৬. ব্যাবসার প্রকৃতি
সমকামীদের মধ্যে অনেকেই আছে যারা ধর্ষকামী (Sadist) ও বালকামী (Paedophile)। এদের বিভিন্ন রকম যৌন চাহিদা মেটাতে বিশ্বব্যাপী যৌন কারবারির দল নতুনভাবে ব্যবসা ফেঁদেছে।
ধর্ষকাম ও বালকামিতাকে বিশেষ ধরণের কামবিকৃতি হিসেবে ধরা হয়। এই বিকৃতি শুধু সমকামীর মধ্যেই নয়, বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আসক্ত পুরুষ বা নারীর মধ্যেও দেখা যায়। তাই সমকামী নরনারীকেই এই দুই বিকৃতির জন্যে অভিযুক্ত করা ঠিক নয়।
ধর্ষকাম : যৌনসঙ্গীকে নানারকম শারীরিক যন্ত্রণা দিয়ে যারা আনন্দ ও যৌন উত্তেজনা লাভ করে তাদের ধর্ষকামী (Sadism/ Active Algolagnia) বলে। ফরাসি লেখক Marquis de Sade-এর নাম অনুসারে ইংরেজিতে ‘sadism’ শব্দটির উদ্ভব হয়েছে। Sade-এর লেখার বিষয় ছিল অপরাধ, হিংসা, প্রেম ও যৌনতা। বিভিন্ন গল্পে তিনি ধর্ষকামের নগ্ন বীভৎস রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি নিজেও একজন ধর্ষকামী। বিকৃত যৌন মানসিকতার জন্যে তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। শুধু Sade-নয়, ধর্ষকামিতাকে কেন্দ্র করে কাব্য রচনার মাধ্যমে বিখ্যাত হয়েছিলেন Baudelaire, Lambard, Casanova, Oscar Wilde।
সঙ্গীকে মারা, কামড়ে দেওয়া, পিন ফোটান, যৌনাঙ্গে ক্ষতের সৃষ্টি করা এবং সর্বোপরি ধারালো অস্ত্র দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে আঘাত করা। এমন কি খুন করাও ধর্ষকামীর কাছে বিচিত্র কিছু নয় (Mukherjee J.B.)।
ধর্ষণের পর খুন করে ধর্ষকামী চরম পরিতৃপ্তি বোধ করে। ধর্ষকামীর এই মানসিকতাকে ‘Necrophagia’ বলে। এছাড়া মৃতদেহের সঙ্গে সঙ্গমের ঘটনাও মনোবিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন। একে ‘Necrophilia’ বলে। ফিলিপাইনসের ওলোন গাপো শহরে রোজারিও নামে এক শিশু যৌনকর্মীকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল ধর্ষকামী এক জার্মান যুবক। শিশুটির যোনির মধ্যে মরচে-ধরা এক ব্যাটারি ঢুকিয়ে দেয়। তীব্র যন্ত্রণা ভোগ করার পর শিশুটি ১১ মে ১৯৮৭ সালে মারা যায়।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইংল্যাণ্ড ও ফ্রান্সে বিভিন্ন ধরণের গণিকালয় গড়ে উঠেছিল। এইসব গণিকালয়ে বিকৃত যৌন কামনা নিবৃত্তির জন্যে আসত নানা ধরণের খদ্দের। এদের একটা বড় অংশই ছিল ধর্ষকামী। গণিকালয়ে এইসব ধর্ষকামী খদ্দেরের মনোরঞ্জনের জন্যে বিশেষ ধরণের কিছু কক্ষ থাকত। এগুলি “Chember of horrors” নামে পরিচিত ছিল। (Roberts)। ধর্ষকামীরা গোপনে অন্যের যৌন অঙ্গ দর্শনে আনন্দ পায়। (Voyeurism)। অনেকে আবার নিজের বিবাহিত স্ত্রীকে জোর করে অন্যের সঙ্গে সহবাসে লিপ্ত হতে বাধ্য করায় এবং ওই দৃশ্য দেখে যৌন উত্তেজনা অনুভব করে। একে ‘Triolism’ বলে। বিকৃত যৌন ক্রিয়ার ছবি সম্বলিত পুস্তক এরা সংগ্রহ করে ও দেখতে ভালবাসে। মনঃসমীক্ষকদের অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, পুরুষের মধ্যে ধর্ষকামের প্রকাশ বেশি। অবশ্য অনেক পুরুষ আছে যারা আবার যৌনসঙ্গীর দ্বারা নিপীড়িত হতে চায়। এরা মর্ষকামী (Masochist)। অস্ট্রিয়ার ঔপন্যাসিক Leopoldvon Masochi-এর নাম অনুসারে এই মানসিকতাকে ইংরেজিতে Masochism বলে। স্ত্রী কর্তৃক অত্যাচারিত হওয়ার মধ্যে দিয়ে বিশিষ্ট এই লেখক তীব্র যৌন উন্মাদনা উপভোগ করতেন, যা তাকে সৃষ্টিশীল গল্প, উপন্যাস লেখায় সাহায্য করতো। মর্ষকামিতা সাধারণত মহিলাদের মধ্যেই লক্ষ্য করা যায়। অবশ্য দীর্ঘদিন ধরে ধর্ষকামে অভ্যস্ত কোন পুরুষ রণেভঙ্গ দিয়ে মর্ষকামিতায় আচ্ছন্ন হতে পারে। এক্ষেত্রে সঙ্গী দ্বারা সে নিগৃহীত হতে চায়। সঙ্গীর ঘৃণ্য, রুচিবিরুদ্ধ আচরণে তার যৌন উত্তেজনা জাগে। সঙ্গীর মূত্র ও মলত্যাগের প্রতি আকর্ষণ জন্মায় এবং তা দর্শনে চরম মানসিক পরিতৃপ্তি লাভ করে। এই মানসিকতাকে ‘Urolagmia’ এবং ‘Koprolaglia’ বলে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য অষ্ট্রেলিয়ার নারী যৌনকর্মীদের কাছে ওই দেশের খদ্দেররা কম যায়। দীর্ঘদিন বিভিন্ন রকম যৌনসঙ্গীর সঙ্গে যৌন ক্রিয়ায় রত হওয়ায় তারা চায় তাদের যৌনসঙ্গী সক্রিয় হয়ে তাদের যৌন আনন্দ দিক। তাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যৌন পর্যটনের হাত ধরে গড়ে উঠেছে ম্যাসেজ পার্লারের তকমাধারী নতুন গণিকালয়। এখানে নিষ্ক্রিয় খদ্দেরকে মৃদুমন্দ যৌনপীড়নের মধ্যে দিয়ে যৌন উত্তেজনা জাগানো হয়।
বালকামিতা : বহু বয়স্ক নরনারীকে শিশু ও কিশোর-কিশোরীর সঙ্গে যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হতে দেখা যায়। সমবয়সির সঙ্গে যৌন সংসর্গে এরা তৃপ্ত হয় না। এই জাতীয় মানসিকতাকে বালকামিতা (Paedophilia/ Infantilism) বলে। শিশুর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন আইনত দণ্ডনীয় এবং নীতিগতভাবে কখনোই সমর্থন করা যায় না। ধর্ষকামীদের মধ্যে বালকামিতার প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। বর্তমানে কালব্যাধি AIDS-এর হাত থেকে বাঁচবার জন্যে যৌনব্যবসায় খদ্দেরের কাছে শিশুর চাহিদা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। মনে করা হয়, শিশুরা যৌনরোগ মুক্ত। তাই সারা বিশ্ব জুড়ে জাঁকিয়ে বসা যৌন পর্যটন ব্যবসায় শিশুর (ছেলে ও মেয়ে) চাহিদা বেশি। পশ্চিমি দুনিয়ার বালকামীদের অত্যন্ত প্রিয় পত্রিকা স্পার্টাকাস-এ (Spartacus) শিশুদের নিয়ে যৌনব্যবসার বিস্তারিত খবর প্রকাশিত হচ্ছে। এই সংবাদ পড়েই বালকামীরা কখনও ছুটছে শ্রীলঙ্কা, কখনো ছুটছে ফিলিপাইনস আবার কখনো আসছে আমাদের দেশের গোয়াতে। আমাদের দেশে বৃদ্ধের দ্বারা শিশু যৌন-নিগ্রহ বা ধর্ষণের ঘটনা আকছার ঘটে। এর কিছু কিছু সংবাদপত্রেও স্থান করে নিচ্ছে। এমন একটি ঘটনা হল উঃ ২৪ পরগনার নোয়াপাড়ার ৬২ বছর বয়স্ক বৃদ্ধের দশ বছর বয়সি একটি মেয়ের ওপর শারীরিক যৌন নির্যাতন (আঃ বাঃ ১১.৩.৯৮)।
বালকামিতার সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী মানসিকতা হল— Gerontophilia। এর অর্থ বয়স্ক/ বয়স্কা স্ত্রী-পুরুষের প্রতি যৌন আকর্ষণ।
আগেই বলা হয়েছে ধর্ষকাম ও বালকামিতার জন্যে কোন অবস্থাতেই সমকামীকে অভিযুক্ত করা ঠিক নয়। নর-নারী নিখাদ প্রেম-ভালবাসার মতোই সমকামের দুই সঙ্গীর মধ্যে গভীর ভালবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একে অন্যকে পীড়নের মধ্য দিয়ে এরা আনন্দ পায় না। উন্নত পরিশীলিত সূক্ষ্ম যৌন অনুভূতির অংশীদার এরা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এই সমকামী মানুষেরাই ধর্ষকামী বালকামী হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন। রুচিশীল সমকামী মানুষেরা বালকামিতা ও ধর্ষকামকে পছন্দ তো করেন না বরং এগুলিকে যৌন বিকৃতি হিসেবে চিহ্নিত করতে চান। মুম্বই-এর সমকামী সংগঠন ‘Bombay Dost’-এর কর্ণধার অশোক রাও কবি জানান, তাঁর সংগঠনের কেউই বালকামিতাকে সামাজিক রুচিশীল কাজ হিসেবে মনে করেন না। এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি জানান— “In Mumbai we share Parks with families and children. Yet nobody has made a charge that we are Paedophiles or anti-social nuisances.”
ধর্ষকাম ও বালকামিতা যতটা না মনস্তাত্ত্বিক তার চেয়ে অনেক বেশি হরমোন (Endocrinological Problem) ও এনজাইমের ত্রুটিজনিত সমস্যা। সুতরাং জিন প্রযুক্তিবাদ, এন্ডোক্রিনোলজিস্ট ও মনস্তত্ত্ববিদদের সম্মিলিত গবেষণা এদের এই কু-অভ্যাসকে বর্জন করতে সাহায্য করবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার শিশুনিগ্রহ সম্পর্কিত আইন প্রচলিত হতে চলেছে। আইনের খসড়াতে বলা হয়েছে কোন ব্যক্তি যদি দুবার কোন শিশুর সঙ্গে বলপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে তাহলে হয় তাকে খোজা করা হবে অথবা ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে পুরুষত্বহীন করা হবে। Ugohu pharmaceutical Company-র তৈরি Deep-Provera ওষুধ চিকিৎসক কর্তৃক স্থিরীকৃত কোর্সের মাধ্যমে অপরাধীর ওপর প্রয়োগ করা হবে। এর ফলে টেস্টোস্টেরন হরমোনের (Testostorone Hormone) মাত্রা কমতে থাকবে। এবং এক সময় অপরাধী পুরুষত্বহীন হয়ে পড়বে। সুইডেন ও জার্মানিতে এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে। তাই এই দুই দেশে বালকামীদের শিরে সংক্রান্তি। তারা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছুটে আসছে। এই জাতীয় আইন প্রণয়নের প্রয়োজন উল্লিখিত অঞ্চলের বিভিন্ন দেশেও, যাতে বালকামিতা রোধ করা যায়।
ধর্ষকাম ও বালকামিতা সম্পর্কিত সামগ্রিক সমস্যা সম্পর্কে আলোচনা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা এখানে সমকামী মানুষের বালকামিতা ও ধর্ষকাম বিষয়ে কিছু দৃষ্টান্তের কথা উল্লেখ করবো।
ফ্রেডি অ্যালবার্ট পিট :
১৯৭৪ সালে এক প্রৌঢ় গোয়ায় আসেন। নাম ফ্রেটি আলবার্ট পিট। রাজধানী পানাজী থেকে ৫৩ কিলোমিটার দূরে মাদগাঁও-এর বন্দর শহরে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। মাদগাঁও-এর নিসর্গ প্রকৃতির টানে বহু দেশি-বিদেশি পর্যটক এখানে আসে। শহর থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে কোলবা বীচের সমুদ্র সৈকতে তাঁর আশ্রম। দরিদ্র মানুষের সেবায় তিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। অন্তত প্রথম কয়েকটি বছর সাধারণ মানুষের মনে এমন ধারণাই প্রকট হয়ে উঠেছিল। হতদরিদ্র অনাথ শিশুদের প্রতি তার ছিল গভীর মমত্ববোধ। আর্তের সেবায় ব্রতী হয়ে স্থানীয় লায়নস ক্লাবের সক্রিয় সদস্যও হয়েছিলেন। এবং এক সময়ে ঐ সংগঠনের সম্পাদক হিসাবেও কাজ করেছিলেন। স্থানীয় বিভিন্ন চার্চের ফাদারদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ফলে সাধারণ মানুষও তাঁকে ফাদার হিসেবেই চিনতে থাকে।
ফ্রেডির ছিল অসাধারণ ছেলে ভোলানোর ক্ষমতা। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি স্থানীয় বিভিন্ন শিশুদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়জন হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠতে লাগলেন। মজার গল্প বলে ও বিভিন্ন সময়ে শিশুদের নিয়ে পিকনিক করে তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা আদায় করে নিয়েছিলেন। শিশুদের অনেকেরই থাকে স্ট্যাম্প ও বিদেশিমুদ্রা জমাবার স্বভাব। দুষ্প্রাপ্য স্ট্যাম্প ও কয়েন দিয়ে ফ্রেডি তাদের আপন করে নিয়েছিলেন। ফ্রেডি স্বপ্ন দেখাতেন। ফ্রেডির চোখ দিয়ে শিশুরা পাশ্চাত্যের বিলাস-বৈভবের ছবি দেখতো। শিশু আর শিশু থাকে না। এক সময়ে সে কিশোর হয়। যৌন অনুভূতি, আকাঙ্ক্ষা মাঝে মধ্যেই তার মনের আনাচেকানাচে উঁকি মারে। যৌনতার স্পর্শে সে শিহরিত হয়। কিশোরকে হাত ধরে ফ্রেডি এক সময়ে নিয়ে আসেন যৌনতার উন্মুক্ত আঙিনায়। সুকৌশলে এবং ধীরে ধীরে সে এইসব কিশোরদের নানা ধরণের ব্লু-ফ্লিম দেখাতে শুরু করে।
নিরন্তর সত্যের অপলাপ করে ফ্রেডি এইসব শিশু ও কিশোরদের নিয়ে এক অমানবিক, নারকীয় ব্যবসায় মেতে ওঠে। বিদেশি হলেও উঁচু মহলের সঙ্গে তার ছিল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। তাই কয়েক বছরের মধ্যেই ভারতীয় পাসপোর্ট বের করতে তার অসুবিধা হয়নি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শিশু ও কিশোরদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ করার ক্ষেত্রে ফ্রেডিকে সাহায্য করেচিলেন গোয়ার এক গির্জার ফাদার। নাম ‘রিগো’। দরিদ্র পথ শিশুদের নিয়ে রিগো একটি স্কুল চালাতেন। এই স্কুলের পঠন পাঠনে সাহায্য করতো ফ্রেডি। পরবর্তীকালে কোলবা সী বীচে তার আশ্রমের এক অংশে গড়ে ওঠে অনাথ শিশু ভবন। এখানে বিভিন্ন বয়েসি শিশু ও কিশোর রাখা হত। তারা যাতে পালিয়ে যেতে না পারে তার জন্যে নজরদারির ব্যবস্থাও ছিল বেশ কঠোর।
সুপরিকল্পিত র্যাকেটের মাধ্যমে ফ্রেডি তার ব্যবসা চালাত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, সুইডেন, ইংল্যাণ্ড, প্রভৃতি দেশের সমকামী, বালকামী ও ধর্ষকামীর কাছে ‘ফ্রেডি’ নামটি ছিল অত্যন্ত সুপরিচিত। অল্পবয়েসি বালকদের সম্ভোগের আশায় বিদেশিরা আসত ফ্রেডির কাছে।
১৯৮৩ সালের ডিসেম্বরে আমরা প্রথম যাই গোয়ায়। ‘যৌন পর্যটন’ বিষয়টির সঙ্গে তখন পরিচয় না থাকলেও পর্যটন শিল্পের গায়ে যে যৌনতার ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে তা গোয়াতে গিয়েই বুঝেছিলাম। বড় শহরের যানজট থেকে গোয়ার রাজধানী পানাজি অনেকটাই মুক্ত। পানাজিতে মাঝারি হোটেলের দু’শয্যাবিশিষ্ট ঘর ভাড়া নিয়েছিলাম। এখানে চারদিন অবস্থান কালে ভাড়া করা মোটর সাইকেলে চেপে সী বীচ ও রিজর্টগুলো ঘুরে দেখি। মনোরম সমুদ্র সৈকতে যৌনতার যে ঢালাও ব্যবস্থা সুপরিকল্পিত ভাবে গড়ে উঠেছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। এখানে বিদেশিদের দাপট চোখে পড়ার মতো। আরব সাগরের সুদৃশ্য বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে মনে হতে পারে এ যেন কোন ভিন দেশ। নগ্ন, অর্ধনগ্ন বিদেশি-বিদেশিনীর স্বাচ্ছন্দ্য ঘোরাফেরা সমুদ্রতরে। আলস্যে শরীর এলিয়ে দিয়েছে কেউ-কেউ। ‘ভাগাটোর সী বীচে’ আলাপ হয়েছিল পিটারের সঙ্গে। বয়স আনুমানিক ৩০-৩৫। মার্কিন নাগরিক। নানান কথার মাঝে জানায় এবার নিয়ে ওর তিনবার হচ্ছে গোয়ায় আসা। শান্ত পরিবেশের টানেই ও আসে গোয়ায়। পিটার জানায় ও বিপত্নীক। আর যৌনতার ব্যাপারে ওর নাকি আদৌ কোন আগ্রহ নেই। বিষয়টা কতদূর সত্যি জানি না। শুধু ভাগাটোর নয়, কালাংগুট, মিরামার, আঞ্জনা সী বীচেও পিটারের মতো আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে স্বাভাবিক যৌনতার প্রতি এদের তেমন কোন আকর্ষণ নেই। ছোট ছোট চায়ের দোকানের মালিক থেকে শুরু করে হোটেলের মালিক, ম্যানেজার অনেকের সঙ্গেই পর্যটন, যৌনতা প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে দেখেছি বিদেশিদের আগমন যে পযর্টন ব্যবসাকে ত্বরান্বিত করেছে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। অনেকে তো বলেই ফেললেন দেশীয় পর্যটকেরা শুধুমাত্র তো এখানে সমুদ্র দেখতে আসেন না, নগ্নতাকে চাক্ষুষ করতেও আসেন। কিন্তু খুবই আশ্চর্যের বিষয়, কারুর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ফ্রেডির নাম শুনতে পাইনি। কিন্তু এই কুখ্যাত মানুষটি আশির দশকে লোকচক্ষুর আড়ালে জ্যান্ত শিশুদের নিয়ে যৌন ব্যবসা রমরমিয়ে চালিয়ে যাচ্ছিল।
দূরদর্শী ফ্রেডি বুঝে উঠতে পারেননি যে তার এই ব্যবসায়ে এক সময় ফাটল ধরবে। আগেই বলা হয়েছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নানা কর্তাব্যক্তির সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ১৯৯১-এর মার্চে গোয়ার এক মেরিন ইঞ্জিনিয়ার এস.আর.বরদারাজ ফ্রেডি অ্যালবার্ট পিটের বিরুদ্ধে গোয়া পুলিশের কাছে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আনেন। অভিযোগে তিনি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, তার দশ বছরের শিশুপুত্রের ওপর ফ্রেডি বিকৃত যৌননিগ্রহ চালায়। একই সময়ে যথাক্রমে ৬ ও ৯ বছরের দুটি ছেলের অভিভাবকের পক্ষ থেকেও ফ্রেডির বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে একই অভিযোগ আনা হয়। ফ্রেডিকে গ্রেপ্তার করার ব্যাপারে গোয়ার বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলি সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং প্রশাসনের ওপর নানা ভাবে চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। এর ফলে পুলিশ পিটকে ধরতে বাধ্য হয়। ফ্রেডির বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭, ২৯২ ও ২৯৩ ধারা প্রয়োগ করা হয়। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় উঁচুমহলের কারসাজির ফলে সেশান কোর্টে সাজার মাত্রা লঘু করা হয়। ১৫-৫-৯১-এ জামিনে ফ্রেডিকে মুক্ত করা হয়। অনেকেই অনুমান করেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী রবি নায়কের সঙ্গে ফ্রেডির সম্পর্ক ছিল খুবই ঘনিষ্ঠ। প্রায় সাত মাস পর ১৯৯১-এর ১৫ ডিসেম্বর বিশিষ্ট সমাজসেবী ও আইনজীবী শ্রীমতী শীলা বারশে মুম্বই থেকে গোয়ায় যান। ফ্রেডির যৌনব্যবসা সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের জন্যে। বিভিন্ন মানুষের সাক্ষাৎকার ও যৌন নিপীড়িত শিশুদের খুঁজে বের করে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট প্রস্তুত করেন। অন্তত ২০টি ধারায় ফ্রেডিকে শাস্তি দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। এরপর মুম্বই হাইকোর্টের গোয়া বেঞ্চ সি.বি. আইকে ঘটনার আনুপূর্বিক তথ্য সংগ্রহের জন্য নির্দেশ দেন। প্রয়োজনে ইণ্টারপোলের সাহায্য নেওয়ার কথাও বলা হয়। সি.বি.আই.-এর রিপোর্টে ফ্রেডি অপরাধী হিসাবে চিহ্নিত হয় এবং তার ভণ্ডামির মুখোশ সর্বসমক্ষে উন্মোচিত হয়। ইণ্টারপোলের অনুসন্ধান থেকে জানা যায় ফ্রেডির সঙ্গে আন্তর্জাতিক শিশু পর্নোগ্রাফি ছবি ও ভি.ডি.ও ব্যবসার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ আছে। তার মাধ্যমে জার্মানি ও ফ্রান্সে ‘শিশু যৌন ছবি’ পাঠান হত।
১৯৯৬ সালে সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত ‘World Congress Against Commercial Sexual Exploitation of Children’ নামক প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থিত গোয়ার একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘Goa watch’-এর প্রতিনিধিরা গোয়ায় শিশু নিপীড়ন ও শিশু পর্নোগ্রাফি নির্মাণের যে ব্যবসা চলেছে সে সম্পর্কে বিশেষ আলোচনা করেন। দেশের বাইরে ও ভিতরে এ সম্পর্কে জনমত গঠনের জন্যে ১,১০,০০০ গোয়াবাসীর স্বাক্ষর সম্বলিত অভিযোগপত্ত সম্মেলনে পেশ করা হয়। ফ্রেডি পিটারের গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনা গোয়ার যৌন পর্যটনের ওপর আঘাত হানে। ‘Week’ পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে Insaf (Indian National Social Action Forum)-এর সম্পাদক Reggie Gnomes জানান, প্রধানত বালকামীরাই গোয়ায় আসে এবং প্রচুর পয়সা ঢেলে তারা সাধারণ মানুষের মুখবন্ধ করতে সক্ষম হয়। দেশের দারিদ্র্যের সুযোগ পুরো মাত্রায় কাজে লাগিয়েছে বিদেশি সমকামীরা। ওই একই পত্রিকায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গোয়ার পুলিশের আই.জি. P.R.S Brar জানান, ফ্রেডির যৌন কেলেঙ্কারী একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনামাত্র। এর থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় না যে, গোয়া বালকামীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। ‘যৌন পর্যটন’ বিষয়ে পুলিশের চরম উদাসীনতা মনে হয় Brar-এর বক্তব্যের মধ্যেই নিহিত হয়েছে। শুধু ফ্রেডি নন— অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যাণ্ড ও সুইডেনের তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বালকামিতার অভিযোগ ওই একই সময়ে আনা হয়েছিল। ফলে এই কথা অনস্বীকার্য যে, গোপন সুচতুর র্যাকেটের মাধ্যমে বিদেশিরা গোয়ায় শিশু ও কিশোরদের যৌনব্যবসায় নামতে বাধ্য করাচ্ছে। তাদের মধ্যে অন্যতম অষ্ট্রেলিয়ার ওয়ারনার উলফ ইনগো (Werher Walf Ingo) , নিউজিল্যাণ্ডের ই.সি. ম্যাকব্রাইড (E.C. Macbride), এবং সুইডেনের নিলস অসকার জনসন (Wills Oscar Jonson)।
ফ্রেডির আশ্রম থেকে উদ্ধার করা হয় অসংখ্য নগ্নচিত্র। এগুলি চড়াদামেই বালকামীদের কাছে বিক্রি করা হত। এছাড়াও নানা ধরণের মাদকদ্রব্য ও ওষুধ উদ্ধার করা হয়।
১৯৯৭-এর অক্টোবরে আবার আমরা গোয়ায় যাই। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে কথা বলি। এরা সকলেই মনে করে এখনো ফ্রেডির মতো আরও অনেক ভদ্রবেশী শয়তান এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। খুবই দুঃখের বিষয়, মাদগাঁও-এর বায়না (Baina) সী বীচ-এর লালবাতি অঞ্চল থেকে যৌনকর্মীদের উচ্ছেদ করার জন্যে যে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে তার ন্যূনতম প্রসার পরিলক্ষিত হয় না এইসব শয়তান বিদেশিদের গ্রেপ্তার করার জন্যে।
বীচ বয় :
শ্রীলঙ্কার যৌন পর্যটন ব্যবসায় ‘বীচবয়’ অতি পরিচিত শব্দ। ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সের ছেলেদের বীচবয় করে তোলা হয়। এরা সমকামী মানসিকতাসম্পন্ন বালকামীদের কাছে দেহদান করে।
অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ভাবে বীচবয়দের ব্যাবসা পরিচালিত হয়। অপরাধ জগতের নানান র্যাকেট এদের সঙ্গে যুক্ত। প্রধানত পথ শিশুদেরই নানাভাবে সংগ্রহ করা হয়। স্কুল থেকে পালিয়ে যাওয়া বা বকাটে ভবঘুরে ছেলেরাও আছে এই দলেই। ভোগ্যপণ্যের নানারকম লোভ দেখিয়েই এদের সঙ্গে মধুর সম্পর্ক গড়ে তোলে আড়কাঠির দল। ১৯৯০ সালে থাইল্যাণ্ডের চিয়াং মাইতে (Chiang Mai) অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক আলোচনা সভায় শ্রীলঙ্কার দুই বিশিষ্ট প্রতিনিধি Maureen Seneviratne এবং Shirley J.S. Peiris বীচবয়দের ওপর কিছু মূল্যবান তথ্য পরিবেশন করেছিলেন। সেই তথ্য থেকেই জানা যায়, শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থাই বীচবয়দের জন্ম দিচ্ছে।
শ্রীলঙ্কার প্রতিটি পরিবারে শিশুরা অত্যন্ত যত্নে লালিত পালিত হত। কন্যা শিশু এখানে অবাঞ্ছিত নয়। মান মর্যাদা ও সম্মানের দিক থেকে স্ত্রী ও পুরুষের মধ্যে কোন সীমারেখা টানা হয় না। বরং কিছুটা উল্টে বলা ভাল, কিছু কিছু পরিবারে কন্যাশিশুর মর্যাদা পুরুষশিশু অপেক্ষা বেশি। নারীর সম্ভ্রম রক্ষায় পরিবারের সকলেই বিশেষ সচেতন। তাই বাড়ির বাহিরে পরিশ্রম সাপেক্ষ সব কাজই পুরুষকেই করতে হয়। শ্রীলঙ্কার প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে যে, যখন সেখানে দাসপ্রথা প্রচলিত ছিল অর্থের প্রয়োজনে পিতা-মাতা তাদের সন্তানকে দাস মালিকদের কাছে বিক্রি করতো। পরে কখনো অর্থ সংগ্রহ করতে পারলে তারাই আবার মালিকের কাছ থেকে তাদের সন্তান ফিরিয়ে আনতো। দাস ব্যবস্থায় এই অভিনব বৈশিষ্ট্য পৃথিবীর অন্য কোন দেশে দেখা যায় না। সাধারণত পরিবারের ভিতরে গৃহভৃত্যের কাজে নিযুক্ত কিছু শিশুর কথা বাদ দিলে গোটা শ্রীলঙ্কার শিশুনিগ্রহের দৃষ্টান্ত খুবই কম। এহেন শ্রীলঙ্কায় বিচিত্র কৌশলে নিরাপরাধ একদল শিশুকে যৌনব্যবসার কাজে লাগানো হয়েছে। এরাই ‘বীচবয়’ নামে পরিচিত।
অধিকাংশ বীচবয় আসে হতদরিদ্র পরিবার থেকে। এদের সংখ্যা প্রায় ৮৫%। মধ্যবিত্তের সংখ্যা ১০%। এবং সম্পন্ন পরিবার থেকে আসে ৫% শিশু। কর্মসংস্থানের আশায় বহু দরিদ্র পরিবারের মানুষ শহরে এসে বাসা বাঁধছে। তাদের সন্তানরা উপার্জনের আশায় যৌনব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। বর্তমান শ্রীলঙ্কায় যৌনব্যবসা আইনত স্বীকৃত নয়। তবুও এখানে ১৫,০০০ যৌন কর্মীর সন্ধান পাওয়া গেছে। এবং ‘বীচবয়’ বা শিশু-পুরুষ যৌনকর্মীর সংখ্যা ৩০,০০০। সুপরিকল্পিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এদের ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। বিভিন্ন সমুদ্র সৈকতে বিশেষ করে হিক্কাদুয়া ও ডিকওয়েলা অঞ্চলেই এদের বেশি দেখতে পাওয়া যায়। তবে একই বীচবয়কে এক জায়গায় বেশি দিন রাখা হয় না। কারণ খদ্দের সবসময় নতুন বীচবয়ের সন্ধান করে। ফলে ১ থেকে ২ বছরের বেশি এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকা সম্ভব হয় না। আমদানি হয় নতুন শিশুর। পুরনোরা হারিয়ে যায়। এভাবেই বীচ বয়দের কাজে লাগিয়ে ফুলে ফেঁপে উঠছে শ্রীলঙ্কার মাফিয়াচক্র। বীচবয়দের খদ্দের সবই বিদেশি। ফ্রান্স, জার্মানি, ইংল্যাণ্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সুইডেন প্রভৃতি দেশের বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সি শ্রীলঙ্কায় লোভনীয় প্যাকেজ টুরের ব্যবস্থা করেছে। বলা বাহুল্য এসব টুরের বড় আকর্ষণ হল বীচবয়। বিদেশি ‘স্পার্টাকাস পত্রিকায় শ্রীলঙ্কার বীচবয়দের কথা ফলাও করে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বিদেশি পর্যটকদের ভিড়ে শ্রীলঙ্কার পর্যটন শিল্পে নতুন জোয়ার এসেছে। কৃষিনির্ভর শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে যৌন পর্যটন নতুন আশার সঞ্চার ঘটালেও, সামগ্রিক সমাজ জীবন যে দ্রুত প্রসার শ্রীলঙ্কার ছাত্র সমাজের মনে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। বিদেশি পর্যটকদের হাত ধরে এসেছে ডলার ও পাউন্ড। ভোগ্যপণ্য মূল্যবান হলেও সহজলভ্য। ছাত্র সমাজের স্বাভাবিক আকর্ষণই থাকে এসবের দিকে। সম্পন্ন মধ্যবিত্ত ঘরের অনেক শিশু স্বেচ্ছায় বিদেশির সঙ্গে ভাব জমায় এবং নিজের অজান্তে ধীরে ধীরে বীচবয়ে পরিণত হয়।
বীচবয়ের ব্যবসা দুইভাবে পরিচালিত হয়। প্রথমত র্যাকেটের মাধ্যমে মস্তান পরিচালিত। দ্বিতীয়ত ব্যক্তিগত উদ্যোগে। শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন সমুদ্র সৈকতে বিশেষত যেখানে বিদেশিদের আনাগোনা বেশি ও রিজর্ট আছে, সেখানে এইসব বীচবয়রা ঘুরে বেড়ায়। খদ্দেরের আশায়। সমুদ্র সৈকতেই বিদেশিদের সঙ্গে এদের পরিচয় হয়। তারপর বিদেশি খদ্দেরদের সঙ্গে এসে ওঠে হোটেলে বা রিজর্টে। শীতের মরসুমে যখন পর্যটক আগমন বেশি হয় তখন একজন বীচবয় মাসে ৮০ থেকে ২৪০ ডলার উপার্জন করে থাকে।
শ্রীলঙ্কায় সমাজ বিজ্ঞানীরা বীচবয়দের পরিবারের ওপর সমীক্ষা চালিয়ে লক্ষ্য করেছেন অধিকাংশ পিতামাতা এদের কার্যকলাপ সম্পর্কে খোঁজ রাখেন না। তবে কিছু মা-বাবা এই অবস্থার কথা জানলেও প্রকাশ্যে তা স্বীকার করতে নারাজ। দারিদ্র্যক্লিষ্ট পরিবারে ছেলের এই ব্যবসা থেকে উপার্জন তাদের সংসারে আর্থিক সমস্যা মেটাতে খানিকটা সাহায্য করে। তাছাড়া অনেক অভিভাবকের কাছে ছেলের এই উপার্জন বাড়তি আয় হিসেবে ধরা হয়। এ দিয়ে টি ভি, টু-ইন-ওয়ান প্রভৃতি ইলেকট্রনিক দ্রব্য কেনা হয়। সত্তর দশকের শেষে মুক্ত অর্থনীতির হাত ধরে শ্রীলঙ্কার মানুষের মূল্যবোধের পরিবর্তন শুরু হয়। সমাজে ভাঙন ধরে। বাজার অর্থনীতির জোয়ারে খুব দ্রুত সমাজের নৈতিকতা ভেঙে পড়ে। ভোগ্যপণ্যের প্রতি মানুষের লালসা বেড়ে যায়। তাই নৈতিকতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে শ্রীলঙ্কার অভাবী সংসারের অভিভাবকেরা ছেলেদের কুপথে উপার্জনকে প্রশ্রয় দিতে থাকেন। সমীক্ষা থেকে জানা যায়, বহু বীচবয় পরিবার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। ফলে তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেন তারা এই ব্যবসায় এল তার সুলুক সন্ধান করাও অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার। কাজের সন্ধানে কিছু কিছু বীচবয়ের মায়েরা দেশে থাকে না। মধ্য প্রাচ্য ও অন্য দেশে থাকতে হয়। ফলে মাতৃস্নেহ বঞ্চিত হয়ে এইসব শিশুরা বড় হয়ে ওঠে। এবং সহজেই কুপথে চলে আসে। বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে সমাজবিজ্ঞানীরা দেখেছেন, স্কুল পালানো শিশুর সংখ্যা কম নয়। এবং অনুসন্ধান করে জানা গেছে, এইসব স্কুল পালানো ছেলেরা বিভিন্ন র্যাকেটের খপ্পরে পড়ে বীচবয় হতে বাধ্য হয়েছে।
সব বিদেশি খদ্দেরের মানসিকতা একরকম নয়। কেউ কেউ বীচবয়দের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করে। তাদের নামে শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন অঞ্চলে জমি জায়গা কিনে দেয়। এর ফলে বীচবয়ের পরিবারে অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যে যেমন দেখা যায়, তেমনি বিদেশি পর্যটক বীচবয়দের পরিবারের নিকটজন হয়ে ওঠে ও বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে সক্ষম হয়।
শ্রীলঙ্কার যৌন পর্যটন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। ১৯৮০ সালের পূর্বে বীচবয়দের ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে সরকারের কোন ধারণা ছিল না। কিন্তু ওই বছর কলম্ব শহরের বিভিন্ন যৌনব্যাধির চিকিৎসা কেন্দ্রে অল্পবয়েসি বালকদের চিকিৎসার জন্যে আসতে দেখা যায়। তখনই এ বিষয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে সরকারি কর্তৃপক্ষ সচেতন হয়ে ওঠে। শিশু কল্যাণ দপ্তর, স্বাস্থ্য দপ্তর, পর্যটন বিভাগ, মহিলা উন্নয়ন পরিষদ, শিক্ষা বিভাগ ও যৌন ব্যাধি নিয়ন্ত্রণকারি সরকারি সংস্থা এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবার কথা ভাবতে থাকে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, UNICEF শ্রীলঙ্কার এ অবস্থা সম্পর্কে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের জন্যে এই সংস্থা কিছু স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ করে। এবং এরাই ছোট ছোট কমিটি গঠন করে এই ব্যাপারে গবেষণা চালাতে থাকে।
১৯৮৪ সালে ‘Redd Barna’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা শ্রীলঙ্কার পথশিশুদের ওপর একটি সমীক্ষা চালায়। এই সমীক্ষা থেকে জানা যায়, শ্রীলঙ্কার ছোটখাটো ব্যবসাদার ও গণিকালয়ের মালিকরা পুরুষ শিশুদের নিজেদের কাছে রাখে এবং এদের সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করে নিজেদের বিকৃত যৌন ক্ষুধা মেটায়। সমীক্ষা থেকে আরও জানা যায় শ্রীলঙ্কার নাগরিক ছাড়া বিদেশিদের কাছেও এরা দেহদান করে থাকে। তবে এক্ষেত্রে এ সম্পর্ক ব্যবসায়িক।
১৯৮০ সালে উদ্ভূত বীচবয়দের সমস্যা সমাধান ও প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যে শ্রীলঙ্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়ক মন্ত্রকের (Plan Implementation Ministry) তত্ত্বাবধানে একটি রিভিউ কমিটির সভা ডাকা হয়। এই আলোচনা সভায় পর্যটন দপ্তর, সমাজসেবী ও শিশু কল্যাণ বিভাগের সদস্যবৃন্দ ও পুলিশ কর্তৃপক্ষ উপস্থিত ছিলেন। এরপর ১৯৮৩ সালের গোড়ায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বীচবয়দের পুনর্বাসন ও সমস্যা দু)রীকরণের জন্যে আইন প্রণয়নের কথা উল্লেখ করে ক্যাবিনেটের কাছে একটি আবেদন জানান। আবেদনে ক্যাবিনেট মন্ত্রীরা সাড়া দেন। কিন্তু ১৯৮৩ জুলাই-এ শ্রীলঙ্কার জাতি দাঙ্গা তীব্র আকার ধারণ করে। রাষ্ট্রীয় প্রশাসন দাঙ্গা সামাল দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে ‘বীচবয়’ সমস্যা সম্পর্কিত আইন প্রণয়ন বিষয়টি স্থগিত থাকল। যদিও ‘রিভিউ কমিটি’ দেশের রাজনৈতিক অবস্থায় উন্নতি ঘটলে সরকারকে বীচবয়দের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করায় অনুরোধ জানায়।
বীচবয়দের ব্যাপারে বিশদ তথ্য সংগ্রহ করা এবং তাদের সুষ্ঠু পুনর্বাসনের জন্য এগিয়ে এসেছে একটি বিদেশি সংস্থা—‘Terres des Hommes’। এদের অনুসন্ধানের রিপোর্ট থেকে বীচবয়দের অবর্ণনীয় অবস্থার কথা উন্মোচিত হচ্ছে। শিশু বয়েসে বিকৃত যৌনক্ষুধার শিকার হওয়ার কারণে অধিকাংশ শিশুর মধ্যেই মানসিক স্থবিরতা (Psychological trauma) দেখা দিচ্ছে। যথোপযুক্ত পুনর্বাসনের অভাবে এইসব বীচবয়েরা পূর্ণ বয়েসে অপরাধ জগতের মানুষ হিসাবে পরিচিত হয়ে উঠছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংগঠিত অসামাজিক ক্রিয়াকলাপের সঙ্গেও এরা যুক্ত।
বীচবয়দের উদ্ধার এবং পুনর্বাসন শ্রীলঙ্কা সরকারের কাছে একটি প্রয়োজনীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বর্তমান আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এ সমস্যার সমাধান করা অত্যন্ত কঠিন বিষয়। সাংবাদিক Maureen Seneviratne এবং ন্যাশনাল কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক Shirley J.S. Peiris-এর ‘Tourism and Child Prostitution in Sreelanka’ নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। বীচবয়দের উদ্ধার করার কাজ কিছুটা সম্ভব হলেও এদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা খুবই কঠিন। দীর্ঘদিন পড়াশোনায় সঙ্গে যুক্ত না থাকায় এদের পড়াশোনা করার অভ্যাস একেবারে চলে গেছে। তাই স্কুলের প্রথাগত শিক্ষার সঙ্গে এরা যুক্ত হতে চায় না। আসলে খুব অল্প বয়েসে এরা উপার্জনের স্বাদ পেয়েছে। ফলে সৎপথে এরা যাতে উপার্জন করতে পারে সেই ব্যাপারটি পুনর্বাসন পরিকল্পনার সময় মাথায় না রাখলে এই প্রকল্পে সার্থক হবে না। এই ব্যাপারে বাবা মায়ের সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ছেলেদের সচেতন করে তোলার জন্যে তাদের উদ্যোগ নেওয়া দরকার। সমীক্ষকেরা লক্ষ্য করেছেন ভোগ্যপণ্য দিয়ে বিদেশি পর্যটকেরা বীচবয়দের এমনভাবে কিনে রেখেছে যে, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি পুনর্বাসন পরিকল্পনার আওতায় এদের আনা সম্ভব হচ্ছে না। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলি বীচবয়দের খেলাধূলার নানান রকম সরঞ্জাম কিনে দিচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এ ব্যাপারে তাদের কোন আগ্রহ নেই।
আর্থার সি ক্লার্ক :
বিজ্ঞানভিত্তিক সাহিত্য রচনা ও কলাবিজ্ঞানের অন্যতম বিশিষ্ট লেখক হলেন আর্থার সি ক্লার্ক। ১৯১৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের সামারসেটের মাইনহেড নামে এক শহরে তাঁর জন্ম। বর্তমানে শ্রীলঙ্কার অধিবাসী। ইংল্যাণ্ডের ব্যস্ত জীবনে ধ্বস্ত বিজ্ঞানী ক্লার্ক শ্রীলঙ্কার কলম্ব শহরে ছুটে এসেছিলেন শান্ত পরিবেশে বিজ্ঞান সাধনাকে অব্যাহত রাখতে। অসাধারণ কিছু গ্রন্থ তিনি রচনা করেন। ভি.ডি.ও ফোনের সাহায্যে বিদেশের বিভিন্ন বিজ্ঞান সম্পর্কিত আলোচনা সভায় তিনি অংশগ্রহণ করে চলেছেন। ফ্যাক্স (FAX) ও ইন্টারনেটের (Internet) মাধ্যমে সারা পৃথিবীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ। শুধু শ্রীলঙ্কা ও ইংল্যান্ড নয়, সারা বিশ্বের মানুষের কাছে তিনি একজন বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞানী হিসাবে পরিচিত। বিজ্ঞানভিত্তিক বিভিন্ন উপন্যাসের মধ্য দিয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ কিছু ভবিষ্যদ্বাণীও করে চলেছেন।
এহেন বিজ্ঞানীর গায়ে লেগেছে কলঙ্কের আঁচড়। অশীতিপর বৃদ্ধ এই বিজ্ঞানী আজ একজন বিকৃত বালকামী হিসাবে চিহ্নিত হয়েছেন। শ্রদ্ধেয় এই ব্যক্তির কামবিকৃতির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য শ্রীলঙ্কার পুলিশ মহল বিশেষ তৎপর। আন্তর্জাতিক যৌনব্যবসার সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ আছে কিনা পুলিশ তা নিয়েও চিন্তিত। সত্য উদঘাটনের জন্য শ্রীলঙ্কার প্রশাসন এই ব্যাপারে ইন্টারপোলের সাহায্য চেয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য দুজন ব্রিটিশ সাংবাদিকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বিজ্ঞানী ক্লার্ক শিশুদের সঙ্গে তার যৌন সম্পর্কের কথা স্বীকার করেন। দুই সাংবাদিকই জানায় যে, এই সাক্ষাৎকার তারা গোপনে রেকর্ডিং করে রেখেছে। পুলিশি জেরায় জেরবার হয়েও ঘটনার সত্যতা ক্লার্ক স্বীকার করতে চাননি।
(সূত্র- আজকাল ৮.৪.৯৮)
ট্রাফালগারের মিছিল :
১৯৯৬ সালে ইংল্যাণ্ডের ট্রাফালগার স্কোয়ারের ২০০ মানুষের মিছিল সংগঠিত হয়েছিল। শিশুদের ওপর বিকৃত যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে এরা সোচ্চার হয়। বালকামীদের বিরুদ্ধে কঠিন আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্যে সরকারের কাছে দাবি তোলে। সেদিনের সেই মিছিলে অনেকের মতোই ছিলেন শ্রীমতী হ্যান্ডলে (Ms. M. Handley)। এই মহিলার ৯ বছরের নিষ্পাপ শিশু পুত্র সন্তান ‘ডেভিড’। দুই বালকামী ১৯৯৪-এর অক্টোবরে তাকে লণ্ডন শহর থেকে কিডন্যাপ করে। যথেচ্ছ পায়ু ধর্ষণের পর বালকটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। বিষ্টলের (Bristal) এক মাঠে তিন মাস পর বালকের মৃতদেহটি উদ্ধার করা হয়।
সুইডেনের বলিন :
৬৯ বছর বয়েসি বলিন (Bolin) সুইডেনের নাগরিক। বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে নানা দেশ ঘুরে ডেরা বাঁধলেন থাইল্যাণ্ডে। পাতাইয়ার সমুদ্র সৈকতের যৌন পর্যটন বৃদ্ধের মনে সাড়া জাগায়। অবচেতন মনে যৌনতার নতুন ভাবে আগমন হয়। বরাবরই মানুষটি সমকামী ছিলেন কিনা জানা যায় না। তবে সমুদ্র সৈকতে ঘুরে বেড়ানো ১৩ বছরের এক কিশোরকে তার ভাল লাগে। কয়েকদিন তার সঙ্গে মেলামেশার পর তাকে ধর্ষণ করেন। ঘটনাটি জানাজানি হয়ে যায়। থাই পুলিশ বৃদ্ধকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু কোর্টের ‘বেল’ পাওয়ায় বৃদ্ধ বলিন নিজের দেশ সুইডেনে ফিরে আসেন। বলিনের এই ধরণের ঘৃণ্য যৌন অপরাধের কথা সুইডেনেও জানাজানি হয়। ফলে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হয়। এবং তার তিন মাসের হাজতবাস হয়।
রজার মুর :
শিশু যৌন নিপীড়ন বন্ধ করার জন্যে ১৯৯৬-এর আগষ্ট মাসে স্টকহোমে অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত প্রতিনিধিরা শিশুদের ওপর যে অবর্ণনীয় যৌন নিপীড়ন চলেছে তার বিভিন্ন ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। প্রখ্যাত হলিউড অভিনেতা রজার মুর এই সম্মেলনে শুধু অংশগ্রহণ করেননি, বক্তব্যও উপস্থাপন করেন। চলচ্চিত্রের পর্দায় জেমস বন্ড (James Bond) নামে পরিচিত এই বিশিষ্ট অভিনেতা সম্মেলনে উপস্থিত বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও উদ্বোধক রানী সিলভিয়ার সামনে নিঃসংকোচে স্বীকার করেন যে, পুরুষ হওয়া সত্ত্বেও শৈশবে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠুর ভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন। নিপীড়নের তীব্র শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার কথা অভিভাবকদের কাছে খুলে বলতে পারেননি কখনো। তিনি আরও বলেন, এই জাতীয় নিগ্রহের ফলে তিনি নিজেকে অপরাধী ভাবতে শুরু করেন। তাই উপস্থিত সমস্ত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধিদের তিনি বলেন উদ্ধার করে আনা শিশুদের মানসিক ভারসাম্য যাতে নষ্ট না হয়, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে।
অস্ট্রেলিয়ান বৃদ্ধ :
৭৫ বছর বয়সি এক অস্ট্রেলিয়ার বৃদ্ধ ৮৫০ বার শিশু যৌন পীড়নের দায়ে অভিযুক্ত হন। পুলিশের অনুমান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শিশুদের ওপর এই বৃদ্ধ একই ধরণের যৌন নিপীড়ন চালিয়েছে। ব্রিসব্রেন কোর্টে (Bris bane Court) তার বিচার চলছে।
স্কটহোল ওয়ে :
দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার একটি ছোট্ট দেশ কাম্পুচিয়া বা কম্বোডিয়া। অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির টানাপোড়েনে বেসামাল অবস্থা এই দেশের। বিভিন্ন সময়ে দেশের জটিল রাজনৈতিক অবস্থা শুধুমাত্র ওই দেশ নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে। অশান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেবার জন্যে শান্তির দূত হিসাবে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার জন্যে এসেছিলেন জন স্কটহোল ওয়ে। মহান দায়িত্ব নিয়ে আসা স্কট সাহেবের পদস্খলন হল। এশিয়ার যৌন পর্যটনের দেশে শান্তির বাণী ছড়াতে এসে তিনি ফেঁসে গেলেন যৌন কেলেঙ্কারিতে। নমপেন (Phnompenth) শহরের একটি মন্দির-সংলগ্ন নির্জন উদ্যানে তিনি এক কিশোরকে ধর্ষণ করেন। ধর্ষিত কিশোর আদালতে জানায় স্কট দুবার তাকে ধর্ষণ করে।
কারাগারের অন্তরালে :
সমাজে অপরাধ আছে। মূলস্রোত থেকে অপরাধীকে বিচ্ছিন্ন করে কারাগারে রাখার ব্যবস্থা হয়েছে। বন্দীদশার মধ্যে দিয়ে অপরাধীর মানসিকতার পরিবর্তন ঘটবে, রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষরা এমনই মনে করে থাকেন। গুরুতর অপরাধীর সাজা মৃত্যুদণ্ড আজও বহাল আছে। উন্নত দেশগুলিতে কারাগারের ভিতর চলেছে সংশোধনের নিরন্তর প্রয়াস। তাই জেলখানার নাম বদল হল। এইসব দেশে জেলখানা আজ সংশোধনাগার হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে।
পশ্চিমের উন্নত দেশের অনুকরণে আমাদের এখানে ঘটেছে নগরায়ন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যায় উন্নতি। সার্বিক উন্নয়নমূলক কাজের অগ্রগতি ঘটে চলেছে। পাল্টে যাচ্ছে পুরনো ভাবধারা ও দৃষ্টিভঙ্গী। আমরাও চাই— অপরাধী মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটুক। অপরাধমূলক কাজকে পরিহার করে সে আবার ফিরে আসুক সুস্থ পরিশীলিত জীবনের আঙিনায়। এই বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার নতুন আইন প্রণয়ন করেছে। এই আইনে দেশের বিভিন্ন কারাগারকে কেন্দ্রীয় সংশোধনাগার, জেলা সংশোধনাগার ও উপসংশোধনাগার হিসেবে গণ্য করা হবে। আমূল এই পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে অপরাধমনস্ক মানুষ সুস্থ হয়ে উঠবে, আশা করা যায়।
শুধুমাত্র আইন প্রণয়নের মধ্যে দিয়ে জেলের ভিতরকার অমানবিক পরিবেশের কতটা উন্নতি করা সম্ভব তা হয়তো আগামী দিনই বলে দেবে।
জেলের ভিতরটা হল এক ভিন্ন জগৎ। ভিন্ন এই জগতের ব্যক্তি মানুষের জীবন যন্ত্রণার টানাপোড়েন, অবসাদ গ্লানি, যৌনতা অবদমনের সুতীব্র যন্ত্রণার কতটুকুই-বা আমরা জানি! রাষ্ট্রীয় কানুন ছাড়া এই সমাজের সদস্যরা মেনে চলে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রথা ও অনুশাসন। পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, রেষারেষি, হিংসা-প্রতিহিংসা সবকিছুরই সন্ধান মিলবে এই সমাজের ভিতরে। সরকারি কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে জেলের ভিতরে চলছে দাদাগিরি। ওয়ার্ডার ও আরও অন্যান্য সরকারি কর্মচারীদের যোগসাজসে দাগি আসামিরা জেলের ভিতরেই মস্তানি চালায়। তাদের ভয়ে অন্যরা তটস্থ। সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত অপরাধীর হয়ে শ্রম দেওয়ার লোকের অভাব হয় না। নানারকম মাদক দ্রব্য ও খুব সহজেই মেয়েদের নিয়ে আসা যায় না জেলখানায়। তাই নারী বিকল্পের সন্ধান চলে।১ এই প্রসঙ্গে এসে যায় ছোকরাবাজির কথা।
বিভিন্ন জেলখানায় বয়স্ক পুরুষদের সঙ্গে অল্পবয়েসি অনেক কিশোর কয়েদিকেই দেখা যায়। ১৮ বছরের কম বয়েসি কোন কিশোরকে বয়স্কদের সঙ্গে একসঙ্গে কারাগারে রাখা হয় না। কিন্তু অনেক সময়েই অপরাধী কিশোরের বয়স নির্ণয় করা কঠিন হয়ে যায়। বেশি বয়স দেখিয়ে এদের সাধারণ জেলখানায় বয়স্কদের সঙ্গে থাকতে বাধ্য করা হয়। অবশ্য এভাবে বয়স ভাঁড়িয়ে কিশোরদের জেলাখানায় পাঠানোর পিছনে সুপরিকল্পিত চক্র কাজ করছে। আসলে সামান্য কিছু লঘু অপারাধের জন্যে এইসব কিশোর অপরাধীর সাজা হয় অনেক বেশি। ফলে এদের জেলে থাকতে হয় অনেক দিন। আবার ভবঘুরে অল্পবয়েসি কিছু ছেলেকে পুলিশ বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করে কোর্টের মাধ্যমে সোজা চালান করে দেয় জেলে।
এইসব কিশোররাই জেলের বয়স্ক পুরুষদের কাছে ‘ছোকরা’ বলে পরিচিত। এবং এদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে স্থাপন করাকে ‘ছোকরাবাজি’ বলে। নিতান্তই শারীরিক যৌন ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্যেই ছোকরাদের চাহিদা আছে। প্রধানত এইসব ছোকরাদের সঙ্গে অপরাধী বয়স্ক পুরুষরা পায়ুকামে লিপ্ত হয়। এছাড়াও আরও নানান বিকৃত উপায়ে তারা এই ছোকরাদের দিয়ে তাদের যৌন লালসা মেটায়। দীর্ঘদিন নারী সংসর্গে বঞ্চিত পুরুষেরা ধর্ষকামী হয়ে ওঠে। চোকরাদের ওপর তারা নানারকম যৌন নিপীড়নও চালায়। ভাল ছোকরা পাওয়ার ব্যাপারে অপরাধীদের মধ্যে রেষারেষি অনেক সময়েই তুঙ্গে ওঠে। মাস্তান দাদারা নিজেদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির জোরে ভালভাল ছোকরাদের ভোগ করে।
জেলের ভিতর ‘ছোকরাবাজি’র ঘটনা নতুন নয়। ব্রিটিশ আমলেও ছোকরাবাজি ছিল। ভাল ছোকরার এত চাহিদা ছিল যে অপরাধী পুরুষেরা এ ব্যাপার নিয়ে চিঠি চালাচালিও করতো। এরকম দু-একটি চিঠির দৃষ্টান্ত এখানে দেওয়া হল—১৯১৭ সালের জুলাই মাসে নীলকান্ত নামে এক বয়স্ক কয়েদি ছোকরা লতিফকে একটি হাত চিঠি পাঠায়। তাতে সে বালকটিকে জানায় গফুরের সঙ্গে তার সম্পর্ক ত্যাগ করতে হবে। যদি সে তা না করে তাহলে প্রতি মাসে তার জন্য বরাদ্দ সাত টাকা খরচ করা হবে না। নীলকান্ত এও জানায় যদি লতিফ তার ছোকরা হিসাবে থাকতে চায়, তাহলে ১০ এবং ১১ নং ওয়ার্ডের মধ্যে দিয়ে অবশ্যই সে যেন আজই তার সঙ্গে দেখা করে। এবং এটাই তার শেষ চিঠি।
ছোকরা খগেন্দ্রকে লেখা এক বয়স্ক কয়েদির একটি চিঠি থেকে আরও জানা যায়—এইসব ছোকরারা বিভিন্ন সময় মস্তান দাদাদের গাঁজা সরবরাহ করতো। শুধু মাত্র বয়স্ক আসামিদের নয়, ওয়ার্ডারদের সঙ্গেও এইসব ছোকরাদের যৌন সম্পর্ক ছিল। ছোকরা খগেন্দ্র তার মালিকের অনুমতি না নিয়ে অন্যের সঙ্গে ঘোরাঘুরি বা যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। এজন্যে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়।
এক ছোকরা দীর্ঘদিন এক আসামির কাছে থাকে না। নানা কারণেই ছোকরা বদল হয়। কখনো কখনো নতুন মালিকের হয়ে ছোকরা তার পুরনো মালিককে অশ্রাব্য ভাষায় চিঠি পাঠায়। ১৯১৭ সালের ডিসেম্বরে ১৩ বছরের শেষ ইয়াসিনের লেখা এমনই একটি চিঠি পাওয়া যায়।
স্বাধীন ভারতের কিছু কিছু জেলে এখনো এই ছোকরাবাজি চলছে। সাংবাদিক শুভাশিস মৈত্রের ‘কারা অন্ধকারের মঞ্চ থেকে’ (আজকাল ৩০.১১.৯৭) নিবন্ধে ১১ বছর বয়েসি এক ছোকরার ওপর অবর্ণনীয় যৌন অত্যাচারের কথা জানা যায়। বলপূর্বক পায়ুসঙ্গমের ফলে ওই ছোকরার মলদ্বারে বীভৎস ঘায়ের সৃষ্টি হয়েছিল। সাংবাদিক ও গবেষকের চোখের আড়ালে আরও কত এই জাতীয় নিপীড়ন চলছে কে জানে!
এশিয়া মহাদেশের সর্ববৃহৎ কারাগার হল দিল্লির তিহার জেল। ২৫০০ কয়েদিকে রাখার জন্যে এই জেল তৈরি হয়। কিন্তু বর্তমানে এই জেলের কয়েদির সংখ্যা ৯০০০ (Trikone V. II No. 1) এই জেলে কয়েদিদের মধ্যে সমকামিতার সম্পর্ক লক্ষ্য করা গেছে। ১৯৯৪ সালে Indian Medical Association তিহার জেলের ভিতর কয়েদিদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দীর্ঘ সমীক্ষা চালায়। সমীক্ষক দলের প্রধান Dr. K.K.Agarwal তাঁর রিপোর্টে জানান, কয়েদিদের ৯০ শতাংশ সমকামিতায় লিপ্ত। বারবার যৌনসঙ্গীর পরিবর্তনের কারণে এদের মধ্যে যৌন ব্যাধি হবার সম্ভাবনা দেখা গেছে। এই কারণে তিনি জেল কর্তৃপক্ষকে কয়েদিদের জন্য কণ্ডোম জোগান দেওয়ার প্রস্তাব রাখেন।১ এর ফলে আশা করা যায় কালব্যাধি AIDS ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কমবে। তৎকালীন তিহার জেলের Inspector General কিরণ বেদী তীব্র ভাষায় এর প্রতিবাদ করেন। তিনি জানান, ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় সমকামিতাকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। তাই এক্ষেত্রে কয়েদিদের হাতে কণ্ডোম তুলে দেওয়ার অর্থ সমকামিতার আইনি স্বীকৃতি। এছাড়া জনক রাজ জাই (Janak Raj Jai) নামে জনৈক ব্যক্তি দিল্লি হাইকোর্টে তিহার জেলে কণ্ডোম বিতরণ যাতে না করা হয় তার জন্য পিটিশান (Petition) দাখিল করেন। সমকামিতা নিয়ে খোদ রাজধানী দিল্লিতে বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ABVA দিল্লি হাইকোর্টে ৩৭৭ ধারা পরিবর্তনের জন্যে রিট পিটিশান দাখিল করে। ১৯৯৪ সালের মার্চ মাসে ভ্রাতৃপ্রতিম বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কাছে ABVA তিহার জেলে কণ্ডোম জোগান দেবার ব্যাপারে জনমত গঠন করার আবেদন জানায়। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা সভার আয়োজন করে জেলের বন্দীদের সমকামিতার স্বীকৃতির দাবি তোলে। তার আরও বলে, বর্তমান ৩৭৭ ধারা ভারতীয় সংবিধানের ১৪ ধারায় উল্লিখিত সাম্যের অধিকার (Right to equality) কে খর্ব করছে।
ড্রাইভার ও খালাসি :
ট্রাক ড্রাইভার ও খালাসিদের চাকুরি একটু ভিন্ন ধরণের। ধরা বাঁধা নির্দিষ্ট সময়ে কাজ করে বাড়ি ফিরে আসার ব্যাপার এখানে নেই। দূরপাল্লার ড্রাইভার ও খালাসিকে একনাগাড়ে বহুদিন বাড়ি ছাড়া হয়ে থাকতে হয়। স্বভাবতই যৌন আবেদন ও আকাঙ্ক্ষাকে অনেক সময়েই অবদমন করা হয়ে ওঠে না। সহধর্মিণীর দীর্ঘ অনুপস্থিতি এদের যৌন অভ্যাসে পরিবর্তন এনে দেয়। চলতি পথের বিভিন্ন স্থানের নিষিদ্ধপল্লিতে এদের যাওয়া শুরু হয়। এছাড়াও লাগামছাড়া মুক্ত জীবনে অবিবাহিত ড্রাইভার ও খালাসিরা ব্যাপক হারে যথেচ্ছ যৌনাচারে জড়িয়ে পড়ে। বহুগামিতা নিত্য অভ্যাসে পরিণত হয়। ফলে যৌনব্যাধিকে আর আটকে রাখা সম্ভব হয় না। যৌনব্যাধি নিয়ন্ত্রণ ও কালব্যাধি AIDS-কে প্রতিহত করার জন্য যে সব ‘Risk group’ চিহ্নিত করা হয়েছে, তাদের মধ্যে এরা বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে।
শুধু ভারতে নয়, সারা পৃথিবীতেই এরা এক বড় সমস্যা। আফ্রিকার পশ্চিমে সেনেগালের রাজধানী ডাকার থেকে পূর্বে কেনিয়ার মোম্বাসা পর্যন্ত বিস্তৃত সুদীর্ঘ Trans-Affrican High Way-র উগান্ডার ড্রাইভারদের ওপর সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে। এদের ৩৫% ড্রাইভার HIV জীবাণু বহন করে চলেছে। (Orobuloye T.O. etc : 1992)
তাই যৌনব্যাধি ও AIDS নিয়ন্ত্রণের জন্যে ড্রাইভার ও খালাসিদের সচেতন করে তোলা একান্ত প্রয়োজন। সরকার ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এ ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগে গ্রহণ করেছে। কণ্ডোম ব্যবহারকে আবশ্যিক করে তোলা হচ্ছে। আশা করা যায়, কণ্ডোম ব্যবহারের ফলে ড্রাইভার ও খালাসিরা বিভিন্ন প্রকার যৌন ব্যাধির হাত থেকে রক্ষা পাবে।
আগেই আলোচনা করা হয়েছে রাস্তার ধারের নিষিদ্ধপল্লি ড্রাইভার ও খালাসিদের মনোরঞ্জনের উত্তম স্থান। এছাড়াও অত্যন্ত প্রচ্ছন্ন ভাবে বিভিন্ন স্থানেই ড্রাইভার ও খালাসিরা নারী সংঘর্ষ লাভ করে। এর মধ্যে অন্যতম হল পথের ধারে ‘ধাবা’গুলি। পরিশ্রান্ত চালক ও তার সহকারী ধাবায় বিশ্রাম নেয় ও খাওয়া-দাওয়া করে। প্রায় প্রতিটি ধাবাতে দেশি, বিদেশি মদের ঢালাও ব্যবস্থা থাকে। আর যৌনক্ষুধা নিবৃত্তির জন্যে কিছু নারীকেও এখানে রাখা হয়। এইভাবে ধাবাগুলি অত্যন্ত সংগোপনে বিশেষ গণিকালয় হিসেবে ড্রাইভার মহলে পরিচয় হয়ে উঠেছে। যৌনকর্মীদের দেখা মেলে আরও এক জায়গায়। এগুলি হল বিভিন্ন পার্কিং এলাকা ও চেকপোষ্ট। উত্তর ২৪ পরগনার সীমান্ত শহর বনগাঁ থেকে ২ কিলোমিটার দূরে মিলনপল্লিতে গড়ে উঠেছে নতুন পার্কিং এলাকা। এর তত্ত্বাবধানে রয়েছে বনগাঁর পৌরসভা। পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই, ভিন্ন রাজ্যের বাংলাদেশগামী অসংখ্য ট্রাকের ড্রাইভার ও খালাসিকে বেশ কিছুদিন (৫-১০ দিন) এখানে কাটাতে হয়। সীমান্তের ক্রিয়ালেন্স পেলেই গাড়িগুলি বর্ডার অভিমুখে যাত্রা করে। একসময় এই বনগাঁয় নিষিদ্ধপল্লি ছিল। আজ আর নেই। নতুন গজিয়ে ওঠা এই পার্কিং-এর এলাকায় সন্ধের পর কিছু মেয়েদের ঘুরঘুর করতে দেখা যায়। এদের প্রধান খদ্দের ড্রাইভার ও খালাসি। সম্প্রতি এই পার্কিং এলাকায় দুটি ভিডিও-হল খোলা হয়েছে। অধিক রাতে এখানে ব্লু-ফিল্ম ও দেখানো হয়। আগে সীমান্তের পেট্রাপোল অঞ্চলের পার্কিং-এর এলাকাতেও এই ধরণের যৌনাচার অবাধে চলত। বনগাঁ শহরে প্রবেশ করার আগে কালুপুর গ্রামের কাছে মাঝে মধ্যে ড্রাইভাররা গাড়ি থামায়, যৌনকর্মীর খোঁজে। শুধু বনগাঁ নয় হিলি, খোজাডাঙ্গা, মেহেদিপুর, সোনা-মসজিদ (মালদা) প্রভৃতি অঞ্চল দিয়েও বাংলাদেশের দিকে শত-শত মালবাহী ট্রাক ছুটছে। ওইসব অঞ্চলের নির্দিষ্ট পার্কিং এলাকার ছবিও একইরকম।
বহু ড্রাইভার আছে যারা সমকামী। তাই এরা পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। চলার পথে এমন সঙ্গী পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই অনেক সময়েই এরা খালাসিদের সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করে।১ আসলে খালাসিদের এই কাজ করতে ড্রাইভাররা একরকম বাধ্যই করে। ড্রাইভারকে সন্তুষ্ট করতে না পারলে ড্রাইভিং শেখা যাবে না। খাওয়া-দাওয়া ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বন্ধ হতে পারে। এমনকি চাকরিটিও খোয়া যেতে পারে। তাই ড্রাইভারের মনোরঞ্জনের জন্যে খালাসিরা তার সঙ্গে পায়ুকামে লিপ্ত হয়। এছাড়াও বিষমকামে অভ্যস্ত দুরপাল্লার অনেক ড্রাইভারই মহিলার অভাবে খালাসিদের নারী হিসাবে ধরে নেয়। এবং তাদের সঙ্গে যৌনক্রিয়ায় মেতে ওঠে। সমাজবিজ্ঞানী সৈয়দ আহমেদ-এর একটি সমীক্ষা থেকে জানা যায়—আসাম হয়ে উত্তরপূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে যেসব ট্রাক ঢুকছে তার মধ্যে ৫০৬ জন ড্রাইভারের ১৫ শতাংশ তাদের সমকামী যৌন সম্পর্কের কথা জানায়। (Ahmed : 1992)

‘যৌনরোগ’ সচেতনা বিষয়ক ‘ভোরুকা’র নাট্যানুষ্ঠানে ড্রাইভার ও খালাসি
পশ্চিমবঙ্গের উলুবেড়িয়া ও ভারত-নেপাল সীমান্ত রক্সলে ট্রাক ড্রাইভার ও খালাসিদের ওপর নানারকম সেবামূলক কাজ করে চলেছে ‘ভোরুকা ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। মূলত Transport Corporation of India (TCI) শাখা সংগঠন হিসাবে ভোরুকা কাজ করছে। ড্রাইভার ও খালাসিদের স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন করে তোলবার সময়েই এরা লক্ষ্য করে, এই দুই শ্রেণির লোকেরা যথেচ্ছ যৌন সম্ভোগ ও সমকামিতার সঙ্গে যুক্ত। সংস্থার এক ক্ষেত্রসমীক্ষকের কাছে এক খালাসি স্বীকার করে, এক বিশেষ মুহূর্তে সে একজন ড্রাইভারের দ্বারা প্রায় ধর্ষিত হয়েছিল। বহু কষ্টে সে যাত্রায় সে মুক্তি পায়।১ ড্রাইভারদের পায়ুকাম সম্পর্কে সংস্থা যে তথ্য সংগ্রহ করেছে তা নীচের দুটি সারণিতে প্রকাশ করা হল।
সারণি—১

সারণি—২

আরও কিছু ঘটনা :
কঠিন কৃচ্ছসাধনের মধ্যে দিয়ে অনেকে ঈশ্বর সাধনায় ব্রতী হন। সংসারের বাইরে একাকী নির্জনে থেকে জীবন কাটিয়ে দেন। নানাভাবে এরা নিজেদের যৌন-ইচ্ছাকে অবদমন করার চেষ্টা করেন। কেউ পারেন, কেউ-বা পারেন না। এরা সাধু-সন্তু বা সন্ন্যাসী। বহু ‘ভণ্ড’ মানুষ এদের দলে ভিড়েছে। এদের জীবন যৌনতা বিবর্জিত নয়। নানাভাবে এরা নিজেদের যৌন-ইচ্ছাকে চরিতার্থ করে। এই প্রসঙ্গেই উল্লেখ করতে হয় ‘নাগা’ সন্ন্যাসীদের কথা। মূল শব্দ ‘নাঙ্গা’, যার অর্থ নগ্ন। নগ্ন হয়ে ঘুরে বেড়ায় বলে এদের ‘নাঙ্গা’ বা ‘নাগা’ সন্ন্যাসী বলে। এরা প্রধানত শৈব-ধর্মাবলম্বী। স্বভাবে উগ্র, উচ্ছৃঙ্খল। গঙ্গা সাগর মেলা, কুম্ভ মেলা ও আরো অনেক মেলাতে এদের চোখে পড়বে। প্রতিটি মেলায় এদের নির্দিষ্ট আখড়া থাকে। এক-একজন ‘প্রধান’ নাগার অধীনে থাকে নানা বয়সের ‘চেলা’। মেলা শুরু হওয়ার বেশ কয়েক মাস আগে বিভিন্ন গাঁ-গঞ্জ থেকে চেলাদের সংগ্রহ করা হয়। যার যত বেশি ‘চেনা’ সেই প্রধানের দাপট তত বেশি। বলা বাহুল্য, এইসব চেলাদের সঙ্গে ‘প্রধান’ বিশেষ যৌনসম্পর্ক গড়ে তোলে। চেলা-সম্ভোগ নাগা সন্ন্যাসীদের মধ্যে অত্যন্ত গোপনীয় ঘটনা।
শুধু নাগা সন্ন্যাসীদের মধ্যে নয়, মেস, হোস্টেল, হোম ও মিলিটারী ব্যারাকেও পুরুষ-সম্ভোগের ঘটনা আকছার ঘটছে। বিভিন্ন মিশনারি স্কুলের আবাসিক ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে অনেক সময় এই ধরণের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৯৭-এর অক্টোবরে বিহারের দুমকার সেন্ট জোসেফস হাইস্কুলের ভাইস প্রিন্সিপালের বিরুদ্ধে ছাত্রের সঙ্গে সমকামিতার সম্পর্ক গড়ে তোলার অভিযোগ আনা হয়।
(আজকাল—২২.১০.৯৭)
সম্প্রতি ‘ইস্কন’ (ISKON/International Society for Krishna Consciousness) ধর্মীয় সংস্থার গুরু বা সমকামিতার অভিযোগে অভিযুক্ত হচ্ছেন। এখানে ছাত্রাবাসগুলির ছাত্রদের ওপর নানারকম যৌন নিগ্রহ চালানো হচ্ছে। গুরু-শিষ্যর যৌনসম্পর্কের কথা প্রকাশ পাচ্ছে। বস্তুতঃ গুরুই শিষ্যদের এই জাতীয় যৌন সম্পর্ক গড়ে তুলতে বাধ্য করান। কথা না শুনলে শুরু হয় অকথ্য শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার। এই কারণেই গুরুদের ওপর শিষ্যরা ভক্তিশ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলছে। আচরণ সংস্কারের জন্যে ‘ইস্কন রিফর্ম গ্রুপ’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
(আনন্দবাজার—১০.১০.৯৮/২.১১.৯৮)।
অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক আম্পায়ার স্টিভ র্যান্ড বিভিন্ন রকম যৌন কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছেন। তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ২৬টি যৌন নিগ্রহের অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল এক কমবয়সী বালকের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন ও যৌন-পীড়ন।
(আজকাল—২৬.১১.৯৮)
১. without female companionship, Prisoners became enmeshed in homosexual relationships not always of their own choosing
(David Arnold–Subalter Studies V. VIII)
১. The Stateman 3.7.94
“The Survey by a team of doctors in Tihar found that instance of homosexual acts was high as 90 percent we immediately recommended distribntion of Comdoms to the Prison insmates.”
১. Nag. M (1996):
Truck drivers in India (all male) are known to have multiple sexual relationships not only with FSW’s but also with other men, particularly with young boys who accompany them in long highway drivers as helpers.
১. Rao, A (1993): One Khalasi narrated his experiece with a truck driver, The truck driver would force it on him and Pin him down, be behave with him as if he was a woman. To get rid of this, he would stop the truck on the highways and push the driver to visit the Sex workers “Mujhe langta Hai Jayse Mai Larki Hun, Mai Paresani Se Bachhe Ke leye Truck Ko Rick Deta. Aur Driver Ko in Larkiyo Ke Pass Habardasti Bhej Data.”
