বিজয় ও মনি (মণিপুরী রূপকথা)

বিজয় ও মনি

কোন ও এক গ্রামে দুইজন বৃদ্ধ লোক ছিল। একজনের নাম বিজয় ও অন্যজনের নাম মনি। বিজয় ছিল খুবই সরল প্রকৃতির লোক আর মনি ছিল খারাপ স্বভাবের লোক। বিজয় উত্তর দিকে আর মনি ডানদিকে, দুইজনের পাশাপাশি বাড়ির মাঝখানে তাদের রেষারেষির নিদর্শন একটি আইল। একজন আরেক জনের সঙ্গে ঝগড়াঝাটি করে তাদের কথাবার্তা বন্ধ, ঘরের ভিটায় প্রবেশও নিষিদ্ধ।

মনির ছিল এক জোড়া বলদ আর বিজয়ের কোন বলদ নেই, আছে একটি মাত্ৰ দুগ্ধবতী গাভী। গাভীটি প্রতিদিন চার কেজি দুধ দিত। এটা মনির জন্য কষ্টকর ছিল।

একদিন বিজয়ের বাছুরটা দৌড়াদৌড়ি করছিল। আর গোয়ালঘর থেকে বের হয়ে মনির গোয়ালঘরে ঢুকতেই মনি বাছুরটাকে আটকিয়ে রেখে দিল। লোকজন জিজ্ঞাসা করলে বলল, কিছুদিনি আগে তার বলদ নাকি এ বাছুরটি জন্ম দিয়েছে। বিজয়ের গাভী বাছুর খুঁজে না পেয়ে হাম্বা হাম্বা করে ডাকতে লাগল। বাছুরটা মনির গোয়ালঘরে আটকে থেকে অনবরত ডাকছে।

গ্রামের আর একজন মাতব্বর রাধাকান্ত। বিজয় তার কাছে গিয়ে বলল সে যেন মনিকে বলে বাছুরটা ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে। কিন্তু পাথরে পানি ঢালার মত নিৰ্ম্মফল চেষ্টা হল। মনি বাছুরটা ছেড়ে দিতে নারাজ কারণ তার বলদের জন্ম দেওয়া বাছুরটাকে সে দিতে পারে না।

গ্রামের মুরুব্বীরা বসে সভা করল। কিন্তু কেউ মনিকে বোঝাতে পারল না যে, বলদ কোনদিন বাচ্চা দিতে পারে না। মনির গোয়ালঘর থেকে বাছুর ডাকছে আর বিজয়ের গোয়ালঘর থেকে গাভী ডাকছে। বিজয় তার গাভীর হাম্বা হাম্বা ডাক আর সহ্য করতে পারল না। সে পরদিন একটি ছাতা মাথায় দিয়ে লাঠি হাতে বেড়িয়ে পড়ল আরও বড় সভা বসাবে বলে। পাশের গ্রাম অবধি লোকজন নিমন্ত্রণ দিয়ে বড়সভার আয়োজন করার ইচ্ছা! নিয়ে পশ্চিমের রাস্তা দিয়ে বের হয়ে হাঁটতে লাগল।

গ্রাম পেরিয়ে মাঠ, মাঠ পেরিয়ে এক বনের মধ্য দিয়ে গড়িয়ে গেছে যে পথ সে পথে রওয়ানা দিল সে। বন পার হয়ে পশ্চিম দিকে একটি পুরনো বস্তি। সে বস্তিতে পৌছার জন্য দ্রুতগতিতে হাঁটছে বিজয়। হঠাৎ পথিমধ্যে দেখতে পেল এক বুড়ো শিয়াল পুরনো এক খবরের কাগজ এক চোখ ভাঙ্গা চশমা লাগিয়ে পড়ছে। বিজয় শিয়ালকে দেখে ভাবল, শিয়ালটা পণ্ডিত বলেই মনে হয়। শিয়ালের কাছে আমার উদ্দেশ্যটা বললে উপকার হতেও পারে।

বিজয় বুড়ো শিয়ালকে প্ৰণাম জানাল আর শ্রদ্ধাভরে বলল, “পণ্ডিতজী আমি এক ঘটনার বিচারপ্রার্থী হয়ে ঘরে ঘরে ঘুরছি। আমার বাছুরটা প্রতিবেশী মনি ভাই আটকিয়ে রেখেছে এবং সে বলছে। ওটা নাকি তার বলদের বাচ্চা। বলদ কি বাচ্চা জন্ম দেয়? পাশের বাড়ির মনি একথাটা জোর দিয়ে বলছে আর আমি গ্রামবাসীদের একথাটা বোঝাতে পারছি না। আমার গাভীটা দিনরাত বাছুরের জ্বালায় হাম্বা হাম্বা রব করে অস্থির হয়ে পড়েছে।”

শিয়াল পণ্ডিত বলল, “তোমাদের মনুষ্য সমাজের এতসব ঘটনাবলী নিয়ে যে প্রতিদিনের পত্রিকা বেরোয়, এতক্ষণ তাই পড়ছিলাম। তুমি কোন চিন্তা কর না। আগামীকাল এ গ্রাম, ও গ্রাম দুগ্রামের মুরব্বীদের ডাক। আমি ঠিক বিকেল ৪টায় তোমাদের সভায় গিয়ে সভাপতিত্ব করব। আর এর একটা সঠিক বিচার করে দিব। আজ তুমি বাড়ি ফিরে যাও।”

বিজয় সে কথা শুনে খুশিমনে বাড়ি ফিরে এল। সে গ্রামের সকল মুরুব্বীয়ানদের নিমন্ত্রন জানাল আগামীকল্য তার বাড়ির সভায় সবাইকে যোগদান করতে হবে। সঙ্গে একথাও জানাল যে, একজন বিজ্ঞ শিয়াল পণ্ডিত আগামীকালের সভায় উপস্থিত থাকবে।

বিজয়ের নিমন্ত্রণ পেয়ে পরদিন বিকাল চারটা থেকে তার বাড়িতে লোকজন জমায়েত হতে থাকল। তারা শিয়াল পণ্ডিতের অপেক্ষা করল। মনিকেও ডেকে সভায় হাজির করা হল।

একঘণ্টা পর শিয়াল নারকেলের পাত্রে তৈরি একটি হুঁকোয় লম্বা নল লাগিয়ে তামাক সাজিয়ে হুঁকোয় টান দিতে দিতে সভাস্থলে উপস্থিত হল।

একজন বৃদ্ধ বলল, “আচ্ছা শিয়াল মশায়! এত দেরি করে সভায় আসছ কেন? আমরা অনেকক্ষণ ধরে বসে আছি!”

শিয়াল বলল, “তোমাদের বাড়ির পাশের পথঘাট দিয়ে গরু মহিষের যাতায়াত একটু বেশি মনে হয়! পথঘাটে পানি জমে গিয়ে দেখতে ছোট্ট ঝর্ণার মত মনে হয়! আর সে ঝর্ণা পার হতে গিয়ে হুঁকোয় ভরা তামাকের জুলন্ত টিকি পানিতে পড়ে গেল। আর বলে লাভ নেই। সমস্ত ঝর্ণার পানি দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। পানিতে চিংড়ি মাছ ছিল, রুই ব্যুইচা মাছ, ব্যাঙের ছানা সবগুলো মরে গেল। আরে ভাই আমি তো জাতিতে শিয়ালের বংশ কিনা। ঐ মরা মাছগুলো খেতে গিয়ে এত দেরি হয়ে গেল। কেউ মনে কিছু নিও না।”

জনতা বলে উঠল, “পানিতে আবার আগুন লাগে নাকি? আমরা এসব আজগুবি কথা শুনতে এখানে আসিনি। চল, আমরা এখান থেকে চলে যাই।”

শিয়াল পন্ডিত সবাইকে করজোড়ে বিনীতভাবে বলল, “আমার সব কথা শুনে পরে যেয়ো।”

“আচ্ছা তোমার সব কথা শুনব”-জনতা বলল। তাড়াতাড়ি বল, আর কী কী বলার আছে!

শিয়াল পণ্ডিত দাঁড়িয়ে সবার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমাদের গ্রামের মনির বলদ যদি বাছুরের জন্ম দিতে পারে তাহলে পানিতে আগুন লাগতে পারে একথা সম্ভব হবে না কেন?”

শিয়ালের কথা শুনে জনতা বলল, হ্যাঁ-পূর্বপুরুষের কাল অবধি কখনও শুনি নাই যে বলদ বাচ্চা জন্ম দিতে পারে। বাছুরটা অবশ্যই বিজয়ের বাছুর। এখানেই বিচার কার্য সমাপ্ত হল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *