কলালেইমা
কোন এক দেশে এক রাক্ষসী আর এক সাধারণ নারী সতীন ছিল। রাক্ষসীর এক কন্যা সন্তান ছিল। মেয়েটির নাম সেনারস্বী। আর মনুষ্য নারীর দুটি ছেলে আর একটি মেয়ে ছিল। মেয়েটির নাম কলালেইমা। ছোটকাল থেকে সেনারস্বীও কলালেইমা বাবার স্নেহ আদর পায় নাই। বাপ তাদের জন্মের কয়দিন পরই মারা যায়। সেনারস্বী ও কলালেইমা দুজন একসাথে খেলে নাচে।
একদিন রাক্ষসী সতীনকে বলল, ছোট বোন, এসো আমরা মাছ ধরতে যাই। মানুষ্য নারী বলল, চলো যাই।
দুই সতীন পানি সেচের হুত (পানি ছিটানোর জন্য বাঁশ বেতের তৈরি হাতিয়ার) আর মাছ ধরার খালই নিয়ে একটি বিলের মধ্যে গেল। দুজনে বিলে নেমে হুত দিয়ে পানি হিচাতে লাগল। সেনারস্বীর মা রাক্ষসী শুধু সাপ ধরতে থাকে আর কলালেইমার মা মনুষ্য নারী শুধু মাছ ধরতে থাকে। মাছ ধরে খালিই (মাছ রাখার বেতের তৈরি পাত্র) পূর্ণ হওয়ায় রাক্ষসী বলল, “ছোট বোন, এবার চল বাড়ি ফিরে যাই। দুগ্ধ পোষ্য মেয়ে দুটি বাড়ি রেখে এসেছি, বেশি দেরি করা ঠিক হবে না। উঠ, চল।
দুজন একসাথে বিলের পানির মধ্য থেকে ডাঙ্গায় উঠে এল। ফিরে যেতে যেতে মাঝপথে একটি আমগাছের নিচে একটু বিশ্রাম নিল তারা। গাছের ছায়ায় বসে দেখতে পেল গাছের ডালে পাকা আম লাল রং হয়ে ঝুলে আছে। রাক্ষসী বলল, “ছোট বোন, দেখছ, পাকা আমগুলো কেমন লাল হয়ে ঝুলে আছে।” মেয়েদের জন্য কয়েকটা ছিড়ে নিই। আমি তো গাছে উঠতে পারি না। তাই তুমি উপরে উঠ, আমি নিচে থেকে আম কুড়াব।
কলালেইমার মা গাছে উঠে ডালপালা নাড়াতে লাগল। এ সময় রাক্ষসী খালই থেকে সাপগুলো বের করে আমগাছে ছেড়ে দিল। সাপগুলো আমগাছে উঠতে লাগল, গাছে উঠে সাপগুলো কলালেইমার মাকে কামড়ে দিল।
সাপের কামড়ে কলালেইমার মা জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ল। মাটিতে পড়ে সে মারা গেল।
কালেলেইমার মায়ের মাছের খালই নিয়ে রাক্ষসী বাড়ি ফিরল। বাড়িতে পৌছতেই কলালেইমা জিজ্ঞেস করল, “ছোট মা, আমার মা কোথায়?”
রাক্ষসী বলল, “ওহে তোমার মা এখনও বিলে মাছ ধরছে। সে আরও মাছ ধরবে বলে জানাল। আমি রোদ সহ্য করতে না পেরে উঠে এলাম।”
কলালেইমা বলল, “ছোট মা, ছোট ভাইটিকে আগুনে পুড়ে একটি মাছ খাওয়াব। তুমি আমাকে একটি মাছ দিবে?”
আচ্ছা দিচ্ছি বলে রাক্ষসী মা খালই থেকে একটা ছোট্ট ফেন্টিয়া মাছ তাকে তুলে দিল।
কলালেইমা ফেন্টিয়া মাছটি আগুনে পুড়তে দিয়ে চুলাটি পরিষ্কার করতে লাগল। এ সময় মাছটি পুড়ে ছাই হল। কলালেইমা ভয়ে ভয়ে ছােট্ট মাছটি পুড়ে ছাই হওয়াতে আরও একটি মাছের প্রয়োজনের কথা রাক্ষসী মাকে জানাল।
রাক্ষসী আর একটি ছোট্ট ফেন্টিয়া মাছ কলালেইমাকে দিল। আগুনে ফুঁ দিতে কলালেইমার চােখে জল এল। সে মাছটি আধাকাঁচা পুড়ে ছােট ভাইটিকে ভাতের সঙ্গে খেতে দিল।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। মায়ের দেখা নেই। কলালেইমা রাত হলে দুভাইকে সঙ্গে নিয়ে বিছানায় ঘুমাল। ঘুমের মধ্যে সে দেখতে পেল যে, রাক্ষসী তার দু’ভাইকে জীবন্ত ধরে চিবিয়ে খাচ্ছে। সে উঠে বসল। চারিদিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখল। সবকিছুই ঠিক আছে। পরদিন সেনারম্বীও কলালেইমা একটি ঝর্ণায় স্নান করতে গেল। রাক্ষসী কলালেইমাকে একটি ছিদ্ৰযুক্ত মাটির কলসী দিল এবং সঙ্গে দিল একখানি ছিড়া গামছা। আর সেনারম্বীকে দিল একটি পিতলের কলসী আর পরিধানের জন্য দিল একটি নুতন লাহিঙ (পরনের কাপড়)।
দূরদেশের এক রাজপুত্র শিকারে বেরিয়েছে। জঙ্গলে শিকার করে ক্লান্তি তৃষ্ণায় কাতর হয়ে নদীতে পানি পান করতে নেমেছে। রাজপুত্ৰ সেনাপতিকে ডেকে বলল, “ঐ যে দূরে দেখা যায় একটি শীর্ণ বস্ত্র পরনে আর পুরাতন মাটির কলসী কাঁখে যে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে তাকে আমি পছন্দ করি। সেনাপতি তো অবাক।
সেনারম্বী সে কথা শুনতে পেল। সে রাগে গদ গদ করে কলালেইমাকে ফেলে বাড়ি চলে গেল। বাড়িতে এসে সে রাক্ষসী মাকে সব কথা জানাল। কলালেইমা বাড়িতে এলে সে দুজনের পোশাক পরিবর্তন করে দিল। কাঁখের কলসী ও পরিবর্তন করে দিল। আবার তাদের নদীর ঘাটে পাঠাল। এবার রাজপুত্র ভাল কাপড় পরিধান করা মেয়েটিকে পছন্দ করল।
তারা বিকেলে বাড়ি ফিরে সব কথা রাক্ষসী মাকে জানাল। কি করা যায়! রাক্ষসী কলালেইমাকে রাজপুত্রের কাছে বিয়ে দিল। পাঁচদিন পর রাজপুত্ৰ পাচরভাত বা ‘পাঁচ দিনের খাবার’ খেতে পাঁচজন সঙ্গী সহ শ্বশুরবাড়ি এল। রাক্ষসী সেদিন সকাল থেকে এক গামলা পানি উনুনে বসিয়ে উত্তপ্ত করছিল। পানি ফুটে রাক্ষসী বর কনেকে অভ্যর্থনা জানিয়ে একটি পিঁড়িতে বসাল। রাক্ষসী কলালেইমাকে ডেকে বলল, সেনারস্বী তোমার সুন্দর সোনার গহনা, পোশাক একবার পরিধান করে দেখতে চায়। সেগুলো তাকে পরিধান করতে দাও। কলালেইমা গহনাপত্র খুলে দিল।
কলালেইমাকে রাক্ষসী বলল, “চল তোমাকে স্নান করিয়ে দেয়।” একথা বলে কলালেইমাকে বাড়ির পিছনে একটি বড় কাঠের পিড়িতে বসাল। ঘর থেকে উনুনের উত্তপ্ত পানির কড়াই তুলে আনল। কলালেইমাকে ফুটন্ত পানিতে মাথা ডুবিয়ে মারল। চিৎকার করার সময়ও পেল না সে।
কলালেইমার আত্মা পাখি হয়ে রাজপ্রাসাদে উড়ে গেল। এদিকে রাজা সেনারান্ধীকে রাণী করে আনল। কলালেইমাকে মারার কথা সে বুঝতেই পারল না। রাক্ষসীর মায়ায় বিভোর হয়ে সেনারম্বীকে কালালেইমা মনে করে রাণী করে রাখল।
এক বছর পর সেনারস্বীর গর্ভে এক ছেলে জন্ম নিল। কলালেইমা পাখি হয়ে প্রতিদিন রাজপ্রাসাদে রাজা বসার আরাম কেদারার সামনে কাপড় শুকোনোর মাচাঙে উড়ে উড়ে বসে থাকে। রাজা বের হয়ে উঠোনে হাঁটাহাঁটি করার সময় পাখিটা করুণ সুরে গান গেয়ে উঠে। মাচাঙে বসার উদ্দেশ্যে ও যেন রাজদর্শন।
কু কুকু কু
সেনারম্বী না উথাকতাল।
চেই চেরানা থামাল থঙ।।
রাজা প্রতিদিন গানটি শুনে আর মনে দুঃখ বোধ হয়। রাজার ছোট শিশু পাখিটাকে ধরে দেওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করে।
একদিন রাজা পাখিটাকে আয় আয় বলে ডাকল। পাখিটা উড়ে এসে রাজার হাতে বসল।
রাজা একটি খাঁচা বানিয়ে পাখিটাকে বারান্দায় ঝুলিয়ে রাখল। পানি, ধান ও নানান খাদ্য খাঁচায় ভরে দিল।
একদিন সেনারম্বী ওটাকে কেটে তরকারি রেঁধে খাওয়াল।
রাজা প্রতিদিন রাজসভায় কাজ সমাধা করে পাখিটাকে আদর করত। সেদিন পাখিটাকে না দেখে রাজা বলল, “পাখিটা কোথায়?”
তারকারী রান্না করে ফেলেছি।”-রাণী বলল।
রাজা দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় একটি মানুষের কাটা নখ তরকারির মধ্যে দেখল; আর অমনি ভাত না খেয়ে উঠে পড়ল। রাজা তরকারি ঘরের পিছনে ফেলে দিল। কিছুদিন পর সেখানে একটি জাম্বুরা গাছ জন্মালো।
এদিকে কলালেইমার এক দাদি নাতিনকে দেখে যাবার জন্য রাজপ্রাসাদে গিয়ে কলালেইমাকে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি করতে লাগল। ঘরের পিছনে সে একটি জাম্বুরা গাছ দেখতে পেল। গাছে অনেক জাম্বুরা ধরেছে। একটা জাম্বুরা ছিঁড়ে নেওয়ার জন্য জাম্বুরা গাছের নিকটে যেতেই জাম্বুরা গাছটি যেন বির বির করে কথা বলছে।
জাম্বুরা ছিঁড়তে গিয়ে সবচেয়ে বড় জাম্বুরা বলল, “আমাকে নাও।” বুড়ি তা দেখতে পেয়ে ছিঁড়ে গামছা দিয়ে বেঁধে বাড়িতে আনল। কেউ যাতে দেখে ফেলতে না পারে সেজন্য একটি ঝুঁড়িতে ভরে লুকিয়ে রাখল।
বুড়ি ঘর থেকে বের হয়ে গেলেই জাম্বুরা থেকে কলালেইমা বের হয়ে ঘরের কাজকর্ম করে নেয়। ঘর ঝাড়ু দেওয়া, থালা বাসন পরিষ্কার করে মুছে রাখা, ভাত রাঁধা শেষ করে আবার জাম্বুরার মধ্যে প্রবেশ করে।
বুড়ি দরোজা খুলে দেখতে পেল তার ভাত তরকারি রান্না হয়ে আছে। “হুঃ। কে আবার আমার ভাত রোধে দিল”-বুড়ি বলল। যাই হােক ভাত সে খেয়ে শেষ করল।
আবার জাম্বুরাটি খাওয়ার জন্য খুঁজতে গিয়ে সে দা খুঁজে পেল না। একদিন দা খুঁজে পেল জাম্বুরা পেল না। আরও একদিন জাম্বুরা খুঁজে পেলেও দা খুঁজে পেল না। তাই জাম্বুরা আর খাওয়া হয়নি। বুড়ি লুকিয়ে ব্যাপারটি দেখতে চাইল।
সে লুকিয়ে দেখল, এক সুন্দরী রমণী বিছানা থেকে নেমে এসে ঘর দোয়ার পরিষ্কার করছে আর ভাত রাঁধছে। ভাত-তরকারি রেঁধে সে নিজে খেয়ে বুড়ির জন্য আলাদা করে রেখে দিল। ঝুড়িতে ঢেকে ভাত রাখার
“তুমি দেবী না মানবী?”
কলালেইমা সমস্ত ঘটনা বর্ননা করল। এবং কিছু সময় কাঁদল। বুড়িকে ভয় না পাওয়ার জন্য বলল। আর মাত্র দুদিন বাকি রয়েছে। তাহলেই সে পূর্ণ মানবী রূপ পেতে পারবে। এখন তার নরম চামড়ায় শরীরে বাতাস লাগা সে সহ্য করতে পরছে না।
বুড়ি তখন একটি কোমল নরম তুলার লেপ দিয়ে ঢেকে তাকে বিছানায় রেখে দিল।
দুদিন পর কলালেইমা মানবী মূর্তি ধারণ করল। দাদী ও নাতিন একে অন্যকে চিনতে পারল। এভাবে তারা শান্তিতে বাস করল। গ্রামের লোক রাজার কাছে তাদের সমস্ত কথা জানাল। রাজা তার ছোট্ট ছেলেটিকে নিয়ে প্ৰাত:ভ্ৰমণে বের হয়ে বুড়ির বাড়িতে আসল। তখন কন্যাটি একটি কাপড় বুননে ব্যস্ত ছিল।
দরিদ্র বুড়ি একটি ফিদা (সুতা দিয়ে তৈরি বসবার আসন) বসতে দিল। রাজা বুড়ির সঙ্গে কথা বলল। ছেলেটি দৌড়ে কলালেইমার কাছে গেল এবং কাপড় বুনন দেখতে লাগল।
বুড়ি নাতিনকে রাজার জন্য পান সুপারি সহ যথোপপুক্ত অভিবাদন জানানোর জন্য বলল। কলালেইমার নাম শুনে রাজা অবাক। বুড়িকে সমস্ত কথা বলল। বুড়ি সমস্ত ঘটনা পূর্বপার বলল। রাজা তার স্ত্রীকে চিনে ফেলল।
বাড়িতে ফিরে রাজা বাড়ির পিছনে একটি বড় গর্ত খনন করল। আর সেনারম্বীকে সেখানে ফেলে মাটি চাপা দিল। রাজা ও কলালেইমা সুখ শান্তিতে বাস করল।
