গুপ্তধন (মণিপুরী রূপকথা)

গুপ্তধন

নদীর ধারে এক গ্রামে বাস করত এক বুড়ো। সে ছিল কৃপণ ও অকৃতদার। তার নাম ছিল পুনশিবা। পুনশিবা অর্থ দীর্ঘজীবি। তার ভাই আঙৌবা। পুনশিবা ও আঙৌবা, দুই ভাইয়ের ছিল এক বড় তালুক। জমি জমা চল্লিশ কিয়ার, সঙ্গে পাহাড়, নদীর পাড় আরও রবিশষ্যের খেত নিয়ে বিশাল কৃষিক্ষেত্র। পুনশিবা জীবনে যা রোজগার করত তা কাকেও দিত না। নিজের খাওয়া-দাওয়া আর পোশাক আশাকের খরচাপাতি ছাড়াও দুবৎসরে দু’একটি কীর্তনের আয়োজন করত সে। এরপরও তার বেঁচে যেত। অনেক সম্পদ। ধান থেকে, পাট থেকে, ইক্ষু থেকে, রবিশষ্য বিশেষ করে মটর শুটির ক্ষেত থেকে যে আয় সবকিছুই তার বেঁচে যেত অতিরিক্ত আয় হিসাবে। আর জমানো টাকা সে পিতলের কলসীতে ভরে মাটির তলায় লুকিয়ে রাখত। ছোট ভাই আঙেীবারও সম্পদের কমতি নেই। চল্লিশ কিয়ার জায়গা জমির ধান, শস্য, মানুষের কাছে বর্গাচাষ দিয়ে দিনগুলো তাদের ভালই চলত। গ্রামের এমন কোন পরিবার নেই যারা আপদে বিপদে তার কাছ থেকে সাহায্য পেয়েছে। কয়েকটি গাভী ছিল দুগ্ধবতী, মহিষ ছিল কয়েক জোড়া চাষাবাদের জন্য, আর বাড়িতে চাকর বাকররা গরু মহিষের ঘাস জোগাড় করতেই গলদঘর্ম হত। পনেরটা গরু-মহিষের খাদ্য যোগান দিত তারা। আঙৌবার ছিল এক পুত্র ও এক কন্যা। পুনশিবা চিরকুমার। দুই ভাই সমানভাবে কৃষিখেতের দেখাশোনা করত। মটর শুটির ক্ষেত ও দেখত। বিশাল চৌহদীর চারিধার জুড়ে আম কঁঠাল আর নানা ফল ফলাদির বাগান। বাড়ির সামনে বড় পুকুরে মাছও ছিল প্রচুর। তাদের নিজের আত্মীয় স্বজনরা অত্যন্ত দূরে বাস করত। বলতে গেলে পাহাড় টিলা আর বন জঙ্গল পেড়িয়ে যোজন যোজন দূরে। সে জঙ্গলের পথ পাড়ি দিতে হত বাঘ ভালুকের সঙ্গে লড়ে। আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না তা নয়। পুরো একদিন একরাত্রি পাহাড়ের সংকীর্ণ পথ হেঁটে কখনো পাহাড়ী ঝর্না পাড় হয়ে, কখনো কণ্টকাকীর্ণ পাহাড়ী কাঁটার গাছের মধ্য দিয়ে ঢেউটি জ্বালিয়ে দল বেঁধে হাঁটতে হত। কারণ কোথাও বাঘ বা ভালুক ঘাপটি মেরে বসে থাকত। পথচারীদের আক্রমণ করে খেয়ে ফেলত ৷

পুনশিবা ও আঙৌবারা দান দক্ষিণাও কম করেনি। গ্রামের পুরোহিতকে তারা গাভী, জমি ইত্যাদি দান করল। মন্দিরের সংস্কার কাজেও তারা বড় আর্থিক অনুদান দিল।

পুনশিবার বয়স হল। অশিতীপর বৃদ্ধ সিদ্ধান্ত নিল সে তীর্থধাম বৃন্দাবন পরিভ্রমণে বের হবে। এর আগে তো আত্মীয় স্বজন সকলের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ কুশল মঙ্গলাদি নিতে হয়। অধিকাংশ আত্মীয় স্বজন পশ্চিমের পাহাড়ের গা ঘেঁষে বসত গ্রামগুলোতে যাবার জন্য প্রস্তুত হল। একদিন সকাল বেলা লাঠি হাতে গায়ে নামাবলি জড়িয়ে ধুতি পরিধান করল সে। ধবধবে সাদা পাঞ্জাবিটা গায়ে দিল। এভাবে রওয়ানা দিল জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড়ী পথে আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে। পথে রাত হল। অনেক দিনের যাওয়া-আসা পথ চেনা তার। তাই কিছুতেই ভয় পেল না সে। সঙ্গে কেরোসিন পূর্ণ করে নেওয়া ঢেউট (মশাল) জ্বালাল। জ্বলন্ত অগ্নিশিখায় পথ দেখে অসীম সাহসে বৃদ্ধ হাঁটতে লাগল।

পাহাড়ের মাঝখানটায় সে একটা গৰ্জন শুনতে পেল। কান পেতে এদিক ওদিক চেয়ে জানার চেষ্টা করল। দেখল একটা বাঘ হরিণকে ধরার জন্য লাফ দিতে গিয়ে হঠাৎ বৃদ্ধের মশালের সামনাটায় এসে পড়েছে। বৃদ্ধের সুউচ্চ মশালের শিখা দেখে বাঘটি ভয় পেয়ে গর্জন করতে করতে দূরে পালাল। আরও কিছুদূর যেতে দেখল একপাল হরিণ নিৰ্ভয়ে কচিঘাস খাচ্ছে। এরপর সে একটা ভালুককে দেখল। অঘোর ঘুমে বিশাল শরীরটা এলিয়ে ঘুমুচ্ছে। বৃদ্ধ দ্রুত পায়ে পথ চলল। বানরের দল এক উচ্চ গাছ থেকে আরেক উচ্চ গাছে লম্ফ দিতে গিয়ে মশালের সামনে পড়ে গেছে। চি চি শব্দ করে ছোট দুটি বাচ্চাকে নিয়ে বানর বনের ভিতরে ঢুকল। শেষরাতে সে সুউচ্চ পর্বতের উপরের পথ অতিক্রম করে দেখল, জঙ্গলের পাশে একটি কুকি পরিবার। পর্বতের গায়ে তাদের জুম চাষ। ফসল আনারস আর পেয়ারার বাগান। কুকীরা বের হয়ে বৃদ্ধকে চিনতে পেয়ে তাদের বাড়িতে নিয়ে আদর যত্ন করল। তারা তাকে কিছু ফলমূল উপহার দিল। অনুরোধ করল আবার ফিরতি পথে যেন তাদের বাড়িতে সে মেহমান হয়ে আসে।

পরদিন ভোর বেলা সে আত্মীয়ের বাড়ি পৌছল। সঙ্গের ব্যাগে পুটলিভৰ্ত্তি ফলমূল আরও পথ্য সামগ্ৰী পেয়ে আত্মীয়েরা খুশি হল। যে আত্মীয়ের বাড়িতে সে প্রথমে গোল- সে ছিল অত্যন্ত গরীব চাষী- নাম সেনচাবা। দারিদ্র ছিল তার নিত্য সংগী। দু’বেলা আহারের ব্যবস্থা করা সম্ভব ছিল না সেনচাবার। বেশির ভাগ বলতে গেলে রাত্ৰিবোলা প্ৰায় অনাহারে কাটাত সে। আর বাড়িতে থালাবাসনও ছিল না। নারকেলের খোসার বাটীতে করে তারা ভাত খেত। পুনশিবা এক দীর্ঘ পাহাড়ী পথে হেঁটে কষ্টে বিশ্রাম নিল। আর এ গরীব আত্মীয়ের বাড়িতেও সে ভাল খাবার খেতে পারল না। দুদিন পর সে আমাশয়ে আক্রান্ত হল। ভাল ঔষধপত্র খাওয়ার টাকাকড়ি সে সঙ্গে নিয়ে আসেনি। দরিদ্র সেনচাবার এমন সামথ্য নেই যে ভাল ডাক্তার দেখাবে, ভাল ঔষধপত্র আর খাবার দাবার যোগাড় করতে পারবে। বুড়ো পুনশিবা শয্যাশায়ী হল। ঔষধপত্র বনৌষধী করা হল। কিন্তু কিছুতেই আমাশয় ভাল হল না। রক্ত আমাশয়ে ভুগে এক সপ্তাহ পর পুনশিবা মারা গেল। বৃন্দাবন যাওয়া হল না তার। মৃত্যুর আগে তার লুকানো গুপ্তধনের কথা সে সেনচারের কাছে বলে গেল। সেনচাবার ভাই হেইশিংপাও গুপ্তধনের কথা জানল।

মৃত্যুর ঠিক বারোদিন পর বিদেহী আত্মার শ্রাদ্ধকর্ম শেষ হল। পরদিনই সেনচাবা ও হেইশিংপা, রওয়ানা দিল মৃত পুনশিবার আপন ভাই ঙৌবার বাড়িতে। তাদের বীেরা কলাপাতায় মুড়িয়ে ভাত আর তরকারি গামছায় বেঁধে দিল। ঙৌবা, অসময়ে তাদের দূরআত্মীয় দুভাইকে দেখে তাদের আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা করল।

তারা বলল, “আমরা এলাম তোমাদের সাথে দেখাসাক্ষাৎ করতে। মৃতের আত্মার সদগতি কামনায় আমরা শরিক হব। আর আমরা সময়ও তো পাই না বলে।”

আঙৌবা বলল, “ভালই হয়েছে। তোমরা পুকুরে স্নান করে আস। বিশ্রাম নাও। দূর পথ অতিক্রম করে এসেছি।”

তারা আঙৌবার স্ত্রীর কাছে কলাগাছের পোড়া ছাই চাইল। ঙৌবার স্ত্রী জানতে চাইল— কলাগাছের পোড়া ছাই দিয়ে কি হবে।

তারা বলল, পাহাড়ী পথ অতিক্রমে পায়ে অনেক ময়লা জমেছে। তাছাড়া তারা তো বছরের ছয়মাস পাহাড়ের শন কেটে বিক্রি করে দিনকাল কাটায়। ছাই মেখে স্নান করলে সহজে ময়লা যায়।

কলাগাছের ছাই পায়ে মেখে স্নান করে তারা দুপুরের খবার খেল। সন্ধ্যাবেলায় দুই ভাই এদিক ওদিক ঘুরাফেরা করে মাটির তলায় লুকানো গুপ্তধনের জায়গাটা অনুমান করে নিল। বুড়ো যেভাবে বর্ণনা দিয়েছিল সেই বাড়ির চৌহদ্দীর পিছনে অনাবাদি জমিটাকে তারা সুযোগ বুঝে দেখে রাখল।

রাত্ৰিবেলা খাওয়া দাওয়া শেষে তারা বাড়ির মাংকলে (বড় বারান্দা) ঘুমোবার ইচ্ছা পোষণ করল।

তারা বলল, “গরমকাল এখন! আর আমরা মাংকলে ঘুমানোতে অভ্যস্ত। তাই আজ আমরা মাংকলেই ঘুমাবো।”

আঙৌবা বলল, “এ কেমন কথা! তোমরা অতিথি! আমি ঘরের মধ্যে ঘুমাবো। আর তোমরা মাংকলে ঘুমাবে তা হয় না!”

তারা বলল, “আমরা মাংকলে ঘুমাতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করছি।”

দুভাই সন্ধ্যায় দুটো কোদল জোগাড় করে রাখল।

গভীর রাত্রে সেনচাবা ও হেইশিংপা মিলে কোদাল নিয়ে বাড়ির পিছনের জমিতে মাটি খনন করতে শুরু করল। কিছু জায়গা খননের পর তারা কিছুই পেল না। চতুষ্কোণ জমিটার এক কোণে তারা খনন করল। সেখানেও তারা কিছুই পেল না। আবার তারা জমিনের ঈশান কোনটায় খনন করতে শুরু করল।

বাড়ির দুটি কুকুর এসে ঘেউ ঘেউ করে ডাকল। সেনচাবা বলল, আগে কুকুর দুটােকে জব্দ করতে হবে। সেনচাবা তাদের বীেদের বেঁধে দেয়া কলাপাতায় মোড়া গামছা বাঁধা ভাত ও তরকারী কুকুর দুটিকে খেতে দিল। কুকুর দুটাে পেট ভরে খেয়ে লেজ নেড়ে তাদের পাশে পাশে রইল। একটু পরে কুকুর দুটাে ঘুমিয়ে পড়লে তারা জমিনের অর্ধেকটা খনন করল। হঠাৎ সেনচাবার কোদালের আগায় ঝন করে কি যেন ঘর্ষণের শব্দ বেজে উঠল।

“পেয়েছি! পেয়েছি!” সেনচাবা চিৎকার করে বলল।

“আস্তে। লোকজন শুনে ফেলবে।” হেইশিংপো বলল।

জমিনটা বৃত্তাকারে খনন করে দেখতে পেল দুটো মোটা পিতলের কলসী মাটির তলায় লুকানো রয়েছে। তারা সেগুলো বের করল। দুজনে কাঁধে বয়ে তারা পাশের জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে রাখল। আবার তারা ফিরে এসে মাংকলে সুবোধ মানুষের মত ঘুমিয়ে পড়ল। একটু পরেই ভোর হল।

ভোর হতেই তারা বাড়ির মালিকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পাহাড়ী পথে রওয়ানা দিল। পূর্ব রাত্ৰিতে জঙ্গলে লুকানাে পিতলের দুটি কলসী তারা জঙ্গল থেকে কুড়িয়ে নিল।

আর সারাদিন রাত পাহাড়ী পথে হেটে শেষরাতে নিজ বাড়িতে ফিরে এল সেনচাবা ও হেইশিংপো।

বাড়িতে এসে বৌদের তারা একথা জানাল না। বৌরা উৎসুক হয়ে পিতলের কলসী দুটো সযত্নে রেখে দিল। ধীরে ধীরে জমি কিনল। আরও জমি তারা কেনার জন্য কথাবার্তা বলল।

এভাবে তারা সহসা ধনী কৃষকে পরিণত হল। এদিকে আঙৌবা, তো অবাক। সে দেখতে পেল তাদের বাড়ির পিছনের অনাবাদী জমিটা রাত্রিবেলা খনন করে ফেলে রেখেচে। গ্রাম বাসীদের জানাল এ কথা। গ্রামবাসীরা সবাই এসে দেখল।

তারা নিশ্চিত হল একাজ অবশ্যই দূর আত্মীয় সেনচাবা ও হেইশিংপার কাজ। তারা মৃত পুনশিবার লুকানো গুপ্তধন নিতে এসেছিল। তা তারা পেয়েও গেছে। এখন উপায়। পুনশিবা তো তাদের বাড়িতেই মারা গিয়েছিল। মরার আগে তার অন্তিম অবস্থায় দু’জনেই মৃতের সঙ্গে কথা বলেছে। আঙৌবা গ্রামবাসিদের নিয়ে দলবল সহ কয়েকদিন পর সেনচাবাদের বাড়িতে উপস্থিত হল। সে সমস্ত ঘটনা বলে গুপ্তধনে তার অংশীদারিত্বের দাবী জানােল। সেনচাবা ও হেইশিংপা গুপ্তধনের কথা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করল।

পঞ্চায়েৎ বসল। গ্রামবাসীরা বলল, “এত তাড়াতাড়ি তারা জমি কিনল কিভাবে!” সেনচাবা ও হেইশিংপা বলল, “আমরা পাহাড় থেকে শন কেটে, বাঁশ কেটে কারবারীদের কাছে বিক্রি করে পয়সা জমিয়েছি। তা দিয়ে জমি কিনেছি। এতে তোমাদের লোভ হল!”

পঞ্চায়েত কর্তা বলল, “ভাল কথা। এ গ্রামের সবাই বাঁশ, শন কেটে জীবন ধারণ করে। কিন্তু তারা তো এমন ধনী হল না।”

তারা বলল, “সে আমাদের চেষ্টার ফল, আমরা জমি কিনেছি। আমরা তো মাটি কমলা নাই যে খনন করতে আত্মীয়ের বাড়ি যাব।”

সেনচাবার বৌ বলল, “আমরা গরীব হলেও কৃপণ নাই যে কলসীতে কাঁচা টাকা জমাব।” হেইশিংপার বৌ বলল, “আমরা এমন নয় যে দু’দিনের পচা ভাত তরকারী কুকুরকে খেতে দিব।”

সবাই বলল, “পুনশিবার গুপ্তধন চুরি করেছ তোমরাই।”

দীর্ঘকাল ধরে পুনশিবার লুকানো টাকার অবিশিষ্ট কলসীটা দেউ হয়ে গভীর রাতে বৃষ্টিতে ভিজে জলাশয়ের ধারে ধারে ঘুরে রইল। আঙৌবার বংশধররা তার কোনো কুলকিনারা খুঁজে পেল না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *