৯. একান্ত আলাপচারিতার দু’টি পর্ব

৯. একান্ত আলাপচারিতার দু’টি পর্ব

।। পর্ব-এক।।

দিল্লির AIMS-এর সামনে রিং রোড ধরে পাঞ্জাবিবাগের দিকে হাঁটছি। আমাদের দুজনের মাঝখানে ইসমাইল। তিরিশের কাছাকাছি, স্বাস্থ্যবান, শ্যামবর্ণ যুবক। বেশ কিছুক্ষণ এক সাথে হাঁটার পর হঠাৎ ও বলে ওঠে— ‘আমাদের কোন সংসার নেই। ভালবাসার মানুষ নেই। চিন্তা করার কেউ নেই। আছে দেহ, যে যে ভাবে পারে ভোগ করে।’ চমকে উঠলাম। সত্যিই ইসমাইলের জন্যে কেউ ভাববে না। ইসমাইলের কথা কেউ মনে রাখবে না। ইসমাইল চলে যাবে বিস্মৃতি অতলে। কিন্তু ইসমাইলও ঘর বাঁধতে চেয়েছিল। অনেক কিছুর স্বপ্ন দেখেছিল। তারপর সব ওলোট-পালোট।— একসময় ওর বাড়ি ছিল উত্তরপ্রদেশের ইটাওয়ায়। ছদ্মপ্রেমিকের সঙ্গে ইসমাইল একসময় নিখোঁজ হয়েছিল। পরে পরিত্যক্ত হয়ে পুরনো দিল্লীর এক বস্তিতে ডেরা বেঁধেছে। অনেক পুরুষই ওর জীবনে এসেছে। কিন্তু কেউ-ই ভালবাসেনি। সবাই ওর খদ্দের। ও এখন দেহ বেচে খায়। বাড়ির সঙ্গে কোন যোগাযোগ নেই।

কৃষ্ণনগরের প্রশান্ত। মুখে ব্যান্ডেজ, হাতে প্লাস্টার। পাড়ার ছেলেরা সেদিন ওকে মেরেছিল। ঠান্ডা মাথার ছেলে প্রশান্ত হঠাৎ-ই রেগে যায়। কতদিনই আর সহ্য করবে। ওকে দেখলেই ওদের শুরু হয় কুৎসিত অঙ্গভঙ্গী ও অশ্রাব্য ভাষা। নিজেকে সামলাতে পারেনি। প্রতিবাদ করেছিল। আর প্রতিবাদের জবাবও তৎক্ষণাৎ পেয়ে যায়। শুনতে হল— ‘ব্যাটা ধুরানী, তোর আবার বড় গলা। খাস তো… মারিয়ে।’ সখেদে প্রশান্ত বলে— ‘দাদা, এভাবে বেঁচে থেকে লাভ কি? এর চেয়ে সুইসাইড করা ভাল। না-হলে হিজড়ে দলে ভিড়ে যাবো।’

বাসুবাটির মেলায় নিতাই-এর সঙ্গে পরিচয় হয়ছিল। ‘দাদা’ বলে সম্বোধন করতে ভ্রূ কুঁচকে বলে— ‘প্লীজ, দাদা না। আজকের দিনটার জন্যে অন্তত ‘দিদি’ বলুন। খুবই অপ্রতিভ। ওকে ব্যস্ত মনে হচ্ছিল। তাই আর বিরক্ত করিনি। অনেক রাতে আবার ওর সঙ্গে দেখা হল। অনেকটা সময় দিল আমাদের জন্যে। ও তখন অন্য বেশে। পরনে শাড়ি, মুখে লিপস্টিক, হাতে চুড়ি। এমন কি কানে দুলও পরেছে। হাঁটা ও কথা বলার ঢঙ পুরোপুরি মেয়েলি। একগাল হেসে বলে, ‘যা ভাবছেন তা না, আমি কিন্তু হিজড়ে না। ওদের সঙ্গে আমার কোন যোগাযোগ নেই। আমি আমার মতো।’ সারারাত মেলায় ঘুরে ওর সঙ্গে অনেক কথা হল। কলকাতার এক প্রাইভেট কোম্পানীতে (নাম বলতে চায়নি) নিতাই কাজ করে। শাড়ি পরতে ওর খুব ভাল লাগে। কিন্তু বাড়িতে ওইভাবে থাকার উপায় নেই। একদিন মা দেখে ফেলেছিলেন ওর এই রূপ। ছেলের মতিভ্রম হয়েছে বলে ডুকরে কেঁদে ওঠেন। প্রতি বছর এই বাসুবাটির মেলায় নিতাই ছুটে আসে। প্রাণভরে মেয়ে সাজতে চায়। সঙ্গে আসে ওর আরও কিছু বন্ধু। তারাও ওর মতো। নিতাই জানায় কিছুদিন অন্তর-অন্তরই ওর মেয়ে সাজার শখ হয়। ও তখন অস্থির হয়ে ওঠে। মনে হয় এক যুবতী ওর মধ্যে প্রবেশ করেছে। সে যেন ওকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তার সঙ্গে কেমন করে যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। নিজেকে এক সুন্দরী যুবতী ভাবতে শুরু করে। আর এই ভাবতে ভাবতে খরস্রোতা নদীর মতো ভেসে চলে যায় কোথায় ও নিজেই জানে না।

গোয়ার সুখরাম এখন পুরুষ যৌনকর্মী। এক সময় ফেরি করতো সমুদ্রের ধারে। বাড়িতে স্ত্রী-পুত্র আছে। তার বর্তমান পেশার কথা বাড়ির কেউ জানে না। ‘আঞ্জনা সী বীচ’ ওর কাজের এলাকা। রোজগার বেশ ভালই। ওর খদ্দেররা সবাই প্রায় বিদেশি। তবে দু-একজন যে দেশি খদ্দের জোটে না তা নয়। ওর যৌন স্বভাব একটু অন্যরকম। কখনো গিগোলো, আবার কখনো সমকামী যৌনকর্মী। সুখরাম বলে, ‘এ পেশায় কাকে কীভাবে আনন্দ দেওয়া যায়, এ নিয়ে ভাবতে হয়।’ এ রীতিমতো গবেষণা। এ গবেষণা করতে করতেই কোন কালব্যাধি সুখরামকে ছিনিয়ে নেবে।

পুরীর ‘রাজন’ খদ্দের খুঁজে বেড়ায়। খদ্দের দেখলেই ও বুঝতে পারে। রাজনরা এখানে ‘মায়া’ বলে পরিচিত। ও আবার ম্যাসেজও করে। সমুদ্রের ধারে। এই কাজে ওর নির্দিষ্ট কিছু খদ্দের আছে। ও বলে একবার ওর ম্যাসেজের আরাম পেলে নাকি বারবার পুরী আসতে হবে। ও জানায় কয়েকজন পুরোহিতও ওর খদ্দের। বেশ কৌতুক করে বলে, ‘আমাকে পুরুষ দেবদাসী বলতে পারেন।’

কালিপদ গ্রামের ছেলে। ওর নামে নানা কথা শোনা যায়। গ্রামের কিছু ছেলে না-কি ওর কাছে যায়। বহুদিন মেশার পরে কালিপদ তার এই স্বভাবের কথা স্বীকার করে। শুধু অর্থের জন্যে নয়। শারীরিক ও মানসিক আনন্দের কারণে ও পুরুষকে সঙ্গ দেয়।

গণেশ এখন পুরোদস্তুর হিজড়ে। বউ, ছেলে-মেয়ের সঙ্গে কোন যোগাযোগ নেই। এক সময় চটকলের শ্রমিক ছিল। ফ্যাক্টরি লক-আউট হলে চাকরি যায়। তারপর নানা ধান্দায় ঘুরতে-ঘুরতে একসময় হিজড়ে হয়ে যায়। হিজড়ে হওয়ার বাসনা কিন্তু ওর হঠাৎ হয়নি। কৈশোর ও যৌবনে বহুবার পুরুষকে সঙ্গ দিয়েছে। আর এখন তো কথাই নেই। তবে বয়স হয়েছে, খদ্দের আসে কম।

রাজুর সঙ্গে কথা হয়েছিল হাওড়া স্টেশনে। বাড়ি ধানবাদে। নিজেকে পুরুষ যৌনকর্মী বলে পরিচয় দিতে কুণ্ঠা বোধ করে না। বেশ গর্ব করেই বলেছিল— ‘জানেন দাদা, আমরা এক সময় ছিলাম হারেমে। রাজা-উজিররা আমাদের ভোগ করতেন। তাই আমাদের এই ব্যবসা চলবে। কেউ আটকাতে পারবে না।’ ঠিকই। রাজুদের ব্যবসা এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে চলেছে।

এরকম যৌনকর্মী রয়েছে অসংখ্য। শিয়ালদা, হাওড়া, বালি, রাজাকাটরা প্রভৃতি বিভিন্ন স্থানে বুলান, নবীন, রতন, চাষী, পাগল ও আরও অনেকে দাঁড়িয়ে থাকে, খদ্দেরের আশায়। এদের সঙ্গে সমাজের স্বাভাবিক সম্পর্কের দড়িটা ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে আসছে। এরা মুখ থুবড়ে পড়ছে এক বিচিত্র সংসারে। গড়ে তুলছে নিজেদের সমাজ।

।। পর্ব-দুই।।

পুরুষ যৌনকর্মীদের ওপর গবেষণা ও সমীক্ষা চালাচ্ছেন কিছু ব্যক্তি ও সংগঠন। এদের সমীক্ষা-রিপোর্টে এইসব যৌনকর্মীদের জীবনের অসহায়তার কথা উঠে আসছে। এছাড়াও বিভিন্ন রূপান্তরকামী-সমকামী ও পুরুষ যৌনকর্মীরা তাদের নিজস্ব পত্রপত্রিকায় ব্যক্তিগত সমস্যা সমাধানের আশায় চিঠি পাঠাচ্ছেন। এখানে এইসবের কিছু অংশ-বিশেষ তুলে ধরা হল।

(১) প্রেম, ২৬ বছর বয়সি যুবক, বিবাহিত এবং একটি শিশুপুত্রের পিতা। সে কলকাতায় তাদের একটি বৃহৎ পারিবারিক ব্যবসার সাথে যুক্ত। ১৩ বছর বয়সে তার প্রথম যৌন অভিজ্ঞতা হয়। বিয়ের পরও সে অন্য পুরুষের সাথে যৌন সহবাস করে। কিন্তু সঙ্গীদের সাথে কোন গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে সে চায় না। এতে তার পারিবারিক ও সামাজিকভাবে বাধা আসতে পারে। সে স্ত্রীকে ভালবাসে না। কিন্তু তার ধারণা স্ত্রী’র প্রতি স্বামীর সকল কর্তব্য সে সঠিকভাবে পালন করছে।

(২) ইন্দু পুনা শহরের একজন অটো-রিক্সাচালক। পুনার শিল্পাঞ্চল থেকে দূরে বস্তিতে স্ত্রী ও চার ছেলেমেয়ে নিয়ে তার বাস। বিবাহিত জীবনে সে সুখী। কিন্তু মাসে অন্তত একবার হলেও তাকে অন্য পুরুষের সাথে যৌনমিলন ঘটাতেই হবে। শহরতলির আনাচেকানাচে সে সঙ্গী খুঁজে বেড়ায়। সে নিজেকে সমকামী বা উভকামী কিছুই মনে করে না। এই কাজকে সে দোষের বলেও মনে করে না। কারণ সে সংসারী, বিবাহিত এবং চারটি সন্তানের জনক। সে আরও জানায় তার প্রথম যৌন অভিজ্ঞতা হয়েছিল ১২ বছর বয়সে তারই এক কাকার সাথে।

(৩) নতুন দিল্লির অধিবাসী, অরজিৎ, ১৯ বছর বয়সি সচ্ছল শিক্ষিত পরিবারের সন্তান। সে নিজেকে সমকামী ভাবে এবং এই সমকামিতার কথা সে পরিবারকে জানাতে চায়। যদিও সে জানে এর ফল হবে ভয়াবহ এবং তাকে সবকিছু ছেড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ছোটবেলা থেকেই সে অন্য ছেলেদের প্রতি আকৃষ্ট হত। ১১ বছর বয়সে তার অন্য একটি বালকের সাথে যৌনমিলনের অভিজ্ঞতা হয়। এখন সে দিল্লির বিভিন্ন সমকামী পুরুষের সান্নিধ্যে এসেছে। এবং যেখানে সে উপভোগ করে দেহে ও মনের চরম উত্তেজনা।

(৪) ১৬ বছরের রঞ্জন একজন পুরুষ যৌনকর্মী। মাদ্রাজ স্টেশনের নিকটেই শহরের প্রাণকেন্দ্রে চলে তার রমরমা ‘ব্যবসা’। বাবার অসহ্য মারের হাত থেকে বাঁচার জন্য যেদিন সে বাড়ি থেকে পালিয়েছিল, ‘ব্যাবসায়’ তার সেদিনই হাতে খড়ি। বাড়ি ফিরে যাওয়ার কোন তাগিদ নেই তার। রঞ্জন বলে, এ ব্যবসায় রোজগার যথেষ্ট ভাল হয়, যদিও মাঝে মধ্যে দু-একটি অমানবিক খদ্দেরকে সইতে হয়। সে পয়সা জমায় একটি ছোটখাট ব্যবসা করবে বলে। সে নিজেকে সমকামী মনে করে না যদিও সে পুরুষসঙ্গীর সাথে যৌনমিলন উপভোগ করে। এই পেশা তার কাছে নিছকই ‘ব্যবসা’।

(৫) অরুণ ও কমল মুম্বাই শহরের দাদার স্টেশনের পাশে বাস করে। পেশায় দুজনেই পৌরসভার ঝাড়ুদার। পেশার সূত্র ধরেই দুজনের প্রথম পরিচয় ও বন্ধুত্ব। গত পাঁচ বছর ধরে সেই বন্ধুত্ব পরিণত হয়েছে এক অদ্ভুত ভালবাসায়। আজ তারা একে অপরের প্রেমিক— ভালবাসার মানুষ। আজ তারা একে অপরকে পৃথক ভাবেনা। তাদের সাথে সমাজের অনেক সমকামী পুরুষের পরিচয় আছে। যেহেতু এরা নিজেরা পুরুষ। তাই তারা নিজেদের স্বামী-স্ত্রী বলে মনে করে না। স্কুল ছেড়েছে ১৩ বছর বয়েসে। দুজনার কেউই ইংরাজি বলতে বা পড়তে পারে না।

(৬) ‘রসিক’ কলকাতার ছেলে। কাজের খোঁজে একদিন তার বাবা-মা তাকে ও বোনকে নিয়ে এই শহরের স্টেশনে আস্তানা গেড়েছিল। আজ বাপ-মা নেই। বোনটাও মারা গেছে। ১০ বছরের রসিকের ঠিকানা এই স্টেশন। এখানে থাকে বাপে খেদানো, পোড়াখাওয়া, বেওয়ারিশ স্টেশনের ছেলেমেয়ের দলে। প্রায় ২০ জনের দলের সকলে পেট ভরানোর জন্য চুরি, ছিনতাই এমনকি ভিক্ষাও করে। যাত্রীদের মালপত্র টেনে দু’চার পয়সা হয়। এভাবেই দিন গুজরান। রাতের বিছানাও স্টেশনে। এভাবে কোন এক দারুণ শীতের রাতে দলের পাণ্ডা ১৪ বছরের রমেশ প্রথম যৌনতার হাতে কলমে শিক্ষা দেয় রসিককে। তারপর শুধু এগিয়ে চলা। পুরুষ খদ্দের জোগাড় হয়। টাকাও আসে। রেলের মালবহনকারী কুলি, ছোট দোকানদার সকলকে তৃপ্ত করে পয়সার বিনিময়ে।

(৭) আলমের বাড়ি বাংলাদেশের ঢাকা শহরে। ৯ বছরের আলমকে প্রতি সন্ধ্যায় দেখা যায় শহরের এক ধর্মীয় পীঠস্থানে, যেখানে আরও প্রায় ১৫০ জন ‘যৌনকর্মী’ নিয়মিত একত্রিত হয়। এদের ‘খদ্দের’ হল স্থানীয় রিক্সাচালক, ট্রাকচালক, দোকানদার এমন কি তীর্থযাত্রীরাও। এখানে বিভিন্ন বয়সের ‘বালক’ দেখা যায়। এরা অর্থের বিনিময়ে সেক্স (Sex) বিক্রি করে। এদের কোঠি (Kothi) বলে। যারা অর্থ দিয়ে যৌনক্ষুধা মিটানোর জন্য এখানে আসে তারা হল পান্থি (Panthis)।

(৮) আলম এক ‘কোঠি’। সে মেয়েদের মতো সাজে, রং মাখে। যৌন উত্তেজক পোশাক পরে কোমর দুলিয়ে পুরুষের দিকে তীর্যক চাহনি দিয়ে যৌন আবেদন জানায়। দেহব্যবসায় রোজগার হয় ভালই। পরিবার জানে, সে রিক্সা সারাই-এর কাজ করে। আর আলম ভালই জানে, তার আয়ের ওপর বেঁচে আছে পাঁচ ভাই-বোন, মদ্যপ কাকা এবং আবার গর্ভবতী তার মা।

(৯) কামালের বাড়ি বাংলাদেশের ঢাকা শহরে। একুশ বছরের যুবক। কামাল শহরের বড় হোটেলের লিফট-চালক। কিন্তু সপ্তাহে ৩-৪ দিন তার ঠিকানা শহরের নির্দিষ্ট একটি পার্ক। যেখানে আরও অনেকে আসে যৌনক্ষুধা মেটাতে। কমল ওষুধ (Oral Contraceptive) খেয়েছে বুকের আকৃতি ও শোভা বাড়াতে। আজ তার স্পষ্ট উন্নত বুক। কমলের কথায়, মেয়েদের মতো সুন্দর, গোলগাল সে করবে? সে সাহায্যপ্রার্থী।

(১০) কুড়ি বছর বয়েসের একজন সমকামী পুরুষ। পরিবার থেকে তার ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে বিয়ের জন্য। কিভাবে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা সে করবে? সে সাহায্যপ্রার্থী।

(১১) বিয়ে করার জন্য এক সমকামী অত্যন্ত চাপের মধ্যে আছে। বাবা-মা এবং আত্মীয়রা তার জন্য ভাল পাত্রী দেখেছেন। কিন্তু সে এই বিয়ের জন্য প্রস্তুত নয়। তার পরিবারে কেউই জানে না সে পুরুষ সমকামী। তার এই সমকামিতার কথা বাবা-মা জানলে তারা তাকে ত্যাগ করবেন। অপরদিকে , তার বিশ্বাস সে বিয়ে করলে একজন সুখী, আদর্শ স্বামী হিসাবে সংসারে ও সমাজে প্রতিষ্ঠা পাবে।

(১২) এক সমকামী শাড়ি গয়না পরতে ভালবাসে। সারাজীবনের জন্য সে একজন ভাল সুবিবেচক পুরুষ বন্ধু বা সঙ্গী চায়।

(১৩) কলকাতাবাসী একজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী। অল্পবয়সি পুরুষ ও মহিলা সমকামীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব করতে চায়। কলকাতা বা নিকটবর্তী অঞ্চলের অগ্রাধিকার।

(সূত্র — নয়া প্রবর্তক/বম্বে দোস্ত/সংঘমিত্র/শিবানন্দ খানের সমীক্ষা)

শেষের কথা

সার্বিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির জোয়ারে আমরা আজ প্লাবিত। আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নতিতে বিশেষভাবে ত্বরান্বিত করার জন্যে আমরা বদ্ধপরিকর। কিন্তু আমাদেরই সমাজের এখানে-ওখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ধুরানীদের কথা আমরা কতটুকুই-বা জানি! সার্বিক উন্নয়নের ঢেউই-বা কতটুকু লেগেছে এদের গায়ে? জানি না। বলতে পারবো না এদের জীবন-যন্ত্রণার কথা। জীবন-জীবিকার গতানুগতিক প্রাত্যহিকতার মধ্যে দুমড়ে-মুচড়ে থাকা মানুষগুলোর ভাল-মন্দর কথা। নিদারুণ অবমাননা আর হীনমন্যতার বিষাক্ত ছোবলে রক্তাক্ত এই মানুষের অন্তর্লীন বেদনা ও বিপন্নতার আর্তি কতটুকু এসে পৌঁছায় আমাদের কানে? সমকামী ও রূপান্তরকামীদের উপেক্ষা করা উচিত নয়। উদার, সংশয়হীন, ন্যায়নিষ্ঠ মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। বন্ধুত্বের অধিকার নিয়ে এদের পাশে দাঁড়াতে হবে। চাই সামাজিক স্বীকৃতি। চাই মানুষের পূর্ণমর্যাদা। নতুন চিন্তা ও ধ্যানধারণার মধ্যে দিয়ে নিশ্চয়ই হবে এর উত্তরণ।

কিছু মতামত

দৃষ্টিভঙ্গীর একটু পরিবর্তন প্রয়োজন

ডঃ অশোকনাথ বসু*

আমাদের দেশের পুরুষ যৌনকর্মীরা নানারকম সমস্যার মধ্যে আছে। এরা বঞ্চনার শিকার। সুষ্ঠু পুনর্বাসনের মধ্যে দিয়ে এদের প্রতিকূল অবস্থার থেকে মুক্ত করা আমাদের দায়িত্ব।

‘যৌনতা’ সম্বন্ধে আমাদের ধারণা যত পরিশীলিত হবে, সমকামিতা, রূপান্তরকামিতা ও পুরুষ-যৌনকর্ম বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গী ততই স্বচ্ছ হয়ে উঠবে। যৌনতার নানান সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম দিক নিয়ে খোলামেলা আলোচনার প্রয়োজন। এবং তাহলেই হয়তো পুরুষ যৌনকর্মীরা নিজেদের অভাব-অভিযোগ ও সমস্যা নিয়ে প্রকাশের আলোয় দাঁড়াবার সাহস অর্জন করতে পারবে।

‘যৌনতা মানবজীবনের একটা বড় দিক। অনেক কিছুই এর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। বিভিন্ন দেশে যৌনতা বিষয়ে নানা পাঠক্রম চালু হয়েছে। গবেষণা হচ্ছে যৌনতার বিভিন্ন রুচি, অভ্যাস ও আচরণের উপর। উন্মোচিত হচ্ছে অনেক অবদমিত আকাঙ্ক্ষার স্বরূপ।

বিজ্ঞানসম্মত মূল্যায়নের মধ্যে দিয়ে যৌনতার উপর জড়িয়ে থাকা রক্ষণশীলতাকে দূর করতে না পারলে পুরুষের যৌনপেশার যথার্থ পর্যালোচনা সম্ভব নয়।

.

উভয়লিঙ্গতা ও তার সমস্যা

ডঃ অমরেন্দ্রনাথ বসু*

শারীরিক দিক থেকে মানুষকে দুই ভাগে বিভক্ত দেখতে পাই : পুরুষ ও নারী। কিন্তু শরীরস্থান (anatomy) এবং ভ্রূণবিদ্যার (embrylogy) উপাত্ত (Data) অনুযায়ী প্রত্যেক মানুষই আবার উভয়লিঙ্গ (bisexual)। এই পৃথিবীতে প্রাণের আদিম উভয়লিঙ্গতার (hermaphroditism) অবস্থা দীর্ঘ বিবর্তনের পথ অতিক্রম করে বর্তমানে এক শরীরে এক লিঙ্গ (unisex) অবস্থায় পৌঁছেছে। তা সত্ত্বেও বিপরীত লিঙ্গের কিছু কিছু চিহ্ন নিষ্ক্রিয় (atrophied) অবস্থায় প্রত্যেকের শরীরে সুপ্তভাবে বিদ্যমান। অর্থাৎ একজন পুরুষের শরীরে নারীর কিছু শারীরিক লক্ষণ এবং একজন নারীর শরীরে পুরুষের কিছু শারীরিক লক্ষণ বিরাজ করে। এর ফলে প্রত্যেক মানুষের ভাবধারা বা মানসিকতায়ও এই উভয়লিঙ্গতার মনোভাব একটি বাস্তব ঘটনারূপে প্রকাশমান। এরূপ মানসিকতাই স্বাভাবিক। শারীরিক মানসিক উভয়লিঙ্গতা মানুষের ক্ষেত্রে একটি সর্বজনীন ঘটনা। উভয়লিঙ্গতা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে অসুস্থ (Pathological) বা অস্বাভাবিক (Abnormal) ঘটনা নয়; তা কেবলমাত্র সমকামীদের (Homosexual) মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

একজন মানুষের প্রধান (Dominant) লিঙ্গ চিহ্ন অনুযায়ী সে পুরুষ অথবা নারী হিসাবে চিহ্নিত হয়। শারীরিক দিক থেকে বিপরীত লিঙ্গ চিহ্ন তার মধ্যে সুপ্ত ও নিষ্ক্রিয় থাকলেও মনে তার প্রতিফলন দেখা দেয়। এরূপ অবস্থায় পুরুষের মধ্যে নারীর ভাব এবং নারীর মধ্যে পুরুষের ভাব কিছুটা দেখা দেওয়াই স্বাভাবিক। অর্থাৎ পুরুষের নারী অঙ্গ লাভের এবং নারীর জীবনের অভিজ্ঞতা লাভের ইচ্ছা, যাকে সাধারণত বলা হয় নারী সুলভ নিষ্ক্রিয়তার ভূমিকা বা Feminine passive role, এবং নারীর পুরুষ অঙ্গ লাভের আকাঙ্ক্ষা এবং পুরুষের মত সক্রিয় ভূমিকা বা Masculine active role এক কথায় বিপরীত লিঙ্গের মানসিকতা পূরণের ইচ্ছা জাগ্রত হয়। এরূপ অবস্থায় নিজের স্বাভাবিক যৌন ইচ্ছা অবদমিত (repressed) হয়; ফলে দেখা দেয় বিকৃতি।

আবার একজন পুরুষ বা নারীর উভয়লিঙ্গতার মানসিকতার জন্য নিজের স্বাভাবিক (Proper বা dominant) যৌন ইচ্ছা অবদমিত হওয়ার ফলে সে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি যথার্থ মনোভাব গ্রহণ করতে পারে না। কারণ সে বিপরীত লিঙ্গ ইচ্ছা অবদমন করেছে। এর জন্যও তার আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দেবে। অর্থাৎ একজন পুরুষ যথাযথভাবে সক্রিয় ভূমিকা এবং একজন নারী যথাযথভাবে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা ভোগ করতে পারবে না।

যে কোন অবদমনের ফলে অবদমিত ইচ্ছাটি অবচেতন (Unconscious) মনে আশ্রয় লয়। এই অবদমন ক্রিয়ার ফলে একজন মানুষের মধ্যে দেখা দেয় নানা দ্বন্দ্ব (Conflict),  তার মানসশক্তির অপচয় ঘটতে থাকে, মানসিক স্বাস্থ্যের হয় অবনতি। যে মানুষের মধ্যে বিপরীত লিঙ্গ ইচ্ছা নিজের স্বাভাবিক লিঙ্গ বোধকে পরাভূত করে তীব্রভাবে দেখা দেয় সেখানে তা প্রকাশের জন্য যৌন বিকৃতির পথ অবলম্বন করে— উদ্ভূত হয় সমকামিতা, বিপরীত লিঙ্গ সজ্জা (Transvestism) ইত্যাদি। এই অবস্থার মধ্যে ব্যক্তিত্ব বিকাশ নির্ভর করে তার অন্তর্নিহিত উভয়লিঙ্গতার সুসামঞ্জস্য সমন্বয় ও তার বিকাশের উপর। কারণ প্রত্যেক মানুষই অর্ধনারীশ্বর।

মনুষ্য সভ্যতার আদি লগ্ন থেকেই এই উভয়লিঙ্গতার ঘটনার উপর নানা শারীরিক ও সামাজিক প্রভাব এসে পড়েছে। তবে শারীরিক বিকলতার প্রভাব অপেক্ষা সামাজিক মানসিক ধ্যানধারণাই একে প্রভাবিত করেছে অধিকমাত্রায়। সামাজিক মানসিক বোধসমূহ মানুষের মানসিক ভাবধারায় নানা সমস্যার সৃষ্টি করে। মানুষের উভয়লিঙ্গতাবোধ যেহেতু অবচেতনে মনে গ্রথিত, তাই এই বোধটি মানুষের কাছে রহস্যাবৃত হয়ে আছে। প্রকৃতপক্ষে মানসিক দিক থেকে পুরুষত্ব ও নারীত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনীন ধারণা (Concept) গঠন করা দুঃসাধ্য। শারীরবৃত্ত, মনোবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের দিক থেকে বিচার করে এ সম্বন্ধে সর্বসম্মত ও সাধারণ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব নয়। অনুমান, যুক্তিতর্ক ও বিচারের পক্ষে যা দুর্ভেদ্য সেখানে প্রত্যক্ষ উপলব্ধি একমাত্র পন্থা হয়ে দাঁড়ায়। পুরুষত্ব ও নারীত্ব, অতএব উভয়লিঙ্গতা এই কারণেই বিচার অপেক্ষা অধিকতরভাবে প্রত্যক্ষ উপলব্ধির ক্ষেত্রে পর্যবসিত হয়েছে। তাই এর যথাযথ উপলব্ধির ক্ষেত্রে দার্শনিক, কবি, শিল্পী এবং অতীন্দ্রিয়বাদীদের (Mystic) সহজ বিচরণ। তাঁদের সৃষ্টিকর্ম ও সাধনায় এর উপলব্ধি ও বিকাশ দেখতে পাই। তাঁরা উপলব্ধি করেছিলেন যে উভয়লিঙ্গতার সুসামঞ্জস্য বিকাশ চরম সত্য (Absolute Truth) অথবা আত্মোপলব্ধির (Self realisation) অন্যতম পন্থা। চরম সত্য পুরুষত্ব ও নারীত্বের ঊর্ধ্বে, তা লিঙ্গ বিবর্জিত। সুতরাং সত্যোপলব্ধির জন্য ব্যক্তিত্বের সুসামঞ্জস্য বিকাশের মধ্য দিয়েই নারী পুরুষ ভেদকে অতিক্রম করতে হবে। কিন্তু তা অতিক্রম করতে হলে তার মধ্য দিয়েই চলতে হবে; যেমন কোন প্রান্তর অতিক্রম করতে হলে প্রান্তরের মধ্য দিয়েই যেতে হয়। নারীত্ব ও পুরুষত্ব এবং উভয়লিঙ্গতা পথ মাত্র।

সকল রহস্যাবৃত ঘটনার মধ্যে সহজেই বিকৃতি অনুপ্রবেশের সম্ভাবনা থাকে। মানসিক দিক থেকে স্বাভাবিক উভয়লিঙ্গতাবোধেও নানা কারণে বিকৃতি দেখা দেয়। কোন মানুষ পথ অতিক্রম করতে গিয়ে যদি পথের মোহে পথেই আবদ্ধ হয়ে থাকে তাহলে তার আর পথ অতিক্রম করা হয় না। তখন বিকৃতি দেখা দেয়। উভয়লিঙ্গতার প্রবণতায় এইভাবে বিকৃতি অনুপ্রবেশ করে। তখন হয় ব্যক্তিত্বের চরম দুর্দশা ও লাঞ্ছনা। একদল স্বার্থান্বেষী মানুষ ব্যক্তিমানুষের এই দুর্দশা ও বিকৃতিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির পথ অবলম্বন করে। যৌন বিকৃতি হয়ে দাঁড়ায় ব্যবসার উপকরণ।

.

কিছু কথা : পুরুষ; যৌনকর্ম, সমকামিতা

রঞ্জন ও পবন*

পেশা হিসাবে যৌনকর্ম পৃথিবীর আদিমতম জীবিকাগুলির একটি। প্রসঙ্গ যখন পুরুষ যৌনকর্মী তখন যৌনকর্মী হিসাবে পুরুষের ভূমিকা পাঠকবর্গের কাছে কিছুটা স্পষ্ট হওয়া দরকার। আজকের সমাজে যে সব পুরুষ যৌনকর্মী দেখা যায় প্রাথমিকভাবে তারা দুই শ্রেণিভুক্ত। একধরনের যৌনকর্মী যারা মহিলাদের সঙ্গে যৌনকর্ম করে জীবিকা নির্বাহ করেন আর অন্যরা পুরুষদের সঙ্গে। এছাড়াও আরও এক ধরনের যৌনকর্মী আছেন যারা নারী ও পুরুষ উভয়ের সঙ্গে যৌনকর্মে লিপ্ত হন।

আমরা সেইসব পুরুষ যৌনকর্মীদের সম্পর্কে আলোচনা করব যারা পুরুষদের সঙ্গে যৌনকর্মে জীবিকা নির্বাহ করেন। এই ধরনের পুরুষ যৌনকর্মীদের মধ্যেও শ্রেণিভেদ করা যায়। দুইটি বিষয়ের ভিত্তিতে এই শ্রেণিভেদ করা যেতে পারে। প্রথমতঃ যৌনতার ভিত্তিতে— এইভাবে যে দুই ধরনের যৌনকর্মী আমরা দেখতে পাই তাদের একদল কেবলমাত্র পুরুষদের সঙ্গেই যৌনকর্মে লিপ্ত হন। অর্থাৎ যৌনসত্তানুসারে সমকামী যৌনকর্মী। আর অন্যদল কেবল আর্থিক প্রয়োজনেই পুরুষদের সঙ্গে যৌনকর্মে লিপ্ত হন, ব্যক্তিগত জীবনে এরা হয়তো নারী সঙ্গেরই পক্ষপাতী। এদের সমকামিতা সাময়িক, আচরণভিত্তিক এবং জীবিকাকেন্দ্রিক ব্যাপার।

দ্বিতীয়ক্ষেত্রে আর্থসামাজিক পরিকাঠামো অনুসারেও এক ধরনের শ্রেণি বিভাগ করা যায়। এই আর্থসামাজিক পরিকাঠামোর ভিত্তিতে যে ক’প্রকার যৌনকর্মী দেখা যায় তাদের একটি দল আসে সম্ভ্রান্ত অবস্থাপন্ন পারিবারিক পরিমণ্ডল থেকে। যাদের কাছে যৌনকর্ম হাতখরচ উপার্জনের একটি সহজ ও অতিরিক্ত উপায়। দ্বিতীয় পর্যায়ে দেখা যাক আর্থিক অনটন ও সমকামুক সত্তার সমন্বয়ে যৌনকর্মকে জীবিকা হিসাবে গ্রহণ করা। তৃতীয় ক্ষেত্রের যৌনকর্মীর অধিকাংশই অল্পবয়সী এবং অবস্থাপন্ন পরিবার থেকে আসা। যারা যৌনকর্মের বিনিময়ে নগদ টাকা নয় আশা করে থাকে মূল্যবান উপহার সামগ্রী!— এ ধরনের ব্যক্তিত্বকে যৌনকর্মীদের পর্যায়ভুক্ত করার মতো যথেষ্ট কারণও আছে। আজকের বস্তুপ্রীতির সময়কালে ব্যক্তির বস্তুকেন্দ্রিক চাহিদা যেভাবে ক্রমবর্ধমান সেখানে অর্থের অভাবে ব্যক্তি খুঁজতে থাকে ওই চাহিদাগুলি পূরণের যেনতেন উপায়। পাশাপাশি সমকামী জগতের নানা অনিশ্চয়তা যখন কোনো কোনো পূর্ণবয়স্ক ও পরিণত মানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তির মধ্যে জাগিয়ে তোলে নিরাপত্তাবোধের চরম অভাব তখন এই দুই ধরনের ব্যক্তির মধ্যে গড়ে ওঠে দেওয়া নেওয়ার এমন একটি সম্পর্ক যার প্রকৃত স্বরূপ হল বিশেষ কিছু যৌন আচরণের মাধ্যমে একজনের হার্দিক ও শারীরিক চাহিদা পূরণ এবং বিনিময়ে অন্যজনের বস্তুগত চাহিদা পূরণ এবং বিনিময়ে অন্যজনের বস্তুগত চাহিদা মিটিয়ে নেওয়া।

‘যৌনকর্মের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন’-ই যদি জীবিকা ”যৌনকর্মের” সংজ্ঞা হয় তবে এরা কোনোভাবইে যৌনকর্মী হিসাবে বিবেচ্য হবে না। কিন্তু যদি মানসিকতার দিক থেকে বিচার করা হয় তবে জীবিকা হিসাবে যৌনকর্মকে গ্রহণ করা বা আবিষ্কার করার পিছনে তথাকথিত যৌনকর্মী এবং এদের মানসিক ভাবধারা এক। পাঠকমণ্ডলীর কাছে বিষয়টি আও একটু স্পষ্ট হয় যদি মহিলা যৌনকর্মীদের উদাহরণ দেওযা যায়। আজকাল এমন অনেক মহিলা দেখা যায় যাঁরা সম্ভ্রান্ত সচ্ছল পরিবারের সদস্যা হয়েও যৌনকর্ম’-কে বেছে নিচ্ছেন একটি অতিরিক্ত উপার্জনের উপায় হিসাবে। এমন দৃষ্টান্ত আমরা চোখ কান খোলা রাখলে প্রচুর দেখতে পাই। এঁরা কি যৌনকর্মী নন? এঁরাও। কারণ, ওই অতিরিক্ত অর্থ ব্যবহার করেন নানা অন্যান্য চাহিদা পূরণের জন্যই। একই কথা খাটে পুরুষ যৌনকর্মীদের ক্ষেত্রে।

কাউন্সেল ক্লাব— সমকামীদের এমন একটি সংগঠন যেখানে সমকামী পুরুষ, নারী, উভকামী বা সমকামিতা বিষয়ে সচেতন ও বোদ্ধা যে কোনো ব্যক্তিত্বকেই আহ্বান জানানো হয়। উদ্দেশ্য, ‘সমকামিতা’— বিষয়টিকে বৃহত্তর সমাজের চোখে সহজ, স্বাভাবিক এবং গ্রহণযোগ্য হিসাবে তুলে ধরা। পাশাপাশি ব্যক্তিকে নিজের যৌনতা সম্পর্কে সচেতন করা। নিজের যৌনতা নিয়ে হীনমন্যতা বা অপরাধবোধ নয় বরং ব্যক্তিজীবনের আর পাঁচটা স্বাভাবিক সত্তার মতোই মেনে নেওয়া। একই সাথে, বৃহত্তর সমাজ ‘সমকামিতা’-কে যে নজরেই দেখুক সমকামী ব্যক্তিত্বদের মধ্যে একটি সংযোগ ও সমন্বয় সাধন করে পরস্পরকে পরস্পরের পাশে দাঁড়ানোর প্রেরণা দেওয়া এবং একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বনির্ভরশীল পরিসর গড়ে তোলাও কাউন্সেল ক্লাব নামের এই সাপোর্ট গ্রুপের একটি প্রধান উদ্দেশ্য।

এ হেন সংগঠনেই বৈচিত্রপূর্ণ রুচি, রুজি ও সংস্কৃতি সম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের আসা যাওয়া। সাপোর্ট গ্রুপ হিসাবে কাজ করতে গিয়ে এখানে যে সমকামী পুরুষ যৌনকর্মীরও যে আগমন ঘটতে পারে সেকথা এই সংস্থা গড়ে ওঠার প্রাক্কালে কেউই কখনো ভাবেনি। বিশেষত যে পাঁচ ছয়জনকে নিয়ে কাউন্সেল ক্লাবের পথ চলা শুরু তাদের মধ্যে আপাতভাবে কেউই যৌনকর্মী ছিলেন বলে জানা যায় না। সমমানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের একটি বন্ধুচক্র গড়ে তোলার পরিকল্পনায় ভবিষ্যতে কি কি ধরনের ব্যক্তিত্বের আগমন ঘটতে পারে তা অগ্রিম জানা ছিল না বা জানা সম্ভবও ছিল না। পরবর্তীকালে সংস্থার পরিসর বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃদ্ধি পেয়েছে সদস্য সংখ্যা। সেইসব সদস্যদের আর্থ সামাজিক পটভূমিকাও বৈচিত্রপূর্ণ। এভাবেই প্রথমদিকে এ ধরনের ব্যক্তিকে সদস্যপদ আদৌ দেওয়া হবে কিনা সে বিষয়ে প্রবীণ সদস্যদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি হলেও পরে সদস্যপদ যে কোনো পটভূমিকা নিরপেক্ষ রাখারই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অতএব যে সব আর্থ সামাজিক পটভূমিকা থেকে বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব কাউন্সেল ক্লাবে এসেছেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ পুরুষ যৌনকর্মীও আছেন।

এখন, যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে সামনে এসে পড়ে তা হল, এ ধরনের সাপোর্ট গ্রুপে যৌনকর্মীর আসার উদ্দেশ্য? তারা সংগঠনের কাছে কি আশা করে? কেবলমাত্র বন্ধুদের সহযোগিতা সহমর্মিতা না পাশাপাশি তাদের ব্যাবসায়িক উদ্দেশ্যও এখানে কাজ করে। এ বিষয়ে গ্রুপের মধ্যে তেমন কোনো আলোচনার অবকাশ প্রসঙ্গ বা সুযোগ কোনোটাই ঘটেনি। এর কারণ, এটা যেহেতু ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিষয় সেহেতু এ ব্যাপারে গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ কেউ যদি তার ব্যবসায়িক স্বার্থসিদ্ধ করেও সেটা এতটাই ব্যক্তিগত এবং গোপনীয় ব্যাপার যে সেখানে নজর দেওয়া অনধিকার চর্চা করা হতে পারে। তবে চিন্তার ব্যাপার এটাই যে সংস্থায় অন্যান্য সদস্যরা যৌনকর্মে জীবিকা নির্বাহ ব্যক্তির সদস্য হিসাবে উপস্থিতি জানতে পারলে কি প্রতিক্রিয়া হতে পারে। তবে সাধারণভাবে বলা যেতে পারে এই সংস্থা প্রথম থেকে বিগত পাঁচ বছর যাবৎ যে ধরনের মুক্ত মানসিকতা নিয়ে পথ চলেছে সেই ধারাবাহিকতায় ও অভিজ্ঞতার আজকের দিনে কখনোই কোনো বিষয়ের ওপর কোনো রকম আদর্শবাদিতা বা মূল্যবোধ চাপানো হয় না। কারণ, জীবিকার বাইরে একজনও সমকামী পুরুষ যৌনকর্মীও সমকামী সমাজের একজন এবং সংখ্যালঘুত্বের শিকার, তার সামাজিক স্বীকৃতি, নিশ্চয়তা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি বিষয়েও ভাবনা চিন্তার অবকাশ থেকেই যায়। অতএব সাপোর্ট গ্রুপ হিসাবে এদেরকে আর পাঁচজনের মতোই গুরুত্ব ও সম্মান দেওয়া বাঞ্ছনীয়।

সমগ্র বিষয়টিকে আমরা তিনটি দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করতে পারি। যেমন, আদর্শবাদী মূল্যবোধ, সংস্থার নীতি এবং বাস্তববাদ। আদর্শবাদী মূল্যবোধে অবশ্যই আপাতভাবে মনে হয় যে সমকামিতাকে যৌনকর্ম বা জীবিকা হিসাবে গ্রহণ করা সামাজিক অপরাধ; কেন অন্য কোনো জীবিকা নয়? আসলে এই কথা যখনই বলছি এখনই নিজের অজান্তেই সমকামিতাকে একটু নীচু নজরে দেখে ফেলছি। আর সমস্যাটা দাঁড়াচ্ছে সেখানেই। এখন সমকামিতাকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করা আরও হীন, লজ্জাকর, অপরাধ ইত্যাদি ইত্যাদি। যেটা ভুলে যাচ্ছি সেটা হল, এখানে সমকামিতা পেশা নয়, পেশা হল একটি বিশেষ আচরণের মাধ্যমে যৌনবাসনা মেটানো এবং সেই আচরণটা সমকামী আচরণ। অতএব, এখনো আদর্শবাদিতা বা মূল্যবোধ প্রয়োগের সুযোগ থাকে না।

সংস্থার নীতি নিয়ে আগেই আলোচনা করেছি। এখন বাস্তবের দিকে তাকালে দেখব সমকামী পুরুষ যৌনকর্মী আছেন এবং থাকবেন। সংস্থার এমনই এক সদস্যের সাথে এ ব্যাপারে আলোচনা করে জানা গেল আর পাঁচজনের মতো তার জীবনেও সমকামিতা এসেছিল, কৈশোরে অজান্তে। তখন সমকামিতা সম্পর্কে কোনো ধারণাই তার গড়ে ওঠেনি। যে সময়ে সমকামী আচরণ তার কাছে যৌনক্রীড়া ব্যতীত অন্য কিছু বলে মনে হয়নি। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা এই যুবক যখন একসময়ে বাইরের জগতে চোখ মেলে, যখন তার সমকামিতা স্কুলের বন্ধুদের গণ্ডি ছেড়ে চলে আসে সমাজের বৃহত্তর পরিসরে। সে খুঁজতে থাকে সমমানসিকতা সম্পন্ন বন্ধু, পথে ঘাটে বাসে ট্রামে পার্কে, এমনকি পাবলিক টয়লেটেও। আর সেই খোঁজাতেই পায় এমন এক সঙ্গ যা তার হাতে তুলে দেয় নগদ টাকা— অভাবী হাতে এ টাকার মূল্য অনেক। এভাবেই উপার্জনের শুরু। সমকামিতা যখন এক অভ্যন্তরীণ সত্তা তখন সমমানসিকতার মানুষকে সঙ্গ দিয়ে ভালবাসা দিয়ে আর কিছু মুহূর্তের সুখ দিয়ে অর্থ উপার্জনের কোনো অন্যায় সে দেখতে পায়নি কখনোই। তাই আজ একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় প্রতিষ্ঠিত পদে চাকুরিরত প্রায় ৩০-এর এই যুবকর অতীতের জীবিকা নিয়ে না আছে কোনো অপরাধবোধ না আছে কোনো অনুশোচনা। তার কথায়, যে ব্যক্তি ভালবাসা, সুখ পেতে চায় পয়সার বিনিময়ে তার জন্যে কিছু করতে অপরাধ কোথায়? আর তেমন ব্যক্তি পরে বন্ধুর ভূমিকাই নির্বাহ করে থাকেন। পাশাপাশি নিজের ইচ্ছায় এটাকে জীবিকা হিসাবে গ্রহণ করলে অপরাধবোধ জাগার সুযোগ কোথায়! এর সমান্তরালে আরও একটা মানসিকতা কাজ করে থাকে। সেটা হল নিজের প্রতি অন্যকে আকর্ষিত করা বা অন্যের উপর নির্ভর করার মতো একটি স্বতঃস্ফূর্ত চাহিদাও অজান্তে সমকামী ব্যক্তিকে করে তোলে যৌনকর্মী।

যৌনকর্ম যখন পেশা তখন ছিনতাইবাদী বা গুণ্ডামি না করে তাকে পেশাদারি চালে প্রয়োগ করা হয় না কেন? এ প্রশ্নের যা উত্তর পাওয়া গেল, আজকের আর্থ সামাজিক পরিস্থিতিতে সমকামী যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হবার ক্ষেত্রে অনেক অসুবিধা দেখা যায়। তার প্রথম দুটি বিষয় হল নিরাপদ জায়গা ও সময়। সেইসঙ্গে সীমিত সংখ্যক খদ্দের (গ্রাহক) সীমিত, কারণ অর্থের বিনিময়ে সমকামী যৌনকর্মে লিপ্ত হবার মতো ব্যক্তির সংখ্যা হাতে গোনা যায়। এর অনেক কারণও আছে। সেগুলির একটি অবশ্যই আর্থিক সচ্ছলতা। অন্য একটি কারণ সত্যিই ভাববার মতো তা হল সাধারণভাবে সমকামী যৌনআচরণের প্রতি ব্যক্তির মনে এমন একটি অপরাধবোধ কাজ করে যা ব্যক্তিকে হীনম্মন্যতায় ভোগায় এবং দুর্বল করে ফেলে। যার সুযোগ নেয় যৌনকর্মীররাও। আবার এটাও ঠিক একই ব্যক্তি যে আবার ওই একই যৌনকর্মীর কাছে ফিরে আসবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে যৌনকর্মীরাও একবারে বড়কোপ মারার চেষ্টা করে। একই সাথে যৌনকর্মীর সংখ্যা যে হারে বাড়ছে তাতে সমাজের এই বিশেষ পরিসরে প্রতিযোগিতা বাড়ছে দ্রুততালে। সঙ্গে আছে পুলিশের এবং সাধারণ ছিনতাইবাজ ও গুণ্ডাদের অত্যাচার। এভাবেই সৃষ্টি হয় নিরাপত্তার অভাব।

কাউন্সেল ক্লাবের এই সদস্যের কথায়, এ ধরনের সাপোর্টগ্রুপে যেটা পাওয়ার আশা থাকে তা হল অকৃত্রিম সহমর্মিতা। তবু সমাজের এই বিশেষ ক্ষেত্রটিতে কাউন্সেল ক্লাব নিজের উদ্যোগে তেমন কোনো কাজ করতে পারেনি। সংস্থার কয়েকজন ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন যৌনকর্মীদের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করলেও সামগ্রিক ভাবে সে প্রয়াস এতটাই সীমিত যে সংস্থাগত দৃষ্টিভঙ্গিতে সেগুলি ততটা ফলপ্রদ হয়ে উঠতে কখনোই পারেনি। এর প্রধান কারণ, এরা যে আর্তিক চাহিদা নিয়ে আমাদের চারপাশে ঘোরাফেরা করেন তা পূরণ করার মতো সামর্থ্য আমাদের সংস্থার নেই। যেখানে ফাঁক থেকে গেছে তা হল সমাজের এই বিশেষ স্তরটিতে পৌঁছে সমাজে এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি। আগামী দিনগুলিতে সেই প্রয়াসের কথা মাথায় রেখে আমাদের পথ চলা প্রয়োজন।

.

এইচ-আই-ভি/এইডস, পুরুষ যৌনকর্মী ও আমাদের দায়িত্ব

দীপ পুরকায়স্থ*

এখনও বহুমানুষ আছেন যারা আমাদের দেশে পুরুষে পুরুষে যৌনসংসর্গের অস্তিত্বকে স্বীকার করেন না, তাদের মতে, পুরুষদের মধ্যে সমকামিতা একটা ”বিজাতীয়” ধারণা যা ভারতবর্ষে অচল। এই পরিপ্রেক্ষিতে পুরুষ দেহ ব্যবসায়ীদের অস্তিত্বকেও ”পাগলের কল্পনা” বলে উড়িয়ে দেওয়াটাই প্রথা। ”এদেশে ওসব হয় না”— জাতীয় মন্তব্যে সত্যকে অস্বীকার করার প্রবণতার জেরে সংগুপ্ত থেকে যায় পুরুষে পুরুষে যৌনসংসর্গের এক ছায়া নিবিড় জগৎ সেই জগতের খোঁজ পাওয়া যায় না বইয়ের পাতায় বা সিনেমার পর্দায়। পুরুষের প্রতি পুরুষের সেই কামনা, বাসনা, রতিক্রীড়ার জগৎ-এর সন্ধান শুধু তারাই দিতে পারেন যারা সেই অদৃশ্য জগৎবাসী আর বোধহয় আমাদের মতো কিছু মানুষ, যাদের কার্যসূত্রে উদ্ঘাটিত করতে হয় সেই বিশাল দূরপ্রসারী সমকামী পুরুষদের অতীব সক্রিয় ”নেটওয়ার্ক” গুলিকে।

অন্যান্য বহু দেশের মতোই ভারতবর্ষের যৌনতার চিত্র আঁকতে গেলে আমাদের সমকামিতার স্বরূপকেও জানতে হবে। কারণ সমকামিতা আমাদের সমাজে শুধু যে আছে তাই নয়, সেই প্রাচীন কাল থেকেই আছে এবং উল্লেখযোগ্য ভাবেই টিকে আছে সমাজের চোখের আড়ালে আবডালে। সমকামের এই বিপুল চাহিদা অনেকাংশেই পূরণ হচ্ছে যৌনবাণিজ্যের মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ, অন্য পুরুষদের, টাকার বিনিময়ে যৌন সঙ্গ দেবার জন্য পুরুষ যৌনকর্মীরাও দাঁড়িয়ে থাকছেন পার্কের ধারে, রাস্তার মোড়ে, রেলের প্ল্যাটফর্মে অথবা সর্বজনীন শৌচালয়ের আশেপাশে গভীর রাত অবধি ভাড়া করা হোটেলের ঘরে বা ধনী খদ্দের এর গাড়িতে, কখনো উন্মুক্ত পার্কের অন্ধকারে বা নির্জন ট্রেনের কামরায় সর্বশ্রেণির, সর্বজাতির পুরুষদের যৌনক্ষুধা মেটাতে তারা ব্যাপৃত।

আমাদের দেশে পুরুষে পুরুষে যৌনসংসর্গ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণে নিন্দিত, লাঞ্ছিত ও দণ্ডনীয়। সেই কারণেই এই জৈবিক প্রবৃত্তি বন্দী হয় গোপনীয়তার ঘেরাটোপে। এই গোপনীয়তা, এই অন্ধকারের আড়ালের হয় না ভারতীয় পুরুষদের যৌনজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক-এর উপর। আজ যখন ভারতবর্ষ, এশিয়াতে এইডস মহামারির কেন্দ্র হয়ে উঠছে। সে সময় পুরুষ পুরুষে যৌনসংসর্গকে উড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতার মধ্যে সুপ্ত থেকে যায় মৃত্যুর ছায়া। কারণ সমকামে লিপ্ত পুরুষদের মধ্যে পায়ুসঙ্গম অন্যতম জনপ্রিয় যৌনআচরণ, আর অসুরক্ষিত পায়ুসঙ্গমের মধ্যদিয়েই এইডস-এর ভাইরাস বা এইচ আই ভি সংক্রমণের এর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

বিশ্বজুড়ে এইচ-আই-ভি পসিটিভ মানুষদের মধ্যে ৫-১০% মানুষ পুরুষে পুরুষে যৌন আচরণের মাধ্যমেই আক্রান্ত হয়েছেন। উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও পশ্চিম ইয়োরোপে আবার ৭০% ই পুরুষে পুরুষে যৌন আচরণ দ্বারা আক্রান্ত। মুম্বই এর ”গে” আন্দোলনের পুরোধা ও বম্বে দোস্ত পত্রিকার সম্পাদক অশোক রাও কবি’র মতে ভারতবর্ষেও এইচ আই ভি সংক্রমণের একটা উল্লেখযোগ্য মাধ্যম হল পুরুষে পুরুষে যৌনসংসর্গ। রাও কবি বলেন ভারতবর্ষে এখনও এইচ আই ভি পসিটিভ মানুষদের মধ্যে পুরুষ মহিলার অনুপাত ৩২ : ১। এইরকম পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে এটা মনে করা অসমীচীন নয় পুরুষদের মধ্যে একটা উল্লেখযোগ্য অংশে পুরুষে পুরুষে যৌনসংসর্গের ফলেই আক্রান্ত। রাও কবির এই মত যদি মেনে নিই তাহলে, আমাদের যথেষ্ট দুশ্চিন্তার কারণ আছে। পুরুষে পুরুষে যে যৌনসংসর্গ হয়, এই স্বীকৃতির অভাব বা পুরুষে পুরুষে যৌনসংসর্গের ব্যাপারটি নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তি, এইচ আই ভি প্রসারের এই অন্যতম মাধ্যমকে নিরাপদ করার প্রচেষ্টায় বাধা সৃষ্টি করছে। এর ফল হতে পারে মারাত্মক।

