দুই ভাই
এক দেশে এক পরিবারে দুই সন্তান রেখে তাদের মা মারা গিয়েছিল। দুই ভাইয়ের বড় ভাইটির নাম ছুনু ও ছোট ভাইটির নাম মানু। তাদের পিতা সংসারের কাজকর্ম ও গৃহস্থলী সামলাতে অপারগ হয়ে একটি মেয়েকে বিয়ে করল। দুই ছেলে সকালে এক মুঠো ভাত খেয়ে মহিষের পাল চড়াতে মাঠে যেত। তাদের বিমাতা কিছু চালের কড়ি ভেজে দিয়ে একটি গামছায় বেঁধে দিত। খিদে পেলে তারা চালের ভাজা কড়ি খেত। তাদের প্রতিদিনের কাজ হল মহিষের পাল মাঠে চাড়ানো।
কোন এক রাজ্যের এক রাজপরিবার সকলেই মারা গিয়ে বংশ প্রায় নির্মল হয়ে পড়ল। বংশধর বলতে রাজার কেউ রইল না। মৃত রাজার একমাত্র হাতি মাধুরী। মাধুরী খাওয়া-দাও বন্ধ করে দিয়ে শুধু রাজার পুষ্করিণীর পারে ইতস্তত হেঁটে বেড়াতে আর তাদের মরদেহ যেখানে দাহ করা হয়েছিল সেই শ্মশানঘাটে এসে বৃংহতি রবে কাঁদত। হাতির ডাকে গ্রামের সন্তানসম্ভবা মহিলদের দশ পূর্ণ হওয়ার আগেই তাদের সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়ে পড়ত। এতো মস্ত মহাবিপদ! রাজার মন্ত্রী কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল।
মন্ত্রীর উপর এই হাতিটাকে দেখভাল করার দায়িত্ব ছিল। মন্ত্রী দস্তুর মত রাগে ফেটে পড়ল। হাতিটা যেন মন্ত্রীর কথা মানছে না। বরং মন্ত্রীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠল। কিছুতেই স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে রাজী হল না। শেষপর্যন্ত মন্ত্রী হাল ছেড়ে দিল। রাজাও হাল ছেড়ে দিল। হাতির চিন্তা বাদ দিয়ে রাজা নিজের কাজে মন দিল।
দিনের পর দিন হাতি অনাহারে থেকে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠল। সবাই বলল হাতিটার মনে দুঃখ রয়েছে বটে। কাকে ও কিছু বলতে পারছে না। মাঝে মধ্যে হাতিটা এমন জোরে ডাক দেয় মাটি থরথর করে কেঁপে উঠে। রাজা বলল, হাতির ডাকে আমার কিছুই হবে না। শেষ পর্যন্ত অবস্থা বেগতিক দেখে ঔষধ প্ৰয়োগ করে হাতিটাকে মেরে ফেলার কথা চিন্তা করল।
রাজা প্রাসাদের বারান্দায় এসে হাতওয়ালা চেয়ারটায় আরাম করে বসল। পাশের চেয়ারে মন্ত্রীও এসে বসল। রাজা হুঁকোয় টান দিয়ে মন্ত্রীর সঙ্গে হাতিটার সম্বন্ধে আলোচনা করছিল। এমন সময় উঠোনের ঈশান কোণে দাঁড়ানাে হাতিটা এমন জোরে গর্জন করে উঠল যে, পাশের গ্রামের বয়োবৃদ্ধ লোক গিরিধারীর পায়ুপথে অরিজ বের হয়ে পড়ল। গিরিধারীর ছেলে মুকুন্দ এক কচুপাতা দিয়ে অরিজটি আবার পায়ুপথ দিয়ে ঠেলে পেটের ভিতর ঢুকাতে গিয়ে ব্যর্থ হল। মুকুন্দ কিংকৰ্তব্যবিমূঢ় হয়ে মন্ত্রীর কাছে ছুটে গেল।
—মুকুন্দ! ভরদুপুরে কী হল তোমার? এত ছুটাছুটি করছ, কেন? মন্ত্রী জিজ্ঞেস করল।
—আপনার বাড়িতে তো কেউ অরিজ রোগে ভোগেনি। তাই বুঝতে পারছেন না মন্ত্রীমশায়—। মুকুন্দ বলল।
–কিসের অরিজি!
