রাসধারীর স্বপ্ন (মণিপুরী রূপকথা)

রাসধারীর স্বপ্ন

মৈরাং রাজ্যে, মনিপুরীদের নৃত্য গীতের একটি প্রসিদ্ধ জায়গায় একজন নামকরা রাসধারী অর্থাৎ রাসনৃত্যের ওঝা ছিল। রাসনৃত্যের ওঝা ছিল দরিদ্র। তার পরিবারে স্ত্রী ও একপুত্র ছাড়া আর কেউ ছিল না। অভাবের তাড়নায় জর্জরিত রাসধারী তার একমাত্র পুত্ৰকে বেশি দূর লেখাপড়া করাতে পারল না। প্রথম মান পর্যন্ত যৎসামান্য লেখাপড়া করে ছেলেটি তার বাবার কাছে মৃদঙ্গ বাদন আর রাসনৃত্য শিখে পারদর্শীতা পেল। তালে গানে ছেলেটি অনন্য হয়ে উঠল। কিন্তু নৃত্যে পারদর্শ হলে কি হবে দিনে সমস্ত সময় সে ঘুমিয়ে কাটাত। এত ঘুম যেন কুম্ভকর্ণের ঘুম তার কাছে হার মানল।

বাপ বুড়ো হল, হাঁটতে সে কুঁজো হয়ে লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটে। তার মা ও ‘মানুষ পাকলে তিতা’ এরূপ প্রবাদতুল্য হয়ে ছেলেটাকে সর্বক্ষণ দোষারূপ করতে লাগল-এহেন ঘুমে আলস্য জীবন কাটানোর জন্য।

ছেলেটার স্বাস্থ্য তো ভালই। দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত পরিবার। বুড়ো মা গ্রাম থেকে খুঁজে এনে যা কিছু রাঁধে ছেলেকে ছাড়া তো সে খেতে পারে না। বুড়োসময়ে দুর্বল হলে মাথায় রাগ ও বেশি চেপে বসে। একদিন বুড়ি দুপুর বেলা ছেলেকে ঘুম থেকে ডেকে জাগাল। বুড়ি বলল, “তুমি উঠছ কিনা?” এক ডেকচির সমস্ত ভাত না খেলে তো তোমার পেট ভরে না। সূর্যদেবতার কাছে প্রার্থনা করি, হে দেবতা, আমি মরার আগে যেন এই নব্য কুম্ভকর্ণের মৃত্যু দাও। কারণ অলস ছেলেটা জীবনভর না খেয়ে জীবন্ত মরবে। আমি তা দেখে সহ্য করতে পারব না। বুড়ো বাপ যে রয়েছে দেখে ও দেখে না, বুঝেও বুঝে না ; আমি এত জ্বালায় জ্বলে মরছি।”

তবুও ছেলেটি উঠল না। আবার বুড়ি গালিগালাজ করতে লাগল। “এই যে বন্ধ করা চোখ, সে চোখ না মেলেই যেন চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।”

বুড়ির গালাগাল ঘুমন্ত ছেলের কাছে মনে হল এক মস্ত বড় জয়ধ্বনি রব। এ জয়ধ্বনি শুনে ছেলেটি খুশি হয়ে জেগে উঠল। উঠেই আবার সে রেগে গিয়ে চোখ বন্ধ করে বিছানা থেকে এক লাফে মাটিতে নামল। ঘর থেকে তাড়াতাড়ি বের হয়ে পূর্বদিকে পুষ্করিণীর দিকে হন হন করে চলে গেল। যাবার সময় রান্নার উনুন থেকে লাকড়িজ্বলা ছাই একমুঠো নিল দাঁত মাজার জন্য। চােখ বন্ধ করে দুপাটি দাঁতে ছাই ঘষতে ঘষতে দুহাত ভরে মুখে পানি দিয়ে কুলকুচা করল। তারপর এক লাফে পুকুরে ডুব দিল। এক ডুব দিয়েই খালাস। একদৌড়ে ফিরে বাড়ির উঠোনে এসে হাজির হল সে। কাকেও কিছু না বলে একটি গামছা খুঁজে বের করে ভিজা কাপড় বদলালো। শক্ত করে পাচাতি বা বড় গামছা পরিধান করে একটি আধভাঙা আয়না বের করে মুখ দেখে নিল। চুল আঁচড়ে বাপের মৃদঙ্গ সঙ্গত চর্চা করার আসনটি পরিষ্কার করল। আর সে আসনটিতে ধ্যানমাগ্নের মত বসে পড়ল। একটি মৃদঙ্গর মারি বা সুতো টান দিয়ে মৃদঙ্গকে ঠিক করল আবার আগের জায়গায় রেখে দিল। মৃদঙ্গ বাদন আন্তরিকভাবে শেখা শিষ্যরাই মৃদঙ্গের উপর এত শ্ৰদ্ধাভক্তি দেখাতে পারে। কিছু দূরে দাঁড়িয়ে অবাক দৃষ্টিতে তাকাল বৃদ্ধ বাপ।

ছেলেটি তাড়াতাড়ি এসে মুখে কি যেন কথা বিরবির করে বলল আর মাটিতে লুটিয়ে বাপকে সষ্টাঙ্গে প্ৰণাম করল। জীবনে প্রথম বারের মত সে বাবাকে সাষ্টাঙ্গ প্ৰণাম করল।

বাপ কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। কিছুই বুঝে উঠতে না পেরে বুড়ো বুড়িকে ধমক দিল আর বলল, “ছেলেটা ক্ষিদের জ্বালায় মাথা খারাপ হয়েছে আর তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে দেখছ? আর কে খাবে? আর কেই বা তোমাকে জ্বালাতন করবে? আবারও বলছি। এই অন্তিম সময়ে আমার কথার বাইরে যেও না। রাসনৃত্যের ওঝা হিসাবে যত জনকে শিষ্য বানিয়েছি। আমি আর ছেলে বের হলে আমার বাকি জীবনটা তাদের বদন্যতায় খেয়ে দেয়ে কেটে যাবে! সে রকম সুনাম রাসধারীর!”

বুড়ো গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে আর বউ কিছুই কৰ্ণপাত না করায় এবার লাঠি হাতে বিছানা থেকে লাফ দিয়ে নামল।

অবস্থা বেগতিক দেখে ছেলে বলল, “বাবা, আমার কিছুই হয়নি। এই দেখ আমি ভাত খাচ্ছি।”

মা ও ছেলে খেতে বসল।

রাত্রি হল। মানুষজন রাস্তাঘাটে যাতায়াত নেই বললেই চলে। সকলেই নিদ্রামগ্ন। গভীর রাত্রে ছেলেটি পুষ্করিণীতে গিয়ে স্নান করল। এসে তুলসী গাছের তলা ধৌত করে শৌচ করল, ভিজা একটা গামছা পরিধান করল, মনঃপুত পবিত্র করে তুলসীগাছের তলায় লম্বা হয়ে সাষ্টাঙ্গ প্ৰণাম করল এবং ভগবানের উদ্দেশ্যে ভক্তি ভরে প্রার্থনা করে বলল, “প্ৰভু মা-বাপের জন্য দু’মুঠো অন্ন যোগাড় করতে পারি সে শক্তি আমায় দাও।” এই বলে সে তুলসী গাছের তলায় শুয়ে রইল।

তখন সে একটি স্বপ্ন দেখল। স্বর্গের রাজা সরালোল (ইন্দ্র) এর সাতটি কন্যা একটি রাসলীলা করবে বলে তাকে রাসধারী নিয়োগ করেছে। এটা কি স্বপ্ন না বাস্তব বুঝে উঠতে পারছে না। স্বৰ্গ থেকে একটি রথ এসে তাকে রথের উপর বসিয়ে রাসলীলার স্থানে নিয়ে গেল। মৃদঙ্গবাদক, দোহার, গোপী, মন্দিরের ভাবক ভক্ত সকলেই যে যার আসনে বসে আছে। শুধু রাসধারীর আগমনের অপেক্ষায় তারা বসেছিল।

ফুল চন্দন দিয়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় তাকে বরণ করা হল। রাগ-রাগিনী বেজে উঠল। নৃত্যরত অবস্থায় বৃন্দাদেবী রাসমণ্ডলে প্রবেশ করল। ধরাচূড়ামনি শ্ৰীকৃষ্ণ নৃত্য করল। রাসধারীর পরিচালনায় রাসে ভক্তবৃন্দ ভাবাবেগে গদগদ করে কাঁদতে লাগল। আর রাসধারীকে ভক্তির শ্রদ্ধার্ঘ্য উপঢৌকন দিল। গলায় জড়িয়ে দিল নানান ভক্তির শ্রদ্ধার্ঘ্য। মাথা নুয়ে গেল তবু উহার অর্ঘ্যদান পর্ব চলল। ভক্তবৃন্দ কেঁদে আকুল। কৃষ্ণদৰ্শনে গীত অমৃতধারায় ভেসে যাচ্ছে ভক্তবৃন্দ। নৃত্যে গীতে ‘নাচে ময়ুরিনী’ নানান অঙ্গ ভঙ্গিমায় সকল গোপিবৃন্দ উঠে ময়ুরীর বেশে ঘুরে ফিরে নাচতে লাগল। নাচতে নাচতে ভোর রাতে রাসলীলা সমাপ্ত হল।

প্রচুর উপহার আর পকেট ভৰ্ত্তি টাকা নিয়ে সে বাড়ি ফিরল। স্বপ্নটা যে বাস্তব হয়ে উঠবে সেকথা ভাবতেও অবাক লাগে তার। একজন রাজদূত এসে বলল, আগামীকাল থেকে নিরামিষ ভোজন করবে। প্রতিদিন রাত বারোটার পর পবিত্ৰ মনে তুলসী গাছের তলায় বসে থাকবে। চারিদিকে তাকাল সে। ঘুম থেকে উঠে মাকে ডেকে জাগাল। মাকে বলল, “মা, রন্ধনপাত্ৰ ধৌত করে আমার জন্য একবেলা নিরামিষ রাধিও।”

-কেন বাবা, তোমার নিরামিষ খেতে হবে।

-হ্যাঁ, পরে বলব।

পরদিন রাতে ঠিক ঠিক তুলসীগাছের তলায় বসে রইল সে। গতকালের স্বপ্ন যেন বাস্তব হয়ে উঠল। মা-বাপের ভরণ-পোষণ কোথা থেকে যেন জোগাড় হয়ে যাচ্ছে।

এভাবে তার দিন কেটে যায়। কিন্তু প্রতিদিনের ঘুম তার ষোল আনায় রইল।

একদিন বিছানায় বসে বুড়ো বাপ কাঁদতে লাগল। কারণ জিজ্ঞাসা করায় সে বলল, “একটি মাত্র ছেলে তার, ছেলে বউ না দেখে সে মরতে যাচ্ছে। পাত্রীও দিচ্ছে না কেউ। ভগবান যেন তাদের প্রতি বিরাগ হয়েছেন।”

ছেলেটি বিছানায় শুয়ে বাপের আর্তি শুনল।

বুড়ো বাপ বাড়ির পূর্ব গেইট দিয়ে তাকিয়ে দেখল, কয়েকজন যুবক যেন সেজেগুজে নুতন জামা কাপড় পরিধান করে সারি বেঁধে যাচ্ছে। বুড়ো জিজ্ঞেস করল, “কোথায় যাচ্ছ যুবকের দল?”

“তোমাদের কুম্ভকৰ্ণকেও পাঠাও না”-পাশের বাড়ির এক মেয়ে বলল।

– কোথায়!

–রাজবাড়িতে।

– কেন রাজবাড়িতে কী হয়েছে আজি?

রাজ্যের রাজকুমারী ফুলমালা গেঁথে কুঞ্জ সাজিয়ে সাততলার উপরে বসে আছে, আসছে শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষা করবে।

-আজি কী বার?

-আজি সোমবার।

—কার জন্য রাজকুমারী অপেক্ষা করছে?

রাজকুমারীর বিবাহের জন্য পাত্ৰ খোঁজা হচ্ছে। জাত পাতের বিচার নেই। রাজা ঘোষণা দিয়েছেন-মাটি থেকে এক লাফে যে সাত তলায় বসা রাজকুমারীর কাছে উঠে পাশে বসতে পারবে তার কাছেই রাজকুমারীকে বিবাহ দেওয়া হবে। রাজার একমাত্র কন্যার অভিলাষ অনুযায়ী হবু বর রাজ্যের সবকিছু পাবে।

বৃদ্ধ বাড়িতে প্রবেশ করল।

সেদিন রাত্ৰিবোলা অলস ছেলেটি রাসলীলায় সরারেলের রাজার (ইন্দ্র) কাছে সবকিছু শোনাল। স্বর্গের দেবতা তার প্রতি প্ৰসন্ন হল।

শুক্রবার সে একজন দূতসহ সকালে রাজবাড়ির দিকে রওয়ানা দিল। এক হাল জমিন দূর হতে সে দেখতে পেল হাজার হাজার যুবক লাফালাফি করছে। সে একহাল জমিন দূর হতে এমন লাফ দিল যে, সোজা উচ্চতায় যেখানে রাজকুমারী কুঞ্জ সাজিয়ে বসে আছে সেখানে গিয়ে দাঁড়াল।

রাজকুমারীর প্রতিজ্ঞা পূরণ হল। সে সাত চক্কর ঘুরতে শুরু করল। রাজা বর দেখে মাথা নত করল—হ্যাঁ রাজকুমারীরই জয় হল। বিবাহপর্ব শেষ হল। অলস ছেলেটি বাড়িতে খবর পাঠাল। রাজকন্যা তো চিন্তায় শুকিয়ে কাঠ হয়ে পড়ল। জানতে পারল না। স্বামী প্রতিরাত্রে কোথায় যেন বেরিয়ে যায়। জিজ্ঞাসা করেও কোন সদুত্তর পেল না। দিনের বেলা ঘুমিয়ে কাটায়।

একদিন রাজকন্যা কুপি জ্বলিয়ে বসে রইল। সে আজ স্বামীর সঙ্গে যাবে।

স্বামী তাকে যতই বোঝাতে লাগল ততই সে তার সঙ্গে যাবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল। শেষ পর্যন্ত সে রাজী হল। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে রাসলীলা দেখতে গেল। রাসধারী হয়ে সে স্বৰ্গরাজ্যের কন্যাদের নাচাল।

ভোরে তারা বাড়ি ফিরল। ক্রমে তাদের সন্তানাদি হল। এভাবে তারা সুখে শান্তিতে বাস করল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *