বাঘের বাচ্চা সোনার ধন (মণিপুরী রূপকথা)

বাঘের বাচ্চা সোনার ধন

এক দেশে এক কাঠুরিয়া পরিবার ছিল। তাদের পরিবার ছিল হতদরিদ্র, দিন আনে দিন খায়। কাঠুরিয়ার বউ ছিল সন্তানসম্ভবা। একদিন জঙ্গল থেকে কাঠ কুড়াতে গিয়ে বৌ জঙ্গলে একটি সন্তান প্রসব করল। সন্তানটি ছিল পুত্রসন্তান।

ঐ জঙ্গলে এক বাঘিনী সন্তান মারা যাবার পর তার দুগ্ধবান ফুলে উঠলে যন্ত্রণায় কাতর হয়ে ঘুরাফিরা করছিল। দৈবাৎ বাঘিনী দূর থেকে কাঠূরিয়া পরিবারকে দেখে ফেলল। বাঘিনীর ভয়ে কাঠূরিয়া পরিবার ভীত হয়ে শিশুটিকে রেখে পালিয়ে গেল।

বাঘিনী শিশুটির কাছে যেতেই শিশুটি ওঁয়া ওঁয়া করে কেঁদে উঠল। দুগ্ধতাপে যন্ত্রণায় কাতর বাঘিনী শিশুটিকে দেখে তৎক্ষণাৎ তার হিংস্রভাব যেন মিইয়ে গেল এবং শিশুটির সঙ্গে মায়ার জালে আবদ্ধ হল। বাঘিনী তার দুগ্ধবান শিশুটির মুখে তুলে দিল। তৎক্ষণাৎ শিশুটির কান্না থেমে গোল এবং আপনমনে বাঘিনীর দুগ্ধ পান করতে লাগল।

এভাবে মানবশিশু বাঘের দুধ পান করে দিনে দিনে বড় হয়ে উঠল। বনের সকল পশুপাখি তার নাম রাখল। “বাঘের বাচ্চা সোনারধান’।

বাঘের বাচ্চা সোনারধান তো মানুষের সন্তান। বড় হবার পর স্বাভাবিক কারণেই দেশে বিদেশে ঘুরে বেড়াতে চাইল।

একদিন বাঘের বাচ্চা সোনারধান বন থেকে বেরিয়ে আরেক জঙ্গলের দিকে রওয়ানা দিল। জঙ্গল ছাড়িয়ে সে পার হল গ্রাম, নদী আর পাহাড়। সে একটি অচিন দেশে এসে পড়ল।

সেদেশে গিয়ে দেখল যে এক যুবক বড় বড় চারটি পাথর দিয়ে “আঙ্করপ্পী” খেলছে। আঙ্করপ্পী হল হাতের পাচের এপিঠ ওপিঠ দিয়ে খেলা। মাটিতে ফেলে এক পাথরের সঙ্গে আরেক পাথরকে আঘাত করা। সেই খেলা দেখে সোনারধন অবাক হযে যুবকটির কাছে গেল। বলল, “তুমি তো অত্যন্ত বলশালী।”

একথা শুনে যুবক বলল, “আমি তেমন বলশালী নই। বাঘের বাচ্চা সোনারধন আমার চেয়ে বেশি বলশালী।”

একথা শুনে সোনারধান বলল, “সে তো আমি!” আমি, বলতেই যুবকটি বলল, “তাহলে আমরা দুজনে বন্ধুত্ব করি।”

দুজনে বন্ধুত্ব গড়ে একসাথে পথ হাঁটতে লাগল। ভ্ৰমণ করতে করতে তারা একটা নুতন দেশে এসে পৌছল। সে দেশে যেয়ে দেখল। একজন যুবক গলায় পাঁচটি পিতলের কলসী ঝুঁলিয়ে বারো বিঘা জমির উপর খোদিত বড় একটি পুষ্করিণীতে স্নান করছে। সেটা দেখে তো সোনারধন ও তার বন্ধু অবাক। যুবকটির নিকটে গিয়ে বলল, “ভাই, তুমি তো ভীষণ বলশালী, তাই না?”

যুবকটি বলল, “আমার আবার এত শক্তি কোথায়? বাঘের বাচ্চা সোনারধনের শক্তি দেখলে-”।

সোনারধান বলল, “সে তো আমিই।”

“তাহলে আমরা দুজনে বন্ধু হই”-যুবকটি বলল।

এবারে সোনারধান ও তার দুই বন্ধু হেঁটে চলল। যেতে পথে সূর্য ডুবল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। আরও হেঁটে তারা একটি গ্রামে পৌছল। সে গ্রামে তারা কোন জন মানবের সাড়া শব্দ পেল না। আর কিছুদূর এগুতেই একটি থুরথুরে বুড়ি ও তার বাড়ি দেখতে পেল। তখন যুবক একটি বিড়ি বের করল। কিন্তু বিড়ি জ্বালানোর আগুন খুঁজে না পেয়ে সোনারধন একজন যুবককে বুড়ির বাড়ির ভেতর পাঠাল। বুড়িকে জিজ্ঞেস করায় বুড়ি বলল, “আমি তো বুড়ো মানুষ, বাড়ির ভিতরে তুমি খুঁজে দেখা।”

ঘরে প্রবেশ করা মাত্রই বুড়ি রাক্ষসীর মূর্তি ধারণ করে একটি পলো (একধরনের বড় ঝুড়ি) দিয়ে যুবকটিকে ঢেকে দিল। এদিকে সোনারধান ও তার বন্ধু যুবকটির অপেক্ষায় থেকে ফিরে আসতে না দেখে বন্ধুকে ঘরের ভিতর পাঠাল। বুড়ি আগের মত রাক্ষসীর মূর্তি ধারণ করে আরেকটি পলো দিয়ে ঢেকে রাখল।

দুই বন্ধুকে হারিয়ে সোনারধন ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করল তাদের মুক্তির জন্য। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে সে অস্থির হয়ে পড়ল। শেষ পর্যন্ত সোনারধান তাদের অবস্থা দেখার জন্য বুড়ির বাড়িতে গেল।

সোনারধান বুড়ির বাড়িতে গিয়ে দেখল, বুড়ি ঘরের বারান্দায় বসে দেবতার উদ্দেশ্যে ভক্তি করছে। সোনারধান তার কাছে আগুন চাইল। বুড়ি তাকে আগের মত ঘরের ভিতরে প্রবেশ করে আগুন খুঁজতে বলল।

সোনারধন বাড়িতে প্রবেশ করা মাত্রই বুড়ি বিকট আওয়াজ করে রাক্ষসীর মূর্তি ধারণ করল। সোনারধান থমকে দাঁড়াল। বুড়ি রাক্ষসীর মূর্তি ধারণ করে সোনারধনকে গ্ৰাস করার জন্য এক পা এগিয়ে যেতেই সোনারধন বাঘের বাচ্চার মত এক লাফে বুড়ির চুলের মুঠো ধরে জোরে টান দিল।

চুলের মুঠো ধরে সোনারধান বুড়িকে কয়েক চক্কর ঘুরাল। এরপরে সে বুড়িকে সজোরে বারান্দায় নিক্ষেপ করল। বুড়ি ঘরের বারান্দায় ছিটকে পড়ল। রাক্ষসী উঠে সোনারধনের সঙ্গে মল্লযুদ্ধে লিপ্ত হল। বাইরে তুফান বইল।

এভাবে মল্লযুদ্ধে বুড়ি কাবু হয়ে পড়লে বাঘের বাচ্চা সোনারধন পা দুটিকে একত্রে জড়ো করে শূন্যে উড়িয়ে ঘুরপাক দিতে থাকল এবং এভাবে রাক্ষসীকে মেরে ফেলল।

রাক্ষসীকে মেরে সে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল। দু বন্ধু বন্দী অবস্থায়। পলোর মধ্য থেকে তাদের উদ্ধার করার জন্য চিৎকার শুনতে পেল। সোনারধান তাদের পলো একটানে উড়িয়ে দিল। দুই বন্ধু উদ্ধার পেল। অনেকদিন পর তিন বন্ধু মিলে দেশে ফিরল। তারা একত্রে দীর্ঘদিন সুখেই কাটাল!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *