পুরুষ যখন যৌনকর্মী – অজয় মজুমদার, নিলয় বসু
পুরুষ যখন যৌনকর্মী – অজয় মজুমদার, নিলয় বসু
PURUSH JAKHAN JOUNAKARMI by Ajay Majumdar, Niloy Basu
.
তৃষা মজুমদার ও নির্ঝর বসু
.
প্রথম প্রকাশ বইমেলা ১৯৯৯
প্রতিকূল আর্থসামাজিক ব্যবস্থার শিকার পুরুষ-যৌনকর্মীদের সুস্থ সামাজিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য যে সব স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং ব্যক্তি নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁদের কার্যক্রম নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন— তাঁদের আন্তরিক চেষ্টার প্রতি সহমর্মিতা জানাই।
.
ভূমিকা
”পুরুষ যখন যৌনকর্মী” আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে একটি দুঃসাহসিক বই। যৌনজগৎ নিয়ে আমাদের আলোআঁধারি মনোভাবের কারণে আমরা এ বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা/গবেষণা থেকে দীর্ঘকাল নিরস্ত থেকেই। আমাদের কেবলই মনে হয়েছে যে সমাজের এই দিকটি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করলে বুঝি বা আমাদের ভারতীয়ত্বের কোন অবমাননা হয়! বিদেশের যৌনবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ এবং রাষ্ট্রের জনস্বাস্থ্য আধিকারিকেরা গত দুই শতক ধরে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা/গবেষণা করছেন। ১৭২৪-১৭৮৮ সালের পুলিশ রেকর্ড তথ্যে পাঁরা দুসালেট পারি শহরের পতিতাবৃত্তির প্রাবল্য দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। ১৭৭০ সালে পারি-র জনসংখ্যা ছিল আনুমানিক ৬০০,০০০ এবং পতিতা-র সংখ্যা ছিল ২০,০০০। ১৮৩৬ সালে পাঁরা-দুসালেট-এর যুগান্তকারী বই ”দ্য লা প্রসটিষ্টিভসিঅ্যাঁ ডাঁ লা ভিল দ্য পারি” প্রকাশিত হয় এবং যৌনকর্ম ও কর্মী সম্পর্কে এটাই বোধহয় প্রথম বিজ্ঞানসম্মত রচনা। ফরাসি বিপ্লবের পরে পারি শহর তথা ফ্রান্সকে পতিতাবৃত্তি মুক্ত করতে এক সরকারি আয়োজনের ব্যবস্থা হয়েছিল। প্রখ্যাত ফরাসি ঔপন্যাসিক এমিল জোলা-র ‘নানা’ বইটি এই প্রেক্ষিতে নিজস্ব অভিজ্ঞতাভিত্তিক এক মহান উপন্যাস। সরকারি প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে সফল হয়নি। উত্তরকালের ইতিহাস এটাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে মানুষের যৌনজীবন সম্বন্ধে কী স্ত্রী যৌনকর্মী, কী পুরুষ যৌনকর্মী, পুরুষ ও মহিলা সমকামী এবং শিশুকামী (পেডেরাস্ট) ইত্যাদি সকল শ্রেণির যৌনজীবন, স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক, আমাদের অবগত করায়। আমরা আরো জানতে পারি যে বিলাসবৈভবের স্রোতে ভাসা পারি শহরে পুরুষ যৌন কর্মীর চাহিদা মহিলা যৌন কর্মীদের চাইতে কিছুমাত্র কম ছিল না। এদের পৃষ্ঠপোষক ছিল অভিজাত সম্প্রদায়ের যৌবনোত্তর প্রৌঢ়া মহিলারা। পরে এরা পেশাদার হয়ে ওঠে। উৎপত্তি হয় ‘গিগোলো’ গোষ্ঠীর। ‘গিগোলো’ শব্দটি ফরাসি ‘গিগোল’ শব্দের পুংলিঙ্গ রূপ। ইতালি নয়, ফ্রান্স-ই শব্দটির জন্মভূমি; ব্যুৎপত্তিগত অর্থে ‘গিগোল’ বলতে নাচঘরের মেয়ে বোঝায়।
পেশা হিসেবে যৌনকর্ম বেছে নেওয়া পুরুষদের পক্ষে খুব স্বাভাবিক না হলেও, সমকামীত্বের সূত্রে যে এই পেশার জন্ম হয়েছে তাতে খুব একটা সন্দেহের অবকাশ নেই। এবং সমকামীত্বের ইতিহাস তো অতি প্রাচীন সোডোম, গোমোর এই দুই শহরের ধ্বংসকাল থেকেই সূচিত। সমকামীত্বের ইতিহাসে এবং ভূগোলে পৃথিবীর কোন কাল বা কোন দেশকেই বাদ দেওয়া যায় না। বাদ দেওয়া যায়না কোন ধর্মাবলম্বীকেও। এখানে সেই ইতিহাস ভূগোলের আলোচনা করবো না। বর্তমানে আলোচ্য বইটি সম্বন্ধে এটুকু জানাই যে লেখকদ্বয় অনেক পরিশ্রম স্বীকার করে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পুরুষ সমকামী এং পুরুষ যৌনকর্মীদের সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ করেছেন বৈজ্ঞানিক নিষ্ঠায় এবং পুরুষদের এই যৌনকর্ম পেশা গ্রহণের পিছনে আর্থ সামাজিক এবং শারীরগত কারণগুলি খুঁজে বের করবার চেষ্টা করেছেন, এ এক অসাধারণ “Odyssey”। সত্তরের দশকে কলকাতার এক দৈনিক সংবাদপত্রে এ ধরণের একটি খবর ছিল যে বছরে ২৫০০০ (১৪-২৫ বছর বয়সী) ছেলে নিখোঁজ হয়ে যায়। এরা কোন দুষ্টচক্রের শিকার হয়ে যৌনকর্মের পেশা বেছে নিতে বাধ্য হয়। তবে ফরাসিদেশে ‘গিগোলো’ বলতে যা বোঝাতো আমাদের দেশে সে ধরণের অবস্থা ও পরিবেশ হয়েছে কিনা বলা শক্ত।
লেখকদ্বয়কে আবার সাধুবাদ জানাচ্ছি তাঁদের এই বইটির জন্য। পড়তে পড়তে মনে হয়েছে বার বার ‘বিপুল মানুষের কতটুকু জানি!’ ওঁরা আরও লিখুন এ বিষয়ে এবং অনেকে উপকৃত হোক।
বেলা দত্তগুপ্ত
.
দেহবৃত্তির ইতিহাসে ‘পুরুষ যৌনকর্মী’ শব্দটি একটু নতুন হলেও সমকালীন সমাজতত্ত্বের এক নৈমিত্তিক অধ্যায়। ‘যৌনকর্মী’ হিসাবে অনেক পরে পুরুষের আবির্ভাব। তাই এই পুরুষরা নারী যৌনকর্মীদের মতো ‘গণিকা’, ‘বারস্ত্রী’ ‘পণ্যাঙ্গনা’, ‘রূপোজীবিনী’, ‘বারবণিতা’, ‘রূপাজীবা’ প্রভৃতি জাতীয় শব্দে চিহ্নিত হয় নি। পুরুষের যৌনকর্মী হিসাবে জীবিকায় আসা নারী-যৌনকর্মীদের মতো নয়। নারীদের পক্ষে কারণটা ছিল আদিতেই আর্থ-সামাজিক। আর আলোচ্য পুরুষরা মূলত রূপান্তরকামী বা সমকামী। পরে অর্থনৈতিক কারণে এই কাজকে পেশা করে ফেলে এবং সঙ্গে সঙ্গে হয়ে পড়ে ‘পুরুষ যৌনকর্মী’। শ্রেণিগতভাবে এই পুরুষ যৌনকর্মীরা দু’টি ভাগে বিভক্ত— (১) সমকামী পুরুষ যৌনকর্মী এবং (২) গিগেলো। ‘গিগেলো’ শব্দটা ফরাসি। এরা সম্পূর্ণই দেহোপজীবী। সমকামী পুরুষ যৌনকর্মীদের কেউ স্বেচ্ছায় এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়। আবার কাউকে বাধ্য করা হয় এই পেশার সঙ্গে যুক্ত হতে। স্বেচ্ছায় যারা দেহব্যবসাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের শ্রেণি আকুয়া।
আমাদের সমীক্ষার মূল বিষয় হল এই শ্রেণির ‘পুরুষ যৌনকর্মী’।



Leave a Reply