হাজারী মালোর শক্তি (মণিপুরী রূপকথা)

হাজারী মালোর শক্তি

একদেশে এক বিধবা মা ও তার একমাত্র পুত্র বাস করত। ছেলেটি এত অলস ছিল যে সে প্রতিদিন দুপুর বারোটা পর্যন্ত ঘুমােত। উঠতো ঠিক দুপুর বারোটায়। স্নান করত সপ্তাহে একবার। তার মা তাকে প্রতিদিন এসব অভ্যাসের জন্য বকুনি দিত। ছেলে তা গায়ে মাখত না।

একদিন ছেলেটি একটি মাছি মারার হাতপাখা বেত দিয়ে তৈরি করল। খেলার ছলে মাছি মারতে লাগল এবং এক হাজার মাছি মেরে ফেলল। মাছি মারা এক হাজার পূর্ণ হলে সে তার মাকে বলল, মা, তুমি রাজার কাছে যাও ! গিয়ে বলবে, “মহারাজ, আমার ছেলে এক হাজার জীব মেরে ফেলেছে।”

মা ছেলের কথায় সম্মতি দিয়ে রাজার কাছে গেল। রাজা এক হাজার জীব মেরে ফেলার কথা শুনে অবাক হল। রাজা ভয় পেয়ে গেল। রাজা মনে মনে ছেলেটিকে কোন ভাল কাজে লাগানোর কথা চিন্তা করতে লাগল। রাজা মহিলাকে কিছু টাকা দিল এবং পরদিন ছেলেকে রাজসভায় পাঠানাের কথা বলল। মহিলাটি কিছুদূর যাওয়ার পর রাজার কি যেন মনে হল। আবার মহিলাকে ডাকাল। রাজা বলল, আজ থেকে তোমার ছেলের নাম হবে “হাজারী মালো”।

মহিলা চলে যাবার পর রাজা জয়ডঙ্কা বাজিয়ে সৈন্যসামন্তকে ডাকল। তাদের আদেশ দিল, হাজারী মালোকে সসম্মানে রাজপ্রাসাদে অভ্যর্থনা জানাতে হবে। রাজ আদেশ পেয়ে হাজারী মালো রাজপ্রাসাদে এসে পৌঁছল। তাকে যথাযোগ্য অভ্যর্থনা দিয়ে বরণ করা হল। রাজা তাকে কাছে ডেকে বলল, “হাজারী মালো, আমি তোমাকে আমার সৈন্যদলের সেনাপতি নিয়োগ করতে চাই।” রাজার কথা শুনে হাজারী মালোর প্রায় দম বন্ধ হয়ে গেল। একটু নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে সে বলল, “আজ্ঞে, মহারাজার সদিচ্ছার জয় হােক ৷”

হাজারী মালো সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় সেনাপতির পদ অলংকৃত করল।

কিছুদিন পর রাজা হাজারী মালোকে ডেকে বলল, “প্রতিবেশী রাষ্ট্রে সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ করতে হবে। তুমি ব্যবস্থা গ্রহণ কর।”

হাজারী মালো এবার বিপদে পড়ল। কিভাবে এ বিপদ থেকে উদ্ধার হওয়া যায় সে চিন্তা করতে লাগল। শেষপর্যন্ত রাজপ্রাসাদ ছেড়ে কোন দূরদেশে পালিয়ে যাবার ফন্দি আঁটল।

রাজপ্রাসাদে এতদিন খেয়ে দেয়ে হাজারী মালোর শরীর বালিশের মত তুলতুলে নরম হয়ে উঠেছিল।

রাজা বলল, “ঘোড়াশাল থেকে সবচেয়ে উত্তম ঘোড়া বেছে যুদ্ধে রওয়ানা হও।”

হাজারী মালো এবারে যুদ্ধের পূর্বরাত্রেই প্রাসাদ থেকে পালানোর সিদ্ধান্ত নিল। সে কাক ডাকা ভোরে উঠল। আস্তাবলে গিয়ে একটি ঘোড়া নিয়ে পালাবার জন্য খোঁজাখুঁজি করতে লাগল।

সেই রাতে এক ঘটনা ঘটল। একটি বাঘ রাতে গরু শিকার করে। খাওয়ার জন্য প্রাসাদের কাছে গরু খুঁজতে খুঁজতে আস্তাবলে ঢুকে গেল। হঠাৎ হাজারী মালোকে দেখে আস্তাবলের এক কোণে লুকিয়ে রইল।

এদিকে অন্ধকারে হাজারী মালো উৎকৃষ্ট তাজা ঘোড়া খুঁজতে খুঁজতে আস্তাবলের এক কোণে পৌছল। অন্ধকারে ঘোড়াগুলি হাতিয়ে দেখছে সে। সে এভাবে হাত দিয়ে মোটা তাজা আন্দাজ করতে করতে বাঘের শরীরে হাত দিয়েই ভাবল, খুবই মোটা তাজা শরীর!–

হ্যাঁ পেয়েছি। এটাকেই নিতে হবে। হাজারী মালো তৎক্ষণাৎ মুখে দড়ি দিয়ে বেঁধে একলাফে পিঠে চড়ে বসল। এবার দৌড়াবার পালা। বাঘটি হালুম, হালুম করে দৌড়তে শুরু করল।

বাঘের শব্দ শুনে দেশের সব মানুষ ঘুম থেকে জেগে উঠল। লোকজন ঘুম থেকে উঠে দেখল, বাঘের পিঠে চড়ে হাজারী মালো দৌড়ে বেড়াচ্ছে। এ খবর সহসা রাজার কানে পৌছল। রাজা এ সংবাদ পেয়ে নিজের বিচক্ষণতার তারিফ করল, একজন সাচ্চা সেনাপতি বটে! এতদিনে খুঁজে পেয়েছি।

এদিকে হাজারী মালো ঈশ্বরের কাছে প্ৰাণ ভিক্ষা করছে। তার প্রাণ বেরিয়ে যাবার অবস্থা হয়েছে। এভাবে হাজারী মালো নিজে দেশান্তরী হতে যেয়ে বাঘটিকে দেশান্তরী করে কতদিন পর নিজে রাজপ্রাসাদে ফিরল।

রাজা দুৰ্দান্ত সাহসিকতার জন্য হাজারী মালোর গলে বিজয়পদক পড়িয়ে দিল। প্রধান সেনাপতির পদ তার জন্য পাকাপোক্ত হল।

বছর গড়িয়ে গেল। গত যুদ্ধে হাজারী মালো শরিক হয় নাই। আবার এক যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। সকল সৈন্যসামন্তের প্রস্তুতি চলছে। হাজারী মালো ভাবল, এবার বুঝি তার মরণ কেউ আটকাতে পারবে না। হাজারী মালো যুদ্ধে যাবার জন্য প্রস্তুত হল। মনে মনে ভাবল, আগে একবার মোটা তাজা ঘোড়া খুঁজতে গিয়ে বাঘ ধরেছিলাম। এবার কী নিয়ে বের হব! ভেবেচিন্তে রাজার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্ৰভুভক্ত ঘোড়াটায় বেরোনোর সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু ঘোড়াটা কিছুদিন ধরে না খেয়ে শুকিয়ে গেছে। ঘোড়াটাকে স্নান করাল, ভাল ভাল খাবার দিল। ঘোড়াটা ভীষণ খুশি হল। ঘোড়াটা লাফালাফি করতে শুরু করল। হাজারী মালো যুদ্ধের পোশাক পরিধান পরে একলাফে ঘোড়ার উপরে উঠে বসতেই ঘোড়াটি লাফ দিতে শুরু করল। ঘোড়াটি দৌড়তে লাগল। হাজারী মালো ভাবল, এবার তার মরণ হবে। মরার আগে অন্তত; সবার সঙ্গে একবার দেখা করে যাব। কিন্তু ঘোড়া যখন আকাশে লম্ফঝম্ফ দিয়ে দৌড়তে শুরু করল তখন সে বলল, “আমি মরে গেলাম, আমাকে রক্ষা কর।” এদিকে সৈন্যরা শুনল, তোমরা কেউ এসো না, আমি একাই শেষ করতে পারব।

এভাবে দৌড়াতে দৌড়াতে ঘোড়া আকাশে হারিয়ে গেল। হাজারী মালো ঘোড়ার গায়ে জড়িয়ে ধরে আটকে রইল। ঘোড়া উপরে উঠে দেখল, শত্রুরা যুদ্ধে নেমেছে। হাজারী মালো আকাশ থেকে নিচে তাকিয়ে দেখল, সবকিছুই আবছা, ছোট দেখাচ্ছে মানুষজন। ঘোড়া শত্রুর দিকে ধেয়ে যাচ্ছে।

এভাবে উড়ে যেতে যেতে সে একটা প্ৰকাণ্ড বটগাছ দেখতে পেল। হাজারী মালো বটগাছের একটা ডাল ভেঙে নিয়ে সেটা নিয়ে শক্ৰদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। দেখল শত্রুরা গুলি ছুড়ছে। বন্দুকের গুলি বটের ডালে লেগে হাজারী মালো রক্ষা পেল। হাজারী মালোর ঘোড়া নিমেষে শক্ৰ সৈন্যদের পিষে মেরে ফেলল। শত্রুদের মেরে যুদ্ধজয় করে হাজারী মালো দেশে ফিরল। দেশের প্রজাবৃন্দ চারদিকে হাজারী মালোকে দেখে জয়ধ্বনি দিল।

যুদ্ধবিজয়ী হাজারী মালো সৈন্যদের আদেশ দিল, ঘোড়াকে স্নান করাও। ভাল খাবার দাও। আমিও ক্লান্ত। আমি ঘুমাব, বিছানা পত্ৰ যোগাড় কর। আর মনে রেখ ঘোড়াটা যেন আমার চোখের সামনে থেকে সরে না যায়। এভাবে কিছুদিন সে ঘুমাল।

এর কিছুদিন পর হাজারী মালো তার মাকে এনে সুখে শান্তিতে রইল। প্রজাবৃন্দও সুখে শান্তিতে রইল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *