নিশ্চুপ বুদ্ধ

নিশ্চুপ বুদ্ধ

১

বৈশালী নগরীর জেতবন বিহার। বুদ্ধশিষ্য অনাথপিণ্ডক তাঁর সর্বস্ব উজাড় করে রাজপুত্র জেতের কাছ থেকে এক বিশাল সুরম্য উদ্যান ক্রয় করে নিবেদন করেছেন করুণাময় বুদ্ধকে। নানা বৃক্ষ ও সরোবরসমৃদ্ধ উদ্যানে তথাগতর বর্ষাযাপনের জন্য নির্মাণ করেছেন তাঁর বাসস্থান—গন্ধকুটি। তাঁর পথপরিক্রমার সঙ্গীদের জন্য তৈরি করেছেন অতিথিনিবাস, সংঘগৃহ।

বর্ষাঋতুতে আশ্রয়গ্রহণের জন্য এমনই আর একটি কানন অবশ্য ইতিপূর্বেই তথাগতকে সমর্পণ করেছিলেন মগধ সম্রাট বিম্বিসার। রাজগৃহস্থিত সেই কাননের নাম বেণুবন। তবে বেশ কয়েক বছর ধরে বেণুবন অপেক্ষা জেতবনেই বর্ষা ঋতুর তিন মাস অতিবাহিত করতে পছন্দ করেন বুদ্ধদেব।

এ স্থানে তাঁর অবস্থানকাল অনাথপিণ্ডক তো বটেই, লিচ্ছবী বংশীয় বৈশালীরাজ থেকে শুরু করে অগণিত সাধারণ মানুষ মহামানবকে দর্শন করতে আসেন। তাঁর মুখ-নিঃসৃত সুক্ত, ধর্মকথা শ্রবণ করতে আসেন। তা শুনে তাঁদের আনন্দাশ্রু মিশে যায় বর্ষার বারিধারার সঙ্গে।

তেমনই এক বুদ্ধানুরাগী হলেন মালঙ্কপুত্ত। তবে তিনি শ্রমণ নন, গৃহী। সাধারণ মানুষের মতো তাঁর মনেও অনেক প্রশ্ন থাকে নানা বিষয় সম্পর্কে। মহাজ্ঞানী বুদ্ধদেবের থেকে তিনি সেসব প্রশ্নের উত্তর গ্রহণ করে পরিতৃপ্ত হন! আনন্দ ও শান্তি লাভ করেন।

আষাঢ়স্য প্রথম দিবসের কয়েক দিন পূর্বেই দীর্ঘ পথপরিক্রমা শেষে মহাজ্ঞানী এবারও এসে উপস্থিত হয়েছেন জেতবনে। যথারীতি বহু মানুষ তাঁকে দর্শন করবার জন্য উপস্থিত হচ্ছেন বিহারে। তার মধ্যে আছেন মালঙ্কপুত্তও। প্রত্যহ তিনি অনাথপিণ্ডকের ন্যায়ই মহাজ্ঞানীর দর্শনে যান। করুণাময়ের বাণী শ্রবণ করে জাগতিক দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তিলাভের পথ খোঁজেন।

বৈশালীরাজ বুদ্ধ অনুরাগী হলেও অন্য ধর্মের মানুষদের প্রতি তিনি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। এই বৈশালী মহাজনপদেই শত বৎসর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেছিলেন আর এক মহামানব। যিনি ‘কেবলজ্ঞান’ বা সর্বজ্ঞান অর্জন করেছিলেন। তিনি তীর্থঙ্কর মহাবীর। যাঁর প্রবর্তিত ধর্মভাবনা শত-সহস্র বৎসরকাল ধরে ষোড়শ মহাজনপদে প্রচলিত হয়ে আসছে।

এই ধর্মের অনুগামীরা ঈশ্বরবাদে, বিভিন্ন দেব-দেবীর আরাধনায় বিশ্বাসী। বৈশালী নগরীতে ধর্মীয় বিভেদ নেই। তাই সকলেই নিশ্চিন্তে বসবাস করেন, নিজেদের ধর্মপ্রচার ও পালন করেন। বৈশালীরাজ প্রয়োজনবোধে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের যেমন সাহায্য প্রদান করে থাকেন, অন্যদের ক্ষেত্রেও তাই করেন।

