মণিপুরী রূপকথা – রণজিত সিংহ
প্রথম প্ৰকাশ ; বইমেলা ২০০৬
প্রচ্ছদ ও অলংকরণ সুখেন দাস
.
ভূমিকা
যুগ যুগ ধরে লোককথা ও রূপকথা মানব সমাজে প্রচলিত হয়ে আসছে। এই যে অতীতকাল, যার অব্যক্ত গুঞ্জনে বিমুগ্ধ মানবচিত্তের বাণী দেশে দেশে কালে কালে সাহিত্যে প্রমূর্ত হয়েছে, লোককথা ও রূপকথা তাকেই ধারণ ও লালন করে আছে। লোকসাহিত্যের পথ সেই অতীত পর্বতগুহা বনজঙ্গল থেকে এ কালের গ্রাম মাঠ প্ৰান্তর পর্যন্ত শহর বন্দরে প্রসারিত।
মানুষের মানসিকতা সংবলিত বিচিত্র অভিজ্ঞতার নিরাভরণ প্ৰকাশ। অতীত জীবনের জ্বালা-যন্ত্রণা, কল্পনা বিলাসিতা আর হাস্যকৌতুকে পরিপূর্ণ এসব কাহিনী প্রতিটি ভাষাগোষ্ঠীর সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের চারটি জেলায় যে মণিপুরী জনবসতি দেখা যায় তাদের মধ্যে বিশেষতঃ মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া সমাজে এই লোক কাহিনীগুলোর প্ৰচলন।
আগেকার দিনে বায়োবৃদ্ধরা নাতি নাতিনদের এসব কাহিনী কখনো ঘুমোবার সময়, কখনো শীতকালে বৃত্তাকারে ঘরের ফুস্কা বা উনুনের চারপাশে বসে আগুনের উত্তাপ গ্রহণের সময় বা কোন বিশেষ সময়ে মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া সমাজের এসব রূপকথা শোনাতেন। রূপকাহিনী শিশুদের ও গ্রাম্য মানুষদের আনন্দ বিধান করত। গবেষকরা এসবের মধ্যে সামাজিক বহু আচার, রীতিনীতি ও সমস্যার ইতিহাস সন্ধান করেন এবং এসবের প্রাচীনতম উৎস নির্ণয়ে যত্নবান হন। প্রতিটি লোককথা ও রূপকথা গ্ৰাম্য বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের নিকট হতে সংগৃহীত। বলা বাহুল্য, রূপকথাগুলো নিশ্চয় সেই বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের নয়, লেখক সংকলকের তাে নয়ই, তারা পূর্ববর্তী কোন পুরুষ বা মহিলার নিকট শুনেছে এবং সেই কাহিনী তার স্মৃতির ভাণ্ডারে রক্ষা করেছে। রূপকথাগুলোর একটি ইতিহাস আছে এবং এইসব কাহিনী কোন একটি বিশেষ দেশে জন্মগ্রহণ করলেও সে সমাজের বিস্তৃতির সংগে সংগে অন্যান্য দেশ ভ্ৰমণ করেছে, তার কলেবরে বিচিত্ৰ সভ্যতার চিহ্ন ধারণ করেছে।
আধুনিক কালে মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া লোককথা ও রূপকথা হারিয়ে যেতে বসেছে। তার জায়গায় স্থান নিয়েছে আধুনিক ভিডিও, ক্যাসেট আরও অনেক জিনিস। এগুলোর সংগ্রহ ও সংকলনের কাজ খুবই কষ্টসাধ্য। কারণ বয়োবৃদ্ধরা এসব কাহিনীগুলো নিজস্ব ভাষায় বলেন অবিন্যস্তভাবে। বয়োবৃদ্ধদের উচ্চারণজনিত কারনে সহজে বােধগম্য করে নিয়ে অনুলিখন ও সংকলনে বেগ পেতে হয়েছে। মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া সমাজের প্রচলিত রূপকাহিনী বিচিত্র রসসম্ভারে অনাদিকাল থেকে সঞ্চিত হয়ে যুগ পরম্পরা ও বংশ পরম্পরায় সাংস্কৃতিক সম্পদ রূপে চিরন্তন হয়ে আছে। এ সমস্ত কথা ও কাহিনীতে বিধৃত হয়েছে রোমাঞ্চকর অভিযান, ধৰ্মীয় বিশ্বাস, প্রবাদ প্রচলন ও অভিজ্ঞতা, নর-নারী, রাক্ষস-রাক্ষসী, যুবক-যুবতীর আশা নিরাশা ও বিচ্ছেদ বেদনার কাহিনী।
মণিপুরী লোক ও রূপকথা গ্রন্থে মৎ কর্তৃক সংগৃহীত লোক ও রূপকথা ব্যতীত আর ও কিছু পুঁথি পুস্তকের সহায়তা লাভ করেছে। সেগুলোর মধ্যে কাছাড়ের ইতিবৃত্ত-উপেন্দ্রনাথ গুহ, বাবেইর য়ারী-বিমল সিংহ, আদিবাসী রূপকথা-প্রশিকা, ঢাকা, রাসলীলা সাময়িকী ২০০৪ বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। উল্লিখিত পুঁথি পুস্তকের গ্রন্থকার ও সংকলকের কাছে আমি ঋণী।
সবশেষে গ্ৰন্থখানি আজকাল প্রকাশনী সংস্থা দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রকাশকের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা যারা আমাকে রূপকথাগুলো তাদের স্মরণশক্তি দিয়ে বুঝিয়ে বলেছেন তাদের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই।
রণজিত সিংহ


Leave a Reply