—গা-গা—গ্রামের অনেক বৃদ্ধ লোকের পিঠে পায়ুপথে অরিজ বেরিয়েছে। অনেকের অরিজ ঢুকাতে সম্ভব হলেও আমার বৃদ্ধপিতার অরিজ ঢুকছে না। হাতির জীবন বড় না। আমার বাবার জীবন বড়।” মুকুন্দ বলল।
–হাতি আবার তোমাদের কি করল?
-হাতির গর্জনে আমার বৃদ্ধবাবার পায়ুপথ দিয়ে অরিজ বেড়িয়েছে। ঢুকছে না। ইহার একটা বিহীত ব্যবস্থা করুন মন্ত্রীমশায়। হাতিটাকে এখন কি করতে হয় একটা কিছু করুন।
— কয়টা বিচার বসাবে বসাওগে যাও। তোমাকে উল্টো দেশ ছাড়া করব।
রাজবাড়ি জয়ঢোল বাজাতেই রাজ্যের সকল প্রজা সমবেত হল। মন্ত্রী নিজে হাতিটার বিচারের ভার নিল। বিচার বসল। বিচার সভায় রাজ্যের সকল প্রজাসাধারণ হাতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করল। এভাবে হাতিটাকে ঔষধ প্রয়োগ করে কষ্ট দিয়ে হত্যা করা কষ্টের ও দুঃখজনক বলে প্ৰজারা জানাল। তাহলে কি করা যায়!
—হ্যাঁ, হাতিকে ছেড়ে দেয়া হোক। সে যাকে সম্মানের সহিত তার পিঠে বসিয়ে তুলে আনবে তাকে রাজা মনোনীত করা হবে। আমার এ প্ৰস্তাবে কি তোমাদের সম্মতি রয়েছে?-মন্ত্রী বলল।
সবাই একবাক্যে মন্ত্রীর কথায় সম্মতি জানাল। সকলে সিদ্ধান্ত নিল—আগামীকালই হাতিটকে ছেড়ে দেয়া হবে।
পরদিন ভোরবেলা হাতিটাকে সাজিয়ে ফুলমাল্য দিয়ে পিঠে বসার আসন বেঁধে দেয়া হল। হাতিকে বলা হল-এ রাজ্যের বাহিরে যাকে পছন্দ তাকেই পিঠে চড়িয়ে আন, তাকেই রাজ অভিষেকে রাজা মনোনীত করা হবে। তাহলে হাতি আর কান্দবে না। আমরা অপেক্ষায় থাকিব যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রাজা বেছে আন।
এদিকে অরিজের যন্ত্রণায় বৃদ্ধ লোকটি মারা গেল। হাতি বন জঙ্গল পার হয়ে হেঁটে চলল। পথে যেতে হাতি রাখাল বালক দুটিকে খুঁজে পেল।
বড় ভাই ছুনু ছোট ভাই মানুকে মহিষের পাল সামলিয়ে রাখতে বলে খানিক সময় ঘুমিয়ে পড়েছিল। এক টুকরো বাঁশের গুড়িতে মাথা রেখে ছুনু অঘোর ঘুমে ঘুমাচ্ছিল। মানু একটি বরই গাছে উঠে। বরই খাচ্ছিল। আর সেখান থেকে মহিষের পাল কোনদিকে ঘাস খাচ্ছে দেখে পাহাড়া দিচ্ছিল।
হাতিটা ঘুমন্ত বালক ছুনুর কাছে গেল। ধীরে ধীরে নরম শুড় দিয়ে তাকে তুলে এনে ডিঠে চড়িয়ে বসাল। আর ধীরপায়ে রাজার বেশে ফিরে চলল আপন রাজ্যে।
পথিমধ্যে বালকটি জেগে উঠল। দেখতে পেল হাতির পিঠে বসে আছে সে। সে ভয়ে চিৎকার করতে লাগল। হাতিটা শুড় দিয়ে নরমভাবে তাকে আদর করল।
ছুনু দেখল তার ভাই কেঁদে কেঁদে মরে যাবে। হাতিটা সোজা বড় বড় পা ফেলে রওয়ানা দিল। ছুনু গামছায় বাঁধা চালভাজা কুড়ি পথে ফেলে দিয়ে গেল। যখন চালভাজা শেষ হল তখন পরনের গামছা কিছু অংশ ছিড়ে টুকরো করে ফেলে দিল। সারাপথে চিহ্ন রেখে গেল।
দেশে ফিরে হাতি ছুনুকে রাজসিংহাসনে বসাল। রাজ্য পরিচালনা শুরু করল ছুনু। মানু কাঁদতে কাঁদতে মহিষের পাল ফেলে বনে প্রবেশ করল।
ফলমূল খেয়ে দিন কেটে যায়। রাত হলে গাছের ডালে উঠে ঘুমায়। এদিকে মা-বাবা তাদের খোঁজে বের হল। কিন্তু কোথাও খুঁজে পেল না।
মানু বাঁশি বাজাত। বাঁশির সুর তার অত্যন্ত সুমিষ্ট। গান গাইতে শুরু করল সে। সে বাঁশি বাজিয়ে গান গেয়ে গ্রামে গ্রামে ভিক্ষা করতে লাগিল। ঘুরতে ঘুরতে সে ছুনুর রাজ্যে পৌঁছাল। গ্রামের লোকজন তার গান ও বঁশির সুর শুনে মুগ্ধ হল। একজন বলল, আমাদের নূতন রাজার কাছে ওকে নিয়ে গিয়ে গান শুনালে রাজা খুশি হবেন।
কিছুদিন পর রাজার এক পুত্ৰ সন্তান হল। পুত্রের ষষ্ঠীপূজায় গান গাওয়া ও বাঁশি বাজানোর নিমন্ত্রণ পেল সে।
কালো কুচকুচে চেহারা। লম্বা দাড়ি। এক বিশ্ৰী চেহারার লোকটিকে দেখে রাজা মন্তব্য করল, ওকে অযথাই নিয়ে আসা হয়েছে।
যারা তাকে রাজসমীপে হাজির করেছে তারা বলল, বাঁশির সুর আর গান না শুনে তো সবকিছু বলা যায় না। তিন বাজনা পার্টির বাজনা শোনার পর মানুর বঁশিতে গান শুরু হল। এক মোহনীয় বাঁশির সুরে রাজা মুগ্ধ হল। শেষ গানটি গাওয়ার সময় রাজা ঘুমিয়ে পড়ল। রাজা খানিক পরে উঠে আবার শেষ গানের কলি গাইতে বলল। মানু গাইল—
‘হারিয়েছি মাকে আমি, হারিয়েছি ভাইয়ে
কোথায় পাব তাদের আমি আজকে-।’
রাজা দাঁড়িয়ে বলল, “ওর বাঁশির গান থামাতে বল।” আচমকা এক লাফে সিংহাসন থেকে নামল। আর রাজা বলল, “সন্ন্যাসীকে আমার পাশে এনে বসতে দাও।”
রাজা তার নাম, পরিচয়, জীবনবৃত্তান্ত ও সন্ন্যাসীর বেশ ধারণের কারণ জিজ্ঞাসা করল।
—আমি মানু, আমার ভাই ছুনুকে আমি হারিয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছি।
—তিন সত্য করে বল, তুমি সত্যিকার মানু কিনা!
রাজা আবার বলল, “তুমি যদি মানু হয়ে থাক তাহলে উঠোনের কোণে পড়ে থাকা বড় পাথরটাকে এক হাতে তুলে দূরে ফেলে দিতে পারবে?”
মানু বলল, পারব।
দশ বারো জন মানুষ যে পাথরখণ্ড নাড়াতে পারছিল না। সন্ন্যাসী তাকে বামহাতে তুলে দূরে ফেলে দিল।
রাজা তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। দুজনে জড়ােজড়ি ধরে কিছুক্ষণ কাঁদল। দুজনে ষষ্ঠীপূজা অনুষ্ঠানে ও গানের মধ্যে কাঁদল।
রাজপ্রাসারে পানি উষ্ণ গরম করে তার স্নানের ব্যবস্থা করা হল। দাড়ি-চুল-কাটা হল। দুই ভাই সুখে শান্তিতে রইল। কিছুদিন পর তারা তাদের মা-বাবাকেও এনে তাদের সঙ্গে রাখল।