বহু মানুষ নির্গণ্ঠ সন্ন্যাসী ও ব্রাহ্মণদের কাছেও তাঁদের ধর্মকথা শুনতে উপস্থিত হন। বৈশালী নগরী থেকে যে প্রধান সড়ক জেতবনের প্রবেশ তোরণে এসে মিশেছে, সেই পথের পাশে জেতবনের সন্নিকটেই নির্গণ্ঠ সন্ন্যাসীদের একটি মঠ ও ব্রাহ্মণকুলের একটি আবাসস্থল পাশাপাশি অবস্থান করছে।

কিন্তু বর্ষা ঋতুতে যে তিন মাস বুদ্ধদেব জেতবনে অবস্থান করেন, সেই তিন মাস বর্ষার বারিধারা উপেক্ষা করে জনস্রোত ধাবিত হয় জেতবনেতেই। নির্গণ্ঠ সন্ন্যাসীদের মঠ বা ব্রাহ্মণদের আবাসস্থলের যাগ-যজ্ঞ ইত্যাদি অনুষ্ঠানে সাধারণ নাগরিকদের উপস্থিতি সেই সময় নগণ্য হয়ে ওঠে।

ব্রাহ্মণদের ধর্মভাবনার সঙ্গে নির্গণ্ঠ বা বৌদ্ধ ধম্মভাবনার পার্থক্য অনেক। কিন্তু ষোড়শ মহাজনপদে মহাজ্ঞানী বুদ্ধের চিন্তা ও ধম্মভাবনার উত্থানই, নির্গণ্ঠ সন্ন্যাসী ও ব্রাহ্মণদের পরস্পরের অনেক কাছে এনে দিয়েছে।

তাঁরা বুঝে উঠতে পারছেন না, এই জম্বুদ্বীপের মাটিতে শত-সহস্র বৎসর ধরে বিকশিত ব্রাহ্মণ্যধর্ম বা যুগপুরুষ তীর্থঙ্কর মহাবীরের ধর্মভাবনার পরিবর্তে কেন মানুষ তথাগতর ভাবনাকে বরণ করে নিচ্ছে? মগধ, বৈশালী, পাবা, মল্ল প্রভৃতি মহাজনপদের রাজন্যবর্গ কেন বুদ্ধের শরণ গ্রহণ করছেন? কী আছে অমিতাভর বাণীতে? কী আছে তাঁর ‘ধম্ম’ ভাবনায়?

২

সেদিন বিকেলে বুদ্ধভক্ত মালঙ্কপুত্ত প্রধান সড়ক বেয়ে জেতবনে মহাজ্ঞানীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসছিলেন। হঠাৎ সারা আকাশ ছেয়ে গেল বর্ষার কালো মেঘে। তারপর বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নামল।

পথের পাশেই নির্গণ্ঠ ও ব্রাহ্মণদের আবাসস্থল। তার মধ্যবর্তী স্থানে একটা প্রস্তরনির্মিত ছত্রি দেখতে পেয়ে বর্ষণের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করবার জন্য মালঙ্কপুত্ত সে স্থানে গিয়ে উপস্থিত হলেন। ছত্রির নীচে পাথরের বেদিতে বসে মত বিনিময় করছিলেন এক ব্রাহ্মণ ও এক নির্গণ্ঠ সন্ন্যাসী। তাঁদের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল, কেন দলে দলে মানুষ তাঁদেরকে ছেড়ে বুদ্ধসমীপে উপস্থিত হচ্ছেন?

মালঙ্কপুত্ত সে স্থানে গিয়ে উপস্থিত হতেই তাঁরা আলোচনা থামিয়ে তাঁকে নিরীক্ষণ করতে লাগলেন। তারপর এক সময় নির্গণ্ঠ সন্ন্যাসী তাঁর উদ্দেশে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমাকে প্রায়শই এ পথে যাওয়া আসা করতে দেখি, কোথায় যাও তুমি?’

মালঙ্কপুত্র জবাব দিলেন, ‘আমি জেতবনে যাই মহাজ্ঞানী বুদ্ধের দর্শনলাভ করতে, তাঁর অমৃতবাণী শুনতে।’

‘তা শ্রবণ করে তোমার কী লাভ হয়?’ প্রশ্ন করলেন নির্গণ্ঠ সন্ন্যাসী।

‘মনে প্রশান্তি জাগে। দুঃখ-যন্ত্রণা দূর হয় মহাজ্ঞানীর কথা শুনলে। জীবনের সার সত্য উপলব্ধি হয় তাঁর আর্য সত্য শুনলে।’ জবাব দিলেন মালঙ্কপুত্ত।

ব্রাহ্মণ বললেন, ‘বুদ্ধের বলা সত্যগুলো কী শুনি?’

মালঙ্কপুত্ত বললেন, ‘মহাজ্ঞানী বলেন, ‘‘দুঃখ আছে, দুঃখের কারণও আছে, দুঃখের নিরোধ বা নিবৃত্তিও আছে, এবং দুঃখ নিবৃত্তির পথও আছে।” এই হল তাঁর চার আর্য সত্য।’

ব্রাহ্মণ আবার প্রশ্ন করলেন, ‘দুঃখ নিবৃত্তির জন্য তিনি কী করতে বলেন?’

‘তার জন্য মহাজ্ঞানী আটটি পথের কথা বলেছেন। সেই অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুসরণ করলে যাবতীয় জাগতিক দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তিলাভ অর্থাৎ নির্বাণলাভ সম্ভব।’ এ কথা বলার পর মালঙ্কপুত্ত তাদের অষ্টাঙ্গিক মার্গের সূত্রগুলোও বললেন।

কথাগুলো শুনে ব্রাহ্মণ ব্যঙ্গের সুরে বললেন, ‘তোমাদের বুদ্ধ দেখছি ঈশ্বরে বিশ্বাসী নন! জেনে রাখো, একমাত্র দেবতাদের তুষ্ট করতে পারলেই দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তিলাভ সম্ভব। নচেৎ নয়।’

নির্গণ্ঠ সন্ন্যাসীও বললেন, ‘এ কেমন ধর্মমত? যেখানে কঠিন কৃচ্ছ্রসাধনের কথা বলা হচ্ছে না? কৃচ্ছ্রসাধন না করলে কি মুক্তি মেলে?’

তাঁদের কথা শুনে মালঙ্কপুত্ত দৃঢ় গলায় বললেন, ‘তথাগত বুদ্ধ, তিনি মহাজ্ঞানী। তিনি যা বলেন, তা নিশ্চয়ই সত্য।’

ব্রাহ্মণ বললেন, ‘তাঁর বাণী শুনে তো আমার মনে হচ্ছে, জগৎ-সংসার সম্পর্কে তাঁর কোনও ধারণাই নেই। নইলে ঈশ্বরের অস্তিত্ব কেউ অস্বীকার করে! এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তো তাঁর দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত।’

নির্গণ্ঠ সন্ন্যাসী বললেন, ‘একমাত্র ত্রিরত্নই আত্মার মুক্তির পথ হতে পারে, অন্য কিছু নয়।’

স্বাভাবিক কারণেই সেই সন্ন্যাসী ও ব্রাহ্মণ নিজ নিজ ভাবনাকে তথাগতর ভাবনার চেয়ে উচ্চমার্গে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য নানা কথা বললেন মালঙ্কপুত্তকে।

কিন্তু সব কিছু শোনবার পরেও মালঙ্কপুত্ত নিজ ভাবনায় অবিচল থেকে বললেন, ‘শাক্যমুনি বোধিলাভ করেছেন। তিনি মহাজ্ঞানী। তাঁর প্রদর্শিত মুক্তিলাভের পথ, নির্বাণলাভের পথ কখনও মিথ্যা হতে পারে না। তিনি সমস্ত প্রশ্নের উত্তর জানেন।’

এবার মালঙ্কপুত্তর কথা শুনে ব্রাহ্মণ কিছুটা ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, ‘তিনি সব প্রশ্নের উত্তর জানেন? তবে আমি কিছু অতি সাধারণ প্রশ্ন করছি তোমাকে। যা মানুষের মনে নিরন্তর ঘুরে বেড়ায়। জগৎবিষয়ক, আত্মাবিষয়ক আর মুক্তি বা নির্বাণবিষয়ক। যদি তোমার মহাজ্ঞানী সে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর তোমাকে দিতে পারেন, তাহলে বুঝবে তিনি প্রভূত জ্ঞানের অধিকারী। নচেৎ নয়।’

এরপর ব্রাহ্মণ কিছুটা ভাবনা-চিন্তা করে মালঙ্কপুত্তকে দশটা প্রশ্ন করলেন তথাগতর থেকে জানার জন্য।

এরপর বৃষ্টি যখন থামল, তখন অন্ধকার নেমে গেছে। এ সময় ধ্যানে বসবেন বুদ্ধদেব। তাই মালঙ্কপুত্ত আর জেতবনে না গিয়ে নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করলেন।

গৃহে ফিরে তিনি ব্রাহ্মণের বলা প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবতে ভাবতে একটা বিষয় অনুভব করলেন যে, এইসব প্রশ্ন তো তার মনেও মাঝে মাঝে উদয় হয়! হয়তো বা সব মানুষের মধ্যেই এই জিজ্ঞাস্য আছে। তবে তথাগত মহাজ্ঞানী, তিনি নিশ্চয়ই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন।

৩

পরদিন ভোরের আলো ফুটল। মালঙ্কপুত্ত নিজ গৃহ ছেড়ে রওনা হলেন তথাগতর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য। পথে তাঁর সঙ্গে দেখা হল বুদ্ধ নিবেদিতপ্রাণ অনাথপিণ্ডকের। তিনিও একই স্থানে যাচ্ছেন। মালঙ্কপুত্ত তাঁকে বললেন, ‘আমি আজ মহাজ্ঞানীর কাছ থেকে কিছু প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইব। সাধারণ কিছু প্রশ্ন। যে প্রশ্নগুলি সম্ভবত সবার মনেই খেলা করে।’

অনাথপিণ্ডক বললেন, ‘মহাজ্ঞানী নিশ্চয়ই আপনার প্রশ্নের যথোপযুক্ত উত্তর দেবেন।’

তাঁরা দু’জন জেতবনে প্রবেশ করে বুদ্ধদেবের রাত্রিবাসের স্থান গন্ধকুটিতে উপস্থিত হলেন। গন্ধকুটির সম্মুখে একটা প্রাচীন বৃক্ষ আছে, যে স্থানে বসে মহাজ্ঞানী তাঁর ধর্মকথা শোনান, দর্শনার্থীদের প্রশ্নের উত্তর দেন। সেই বৃক্ষতলে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর দুই ছায়াসঙ্গী ভিক্ষু সারিপুত্ত ও ভিক্ষু আনন্দর সঙ্গে।

গন্ধকুটিকে কেন্দ্র করে ইষ্টকনির্মিত একটা বৃত্তাকার পথ আছে। যে পথে পদচারণা করেন বুদ্ধদেব। তারই উপক্রম করছিলেন তিনি। সেই সময় অনাথপিণ্ডক আর মালঙ্কপুত্ত তাঁর সামনে উপস্থিত হয়ে প্রণাম জানালেন তাঁকে।

সাধারণত মালঙ্কপুত্ত সারাদিন নিজ কর্ম সম্পাদনের পর বিকালে মহাজ্ঞানীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন। এদিন প্রাতঃকালে তাঁকে উপস্থিত হতে দেখে তথাগত অনুমান করলেন, নিশ্চয়ই কোনও বিশেষ কারণে তিনি এ সময় এ স্থানে উপস্থিত হয়েছেন। অমিতাভ তাঁকে প্রশ্ন করলেন, ‘অদ্য তোমার এ সময়ে আগমন কোনও বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে কি?’

মালঙ্কপুত্ত বললেন, ‘হ্যাঁ, নরশ্রেষ্ঠ। আমার আপনার নিকট কিছু প্রশ্নের উত্তর জানবার আছে। কাল সারারাত্রি আমার মনে প্রশ্নগুলো জাগ্রত ছিল। তাই প্রভাতকালেই আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছি কৌতূহলের নিবৃত্তি ঘটানোর জন্য। দয়া করে যদি আপনি সেসব প্রশ্নের উত্তর দেন, তবে আমি কৃতার্থ হব।’

জ্ঞানতাপস হেসে জানতে চাইলেন, ‘তোমার জিজ্ঞাস্য কী বিষয়ে?’

মালঙ্কপুত্ত জবাব দিলেন, ‘জগৎ, আত্মা ও নির্বাণ বিষয়ে।’

মহাজ্ঞানী বললেন, ‘চলো, সকলে মিলে পদচারণা করতে করতে তোমার প্রশ্নগুলো শুনি।’

চারজনকে নিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন তথাগত। কিছুটা পা চলবার পর মালঙ্কপুত্ত জগৎবিষয়ক চারটি প্রশ্ন করলেন।

তিনি বললেন—

‘হে মহাজ্ঞানী, জগৎ কি নিত্য?

জগৎ কি অনিত্য?

জগৎ কি সসীম?

জগৎ কি অসীম?’

মালঙ্কপুত্ত’র এ প্রশ্নগুলোর কোনও উত্তর না দিয়ে ধীর পায়ে চলতে লাগলেন বুদ্ধদেব। আলো ঝলমলে প্রভাতে, গতকালের বৃষ্টিধৌত সবুজ পাতার ফাঁক দিয়ে প্রভাতি সূর্যকিরণ এসে পড়েছে তাঁদের চলার পথে। কী সুন্দর এই পৃথিবী! তথাগত যেন চলতে চলতে বিশ্বপ্রকৃতির সেই শোভাই উপভোগ করতে লাগলেন।

চক্রাকারে আরও কিছুটা পথ অতিক্রম করার পর মালঙ্কপুত্ত তাঁকে এবার দেহ ও আত্মাবিষয়ক দু’টি প্রশ্ন করলেন। তিনি বললেন—

‘হে, জ্ঞানতাপস, আত্মা আর শরীর কি অভিন্ন?

আত্মা আর শরীর কি ভিন্ন?’

মুহূর্তের জন্য থামলেন বুদ্ধদেব। কারণ তাঁর দৃষ্টি গিয়ে পড়েছে পথপার্শ্বে কাকচক্ষু সরোবরের ধারে এক সারসদম্পতির প্রতি। প্রেমালাপে মত্ত তারা। এবারও তিনি মালঙ্কপুত্তর এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পুনরায় হাঁটতে শুরু করলেন।

তাঁরা তখন চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে আবার পৌঁছে গেছেন গন্ধকুটির কাছাকাছি। মহাজ্ঞানী নিরুত্তর দেখে মালঙ্কপুত্ত খানিক ইতস্তত করছেন বাকি প্রশ্নগুলো জিগ্যেস করবেন কিনা। ঠিক এমন সময় এক শ্রমণ এসে বার্তা দিল যে, এক বৃদ্ধ শ্রমণ বয়সজনিত কারণে জাগতিক দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তিলাভ করেছেন। অর্থাৎ মৃত্যু হয়েছে তাঁর।

ভিক্ষু আনন্দ সেই ব্যক্তিকে জানালেন, কিছু সময়ের মধ্যেই তিনি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। মৃত্যুসংবাদ শুনে কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইলেন করুণাময়। তারপর আবার হাঁটতে শুরু করলেন। সকলে মিলে এসে উপস্থিত হলেন গন্ধকুটির বৃক্ষতলে। মহাজ্ঞানী উপবেশন করলেন সে স্থানে।

সেই ভিক্ষুর নির্বাণলাভের সংবাদ মালঙ্কপুত্তকে উদ্‌গ্রীব করে তুলল মৃত্যু ও নির্বাণবিষয়ক প্রশ্নগুলো জানার জন্য। তিনি বললেন, ‘আমাকে মার্জনা করবেন মহাবোধি। আমি মৃত্যু ও নির্বাণবিষয়ক চারটি প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য বড় কৌতূহল অনুভব করছি। আপনি কৃপাপূর্বক আপনার জ্ঞানের আলোকে আমার এই কৌতূহলের নিরসন ঘটান। হে নাথ,

তথাগতর কি মৃত্যুর পর পুনর্জন্ম হয়েছে?

তথাগতর কি মৃত্যুর পর পুনর্জন্ম হয়নি?

তথাগতর পুনর্জন্ম হওয়া বা না হওয়া কি সত্য?

তথাগতর পুনর্জন্ম হওয়া বা না হওয়া কি অসত্য?’

শুধু মালঙ্কপুত্তই নয়। উপস্থিত অন্য তিনজনও এবার উর্দগ্রীব হয়ে তাকালেন জ্ঞানতাপসের দিকে। তাঁরা সবাই ভাবলেন, এবার নিশ্চয়ই মহাজ্ঞানী একে একে সব প্রশ্নের উত্তর দেবেন। কিন্তু তা ঘটল না। মহামানব কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইলেন তাঁর অনুরাগী ভক্ত-ভিক্ষুদের দিকে। তারপর চক্ষু মুদে ধ্যানস্থ হলেন।

তবে কি মহাজ্ঞানীর জানা নেই এই দশটি প্রশ্নের উত্তর? কেন তিনি স্তব্ধ, নিরুত্তর?—এ কথা ভাবতে ভাবতে সকলে অন্যত্র চলে গেলেন যাতে বুদ্ধদেবের ধ্যানের কোনও ব্যাঘাত না হয়।

৪

সারিপুত্ত আর আনন্দ যখন মহাজ্ঞানীর কাছে ফিরে এলেন, তখন তাঁর ধ্যান ভঙ্গ হয়েছে। বেলাশেষের আলোয় উজ্জ্বল বর্ণ ধারণ করেছে তাঁর মুখমণ্ডল। দুই ভিক্ষু এসে বুদ্ধদেবের সম্মুখে দাঁড়ালেন, যদি তিনি কোনও আদেশ প্রদান করেন সে জন্য। তবে তাঁদের মনেও উঁকি দিচ্ছে মালঙ্কপুত্তর সেই প্রশ্নগুলো।

মহাজ্ঞানী বিষয়টা অনুমান করতে পারলেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটে উঠল। তিনি ভিক্ষুদ্বয়ের উদ্দেশে বললেন, ‘তোমরা হয়তো ভাবছ, আমি মালঙ্কপুত্তর প্রশ্নের উত্তর দিইনি কেন! কারণ ওই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবার ক্ষেত্রে আমার নিশ্চুপ থাকাই শ্রেয় বলে মনে হয়েছে।

‘ধরো, কোনও ব্যক্তি শরবিদ্ধ হয়েছে। তখন সর্বাগ্রে তার চিকিৎসার প্রয়োজন, নাকি এটা জানা প্রয়োজন যে সেই শর কে নিক্ষেপ করেছে? কোন দিক থেকে নিক্ষেপ করেছে? কে সেই শর নির্মাণ করেছে?’

এই বলে কিছুক্ষণ স্তব্ধ রইলেন বুদ্ধদেব। তারপর পুনরায় মৃদু হেসে বললেন, ‘সর্বাগ্রে তার চিকিৎসারই প্রয়োজন। কারণ এ সমস্ত প্রশ্নের সঙ্গে তার চিকিৎসার কোনও সম্পর্ক নেই। তেমনভাবেই আমি তোমাদের নির্বাণলাভের জন্য যে পথ অনুসরণ করবার কথা বলি তার সঙ্গে মালঙ্কপুত্তর প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা বা না জানা গুরুত্বহীন। তাই আমি নিরুত্তর ছিলাম।’

ভিক্ষু সারিপুত্ত এবং ভিক্ষু আনন্দ তথাগতর এ কথা শুনে, তার গুরুত্ব উপলব্ধি করে প্রণাম জানালেন তাঁকে।

বুদ্ধের নীরবতার এই কাহিনি প্রাচীন পালি গ্রন্থ ‘কুলা-মালুঙ্কা সুত্ত’-এ বর্ণিত আছে। পালি গ্রন্থে এই প্রশ্নের সংখ্যা দশটি হলেও কিছু সংস্কৃত গ্রন্থে এই নিরুত্তর প্রশ্নের সংখ্যা ষোলো বলা হয়েছে। প্রশ্নগুলোর ক্ষেত্রে বুদ্ধদেবের এই নীরবতার কারণেই ‘নিশ্চুপ বুদ্ধ’ বা ‘সাইলেন্ট বুদ্ধ’ কথাটির উৎপত্তি হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *