দশমিতি (মণিপুরী রূপকথা)

দশমিতি

এক দেশে এক পরিবারে কয়েকজন ভাই-বোন ছিল। সাত ভাই আর এক বোন। বোনটির নাম দশমতি। একদিন সাতভাই একযোগে বাণিজ্যে যেতে মনস্থির করল। সকল ভাইদের বউ ছিল। ভাইয়েরা তাদের বউদের আর দশমতিকে বাড়িতে রেখে গেল।

তিন মাস পর দ্বিতীয় ভাইটি ঘরে ফিরে এল। সে বাড়ির সকলের জন্য একটি করে উপহার কিনে আনল। আটখানা চাকচাবি (ফানেক পরিধেয়)। বোনটিকে ভাল চাকচাবি দিয়ে দিল। ননদের চাকচাবির লোভে বউরা নিজেদের চাকচাবি পরিধান করল না।

দ্বিতীয় ভাই ঘর থেকে বের হয়ে গেলে সকল বউরা দশমতির পিছনে লাগল ৷ ফন্দি ফিকির করে দশমতিকে মেরে ফেলতে চাইল।

তাদের পাশের বাড়ির একটি মেয়ের নাম বাসুকী। তার সঙ্গে যুক্তি করল। কিভাবে দশমতিকে মেরে ফেলা যায়!

একদিন বউরা সকলে মিলে দশমতিসহ বাসুকীর বাড়িতে ঢেঁকিতে চিড়া ভানতে গেল। একজন টেকিতে ধান ভানছে আর একজন হাত দিয়ে চিড়ার ধান নাড়া দিচ্ছে। ছোট বউ বলল, এস না দশমতি, তুমি হাত দিয়ে চিড়া নাড়বে।

দশমতি বৌদির কথা শুনে মাটিতে বসে হাত দিয়ে টেকিতে ধান নাড়িয়ে দিতে থাকল। আর দুজনে ধান ভানল।

ধান ভানার সময় এক বউ হঠাৎ দশমতিকে টেকিতে ঠেলে দিল। অন্য জন পিছে ফেলল। গুম গুম। যন্ত্রণায় কাতর হয়ে ধুকরে ধুকরে দশমতি মারা গেল। এখন কি করবে! কোথায় তাকে ফেলা হবে এ নিয়ে ভাবনায় পড়ল তারা। তাড়াতাড়ি তারা একটি হাপেঈ (বাঁশের ঝুড়িতে) ভরে নিকটের পুষ্করিণীতে ফেলে দিল।

যেখানে দশমতিকে ফেলে দেয়া হল সেখানে একটি পদ্মফুল ফুটল। কয়েকমাস পর বড় ভাই বাড়ি ফিরল। বাড়িতে ফেরার পথে সে পুষ্করিণীর কোনায় দেখতে পেল একটি পদ্মফুল ফুটে আছে। পদ্মফুলটি চারদিকে আলোক ছড়াল যেন। বড় ভাই ভাবল, বোনটির জন্য একটি পদ্মফুল নিলে খুবই খুশি হবে। সে কথা ভেবে হাতের জিনিসগুলো বগলে চেপে পদ্মফুল ছিঁড়তে গেল।

পদ্মফুল তখন মাথা নাড়তে শুরু করল। বাতাসে আন্দোলিত পদ্মফুল হেলে দুলে গান গেয়ে উঠল–

হাত দিও না গায়ে

মরেই গেছে যে

তুলতে যেয়ো নাকো তারে।

আহা! কি মধুর সুরে গান জুড়াচ্ছে পদ্মফুলটি। স্পর্শ না করার কথা বললেও বড় ভাই নাছোড়বান্দা। সে পদ্মফুলটার ডগায় ধরে সজোরে টান মারল। অবাক কাণ্ড! পদ্মফুলের কাণ্ডমুলে জড়িয়ে দশমতি কাঁদতে লাগল।

আহা! দশমতি, তুমি কেন এখানে এসেছ?

—“মেজো ভাই যে চাকচাবি এনে দিয়েছিল, সেটা পাবার লোভে সকল বৌদিরা মিলে আমাকে চিড়ার সঙ্গে পিষে মেরে এখানে পুষ্করিণীতে ফেলে দিল।” দশমতি বলল

উহ! চল চল বলে দশমতিকে স্নান করিয়ে বাড়িতে আনল; দশমতিকে দেখে বাড়ির সবাই ভয় পেয়ে গেল। তারা সকলে পালাল। মাথা ঠাণ্ড করে বড় ভাই সবাইকে ডেকে এনে আর ঝগড়া বিবাদ না করার উপদেশ দিল। আবার সে বাণিজ্যে বেরোল।

বাড়ির বউরা আবার সলা পরামর্শে বসল। তারা বলল, সাতভাই একত্রে বাড়ি ফিরে এলে বউদের মেরে ফেলবে। তাই তারা আবার সকলে মিলে মাটিতে গর্ত খুঁড়ে জোর করে দশমতিকে জীবন্ত মাটি চাপা দিল।

সে গর্ত থেকে একটা লাউ গাছ গজালো। এদিকে বড় ভাই বাণিজ্যে প্রবাসে গিয়ে মনে শান্তি পায় না। আবার বাড়িতে ফিরে আসল সে। এসেই খুঁজতে লাগল—ছোট বোনটি কোথায়?

বউরা উত্তর দিল—“তুমি যাবার পরদিন দশমতি কোথায় গিয়ে যে লুকালো, এখনও ফিরে আসেনি।”

একথা শুনে বড়ভাই মনে বড় কষ্ট পেল। মনের কষ্টে ঘরের বাইরে একটু বেরিয়ে যেতেই একটি লাউগাছ চোখে পড়ল। লাউগাছে একটি ফুল ফুটেছে দেখে ফুলটার কাছে যেতেই ফুলটি গেয়ে উঠল—

হাত দিও না গায়ে

মারা গেছে যে

তুলতে যেয়ো নাকো তারে।

বড়ভাই রাগে অভিমানে লাউ গাছটায় ধরে সজোরে টান দিল টান। দিতেই লাইগাছের কাণ্ডমূলে জড়িয়ে দশমতি বেরিয়ে এল। অবাক কাণ্ড! দশমতি তুমি কেন এখানে এসেছ? বড়ভাই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

দশমতি বলল, বৌদিরা সকলে মিলে মাটিতে গর্ত খুঁড়ে আমাকে পুঁতে রেখেছে। বড়ভাই দশমতিকে বাড়িতে এনে রাখল। বাউদের ডেকে উপদেশ দিল। বাড়িতে শান্তি বজায় রেখে সকল বৌরা ননদ সহ মিলেমিশে থাকার পরামর্শ দিয়ে সে বাণিজ্যেতে গেল।

আবার ও বউরা পরশ্ৰীকাতর হয়ে উঠল। তারা ভাবলা, এবার বাণিজ্য থেকে ফিরে আসার সময়ও প্রায় হয়ে গেল। টাকা পয়সা সব বোনটার কাছে দিয়ে দিবে-এ চিন্তায় তারা ভুগতে থাকল। আবার বাসকীর কাছে গিয়ে পরামর্শ চাইল, কি ভাবে দশমতিকে মারা যায়।

দশমতিকে যাদুমন্ত্র দিয়ে ময়নাপাখি বানানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হল। একটি কাঠের টুকরো যাদুমন্ত্র দিয়ে চুলে বেঁধে দিতেই দশমতি পাখি হয়ে গেল। পাখিটা উড়ে গেল।

এদিকে সাত ভাই ছোট বোনের জন্য উপহার, মিষ্টি আরও কত কিছু আনল। বাড়িতে ফিরে তারা বোনকে ডাকল। কিন্তু কোন সাড়াশব্দ পেল না। বোনের দেখা নাই। ভাইয়ের বউদের উপর সন্দেহ করল আর বউদের বেদম পেটাতে লাগল। বাসকীকে ডেকে জিজ্ঞেস করল-দশমতি কোথায়?

এ সময় ঘরের পিছন থেকে একটি পাখির গান শোনা গেল। একটি ময়না পাখি গাছের আগায় চড়ে গেয়ে উঠল–

“পাশের বাড়ির বাসুকী মন্ত্র দাতার মূল

যাদুমন্ত্রে পড়াল মোরে মাথার চুলে হুল।”

ছোট ভাই ঘরের পিছনের বারান্দায় বসে কাঁদল। গান শুনে দৌড়ে গেল সকলকে ডাকতে। সকলে মিলে ময়নাপাখির গান শুনল। সবাই মিলে ময়না পাখিটাকে ধরল। ধরে এনে মাথায় জড়ানো যাদু মন্ত্রের কাঠিটা খুলে দিল—সাথে সাথে দশমতি একটি সুন্দরী মেয়ে হয়ে উঠল।

“দশমতি! তুমি কেন এভাবে রূপ বদলিয়েছিলে?”—সবাই একসাথে জিজ্ঞেস করল।

দশমতি বলল, বৌদিরা মাথার চুলে উকুন বেছে দিবে বলে বাসুকীর দেয়া যাদুর কাঠি মাথার চুলে বেঁধে দিয়েছে। আর আমনি আমি ময়না পাখি হয়ে রইলাম।”

ভাইয়েরা বাসুকীকে ধরে আনল। সবাই মিলে দুপায়ে ছিড়ে মেরে উঠোনের কোণে মাচাঙে বুলিয়ে রাখল। বাড়ির পিছনে তারা একটি বড় গর্ত খনন করল। সাত ভাইয়ের বউকে একসাথে গর্তে ফেলে দিয়ে মাটি চাপা দিল। এরপর সাত ভাই বোন সুখে শান্তিতে রইল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *