পাপী বুদ্ধ
প্রশস্ত রাস্তাটা সোজা এগিয়ে গিয়ে মিশেছে মহাবোধি মন্দিরের প্রবেশ তোরণের সামনের উঁচু রাস্তার মোড়ে। পথের দু’পাশে স্থায়ী-অস্থায়ী নানা দোকানে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের মূর্তি, বুদ্ধের ছবি আঁকা টি-শার্ট, বুদ্ধমূর্তি, সন্ন্যাসীদের পরনের সারঙ, দেবতাদের গায়ে চড়াবার জন্য উজ্জ্বলবর্ণের বস্ত্র-খণ্ড চীবর ইত্যাদি।
মূল মন্দিরে যাওয়ার পথের দু’পাশে আরও কিছু বৌদ্ধ মন্দির বা মঠ আছে। বাংলাদেশ থেকে শুরু করে থাইল্যান্ড, চীন, জাপান ইত্যাদি বিভিন্ন দেশের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মঠ। আসলে এ জায়গাটা সারা পৃথিবীর বৌদ্ধদের কাছে এক পবিত্র তীর্থক্ষেত্র।
ওই যে আকাশের বুকে মহাবোধি মন্দিরের শীর্ষদেশ দেখা যাচ্ছে, ওই স্থানেই দু’হাজার বছর আগে এক অশ্বত্থ গাছের নীচে বোধিলাভ করেছিলেন মহাজ্ঞানী গৌতম বুদ্ধ। সেসময় এ স্থানের নাম ছিল উরুবিলা, আজ যা বুদ্ধগয়া নামে পরিচিত। শুধু এদেশের মানুষেরাই নন, বিভিন্ন দেশ থেকেও বহু মানুষ এখানে তীর্থ করতে আসেন। তাই বিভিন্ন দেশ তাদের মঠ-মূর্তি স্থাপন করেছে অঞ্চলে।
শীতের মেঘমুক্ত নীল আকাশ। রাস্তায় দেশি-বিদেশি টুরিস্ট, বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের ভিড়। সেই ভিড়ের মধ্যে দিয়েই মন্দিরের দিকে এগোচ্ছিল শাক্য। সঙ্গে আরও দু’জন লোক। তারা দু’জনেই এ অঞ্চলের বাসিন্দা। একজনের নাম রাকেশ যাদব। বয়সে যুবক সে, পরিবেশ কর্মী। অপরজন, মধ্যবয়সি মানুষ তিনি। নাম প্রেমানন্দ সিং। তাঁর পরনে কোনও কোনও ইউনিফর্ম না থাকলেও, একজন সাদা পোশাকের পুলিশ অফিসার।
শাক্য এই দলটাকে আরও বড় করতে পারত, কিন্তু তা সে করেনি। কারণ, তাতে তারা অন্যদের চোখে পড়ে যেতে পারে। শাক্যর কাজে বিঘ্ন ঘটতে পারে। যাদের সে খুঁজতে যাচ্ছে তারাও সতর্ক হয়ে যেতে পারে।
সেই কারণে সঙ্গে থাকা পুলিশ অফিসারকেও সাদা পোশাকে আসতে বলেছে সে।
তবে সমস্যার কিছু নেই। পুলিশ আর স্থানীয় বন দপ্তরের গাড়ি কাছেই অপেক্ষা করছে। ফোন করলেই যথাস্থানে পৌঁছে যাবে তারা।
শাক্যরা চারপাশে তাকাতে তাকাতে হাঁটছিল। বিশেষত রাকেশ নামের পরিবেশ কর্মী যুবকটি তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল রাস্তার চারদিকে। মূলত তার জন্যই ভারত সরকারের বন বিভাগের আধিকারিক শাক্যর বোধগয়াতে আসা। একটা বিষয় নিয়ে বার বার শাক্যদের দপ্তরে পত্রাঘাত করেছে সে।
ইতিপূর্বে স্থানীয় প্রশাসনের কাছেও নাকি সে এই নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছিল। কিন্তু তারা বিশেষ গুরুত্ব দেননি। হয়তো বিষয়টা বেআইনি হলেও দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে বলে আর ধর্মীয় ভাবাবেগের সঙ্গে কিছুটা যুক্ত বলে।
যেমন পুলিশ অফিসারটির এই সম্পর্কে খুব একটা আগ্রহ আছে বলে মনে হচ্ছে না। শাক্য বা তাঁর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন অফিসারের নির্দেশ পালন করার জন্যই যেন তিনি এসেছেন। হাঁটতে হাঁটতে তিনি শাক্যকে জিগ্যেস করলেন, ‘একটা কথা জিগ্যেস করছি, কিছু মনে করবেন না স্যার। আপনি কি বৌদ্ধ?’
শাক্য পালটা প্রশ্ন করল, ‘কেন বলুন তো?’
প্রেমানন্দ সিং বললেন, ‘এখানে অনেক বৌদ্ধ আছে যাদের নাম শাক্য বা শাক্যমুনি।’
শাক্য জবাব দিল, ‘আমার নামটা বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে যুক্ত হলেও আমি বৌদ্ধ নই। তবে আমি যে ধর্মের লোকই হই না কেন, এই মুহূর্তে আমার পরিচয় আমি একজন সরকারি অফিসার। আর আমি আমার দায়িত্ব পালন করতে এসেছি।’
তার কথা শুনে রাকেশ যাদব উৎসাহিত বোধ করে বলল, ‘আপনি একদম ঠিক বলেছেন স্যার। এখানকার লোকেরা যদি তাদের দায়িত্ব ঠিকঠাকভাবে পালন করত, তবে আমাকে আর এত কষ্ট করে আপনাদের কাছে অভিযোগ জানাতে হতো না।’
ছেলেটার কথা শুনে শাক্যর মনে হল, সে তার বক্তব্যের মাধ্যমে প্রেমানন্দকেই ইঙ্গিত করছে। তবে অফিসার সেসব গায়ে না মেখে শাক্যকে ফের প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি আগে কখনও বুদ্ধগয়াতে এসেছেন স্যার?’
শাক্য জবাব দিল, ‘না, আসা হয়নি।’
প্রেমানন্দ সিংহ গল্পের ছলে বললেন, ‘আমাদের এ জায়গাটা খুব শান্ত আর সুন্দর। হাতে সময় থাকলে মহাবোধি মন্দির, বোধিবৃক্ষ দেখার পাশাপাশি থাই মন্দির, চাইনিজ মন্দির, আশি ফুটের বুদ্ধমূর্তি—এই জায়গাগুলোও ঘুরে নিতে পারেন। ভালো লাগবে। নদীর ওপারে সুজাতা মন্দির আছে, সেটাও দেখে আসতে পারেন।’
তাঁর কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাকেশ যাদব বলল, ‘হ্যাঁ, এ জায়গাটা সুন্দর তো বটেই। তবে আরও সুন্দর হতে পারে যদি পরিবেশ নিয়ে কিছু মানুষের ছেলেখেলা বন্ধ করা যায়। সে চেষ্টাই আমি করে চলেছি বেশ কিছু বছর ধরে। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ স্যার যে আপনি আমার ডাকে সাড়া দিয়ে এসেছেন। আপনার কাজ মিটলে আমি আপনাকে এখানকার সব কিছু ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেব।’
শাক্য বলল, ‘এখন বেলা এগারোটা। এখানে যখন এসেছি তখন দেখছি কোনওভাবে মহাবোধি মন্দিরের বিখ্যাত বুদ্ধমূর্তি দর্শন করার সুযোগ হয় কিনা। কাল ভোরেই তো আমাকে আবার পাটনা হয়ে দিল্লি ফিরতে হবে।’
এরপর আরও একটু এগিয়ে গিয়ে মৃদু চড়াই ভেঙে তারা পৌঁছে গেল মহাবোধি মন্দিরের প্রবেশ তোরণের সামনে।
২
জায়গাটা আসলে একটা রাস্তার মোড়। তবে মন্দিরের সামনে বলে সেখানে সাধারণ যানবাহন কিছুটা কম চলাচল করে। রাস্তার মাঝখানে একটা আইল্যান্ড আছে। তার এক পাশ দিয়ে মহাবোধি মন্দিরের তোরণে প্রবেশ করার জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পর্যটক-পুণ্যার্থীরা। অন্য পাশে দুটো বিশাল বৌদ্ধমঠ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।
তাদের দু’পাশ দিয়ে দুটো রাস্তা চলে গেছে মঠের পিছন দিকে। তার মধ্যে একটা রাস্তা বেশ ঘিঞ্জি। নানাধরনের দোকানপাট রয়েছে সেখানে। মন্দিরের সামনের এই মোড়টাতে গাড়ি প্রায় চলে না বলে রাস্তার মধ্যেই স্থানীয় অনেক মানুষ বসে গেছে পুজোর সামগ্রী বিক্রি করার জন্য। হাতে পদ্মকুঁড়ি নিয়েও ফিরি করছে কেউ কেউ।
আর আছে একদল পথশিশু। খালি পা, খড়ি ওঠা গা, পরনে ছেঁড়া পোশাক, নাক দিয়ে শিকনি গড়াচ্ছে। টুরিস্ট, বিশেষত সাদা চামড়ার টুরিস্ট দেখলেই তারা গিয়ে হাত পাতছে। ব্যস্ত হয়ে মন্দিরের দিকে যাওয়া আসা করছে পীতবর্ণের পোশাক পরা বৌদ্ধ শ্রমণের দল। সব মিলিয়ে জায়গাটা বেশ জমজমাট। যে-কোনও বিখ্যাত ধর্মস্থানের সামনে যেমন হয় আর কী!
শাক্যর পরনে কোট প্যান্ট দেখেই একদল বাচ্চা ভিক্ষার লোভে তার সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর হাতের থালা নাচাতে লাগল। প্রেমানন্দ এক ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দিলেন তাদের। শাক্য জানতে চাইল, ‘এই বাচ্চারা কি বৌদ্ধ ভিক্ষু?’
প্রেমানন্দ জবাব দিলেন, ‘না, বৌদ্ধ শিশুভিক্ষুরা মঠে থাকে। বিভিন্ন মঠ তাদের লালন-পালন করে, শিক্ষা দেয়। এই বাচ্চারা স্থানীয় গরিব পরিবারের ছেলে-মেয়ে। এদের মধ্যে হিন্দু-মুসলিম অনাথ সকলেই আছে।’
এদিক ওদিক দেখতে দেখতে রাকেশ যাদব পাশের একটা ঘিঞ্জি গলির দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, ‘স্যার, ওই দেখুন গলির মুখের চায়ের দোকানের পাশে একজন খদ্দের ধরার জন্য ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা খাঁচা। এমন আরও কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে থাকে ওখানে।’
শাক্য বলল, ‘চলুন এগোনো যাক। তবে যা কথা বলার আমিই বলব।’
যেন শাক্যরা টুরিস্ট, এমন ভাব দেখিয়ে তারা এগিয়ে গিয়ে গলির মুখে লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। লোকটাকে প্রায় বৃদ্ধই বলা যায়। মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা। পরনে বিবর্ণ শার্ট আর একটা ধুতি। এক হাত দিয়ে সে তার কাঁধের ওপর একটা থলে ধরে রেখেছে। আর তার অন্য হাতে ঝুলছে একটা ছোট খাঁচা। তার মাথার ওপর গামছা চাপা দেওয়া। শাক্য হেসে তাকে জিগ্যেস করল, ‘তোমার খাঁচায় কী আছে?’
প্রশ্ন শুনে লোকটা খুব উৎসাহ নিয়ে খাঁচাটা শাক্যর চোখের উচ্চতায় তুলে ধরল। শাক্য দেখল, তার মধ্যে রাখা আছে একঝাঁক চড়াই, বন মুনিয়া— এসব জাতীয় পাখি। লোকটা হেসে শাক্যকে বলল, ‘কুড়ি টাকা জোড়া বাবু। খুব সস্তা।’
শাক্য প্রশ্ন করল, ‘কী হবে এ পাখি কিনে?’
লোকটা তড়িঘড়ি জবাব দিল, ‘উড়িয়ে দেবেন হাতে ধরে। ওরা মুক্তি পেলে আপনার পুণ্য হবে। অনেকেই ওড়ায় ওখানে।’
শাক্য জানতে চাইল, ‘তুমি পাখি ধরো? নাকি কিনে এনে বিক্রি করো?’
সে জবাব দিল, ‘আমিই ধরি। নদীর পাড়ের জঙ্গল থেকে। আপনি পাখি ওড়াবেন বাবু?’
শাক্য এবার মৃদু কঠিনভাবে বলল, ‘তুমি জানো না পাখি ধরা বেআইনি কাজ?’
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে লোকটা হেসে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, জানি বাবু।’
রাকেশ যাদব এবার লোকটার প্রতি নিজের রাগ চাপতে না পেরে বলে উঠল, ‘অন্যায় করে কেমন হাসছে দেখেছেন!’
এক সন্ন্যাসী পাশ দিয়ে যাবার সময় থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। সম্ভবত তিনি কাছেই কোনও মঠে থাকেন। তিনি প্রেমানন্দ সিংকে চিনতে পেরে বললেন, ‘পুলিশ সাহেব, আপনি এখানে কী করছেন? কোনও গন্ডগোল হল নাকি?’
প্রেমানন্দ একটু ইতস্তত করে শাক্যকে দেখিয়ে বললেন, ‘ইনি বন দপ্তরের বড় অফিসার। পাখি ধরা তো নিষিদ্ধ। ওনার কাছে কমপ্লেন গেছে। তাই উনি ব্যাপারটা বন্ধ করতে এসেছেন। আমিও ওনার সঙ্গে এসেছি।’
রাকেশ যাদব এরপর সেই সন্ন্যাসীকে বলল, ‘এই লোকটাকে আপনি চেনেন? এইসব অন্যায় কাজ কে আপনারা সমর্থন করেন?’
বৌদ্ধ সন্ন্যাসী প্রত্যুত্তরে বললেন, ‘ওকে আমি চিনি। কাছেই একটা মঠে কাজ করত। সে কাজ এখন নেই। আর কোনও বেআইনি কাজকে আমরা সমর্থন করি না। ভগবান বুদ্ধ সমস্ত জীব-জগৎ, পশু-পাখির প্রতি সদয় ছিলেন। আমরা তাঁর দেখানো পথই অনুসরণ করি।’ এই বলে তিনি আর সেখানে দাঁড়িয়ে না থেকে নিজের কাজে রওনা দিলেন।
চারপাশে কৌতূহলী লোকজনের ভিড় বাড়ছে। পাখিওয়ালা কী করবে বুঝতে না পেরে নির্বাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে শাক্যর দিকে। প্রেমানন্দ শাক্যকে বললেন, ‘তাহলে গাড়ি ডাকি স্যার? থানায় নিয়ে গিয়ে যা ব্যবস্থা করার করব।’
শাক্য সম্মতি দিল তার কথায়। প্রেমানন্দ ফোন করতেই পুলিশের গাড়ি চলে এল। খাঁচাসমেত লোকটাকে গাড়িতে তুলে তারা রওনা হল পুলিশ চৌকির দিকে। লোকটা গাড়িতে ওঠার পর সারাটা পথ কোনও কথা বলল না। মাথা নিচু করে খাঁচাটার দিকে তাকিয়ে বসে রইল।
রাকেশ যাদবের চোখে মুখে তখন সাফল্যের উল্লাস। পরিবেশ রক্ষার একটা কাজ করতে পেরেছে সে। পুলিশ চৌকিতে পৌঁছে গাড়ি থেকে নামার পর রাকেশ যাদব বলে উঠল, ‘ওর হাত দুটো মেরে ভেঙে দেবেন স্যার। যাতে ও আর কোনও দিন পাখি ধরতে না পারে।’
শাক্যর কথা শুনে মনে হল, ছেলেটা পরিবেশ কর্মী হলেও তার কথাবার্তা এবার এক্তিয়ারের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাই সে রাকেশ যাদবকে বলল, ‘আপনাকে ধন্যবাদ। কিন্তু আপনার কাজ এখানেই শেষ। আপনি এবার আসতে পারেন। বাকি কাজটা আমরা বুঝে নেব। সরকারি কাজের সময় বাইরের লোককে অ্যালাও করা যাবে না।’
শাক্যর কথা শুনে কিছুটা আশাহত হয়েই পুলিশ চৌকি ছেড়ে বেরিয়ে গেল ছেলেটা।
৩
চৌকির একটা ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসল শাক্য আর পুলিশ অফিসার প্রেমানন্দ। সেই পাখি বিক্রেতাকে তাদের সামনে এনে দাঁড় করানো হল। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে সে। প্রেমানন্দ তাঁকে জিগ্যেস করলেন, ‘তোমার নাম কী? ঘর কোথায়?’
সে ধীরে ধীরে জবাব দিল, ‘আমার নাম বুদ্ধ সিং। টেম্পল রোড থেকে যে রাস্তাটা আশি ফুট বুদ্ধমূর্তির দিকে গেছে, সে রাস্তার এক পাশে আমি থাকি।’
‘বুদ্ধ সিং! তুমি কি বৌদ্ধ নাকি?’ আবার প্রশ্ন করল পুলিশ অফিসার।
‘তা ঠিক জানি না। ছোটবেলায় কে যেন আমাকে মন্দিরের সামনে ফেলে রেখেছিল। বাবা-মা’কে আমি দেখিনি।’
‘তোমার নাম বুদ্ধ, কিন্তু বুদ্ধুর মতো অন্যায় কাজ করো কেন? পাখি ধরো কেন?’
বুদ্ধ সিং জবাব দিল, ‘অন্যেরা পাখি ওড়ালে পুণ্য হবে তাই।’
এতক্ষণ পর শাক্য বলল, ‘কিন্তু তুমি যে পাখি ধরো তাতে তোমার পাপ হচ্ছে না? অন্য কোনও কাজ করতে পারো তো! সামান্য ক’টা টাকার জন্য অন্যকে পুণ্য দিয়ে নিজের পাপের বোঝা বাড়াচ্ছ কেন? জানো, এর জন্য তোমার বড় সাজা হতে পারে!’
বুদ্ধ সিং জবাব দিল, ‘জানি, পাখি ধরা পাপকাজ। কিন্তু এখন বয়স হয়েছে, অন্য কাজ করতে পারি না। তাই জাল দিয়ে পাখি ধরি। আমাকে ছেড়ে দিন বাবুরা।’
শাক্য এরপর আর কিছু জিগ্যেস করল না। এবার কী করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করার জন্য লোকটাকে ঘরের বাইরে যেতে বলল। সে বাইরে চলে যাবার পর প্রেমানন্দ বললেন, ‘স্যার এখন কী করব? কেস লিখে কোর্টে চালান করে দেব?’
শাক্য বলল, ‘দেখে মনে হচ্ছে লোকটা খুব গরিব। পেটের দায়ে এ কাজ করে। কেস দিলে তো ওকে এখন বেশ কয়েক বছর জেলের ঘানি টানতে হবে।’
পুলিশ অফিসার বললেন, ‘হ্যাঁ, আর ও পয়সা খরচ করে মামলা লড়ে বেরিয়ে আসার লোক নয়। হয়তো পরিবারের ভরণপোষণের জন্য কাজটা করে। ও জেলে গেলে তারাও জলে পড়বে। কিন্তু ধরে যখন আনা হয়েছে তখন এমনি এমনি তো আর ছাড়া যাবে না। কী করব বলুন স্যার! আপনি যেমন বলবেন তেমনই হবে।’
প্রেমানন্দর কথা শুনে শাক্য বুঝতে পারল, তিনি লোকটার ব্যাপারে কিছুটা সহানুভূতিশীল। এই বৃদ্ধ লোকটাকে নিয়ে কী করা যায় ভাবতে ভাবতে শাক্যর মাথায় হঠাৎ একটা পরিকল্পনা এল। সে পুলিশ অফিসারকে বলল, ‘একটা কাজ করা যেতে পারে। ও আর কোনওদিন পাখি ধরবে না—এই মর্মে ওকে মুচলেকা লিখিয়ে ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। তাতে সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না।’
শাক্যর নির্দেশমতোই কাজ করলেন পুলিশ অফিসার। মুচলেকার কাগজ তৈরি করা হল। বুদ্ধ সিংকে ডেকে বলা হল, ভবিষ্যতে যদি সে আবার এমন কাজ করে তবে তাকে হাজতবাস করতে হবে। বুদ্ধ সিং নিশ্চুপভাবে কাগজে টিপ ছাপ দিল।
তবে সে চলে যাওয়ার আগে তার পিঠের থলে থেকে পাখি ধরার জালটা বাজেয়াপ্ত করা হল। পাখি সমেত খাঁচাটাও রেখে দেওয়া হল। থানায় পুলিশ অফিসার প্রেমানন্দ শাক্যকে বললেন, তিনি সেই বিরাট বুদ্ধমূর্তির কাছে যে বড় বড় গাছের বাগান আছে সেখানে একজন লোক পাঠিয়ে পাখিগুলোকে ছাড়ার ব্যবস্থা করবেন।
৪
শাক্য নিজের থাকার জন্য একটা হোটেলের বন্দোবস্ত করেছিল। পুলিশ চৌকি থেকে ফিরে সেখানে খাওয়া সেরে একটা লম্বা ঘুম দিয়ে যখন সে উঠল তখন বিকাল হয়ে গেছে। মহাবোধি মন্দির আর আশি ফুট বুদ্ধমূর্তিটা দেখার জন্য হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়ল সে।
মূর্তির মাথাটা অনেক দূর থেকেই দেখা যায়। হোটেল ছেড়ে বেরিয়েই সেটা চোখে পড়ল তার। সেদিকে এগিয়ে বড় রাস্তা ছেড়ে একটা ছোট রাস্তা ধরল শাক্য। এক সময় সে এমন একটা জায়গায় এসে পড়ল, যেখানে ভাঙাচোরা সব ঘরবাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে কোথাও বেড়ার বা কোথাও মেটে দেওয়ালের ঘর। জায়গাটা বুদ্ধমূর্তির খুব কাছেই। এখান থেকে মূর্তিটা আরও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
শাক্য দেখল, মূর্তির মাথার ওপর অনেক পাখি উড়ছে। হয়তো ওগুলো সেই বুদ্ধ সিংয়ের পাখিগুলোই। তাদের তো এখানেই ছেড়ে দেওয়ার কথা। এসব ভাবতে-ভাবতেই হঠাৎ শাক্য দেখতে পেল বুদ্ধ সিংকে। কাছেই রাস্তায় পাশে একটা খড়ের ছাউনি দেওয়া ঘরের সামনে বসে কী যেন করছে!
শাক্য কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে গিয়ে তার ভাঙা ঘরটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। শাক্যকে চিনতে পেরে সে মাথা ঝুঁকিয়ে নমস্কার করে বলল, ‘এটাই আমার ঘর বাবু।’
শাক্য দেখল বুদ্ধ সিংয়ের হাতে একটা জাল ধরা। সে অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, ‘জাল দিয়ে তুমি কী করছ?’
বৃদ্ধ বুদ্ধ সিং অম্লানবদনে বলল, ‘একটা জাল তো পুলিশ চৌকিতে আপনারা জমা নিয়ে নিলেন। এটা ঘরে ছিল, জঙ্গলে গিয়ে পাতব। পাখি ধরা পড়বে।’ এই বলে ভাঙা দাঁত বার করে হাসল বৃদ্ধ।
শাক্য তার কথা শুনে বিরক্ত হয়ে বলল, ‘আবার পাখি ধরবে, এ কথা বলতে তোমার লজ্জা করছে না! আজই তো মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পেলে। এখন দেখছি, তোমাকে ছাড়াটাই আমাদের ভুল হয়েছে।’
সব শুনে নিরুত্তর রইল বুদ্ধ সিং।
শাক্য এরপর তাকে বোঝাবার জন্য বলল, ‘বেশ, ধরে নিলাম তোমার জেলে যাওয়ার ভয় নেই। কিন্তু তুমি জানো না, পাখি ধরা পাপ?’
বুদ্ধ সিং এবার দৃঢ় গলায় বলল, ‘হোক পাপ। আমি পাপ না করলে ওরা খাবে কী?’
ইতিমধ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে সাত-আট বছর বয়সি পাঁচ-ছ’জন বাচ্চা ছেলে। পরনে বিবর্ণ পোশাক। সম্ভবত বুদ্ধ সিংয়ের কোনও বিপদ হতে পারে আঁচ করে তারা ঘিরে দাঁড়াল তাকে।
শাক্য জিগ্যেস করল, ‘এই বাচ্চাগুলো কারা?’
বৃদ্ধ বলল, ‘এরা হয়তো কেউ বৌদ্ধ, কেউ হিন্দু, কেউ বা মুসলমান। তবে ওদের একটাই পরিচয়—ওরা অনাথ। মঠে-মন্দিরে কোথাও জায়গা হয় না ওদের। ওদের রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনেছি আমি। ওদের মুখে ভাত তুলে দেবার জন্যই আমি পাখি ধরি।
‘আপনি আমার পাপ-পুণ্যের কথা জিগ্যেস করছিলেন না! ওদের জন্য অন্যকে পুণ্য দিয়ে আমি পাপ করতে রাজি। ভগবান বুদ্ধ সব দেখছেন। তিনিই আমার যা করার করবেন।’
এই বলে বৃদ্ধ বুদ্ধ সিং তাকাল আকাশের দিকে। বেলা পড়ে এসেছে। শ্বেতশুভ্র বুদ্ধমূর্তির প্রকাণ্ড মুখমণ্ডলে তখন দেখা যাচ্ছে বিদায়ী সূর্যের শেষ আলো। বুদ্ধ সিংয়ের বলিরেখাময় মুখেও সেই আলোর রেশ খানিকটা পড়েছে। শাক্যর মনে হল, করুণাঘন চোখে তথাগতর মূর্তি যেন চেয়ে আছেন বুদ্ধ সিংয়ের দিকেই। যেন তিনি ওপর থেকে বুদ্ধ সিংকে বলছেন—‘তোমার সব পাপের ভার আমার।’
