বুড়ো বুড়ির আড়ি (মণিপুরী রূপকথা)

বুড়ো বুড়ির আড়ি

এক গ্রামে ছিল এক বুড়ো। তার নাম গোবর্ধন। আর তার স্ত্রীর নাম ধ্বনি। গােবর্ধন হল একটি পর্বতের নাম, কথায় আছে গিরিগােবর্ধন, আর ধ্বনি অর্থ উচ্চারণ স্বর। তাদের ছিল একমাত্র কন্যা, নাম কাবকলেই। কাবকলেই খুবই সুগন্ধী ফুল। মেয়েটির যেমন নাম ছোটকাল থেকে নৃত্যগীতে পারদর্শী। বাড়িতে নাচ শিখে ওস্তাদ বা ওঝা রেখে সে রাসলীলার সম্পূর্ণ আসর নাচতে শিখেছে। যেদিন কার্তিক রাসপূর্ণিমায় কাবকলেই বৃন্দাদেবী হয়ে নাচছিল, সেদিন বুড়ো বুড়ির আবেগ সামলাতে না পেরে কেঁদে আকুল হল। রাসধারী, সূত্ৰধারী, মৃদঙ্গবাদকের পাশে বসে বুড়ো-বুড়ির যে কি কান্না। মণ্ডপের মাঝখানে মৃদঙ্গর গম গম আওয়াজে চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে ঘাঘরা পােশাক পরিহিতা নৃত্য শিল্পীর কুশলী দেখে সবাই তার তারিফ করল। আর চারদিক থেকে বৃষ্টির মত বর্ষণ হল বাতাসা, নকুনদানা, মিঠাই ও বিস্কুট। যাদের মানত ছিল দেবতার উদ্দেশ্যে কিছু অর্ঘ্য দেওয়ার তারা তা পূরণ করল। ভাবে বিভোর হয়ে গোবর্ধন সারারাত মাটিতে বসে কাঁদল।

রাসলীলার দুবছর পর কাবকলেইর বিয়ে দেওয়া হল। দূর গ্রামে এক বড় পরিবারে তার বিয়ে হল। এমন দূরত্ব রেখে সে বছরে একবারই আসা হয় না তার। বুড়ো বুড়ি একাকী হয়ে পড়ল। বাড়ির সমস্ত কাজ, বাসন পরিষ্কার করা, রান্না করা, কাপড় ধোয়া সবকিছুই নিজে হাতে করত বুড়ি। বুড়ো তার সৎসামান্য কৃষিক্ষেত নিয়ে ব্যস্ত থাকত। রোদে পুড়ে, কোদাল দিয়ে রবি শস্যের মাটি কর্ষণ করে সে হয়রান হয়ে পড়ত। এরই মাঝে তার নিজস্ব কিছু বিদ্যা বলতে রাসনৃত্যের মৃদঙ্গ বাদন ঠিক ভাবে করতে পারত না বলে মনে কষ্ট পেত। এমন ভাবপ্রবণ কর্মঠ মানুষটির ভিতরে ছিল অসম্ভব জেদ। জীবনভর যা ভাল বলে বুঝেছে তাই করে কাটিয়েছে। কোন লোভ লালসা তাকে অন্যায় পথে চালিত করতে পারেনি। এইজন্যে তার আত্মম্ভরিতাও কম ছিল না।

পাশের বাড়ির বসন্তকুমারের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভাল ছিল না। দুজনেই সমবয়সী ও মাতব্বর। প্রায়ই এটা ওটা নিয়ে তর্কবির্তক, লাগালাগি, রেষারেষি লেগেই ছিল। একদিন পরগণার বিচারে দুজনে তর্কযুদ্ধে মেতে উঠল-। এক বাড়ির মহিষ আরেক বাড়ির ধানক্ষেতে অনিষ্ট করার জন্য বিচার বসেছিল। বসন্তকুমার আঙুল তুলে বলল-“তোমার এ সিদ্ধান্ত ন্যায়সঙ্গত নয়।”

গোবর্ধন বলল, ন্যায্য-অন্যায্য বোঝার ক্ষমতা আমার আছে বলেই এই সিদ্ধান্ত আমার।”

বসন্ত কুমার তাদের দলবলসহ গোবর্ধনের দলবলের উপর হাতাহাতি জুড়ে দিয়েছিল। গোবর্ধন সেদিন বলল, বসন্তকুমারের হুঁকোতে আমি তামাক খাব না কোনদিন। সেই থেকে তাদের আড়ি। একে অন্যের ছায়া মারায় না। কয়েক বছর চলল এ আড়াআড়ি। গ্রামের মানুষের ও তাদের আড়াআড়ি ভাঙাতে পারল না।

এদিকে গোবর্ধনের বাড়িতে ও সামান্য বিষয় নিয়ে বৌয়ের সঙ্গে আড়ি দিয়েছিল সে। দুপুরে গোবর্ধন নদীতে স্নান করে ভিজা গামছা পরিধান করে বাড়ি ফিরছিল। বৌ বলল, তাড়াতাড়ি গামছা বদল করে ফেল। ভিজা কাপড় এতক্ষন ধরে পরিধান করে আছ, শরীরের ক্ষতি হবে। গোবর্ধন শুকনা কাপড় চাইল। বৌ তাড়াতাড়ি বাড়ির ভেতর থেকে একটা লাকচি একটা লাকটিনা (জোড়াতালি) গামছা বুড়োকে দিল। বুড়ো রেগে চিৎকার করতে শুরু করল। “আমি এ গামছা পরিধান করব না। আমি কি এরূপ লাকটিনা গামছা পরিধানের যোগ্য। আমি একজন ওঝা, তুমি সবসময়ই আমাকে ছোট করতে চাইছ।”

বুড়ি বলল, “ভাল গামছাটা খুঁজে পাচ্ছি না। আপাতত এটা দিয়ে ভিজা কাপড় বদলে ফেলা।” বুড়ো রাজী হল না। সে বাড়িতে ঢুকে ভাল গামছাটা খুঁজে এনে পরিধান করল।

বুড়ির উপর বুড়ো ক্ষেপে গিয়ে যে আড়ি দিল আর ভাঙার নাম নেই। একদিন বুড়ো ভাত খেতে বসল। বউ থালায় পর্যাপ্ত ভাত ও বাটীতে মাছ তরকারী, সঙ্গে পিতলের জগে পানি এগিয়ে দিল। বুড়ো থালার ভাত খেয়ে শেষ করল। “আরও ভাত লাগবে নাকি?”-বুড়ি জিজ্ঞেস করল। বুড়ো নিরুত্তর।

-“পেট না ভরলে তো যে কেউ আরো খেতে চাবে।” বুড়ো উত্তরে বলল।

বুড়ি তারু (বড় চামচ) দিয়ে দু তারু ভাত থালায় ঢেলে দিল। দু। তারু তারকারিও ঢেলে দিল বাটিতে।

এদিকে বুড়ি বুড়োর থালায় ভাত-তরকারি দেয়ার সময় একটি বিড়াল বুড়ির জন্য রাখা মাছের টুকুরো মুখে নিয়ে দৌড়ল। বুড়ো দেখে ও যেন বিড়াল তাড়াল না। সে তার স্বতন্ত্র জেদ ও আড়ি বজায় রাখল। শেষপর্যন্ত বুড়ি সাদাভােত আর লবন মেখে ভাত খেয়ে শুয়ে রইল।

বুড়ো ভাল রকম খেয়ে লাউয়ের মত পেটটার উপর পৈতা ঝুলিয়ে শীতের দুপুরে উঠোনে পিঁড়ি পেতে কিছু সময় রোদ পোহাল। তারপর গায়ে একটু গরম মেখে উঠে এল ঘরের ভিতর। লেপ মুড়িয়ে বিছানায় নাক ডেকে শুয়ে রইল। গ—র-র। গভীর দিবা নিদ্রায় আচ্ছন্ন অভ্যস্ত বুড়ো।

সূর্য ডুবু ডুবু হল। বুড়ো দিবা নিদ্রা ছেড়ে উঠে পিছনের রবিশষ্যের ক্ষেত দেখতে গেল। বড় দুটি মুলা মাটি থেকে তুলে আনল সে। কিছু বেগুন আর মরিচও তুলল। বাড়ির চৌহদ্দীতে কিছু সময় পায়চারি করে সন্ধ্যার অন্ধকারে ঘরে ফিরল। তারপর একটি হারিকেন জ্বালিয়ে ধবধবে সাদা ধুতি ও পাঞ্জাবি গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে পড়ল রাত্রিকালীন ভ্রমণে। এটা তার নিত্যদিনের ভ্রমণের রুটিন। এ বাড়ি ও বাড়ি বেড়িয়ে মাঝরাতে বাড়ি ফিরল বুড়ো।

বউ তার রুচির তরকারি মুখি আর ইলিশ মাছ রেঁধে রাখল। সে বুড়োর জন্য না খেয়ে অপেক্ষায় থাকল। বুড়ো হন হন করে বাড়িতে ঢুকে কোন কথা না বলে খাবার খেয়ে মুখে কিছু ধৰ্মীয় গ্রন্থ থেকে শ্লোক পাঠ করল। তারপর সটান হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল।

বুড়ো বুড়ি গভীর নিদ্রাচ্ছন্ন। সে রাতে একটা সিঁদেল চাের ঘরের পিছনের বাঁশের বেড়া কেটে গর্ত করে ঘরে ঢুকল। পিতলের সমস্ত থালা বাসন একটি চটের থলেয় ভরল। পিতলের বাসনপত্রের ঝনঝনানিতে বুড়োর কান খাড়া হল। সে ভাবল, বুড়ি সম্ভবত থালা বাসন ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে রাখছে। সে জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন বোধ করল না। আবার ঘুমিয়ে পড়ল বুড়ো।

ঘর অন্ধকার ছিল। ঘুমুবার আগে কূপি নিভানো হয়েছিল।

দিয়াশলাই আর কূপিটা ছিল বুড়োর শিয়রে। বুড়ির শব্দ শুনে ঘুম ভাঙল। একবার দিয়াশলাই খুঁজতে যাবার মনস্থ করেও বুড়োর তাচ্ছিল্য স্বাভাবের কথা মনে হতেই কিছুই করল। না। ভাবল বিড়াল ঢুকেছে হয়ত ঘরে। অন্ধকারে কিছুই দেখতে না পেরে বিড়ালকে দূর দূর করে তাড়াবার জন্য সাবধান করে দিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।

চোর এবার বুড়োকে বিছানার একপাশে ঠেলে চৌকির মধ্যখানে রাখা বক্সটার সোনা গহনা ও টাকা পয়সা নিয়ে কেটে পড়ল। বুড়ো ভাবল বুড়ি তার বিছানার পাশে ঘুমোতে এসেছে। সে চুপচাপ শুয়ে রইল।

চোর বাড়ির সবকিছু নিয়ে পালাল।

সকালে উঠে তো তাদের দুর্দশার কথা কে শোনে। পরোক্ষে একে অন্যকে দোষারপ করে কথাবার্তা বলে দিন কাটাল।

পৌষ মাস কনকনে শীত পড়েছে। রাত্ৰিবেলা ফোঙাকায় (ঘরের মধ্যখানের উনুন)। দুদিকে বুড়ো বুড়ি দুজনে বসে আগুনের উত্তাপ গায়ে মেখে শীত নিবারণ করছে। বাঁশের শুকনো গুড়ি, শুকনো পাতা, ইক্ষুর ছোবা (রস বের করা শুকনো ইক্ষু) আগুনে পুড়ে তারা শীত নিবারণ করছে। বুড়োর পিঠ আগুনের দিকে পিছন দিয়ে বসা। বুড়োও অনুরূপভাবে বসে আগুন পোহাচ্ছে। হঠাৎ কাপড়ের পোড়া গন্ধ পেল বুড়ি। সোজা হয়ে আগুনের দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকাল বুড়ি। কিছুই দেখল না। একটু পর বুড়ির নাকে কী যেন পােড়া গন্ধ এল। বুড়ি সতর্ক দৃষ্টি নিয়ে ফিরে তাকল। দেখল বুড়োর গুনজায় (গামছা বা ধূতির কিচকুম্ভী) নিবু নিবু আগুন ধরেছে। বুড়ি কিছুক্ষণ কী যেন চিন্তা করল। একটু গলা খন খন করল কাশি দিল। তাকে বুড়ো কিছুই করল না দেখে বুড়ি বলল, “যে কোন লোকের গুনজায় আগুন লেগেই থাক ৷”

বুড়ো কিছুই বলল না। বুড়ি দেখল। বুড়োর গামছাসুদ্ধ পুড়ে যাবার উপক্রম হল। তবু বুড়ো বুড়ির কথায় কর্ণপাত করল না! বুড়ি আবার বলল, “যার গুন জায়আগুন লেগেই থাকুক। আমার কি।”

এবার পরনের গামছা জ্বলে শরীরে তাপ লেগেছে বুঝে বুড়ো এক লাফে উঠে দাঁড়াল। আগুনে গামছা জ্বলে শরীরের চামড়া পুড়তে শুরু করলে সে চিৎকার করে উঠল–আগুন! আগুন!; সে ছুটোছুটি করতে লাগল।

-চিৎকার কর না, তুমি শুয়ে পড়। আমি এক বালতি পানি আনছি।

–পানি এনে কি হবে? আমি জ্বলে মরে গেলাম-।

-বুড়ি সামনের পুকুর থেকে এক বালতি পানি এনে বুড়োর শরীরে ঢালল।

বুড়ো বলল, আরও পানি ঢাল। বুড়ো-বুড়ির চোঁচামেচির শব্দ শুনে পাশের বাড়ির বসন্ত দৌড়ে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে দেখল গোবর্ধন মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।

বুড়ি বলল, কি দেখছ বসন্ত। দৌড়ে এস, বুড়োকে ধর। বুড়ো গোবর্ধন নির্বাক, উত্তাপের জ্বালায় মুখ দিয়ে হা হু করছে শুধু। পাড়া পড়াশীরা জড়ো হল। তারা তাকে কাঁধে তুলে কবিরাজের বাড়ি নিল। কলাপাতায় বুড়োকে শুতে দেয়া হল। তারপর বৈদ্য কবিরাজ ঔষধ দিল। বৈদ্য বলল, সময় লাগবে সুস্থ হতে। বুড়ো নির্বাক। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে একবার বুড়ির দিকে একবার বসন্তের দিকে চেয়ে রইল।

বুড়ি ও বসন্ত বার বার গোবর্ধনকে ডাকল। গোবর্ধন বলল, হু।

–তুমি কিছু সুস্থবোধ করছ।

–হুঁ

–আর আড়ি আড়ি করবে?

–না, না, আড়ি নয়। আমায় বাড়ি নিয়ে চল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *