ক্ষমাহীন ক্ষমাময়
মগধ। জম্বুদ্বীপের ষোড়শ মহাজনপদের মধ্যে বৈভবে, সামরিক শক্তিতে, রাজনৈতিক প্রতিপত্তিতে সর্বশ্রেষ্ঠ। বর্তমানে হর্যঙ্কবংশীয় নৃপতি বিম্বিসার মগধের সিংহাসন অলঙ্কৃত করছেন। মগধের রাজধর্ম—‘বৌদ্ধধম্ম’।
রাজ্যের দু’টি স্থানে মহারাজ বিম্বিসার পর্যায়ক্রমে অবস্থান করেন। তার একটি গঙ্গার নিকটবর্তী নগরী পাটলিপুত্র ও অপরটি রাজগৃহ। নৃপতি যখন যেখানে বাস করেন, সে স্থানই তখন তার রাজধানী বলে বিবেচিত হয়।
বর্তমানে মহারাজের প্রিয় নগরী হয়ে উঠেছে রাজগৃহ। এই স্থানেই একদা মহাজ্ঞানী অমিতাভর সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ হয়। তিনি তাঁর উপদেশাবলি গ্রহণ করেন। রাজগৃহে বহু ভিক্ষু শ্রমণের বাস। বিম্বিসার বেণুবন নামক সরোবর সমন্বিত বাঁশের বন দান করেছেন সংঘকে।
বুদ্ধের চরণে নিবেদিতপ্রাণ মহারাজ বিম্বিসার, মহাজ্ঞানীর নখ ও কেশ সংগ্রহ করে তাঁর প্রাসাদকাননে দু’টি মর্মরস্তূপ নির্মাণ করিয়েছেন। প্রতি সন্ধ্যায় সেই দু’টি স্তূপে ধূপ ও প্রদীপ সহযোগে বুদ্ধবন্দনা করা হয়।
আজ এক আনন্দমুখর দিন। রাজকুমার অভয় পঞ্চম বর্ষে পদার্পণ করেছে। সেই উপলক্ষে রাজবংশের প্রাচীন প্রথা মেনে অভয়ের তিলকদান বা টিকাদান অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে।
বিম্বিসারের পাঁচ পত্নী—কৌশল্যা দেবী, চেল্লানা, ক্ষেমা, নন্দিতা ও পদুম্পাবতী। মহারাজের জ্যেষ্ঠ পুত্র জন্ম নিয়েছেন বৈশালীর লিচ্ছবি, রাজকন্যা মহারাজের দ্বিতীয় পত্নীর গর্ভে। তাঁর নাম অজাতশত্রু। বর্তমানে যুবা বয়সে পদার্পণ করেছে সে। তৃতীয় পত্নী মদ্রদেশের রাজকন্যা ক্ষেমা বা অম্বাপালীর গর্ভে জন্ম নিয়েছে দ্বিতীয় কুমার কোন্ডল। আর কনিষ্ঠা পত্নী পদুম্পাবতী বা পদ্মাবতী জন্ম দিয়েছেন অভয়কে। পদ্মাবতীর অবশ্য অন্য রানির মতো ‘রাজকন্যা’-র পরিচয় বা বংশমর্যাদা নেই। তিনি মহারাজের সভার নর্তকী ছিলেন। মহারাজ তার রূপে আকৃষ্ট হয়ে তাকে বিবাহ করেন।
রাজগৃহ বুদ্ধের পদধূলিতে ধন্য। তাই মহারাজ এই স্থান নির্বাচন করেছেন পুত্রের মাঙ্গলিক কাজ সম্পন্ন করার জন্য। রাজকোষ আজ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে দুঃখী আতুরদের সেবার উদ্দেশ্যে। সহস্র মানুষ আজ পরমান্ন ভক্ষণ করেছেন। বৌদ্ধ শ্রমণদের ভিক্ষাপাত্র আজ পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে মহারাজ বিম্বিসারের দানসামগ্রীতে। গোটা নগরীতে আজ খুশির প্রবাহ।
কিন্তু এই আনন্দঘন পরিবেশেও মহারাজের প্রাসাদের অনতিদূরে এক কক্ষে একাকী বসে আছেন একজন। রাজপ্রাসাদের সন্নিকটে এক স্থানে পাঁচশত তিরন্দাজ নিয়ে বসবাস করেন তিনি। যুবাবয়স প্রাপ্ত হলে পিতা তাকে পাঁচশত তিরন্দাজের অধিপতি করেছেন। মহারাজ যখন এ নগরী ছেড়ে পাটলিপুত্র গমন করেন, তখন এই তিরন্দাজ বাহিনীই রাজগৃহ নগরীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকে। তারা কুমার অজাতশত্রুর একান্ত অনুগত ও বিশ্বস্ত।
একাকী যিনি কক্ষে বসেছিলেন, তিনি বিম্বিসারপুত্র অজাতশত্রু। উন্মুক্ত গবাক্ষ দিয়ে তিনি বাইরের চলমান জনজীবনের প্রতি লক্ষ্য রাখছিলেন। রাজপ্রাসাদ থেকে দানসামগ্রী গ্রহণ করে নিজ নিজ বাসস্থান বা সংঘের দিকে ফিরে চলেছে কলহাস্যমুখর পুরবাসী ও বৌদ্ধ শ্রমণদের দল।
কিন্তু সেই আনন্দের লেশমাত্র নেই অজাতশত্রুর মনে। এক অদ্ভুত বিষণ্ণতায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে তাঁর মন। এমন সময় দ্বারী বার্তা নিয়ে এল—একজন সাক্ষাৎ করতে এসেছেন তাঁর সঙ্গে। আগন্তুকের নাম শোনামাত্রই তাঁকে যথাযথ সম্মানের সঙ্গে নিজ কক্ষে আনয়নের নির্দেশ দিলেন কুমার।
এই সাক্ষাৎপ্রার্থী আর কেউ নন, রাজবংশজাত ও সর্বোপরি কুমার অজাতশত্রুর পরম বান্ধব। একদা তক্ষশীলাতে কয়েক বৎসরকাল তাঁরা দু’জন শিক্ষাগ্রহণ করেছেন।
কিছু সময়ের মধ্যেই এক দীর্ঘদেহী পুরুষ প্রবেশ করলেন কুমার অজাতশত্রুর কক্ষে। তিনি শাক্যবংশীয় কুমার দেবদত্ত। একইসঙ্গে তাঁর আরও একটি পরিচয় আছে। তিনি বুদ্ধের জ্ঞাতি ভ্রাতা।
দেবদত্তকে আলিঙ্গন করে তাঁকে আসনে উপবেশন করালেন কুমার। বহু দূরের পাহাড়ি জনপদ কপিলাবস্তু নগরী থেকে এসেছেন কুমার দেবদত্ত। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষুধার্ত। কুমার অজাতশত্রুও আজ সারাদিন আহার গ্রহণ করেননি। তাই অতি সত্বর উৎকৃষ্ট মদিরা ও মৃগমাংস আনার নির্দেশ দিলেন তিনি।
মুখোমুখি আসনে বসে অজাতশত্রু বললেন, ‘সব কুশল তো বন্ধু?’
দেবদত্ত বললেন, ‘শরীর স্বাস্থ্য ঠিকই আছে, তবে মনটা মাঝে-মাঝেই বিষণ্ণ হয়ে ওঠে। বন্ধু, আপনি তো জানেনই কোলীয় রাজকন্যা যশোধরাকে বিবাহ করার জন্য আমি কতটা আগ্রহী ছিলাম! যশোধরার পিতা কোলীয়রাজ সুপ্পবুদ্ধও এ ব্যাপারে সম্মত ছিলেন। কিন্তু রাজা শুদ্ধোধন বাধা দিলেন। গৌতমের সঙ্গেই তার বিবাহ দিলেন। যদিও তা বহু বৎসর পূর্বের ঘটনা।
‘বর্তমানে আবার এক নতুন উপদ্রব তৈরি হয়েছে। আমি বুদ্ধের “ধম্ম’’ গ্রহণে অসম্মত হয়েছি বলে কপিলাবস্তুর অনেকেই আমার সঙ্গে আর তেমন বাক্যালাপ করে না। আমি শুনেছি, অনেকেই নাকি আমাকে নিয়ে আড়ালে বিদ্রুপ করে। এসব কারণেই বেশ কিছু দিন ধরে মনে মনে অস্থির হয়ে উঠেছি। তাই ভাবলাম রাজগৃহে এসে বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তাতে মনের আরাম হবে।’
অজাতশত্রু বললেন, ‘উত্তম কাজ করেছেন।’
কুমার দেবদত্ত বান্ধব কুমার অজাতশত্রুর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কিন্তু আপনাকে এত বিষণ্ণ দেখাচ্ছে কেন? নগরীতে তো এখন উৎসবের পরিবেশ! আমি প্রথমে প্রাসাদেই গিয়েছিলাম আপনার অন্বেষণে। কিন্তু গিয়ে শুনলাম আপনি সেখানে পদার্পণ করেননি। কিন্তু সমগ্র নগরী যখন আনন্দ উৎসবে মত্ত তখন আপনি একাকী এ কক্ষে বসে আছেন কেন কুমার?’
অজাতশত্রু খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন, তারপর বললেন, ‘প্রাতঃকালে আমি স্নান সেরে, শুদ্ধবস্ত্র পরিধান করে তিলকদান উৎসবের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম। এমন সময় মন্ত্রী নন্দক এসে জানালেন, আমাকে যে বিশেষ কারণে প্রাসাদে যেতে বলা হয়েছিল, তার আর আবশ্যিকতা নেই। তবে অন্য সবার মতো আমিও এই মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারি। এ কথা শোনার পর আমি আর প্রাসাদে যাইনি।’
ইতিমধ্যে দাসী আহার ও পানীয় নিয়ে প্রবেশ করল কক্ষে। অজাতশত্রু তাকে কক্ষত্যাগের নির্দেশ দিলেন। কারণ তিনি চান না যে দুই বন্ধুর ঘনিষ্ঠ বাক্যালাপ তৃতীয় কেউ শ্রবণ করুক। দাসী কক্ষ থেকে অন্তর্হিত হবার পর অজাতশত্রু নিজেই খাদ্য-পানীয় পরিবেশন করলেন।
শাক্যকুমার তাঁকে জানালেন চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি কিছুকাল সোমরস পান থেকে বিরত আছেন। তিনি শুধুমাত্র খাদ্য গ্রহণ করবেন, মদিরা নয়।
আহার শুরু হল। দেবদত্ত খেয়াল করলেন আজ যেন কুমার অজাতশত্রু সোমরসের প্রতি একটু বেশিই আকৃষ্ট হয়ে পড়েছেন। তাঁর মনে হয়তো কোনও কারণে ক্ষোভ বা যন্ত্রণার সৃষ্টি হয়েছে। দেবদত্ত বললেন, ‘মনে হচ্ছে কুমারের মন আজ বড় বিচলিত। আপনি যদি আমাকে প্রকৃত অর্থেই মিত্র ভাবেন, আপনার হিতাকাঙ্ক্ষী ভাবেন, তবে আমার কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। দেখি আমি আপনাকে কোনও পরামর্শ দিতে পারি কিনা?’
সোমরসের পাত্রে চুমুক দিয়ে বন্ধুর প্রশ্নের জবাবে মুখ খুললেন অজাতশত্রু। তিনি বললেন, ‘আপনি হয়তো জেনেছেন যে আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা অভয়ের তিলকদান অনুষ্ঠান ছিল। হর্যঙ্ক রাজবংশের প্রচলিত নিয়ম অনুসারে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয় তিলকদানের জন্য। কারণ, জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা পিতার সমান। আমাকেও সেই অনুরোধ জানিয়েছিলেন মহারাজ। আমিও তাঁর প্রস্তাবে সম্মত হয়েছিলাম। কিন্তু, আজ সকালে মন্ত্রী এসে জানালেন, অভয়ের তিলকদান করবেন মহারাজ ও বিমাতা অম্বাপালী-পুত্র, আমার মধ্যম ভ্রাতা কোন্ডল। আর সেভাবেই অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে…।’
দেবদত্ত মৃদু বিস্ময়ের সঙ্গে জানতে চাইলেন, ‘মহারাজ হঠাৎ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেন কেন?’
এ প্রশ্নের জবাবে অজাতশত্রু প্রথমে তার দক্ষিণ হস্তের কনিষ্ঠা তুলে ধরে দেখালেন। তারপর বললেন, ‘কারণ, আমি খুঁতযুক্ত বলে। যে কারণে আমাকে লোকে আড়ালে কুনিক বলে ডাকে। প্রাসাদে আমার এক গুপ্তচর আছে। তার মাধ্যমে জানতে পেরেছি বিমাতা অম্বাপালী নাকি বিমাতা পদুম্পাবতীকে পরামর্শ দিয়েছেন যে কোনও খুঁতযুক্ত ব্যক্তি যদি অভয়কে তিলকদান করে, তা অমঙ্গলসূচক হবে। তার এ কথা শুনে বিমাতা পদুম্পাবতী ভীত হয়ে পড়েন। এবং মহারাজকে গতকাল রাতে বলেন যে, আমার
পরিবর্তে যেন মধ্যম ভ্রাতা কোন্ডলকে দিয়েই তিলকদান সম্পন্ন করানো হয়। আর পিতা বিম্বিসার সে প্রস্তাব মেনে নেন।’ এই বলে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন কুমার অজাতশত্রু।
দেবদত্ত বললেন, ‘অনেকে আপনাকে কুনিক বলে সম্বোধন করেন, তা আমি শুনেছি। বিশেষত বৌদ্ধ ভিক্ষুরা। আমিও আপনার ওই ক্ষতচিহ্ন বহুকাল ধরেই খেয়াল করেছি। পাছে আপনি বিব্রত হন বা দুঃখ পান তাই ওই কর্তিত আঙুল সম্পর্কে আপনাকে কখনও কিছু জিজ্ঞাসা করিনি। কিন্তু আজ ওই কনিষ্ঠ অঙ্গুলির বিষয়ে জানতে বড় কৌতূহল হচ্ছে।’
২
নতুন এক পাত্র মদিরা গলাধঃকরণের পর অজাতশত্রু বললেন, ‘বন্ধুকে সে কাহিনি বলতে আপত্তির কিছু নেই। তবে শুনুন, আমার জন্মের সময়কার সে কাহিনি। আমার মাতা লিচ্ছবীকন্যা চেল্লানা তখন পূর্ণ গর্ভবতী। আর কয়েক দিনের মধ্যেই সন্তান প্রসব করবেন তিনি। কিন্তু কোনও খাদ্যেই রুচি নেই তাঁর। বিচলিত মহারাজ স্ত্রীর খাদ্যের প্রতি অনীহা দেখে রাজবৈদ্যের সঙ্গে আলোচনা করলেন। রাজবৈদ্য বললেন, শশকের হৃৎপিণ্ড মাতা চেল্লানার রুচি ফেরাতে পারে।
‘একান্ত আলাপচারিতায় পিতা মাতাকে বললেন, “কোন খাদ্য ভক্ষণ করলে তোমার মুখের রুচি ফিরবে বলো তো?”
‘মাতা চেল্লানা প্রশ্ন শুনে বললেন, “কোনও খাদ্যেই রুচি ফিরবে বলে মনে হয় না। তবে কোনও এক কাহিনিতে শুনেছিলাম মানুষের হৃৎপিণ্ড ভক্ষণ করলে নাকি মুখের রুচি ফেরে। কিন্তু, তা তো আর সম্ভব নয়।”
‘তাঁর কথা শুনে রাজা বিম্বিসারের মনে হঠাৎই কৌতুক করার ইচ্ছা জাগ্রত হল। তিনি আর রাজবৈদ্যের পরামর্শের কথা রানিকে জানালেন না। কিন্তু তাঁর কথামতো পথ্য প্রস্তুত করে খাওয়ালেন। এবং তার ফলে মাতার মুখের রুচি ফিরে এল। আমার জন্মের পূর্ব দিবসে মহারাজ বিম্বিসার যখন তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলেন, তখন মাতা তাঁকে জিগ্যেস করলেন, “আপনি আমাকে কীসের মাংস ভক্ষণ করিয়েছেন বলুন তো? ইতিপূর্বে ওই মাংস আমি কখনও ভক্ষণ করিনি!”
‘মহারাজ বিম্বিসার যেন এই প্রশ্নের অপেক্ষাতেই ছিলেন। তিনি কৌতুক করে মাতাকে বললেন, “তোমার শরীর সুস্থ রাখার জন্য, গর্ভস্থ সন্তানকে সুস্থ রাখার জন্য আমার তোমাকে অদেয় কিছু নেই। তুমি আমাকে বলেছিলে, মানুষের হৃৎপিণ্ড ভক্ষণ করলে মুখের রুচি ফেরে। তাই এক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিকে হত্যা করে তাঁর হৃৎপিণ্ড রন্ধন করে তোমাকে দিয়েছিলাম আমি। মানুষের হৃৎপিণ্ড ভক্ষণ করেই তোমার মুখের স্বাদ ফিরেছে।” ’
একটু থেমে আবারও এক পাত্র মদিরা গ্রহণ করলেন অজাতশত্রু। শাক্যকুমার দেবদত্ত বেশ বুঝতে পারছেন, মদিরার প্রভাবে অজাতশত্রু ধীরে ধীরে উত্তেজিত হয়ে উঠছেন।
অজাতশত্রু এরপর আবার ফিরে গেলেন তাঁর কাহিনিতে, ‘মহারাজ তো রানি চেল্লানাকে মানুষের হৃৎপিণ্ড ভক্ষণ করিয়েছেন বলে চলে গেলেন। কিন্তু, আমার মাতা চেল্লানা রাজার কৌতুক বুঝতে পারলেন না। তিনি ভাবলেন, তিনি সত্যিই নরমাংস ভক্ষণ করেছেন। তাই নিজের প্রতি, গর্ভস্থ সন্তানের প্রতি ঘৃণায় তাঁর মন পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন, গর্ভস্থ যে সন্তানের জন্য তিনি নররাক্ষসীতে পরিণত হলেন, তাকে আর তিনি কিছুতেই বাঁচতে দেবেন না। হয়তো-বা কোনও নররাক্ষসের জন্ম দিতে চলেছেন তিনি। তাকে বাঁচিয়ে রাখলে হয়তো সে ভবিষ্যতে বহু মানুষের মৃত্যুর কারণ হবে। সেদিন মধ্যরাতে জন্ম হল আমার।
‘পরদিন সকালবেলা মহারাজ বিম্বিসার প্রফুল্লমনে পুত্রের মুখদর্শনের জন্য মাতা চেল্লানার প্রসূতিকক্ষে প্রবেশ করলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। সে কক্ষে কোথাও তাঁর সদ্যোজাত শিশুর অস্তিত্ব নেই! মহারাজ মাতা চেল্লানাকে প্রশ্ন করতে মাতা পাগলিনীর মতো আচরণ করে বলে উঠলেন, “যে সন্তানের জন্য আমি নররাক্ষসীতে পরিণত হলাম, তাকে আমি খানিক আগে আঁস্তাকুড়ের আবর্জনার স্তূপে নিক্ষেপ করে এসেছি। তাঁর বাঁচার কোনও অধিকার নেই। সেও কাক-শকুনের খাদ্যে পরিণত হোক!”
‘এ কথা শুনে মহারাজ বিম্বিসার সঙ্গে সঙ্গে আঁস্তাকুড়ের দিকে ছুটলেন। তিনি সেখানে গিয়ে দেখলেন, একদল কাক আর মোরগ আমার নরম দেহ ঠোকরাতে শুরু করেছে। তিনি যখন আমাকে বুকে তুলে নিলেন, ততক্ষণে একটা মোরগ আমার কনিষ্ঠ আঙুলটা বেশ খানিকটা ভক্ষণ করে ফেলেছে।
‘রাজবৈদ্য জীবক ক্ষতবিক্ষত ছোট্ট শিশুর জীবন ফিরিয়ে দিলেন ঠিকই, কিন্তু আমার মাতা পাগলিনী হয়েই রইলেন। আর আমি “কুনিক” হয়ে দাসীদের কাছে প্রতিপালিত হতে লাগলাম।’ তাঁর করুণ কাহিনি শেষ করে আবারও এক পাত্র মদিরা পান করলেন অজাতশত্রু।
তারপর তিনি দেবদত্তকে প্রশ্ন করলেন, ‘আমার এ গ্লানি থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ কি আপনি বলে দিতে পারবেন মিত্র? হয়তো-বা কুনিক হওয়ার কারণে ভবিষ্যতে আরও বড় কোনও অপমান অপেক্ষা করছে আমার জন্য!’
দেবদত্ত বললেন, ‘হ্যাঁ, আমারও তাই অনুমান। এমনকী এর জন্য হয়তো-বা ভবিষ্যতে মগধের রাজসিংহাসনের অধিকারও আপনি হারাবেন মিত্র। আমার মনে হয়, আজকের এই ঘটনা ভবিষ্যতের সেই অশনিসংকেত দিচ্ছে। আজকের ঘটনা সেই চক্রান্তেরই অংশমাত্র।’
‘আপনার এমন অনুমান হল কেন?’
দেবদত্ত বললেন, ‘অনুমানের পিছনে যুক্তিগ্রাহ্য কারণ আছে। দেখুন, সব রানিরাই চাইবেন যে তাঁর পুত্র রাজসিংহাসনে বসুক আর তিনি রাজমাতা হন। রানি অম্বাপালীর ক্ষেত্রেও এই আকাঙ্ক্ষা ব্যতিক্রম নয়। তাই তিনি আজকে কৌশলে তাঁর পুত্র কোন্ডলকে দিয়ে মহারাজের জ্যেষ্ঠ পুত্রের দায়িত্ব সম্পাদনা করালেন, যাতে সে ভবিষ্যতে সিংহাসনের দাবিদার হতে পারে।
‘তা ছাড়া মদ্রদেশের সঙ্গে লিচ্ছবীদের দীর্ঘদিনের বিবাদ। কোনও
মদ্রকন্যা নিশ্চয়ই চাইবেন না যে কোনও লিচ্ছবীকন্যার পুত্র অর্থাৎ আপনি সিংহাসনে বসুন। আপনার বিমাতা অম্বাপালী পরিকল্পিতভাবেই আপনাকে কুনিক নাম দান করেছেন ও বৌদ্ধদের মধ্যে তা চারণা করেছেন। যাতে মহারাজ বিম্বিসারের অবর্তমানে কোনও খুঁতযুক্ত ব্যক্তিকে প্রজারা সিংহাসনে বসাতে সম্মত না হয়।’
‘তাহলে এই সংকট থেকে পরিত্রাণের উপায় কী বন্ধু?’ জানতে চাইলেন অজাতশত্রু।
মুহূর্তের মধ্যে তাঁর কৌশল ঠিক করে নিলেন দেবদত্ত। তিনি মদিরার পাত্র পূর্ণ করে তা অজাতশত্রুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘একটিমাত্র উপায়ে এ সংকট থেকে আমরা মুক্তিলাভ করতে পারি।’
‘কী উপায়?’
স্থিরদৃষ্টিতে কয়েক মুহূর্ত অজাতশত্রুর দিকে তাকিয়ে থাকার পর শাক্যকুমার বললেন, ‘উপায় হল, বলপূর্বক মগধের সিংহাসন দখল করা। আর তার জন্য প্রয়োজনে মহারাজ বিম্বিসারকে হত্যা করা। আর তা আপনার পক্ষে সম্ভব না হলে, তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করা। যাতে আপনি ভবিষ্যতে প্রমাণ করতে পারেন যে, আপনি “কুনিক” হলেও আপনার ওই হাতে ধরা তরবারিই মগধ শাসনের জন্য অদ্বিতীয়।
‘আর হ্যাঁ, শুধু সিংহাসন দখল করা, রাজা বিম্বিসারকে হত্যা বা কারারুদ্ধ করলেই চলবে না। আপনার সিংহাসন আরোহণের পর ওই “কুনিক” হস্তে নির্মমভাবে হত্যা করতে হবে বৌদ্ধ শ্রমণদের। নইলে তাঁরা আবার নতুন চক্রান্তের জাল বুনে আপনাকে সিংহাসনচ্যুত করতে চাইবে। আর এসব যদি না পারেন তবে ভবিষ্যতে এ রাজ্য থেকে বিতাড়িত হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকুন। অথবা গুপ্তঘাতকের হাতে অকালমৃত্যুর জন্য।’
দেবদত্তর কথা শুনে চরম আশঙ্কার উদ্রেক হল মদিরাগ্রস্ত যুবরাজ অজাতশত্রুর মনে। পানপাত্রটি এক চুমুকে শেষ করে তিনি বললেন, ‘মগধের এত বিশাল সেনাবাহিনী…এ কাজ আমার পক্ষে কীভাবে সম্ভব? তার জন্য তো আমাকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হবে। অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। সেনাদল গঠন করতে হবে। ততদিনে যদি কোনও দুর্ঘটনা ঘটে যায়?’
ধূর্ত দেবদত্ত বললেন, ‘তা ঘটা অসম্ভব কিছু নয়। ওসব কাজ তাই ফেলে রাখতে নেই। মগধের সেনাদল বর্তমানে অবস্থান করছে পাটলিপুত্র নগরী এবং সীমান্ত অঞ্চলে। প্রাসাদে গিয়ে দেখলাম সামান্য কয়েকজন দেহরক্ষী নিয়ে রাজগৃহে উপস্থিত হয়েছেন রাজা বিম্বিসার। এ সুযোগকে কাজে লাগান আপনি। আজই মহারাজ বিম্বিসারকে হত্যা করে বা কারারুদ্ধ করে নিজেকে মগধের রাজা বলে ঘোষণা করুন। আপনার অনুগত পাঁচশত তিরন্দাজ সৈনিক তো আছেই। তাঁরা এ কাজ সম্পন্ন করতে পারবে।
‘আপনি সিংহাসন আরোহণ করতে পারলে পাটলিপুত্রে অবস্থানকারী সেনারাও আপনাকে মগধের নৃপতি হিসাবে মেনে নেবে। কারণ, সেনাপতি বা সৈন্যরা ব্যক্তি অপেক্ষা বেশি গুরুত্ব দেয় রাজসিংহাসনের অধিপতিকে।’
অজাতশত্রু বললেন, ‘কিন্তু সিংহাসন আরোহণের পশ্চাতে পার্শ্বদেশীয় কোনও রাজা বা রাজবংশীয়র স্বীকৃতি আদায় করতে হয়। সে কাজ কে সম্পন্ন করবেন?’
দেবদত্ত বললেন, ‘কেন? আমি। আমিও তো শাক্য রাজবংশজাত। আমিই আপনাকে স্বীকৃতি প্রদান করে আপনার হাতে রাজদণ্ড তুলে দেব। তবে মনে রাখবেন, আজকের দিনের মতো সিংহাসনলাভের সুযোগ আর আপনার জীবনে আসবে না। হয় আপনি আজ মগধের সিংহাসনের অধিকারী হবেন, নচেৎ ভবিষ্যতের দুর্দশার জন্য প্রস্তুত থাকবেন।’
দেবদত্তর কথা শুনে মগধের যুবরাজ মদিরাগ্রস্ত অজাতশত্রু নিজের আসন ত্যাগ করে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ওরে, কে আছিস? এখনই তিরন্দাজ কুম্ভীরকে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বল।’
সূর্য অস্ত গেল। দাসীরা প্রদীপমালায় প্রাসাদকাননে রক্ষিত করুণাময় বুদ্ধের চিহ্ন ধারণকারী শ্বেতশুভ্র স্তূপ দু’টি সাজিয়ে তুলল। মহারাজ বিম্বিসার প্রাসাদ ত্যাগ করে কাননের উদ্দেশে রওনা হলেন। কাননের স্তূপ দু’টিতে নিজ হাতে দু’টি প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে, তাদের পদস্থলে বসে শ্রমণদের কাছে বুদ্ধকথা শ্রবণ করার সময় হয়েছে।
আজ এই আনন্দ উৎসবের দিনেও মাঝে মাঝে বেদনা বোধ করছেন বিম্বিসার। স্ত্রী পদুম্পাবতীর অনুরোধ অস্বীকার করতে না পেরে অজাতশত্রুকে তিনি বঞ্চিত করেছেন মাঙ্গলিক উৎসবের দায়িত্ব থেকে। সে কথা জানার পর অজাতশত্রুও আর প্রাসাদে আসেনি। তাঁর অনুপস্থিতি ব্যথিত করেছে মহারাজ বিম্বিসারকে।
তিনি যখন প্রাসাদ কাননে স্তূপ দু’টির সামনে এসে উপস্থিত হলেন, তখন সন্ধ্যা নেমেছে। দাসী ও শ্রমণরা ইতিমধ্যেই ফুলমালা ও দীপে সজ্জিত করেছে স্তূপ দু’টিকে। তাদের মধ্যবর্তী স্থানে আসন রচনা করা হয়েছে। সেই স্থানে মহারাজ উপবিষ্ট হয়ে বুদ্ধবাণী শুনবেন। বৌদ্ধ শ্রমণরাও ইতিমধ্যে সেখানে উপস্থিত হয়েছেন।
মহারাজ উপস্থিত হওয়ার পর একজন দাসী স্বর্ণথালায় দু’টি স্বর্ণপ্রদীপ নিয়ে মহারাজের সামনে এসে দাঁড়াল। নৃপতি বিম্বিসার ‘নমঃ বুদ্ধ’ বলে প্রদীপ তুলে নিতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু সে কাজ আর সম্পন্ন হল না। কোথা থেকে একটা তির এসে বিদ্ধ করল দাসীর হৃদয়। প্রদীপের থালাসহ ভূপতিত হল দাসী। মাটিতে পড়ে নিভে গেল স্বর্ণপ্রদীপ দু’টি। আর তার পরেই ঝাঁকে ঝাঁকে তির নিক্ষিপ্ত হতে লাগল শ্রমণদের ওপর। ভূপতিত হতে লাগলেন তাঁরাও। তাঁদের রক্তের ছিটায় রক্তবর্ণ ধারণ করল শ্বেতমর্মর স্তূপ দু’টিও।
সব কিছু শেষ হতে মাত্র কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল। বিম্বিসার ভালো করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই স্তূপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল একদল অস্ত্রধারী। রাজা বিম্বিসার এই সময়ে কোনও অস্ত্রধারণ করেন না। কাজেই স্তূপের আড়ালে ও কাননে লুকিয়ে থাকা অস্ত্রধারীরা সহজেই বিম্বিসারের রাজমুকুট ছিনিয়ে নিতে সমর্থ হল ও তাঁকে লৌহশৃঙ্খলে আবদ্ধ করে নিয়ে চলল কারাগারের উদ্দেশে।
পরদিন ঊষালগ্নেই বিম্বিসারের রাজসিংহাসনে আরোহণ করলেন কুমার অজাতশত্রু। শাক্য বংশীয় কুমার দেবদত্ত প্রথা অনুসারে তাঁকে মগধের নৃপতি রূপে ঘোষণা করে বন্ধুকৃত্য সম্পন্ন করলেন। পরদিন পাটলিপুত্রে খবর পৌঁছল। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে বিম্বিসারের সেনাদলও দেবদত্তর প্রত্যাশামতো অজাতশত্রুকেই মগধের নতুন নৃপতি হিসাবে মেনে নিল।
শুধু নৃপতি বিম্বিসারকেই নয়, তাঁর দুই ভ্রাতা কোন্ডল ও অভয়কেও কারারুদ্ধ করে ফেলেছেন অজাতশত্রু। এবং তাঁর দুই বিমাতা অম্বাপালী ও পদুম্পাবতীকেও। সিংহাসনে আরোহণের পরই বান্ধব দেবদত্তর পরামর্শমতো নৃপতি অজাতশত্রু ঘোষণা করলেন মগধে বেদ-ব্রাহ্মণ-রাজা ব্যতীত অন্য কারও, বিশেষত বুদ্ধের বন্দনা নিষিদ্ধ। রাজগৃহতে তিনি তিন দিনে একসহস্র বৌদ্ধ ভিক্ষু শ্রমণকে হত্যা করলেন। বৌদ্ধ ‘ধম্ম’ অনুরাগীদের তিনি অন্যত্র চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন।
তবে তিনি শুধু একজনকে এই নির্দেশ দিলেন না। তাঁকে শুধু বুদ্ধ উপাসনা থেকে নিবৃত্ত থাকতে অনুরোধ করলেন অজাতশত্রু। তিনি হলেন, অজাতশত্রুর দাসীমা, দাসী উৎপলবর্ণা। অজাতশত্রুর মাতা চেল্লানার মস্তিষ্ক-বিকৃতির পর তিনিই নিজের স্তন্য দান করে, কোলে-পিঠে মানুষ করেছেন রাজা অজাতশত্রুকে। তাই তিনি উৎপলবর্ণার প্রতি বিরূপ হতে পারলেন না। যদিও উৎপলবর্ণা অজাতশত্রুর অগোচরে নিভৃতকক্ষে বুদ্ধের প্রার্থনা করে চললেন।
রাজগৃহে আপাতত শাক্যকুমার বুদ্ধবিদ্বেষী দেবদত্তর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তিনি কপিলাবস্তুতে ফিরে যাওয়ার আগে বিদায় নিতে এলেন মগধরাজ অজাতশত্রুর কাছে। যাওয়ার আগে তিনি অজাতশত্রুকে পরামর্শ দিলেন, ‘মনে রাখবেন, বৌদ্ধ নৃপতিরা আপনার শত্রু। তাদের রাজ্য ও অন্যান্য রাজ্যগুলি জয় করে আপনি নিজেকে শুধু মগধের নৃপতি নয়, ষোড়শ মহাজনপদের কালজয়ী সম্রাট হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করুন।’
দেবদত্তর কথা শুনে মগধরাজ অজাতশত্রু বললেন, ‘আপনার পরামর্শমতোই আমি বিপদমুক্ত হয়েছি। মগধের রাজসিংহাসনে অধিকারী হয়েছি। আপনার পরামর্শমতোই আমি কাজ করব। আমি জম্বুদ্বীপের ষোড়শ মহাজনপদ ও ভবিষ্যতের পৃথিবীকে দেখিয়ে দেব “কুনিক”-এর বাহুর জোর কতখানি। আমি নিজেই আজ থেকে “কুনিক” নাম গ্রহণ করলাম। এই নাম শুনলেই ভবিষ্যতে হৃৎকম্প হবে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রুদের।’
তারপর দেবদত্তর হাত দুটো ধরে অজাতশত্রু বললেন, ‘আপনিই আমার পরম বান্ধব ও হিতাকাঙ্ক্ষী। যদি কোনোদিন আপনার কোনও সাহায্যের প্রয়োজন হয়, তবে তা চাইতে সংকোচ করবেন না। মগধ নৃপতি আপনার সাহায্যের জন্য সদা প্রস্তুত রইল।’
শাক্যকুমার হেসে বললেন, ‘তেমন কোনও প্রয়োজন হলে নিশ্চয়ই জানাব আপনাকে।’
শাক্যকুমার দেবদত্ত কপিলাবস্তুর উদ্দেশে রওনা হলেন। মগধ নৃপতি অজাতশত্রু বৌদ্ধ নিধন ও সাম্রাজ্য বিস্তারের কাজে মনোনিবেশ করলেন। বহু রাজ্য তিনি কৌশলে বা বাহুবলে নিজের করতলে আনলেন।
এক দশক অতিক্রান্ত হল। নৃপতি অজাতশত্রু আজ মগধ সম্রাট। ষোড়শ মহাজনপদের এক তৃতীয়াংশ রাজ্য বশ্যতা স্বীকার করে নিল অজাতশত্রুর। এমনকী মহাজনপদের অন্যতম শক্তিশালী রাজ্য কোশল বা কাশীও।
অজাতশত্রুর বিমাতা ভূতপূর্ব রাজা বিম্বিসারের প্রথম পত্নী কৌশল্যাদেবী অজাতশত্রুর সিংহাসন আহরণের পর কোশল রাজ্যে ফিরে গিয়েছিলেন। তিনি তাঁর ভ্রাতা কোশলরাজ প্রসেনজিৎকে অজাতশত্রুর বিরুদ্ধে উদ্দীপ্ত করেন। বিম্বিসারের সঙ্গে কৌশল্যা দেবীর বিবাহের সময় কোশল রাজ্যের যে অংশ মগধকে যৌতুক হিসাবে দেওয়া হয়েছিল তা ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।
ফলস্বরূপ প্রসেনজিৎ মগধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। সে যুদ্ধে কোশলরাজ শুধু পরাজিতই হননি, নিজ প্রাণরক্ষার্থে কোশল রাজ্যের অর্ধেক আর নিজ কন্যাকে সম্প্রদান করেছেন অজাতশত্রুর হাতে।
৩
সংঘগৃহের এক নির্জন কক্ষে একাকী অবস্থান করছিলেন সন্ন্যাসী ভিক্ষু দেবদত্ত। হ্যাঁ, তিনি এখন সন্ন্যাসী। বুদ্ধের ‘ধম্ম’ তিনি গ্রহণ করেছেন ঠিকই, মেনে নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তা তিনি ‘মনে’ নেননি। ‘মেনে নেওয়া’ আর ‘মনে নেওয়া’-র মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। একপ্রকার বাধ্য হয়েই তিনি সংঘে অনুপ্রবেশ করেছেন। কারণ, কপিলাবস্তু-সহ ষোড়শ মহাজনপদের অর্ধেক রাজ্যই আজ বুদ্ধের আদর্শে অনুপ্রাণিত অথবা তাঁর ‘ধম্ম’ গ্রহণ করেছে।
কার্যত ক্রমশ একা হয়ে পড়ছিলেন দেবদত্ত। মগধ থেকে ফিরে আসার পর তিনি বেশ কয়েক বছর পর্বত গুহাতে তপস্যাও করেছিলেন বোধিলাভের জন্য। কিন্তু তাতে সামান্য কিছু ক্ষমতালাভ ছাড়া বোধিলাভ তাঁর হয়নি। শেষ পর্যন্ত তিনি ভেবেছিলেন, যদি তিনি বুদ্ধ শরণাপন্ন হন, সন্ন্যাসী হন, তবে বুদ্ধের ভ্রাতা হিসাবে তিনি সংঘ পরিচালনার অন্যতম ব্যক্তি হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন ও সকলের শ্রদ্ধার পাত্র হবেন।
সর্বোপরি বুদ্ধের যদি কোনও অলৌকিক ক্ষমতা থাকে তবে তা তিনি তাঁর থেকে গ্রহণ করবেন, এবং ভবিষ্যতে বুদ্ধের স্থান অলঙ্কৃত করবেন। তখন রাজা-মহারাজারা এসে চরণ স্পর্শ করবে তাঁর। নিজে রাজা হতে না পারার আক্ষেপ দূর হবে।
এই মনোভাব পোষণ করেই তিনি বুদ্ধের শরণ নিয়েছিলেন, বুদ্ধও তাঁকে ফেরাননি। তিনি তাঁকে আশ্রয় দিয়েছেন সংঘে।
কিন্তু সংঘে প্রবেশের পর তিনি বৃজি রাজ্য থেকে আগত কিছু ভিক্ষুকে নিজের প্রতি অনুরক্ত করে তুলতে পারলেও আসল কাজ তেমন কিছুই হয়নি। বুদ্ধ তাঁকে সংঘের অন্যতম প্রধান পরিচালকের আসন প্রদান করেননি। মহাজ্ঞানী অন্যান্য সাধারণ ভিক্ষুদের সঙ্গে যেমন আচরণ করে থাকেন, তেমনই করে থাকেন তাঁর জ্ঞাতি ভ্রাতা দেবদত্তর সঙ্গে। বরং, তিনি সংঘ পরিচালনার ব্যাপারে আস্থা রাখেন তাঁর শিষ্য ভিক্ষু শ্রীগুপ্ত, মৌদ্গল্যায়ন, আনন্দ প্রমুখের ওপর। তাদের সঙ্গেই পরামর্শ করে তিনি সংঘ পরিচালনা করেন। অপাঙ্েক্তয় থেকে যান ভ্রাতা দেবদত্ত।
তাছাড়া আজ অবধি বুদ্ধ কোনও অলৌকিক শক্তি প্রদান করেননি দেবদত্তকে যার ফলে, তিনি ভবিষ্যতের বুদ্ধ হতে পারেন। দেবদত্তর কৌশল ভাবনা সব কিছু ব্যর্থ হতে চলেছে।
মহাজ্ঞানী বুদ্ধ বেশ কিছু দিন ধরে ‘ধম্ম’ প্রচারের উদ্দেশে বৃজিতেই অবস্থান করছেন। এরপর তিনি এ স্থান ত্যাগ করে কিছুকালের জন্য গৃধ্রকূট পর্বতে চলে যাবেন নির্জনে চক্রমনের জন্য। যে ভিক্ষুদল মহামানবের সঙ্গী হয়ে বৃজিতে এসেছেন, তাদের সঙ্গে দেবদত্তও এসেছেন। অবস্থান করছেন বৃজির সংঘগৃহতে। কিছু দিনের মধ্যেই আবার তাঁকে ফিরে যেতে হবে নিজ রাজ্য কপিলাবস্তুতে। আর বুদ্ধ তাঁর প্রিয় কয়েকজন শিষ্যকে নিয়ে রওনা হবেন গৃধ্রকূট পর্বতের উদ্দেশে।
বুদ্ধের মগধে প্রবেশের অনুমতি নেই ঠিকই। কিন্তু রাজগৃহ থেকে গৃধ্রকূট পর্বতের দূরত্ব খুব বেশি নয়। অজাতশত্রু মগধের সিংহাসনে আরোহণ করার পর বেণুবনে চক্রমনের সুযোগ আর নেই। তাই মহাজ্ঞানী চক্রমনের স্থান হিসাবে নির্বাচন করেছেন গৃধ্রকূট পর্বত। যা বর্তমানে বৈশালী রাজ্যের অধীন। আর বৈশালী নৃপতি বর্তমানে বৌদ্ধ ধম্ম গ্রহণ করেছেন।
নির্জন কক্ষে বসে দেবদত্ত ভেবে চলেছেন, এবার কোন পথ অবলম্বন করবেন তিনি? এত প্রচেষ্টা করেও তো তিনি বুদ্ধ হয়ে উঠতে পারলেন না। ভবিষ্যতেও তাঁর বুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। যদি না তিনি বুদ্ধের থেকে অলৌকিক শক্তি লাভ করতে পারেন।
তবে নিজ চক্ষে বুদ্ধের কোনও অলৌকিক শক্তি দর্শন না করলেও এতদিনে তাঁর মনে বিশ্বাস জন্মেছে যে নিশ্চয়ই বুদ্ধের এমন কোনও অলৌকিক গুপ্ত শক্তি আছে, যার ফলে তিনি এত মানুষ, রাজা-মহারাজাদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হচ্ছেন।
সন্ন্যাসী তো কতই আছেন এই ষোড়শ মহাজনপদে। তাদের মধ্যে অনেকেই বুদ্ধের চেয়ে বয়সে প্রাচীন। তাঁর চেয়েও বেশি দিন ধরে, বৎসরের পর বৎসর তাঁরা তপস্যা করেছেন, শাস্ত্র অধ্যায়ন করেছেন। কিন্তু, তাঁরা তো কেউ বুদ্ধের মতো খ্যাতি বা সম্মান লাভ করতে পারলেন না!
ব্যতিক্রম একমাত্র জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীর। দেবদত্ত শুনেছেন, তাঁরও নাকি বিশেষ অলৌকিক ক্ষমতা আছে।
এসব কথাই ভাবছিলেন দেবদত্ত। এমন সময় এক ভিক্ষু এসে বললেন, ‘ভন্তে, সংঘপ্রাঙ্গণ ঝাঁট দেওয়ার ও ধৌত করার দায়িত্ব আজ আপনার ওপর ন্যস্ত হয়েছে। মৌদ্গল্যায়ন আপনাকে এ সংবাদ জানাতে বলেছেন।’
সংঘে যারা বসবাস করেন, তাঁদের প্রত্যেককে প্রতিদিন কিছু কার্য সম্পাদন করতে হয় পর্যায়ক্রমে। কেউ বন থেকে শুষ্ক কাষ্ঠ সংগ্রহ করে আনেন রন্ধনের জন্য, কেউ নদী থেকে জল সংগ্রহ করে আনেন, কেউ ভিক্ষালব্ধ তণ্ডুল রন্ধন করেন, কেউ মালা গাঁথেন, কেউ প্রদীপ প্রজ্বলনের ব্যবস্থা করেন, আবার কাউকে ঝাঁট দেওয়ার বা সংঘ ধৌত করার কাজও করতে হয়।
তবে এতদিন দেবদত্ত অন্য সব কাজ করলেও, তাঁকে উঠান ঝাঁট দেওয়ার কথা কেউ বলেনি। ভিক্ষু বার্তা দিয়ে চলে যাওয়ার পর দেবদত্ত মনে মনে ভাবলেন, এমন নিকৃষ্ট কাজও তাকে করতে হবে? হাজার হলেও সে রাজবংশজাত। তার নিজের প্রাসাদে এখনও অন্তত একশত ভৃত্য-দাসী আছে এসবের জন্য। কিন্তু, এত কিছুর বিনিময়ে ফল হচ্ছে কই?
না না, এ নিয়ে সরাসরি তাঁর বুদ্ধের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন। কিন্তু, কোন সময় তাঁর সঙ্গে একাকী কথা বলা সম্ভব? সব সময়ই তো তাঁকে ঘিরে থাকে তাঁর শিষ্য ও ভক্তকুল।
হঠাৎ দেবদত্তর খেয়াল হল দ্বিপ্রহরের এই সময় তাঁকে একাকী পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কারণ, এই সময় ভিক্ষুরা আহারগ্রহণের পর কিছু সময় বিশ্রাম করেন। অথবা নিজ কক্ষে ব্যক্তিগত কাজে নিয়োজিত থাকেন।
বুদ্ধ আজ এইসময় একাকী সংঘের নিকটবর্তী এক শালবনে অবস্থান করবেন। আজ এসময়ই তাঁর সঙ্গে বাক্যালাপ করা যেতে পারে। কারণ, কিছু দিনের মধ্যেই তো তিনি চলে যাবেন গৃধ্রকূট পর্বতে। তারপর তাঁর সঙ্গে কবে কোথায় সাক্ষাতের সুযোগ মিলবে তা জানা নেই।
প্রত্যাশামতো সেখানে একাকী অবস্থান করছিলেন মহাজ্ঞানী। বনের মধ্যে চারপাশে শালগাছ ঘেরা একটা উন্মুক্ত স্থান আছে। সে স্থানে বসেই বুদ্ধ তাঁর বাণী শোনান তার ভক্তদেরকে। দেবদত্ত সে স্থানে পৌঁছে দেখলেন, শিষ্যদের বসার স্থানে যে শুষ্ক শালপল্লব পড়ে আছে, বুদ্ধ তা একাকী ভূমি থেকে সংগ্রহ করে সে স্থান পরিষ্কার করছেন।
তাকে দেখে বুদ্ধ জানতে চাইলেন, ‘এ সময় আপনার আগমন ঘটল কেন? কোথাও কিছু ঘটেছে কি?’
দেবদত্ত বললেন, ‘আপনার সঙ্গে একাকী কিছু জরুরি কথা বলার প্রয়োজন আছে। তাই এসময় সাক্ষাৎ করতে এলাম।’
বুদ্ধ হেসে বললেন, ‘নিশ্চয়ই, আপনার কথা শুনব। একটু ধৈর্য ধরুন। আমি আমার কাজ সেরে নিই।’
দেবদত্ত বললেন, ‘এ কাজ তো আপনি কোনও ভিক্ষুকে দিয়ে করিয়ে নিতে পারতেন। আপনি কেন নিজের সময় ব্যয় করছেন এমন তুচ্ছ কাজে?’
বুদ্ধ বললেন, ‘আমি বললে তাঁরা তা করতেন। কিন্তু, মাধুকরী সেরে এসে তারা এখন কেউ বা খাদ্য গ্রহণ করে বিশ্রাম গ্রহণ করছেন, কেউ বা ব্যক্তিগত কাজে নিয়োজিত আছেন। তাই এসময় আমি তাঁদের কাউকে ডাকিনি। তাছাড়া যে কাজ আমি নিজেই করতে পারি, সে কাজে আমি অন্যের সাহায্য গ্রহণ করব কেন?’ এ কথা বলতে বলতে তিনি আবার শুষ্কপত্র সংগ্রহ করতে লাগলেন।
এক সময় শাস্তার কাজ শেষ হল। পাতাগুলিকে তিনি এক পার্শ্বে জড়ো করে রেখে একটি ভূপতিত শালবৃক্ষের গুঁড়ির ওপর উপবেশন করলেন। এই স্থানে বসেই তিনি ভক্তদের ‘ধম্ম শিক্ষা’ দেন। দেবদত্ত তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। বুদ্ধ বললেন, ‘এবার বলুন, আপনি কী বলতে চান?’
দেবদত্ত মনের মধ্যে সাজিয়ে নিয়ে এসেছিলেন তাঁর কথাগুলো। তিনি বুদ্ধকে প্রভাবিত করার জন্য বললেন, ‘আমি ও আপনি দু’জনেই শাক্য রাজবংশের, অভিজাত বংশের সন্তান। আমাদের ধমনীতে একই সম্ভ্রান্ত রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। সম্পর্কে আমি আপনার অগ্রজ ভ্রাতা। তাই আমি আপনার কাছে একটি অনুরোধ নিয়ে এসেছি।’ এ কথা বলার পর একটু থামলেন তিনি।
বুদ্ধ বললেন, ‘হ্যাঁ, জন্মসূত্রে আমরা দু’জনেই অভিজাত, বংশজাত এবং আপনি আমার অগ্রজ ভ্রাতা। কিন্তু, যেদিন আমি কপিলাবস্তুর রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করেছিলাম, সেদিন থেকেই আমি আমার বংশকৌলিন্য ত্যাগ করে এসেছি। আমি নিজেকে বংশগরিমাহীন একজন সাধারণ মানুষ বলেই মনে করি। এমনকী মানুষ হিসাবে চণ্ডাল বা ব্যাধের সঙ্গেও আমার কোনও পার্থক্য আছে বলে মনে করি না।
‘জন্মসূত্রে যাঁদের সঙ্গে আমার আত্মীয়তা ছিল বা আছে তাদেরকেও আমি অন্যদের থেকে পৃথক মনে করি না। সব মানুষই আমার কাছে আত্মীয়। তা শত্রু হোক বা মিত্র। এমনকী কীট-পতঙ্গ থেকে পৃথিবীর সব প্রাণীকেই আমি মানুষের মতো দেখি। সবাইকেই আমি সাধ্যমতো আমার পরামর্শ বা সেবাদানের চেষ্টা করি। এবার বলুন, আপনি কী অভিপ্রায়ে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছেন?’
দেবদত্ত বলল, ‘আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব না দিলেও আমি আপনার সঙ্গে আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক অস্বীকার করতে পারি না। আর সেই বিশেষ আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণেই আমি একটি দাবি বা অনুরোধ জানাচ্ছি—আপনি আপনার অলৌকিক ক্ষমতা বা তার প্রয়োগ কৌশল আমাকে প্রদান করুন। যাতে আমি আপনার সঙ্গে অথবা আপনার অবর্তমানে তা কাজে লাগিয়ে ধম্ম বা সংঘের বিস্তার ঘটাতে পারি।’
মহাজ্ঞানী কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে বললেন, ‘সাধনার মাধ্যমে আমি বোধিলাভ করেছি, জ্ঞানলাভ করেছি যা “আর্য সত্য”। সেই আর্য সত্য কী তা আপনি জানেন। সে জ্ঞান আমি সকলকেই প্রদান করি। কিন্তু বোধিলাভ করে আমি কোনও অলৌকিক শক্তির অধিকারী হইনি। লোকে এ ধারণা পোষণ করলে তা ভ্রান্ত। আমি একজন “মার্গদর্শক” বা পথপ্রদর্শক মাত্র। যা আমার কাছে নেই তা আমি আপনাকে কীভাবে দেব?’
‘তবে, অন্য কোনও ক্ষমতা যা আপনার আছে, অন্য কারও নেই তা আপনি আমাকে প্রদান করুন।’
তথাগত একটু ভেবে নিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, একটা বিশেষ ক্ষমতা আমার আছে। যা বোধিলাভের আগে থেকেই প্রাপ্ত। তা হল, আমি আমার পূর্বজন্মের শিক্ষা ও ঘটনা স্মরণ করতে পারি। কিন্তু, সে ক্ষমতা আমি এজন্মে সাধনার মাধ্যমে অর্জন করিনি। কাজেই, সে ক্ষমতা আপনাকে দেওয়ার কৌশল আমার জানা নেই।’
মহাজ্ঞানীর সত্য কথন দেবদত্তর কাছে মিথ্যা ঠেকল। সন্ন্যাসী দেবদত্ত তাঁর ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য একটা শেষ চেষ্টা করলেন। তিনি বললেন, ‘তবে আপনি সংঘ পরিচালনার দায়িত্ব আমার ওপরে ন্যস্ত করুন। যেমন করেছেন মৌদ্গল্যায়ন, আনন্দ প্রমুখের ক্ষেত্রে।’
বুদ্ধ বললেন, ‘এ দায়িত্বও আপনাকে দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। কারণ, সংঘের পরিচালক মণ্ডলীকে আমি নির্বাচন বা মনোনীত করিনি। বিভিন্ন স্থানে যে কয়েক শত সংঘ স্থাপিত হয়েছে সে স্থানে অবস্থানরত ভিক্ষুরা সম্মিলিতভাবে সভা ডেকে ভিক্ষু সংঘের কেন্দ্রীয় পরিচালক মণ্ডলী নির্বাচন করেন। এ ব্যাপারে তাঁদের সিদ্ধান্তই শেষ কথা। তাঁদের সিদ্ধান্তে আমি কোনও হস্তক্ষেপ করি না। কারণ, সংঘের সম্মিলিত সিদ্ধান্তই হল সংঘের প্রধান চালিকাশক্তি।
‘আমার পরামর্শ যদি আপনি শোনেন, তবে একাগ্রচিত্তে আপনি মানবসেবায় ও সংঘের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করুন। দেখবেন, এক দিন এ কাজের জন্য অভীষ্ট ফল লাভ করবেন।’
দেবদত্ত এবার বুঝতে পারলেন, বুদ্ধ তাঁর দাবি পূরণ করবেন না। তাই তিনি সে স্থান ত্যাগ করে সংঘের দিকে গমন করলেন। আরেকবার তিনি শেষ চেষ্টা করে দেখবেন।
এই অভিপ্রায় নিয়ে তিনি ফিরে এসে একে একে বুদ্ধের প্রধান শিষ্য, শ্রীগুপ্ত, আনন্দ, মৌদ্গল্যায়ন, সুভূতি প্রমুখের কক্ষে গিয়ে বললেন, ‘আমি বুদ্ধের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। তাই আমি হয়তো ভবিষ্যতে বুদ্ধ হব। তাই, বুদ্ধ যদি আপনাকে কোনও অলৌকিক ক্ষমতা প্রদান করে থাকেন, তবে তা আপনারা আমাকে প্রদান করুন।’
শুধু সেদিনই নয়, পর পর বেশ কয়েক দিন ধরে দেবদত্ত বুদ্ধের প্রধান শিষ্য ও সংঘ পরিচালকদের কাছে এই দাবি জানালেন। কিন্তু সবাই এক বাক্যে তাঁকে বললেন বুদ্ধ তাদের আর্য্য সত্য ও জীবসেবার উপদেশ ছাড়া কোনওরকম অলৌকিক জ্ঞান প্রদান করেননি।
৪
এক সপ্তাহ অতিক্রান্ত হয়েছে। দেবদত্তর হতাশা ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। সেদিন বিকালে নিজ কক্ষের সামনে পদচারণা করছিলেন দেবদত্ত। এমন সময় একজন তরুণ ভিক্ষু এসে বললেন, ‘ভন্তে, মৌদ্গল্যায়ন আপনার সাক্ষাৎপ্রার্থী। তিনি সংঘগৃহের পশ্চাৎপ্রাঙ্গণে অবস্থান করছেন।’
তবে কি মৌদ্গল্যায়ন অবশেষে তাঁকে গোপন জ্ঞান প্রদানে সম্মত হলেন? এ কথা ভেবে প্রফুল্লমনে দেবদত্ত সঙ্গে সঙ্গে সেদিকে এগোলেন।
সংঘগৃহের পশ্চাদ্ভাগে গাছে ঘেরা একটি পাথর বাঁধানো চত্বর আছে। দেবদত্ত দেখলেন, সেখানে কয়েকজন তরুণ ভিক্ষুর সঙ্গে বাক্যালাপ করছেন সংঘের প্রধান পরিচালক মণ্ডলীর অন্যতম ভিক্ষু মৌদ্গল্যায়ন। দেবদত্ত গিয়ে দাঁড়ালেন মৌদ্গল্যায়নের সামনে।
তিনি ভূমির প্রতি দেবদত্তর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, ‘দেখেছেন পক্ষীকুলের বিষ্ঠাত্যাগের ফলে প্রাঙ্গণ কেমন অপরিষ্কার হয়ে গেছে।’ দেবদত্ত মাটির দিকে তাকিয়ে দেখলেন, প্রাঙ্গণের চারপাশে পাখির বিষ্ঠা ছড়িয়ে আছে।
দেবদত্ত এরপর চারপাশের গাছগুলোর মাথার ওপর পাখির বাসাগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওই বাসাগুলোকে ভেঙে দিলেই তো এ সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। পক্ষীকুল আর এ স্থানে আসবে না, আর প্রাঙ্গণও অপরিষ্কার হবে না।’
মৌদ্গল্যায়ন বললেন, ‘না, সে কাজ করা যাবে না। কারণ, মহাজ্ঞানী আমাদের শিক্ষা দেন যে এ পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীকেই সমানভাবে ভালোবাসতে। কাজেই পক্ষীকুলের বাসস্থান ভেঙে দিলে তা মহা পাপকার্য হবে। আমরা বুদ্ধের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হব।’
এ কথা বলার পর তিনি জানালেন, ‘অবন্তী নগরী থেকে একদল ভিক্ষু বহু মানুষকে নিয়ে আর কয়েক দিনের মধ্যেই এ নগরীতে এসে উপস্থিত হবেন। তারা কিছু দিন এ স্থানে অবস্থান করবেন। কিন্তু, এত মানুষের স্থান সংকুলান সংঘগৃহের কক্ষগুলোতে হবে না। তাদের রাত্রীবাসের জন্য এই স্থান নির্বাচন করা হয়েছে। এখানে তাদের জন্য অস্থায়ী গৃহ নির্মাণ করতে হবে। তবে সর্বাগ্রে প্রয়োজন জায়গাটাকে পাখির বিষ্ঠা মুক্ত করা। কয়েকজন তরুণ ভিক্ষু আপনাকে সাহায্য করবে। তাদের নিয়ে আগামীকাল প্রত্যুষে জায়গাটা পরিষ্কার করে ফেলবেন।’
দেবদত্ত কর্কশভাবে বললেন, ‘কীঃ! আপনি আমাকে পাখির বিষ্ঠা পরিষ্কার করার কথা বলছেন!’
মৌদ্গল্যায়ন শান্তস্বরে বললেন, ‘হ্যাঁ, বলছি। কারণ, সংঘের যাবতীয় কাজ আমরা ভিক্ষুরাই করি। প্রত্যেককেই নানা সময় নানা কাজ করতে হয় তা নিশ্চয়ই আপনি জানেন।’
দেবদত্ত উত্তেজিতভাবে বললেন, ‘তা জানি। কিন্তু আমি বুদ্ধের অগ্রজ! তাঁর জ্ঞাতি ভ্রাতা। উচ্চ রাজবংশজাত। তা জেনেও আপনি আমাকে এমন নিকৃষ্ট কাজ করতে বলছেন?’
মৌদ্গল্যায়ন আবারও শান্তস্বরে বললেন, ‘হ্যাঁ, বলছি। কারণ সংঘে বংশপরিচয়ের বিভেদ নেই। আমাদের সকলের একটাই পরিচয়—আমরা ভিক্ষু। আমরা ভগবান বুদ্ধের আদর্শ অনুসরণ করি। তাছাড়া কাজের মধ্যে কোনও ছোট-বড়, নিকৃষ্ট-উৎকৃষ্ট বলে কিছু নেই। আমি করুণাময় বুদ্ধকে দেখেছি নিজ হস্তে মুমূর্ষু রোগীর মলমূত্র পরিষ্কার করতে।’
দেবদত্ত এবার বললেন, ‘আমি এ কার্য করতে পারব না।’
মৌদ্গল্যায়ন এবার বাধ্য হয়েই একটু কঠিন স্বরে বললেন, ‘সংঘে অবস্থান করলে আমাদের সবাইকেই সংঘের অনুশাসন মেনে চলতে হয়। ইতিপূর্বে আপনাকে একদিন সংঘের সমুখ ভাগের প্রাঙ্গণ পরিষ্কার করতে বলা হয়েছিল, তা আপনি করেননি। সংঘের অন্যতম প্রধান পরিচালক হয়েও আমি নিজে সে কাজ করেছি। তাতে আমার মান যায়নি। প্রয়োজনবোধে আমি আবার সে কাজ করব। কিন্তু সংঘের রীতি-নীতি, অনুশাসন আমি ভঙ্গ হতে দিতে পারি না। যাকে যে দায়িত্ব অর্পণ করা হয় তাকে সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে, এটাই সংঘের নিয়ম। তাই অনুরোধ নয়, সংঘের মহাপরিচালন সমিতির সদস্য হিসাবে আমি আপনাকে নির্দেশ দিচ্ছি!’
তরুণ ভিক্ষুদের সামনে মৌদ্গল্যায়নের মুখ থেকে এমন কথা শুনে তীব্র অপমানিত বোধ করলেন দেবদত্ত। তিনি আর একটাও কথা না বলে সে স্থান ত্যাগ করে নিজ কক্ষে ফিরে এলেন।
প্রত্যাখ্যানের জ্বালার সঙ্গে এবার অপমানের যন্ত্রণাতেও বিদ্ধ হতে থাকলেন দেবদত্ত। তিনি অনুধাবন করলেন না, ভিক্ষু মৌদ্গল্যায়ন তাঁকে কোনও অন্যায্য কথা বলেননি। তবে একটা সত্য তিনি অনুভব করলেন যে, বুদ্ধ বা ভিক্ষু সংঘের প্রধান শক্তি হল তার ঐক্য ভাবনা। সংঘের ঐক্য যদি বিনষ্ট করা যায়, তবে বুদ্ধের শক্তিও বিনষ্ট হবে। তখন তিনি নিজেকে বুদ্ধ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন।
কিন্তু, সংঘতে তিনি কীভাবে ভাঙন ধরাবেন? বৃজি থেকে আগত তাঁর কিছু অনুগত ভিক্ষু আছেন ঠিকই, কিন্তু তাদের সংখ্যাটা এই সংঘ ভাঙার পক্ষে যথেষ্ট নয়। যেসব স্থানে সংঘ প্রতিষ্ঠা হয়েছে, তার মধ্যে বৃজির এই সংঘ অন্যতম প্রধান সংঘগৃহ। প্রায় একসহস্র ভিক্ষু বাস করেন এ স্থানে।
ভাবতে ভাবতে হঠাৎ এই সংঘে বসবাসকারী তিনজন ভিক্ষুর কথা মনে এল তাঁর। বুদ্ধ শিষ্য কোকালিক, খণ্ডদ্রব্য ও সমুদ্রদত্ত। এঁরা তিনজনই রাজবংশজাত। তারা দেবদত্তকে বেশ সমীহ ও সম্মান করে চলেন। দেবদত্ত লক্ষ করেছেন তাঁদের তিনজনের মধ্যেই সংঘে আধিপত্য বিস্তারের ব্যাপারে উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে। হয়তো-বা সেটা তাঁদের রাজরক্তের জন্যই।
বয়সে তারা নবীন। তাদের প্রত্যেকের কিছু নিজস্ব অনুগামীও আছে, যাদের নিয়ে তারা সংঘের আশ্রয় নিয়েছিলেন। দেবদত্ত ভেবে দেখলেন, তাদের যদি তার পরিকল্পনার সঙ্গী করা যায় তবে তা বাস্তবায়ন সম্ভব। তাছাড়া বুদ্ধ নিজেও স্নেহ করেন এই তিনজনকে। কাজেই তাদেরকে যদি সংঘচ্যুত করা যায় তবে বুদ্ধকেও আঘাত করা যাবে।
দেবদত্ত নিজের পরিকল্পনা সাজিয়ে নিলেন। সন্ধ্যার পর যখন সংঘের প্রধান ভিক্ষুরা শালবনে বুদ্ধবাণী শ্রবণের উদ্দেশে গমন করলেন, দেবদত্ত গিয়ে হাজির হলেন ওই তিন যুবা ভিক্ষুদের কক্ষে।
তিনি তাদের বললেন, ‘আপনাদের সঙ্গে আমার কিছু গোপন পরামর্শ আছে, যা আপনাদের ভবিষ্যতের জন্য হিতকর হবে। আজ মধ্যরাতে আমার কক্ষে আসুন। আপনাদের সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা আছে।’
রাত্রি গভীর হল। একটি একটি করে দীপ নিভে গেল, ভিক্ষুকুল নিদ্রামগ্ন হল। ঠিক সেই কালরাত্রিতে কোকালিক, খণ্ডদ্রব্য ও সমুদ্রদত্ত দেবদত্তর প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে দেবদত্তর কক্ষে প্রবেশ করলেন।
তিনজনের উদ্দেশে দেবদত্ত বললেন, ‘আপনারা তিনজনই উচ্চ রাজবংশজাত। আর সেই কারণেই আমি অন্য ভিক্ষুদের চেয়ে আপনাদেরকে পৃথক বলে মনে করি, শ্রদ্ধা করি, স্নেহ করি। ভিক্ষু সংঘে এমন অনেক ভিক্ষু আছেন যাঁরা পূর্বে চামার-চণ্ডাল-ব্যাধের পেশায় নিযুক্ত ছিল। এমনকী সংঘের মহাপরিচালক মণ্ডলীর মধ্যেও এমন অনেকে আছেন, যাদের কোনও বংশগরিমা নেই। যে যাই বলুন না কেন, আপনাদের মতো উচ্চ বংশজাতদের আমি কখনোই তাঁদের সঙ্গে এক আসনে বসাতে পারি না।’
ধূর্ত সন্ন্যাসীর স্তুতিবাক্যে খুশি হলেন উচ্চ রাজবংশজাত তিন তরুণ ভিক্ষু সন্ন্যাসী।
দেবদত্ত বললেন, ‘আপনারা তিনজনই বয়সে নবীন হলেও, কর্মঠ, বিচক্ষণ ও নানা বিদ্যায় শিক্ষিত। আপনাদের কি মনে হয় না যে ওই মহাকাশ্যপ, মৌদ্গল্যায়ন, শ্রীগুপ্তর মতো বৌদ্ধ বৃদ্ধ ভিক্ষুদের চেয়ে আপনারা সংঘ পরিচালনা করতে অধিক সক্ষম?’
সমুদ্রদত্ত বললেন, ‘হ্যাঁ, আমারও তা মনে হয় বইকি! এক সময় আমি কিছু দিন একটা রাজ্য পরিচালনার দায়িত্বে ছিলাম। সে কাজ সংঘ পরিচালনার থেকে বেশি কঠিন কাজ বলে মনে হয়।’
দেবদত্ত পালটা প্রশ্ন করলেন, ‘তবে আপনারা সে দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন না কেন?’
কোকালিক বললেন, ‘ভন্তে, আপনি কী বলতে চাইছেন, তা বুঝিয়ে বলুন।’
দেবদত্ত বললেন, ‘আমি চাই অকর্মণ্য, বৃদ্ধ পরিচালক মণ্ডলীর সংঘ পরিচালনার অবসান ঘটিয়ে আপনারা সংঘের মহাপরিচালকের স্থান গ্রহণ করুন। ষোড়শ মহাজনপদে যেখানে যত মঠ-সংঘ আছে তাদেরকে আপনারা নিয়ন্ত্রণ করুন।’
এ কথা শুনে খণ্ডদ্রব্য বললেন, ‘তা কী করে সম্ভব? সংঘের সম্মিলিত সভা যতক্ষণ না কাউকে সংঘের মহাপরিচালন সমিতি থেকে অব্যাহতি দান করছে অথবা আমাদের সে স্থানে অন্তর্ভুক্ত করছে ততক্ষণ তো তা সম্ভব নয়।’
সমুদ্রদত্ত বললেন, ‘আর আমাদের ইচ্ছা থাকলেও ভিক্ষুরা তা করতে যাবেনই বা কেন? মহাপরিচালক মণ্ডলীতে যারা আছেন—শ্রীগুপ্ত, মৌদ্গল্যায়ন, সুভূতি, কাত্যায়ন—তাঁরা বয়ঃবৃদ্ধ হলেও বুদ্ধের প্রধান শিষ্য। অধিকাংশ ভিক্ষুই তাঁদের শ্রদ্ধা-ভক্তি করেন। আর স্বয়ং বুদ্ধও তাদের পরামর্শ মেনে চলেন।’
দেবদত্ত বললেন, ‘হ্যাঁ, তাঁরাই চক্রব্যূহ রচনা করে ঘিরে রেখেছেন বুদ্ধকে। মহাপরিচালকমণ্ডলীর তরুণ প্রতিনিধি বলতে তো দশজনের মধ্যে মাত্র তিনজন—অনিরুদ্ধ, আনন্দ আর বুদ্ধপুত্র রাহুল। অন্য কোনও নবীন ব্যক্তিকে বুদ্ধের বয়োজ্যেষ্ঠ পরিচালক মণ্ডলীর সদস্যেরা তাদের দলে অন্তর্ভুক্ত করতে চান না।’
‘এর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে?’ জানতে চাইলেন কোকালিক।
দেবদত্ত কপটতার আশ্রয় নিয়ে বললেন, ‘কারণ অবশ্যই আছে। বহু রাজা ও ধনী ব্যক্তিরা বুদ্ধদর্শনে এসে বহু দুর্মূল্য রত্ন-অলংকার-স্বর্ণ ইত্যাদি বুদ্ধের পদতলে দান করছেন। বুদ্ধ তো সেসব জিনিস নিজের কাছে রাখেন না। তা তিনি তাঁর প্রধান শিষ্যদের হাতে তুলে দেন। সংঘের প্রয়োজনে তার অতি সামান্য অংশই ব্যয় করেন তাঁরা, বাকিটা নিজেরা আত্মসাৎ করেন। চীবরের আড়ালে বর্তমানে তাঁরা অনেকেই রাজসম্পদের অধিকারী হয়ে উঠেছেন। আমার ধারণা এই কারণে তাঁরা মহাপরিচালক মণ্ডলীতে নতুন কাউকে জায়গা দিতে চান না।’
দেবদত্তর কক্ষে উপস্থিত তিনজনই নবীন সন্ন্যাসী। কিছুকাল আগে পর্যন্ত তাঁরা রাজ-ঐশ্বর্য, রাজ-সুখ ভোগ করেছেন। জাগতিক কামনা বাসনা থেকে এখনও তারা নিজেদেরকে মুক্ত করতে পারেননি। তাই দেবদত্তর মিথ্যা ভাষণ প্রভাবিত করে ফেলল তাঁদের, ধনরত্ন স্বর্ণ ইত্যাদি লাভের লালসা অতি সত্বর তাঁদের মধ্যে সংক্রামিত হয়ে গেল।
কোকালিক বললেন, ‘কীভাবে তবে সংঘ পরিচালনার অধিকার লাভ করা যায়?’
দেবদত্ত বললেন, ‘সে পথ আমি ভেবে রেখেছি। আপনারা আমার পাশে থাকলেই হবে। আমি একগুচ্ছ প্রস্তাব উপস্থিত করব বুদ্ধের কাছে। তিনি যদি তা মেনে নেন, তবে সংঘ পরিচালনার ব্যাপারে আপনাদের পথ উন্মুক্ত হবে। কারণ, ওই প্রস্তাব বুদ্ধ মানলেও অধিকাংশ ভিক্ষুই তা মানতে অস্বীকার করবেন।
‘সংঘের মধ্যে মতবিরোধ হবে, ভাঙন ঘটবে, সংঘ দুর্বল হবে। আর সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সংঘের ক্ষমতাদখল করতে পারবেন আপনারা। আর, আমি এমনভাবে বাকি রাত জেগে প্রস্তাবগুলি তৈরি করব, যে বুদ্ধ যদি প্রস্তাবগুলি না মানেন ও আমরা যদি সে কথা ভিক্ষুদের মধ্যে সঠিকভাবে প্রচার করতে পারি, তবে সে ক্ষেত্রেও সংঘে ভাঙন সৃষ্টি করতে পারব আমরা। এখনকার সংঘ ভেঙে বেরিয়ে নতুন সংঘ প্রতিষ্ঠা করব আমরা।
‘সেই সংঘের মুখ্য পরিচালক হবেন আপনারা তিনজন। একবার কোনও এক সংঘে ভাঙন ধরাতে পারলে অন্য সংঘেও ভাঙন ধরতে বেশি দিন লাগবে না। অচিরেই আমাদের প্রবর্তিত সংঘ প্রধান সংঘের রূপ নেবে। নানান স্থানে শাখা প্রতিষ্ঠিত হবে তার। মহাজ্ঞানী বুদ্ধও এক সময় বাধ্য হবে আপনাদের সংঘকেই প্রধান সংঘ হিসাবে স্বীকৃতি দিতে।’ নিজের পরিকল্পনার কথা তিন প্রভাবশালী তরুণ বুদ্ধশিষ্যর কাছে ব্যক্ত করলেন দেবদত্ত।
কোশল রাজবংশধর খণ্ডদ্রব্য বললেন, ‘আপনার পরিকল্পনা উত্তম। কিন্তু কাজে নামার আগে আমার একটি ব্যাপারে জানার আছে। বর্তমানে সংঘ পরিচালনার জন্য যা ব্যয় হয়, সে অর্থ বিভিন্ন রাজা-মহারাজারা দিয়ে থাকেন। তারাই সংঘগৃহ নির্মাণ করে দেন। আমরা না হয় সংঘ ভেঙে বেরিয়ে গিয়ে নতুন সংঘ প্রতিষ্ঠা করলাম। কিন্তু তার পৃষ্ঠপোষকতা কে করবেন? প্রাথমিক অবস্থায় সংঘ প্রতিষ্ঠা ও তা পরিচালনার জন্য তো বিপুল অর্থেরও প্রয়োজন হবে।’
দেবদত্ত এবার তাঁদের আশ্বস্ত করে বললেন, ‘তা করবেন স্বয়ং মগধ সম্রাট অজাতশত্রু। তিনি আমার মিত্র হন। আপনারা বয়সে নবীন তাই হয়তো আপনারা জানেন না যে, তাঁর সিংহাসন আরোহণের সময় আমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলাম। আমার পরামর্শ অনুসরণ করেই তিনি আজ মগধের রাজা থেকে সম্রাট হয়েছেন। ষোড়শ মহাজনপদের এক তৃতীয়াংশ জনপদ আজ তাঁর পদানত। এমনকী কাশীর মতো বৃহৎ প্রাচীন শক্তিধর রাজ্যও আজ অজাতশত্রুর আজ্ঞানির্ভর। তিনি আমাদের পৃষ্ঠপোষকতা করবেন এ বিশ্বাস আমার আছে। আর সম্রাটের পৃষ্ঠপোষকতায় আমাদের সংঘ ছড়িয়ে পড়বে ষোড়শ মহাজনপদের নানা প্রান্তে।’
সম্রাট অজাতশত্রুর সঙ্গে দেবদত্তর পূর্ব সম্পর্কের কথা জানা না
থাকলেও, তিনি যে বর্তমানে জম্বুদ্বীপের ক্ষমতাবান শাসক তা উপস্থিত তিনজনেরই জানা আছে। তাই তাঁদের মধ্যে আর কোনও সংশয় রইল
না।
কোকালিক বললেন, ‘আমরা আপনার প্রস্তাবে রাজি। কিন্তু একটা প্রশ্ন, ‘মগধ সম্রাট অজাতশত্রু তো বৌদ্ধ ধম্ম বিদ্বেষী। তিনি সংঘের পৃষ্ঠপোষকতা করবেন কি?’
দেবদত্ত হেসে বললেন, ‘তার পেছনে আরও একটা কারণ আছে।’ এবারও তিনি তিনজনকে প্রভাবিত করার জন্য কপটতার আশ্রয় গ্রহণ করলেন। দেবদত্ত বোধিলাভের অভিপ্রায় কয়েক বৎসর একাকী অরণ্যে তপস্যা করেছিলেন। সেই তপস্যা বা সাধনার ফলে তিনি বোধি বা বুদ্ধত্ব লাভ না করলেও কয়েকটি ক্ষুদ্র গুপ্তবিদ্যা আয়ত্ত করেছিলেন। তার মধ্যে একটি ক্ষমতা হল ক্ষণিকের তরে অন্যদের দৃষ্টিবিভ্রম ঘটানো। সেই বিদ্যাই এবার প্রয়োগ করলেন তিনি।
দেবদত্ত তাদেরকে বললেন, ‘আপনারা আমার দিকে তাকিয়ে থাকুন। আমি ধ্যান মুদ্রায় বসছি। আমার দক্ষিণ হস্ত যখন ভূমি স্পর্শ করবে তখন আপনারা চোখের পাতা মুদে আবার পরক্ষণেই তা খুলবেন। তারপর আবার দ্বিতীয়বার একই কাজ করবেন।’
দেবদত্ত ধ্যান মুদ্রায় বসলেন। তাঁর কথামতো যখন তিনি দক্ষিণ হস্ত দিয়ে ভূমি স্পর্শ করলেন তখন তাঁরা তিনজন দেবদত্তর নির্দেশমতো কাজ করলেন। চোখের পাতা মুদে তারপর তা খুলতেই তারা দেখলেন দেবদত্ত নন, তাদের সামনে এক বালক বসে আছে! আর এরপর তাঁরা দ্বিতীয়বার সে কাজ করে চক্ষু মেলে দেখলেন, আবার দেবদত্ত নিজের স্থানে ফিরে এসেছেন!
বিস্মিত সমুদ্রদত্ত বলে উঠল, ‘আপনি দেখছি অলৌকিক শক্তির অধিকারী!’
দেবদত্ত বললেন, ‘হ্যাঁ, কারণ, আমিই ভবিষ্যতের বুদ্ধ। আর এ খবর অজাতশত্রুর জানা। ভবিষ্যতের বুদ্ধের ওপর কোনও বিদ্বেষ নেই তাঁর। তিনি আমাকে তাই শ্রদ্ধা করেন।’
৫
পরদিন সকালে একদল যুবা ভিক্ষু এসে উপস্থিত হল দেবদত্তর দ্বারে। মৌদ্গল্যায়ন তাঁদেরকে পাঠিয়েছেন পূর্ব পরিকল্পনামতো তাঁর সাহায্যের জন্য। দেবদত্ত হেসে বললেন, ‘ভন্তে, মৌদ্গল্যায়নকে বলো, ওই পক্ষীবিষ্ঠা পরিষ্কার করার কাজে আমি যোগ দিতে পারছি না। কারণ, আমি খানিক পর মহাজ্ঞানী বুদ্ধের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাব। অপরিষ্কার দেহ নিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়া উচিত নয়।’
সূর্য যখন মধ্যগগনে, দেবদত্ত সংঘের তিন আবাসিক বুদ্ধশিষ্য কোকালিক, খণ্ডদ্রব্য ও সমুদ্রদত্তকে নিয়ে রওনা হলেন বুদ্ধের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার উদ্দেশে। কৌশলি দেবদত্ত বিশেষ কারণবশত এই সময়কাল নির্বাচন করেছেন। কারণ এ সময়কালে বহু মানুষ বুদ্ধের কাছে উপস্থিত হন, তার ধম্মকথা শোনার জন্য। দেবদত্ত চান, তিনি যে বক্তব্য উপস্থাপিত করবেন এবং বুদ্ধ যা প্রত্যুত্তর দেবেন তা যেন লোকমুখে প্রচারিত হয়।
শালবনের শীতল ছায়ায় বসে মহাজ্ঞানী বুদ্ধ তখন কিছু মানুষ আর একদল তরুণ ভিক্ষুকে ধর্ম উপদেশ দিচ্ছিলেন। তিনি বলছিলেন, ‘তোমরা কোনোদিন অন্যায় কাজে লিপ্ত হোয়ো না, কারও সঙ্গে হিংস্র আচরণে লিপ্ত হোয়ো না। তাহলে তোমাদের সেই পাপের ফল পেতে হবে। কর্মফল কেউ এড়াতে পারে না, তা ভালো হোক বা মন্দ হোক, ইহজন্মর হোক বা পূর্বজন্মর হোক। এমনকী আমিও তা এড়াতে পারি না। কর্মফলের জন্য ব্যক্তিমানুষই দায়ী হন। অপর কোনও মানুষ নয়।’
ঠিক এই সময় তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালেন কোকালিক, খণ্ডদ্রব্য আর সমুদ্রদত্ত। এবং তাদের কিছুটা তফাতে সন্ন্যাসী দেবদত্ত। বুদ্ধ প্রথমে তাঁকে খেয়াল করেননি। তবে তিন যুবক ভিক্ষুকে দেখে মহাজ্ঞানী বেশ প্রীত হলেন। কারণ, এই তিন যুবক রাজসুখ ত্যাগ করে ভিক্ষুর জীবন বেছে নিয়েছেন।
তাদের দেখে বুদ্ধ কোমল সুরে বললেন, ‘তোমরা সব কুশল তো?’
তাঁরা জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ।’
প্রেমময় বুদ্ধ আবার জানতে চাইলেন, ‘আমার কাছে কি তোমাদের কোনও বক্তব্য আছে?’
বক্তব্য থাকলেও মহাজ্ঞানীর ব্যক্তিত্বের সামনে তাঁরা কেউই মুখ খুলতে পারলেন না। কাজেই দেবদত্ত এবার তাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন। তারপর তথাগতকে বললেন, ‘ইতিপূর্বে আমি আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলাম। সেদিন আপনি সংঘের হিতসাধনের ব্যাপারে আমাকে চেষ্টা করার উপদেশ দিয়েছিলেন। আমি আপনার পরামর্শ মেনে সংঘ ও ভিক্ষুদের হিতসাধনের জন্য এই তিনজন যুবা ভিক্ষুর সঙ্গে আলোচনা করে ভিক্ষু ও সংঘ পরিচালনার ব্যাপারে কিছু মতামত ব্যক্ত করতে এসেছি।’
মহাজ্ঞানী বললেন, ‘আপনাদের মতামত যদি সংঘ ও ভিক্ষুদের পক্ষে উপকারী হয়, তবে আমি তা গ্রহণের জন্য অবশ্যই মহাপরিচালক মণ্ডলীকে তা নিয়ে আলাপ করতে বলব। আপনাদের পরামর্শ আমাকে বলুন।’
দেবদত্ত বলতে শুরু করলেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে বৈদিক ঋষিরা কঠিন কৃচ্ছ্রসাধন আর তপস্যা করতেন জ্ঞানলাভের জন্য। মানুষ তাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। ঋষি-মুনিদের জ্ঞানের কারণেই বৈদিক ধর্ম সারা জম্বুদ্বীপে ছড়িয়ে পড়েছে হাজার বছর ধরে। আজও জম্বুদ্বীপ বা ষোড়শ মহাজনপদের অধিকাংশ রাজ্যই পরিচালিত হয় বৈদিক দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই। তাই নবীন বৌদ্ধ ধম্মকে যদি তাদের সমকক্ষ হয়ে উঠতে হয়, ভবিষ্যতে হাজার হাজার বছর ধরে সংঘের আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়, তবে ভিক্ষু সংঘের বর্তমান নিয়ম-নীতির কিছু পরিবর্তন দরকার। তার জন্য পাঁচটি পরামর্শর কথা আমি ব্যক্ত করছি—
‘প্রথমত, প্রধান ভিক্ষুরা অরণ্যে গিয়ে বাস করবেন, সংঘ গৃহতে নয়। নচেৎ তাঁরা ধর্মচ্যুত হবেন।
‘দ্বিতীয়ত, তারা শুধুমাত্র ভিক্ষাকার্য করে আহারগ্রহণ করবেন। কোনও নিমন্ত্রণ গ্রহণ করবেন না, বা উপহার গ্রহণ করবেন না। করলে তাঁরা পাপী বলে গণ্য হবেন।
‘তৃতীয়ত, তাঁরা মাছ, মাংস আহার করবেন না। শুধু ভিক্ষালব্ধ তণ্ডুলসিদ্ধ আহার করবেন। নচেৎ তাঁরা পাপী বলে গণ্য হবেন।
‘চতুর্থত, তাঁরা কেবলমাত্র পাংশুকুল চীবরই পরিধান করবেন, নিজ হস্তে তা প্রস্তুত করবেন। কোনও দানের চীবর পরিধান করলে তাঁরা লোভী ও দোষী বলে চিহ্নিত হবেন।
‘পঞ্চমত, তাঁরা বাকি জীবন অরণ্যের বৃক্ষতলে বসবাস করবেন। গ্রামে বা সংঘে প্রত্যাবর্তন করলে তাঁরা তাঁদের ভিক্ষুত্ব হারাবেন।
‘এই নিয়মের প্রচলন করলে ধম্মপ্রচার বা সংঘ পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনও অসুবিধা হবে না। আপনার সামনে যে যুবক ভিক্ষুরা দাঁড়িয়ে আছেন তাঁরা কর্মঠ। তাঁরাই সংঘ পরিচালনা ও ধম্মপ্রচারের দায়িত্ব নেবেন।’
দেবদত্তর পরামর্শ মন দিয়ে শোনার পর মহাজ্ঞানী কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে বললেন, ‘আপনার কোনও পরামর্শই গ্রহণীয় মনে হল না। তাই আপনার বক্তব্য নিয়ে সংঘকে আলোচনা করার পরামর্শ দেব না। কারণ, তাতে সংঘের মঙ্গল হবে না ও ধম্মপ্রচারের কাজে বিঘ্ন ঘটবে। প্রবীণ সন্ন্যাসীরা দীর্ঘদিন ধরে সংঘ পরিচালনায় কাজে অভিজ্ঞ। নবীনরা সে অভিজ্ঞতা অর্জন করেননি এখনও। বৃদ্ধ, বয়োজ্যেষ্ঠ সন্ন্যাসীর এখনও ধম্মপ্রচারের জন্য পরিশ্রম করেন, কৃচ্ছ্রসাধন করেন। অকারণে তাদের বনে গিয়ে কৃচ্ছ্রসাধনের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।
‘বৌদ্ধ ধম্মধারীদের অন্যতম চিহ্ন এই চীবর। তা প্রত্যাখান করার অর্থ চীবরদাতাকে অপমান করা। আর ভিক্ষুরা কোন আহার গ্রহণ করবেন, মাছ-মাংস ভক্ষণ করবেন কি করবেন না, তা তাদের ব্যক্তিগত রুচির ওপর নির্ভরশীল। এ ব্যাপারেও আমি তাঁদের পরামর্শ দিতে পারি না।’
দেবদত্তর সব পরামর্শই সঙ্গত কারণে প্রত্যাখান করলেন মহাজ্ঞানী বুদ্ধ। সে কথা উপস্থিত ভক্তমণ্ডলী ও অন্য ভিক্ষুরা শ্রবণ করলেন। নিজেদের বক্তব্য বুদ্ধের কাছে উপস্থাপিত করে তিন ভিক্ষুকে নিয়ে ফেরার পথ ধরলেন
দেবদত্ত।
তিনি যুবক ভিক্ষুদের বললেন, ‘দেখলেন তো, স্বয়ং বুদ্ধ, যাঁকে আপনারা দেবতাজ্ঞানে শ্রদ্ধা করেন, তিনিও আপনাদের ওপর আস্থা রাখেন না। যাঁর জন্য আপনারা রাজসুখ ত্যাগ করে ভিক্ষু হলেন তিনি আপনাদের ত্যাগের দাম দিতে চান না।’
ক্ষুব্ধ সমুদ্রদত্ত জানতে চাইলেন, ‘তবে এবার আমাদের কী করণীয়?’
দেবদত্ত বললেন, ‘একটাই পথ খোলা আছে, তা হল সংঘ ভেঙে দেওয়া ও নতুন সংঘের প্রবর্তন করা।’
সংঘে ফিরে এসে দেবদত্তর পরামর্শমতো সে কাজেই লিপ্ত হল তাঁরা তিনজন। তাঁদের প্রত্যেকেরই কিছু নিজস্ব অনুগামী ছিল। তাছাড়া তাঁরা একজন প্রধান সন্ন্যাসীকেও পেয়ে গেলেন যাঁরও কিছু নিজস্ব অনুগামী আছে। তাঁর নাম কাঠমোরগাদিত্য। কোনও কারণবশত তিনি ভিক্ষু মৌদ্গল্যায়নের প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন।
তাঁরা সকলে মিলে সংঘের ভিক্ষুদের মধ্যে, বিশেষত যুবক ভিক্ষুদের মধ্যে গোপনে প্রচার করতে লাগলেন, সংঘের মহাপরিচালক মণ্ডলীর প্রবীণ বৃদ্ধ সন্ন্যাসীরা চান না যে যুবকরা তাদের স্থলাভিষিক্ত হোক। কারণ, তাঁরা সংঘ, বা বুদ্ধকে যে মহামূল্য সামগ্রী, অর্থ প্রদান করা হয় তা আত্মসাৎ করতে চান। আর বুদ্ধ নিজেও ওই সব বৃদ্ধ-প্রবীণদের নিজের অজান্তে প্রশ্রয় দিয়ে চলেছেন।
দেবদত্তর নেতৃত্বে এই মিথ্যা প্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে পড়লেন তরুণ
ভিক্ষুরা। তাঁরা ধীরে ধীরে সমর্থন করতে শুরু করলেন কূট দেবদত্তকে। মৌদ্গল্যায়ন, মহাকাশ্যপের কাছে এ খবর পৌঁছল ঠিকই। কিন্তু তারা ভাবলেন, এ অস্থিরতা সাময়িক। সংঘভঙ্গের মতো মহা পাপকাজ ভিক্ষুরা কখনওই
করবেন না। অচিরেই তারা দেবদত্তর সংস্পর্শ থেকে নিজেদের সরিয়ে
নেবেন।
কিন্তু তাঁদের ধারণা ভ্রান্ত প্রমাণিত হল। এক্ষেত্রে সফল হল দেবদত্তর কূট চাল। একদিন দেবদত্ত হিসাব করে দেখলেন বৃজির মহাসংঘের অর্ধেক ভিক্ষু তাঁর সমর্থনে রয়েছেন। এবং তাঁরা এবার সংঘ ভেঙে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছেন।
দেবদত্ত সিদ্ধান্ত নিলেন আর দেরি করা উচিত হবে না। কারণ, তার সমর্থক ভিক্ষুরা মত পরিবর্তন করতে পারেন। সংঘ পরিচালনার জন্য প্রতি মাসে একবার বুদ্ধের উপস্থিতিতে মহাপরিচালক মণ্ডলীর সভা বসে।
দেবদত্ত ঠিক করে নিলেন ওই সভার দিন মহাপরিচালক মণ্ডলীর সদস্যরা যখন সভা করতে রওনা হবেন তখনই তিনি সংঘ ভেঙে ভিক্ষুদের নিয়ে মগধের উদ্দেশে রওনা হবেন। যাতে যাত্রাকালে কেউ তাঁদের বাধা দান করতে না পারেন।
কয়েক দিনের মধ্যেই মহাপরিচালক মণ্ডলীর সভার দিন এসে গেল। মহাপরিচালক মণ্ডলীর সদস্যরা সংঘগৃহ ত্যাগ করে রওনা হলেন শালবনের দিকে। বুদ্ধের উপস্থিতিতে তাদের সভার কাজ শুরু হল।
মধ্যাহ্নে আলোচনা সভাতে হঠাৎ একটা নথির প্রয়োজন হল। ভিক্ষু আনন্দ নথি সংগ্রহের জন্য শালবন থেকে বেরিয়ে রওনা হলেন সংঘগৃহের দিকে। সেখানে পৌঁছে তিনি দেখলেন ভিক্ষু দেবদত্ত, কোকালিক, কাঠমোরগাদিত্য, খণ্ডদ্রব্য, সমুদ্রদত্ত প্রমুখ ভিক্ষুরা আরও বহু শত ভিক্ষুকে নিয়ে সংঘ তোরণের বাইরে বেরিয়ে এসেছেন। আনন্দ বিস্মিতভাবে তাঁদেরকে জিগ্যেস করলেন, ‘আপনারা এ সময় সংঘগৃহ ত্যাগ করছেন কেন?’
দেবদত্ত হেসে বললেন, ‘তোমাদের সর্বজ্ঞানী বুদ্ধকে জানিও এ সংঘ আমি ভেঙে দিলাম। আমরা আর তোমাদের সংঘের অধীনে নই। আমরা সংঘ ত্যাগ করে নতুন সংঘ প্রতিষ্ঠা করতে চলেছি।’
আনন্দ হতবাক হলে গেলেন। সংঘ ভেঙে দেওয়ার মতো পাপকার্য যে ভিক্ষুরা করতে পারেন তা যে কল্পনার অতীত!
কাঠমোরগাদিত্য দেবদত্তকে দেখিয়ে আনন্দকে বললেন, ‘মৌদ্গল্যায়নকে জানিও আমরা আজ থেকে এই ভবিষ্যতের বুদ্ধ দেবদত্তকেই অনুসরণ করে চলব।’
কোকালিক আনন্দকে বললেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠিত নতুন সংঘে যোগ দেওয়ার জন্য আপনাদেরও আমন্ত্রণ জানিয়ে রাখলাম। তবে সে স্থানে আমাদের নির্দেশমতো আপনাদের পরিচালিত হতে হবে।’
হতবাক আনন্দ কারও কথারই কোনও জবাব দিতে পারলেন না। তিনি দেখলেন তাঁর চোখের সামনে দিয়ে সংঘ ভেঙে দিয়ে পাঁচশত ভিক্ষুকে নিয়ে সংঘ ত্যাগ করলেন দেবদত্ত। সে দৃশ্য দেখে আনন্দর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।
দেবদত্ত ভিক্ষুদের নিয়ে আনন্দর চোখের আড়ালে অন্তর্হিত হওয়ার পর সম্বিৎ ফিরল আনন্দর। তিনি ছুটলেন শালবনের দিকে।
আনন্দর মুখে ঘটনার বিবরণ শুনে হতভম্ব হয়ে গেলেন সংঘের মহাপরিচালকরা। তবে বুদ্ধের মধ্যে তেমন ভাবান্তর দেখা গেল না।
প্রাথমিক বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে ওঠার পর শ্রীগুপ্ত, মহাকাশ্যপ, মৌদ্গল্যায়ন প্রমুখেরা বুদ্ধকে বললেন, ‘এখনও তো তারা বেশি দূরে গমন করতে পারেনি। আমরা কি গিয়ে তাদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করব? সংঘের ঐক্য অটুট রাখতে আমরা মহাপরিচালক মণ্ডলী থেকে অবসর নিয়ে তাঁদের আমাদের স্থানে অভিষিক্ত করার জন্য প্রস্তুত।’
মহাজ্ঞানী বুদ্ধ বললেন, ‘না, তাদের এখনই ফিরিয়ে আনতে যাওয়ার দরকার নেই। তাতে সংঘের আরও ক্ষতিবৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে। যারা যাচ্ছে তাদের যেতে দাও। তাঁদের ভুল ভাঙতে কিছু সময় লাগবে। তারপর তাঁরা সংঘে ফিরে আসতে চাইলে আমি আবার তাঁদের গ্রহণ করব।
‘তবে তোমাদেরকে দৃষ্টি রাখতে হবে যে, দেবদত্তর মতো কোনও কূটকৌশলী যাতে আর সংঘ ভাঙতে না পারে। যে স্থানে যত সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাদের ওপর আরও দৃষ্টি রাখতে হবে তোমাদের। আর সে জন্য সংঘগুলির দায়িত্ব নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নাও।
‘আনন্দ আর অনিরুদ্ধ ব্যতীত অন্য কারও আমার সঙ্গে পথ পরিক্রমার প্রয়োজন নেই। তার পরিবর্তে তোমরা সংঘের ঐক্য অটুট রাখতে সময় ব্যয় করো। মনে রাখবে আমার কোনও অলৌকিক শক্তি নেই, যার সাহায্যে আমি সংঘ গড়ে তুলতে পারি বা তাদের ভাঙন রোধ করতে পারি। এ কাজের দায়িত্ব তোমাদের মতো অভিজ্ঞ ভিক্ষুদেরই নিতে হবে। তবেই সংঘের ভাঙন রোধ করা সম্ভব।
‘কোনও সংঘের একজন ভিক্ষুর মধ্যেও যদি ক্ষোভ সঞ্চার হয়, তবে তোমরা সেই ক্ষোভের কারণ অনুসন্ধান করবে। তা প্রশমিত করার চেষ্টা করবে। তার প্রতি বিরূপ হবে না। ভালোবাসা দিয়ে তাদের জয় করার চেষ্টা করবে।’
ভিক্ষু আনন্দ হঠাৎ মহাজ্ঞানীকে জিগ্যেস করে বসল, ‘ভিক্ষু দেবদত্ত তো সংঘ ভেঙে দেওয়ার মতো মহা পাপকার্য করলেন। ধরুন, তিনি যদি কোনও দিন ফিরে আসেন, আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান, ক্ষমা
প্রার্থনা করেন, তবে কি আপনি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন? তাঁকে ক্ষমা করবেন?’
আনন্দ ও তাঁর অন্য শিষ্যদের অবাক করে দিয়ে ক্ষমাময় বুদ্ধ বললেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই। দেবদত্ত এর আগেও আমার বিরুদ্ধে নানা চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছিল। তবু আমি তাঁকে সংঘে আশ্রয় দিয়েছিলাম। তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরে আবার যদি ফিরে আসেন, আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান, তার কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে চান তবে আমি অবশ্যই তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করব, তাঁকে ক্ষমা করব। কারণ ক্ষমাই হল পরম ধর্ম।’
৬
গণ্ডক ও শোন নদীর সংগমস্থলে একটি নতুন দুর্গ নির্মাণ করেছেন মগধ সম্রাট অজাতশত্রু। তিনি এখন সেখানেই বসবাস করেন। জম্বুদ্বীপের মহাজনপদের সবক’টিকে তার পদানত করার আকাঙ্ক্ষা যেন পেয়ে বসেছে তাঁকে।
এ মুহূর্তে মহাজনপদগুলির মধ্যে একটিমাত্র রাজ্যকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী বলা যেতে পারে। সে রাজ্য হল কলিঙ্গ। তবে এ রাজ্য জয় করা সহজ নয়। বিশাল হস্তিবাহিনী আছে তাঁর। সে কারণে তাঁকে পরাজিত করা খুব কঠিন কাজ।
তবে মগধ সম্রাট অজাতশত্রু সহজে তাঁর আকাঙ্ক্ষা থেকে সরে আসার পাত্র নন। ইতিমধ্যেই তিনি গোপনে কলিঙ্গ জয়ের পরিকল্পনা শুরু করে দিয়েছেন।
শোন নদীর পাড়ে মকর সংক্রান্তির দিন পশুমেলা বসে। অতি প্রাচীন মেলা। সে মেলা থেকে সম্রাট হস্তী সংগ্রহ করছেন। তাদের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেছেন কলিঙ্গ জয়ের জন্য। কলিঙ্গ জয় হলে বাকি সব রাজ্য এমনিতেই তার বশ্যতা স্বীকার করবে।
এদিন দ্বিপ্রহরে রাজসভা ভঙ্গ হওয়ার পর সম্রাট অজাতশত্রু একাকী বসে কলিঙ্গ বিজয়ের পরিকল্পনার কথাই ভাবছিলেন। এমন সময় প্রহরী এসে বার্তা দিল, দেবদত্ত তাঁর সাক্ষাৎপ্রার্থী। তিনি যে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসবেন তা আগেই খবর পেয়েছিলেন সম্রাট।
তিনি সমাদরের সঙ্গে পুরোনো মিত্রকে কক্ষে আহ্বান জানালেন। দেবদত্তকে দেখে বেশ অবাকই হয়ে গেলেন সম্রাট। দেবদত্তর আগমনবার্তা না জানা থাকলে তাঁকে চিনতেই পারতেন না অজাতশত্রু। কোথায় দেবদত্তর পরনে সেই সভ্রান্তবংশীয় রাজকীয় পোশাক, কোথায় অলংকার? কোথায় তাঁর শাক্য রাজবংশীয় দীর্ঘ তরবারি?
সম্রাটের সামনে এসে যিনি দাঁড়িয়েছেন তাঁর পরনে বৌদ্ধদের মতো ঘৃণ্য কাষায়বস্ত্র—চীবর। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মতোই তাঁর মস্তক মুণ্ডিত। অথচ এই দেবদত্তই তাঁকে একদিন পরামর্শ দিয়েছিলেন মগধ থেকে বৌদ্ধ ধম্মকে মুছে ফেলতে।
তাঁরই পরামর্শে সহস্র সহস্র বৌদ্ধ ভিক্ষুকে হত্যা করেছেন অজাতশত্রু। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী বেশ কিছু রাজ্যকেও দখল করেছেন। কিন্তু যার পরামর্শে সম্রাট এ কাজে ব্রতী হয়েছেন তাকেই আজ তিনি বৌদ্ধ ভিক্ষুর বেশে দেখছেন! বিস্মিতভাবে দেবদত্তর দিকে চেয়ে রইলেন সম্রাট।
দেবদত্ত সম্রাট অজাতশত্রুর চোখের দৃষ্টি দেখে তাঁর মনের ভাব পড়তে লাগলেন। তিনি অজাতশত্রুকে বললেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই আমার মুণ্ডিত মস্তক ও পরনে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের মতো পোশাক দেখে বিস্মিত হচ্ছেন! কিন্তু বাধ্য হয়েই আমাকে বৌদ্ধ ভিক্ষুর ভেক ধারণ করতে হয়েছিল এবং ভবিষ্যতেও হয়তো কিছুকাল এ বেশ ধারণ করে থাকতে হবে, যতদিন না আমি বুদ্ধের সব সম্মান, ক্ষমতা হরণ করতে পারি। বুদ্ধ আগেও আমার ঘৃণার পাত্র ছিলেন, এখনও আছেন ও ভবিষ্যতেও থাকবেন।
‘বৃজির মহাসংঘ ভেঙে দিয়েছি। পাঁচশত ভিক্ষুকে গৌতম বুদ্ধ ও তাঁর সংঘের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করতে পেরেছি। তাঁদের আমার সঙ্গী করতে পেরেছি। তাঁরা নগরীর দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছেন।’
দেবদত্তর বৌদ্ধ ধম্ম বিদ্বেষের কথা শুনে এগিয়ে গিয়ে তাঁকে আলিঙ্গন করলেন অজাতশত্রু-কুনিক। তারপর বললেন, ‘স্বাগত বন্ধু! আপনার এ বেশ দেখে তো আমি বেশ অবাকই হয়ে গেছি। এবার আপনি আমাকে মগধ থেকে ফিরে যাওয়ার পর আপনার অতীতের কথা খুলে বলুন ও আপনার আগমনের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করুন।’
দেবদত্ত বললেন, ‘আমি ও আমার সঙ্গীরা বড় ক্ষুধার্ত। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মগধে এসে উপস্থিত হয়েছি আমরা। পথমধ্যে বৈশালী-সহ বেশ কিছু জনপদ অতিক্রম করেছি। সংঘ পরিত্যাগ করেছি জেনে বৌদ্ধ ধম্মের প্রতি অনুগত সেই জনপদগুলি আমাদের এককণা খাবারও দেয়নি। আপনি সর্বাগ্রে আমার ও আমার সঙ্গীদের জন্য আহারের ব্যবস্থা করুন। তারপর আমি সমস্ত কথা ব্যক্ত করছি আপনাকে।’
সম্রাট সঙ্গে-সঙ্গেই বন্ধুর জন্য উৎকৃষ্ট খাবার আনার নির্দেশ দিলেন এবং তার সঙ্গে দেবদত্তর পাঁচশত সঙ্গীর জন্যও আহার পাঠাবার নির্দেশ দিলেন।
আহার এল দেবদত্তর জন্য। একখণ্ড হরিণের মাংস মুখে তুলে চিবোতে চিবোতে দেবদত্ত বললেন, ‘ওঃ! কতদিন পর এত উৎকৃষ্ট আহার গ্রহণ করছি। পাপিষ্ঠ গৌতম বুদ্ধ ও তাঁর প্রধান শিষ্যরা শ্রমণদের একবেলা অতি সাধারণ আহার দিয়ে থাকেন। আপনার সাহায্য পেলে অতি শীঘ্রই তাঁদের সকলকে ধ্বংস করব।’
এরপর কথোপকথন শুরু হল দুই বন্ধুর মধ্যে। দেবদত্ত ব্যক্ত করলেন, কেন এবং কোন পরিস্থিতিতে তাকে বুদ্ধের শরণ নিতে হয়েছিল। আর কীভাবে তিনি সংঘ ভাঙার মতো কঠিন সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। আর সম্রাট অজাতশত্রুও তাঁকে জানালেন কলিঙ্গ জয়ের গোপন অভিলাষের কথা এবং তার প্রস্তুতির কথা।
অজাতশত্রু জানতে চাইলেন, ‘বুদ্ধ ও তাঁর প্রদর্শিত ধম্মকে মুছে ফেলার জন্য আপনি আমার কাছে কী ধরনের সাহায্য প্রত্যাশা করেন?’
দেবদত্ত বললেন, ‘আমি চাই সম্রাট অজাতশত্রুর পৃষ্ঠপোষকতা। আপনি আমাদের জন্য নতুন সংঘ গৃহের ব্যবস্থা করে দিন। কিছু কালের জন্য আমাদের আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থা করুন। তাহলে আমরা বৌদ্ধ সংঘগুলো ভাঙতে সক্ষম হব। বুদ্ধের ধম্মও দুর্বল হয়ে যাবে তাতে। তাঁর থেকে মুখ ফেরাবে জনতা। আর তা দেখে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী নৃপতিরাও জনাদেশ মেনে আর বৌদ্ধ ধম্ম অনুসরণ করবেন না।
‘তারা তখন নতুন সংঘেরই অনুসারী হবেন। আর আমি তখন তাদের আপনার সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপনের নির্দেশ দেব। কলিঙ্গ অভিযানে তাঁদের সেনাদল আপনার সহযোগী হলে আপনি কলিঙ্গ জয় করতে সমর্থ হবেন।’
ইতিপূর্বে বন্ধু দেবদত্তর কথা শুনে মগধের সিংহাসন লাভ করেছেন, রাজা থেকে সম্রাট হয়েছেন কুনিক-অজাতশত্রু। এবারও বন্ধু দেবদত্তর কথা শুনে সম্রাটের মনে হল দেবদত্তকে সাহায্য করলে রাজনৈতিকভাবে তিনি লাভবানই হবেন। তাই অজাতশত্রু দেবদত্তকে বললেন, ‘আপনার পরামর্শ গ্রহণ করেই আমি আজ সম্রাট অজাতশত্রু হয়েছি। আমি আপনাকে কথা দিয়েছিলাম যে, যে-কোনও প্রয়োজনে আমি আপনার পাশে থাকব, আপনাকে সাহায্য করব। সে প্রতিশ্রুতি আমি ভুলিনি।
‘পাবাপুরীতে আমি এক গৃহ নির্মাণ করেছিলাম, সেখানে সৈন্যাবাস স্থাপন করার জন্য। কিন্তু পরবর্তীকালে সে গৃহের আর প্রয়োজন হয়নি। সেই গৃহকেই আপনি আপনার প্রতিষ্ঠিত সংঘগৃহ হিসাবে, সংঘের প্রধান কার্যালয়রূপে ব্যবহার করুন। আর সংঘ পরিচালনার জন্য অর্থের অভাব হবে না।’
দেখতে দেখতে এরপর প্রায় তিন মাস অতিক্রান্ত হল। দেবদত্ত সংঘ ভেঙে বেরিয়ে এসে নতুন সংঘ স্থাপন করলেন ঠিকই, বিভিন্ন স্থানের সংঘ ভাঙার প্রচেষ্টাও করলেন, কিন্তু সাফল্য এল না। একজন ভিক্ষুও অন্য সংঘ ভেঙে বেরিয়ে এসে নতুন সংঘে যোগদান করলেন না।
এদিকে নতুন সংঘের বিস্তার না ঘটাতে হতাশা জন্মাতে শুরু করল নতুন সংঘের ভিক্ষুদের মনে। বয়সে তারা অধিকাংশই তরুণ। তাই তাঁদের ধৈর্যও কম। তাই তাদের মধ্যে কেউ কেউ ভাবতে শুরু করলেন বুদ্ধপ্রবর্তিত সংঘ থেকে বেরিয়ে এসে তারা হয়তো ঠিক কাজ করেননি। আর তাদের এ ভাবনা কানে যেতেই দেবদত্ত শঙ্কিত হয়ে উঠলেন।
তিনি প্রমাদ গুনলেন, যদি তাঁর প্রতি আস্থাহীন হয়ে নবীন ভিক্ষুরা আবার বুদ্ধের কাছে ফিরে যান! দেবদত্ত সংকট থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে লাগলেন। তবে তিনি এ সত্যও অনুধাবন করতে পারলেন যে যতদিন তথাগত জীবিত আছেন ততদিন হয়তো-বা তার পক্ষে নতুন করে সংঘ ভাঙা সম্ভব হবে না।
দেবদত্ত কয়েক দিনের মধ্যেই গুপ্তচর মারফত জানতে পারলেন যে বিলম্বে হলেও বুদ্ধ শেষ পর্যন্ত চক্রমনের জন্য গৃধ্রকূট পর্বতে উপস্থিত হয়েছেন। বুদ্ধের সঙ্গী বলতে মাত্র দু’জন—আনন্দ ও অনিরুদ্ধ। বাকিরা বিভিন্ন সংঘের দায়িত্ব সামলাছেন। দেবদত্ত ভেবে নিলেন এ সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন দেবদত্ত। তিনি স্থির করলেন, হত্যা করবেন বুদ্ধকে! পরিকল্পনামাফিক গোপনে গিয়ে উপস্থিত হলেন গৃধ্রকূট পর্বতে।
গৃধ্রকূট পর্বতের ওপরে আছে গিরিবর্ত্ম। সেই সংকীর্ণ পথের দু’পাশে জঙ্গল আচ্ছাদিত পাহাড়ের ঢাল। দেবদত্ত কয়েক দিন ধরে আড়াল থেকে দৃষ্টি রাখতে লাগলেন বুদ্ধ ও তাঁর দুই শিষ্যের ওপর।
পাহাড়ের এক গুহাকেই রাত্রিবাসের স্থান হিসাবে নির্বাচন করেছেন তাঁরা। সকাল ও বিকালে একাকী সংকীর্ণ গিরিপথে চক্রমন করেন গৌতম বুদ্ধ। তারপর ফিরে এসে গুহার সামনে এক প্রস্তরখণ্ডর ওপর ধ্যানমগ্ন হন। অনিরুদ্ধ ও আনন্দ নিয়োজিত থাকেন ফলমূল ও রন্ধনের জন্য কাষ্ঠ সংগ্রহ ইত্যাদি কার্যে।
একদিন বিকালে তথাগত যথারীতি চক্রমন করছিলেন, এমন সময় তাঁকে লক্ষ্য করে পাহাড়ের ঢালের ওপর থেকে এক বিশাল প্রস্তরখণ্ড গড়িয়ে দিলেন দেবদত্ত।
অমিতাভ যদি নির্দিষ্ট পথে হাঁটা চালিয়ে যেতেন, তবে সেই পাথরের আঘাতে নিশ্চিতভাবে তাঁর মৃত্যু হতো। কিন্তু চলতে চলতে হঠাৎই দাঁড়িয়ে পড়তে হল তাঁকে। তিনি দেখলেন পাশের এক ঝোপ থেকে একটা পাখির ছানা ভূপতিত হয়েছে। ছানাটিকে তুলে তার বাসায় রাখার মুহূর্তেই বিশাল এক পাথর গড়িয়ে এসে তাঁর কিছুটা তফাতে পড়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। ওপরে তাকিয়ে মুহূর্তের জন্য বুদ্ধ পলায়মান এক ব্যক্তিকে দেখতে পেলেন।
পাথরের আঘাতে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু এড়ানো গেল ঠিকই, তবে পাথর চূর্ণ হয়ে কয়েকটি ক্ষুদ্র পাথরের টুকরো ছিটকে এসে আঘাত হানল বুদ্ধের উন্মুক্ত পায়ের পাতায়। রক্তাক্ত হল তাঁর চরণ।
চক্রমন শেষ করে বুদ্ধ ফিরে এলেন। তাঁর রক্তাক্ত পদযুগল দেখে আনন্দ ও অনিরুদ্ধ অস্থির হয়ে পড়লেন। বুদ্ধ তাঁদের সমস্ত ঘটনা ব্যক্ত করলেন।
অনিরুদ্ধ বুদ্ধের ক্ষতস্থান ধৌত করে দিয়ে জানতে চাইলেন, ‘কিন্তু আপনি তো পরম বুদ্ধ! আপনি পাপহীন। তবে আপনি প্রস্তরকণাতে রক্তাক্ত হলেন কেন অমিতাভ?’
বুদ্ধ করুণ হেসে বললেন, ‘এজন্মে না হলেও এ আমার পূর্বজন্মের পাপের ফল। পাপ জন্ম-জন্মান্তরেও পিছু ছাড়ে না। কোনও না কোনও জন্মে তার ফল ভোগ করতেই হয়। পূর্বজন্মের কোনও পাপের ফলেই আজ আমার পদযুগল রক্তাক্ত হয়েছে।’
বুদ্ধ গুহার সামনে প্রস্তরখণ্ডর ওপর উপবেশন করলেন। আনন্দ তাঁর চরণে পটি বেঁধে দিচ্ছিলেন, কৌতূহলভরে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘কী সেই পাপকর্ম ভগবান, যার ফল আপনাকে এই জন্মে ভোগ করতে হল?’
‘শোনো তবে আমার পূর্বজন্মের সেই পাপের কাহিনি’, বুদ্ধ তাঁর দুই শিষ্যকে সামনে রেখে বলতে শুরু করলেন, ‘সহস্র বৎসর পূর্বে আমি কাশী নগরীতে এক অতি দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়েছিলাম। অন্নসংস্থানে অপারগ আমার পিতা-মাতা আমাকে পথেই ফেলে রেখে যান। পথ শিশুদের সঙ্গেই বড় হতে থাকি আমি। ছোটখাটো দুষ্কর্মও করতে শিখি।
‘একদিন আমরা কয়েকজন বালক পাথরকণা নিয়ে লোফালুফি খেলছিলাম। সে সময় এক বৃদ্ধ ভিক্ষুক সে পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। খেলতে খেলতে হঠাৎই এক বালকের হাত থেকে পাথরের টুকরো ছিটকে গিয়ে পড়ল সেই ভিক্ষুকের উন্মুক্ত পায়ে। আকস্মিক সেই আঘাতে ভিক্ষুক লাফিয়ে উঠলেন।
‘পাথরখণ্ডের আঘাতে ভিক্ষুকের লাফিয়ে ওঠা দেখে আমি বড় আনন্দ পেলাম। তারপর পাথরকণা নিক্ষেপ করতে লাগলাম সেই ভিক্ষুকের পা লক্ষ্য করে। পাথরের আঘাতে তাঁর পা রক্তাক্ত হয়ে উঠল। তিনি যন্ত্রণায় কাতর হয়ে লাফাতে লাগলেন। আর আমি আরও আনন্দ উপভোগ করতে লাগলাম। তারপর সেই ভিক্ষুক কোনওক্রমে সে স্থান থেকে পলায়ন করলেন।
‘তিনি নিশ্চয়ই আমাকে ক্ষমা করেননি। সেই পূর্বজন্মের পাপের ফল আজ আমি ভোগ করছি।’
এ কাহিনি শোনার পর ভিক্ষু অনিরুদ্ধ বললেন, ‘দেবদত্ত সংঘ ভেঙে দিয়ে পাপ করেছেন, তাও আপনি তাঁকে ক্ষমা করবেন বলেছিলেন। আপনাকে হত্যার প্রচেষ্টা করে আজ যে পাপ করলেন, এখন যদি তিনি আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন, ক্ষমাপ্রার্থনা করতে আসেন, তবে কি আপনি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন? তাঁকে ক্ষমা করবেন?’
প্রেমময় বুদ্ধ হেসে বললেন, ‘তিনি যদি অনুতপ্ত হন এবং সে কারণে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান, ক্ষমাপ্রার্থনা করতে চান, তবে অবশ্যই
আমি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করব। তাঁকে ক্ষমাদান করব। কারণ ক্ষমাই হল পরম ধর্ম।’
৭
বুদ্ধহত্যার প্রথম প্রচেষ্টাতে দেবদত্ত ব্যর্থ হলেন ঠিকই। কিন্তু তাঁর লক্ষ্যে তিনি অটল রইলেন। যেভাবেই হোক, হত্যা করতে হবে বুদ্ধকে!
গৃধ্রকূট পর্বত থেকে ফিরে আসার কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি গিয়ে সাক্ষাৎ করলেন মগধ সম্রাট অজাতশত্রুর সঙ্গে। মগধ সম্রাট বললেন, ‘যতটুকু জানতে পেরেছি যে, আপনার সংঘে নাকি নতুন কেউ যোগদান করেনি, এবং অন্যান্য সংঘগুলোতেও সব কিছু আগের মতোই চলছে। এ সংবাদ আশাহত করেছে আমাকে।’
সন্ন্যাসী দেবদত্ত বললেন, ‘ঠিকই শুনেছেন। সংঘের মহাপরিচালক মণ্ডলীর সদস্যরা সম্মিলিতভাবে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন বাকি সংঘগুলোকে অটুট রাখতে। তাছাড়া, শুনেছি তাঁরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাজাদের শরণাপন্ন হয়েছেন। নিজ নিজ রাজ্যে সংঘের ভাঙন রোধ করতে তাঁরাও নানান ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।
‘তবে, আমিও আর বিলম্ব করতে রাজি নই। একমাত্র বুদ্ধের মৃত্যুই ত্বরান্বিত করবে সংঘের ভাঙন। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী নৃপতিরাও আবার স্বধর্মে ফিরে আসবেন। আমার প্রবর্তিত সংঘে যোগ দেবেন ও আপনার বিরুদ্ধাচারণ বন্ধ করবেন।’
কয়েক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে দেবদত্ত এবার সম্রাটের সামনে তাঁর আসল প্রস্তাবটা রাখলেন। ‘সম্রাট, এখন বুদ্ধকে হত্যা করাই আমাদের প্রধান কাজ। তিনি মাত্র দু’জন সঙ্গী নিয়ে বর্তমানে গৃধ্রকূট পর্বতে অবস্থান করছেন। আমি সেখানে গিয়ে তাঁকে হত্যারও চেষ্টা করেছি, কিন্তু ভাগ্যক্রমে তিনি রক্ষা পেয়েছেন। এবার আপনাকে আমায় সাহায্য করতে হবে।’
সম্রাট অজাতশত্রু বললেন, ‘আপনার ভাবনা যথার্থ। কিন্তু, একটা অন্য বিষয়ও আমাকে ভাবতে হচ্ছে। এই ঘটনা যদি জনসমক্ষে প্রকাশ পায়, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাজারা সম্মিলিতভাবে আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারেন। তখন তাদের প্রতিরোধ করার জন্য আমায় সময় ব্যয় করতে হবে। তাতে আমার কলিঙ্গ অভিযানের প্রস্তুতি ব্যাহত হবে।
‘তাছাড়া, আর কয়েক দিনের মধ্যেই বর্ষা নামবে। বর্ষাকালে এই নিম্নভূমির অনেক স্থানই জলমগ্ন হয়ে যায়। সেসময় আমার পক্ষে অন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা অসুবিধাজনক।’
দেবদত্ত বললেন, ‘এ সবই আমার জ্ঞাত সম্রাট। আমি আপনাকে আশ্বস্ত করছি, আমি আর আপনি ছাড়া দ্বিতীয় কোনও ব্যক্তি জানবে না, কে তাঁকে হত্যা করেছে। কারণ, এ ঘটনার কোনও সাক্ষী থাকবে না।
‘আপনি শুধু কয়েক জন দক্ষ তিরন্দাজ দিয়ে সাহায্য করুন আমাকে। আর এ কাজ বর্ষা নামার আগেই করতে হবে। কারণ, বর্ষা নামলেই বুদ্ধ অন্যত্র চলে যাবেন। বর্ষার তিন মাস বৌদ্ধ ভিক্ষুরা চক্রমন বা পরিক্রমণ করেন না।’
অজাতশত্রু বললেন, ‘হত্যার সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকবে না তা কীভাবে সম্ভব মিত্র?’
কূট-কৌশলী দেবদত্ত বললেন, ‘তবে শুনুন, বুদ্ধ যখন প্রভাতকালে গিরিবর্ত্মে চক্রমনে বেরোবেন, তখন পাহাড়ের উপরিভাগ থেকে আমাদের তিরন্দাজ তাঁকে লক্ষ্য করে শর নিক্ষেপ করবে।
‘গৃধ্রকূট পর্বতে অনেকগুলি গিরিবর্ত্ম আছে। ওঠা নামার অনেকগুলি পথ আছে। শর নিক্ষেপের পর কোন পথে সেই তিরন্দাজ ফিরবে সে নির্দেশ আমি তাকে দিয়ে দেব।
তার জন্য সে পথে অপেক্ষা করে থাকবে আরও দু’জন তিরন্দাজ। তারা তাকে হত্যা করবে। একইভাবে ওই দু’জন তিরন্দাজকে হত্যা করবে সে পথের আরও খানিক নীচে অবস্থানরত চারজন তিরন্দাজ। এ ভাবে সেই চারজনকে আবার হত্যা করবে শেষ আটজন তিরন্দাজ। আর ওই শেষ আট জন তিরন্দাজকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করব আমি।
‘অতএব বুদ্ধ হত্যার আর কোনও সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকবে না।’
শেষ পর্যন্ত দেবদত্তর এই কূট পরিকল্পনাতে সম্মত হলেন সম্রাট অজাতশত্রু। তিনি দেবদত্তকে বললেন, ‘ঠিক আছে। আপনার চাহিদা পূরণ করব আমি।’
আলোচনা শেষে দেবদত্ত মন্ত্রণাকক্ষ থেকে বেরোতে গিয়ে দেখলেন, দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন এক বৃদ্ধা। তিনি অজাতশত্রুর পালক মাতা দাসী উৎপলবর্ণা।
মন্ত্রণাকক্ষের দরজা পর্যন্ত প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু, একমাত্র উৎপলবর্ণার গতিবিধিতে কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই সম্রাট অজাতশত্রুর নির্দেশেই। শুধু তাই নয়, অজাতশত্রু তাকে দাসীবৃত্তি থেকে মুক্তি দিয়েছেন, এবং তাঁকে মাতা বলে সম্বোধন করেন। তাঁর জীবনে উৎপলবর্ণার মতো হিতাকাঙ্ক্ষী যে দ্বিতীয় কেউ নেই, তা সম্রাট বিলক্ষণ জানেন। অজাতশত্রু যখন যে স্থানে অবস্থান করেন, উৎপলবর্ণা তাঁকে অনুসরণ করেন।
দেবদত্ত তাঁর পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার পর উৎপলবর্ণা মন্ত্রণাকক্ষে প্রবেশ করলেন। তাঁকে দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে অজাতশত্রু বললেন, ‘মাতা, আপনি হঠাৎ এ কক্ষে এলেন?’
অজাতশত্রু এখন সম্রাট। তাঁকে সম্রাট বলেই সম্বোধন করার রীতি। তাঁর বৃদ্ধা পালিকা মাতাও তাঁকে সেই সম্বোধনই করেন, ‘সম্রাট, কার্যোপলক্ষ্যে আমি এই কক্ষের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ কক্ষের ভেতর থেকে কিছু কথোপকথন আমার কানে এল। আর আমার পা দু’টি দ্বারের সামনে আটকে গেল। আর সে কারণেই আমি আপনাকে একটি অনুরোধ জানাতে এলাম।’ এই বলে থেমে গেলেন তিনি।
অজাতশত্রু বললেন, ‘কী অনুরোধ মাতা?’
বৃদ্ধা উৎপলবর্ণা বললেন, ‘হয়তো আমার বক্তব্য শোনার পর আপনি আমাকে কারাগারে নিক্ষেপ করতে পারেন, বা মৃত্যুদণ্ডও দিতে পারেন। সে সম্ভাবনা আছে জেনেও, আপনার মঙ্গলকামনায় কথাটা আমাকে বলতেই
হবে।’
অজাতশত্রু বললেন, ‘আপনি নিঃসঙ্কোচে আপনার বক্তব্য আমাকে জানান মাতা।’
উৎপলবর্ণা খানিক ইতস্তত করে বললেন, ‘শঠ দেবদত্তকে সাহায্য করা থেকে বিরত থাকুন। এমন মহা পাপকার্যের সঙ্গে আপনি নিজেকে জড়াবেন না। তাতে ভবিষ্যতে আপনার অমঙ্গল সূচিত হবে। তাছাড়া দেবদত্ত যে পরিকল্পনাই করুন না কেন, তাঁর মতো পাপী কখনোই বুদ্ধহত্যায় সমর্থ হবে না। কারণ, বুদ্ধ মহাজ্ঞানী। তিনি দেবতার অবতার। তাই তো এত মানুষ, এমনকী নৃপতিরা তাঁর পদতলে আশ্রয় নিয়েছেন।’
কথাটা শোনামাত্রই অজাতশত্রুর মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। উৎপলবর্ণার পরিবর্তে কেউ যদি মন্ত্রণাকক্ষের আলোচনা আড়ি পেতে শুনে, তাঁকে অযাচিত উপদেশ দিতে আসতেন, তাহলে অজাতশত্রু সত্যি সত্যি তাঁকে এই ধৃষ্টতার জন্য কারাগারে নিক্ষেপের আদেশ দিতেন।
কিন্তু, অজাতশত্রু তাঁর জীবনে উৎপলবর্ণার অবদান কখনও অস্বীকার করতে পারেন না। তাই তাঁর কথা শুনে মুহূর্তের জন্য উত্তেজিত হয়ে উঠলেও, পরক্ষণেই তাঁর মুখে হাসি ফুটে উঠল।
তিনি নরমস্বরে উৎপলবর্ণাকে বললেন, ‘মাতা, আপনি যে এখনও বুদ্ধের বন্দনা করেন তা আমি জানি। কারণ, প্রতি সন্ধ্যায় আপনার কক্ষের দ্বার বন্ধ থাকে। আমি সেসময় বহু দিন আপনার কক্ষের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ধূপের সুবাস পেয়েছি। আমি পিতাকে কারাগারে নিক্ষেপ করেছি, কিন্তু আপনাকে করিনি, আর ভবিষ্যতেও এ সম্ভাবনা নেই।
আপনার কথামতো বুদ্ধ মহামানব-মহাজ্ঞানী হতে পারেন, কিন্তু আমি শুনেছি যে তিনি নিজেই বলে থাকেন যে মৃত্যুকে প্রতিহত করার ক্ষমতা তাঁর নেই। আর বুদ্ধ নিজে রাজা না হলেও, রাজনীতি না করলেও, তিনি এখন এই ষোড়শ মহাজনপদের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন।
‘আমি দেবদত্তকে সাহায্য করছি ওই রাজনৈতিক কারণেই। রাজনীতি বড় জটিল ব্যাপার, তা আপনি বুঝবেন না। আপনি নিজ কক্ষে ফিরে বিশ্রাম গ্রহণ করুন। আপনার বয়স হচ্ছে। শরীরের প্রতি যত্ন নিন। আর নিজের মনের ওপর চাপ বাড়াবেন না।’
অজাতশত্রু তাঁর সিদ্ধান্তে অটল রইলেন। দেবদত্তর কথামতো তাঁর কাছে তিরন্দাজ পাঠাতে লাগলেন তিনি। বুদ্ধহত্যার জন্য প্রথম যে তিরন্দাজকে পাঠালেন তার নাম চিলপক্ষী। চিলের মতোই তার তির নির্ভুল লক্ষ্যে ছোঁ মেরে মানুষের প্রাণ নিতে পারে।
৮
প্রতিদিনের মতো সেদিনও ভোরবেলা চক্রমনে বেরিয়েছেন অমিতাভ। এমন সময় কিছু দূরে গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল চিলপক্ষী।
ইতিপূর্বে সে কোনওদিন বুদ্ধকে দেখেনি। শুধুমাত্র তাঁর চেহারার বর্ণনা দেওয়া হয়েছিল তাকে। যদিও ধূর্ত দেবদত্ত তাকে ঘুণাক্ষরেও জানতে দেননি, যাকে সে হত্যা করতে চলেছে তিনিই স্বয়ং বুদ্ধ। তিনি চিলপক্ষীকে শুধু বলেছিলেন, এক শ্রমণকে হত্যা করতে হবে তাকে।
ইতিপূর্বে রাজনির্দেশে চিলপক্ষী বহু শ্রমণ হত্যা করেছে। এ কাজে সে অভিজ্ঞ। কিন্তু এবারে চিল বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। তাকে শর রচনা করতে দেখেও, বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বিন্দুমাত্র ভীত হলেন না, বরং তিনি ধীরে ধীরে তার দিকেই এগিয়ে আসছেন। নবীন সূর্যালোকে সন্ন্যাসীর মুখমণ্ডলে হাসি ফুটে উঠেছে।
ভারি আশ্চর্য হল চিল। ইতিমধ্যে সে তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে। সে মনে মনে ভেবে চলেছে এই অদম্য সাহস কোথা থেকে পেলেন এই বৌদ্ধ ভিক্ষু?
কখন যে বুদ্ধ তাঁর সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন চিল তা লক্ষ্যই করেনি। সম্বিৎ ফিরে পেতেই সে দেখল, বৌদ্ধ সন্ন্যাসী আশীর্বাদের হাত তুলে ধরেছেন তার উদ্দেশে।
বিস্মিত চিল তাঁকে প্রশ্ন করল, ‘আমি আপনাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছি দেখেও আপনি ভীত হলেন না কেন?’
বুদ্ধ হেসে বললেন, ‘কারণ, আমি জানি মৃত্যু অপ্রতিরোধ্য হলেও, তার আসার সময় নির্দিষ্ট। সেই সময়ে তাকে প্রত্যাখান করা যায় না। এ সত্য আমি মানি। তোমার হাতে যদি আমার মৃত্যু লেখা থাকে, তবে তো তা খণ্ডাতে পারব না। তাই অযথা পলায়ন করতে যাব কেন?’
চিল বলল, ‘দেবদত্তর নির্দেশমতো আপনাকে এখনই হত্যা করতে হবে।’
বুদ্ধ তিরন্দাজকে বললেন, ‘তুমি সে কাজ করতে পারো। তবে একটা প্রশ্ন আছে। আমাকে হত্যা করার পর কি দেবদত্ত তোমাকে নির্দিষ্ট কোনও পথে ফিরে যেতে বলেছেন?’
তিরন্দাজ চিল বলল, ‘হ্যাঁ।’
বুদ্ধ হেসে বললেন, ‘তবে, তুমি এক কাজ করো। তুমি যে পথ দিয়ে ফিরবে, গিরিবর্ত্মের ওপরে উঠে সে পথ আগে দেখে এসো। তাতে তোমার জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হবে। আমি পালাব না। আমাকে ওই বৃক্ষের সঙ্গে বেঁধে রেখে যেতে পারো। ফিরে এসে প্রয়োজনে হত্যা কোরো আমাকে।’
বুদ্ধের এই অদ্ভুত পরামর্শ শুনে কৌতূহল জন্মাল তিরন্দাজের মনে। বুদ্ধকে গাছের সঙ্গে বেঁধে সে গিরিবর্ত্মের বেশ খানিকটা ওপরে উঠে এসে দেখল, তার ফেরার পথে দু’জন তিরন্দাজ দাঁড়িয়ে আছে। তিরন্দাজ চিলপক্ষীর কাছে সমস্তটা স্পষ্ট হয়ে গেল!
সে বুদ্ধের কাছে ফিরে এসে বলল, ‘আপনি আমার প্রাণ রক্ষা করেছেন, দু’জন তিরন্দাজ আমাকে হত্যা করার জন্য দাঁড়িয়ে আছে।’ এ কথা বলে সে বুদ্ধকে বন্ধনমুক্ত করল।
বুদ্ধ বললেন, ‘হ্যাঁ, আমাকে হত্যা করার পর সাক্ষ্য-প্রমাণ মুছে ফেলার জন্যই ওই দুই তিরন্দাজ নিয়োগ করেছেন দেবদত্ত। তবে তোমার এ স্থানে থাকা উচিত হবে না। ওই দুই তিরন্দাজ তোমার খোঁজে এখানে উঠে আসতে পারে। তুমি কাছেই পর্বত কন্দরে আত্মগোপন করো। আমি না ডাকলে বাইরে আসবে না।’
বুদ্ধের নির্দেশমতোই চিলপক্ষী পর্বত কন্দরে ঢুকে পড়ল। বুদ্ধের অনুমানই সত্যি হল। নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর, সেই দু’জন তিরন্দাজ এসে বুদ্ধকে দেখে জিগ্যেস করল, ‘আপনি কি কোনও তিরন্দাজকে দেখেছেন?
বুদ্ধ বললেন, ‘সে কোথায় আত্মগোপন করেছে আমি জানি। তার সন্ধান তোমাদের আমি দেব। কিন্তু, তাঁকে হত্যা করার পর তোমাদের যে পথে ফিরতে বলা হয়েছে, আড়াল থেকে গিয়ে দেখে এসো যে, সে পথ তোমাদের জন্য নিরাপদ কিনা।’
বুদ্ধের পরামর্শ অনুযায়ী তারা গিয়ে দেখল, তাদের ফেরার পথে চারজন তিরন্দাজ দাঁড়িয়ে আছে। বিস্মিত হয়ে তারা ফিরে এসে বুদ্ধকে সে কথা জানালে, বুদ্ধ তাদের পথের ডান পাশের পাহাড়ের ঢালে আত্মগোপন করতে বললেন।
নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দু’জন তিরন্দাজের দেখা না পেয়ে, অপেক্ষারত চারজন তিরন্দাজ ওপরে উঠে এল। মহাজ্ঞানী তাদেরও একই উপদেশ দিলেন এবং তাদের প্রাণরক্ষার্থে পথের বাম পাশের জঙ্গলে আত্মগোপন করতে বললেন।
এক সময় চারজন তিরন্দাজের খোঁজে আটজন তিরন্দাজ ওপরে উঠে এল। তাঁরা বুদ্ধের কাছে এসে চারজন তিরন্দাজের খোঁজ করতেই তিনি বললেন, ‘ওই চারজনকে হত্যা করে ফিরে যাওয়ার পর দেবদত্ত তোমাদেরও হত্যা করবে।’
এই বলে তিনি আত্মগোপন করা তিরন্দাজদের বাইরে বেরিয়ে আসতে বললেন। এরপর তারা একে একে দেবদত্তের দেওয়া নির্দেশ ব্যক্ত করতে লাগল। অবশেষে দেবদত্তর অভিসন্ধি স্পষ্ট হয়ে গেল সবার কাছে।
মহাজ্ঞানী তাদের সকলকে নিয়ে উপস্থিত হলেন নিজ গুহার সামনে। চিল কৌতূহলী হয়ে তাঁকে জিগ্যেস করল, ‘আপনি কে প্রভু, যিনি অস্ত্রের সামনেও ভীত হন না? যিনি আমাদের মতো ঘাতকদের প্রাণ রক্ষা করলেন! সর্বোপরি দেবদত্ত আপনাকে হত্যা করার জন্য এমন ক্রূর পরিকল্পনা রচনা করেছেন কেন?’
অনিরুদ্ধ তার পরিচয় দান করে বললেন, ‘উনিই হলেন মহাজ্ঞানী বুদ্ধ।’
নাম শুনেই তিরন্দাজরা তাঁর পদতলে লুটিয়ে পড়ল। তাঁরা বলল, ‘আমরা না জেনেই আপনাকে হত্যা করার চক্রান্তে লিপ্ত হয়ে ছিলাম প্রভু! আপনি আমাদের ক্ষমা করুন! আমাদের আপনার পদতলে আশ্রয় দান করুন।’
বুদ্ধ বললেন, ‘আমি তোমাদের ক্ষমা করলাম, কারণ, তোমরা অনুতপ্ত। আমি তোমাদের “আর্য সত্য” দান করব। আশ্রয়ও দেব। এই গুহাতে সংঘ নির্মাণ করে তোমরা বসবাস করবে।’
মধ্যাহ্নে তির-ধনুক ত্যাগ করে চীবর পরিধান করে বৌদ্ধ ধম্ম গ্রহণ করল তিরন্দাজরা। বুদ্ধ তাদের আর্য সত্য সম্পর্কে জ্ঞাত করলেন। অপরাহ্ণে সকলকে নিয়ে গিরিবর্ত্মে পরিক্রমণ করতে বেরোলেন অমিতাভ। চলতে চলতে তিনি তিরন্দাজ ভিক্ষুদের তাঁর ধম্মের কথা শোনাচ্ছিলেন। প্রেম ও ক্ষমাধর্মের কথা বলছিলেন।
আনন্দ তাঁকে জিগ্যেস করলেন, ‘এরপর যদি দেবদত্ত আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসে, ক্ষমা-ভিক্ষা করতে আসে, তবে আপনি কী করবেন প্রভু?’
করুণাময় বুদ্ধ এবারও হেসে বললেন, ‘তিনি যদি তাঁর কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হন, তবে নিশ্চয়ই আমি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করব। তাঁকে ক্ষমা করব।’
এই ঘটনার আভাস সম্রাট অজাতশত্রুর কানে পৌঁছতে বিলম্ব হল না। সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তিনি গুপ্তচর নিয়োগ করলেন। গুপ্তচরের দল ফিরে এসে জানাল গৃধ্রকূট পর্বতের পাদদেশে যে গ্রামগুলি আছে, সে স্থানে নাকি সেই তিরন্দাজের দল ভিক্ষুবেশে মাধুকরী করছে ও বুদ্ধের জয়গান গাইছে।
একজন গুপ্তচর জানাল, সে গৃধ্রকূট পর্বতের ওপরে উঠে দেখে এসেছে, সে স্থানে এক গুহাতে সংঘ নির্মাণ করেছে তাঁরা। গুহার সামনে সংঘধ্বজা উড়ছে। তবে বর্ষার সূচনাতেই নাকি বুদ্ধ সে স্থান ত্যাগ করবেন।
বুদ্ধের এহেন পরিত্রাণ পাওয়ার ঘটনাতে অজাতশত্রু অত্যন্ত বিস্ময় বোধ করলেন। তাঁর মনে প্রশ্ন জাগল, বুদ্ধ কি সত্যিই কোনও অলৌকিক পুরুষ? না হলে এই নিশ্চিত মৃত্যুকে তিনি কীভাবে এড়িয়ে গেলেন? কোন মন্ত্রবলে তিনি তিরন্দাজদের অহিংস বৌদ্ধ ভিক্ষুতে পরিণত করলেন? তিনি কি সত্যি কোনও মহাপুরুষ? বলা বাহুল্য, এ চিন্তা প্রথমবারের জন্য উদয় হল মগধ সম্রাট অজাতশত্রুর মনে।
নিভৃতে উৎপলবর্ণা সম্রাটকে বললেন, ‘সম্রাট, আমি পূর্বেই আপনাকে বলেছিলাম—মহাতাপস, মহাজ্ঞানী বুদ্ধকে হত্যা করা সম্ভব নয় ওই পাপী দেবদত্তর পক্ষে। আপনি অযথা এ কার্যে তাকে সাহায্য করে কালিমালিপ্ত হলেন।’
অজাতশত্রুর সাহায্য নিয়ে যে দেবদত্ত বুদ্ধকে হত্যার চক্রান্ত করে ব্যর্থ হয়েছেন, এ কথা পাবাপুরীতে স্থাপিত নতুন সংঘের নবীন সদস্যদের কাছে বাতাসের চেয়েও দ্রুত ছড়িয়ে গেল। তাঁদের মধ্যে সংশয়ের সৃষ্টি হল নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
৯
দেবদত্ত তাঁর ভাবনা থেকে বিচ্যুত হলেন না। যেভাবেই হোক তাকে বুদ্ধের আসন দখল করতেই হবে। দু’দু’বার বুদ্ধকে হত্যার ব্যর্থ প্রচেষ্ঠা করেও তিনি দমলেন না। তাঁর মনে এই ঘৃণ্য কাজের জন্য কোনওরূপ হতাশা বা অনুশোচনা জাগল না। উপরন্তু বুদ্ধকে হত্যার আকাঙ্ক্ষা আরও তীব্র হয়ে উঠল দেবদত্তর মনে।
তিনি উপলব্ধি করেছেন, অতি শীঘ্র বুদ্ধকে হত্যা করে নিজেকে বুদ্ধরূপে ঘোষণা করতে না পারলে, তিনি ওই পাঁচশত সন্ন্যাসীকে আর পাবাপুরীতে ধরে রাখতে পারবেন না। কারণ, দেবদত্তর ক্ষমতা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে তাদের মনে। এ সংশয়ের নিষ্পত্তি ঘটাতে হবে।
আবার অজাতশত্রুর শরণাপন্ন হতে হবে তাঁকে। হাতে সময় বড় কম। বুদ্ধ বৈশালী নগরী বা অন্যত্র চলে গেলে সম্রাট অজাতশত্রুর সাহায্য আর কাজে আসবে না। দেবদত্তর কানে এসেছে আষাঢ় মাস শুরু হওয়ার তিন দিন আগেই বুদ্ধ গৃধ্রকূট ত্যাগ করে অন্যত্র গমন করবেন।
দিনক্ষণ হিসাব করে দেবদত্ত আবারও সম্রাট অজাতশত্রুর কাছে গিয়ে উপস্থিত হলেন। তাঁকে দেখে প্রথমে বেশ বিরক্ত বোধ করলেন অজাতশত্রু। তিনি তাঁকে বললেন, ‘বিগত কয়েক মাস ধরে আপনার দাবিমতো আপনাকে সর্বপ্রকার সাহায্য করলাম। তা সত্ত্বেও আপনি বুদ্ধ বা সংঘের কোনও ক্ষতিসাধন করতে পারলেন না, উপরন্তু বুদ্ধের শিষ্য সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে!’
দেবদত্ত বললেন, ‘আমি দু’দু’বার ব্যর্থ হয়েছি ঠিকই, কিন্তু এ প্রচেষ্টা আমাদের চালিয়ে যাওয়া উচিত।’
অজাতশত্রু বললেন, ‘মাতা উৎপলবর্ণা আমাকে বলেছিলেন, বুদ্ধ মহাজ্ঞানী-মহামানব। তাঁকে হত্যা করা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। হয়তো-বা তিনি অলৌকিক শক্তির অধিকারী। কেন জানি ক্রমেই আমার মনেও এ ধারণা দৃঢ় হচ্ছে।’
দেবদত্ত বললেন, ‘এ ধারণাকে কদাপি মনের মধ্যে প্রশ্রয় দেবেন না। উৎপলবর্ণা বা যারা এ কথা বলেন, তারা বুদ্ধের প্রতি অনুরক্ত। এই যে আপনি আমার পরামর্শমতো হাজার হাজার বৌদ্ধ ভিক্ষুকে হত্যা করেছেন, মগধে যত স্তূপ, চৈত্য ছিল তা ধরাশয়ী করেছেন, বুদ্ধ যদি এত ক্ষমতাবান হতেন তবে কি তিনি তাঁর অনুগামীদের জীবন রক্ষা করতে পারতেন না? আমাদের তাঁকে হত্যা করার জন্য একটা শেষ চেষ্টা করতেই হবে। লোকে বলে, তৃতীয় চেষ্টা নাকি বিফলে যায় না।’
সম্রাট অজাতশত্রু বললেন, ‘আমি কিন্তু বুদ্ধহত্যার প্রচেষ্টায় আর একজন সৈনিককেও আপনার হাতে তুলে দিতে পারব না। হয়তো দেখা গেল তিরন্দাজদের মতো তারাও বুদ্ধ অনুগামী হয়ে গেল।’
কথাটা শুনে দেবদত্ত বললেন, ‘কপট বুদ্ধ তাঁর কথার মায়াজালে তিরন্দাজদের নিজের দলে টেনেছেন। মানুষকে অতি সহজেই প্রলোভন দেখিয়ে বশীভূত করা যায়। কিন্তু কোনও পশুর ক্ষেত্রে তেমন ঘটার সম্ভাবনা নেই।’
অজাতশত্রু বললেন, ‘কী বলতে চাইছেন আপনি?’
দেবদত্ত বললেন, ‘আপনি নলগিরিকে আমাকে দিন। আমি তাকে দিয়ে বুদ্ধকে হত্যা করব।’
নলগিরি এক পর্বতপ্রমাণ উন্মত্ত হস্তী। অজাতশত্রু বহু যুদ্ধ জয় করেছেন তার সাহায্যে। হত্যা করেছেন বহু শ্রমণকে। তাকে এমন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে যে, চীবর পরিহিত মুণ্ডিতমস্তক কাউকে দেখলেই সে তাকে হত্যা করার জন্য ছুটে যায়।
দেবদত্তর কথা শুনে প্রাথমিক অবস্থায় অজাতশত্রু রাজি হলেন না। কিন্তু দেবদত্ত তাঁকে দেওয়া অজাতশত্রুর পূর্ব প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে সম্রাটকে রাজি করিয়ে ফেললেন। হস্তীশালা থেকে নলগিরিকে নিয়ে দেবদত্ত তার লক্ষ্যপূরণের জন্য রওনা হলেন।
নিজকক্ষ থেকে সমস্ত ঘটনা লক্ষ করলেন উৎপলবর্ণা। তাঁর বুঝতে বাকি রইল না কোন কাজে নলগিরিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অজাতশত্রুর সঙ্গে সাক্ষাতে তিনি বললেন, ‘এবারও দেবদত্ত সফল হবেন না। আপনি ওই দুষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক পরিহার করুন।’
সম্রাট অজাতশত্রুও মনে মনে স্থির করে নিলেন, এবার দেবদত্ত ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে তিনি আর তাঁকে সাহায্য করবেন না।
বর্ষা নামার আগেই অমিতাভ তাঁর দুই শিষ্যকে নিয়ে বৈশালী নগরীর উদ্দেশে রওনা হলেন। পাহাড় থেকে নেমে তাঁরা যখন গ্রামের পথ ধরলেন, সেই সুযোগে দেবদত্ত সে পথে প্রবেশ করালেন নলগিরিকে।
মুণ্ডিতমস্তক চীবরপরিহিত তিন ব্যক্তিকে আসতে দেখেই নলগিরি ছুটল তাঁদের দিকে। তাকে ছুটে আসতে দেখে আনন্দ বুদ্ধের প্রাণরক্ষার্থে নিজে সামনে এসে দাঁড়ালেন।
মহাজ্ঞানী আনন্দকে সরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ওকে আমার কাছে আসতে দাও।’
উন্মত্ত পর্বতপ্রমাণ হস্তী নলগিরি ছুটে এল। তারপর হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। বুদ্ধ নলগিরির উদ্দেশে হাত তুলে আশীর্বাদ করলেন। কোনও অদ্ভুত মন্ত্রবলে শান্ত হয়ে গেল নলগিরি। সে শুঁড় তুলে প্রণাম করল বুদ্ধকে।
মহাজ্ঞানীর এক হস্তে একটি পদ্মফুল ছিল। সেটা তিনি বাড়িয়ে দিলেন নলগিরির দিকে। সেই ফুল শুঁড়ে নিয়ে নলগিরি যাত্রা করল মগধের উদ্দেশে।
আবার বুদ্ধ তার সঙ্গীদের নিয়ে পথ চলতে শুরু করলেন। যেতে যেতে তিনি বললেন, ‘ভালোবাসার কাছে, প্রেমের কাছে শুধু মানুষ নয়, পৃথিবীর সব প্রাণী বশীভূত হয়।’
অনিরুদ্ধ আবার জিগ্যেস করলেন, ‘দেবদত্ত সংঘ ভাঙলেন। এই নিয়ে তিনবার আপনাকে হত্যার চেষ্টা করলেন। এরপরও তিনি যদি আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন, ক্ষমা চাইতে আসেন, তাহলে নিশ্চয়ই এবার আপনি তাঁকে দর্শন দেবেন না, ক্ষমা করবেন না?’
অনিরুদ্ধ আর আনন্দকে অবাক করে দিয়ে ক্ষমাময় বললেন, ‘তিনি যদি অনুতপ্ত হয়ে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন, তবে আমি নিশ্চয়ই সাক্ষাৎ করব। ক্ষমা করব।’
গৃধ্রকূট পর্বতের পাদদেশে যখন এই ঘটনা ঘটছে, তখন পাবাপুরীতেও ঘটছে অন্য এক ঘটনা। কার্যোপলক্ষ্যে এক মঠ থেকে আর এক মঠ যাওয়ার জন্য পাবাপুরী অতিক্রম করছিলেন ভিক্ষু মৌদ্গল্যায়ন, শ্রীগুপ্ত ও কয়েকজন ভিক্ষু। পথে দেবদত্তর অনুচর কোকালিকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল তাঁদের।
কোকালিক ভাবলেন মৌদ্গল্যায়ন ও শ্রীগুপ্ত নিশ্চয়ই তাদের দলে যোগদান করার ইচ্ছা নিয়ে পাবাপুরীতে এসেছেন। তিনি তাঁদের আমন্ত্রণ করে নিয়ে এলেন সংঘগৃহে।
তারপর এই সুসংবাদ দেবদত্তকে জানাবার জন্য রওনা হলেন গৃধ্রকূট পর্বতের পাদদেশের উদ্দেশে। যে স্থানে দেবদত্ত এখন অবস্থান করছেন।
আষাঢ়ের প্রথম দিন ভোর থেকেই তুমুল বর্ষণ শুরু হল। এক দিনেই ফুলে-ফেঁপে উঠল শোন ও গণ্ডক নদীর সঙ্গমস্থল। এই স্থানেই অজাতশত্রুর দুর্গ অবস্থিত। জলের স্রোত সাপের ফণার মতো আঘাত হানতে শুরু করল দুর্গে।
ধীরে ধীরে পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল। ভেসে গেল দুর্গের হস্তীশালা। কলিঙ্গ অভিযানের জন্য যে সকল হস্তী অজাতশত্রু সংগ্রহ করেছিলেন, তারাও ভেসে গেল জলের তোড়ে।
পরদিন সকালে প্রকৃতি শান্ত হলে সম্রাট অজাতশত্রু তার ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণ করে দেখলেন, তার পক্ষে আর এখন কলিঙ্গ অভিযান সম্ভব নয়।
সেদিনই বিকালে সেখানে এসে উপস্থিত হল নলগিরি। তাকে দেখে দুর্গের বাইরে বেরিয়ে এলেন অজাতশত্রু। বেরিয়ে এলেন বৃদ্ধা উৎপলবর্ণাও। নলগিরি তার শুঁড়ে ধরা পদ্মফুলটি সমর্পণ করল সম্রাট অজাতশত্রুর হাতে।
উৎপলবর্ণা বললেন, ‘আমি আপনাকে বলেছিলাম সম্রাট, মহাজ্ঞানীকে হত্যা করা সম্ভব নয়। ওই পদ্ম নিশ্চয়ই ভগবান আপনার উদ্দেশে পাঠিয়েছেন। আপনি শঠ দেবদত্তর কথায় প্ররোচিত হয়ে নলগিরিকে তাকে হত্যা করতে পাঠালেন। আর তার পরিবর্তে বুদ্ধ আপনার জন্য পদ্ম পাঠালেন! তিনি কত প্রেমময়!’
মহাজ্ঞানীর উদ্দেশে প্রণাম জানিয়ে উৎপলবর্ণা বললেন, ‘দেবদত্তর পাপকার্যে লিপ্ত হয়ে আপনি আপনার সকল হস্তীকুলকে হারালেন। আপনার কলিঙ্গ বিজয়ের পরিকল্পনা বিনষ্ট হল। এখনও সময় আছে, আপনি দেবদত্তর সঙ্গ পরিহার করুন। তিনি আপনাকে ক্রমশ আরও বেশি করে পাপকার্যে নিমজ্জিত করছেন।’
বুদ্ধের পাঠানো পদ্ম আর উৎপলবর্ণার কথা প্রভাবিত করল সম্রাট অজাতশত্রুকে। তিনি দ্বাররক্ষীদের নির্দেশ দিলেন, দেবদত্তকে যেন আর প্রাসাদে প্রবেশ করতে দেওয়া না হয়।
এদিকে দেবদত্ত গৃধ্রকূট পর্বতের পাদদেশে অবস্থান করে ভেবে চলেছেন, এবারে অজাতশত্রুর কাছে গিয়ে কী কৌশলে তাঁর সাহায্য লাভ করা যায়?
এমন সময় সেখানে উপস্থিত হলেন কোকালিক। তিনি তাঁকে পাবাপুরীতে শ্রীগুপ্ত ও মৌদ্গল্যায়নের আগমনবার্তা জানালেন। সংবাদ পাওয়ামাত্রই দেবদত্ত উৎফুল্ল হয়ে রওনা হলেন পাবাপুরীর উদ্দেশে।
কিন্তু সংঘে পৌঁছে তাঁরা দেখলেন গৃহ শূন্য। দেবদত্তর অনুপস্থিতিতে মৌদ্গল্যায়ন ও শ্রীগুপ্ত ভিক্ষুদের আসল সত্য বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন। ভিক্ষুরা মৌদ্গল্যায়নদের সঙ্গে রওনা হয়েছেন। বুদ্ধের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, আবার পুরোনো সংঘে যোগদান করবেন বলে।
এ ঘটনা জানার পর উন্মাদ হয়ে গেলেন দেবদত্ত। আর এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে তিনি ছুটলেন মগধের দিকে। যদি অজাতশত্রুর সাহায্যে কোনওভাবে শ্রমণদের গতিরোধ করা যায়!
দেবদত্ত যখন মগধে এসে পৌঁছালেন, তখন দ্বাররক্ষীরা তাঁকে জানিয়ে দিল, তিনি আর দুর্গে প্রবেশ করতে পারবেন না! এমন সময় দুর্গের বাইরে তিনি উৎপলবর্ণাকে দেখতে পেলেন। তাঁকে দেখে দেবদত্ত ক্ষুব্ধভাবে জানতে চাইলেন, ‘আমার দুর্গে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে কেন? আমি সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাই।’
উৎপলবর্ণা বললেন, ‘সম্রাট আপনার সঙ্গে আর সাক্ষাৎ করবেন না। সম্রাটের হিতার্থে আমিই তাঁকে পরামর্শ দিয়েছি, আপনার মতো শঠ ব্যক্তির সংস্পর্শে না থাকতে। আপনি এখন এ স্থান পরিত্যাগ করুন।’
উৎপলবর্ণার কথা শুনে দেবদত্ত আর নিজের ক্রোধ সম্বরণ করতে পারলেন না। তিনি প্রচণ্ড জোরে মুষ্ঠাঘাত করলেন বৃদ্ধা উৎপলবর্ণার শীর্ণ মুখমণ্ডলে। সেই প্রচণ্ড আঘাতে উৎপলবর্ণার চোখের কোটর থেকে মণি দুটো ছিটকে মাটিতে পড়ল। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ভূপতিত হয়ে প্রাণ হারালেন।
আর এরপরই দেবদত্ত অনুধাবন করলেন এ কাজের জন্য অজাতশত্রু তাঁকে ক্ষমা করবেন না, নিশ্চিত হত্যা করবেন। অতি সত্বর তিনি সে স্থান ছেড়ে পলায়ন করলেন।
অবশেষে মগধ থেকে দূরে গিয়ে এক আগ্নেয় পর্বতে আত্মগোপন করলেন দেবদত্ত। সে ভয়ঙ্কর স্থান, অজাতশত্রুর সেনাদের কাছে অগম্য।
উৎপলবর্ণার হত্যার সংবাদ এক সময় বুদ্ধের কাছে পৌঁছাল। তিনি ব্যথিত হলেন। এই প্রথমবার তিনি আনন্দকে বললেন, ‘দেবদত্ত আর কোনওদিন আমার সাক্ষাৎ পাবেন না।’
১০
সময় এগিয়ে চলল। বেশ কয়েক বৎসরকাল অতিক্রান্ত হল। দেবদত্ত একাকী দিন অতিবাহিত করছেন সেই আগ্নেয় পর্বতে। আগ্নেয় পর্বতের আবহাওয়া চরমভাবাপন্ন। মাটির নীচেই লাভা ফুটছে! দেবদত্তর আর বুদ্ধ বা অজাতশত্রু, কারও কাছে ফেরার উপায় নেই। তাই তিনি পর্বতের গরম বাতাসে দগ্ধ হতে থাকলেন।
এদিকে কলিঙ্গ অভিযানে অসমর্থ হলেও, অজাতশত্রু কয়েক বৎসরের মধ্যেই বৃজি আক্রমণ করে বসলেন এক বিশেষ কারণে। বৃজির এক পর্বতে এক দুর্মূল্য গন্ধদ্রব্য পাওয়া যায়। সোনার চাইতেও বেশি দামে তা বিক্রয় হয়। বৃজির সম্পদের প্রধান উৎসই ওই গন্ধদ্রব্য। তা দখলের উদ্দেশ্যেই তিনি বৃজির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শুরু হল দুই রাজ্যের মধ্যে। অবশেষে বহু মানুষকে হত্যা করে তিনি যুদ্ধে জয়ী হয়ে সেই গন্ধপর্বত দখল করলেন।
কিন্তু অজাতশত্রুর মনে শান্তি ফিরল না। উপরন্তু বেশ কিছু উপসর্গ গ্রাস করল তাঁকে। গন্ধপর্বত তাঁর দখলে এলেও, তিনি কোনওরূপ সুগন্ধ গ্রহণের ক্ষমতা হারালেন। কোনওরকমের সুগন্ধই আর তাঁর নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করে না। রাতে ঘুম আসে না তাঁর। যদিও বা আসে, দুঃস্বপ্নরা ঘিরে ধরে। তিনি দেখেন, যাদের তিনি একদা হত্যা করেছেন, সেই কাটামুণ্ডরা তাঁকে ঘিরে নৃত্য করছে।
অবশেষে তিনি একদিন চিকিৎসক জীবকের শরণাপন্ন হলেন। রোগের উপসর্গর কথা শুনে তিনি বললেন, ‘আপনার রোগমুক্তির ঔষধ আমার কাছে নেই। এই উপসর্গ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হল পাপক্ষালন করা। তাতে আপনার মানসিক শান্তি আবার ফিরে আসবে।’
অজাতশত্রু জীবকের পরামর্শ অনুধাবন করলেন। হ্যাঁ, পাপমুক্ত হতে হবে তাঁকে। তাঁর পাপকার্য শুরু হয়েছিল পিতা বিম্বিসারকে কারারুদ্ধ করার সময় থেকে। তাই তিনি সর্বাগ্রে ছুটলেন কারাগৃহের দিকে, তাঁর প্রথম পাপ স্খলনের জন্য।
কারাকক্ষে যখন পিতা-পুত্রর সাক্ষাৎ হল, তখন বিম্বিসারের জীবনের শেষ কিছু সময় মাত্র অবশিষ্ট আছে। অজাতশত্রু তাঁকে বললেন, ‘আমি আপনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছি পিতা। আমি যে অন্যায় করেছি, তার জন্য আমাকে ক্ষমা করুন। আমি আমার রাজমুকুট আপনার পদতলে নামিয়ে রাখলাম। এ মুকুট গ্রহণ করে আপনি আবার মগধের সিংহাসনে বসুন। আপনি আমাকে আমার পাপকার্যের গ্লানি থেকে মুক্তি দিন পিতা।’
বিম্বিসার বললেন, ‘আমি তোমাকে ক্ষমা করলাম পুত্র। কারণ, বুদ্ধ আমাকে এ শিক্ষা দিয়েছিলেন যে, কেউ যদি তার পাপকার্যের জন্য অনুতপ্ত হয়, তবে তাঁকে ক্ষমা করতে হয়। বুদ্ধও তাই করে থাকেন। তবে, তুমি যে শত-সহস্র বৌদ্ধ শ্রমণদের হত্যা করেছ, সে অপরাধ ক্ষমা করার ক্ষমতা আমার নেই। তা কেবলমাত্র করতে পারেন স্বয়ং তথাগত, ক্ষমাময় বুদ্ধ। এই রাজমুকুট তুমি তাঁর চরণতলে নিবেদন করে, শ্রমণদের হত্যা করার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কোরো। তিনি নিশ্চয়ই তোমাকে ক্ষমা করবেন।’
এ কথা বলেই চক্ষু মুদে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন বিম্বিসার। অশ্রুমথিত চোখে কারাগৃহের বাইরে বেরিয়ে অজাতশত্রু জীবকের সাক্ষাৎ পেলেন। অজাতশত্রু তাঁর পিতার বলা শেষ কথাগুলো জানালেন তাঁকে।
জীবক বললেন, ‘মৃত্যুকালে পিতা আপনাকে সঠিক পরামর্শই দিয়েছেন সম্রাট।’
বিম্বিসারের পারলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর মগধ সম্রাট অজাতশত্রু নিরস্ত্রভাবে মগধ ত্যাগ করে রওনা হলেন বৈশালী নগরীর উদ্দেশে। সেখানেই তখন অবস্থান করছেন তথাগত।
বৈশালীর আম্রকাননে তথাগতর সঙ্গে সাক্ষাৎ হল সম্রাট অজাতশত্রুর। বুদ্ধ তাঁকে দেখে স্মিতবদনে বললেন, ‘আমি জানতাম আপনি আসবেন।’
অজাতশত্রু বললেন, ‘আমি আমার পিতাকে কারারুদ্ধ করে তাঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছি। আমি অনুতপ্ত, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।’ এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই যেন সুগন্ধ প্রবেশ করল অজাতশত্রুর নাসারন্ধ্রে!
অজাতশত্রু বলে চললেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্রে আমি অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেছি। আমি পাপী। আমার কৃতকর্মের জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।’ এই স্বীকারোক্তির সঙ্গে-সঙ্গেই যেন অজাতশত্রুর মনের সব কষ্ট দূর হয়ে গেল।
অজাতশত্রু এরপর বললেন, ‘আমি অসংখ্য বৌদ্ধ ভিক্ষুকে হত্যা করেছি, চৈত্য, স্তূপ ধ্বংস করেছি। তার জন্য আমি অনুতপ্ত। আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।’
বুদ্ধ এবার সম্রাট অজাতশত্রুর উদ্দেশে আশীর্বাদের ভঙ্গিতে হাত উত্থিত করে বললেন, ‘আপনার সব পাপ আমি ক্ষমা করলাম। কারণ, ক্ষমাই পরম ধর্ম।’
এরপর দীর্ঘক্ষণ ধরে অজাতশত্রু বুদ্ধের মুখনিঃসৃত আনন্দবাণী শ্রবণ করলেন। তারপর প্রশান্তমনে মগধের দিকে রওনা হলেন।
মগধে ফিরে তিনি বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি সমস্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়ে ‘ধম্ম’ প্রচারের জন্য স্তূপ ও সংঘ নির্মাণে ব্রতী হলেন। আনন্দময় নগরী হয়ে উঠল মগধ।
এদিকে দেবদত্ত আগ্নেয় পর্বতে দগ্ধ হচ্ছিলেন। তিনি জানতে পারলেন বুদ্ধ অজাতশত্রুকে ক্ষমা প্রদর্শন করেছেন। তা জেনে দেবদত্তর মনে হল অজাতশত্রু যখন সহস্র বৌদ্ধ ভিক্ষুকে হত্যা করেও ক্ষমালাভ করেছেন, তখন নিশ্চয়ই তাকেও ক্ষমা করে দেবেন মহাজ্ঞানী। এ কথা ভেবেই তিনি বৈশালী নগরীর উদ্দেশে রওনা হলেন।
আগ্নেয় পর্বতের গাত্রে প্রকৃতি মৃত্যুফাঁদ পেতে রাখে। দ্রুত চলতে গিয়ে দেবদত্ত এক বিপজ্জনক জায়গায় পা ফেললেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পায়ের নীচের মাটি সরে গেল। পর্বত গহ্বরের জলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হল তাঁর শরীর। মহাজ্ঞানী বুদ্ধের কথাই সত্যি হল। তিনি আর কোনওদিন বুদ্ধদর্শন পেলেন না।
এ খবর জানার পর ভিক্ষু আনন্দ একদিন ক্ষমাময় বুদ্ধকে বললেন, ‘সম্রাট অজাতশত্রুর মতো হন্তারক আপনার দর্শনলাভ, আশীর্বাদলাভের সুযোগ পেলেন। কিন্তু, দেবদত্ত সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলেন কেন?’
প্রেমময়, করুণাময়, ক্ষমাময়, মহাজ্ঞানী বুদ্ধ শিষ্যের প্রশ্নের জবাবে বললেন, ‘দেবদত্ত সংঘ ভাঙার মতো মহাপাপ কাজ করেছিলেন। তবুও আমি তাঁকে দর্শন দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। তিনি আমাকে তিনবার হত্যার চেষ্টা করেছিলেন, তবুও তাঁকে আমি দর্শনদানের জন্য, ক্ষমা করার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু, তিনি শেষ পর্যন্ত উৎপলবর্ণার মতো এক বৃদ্ধা নারীকে হত্যা করলেন। তাই তিনি আর আমার দর্শন পেলেন না। নারীহত্যা মহাপাপ! সে পাপের কোনও ক্ষমা হয় না। দেবদত্তর এ পাপ ক্ষমা করার সাধ্য আমার ছিল না।’
