়ে চেয়ে রইলেন তথাগতর দিকে।
বেশ কয়েক মুহূর্ত অতিবাহিত হল এমনভাবে। তারপর হঠাৎ তার শরীর কম্পিত হয়ে উঠল। হাত থেকে খসে পড়ল মৃত্তিকাভাণ্ড। আর তার মধ্যে থাকা পিষ্টক ছড়িয়ে পড়ল মাটিতে। কারণ, শ্রেষ্ঠী যখন অপলক দৃষ্টিতে বুদ্ধকে দর্শন করছিলেন, তখন এক সাহসী মূষিক খাদ্যদ্রব্যের গন্ধ পেয়ে শ্রেষ্ঠীর শরীরে উঠে পড়েছিল। তারই স্পর্শে তাঁর শরীর কম্পিত হয়েছে, হাত থেকে খসে পড়েছে ভাণ্ড।
ঘটনাটা দেখে ভীষণ বিব্রত বোধ করলেন সারিপুত্ত ও মৌদ্গল্যায়ন। সম্বিৎ ফিরে পেলেন শ্রেষ্ঠীও। বুদ্ধদেবকে প্রণাম করবার পর তিনি আহতস্বরে বললেন, ‘আমাকে মার্জনা করবেন মহাজ্ঞানী, আপনার জন্য আনা উপহার আমি আপনাকে নিবেদন করতে পারলাম না।’
বুদ্ধ শ্রেষ্ঠীর উদ্দেশে ধীরকণ্ঠে বললেন, ‘আপনার আগমনের হেতু কি শুধু আমাকে খাদ্য নিবেদন করা?’
শ্রেষ্ঠী বললেন, ‘তা ঠিক নয়, আমি এসেছিলাম আপনার দর্শনলাভ করতে এবং আপনার ধম্মকথা শুনতে। পিষ্টক এনেছিলাম যদি আপনি তা গ্রহণ করে তৃপ্তবোধ করেন সে জন্য।’
ইতিমধ্যে একদল মূষিক ছুটে এসে সেই পিষ্টক ভক্ষণ করতে শুরু করেছে। তথাগত তাকালেন সেই দিকে। তারপর শ্রেষ্ঠীকে বললেন, ‘দেখুন, ওই মূষিক কেমন পরিতৃপ্তির সঙ্গে পিষ্টক ভক্ষণ করছে। আমি যদি নিজে ওই পিষ্টক গ্রহণ করতাম তাহলেও এমন পরিতৃপ্তি লাভ করতাম না।’
এ কথা বলার পর করুণাময় বললেন, ‘আপনি আমার নিকট আমার ধম্মের কথা শুনতে এসেছেন। আমার ধম্মের সার কথাই হল, এ পৃথিবীর সকল জীবের প্রতি ভালোবাসা, করুণাধারা বর্ষণ করা। তা সে মানুষ হোক বা মূষিক বা অন্য কোনও জীব!
‘এ পৃথিবীর সকল জীবকেই আমি আমার আত্মীয় বলে মনে করি। এ কথাই আমি নানাভাবে ব্যক্ত করি আমার ধম্মের মাধ্যমে। সব মানুষকেই আমি অন্য মানুষকে, অন্য প্রাণীকে ভালোবাসতে উপদেশ দিই। অন্যের প্রতি দ্বেষ-হিংসা ত্যাগ করতে বলি।’
অতি সংক্ষেপে প্রেমময় বুদ্ধ তাঁর ধম্মের সার কথা জানিয়ে দিলেন শ্রেষ্ঠীকে। তাঁর কথা শুনে মুগ্ধ শ্রেষ্ঠী আর কিছু সময় তাঁর সঙ্গে বাক্যালাপ করে তারপর প্রস্থান করলেন।
তখন সারিপুত্ত তথাগতকে বললেন, ‘আপনি আমাদের সমগ্র প্রাণীকুলকে ভালোবাসার শিক্ষা দিয়েছেন, এবং আমরা তা পালন করি। কিন্তু মূষিকরা স্বভাবগতভাবেই ছেদক। তাই শঙ্কা জাগে, যদি কোনোদিন ওরা আপনার শরীর ছেদন করে বসে! তাই ওদের সকলকে এ স্থান থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়াই শ্রেয়। না হয় সে স্থানে ওদের খাদ্যদ্রব্যের ব্যবস্থা করে দেব।’
করুণাময় বললেন, ‘না সারিপুত্ত, ওরা এখানে যেমন আছে, তেমনই থাক। আমি ওদের অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া বা পিঞ্জরবদ্ধ করা অনুচিত বোধ করি। আমি মনে করি না, ওরা আমার কোনও অনিষ্ট করবে। মানুষের মতো অন্য প্রাণীরাও তো ভালোবাসা বোঝে। বিনা কারণে তারা কাউকে আক্রমণ করে না। বরং অনেকক্ষেত্রে পশু-পক্ষীরা মানুষের ভালোবাসার প্রতিদান দেয়।’ এ কথা বলে তিনি করুণাঘন চোখে চেয়ে রইলেন ভোজনরত মূষিকদের দিকে।
এরপর সারিপুত্তর আর কিছু বলার রইল না। তৃপ্তি সহকারে মূষিকদের আহারগ্রহণ প্রত্যক্ষ করবার পর, মহাজ্ঞানী সেই বৃক্ষতল ত্যাগ করে দুই ভিক্ষুর সঙ্গে প্রবেশ করলেন সংঘগৃহের অভ্যন্তরে।
২
নগরনটী চিঞ্চামানবিকা। অত্যন্ত রূপসী সেই নারী বহু পুরুষের আকাঙ্ক্ষিত! কিন্তু চিঞ্চামানবিকার উচ্চাকাঙ্ক্ষা অতি প্রবল। তার রূপ-যৌবন-অর্থের কোনও অভাব না থাকলেও সে ক্ষমতার অধিকারিণী হতে চায়। এমনকী রাজা-রাজচক্রবর্তীদের থেকেও বেশি ক্ষমতা চাই তার। সে চায়, সবাই তার পদতলে মাথা নত করুক, তার আজ্ঞাবহ হয়ে থাকুক।
নটী চিঞ্চামানবিকার ধারণা, সে তখনই সেই স্থানে পৌঁছতে পারবে— যদি কারও কাছ থেকে সে অলৌকিক ক্ষমতা লাভ করতে সক্ষম হয়। তাই সে মুনি-ঋষি-যোগীপুরুষদের কাছ থেকে অলৌকিক ক্ষমতা আহরণ করে নিজের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে চায়। বহু দিন ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে সে।
অলৌকিক শক্তি আহরণের জন্য বহু ব্রাহ্মণকে সে সঙ্গ দিয়েছে, উপঢৌকন দিয়েছে, এমনকী নির্গণ্ঠ সন্ন্যাসীদেরও দ্বারস্থ হয়েছে। কিন্তু তাঁদের কারও কাছ থেকেই সে সেই ক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি।
চিঞ্চামানবিকা লোকমুখে শুনেছে, মহাজ্ঞানী বুদ্ধদেব নাকি প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী। মারের মতো রাক্ষসকে তিনি পরাজিত করেছেন।
যদিও ‘মার’ শব্দের আসল অর্থ জানা নেই নগরনটীর। ‘মার’ হল মানুষের মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা হিংসা-দ্বেষ-লোভ-কামের মতো প্রবৃত্তি। যা জয় করে সিদ্ধার্থ থেকে বুদ্ধত্ব লাভ করেছেন মহাজ্ঞানী।
চিঞ্চামানবিকা এ কথাও শুনেছে যে মগধ সম্রাট অজাতশত্রু মদমত্ত হস্তী নলগিরিকে পাঠিয়েছিলেন বুদ্ধকে হত্যা করবার জন্য। কিন্তু বরাভয় মুদ্রায় দাঁড়াতেই সেই ভয়ঙ্কর হস্তী তাঁর সামনে বসে পড়ে শুঁড় তুলে প্রণাম জানিয়েছিল তাঁকে। আর এ কাহিনি শোনার পর থেকে চিঞ্চামানবিকার ধারণা হয়েছে, বুদ্ধদেবের অতীব অলৌকিক শক্তি রয়েছে, নচেৎ তিনি কীভাবে বশ করেন পশু-পাখিকে!
নগরনটী সংবাদ পেয়েছে, মহাজ্ঞানী বুদ্ধ বর্তমানে এই নগরীর সংঘগৃহতে এসে উপস্থিত হয়েছেন। এবং বেশ কিছুকাল তিনি এ স্থানেই অবস্থান করবেন তাঁর ধম্মপ্রচারের জন্য। রাজা থেকে প্রজা—বহু মানুষ তাঁর সঙ্গে প্রতিদিন সাক্ষাৎ করতে যান সে স্থানে।
চিঞ্চামানবিকা সিদ্ধান্ত নিল, এ সুযোগ তাকে কাজে লাগাতেই হবে। যেভাবেই হোক অলৌকিক ক্ষমতা অর্জন করতেই হবে তাঁর কাছ থেকে। সে এ সংবাদও সংগ্রহ করেছে যে সূর্যাস্তের পূর্বে বৃক্ষতলে কিছুক্ষণ একাকী বসে থাকেন মহাজ্ঞানী। সেসময় তার চারপাশে জনসমাগম বিশেষ থাকে না। তাই বুদ্ধদেবের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য এই সময়টা বেছে নিল চিঞ্চামানবিকা।
মহাজ্ঞানী তাপস এদিন একাই বসে ছিলেন বৃক্ষতলে। এই সময় তাঁর সঙ্গে অন্য কেউ সাক্ষাৎ করতে আসে না। তাঁর শ্রমণ সঙ্গীরাও সংঘগৃহে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত। পাতার ফাঁক গলে শেষ বিকালের রাঙা আলো এসে পড়েছে তাঁর মুখমণ্ডলে। যেন জ্ঞানের দীপ্তি বিচ্ছুরিত হচ্ছে তথাগতর শান্ত মুখমণ্ডল থেকে। বনানীর বিভিন্ন বৃক্ষশাখা থেকে ভেসে আসছে ঘরে ফেরা পাখিদের কলতান। এক শান্ত-মনোরম পরিবেশ চারপাশে।
এমন সময়ে মহাজ্ঞানীর সম্মুখে গিয়ে উপস্থিত হল চিঞ্চামানবিকা। তথাগত করুণাঘন চোখে চাইলেন তার দিকে। চিঞ্চামানবিকা করজোড়ে প্রণাম জানালেন তাঁকে। বুদ্ধদেব আশীর্বাদের ভঙ্গিতে তার উদ্দেশে হাত তুললেন, তারপর প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কোথা থেকে আসছ? কী তোমার পরিচয়?’
সুন্দরী যুবতী জবাব দিল, ‘আমি নগরনটী চিঞ্চামানবিকা। আমার সমকক্ষ সুন্দরী নটী এ নগরীতে আর কেউ নেই।’
মহাজ্ঞানী মৃদু হাসলেন তাঁর কথা শুনে। তারপর পুনরায় প্রশ্ন করলেন, ‘আমার নিকট উপস্থিত হবার হেতু কী?’
চিঞ্চামানবিকা জবাব দিল, ‘আমি আপনার কাছে জ্ঞান আহরণ করতে এসেছি।’
তার কথা শুনে খুশি হলেন বুদ্ধ। তিনি বললেন, ‘আমি তোমাকে অবশ্যই জ্ঞান প্রদান করতে পারি। নির্বাণের জন্য প্রয়োজনীয় পথের সন্ধান দিতে পারি, যেমন দিয়েছি নর্তকী আম্রপালিকে।’
তথাগতর কথা শুনে নটী বলল, ‘না না, আমি ওসব জ্ঞানলাভের প্রত্যাশায় আপনার কাছে আসিনি। আমি এসেছি অন্য জ্ঞানলাভের জন্য।’
‘কী জ্ঞান?’ জানতে চাইলেন তথাগত।
চিঞ্চামানবিকা উত্তর দিল, ‘অলৌকিক জ্ঞান! আমি আপনার কাছ থেকে অলৌকিক জ্ঞান আহরণের প্রত্যাশী।’
বুদ্ধদেব মৃদু চুপ করে থেকে জবাব দিলেন, ‘সে জ্ঞান তো আমি তোমাকে দিতে পারব না।’
‘কেন পারবেন না? আমাকে সে জ্ঞান প্রদান করবার বিনিময়ে আপনি যা চাইবেন আমি তাই দিতে প্রস্তুত। শরীর, অর্থ—সব কিছু।’
মহাজ্ঞানী বললেন, ‘যে ক্ষমতা আমার নেই তা আমি তোমাকে কেমনভাবে প্রদান করব! আমি যে জ্ঞান অর্জন করেছি তা অলৌকিক নয়।’
মহাজ্ঞানীর একথা বিশ্বাস হল না চিঞ্চামানবিকার। কারণ, সবাই বলে তিনি সর্বজ্ঞানের অধিকারী।
নটী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল, কীভাবে মহাজ্ঞানীকে প্রলুব্ধ করে সেই গুপ্তজ্ঞান সংগ্রহ করা যায়! এক সময় সে চটুল ভঙ্গিমায় বলল, ‘আমাকে কি আপনার যথেষ্ট রূপসী বলে মনে হয় না? চৌষট্টি কলায় পারদর্শী আমি!’
নটীর কথা শুনে বুদ্ধ তাকে ভগিনী সম্বোধন করে বললেন, ‘দ্যাখো, আমি তোমাকে সত্যি কথাই বলছি। তোমাকে কোনও অলৌকিক ক্ষমতা দিতে আমি অপারগ।’
এরপর তথাগত তাকে বললেন, ‘এবার তুমি এ স্থান ত্যাগ করে গৃহে ফিরে যাও। সূয অস্ত যেতে বসেছে। অন্ধকার নামতে বেশি দেরি নেই। সংঘের নিয়ম অনুসারে অন্ধকার নামবার পর এই স্থানে কোনও নারীর থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। তবে ভগিনী তুমি যদি আমার কাছ থেকে সত্য-জ্ঞান আহরণ করতে চাও, সত্যের মার্গদর্শন করতে চাও, তবে তুমি আমার কাছে আবার এসো।’
নটী চিঞ্চামানবিকা যে উদ্দেশ্য নিয়ে তথাগতর সাক্ষাৎপ্রার্থী হয়েছিল, তা ব্যর্থ হওয়ায় মনে মনে সে অপমানিত বোধ করল। এরপর সেই স্থান সে ত্যাগ করল ঠিকই, কিন্তু ফেরার পথে এও প্রতিজ্ঞা করল—যেভাবেই হোক বুদ্ধকে সে বাধ্য করবে তাকে অলৌকিক শক্তি প্রদান করতে। আর ভাবতে ভাবতেই শেষ পর্যন্ত এক কূটবুদ্ধির উদয় হল নটীর মনে।
৩
পরদিন বিকালবেলা সুন্দর পোশাকে সজ্জিত হয়ে, পায়ে নূপুরের ঝঙ্কার তুলে সংঘগৃহের দিকে রওনা হল চিঞ্চামানবিকা। সুন্দরী নটীর নূপুরধ্বনি শুনে কেউ কেউ তাকে জিগ্যেস করল, ‘তুমি কোথায় যাচ্ছ?’
খল নর্তকী জবাব দিল, ‘বুদ্ধদেব আমার সাক্ষাৎপ্রার্থী। আমি তাঁর ডাকে সাড়া দিতে যাচ্ছি।’
পরদিন প্রত্যুষে সে কিছুটা বিধ্বস্ত শরীর নিয়ে আবার সেই পথেই ফিরতে লাগল। অন্য পথচারীরা তাকে জিগ্যেস করল, ‘এত ভোরে তুমি কোথা থেকে ফিরছ?’
চিঞ্চামানবিকা ক্লান্ত ভঙ্গিমায় সকলকে বলল, ‘সমগ্র রাত্রিকাল আমি বুদ্ধের সঙ্গে অতিবাহিত করেছি। এখন গৃহে ফিরছি।’
এরপর নিত্য দিন একই ঘটনা ঘটতে লাগল। আসলে সকলকেই মিথ্যা বলছিল সে। প্রতিরাতে সে আত্মগোপন করে থাকত সংঘগৃহের নিকটস্থ এক গৃহে।
কিছু দিনের মধ্যেই চিঞ্চামানবিকার এই যাওয়া-আসা নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে গুঞ্জন তৈরি হল। আর এ রটনায় ইন্ধন দিল ব্রাহ্মণ ও নির্গণ্ঠদের একাংশ। সকলে ভাবল, সর্বত্যাগী তথাগত কি তবে নটীর সঙ্গে প্রণয়ে লিপ্ত হয়েছেন?
এভাবে কিছু দিন পর একদিন সন্ধ্যায় চিঞ্চামানবিকা সত্যি সত্যি উপস্থিত হল বুদ্ধের কাছে।
তথাগতকে সে বলল, ‘আমি শেষবারের মতো জানতে এসেছি, আপনি আমাকে অলৌকিক ক্ষমতা প্রদান করবেন কিনা?’
পূর্বের মতোই একই কথা বললেন তথাগত, ‘যা আমার কাছে নেই তা আমি প্রদান করতে অপারগ।’
চিঞ্চামানবিকা বলল, ‘বেশ, তবে আমি আপনাকে বাধ্য করব সে জ্ঞান প্রদান করতে।’
বুদ্ধদেব নীরব হয়ে রইলেন নটীর কথা শুনে।
এরপর চিঞ্চামানবিকা কুটিল হাসি হেসে সংঘগৃহ ত্যাগ করল।
এরপর বেশ কিছু মাস সে নটীকে আর নগরীর পথে দেখা গেল না। নিজেকে গৃহবন্দি করে রাখল সে।
অন্য দিকে তথাগতর দর্শনে আগের মতোই বহু মানুষ আসেন। মহাজ্ঞানী তাঁদের ধর্মকথা শোনান, সত্যের পথে, নির্বাণলাভের পথে পরিচালনার চেষ্টা করেন।
এভাবে দিন কাটতে কাটতে এক সময় তাঁর এ স্থান পরিত্যাগ করবার সময় উপস্থিত হল। তিনি আবার পথপরিক্রমা শুরু করলেন। রওনা হবেন কাশী রাজ্যের দিকে। সংঘগৃহ থেকে নগরবাসীর উদ্দেশে জানিয়ে দেওয়া হল, আর মাত্র সাত দিবস এ নগরীতে অবস্থান করবেন মহাজ্ঞানী।
চিঞ্চামানবিকা নিজে গৃহের বাইরে পদার্পণ না করলেও, চরের মাধ্যমে সব খোঁজ-খবরই রাখছিল। যেদিন সংঘের পক্ষ থেকে তথাগতর যাত্রার দিন ঘোষিত হল, সেদিনই আবার নগরীতে আত্মপ্রকাশ করল নগরনটী চিঞ্চামানবিকা। তাকে দেখে সমগ্র নগরবাসী অবাক হয়ে গেল।
সন্তানসম্ভবা রমণীর ন্যায় স্ফীতউদর নিয়ে সে সোজা সংঘগৃহে গিয়ে উপস্থিত হল। মহাজ্ঞানী তখন তাঁর নিকট আগত কিছু মানুষকে সত্যপথে চলবার পাঠ দিচ্ছিলেন। সারিপুত্ত, মৌদ্গল্যায়ন প্রমুখ ভিক্ষুরাও উপস্থিত ছিলেন বুদ্ধসমীপে সেই আম্রকুঞ্জে। চিঞ্চামানবিকা গিয়ে দাঁড়াল সেখানে। তাকে দেখে পাঠদান থামালেন মহাজ্ঞানী। অন্য সকলেও কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাল স্ফীতউদর নটীর দিকে।
বুদ্ধ চিঞ্চামানবিকার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন। তারপর বললেন, ‘ভগিনী, তোমার এ সময় এ স্থানে আগমনের হেতু কী?’
খল চিঞ্চামানবিকা সকলকে চমকে দিয়ে বলল, ‘আমি সন্তানসম্ভবা। হয় আপনাকে আমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করতে হবে, নইলে আমার সন্তানের পিতৃত্বের দায় স্বীকার করতে হবে।’
চিঞ্চামানবিকার এ কথা শুনে চারপাশে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এল। বুদ্ধের সঙ্গীভিক্ষুরা জানেন, এ ঘটনা কোনওভাবেই সম্ভব নয়, মহাজ্ঞানী বুদ্ধ সর্বত্যাগী, রিপুজয়ী। তিনি কখনই কোনও নারীদেহের প্রতি আসক্ত হতে পারেন না। এই রমণী শঠ, মিথ্যা বলছে সে। মহাজ্ঞানীকে চরিত্রহননের ভয় দেখিয়ে নিজের ইচ্ছাপূরণের চেষ্টা করছে।
বুদ্ধদেব কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর চিঞ্চামানবিকার উদ্দেশে বললেন, ‘সত্য একদিন প্রকাশিত হবেই। তুমি এখন এ স্থান ত্যাগ করো। তোমার উপস্থিতি পাঠদানে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।’
চিঞ্চামানবিকা ব্যঙ্গের সুরে বলে উঠল, ‘কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যা, তা কেবল আমি-আপনি জানি, নগরবাসীরা কিছু জানে না।’
তথাগত আবারও বললেন, ‘সত্য একদিন প্রকাশিত হবেই।’ তারপর তিনি আর নটীর দিকে না তাকিয়ে পাঠদানে মনোনিবেশ করলেন।
প্রতিহিংসার এক স্পষ্ট ভাব ফুটে উঠল সেই কপট নারীর মুখমণ্ডলে। সে তথাগতর উদ্দেশে বলল, ‘আমি এই মুহূর্তে এ স্থান ছেড়ে চলে যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু আমি আবার আসব। আমার ইচ্ছাপূরণ না করা অবধি, আমি আপনাকে নগরী ত্যাগ করতে দেব না।’
সংঘের প্রধান তোরণ ত্যাগ করে চিঞ্চামানবিকা ক্রন্দনরত অবস্থায় পাগলিনীর মতো ছোটাছুটি করতে লাগল উদর চেপে ধরে। পথচলতি লোকজন তাকে জিগ্যেস করল, ‘তুমি এইরূপ আচরণ করছ কেন?’
চিঞ্চামানবিকা উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করতে করতে বলতে লাগল, ‘তোমরা তো ইতিপূর্বে দেখেছ যে আমি বুদ্ধের ডাকে সাড়া দিয়ে তাঁর কাছে রাত্রিবাস করতে যেতাম। আমার এই গর্ভস্থ সন্তানের পিতা তিনিই। কিন্তু এখন তিনি তা স্বীকার করতে চাইছেন না। আমাকে ফেলে রেখে এই নগরী ছেড়ে পলায়ন করতে চাইছেন। তোমরা এর বিহিত করো। নইলে আত্মহনন করা ছাড়া আমার আর কোনও উপায় নেই।’
৪
দাবানলের মতো দ্রুত এ সংবাদ নগরীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে লাগল। কলঙ্কসংবাদ সত্য হোক বা মিথ্যা—বড় দ্রুত লোকমুখে ছড়িয়ে যায়। তার ওপর পথে পথে ঘুরে ঘুরে সকলকে একই কথা বলতে লাগল শঠ রমণী চিঞ্চামানবিকা। এমনকী সে সংবাদ রাজারও কর্ণগোচর হল।
নগরবাসী বিষয়টা নিয়ে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। একদল বলল, ‘মহাজ্ঞানী বুদ্ধের পক্ষে এ কাজ করা কখনই সম্ভব নয়’। আর একদল বলতে লাগল, ‘ঘটনাটা সত্যি হলেও হতে পারে। অনেক মুনি-ঋষিই তো সুন্দরী রমণীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তার সঙ্গে শারীরিক মিলন ঘটিয়ে সন্তান উৎপাদন করেছিলেন। নানা কাহিনিতে তার উল্লেখ আছে। এ ক্ষেত্রেও হয়তো তেমনই ঘটেছে। নচেৎ চিঞ্চামানবিকা হঠাৎ এ অভিযোগ করতে যাবেই বা কেন?’
বুদ্ধবিদ্বেষী একদল মানুষ ও কিছু সন্ন্যাসীও এ সংবাদ প্রচার করতে লাগলেন। এবং চিঞ্চামানবিকা যাতে ন্যায়বিচার পায়, তার জন্য দাবি জানাতে শুরু করলেন। তাঁরা কলঙ্কের দাগ লাগিয়ে দিলেন সর্বত্যাগী, রিপুজয়ী মহাজ্ঞানী বুদ্ধের গায়ে। বৌদ্ধমঠের ভিক্ষুরা মাধুকরীর জন্য রাজপথে বেরোলে, চারিদিক থেকে কটূক্তি-বিদ্রুপ শুরু হল তাঁদের প্রতি। অনেকে তাঁদের ভিক্ষা দেওয়াও বন্ধ করলেন।
নগরবাসীগণ বুদ্ধের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসা বন্ধ করল। তাঁর সঙ্গীভিক্ষুরাও বুঝে উঠতে পারলেন না, এ সময় তাঁদের কী করা উচিত! যদিও তাঁরা জানেন যে, তথাগতকে কলঙ্কিত করবার জন্যই তাঁর সম্পর্কে মিথ্যা অপবাদ প্রচার করছে নটী চিঞ্চামানবিকা ও বুদ্ধবিদ্বেষীরা।
এভাবেই গোটা একটা সপ্তাহ অতিক্রান্ত হতে চলল। মহাজ্ঞানীর যেদিন এ নগরী ত্যাগ করে কাশী রাজ্যের উদ্দেশে রওনা হবার কথা, তার দু’দিন আগে চিঞ্চামানবিকা ও বুদ্ধবিদ্বেষীরা সিদ্ধান্ত নিলেন যে এ ঘটনার নিষ্পত্তি না হওয়া অবধি বুদ্ধকে নগরী ত্যাগ করতে দেওয়া হবে না।
তাঁরা পরিকল্পনা করলেন, পরদিন চিঞ্চামানবিকাসহ সকলে বুদ্ধের কাছে যাবে। তাঁদের এই পরিকল্পনার সংবাদ রাজার কাছেও পৌঁছাল। রাজা বুদ্ধভক্ত। কিন্তু তাঁর মনেও তখন একটা দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, পরদিন তিনিও সংঘগৃহে উপস্থিত থাকবেন ঘটনার সত্যতা জানবার জন্য।
তথাগতও চিঞ্চামানবিকার পরিকল্পনা শুনলেন। সারিপুত্ত, মৌদ্গল্যায়ন, আনন্দ প্রমুখ ভিক্ষুরাও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন সকলে। কিন্তু তথাগত নিশ্চুপ রইলেন। তিনি ভিক্ষুদের কোনও নির্দেশ দিলেন না। তবে সেদিন আহার গ্রহণ না করে তিনি তাঁর আহার্য তণ্ডুল বৃক্ষতলে আগত মূষিকদের ভক্ষণ করালেন। সমগ্র রাত্রি তিনি বৃক্ষতলে ধ্যানমগ্ন রইলেন। এবং উৎকণ্ঠিত বৌদ্ধভিক্ষুরাও বিনিদ্র রজনীযাপন করলেন।
পরদিন ভোরের আলো ফোটার পর ধ্যানভঙ্গ হল মহাজ্ঞানীর। সংঘের সকল ভিক্ষুরা তাঁর কাছে এসে উপস্থিত হলেন। কিন্তু বুদ্ধদেব কারও সঙ্গেই কোনও বাক্যালাপ করলেন না। কিছু সময়ের মধ্যেই সংঘকাননে একে একে প্রবেশ করতে শুরু করল নগরবাসীবৃন্দ। তাঁদের মধ্যে কেউ বুদ্ধভক্ত, কেউ বা বুদ্ধবিদ্বেষী, আবার কেউ নিরপেক্ষ।
এক সময় স্বয়ং রাজা তাঁর পার্ষদদের নিয়ে উপস্থিত হলেন সে স্থানে। ভিক্ষুরা একটি কাষ্ঠাসন এনে তাঁকে বসালেন। তবে রাজার আগমনেও তথাগত নিশ্চুপই রইলেন। যেন মৌনব্রত পালন করছেন তিনি। এরপর যখন জনসমাগমে আম্রকুঞ্জ পরিপূর্ণ হয়ে গেল, ঠিক তখনই সে বৃক্ষতলে এসে উপস্থিত হল নগরনটী চিঞ্চামানবিকা।
৫
সে উপস্থিত হবার পরই জনতার কোলাহল স্তব্ধ হয়ে গেল। মহাজ্ঞানী তখনও নির্বিকার—নিশ্চুপ। ভাবলেশহীন তাঁর মুখমণ্ডল। চিঞ্চামানবিকা রাজাকে প্রণাম জানিয়ে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বলল, ‘আমি কেন আজ এ স্থানে উপস্থিত হয়েছি তা আপনারা সকলেই জানেন। আমি এসেছি আমার প্রতি বুদ্ধের অন্যায় আচরণের প্রতিবিধান চাইতে। আপনারা নগরবাসীরা সকলে এ স্থানে উপস্থিত আছেন। সর্বোপরি স্বয়ং মহারাজ এখানে উপস্থিত আছেন, তাই আমি আশা করি আমার সঙ্গে ন্যায়বিচারই হবে।’
তার এ কথা শুনে উপস্থিত বুদ্ধবিদ্বেষীরা বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, ন্যায়বিচার তোমার প্রাপ্য। তুমি তোমার দাবির কথা বলো।’
নটী চিঞ্চামানবিকা বলল, ‘আমার এই গর্ভের সন্তান বুদ্ধের ঔরসজাত। তাঁকে তাই এ সন্তানের পিতৃত্বের দায়স্বীকার করতে হবে। আমাকে বিবাহ করতে হবে তাঁকে। স্ত্রীরূপে গ্রহণ করতে হবে।’
স্ফীতউদর চিঞ্চামানবিকার কথা শুনে রাজা তাকালেন তথাগতর মুখের দিকে। তিনি নিশ্চুপ। মৌনতা সম্মতির লক্ষণ হয়। তবে কি তিনি স্বীকার করে নিচ্ছেন ঘটনাটা?
তথাগতকে চুপ থাকতে দেখে জনতার মধ্যেও গুঞ্জন শুরু হল। রাজা বুদ্ধভক্ত হলেও রাজনীতিবিদ! তাই তিনি মনে মনে ভেবেছিলেন, যদি বুদ্ধের পদস্খলন হয়েও থাকে, তবুও যে তিনি মহাজ্ঞানী—এ সত্য অস্বীকার করা যায় না। তাই কৌশলে চিঞ্চামানবিকার হাত থেকে মুক্ত করতে হবে তাঁকে। তাই রাজা নটীকে বললেন, ‘তোমার এ দাবির পরিবর্তে অন্য কোনও দাবি আছে কি?’
চিঞ্চামানবিকা যেন এ মুহূর্তের জন্যই অপেক্ষা করছিল। সে বলল, ‘হ্যাঁ, আছে। বুদ্ধ যদি আমার সে দাবি পূরণ করেন তবে আমি তাঁকে আমার অন্য সকল দাবি থেকে মুক্তি দিতে পারি। তাঁকে আর আমাকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করতে হবে না। সন্তানের দায়িত্বও নিতে হবে না।’
তার কথা শুনে রাজা জানতে চাইলেন, ‘কী সেই দাবি?’
নটী চিঞ্চামানবিকা ধূর্ত নারী। সে জবাব দিল, ‘সে কথা আমি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে পারব না। তবে সেই দাবির কথা বুদ্ধ জানেন। আপনি তাঁকে আমার সে দাবি মেনে নিতে বলুন।’
রাজা তাকলেন তথাগতর মুখের দিকে। সেই মুখমণ্ডল আগের মতোই ভাবলেশহীন। যেন তিনি চোখ খোলা অবস্থাতেই ধ্যানমগ্ন।
জনতার মধ্যে আবার কোলাহল শুরু হল। একদল লোক বলতে লাগল, চিঞ্চামানবিকার বক্তব্য সত্যি। সে জন্যই বুদ্ধ নিরুত্তর। তাই নটীর দু’টি দাবির মধ্যে যে কোনও একটা দাবি বুদ্ধকে মানতেই হবে।
এক সময় কোলাহল চরমে উঠল। জনতার মধ্যে কেউ কেউ বুদ্ধকে ভণ্ড, কামুক বলে গালি দিতে শুরু করল। ভিক্ষুরাও স্তম্ভিত। তাঁরাও বুঝে উঠতে পারছেন না তাঁদের কর্তব্য। কারণ তথাগত নিশ্চুপ।
এরপর জনতার মধ্যে থেকে বুদ্ধবিদ্বেষী এক সন্ন্যাসী একটা মালা নিয়ে চিঞ্চামানবিকার কাছে এগিয়ে এসে বললেন, ‘এই মালাটা তুমি বরমাল্য হিসাবে বুদ্ধের গলায় পরিয়ে দাও। তাহলে গান্ধর্বমতে ওর সঙ্গে তোমার বিবাহ সম্পন্ন হবে। তখন ও আর তোমাকে স্ত্রী হিসাবে অস্বীকার করতে পারবে না।’
চিঞ্চামানবিকা তাকাল তথাগতর দিকে। তিনি একইরকম অচঞ্চল, নিরুত্তর।
বেশ কিছু উত্তেজিত জনতা চিৎকার করে উঠল, ‘মালা পরাও! ওর গলায় মালা পরাও! তারপর দেখব বুদ্ধ কীভাবে তোমাকে স্ত্রী হিসাবে অস্বীকার করে! কীভাবে ‘‘ধম্ম’’ প্রচার করে! চিঞ্চামানবিকা, তুমি এই বুদ্ধের ভণ্ডামির আবরণ উন্মোচন করো।’
শঠ, প্রতিশোধপরায়ণা গণিকা চিঞ্চামানবিকা বলল, ‘তবে তাই হোক। আমি বরমাল্য পরাচ্ছি ভণ্ড সন্ন্যাসীর গলায়।’
এই বলে সে মালাটা নিয়ে বুদ্ধের দিকে এগোল। কিন্তু কয়েক পা এগোতেই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। চিঞ্চামানবিকার স্ফীতউদর হঠাৎই তার শরীর থেকে মাটিতে খসে পড়ল! সবাই দেখল, সেটা একটা কচ্ছপের খোল মাত্র। আর তার মধ্যে থেকে একটা মূষিক বেরিয়ে এসে দ্রুত গাছের ওপর উঠে অদৃশ্য হয়ে গেল।
রাজা সম্পূর্ণ বিষয়টা বুঝতে পারলেন। ওই মূষিক চিঞ্চামানবিকার গায়ে উঠে খোলের দড়ি ছেদন করেছে। তাই খোল খসে পড়েছে। সত্য উদ্ঘাটিত হল। এমনটা যে ঘটবে, তা বুঝতে পারেনি চিঞ্চামানবিকা। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে মাটিতে খসে পড়া খোলটার দিকে চেয়ে রইল সে।
রাজা এবার তাকালেন তথাগতর মুখের দিকে। তিনি দেখলেন, মহাজ্ঞানীর ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠতে শুরু করেছে।
কয়েক মুহূর্তের জন্য সবাই হতভম্ব হয়ে গেল ঘটনাটা দেখে। তারপর সবাই চিৎকার করে উঠল ‘শাস্তি দাও, শাস্তি দাও ওই পাপিষ্ঠাকে।’
রাজা উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর রক্ষীদের নির্দেশ দিলেন, ‘বন্দি করো এই দূরাচারিণী নারীকে! মহাজ্ঞানীকে কলঙ্কিত করবার জন্য ওকে আমি কারাগারে নিক্ষেপ করব।’
এতক্ষণ পর বুদ্ধদেব রাজার উদ্দেশে বললেন, ‘ওকে শাস্তি দেবার দায়িত্ব আপনাকে নিতে হবে না। ওকে আমি ক্ষমা করলাম। তবে কেউ যদি কোনও পাপ করে থাকে, তবে ইহজন্ম হোক বা পরজন্ম, পাপের শাস্তি তাকে পেতেই হবে। চিঞ্চামানবিকাও সেই শাস্তি পাবে।’
মহাজ্ঞানীর কথা শুনে নিরস্ত হলেন রাজা। উন্মত্ত জনতাও ধীরে ধীরে শান্ত হল। আর ছলনাময়ী নটী চিঞ্চামানবিকা সুযোগ পেয়ে সে স্থান ত্যাগ করে, নগরী থেকে পলায়ন করবার পথ ধরল।
৬
এক সময় সমগ্র নগরবাসী সে স্থান থেকে বিদায় নিল। তথাগতর নিকট বুদ্ধের কাছে রয়ে গেলেন শুধু রাজা আর সংঘের ভিক্ষুরা।
রাজা মহাজ্ঞানীকে প্রণাম জানিয়ে বললেন, ‘সত্যি আপনি তথাগত—পরম করুণাময়, নইলে যে আপনার চরিত্রহননের চেষ্টা করে আপনাকে এত ক্লেশ দিল, অপমানিত কলঙ্কিত করল, তাকে আপনি ক্ষমা করতে পারতেন না। এই মিথ্যা অপবাদের কারণে নিশ্চয়ই এ ক’দিন প্রভূত মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে আপনাকে!’
তথাগত বললেন, ‘তা হয়েছে। কারণ যা ঘটেছে তা আমার পূর্বজন্মের পাপের ফল।’
বিস্মিত হয়ে রাজা জিগ্যেস করলেন, ‘পূর্বজন্মে আপনি কী পাপ করেছিলেন যার কারণে এ জন্মে আপনাকে এরূপ কলঙ্ক সহ্য করতে হল?’
মহাজ্ঞানী বললেন, ‘বহুকাল পূর্বে আমি একবার কাশী নগরীতে এক শ্রেষ্ঠীর পরিবারে জন্ম নিয়েছিলাম। পিতা-মাতা আমাকে অতিরিক্ত স্নেহ দিলেও উপযুক্ত শিক্ষা দিতে সমর্থ হননি। তাই আমার ভালো-মন্দ, উচিত-অনুচিত বোধ ছিল না।
‘একবার আমাদের গৃহ থেকে সামান্য কিছু দ্রব্য চুরি যায়। আমি তখন কোনও প্রমাণ ও চিন্তা ছাড়াই আমার গৃহে কর্মরত এক দাসীকে চোর অপবাদ দিই। সবাই তাকে তিরস্কার করে। চুরির মিথ্যা অপবাদে আমি সেই দাসীকে কলঙ্কিত করি।
‘পরে অবশ্য জানা যায় যে সে চুরি করেনি। আমার সেই অপরাধের শাস্তি আমি এজন্মে ভোগ করলাম। পাপের শাস্তি কারও পিছু ছাড়ে না। তা সে বুদ্ধই হোক বা রাজন।’
এ কথা শোনার পর রাজা বললেন, ‘মহাজ্ঞানী, আমাকে মার্জনা করবেন, একটি প্রশ্নের উত্তর জানতে আমি বড় উদ্গ্রীব বোধ করছি। নটী চিঞ্চামানবিকা আপনার থেকে কী এমন দাবি করেছিল যা দান করতে আপনি অসম্মত হওয়ায় সে এমন কদর্য পরিকল্পনা গ্রহণ করল?’
মহাজ্ঞানী হেসে বললেন, ‘সে আমার থেকে অলৌকিক ক্ষমতা সম্বন্ধে জ্ঞানলাভ করতে চেয়েছিল। কিন্তু যে জ্ঞান বা ক্ষমতা আমার নেই, তা আমি কীভাবে তাকে প্রদান করতাম? আমি শুধু মানুষকে পথনির্দেশ করতে পারি মাত্র! কোনও অলৌকিক শক্তি আমার নেই।’
রাজার মুখ দেখে মহাজ্ঞানী অনুমান করলেন, রাজা সদ্যতন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যেন তাঁর এই বক্তব্য ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না। তাই সত্যমার্গগামী বুদ্ধ এরপর হেসে বললেন, ‘আপনি বা আপনারা হয়তো ভাবছেন, মূষিকটি যে চিঞ্চামানবিকার বন্ধনী ছিন্ন করে সত্যকে প্রকাশ করল তা একটি অলৌকিক ঘটনা। আমি আমার অলৌকিক ক্ষমতাবলে সেই মূষিককে পরিচালিত করেছিলাম বন্ধনীছেদনের জন্য!
‘তবে ব্যাপারটা তা নয়। আসলে বহু মানুষ আমার নিকট উপস্থিত হন খাদ্যদ্রব্যের ভাণ্ড নিয়ে। এই মূষিক চিঞ্চামানবিকার স্ফীত উদর দেখে তাকে খাদ্যভাণ্ড ভেবেছিল। সে জন্যই সে চিঞ্চামানবিকার শরীরে উঠেছিল। আর ছেদন করা মূষিকের সাধারণ অভ্যাস। সেই অভ্যাসবশতই সে বন্ধনী ছিন্ন করেছিল।
‘এ কোনও অলৌকিক ঘটনা নয়। তবে আমি এটুকু জানি, সত্য হল সূর্যের মতো। তা একদিন প্রকাশিত হবেই। এ জন্যই আমি চিঞ্চামানবিকার কলঙ্ক সহ্য করেও নিশ্চুপ ছিলাম।’ এই বলে ধীরে ধীরে ধ্যানমগ্ন হলেন মহাজ্ঞানী।
পরদিন সূর্যোদয়ের পরে পূর্ব-পরিকল্পনামতোই তথাগত সংঘগৃহ ত্যাগ করে রওনা হলেন, নতুন স্থানে ধম্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে। রাজা ও সমগ্র নগরবাসীরা কলঙ্কমুক্ত বুদ্ধদেবকে নগরপ্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন এই প্রত্যাশায় যে, আবার একদিন এ নগরীতে তাঁর শুভ পদচিহ্ন পড়বে।
নগর পরিত্যাগের সময় তথাগত সংঘের ভিক্ষুদের বলে গেলেন, তাঁর অবর্তমানে ওই মূষিককুলকে যেন সে স্থান থেকে বিতাড়িত না করা হয়। তাঁর জন্য প্রতিদিন যে খাদ্যদ্রব্য দেওয়া হতো, তাই যেন ভক্ষণ করানো হয় ওই প্রাণীদের। এ জগতের সব জীবই ভালোবাসা ও করুণালাভের যোগ্য—এ কথা জানিয়ে এগিয়ে চললেন মহাজ্ঞানী করুণাময় বুদ্ধ।