এইডসের সেই মারক আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরুষ যৌনকর্মীরা। তার মধ্যে একটা বিরাট অংশ নিম্ন মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে আগত। অনেকেই বিবাহিত এবং তাদের সংসার চলে এই যৌনব্যবসার টাকায়। আজকের এই ব্যাপক বেকারি ও কর্মহীনতার যুগে অন্য কোনো কর্মসংস্থানও তাদের পক্ষে অসম্ভব। সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কারণে প্রান্তিক এই মানুষগুলি, অর্থনৈতিক ভাবেও পিছিয়ে পড়া। শুধু প্রান্তিকতাই নয়, এইসব যৌনকর্মীরা তাদের যৌনতা ও লিঙ্গচেতনার জন্যও অনেক বেশি ঝুঁকির সম্মুখীন।

এই যৌনকর্মীদের অসহায়তাকে বুঝতে হলে বুঝতে হবে তাদের যৌনতার কথা। বুঝতে হবে তাদের একটা স্বতন্ত্র লিঙ্গচেতনার প্রকাশ-কে।

যেসব পুরুষেরা অন্য পুরুষদের সাথে যৌন সংসর্গ করেন (যাদের ইংরাজিতে Males who have sex with males বা MSM বলা হয়) তারা তাদের নিজেদের সবসময় সমকামী বা উভকামী হিসাবে দেখেন না। অনেকেই নিজেদের বিপরীতকামী মনে করেন। MSM নেটওয়ার্কের একটা নাতিক্ষুদ্রঅংশ আবার এ ধরনের কোনো নাম ব্যবহার করার পক্ষপাতী নন।

তবুও ভারতীয় MSM নেটওয়ার্কের মধ্যে নিজেদের একটা যৌনসংজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত করার তাগিদ পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু সেই সংজ্ঞা কখনোই পাশ্চাত্যের ডাক্তারি শাস্ত্রের সমকামী, বিপরীতকামী, উভকামী বা লিঙ্গরূপান্তরকামী ইত্যাদি অভিধার অনুসারী নয়। আমারা দেখেছি, যে ভারতবর্ষের MSM নেটওয়ার্কগুলির বেশিরভাগ মানুষের কাছে, তাদের যৌনসংজ্ঞা, যৌনসঙ্গীর দৈহিক লিঙ্গ বা Sex-এর চেয়ে তাদের মানসিক লিঙ্গ বা Gender-এর উপর নির্ভর করে বেশি।

সাধারণত যৌন আচরণের সময়ে যে পুরুষ তার যৌনসঙ্গীর পায়ুতে বা মুখে লিঙ্গ প্রবেশ করান, তারা নিজেদের যৌনসংজ্ঞা এই ”সক্রিয় পুরুষোচিত” আচরণের দ্বারাই নির্ধারণ করেন। এর বিপরীতে, যারা তাদের পায়ুতে বা মুখে সঙ্গীর লিঙ্গ গ্রহণ করেন তাদের আচরণ ”নিষ্ক্রিয় এবং মহিলাসুলভ” বলেই মনে করা হয়। বেশিরভাগ যৌনকর্মীরা এই শেষোক্ত শ্রেণিরই অন্তর্গত। এরাই ”কোতি” বা ”ধুরানী” এই নামের মধ্য দিয়ে নিজেদের যৌনসত্তাকে অভিহিত করেছেন।

তবে কোতি বা ধুরানী নির্ধারণের মাপকাঠি সবসময়েই শুধু যৌন আচরণের মানদণ্ডে বিচার করা যায় না। ধুরানী সমাজে ওইরকম অনেকে আছেন, যারা যৌন আচরণ এর সময়ে সক্রিয় ভূমিকা নেন বা নিতে ভালবাসেন। তাই বৃহত্তর অর্থে ধুরানী বলতে MSM  নেটওয়ার্কের সেই অংশকে আখ্যাত করা হয় শারীরিক বা মানসিক সম্বন্ধ স্থাপনের ক্ষেত্রে নিজেদের নারীভাবে প্রকাশ করতে পছন্দ করেন। ধুরানীরা তাই দৈহিক লিঙ্গ-এর দিক থেকে পুরুষ কিন্তু মানসিক লিঙ্গ-এর দিক থেকে নারী বা প্রকৃতি ভাব সম্পন্ন। এই কারণেই পুরুষ যৌনকর্মী আর নারী যৌনকর্মীদের পরিস্থিতিগত কিছু মিল আছে। এইডস-এর মহামারির প্রেক্ষিতে, তাঁরা নিজেদের ঝুঁকি কমিয়ে আনতে পারেন যৌনসঙ্গীর সংখ্যা কমিয়ে এনে বা যৌনসঙ্গমের সময়ে কণ্ডোম-এর ব্যবহার করে।

যৌনকর্মী বলেই উভয় গোষ্ঠীর পক্ষে যৌনসঙ্গী বা খদ্দেরদের সংখ্যা কমানো সম্ভব হয়ে ওঠে না। তেমনি সম্ভব হয় না খদ্দেরদের কন্ডোম পরতে বাধ্য করানো। খদ্দেররা কন্ডোম পরতে চান না কারণ এতে নাকি ‘আরাম’ হয় না। কেউ বেশি জোরাজুরি করলে সেই খদ্দের অন্য কারও কাছে চলে যেতে পারে এই ভয় স্ত্রী পুরুষ উভয়েরই।

পুরুষ যৌনকর্মীদের সমস্যা কিন্তু অন্য দিক দিয়ে দেখতে গেলে বেশ কিছুটা স্বতন্ত্র। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ দফা মোতাবেক সমকামী যৌন আচরণ, যেমন পায়ু বা মুখমৈথুন অপরাধ, প্রত্যেকটি পুরুষ যৌনকর্মী তাই প্রতিদিনই ভাঙছেন ৩৭৭ দফার এই আইন। এই আইনের জুজু দেখিয়েই পুলিশ বাহিনীর হাতে তুলে দিতে হচ্ছে ”হপ্তা” অথবা অর্থের অভাবে যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হতে হচ্ছে ইচ্ছার বিরুদ্ধে। অনেক সময় দল বেঁধে আসা খদ্দেরদের দ্বারা ধর্ষণের ঘটনা ঘটে যায়। পুরুষের দ্বারা পুরুষের এই গণধর্ষণের স্বীকৃতি নেই ভারতীয় দণ্ডবিধিতে, সুতরাং ধর্ষণের কোন প্রতিকারও নেই। এইচ আই-ভি, এইডসের প্রসার রোধে, সচেতনতা বৃদ্ধির সাথে সাথে আশু জরুরি আইনের চোখে পুরুষ যৌনকর্মীদের মানব অধিকার প্রতিষ্ঠা।

পুরুষ যৌনকর্মীদের মধ্যে এইচ আই ভি এইডসের সংক্রমণ রোধ করতে চাই প্রাথমিকভাবে পুরুষে পুরুষে যৌনসংসর্গ নিয়ে অস্বীকার আর অস্বস্তির পরিবেশের পরিবর্তন। তার সমান্তরাল ভাবে দরকার ভারতীয় দণ্ডবিধিকে যুগোপযোগী করা।

পুরুষে পুরুষে যৌনসংসর্গের মাধ্যমে এইচ আই ভি’র সংক্রমণ সম্বন্ধীয় কোন নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের অভাব ও পদে পদে বিঘ্নিত করে পুরুষ যৌনকর্মীদের জন্য পরিকল্পিত চলতি স্বাস্থ্য কর্মসূচিগুলিকে। এছাড়াও স্বাস্থ্য পরিষেবাগুলি অনেকাংশে পুরুষ যৌনকর্মীদের হাতের বাইরে থেকে যাচ্ছে।

তবে একদিকে যেমন পুরুষে পুরুষে যৌনসংসর্গের বিষয়টিকে সুস্থ আলোচনার পরিসরে আনতে হবে তেমনই জাতীয় এইডস প্রতিরোধ কার্যক্রমগুলিকেও পুরুষে পুরুষে যৌনসংসর্গের বিষয়টিকে সুস্থ আলোচনার পরিসরে আনতে হবে। যা আগামীদিনে ইতিবাচক ভূমিকা নেবে।

.

পুরুষের যৌনপেশা : টুকরো কথা

ডঃ জে. বি. মুখার্জী*

বয়েস হয়েছে অনেক। এখন আর আগের মতো ছুটে কাজ করতে পারি না। শরীরও খারাপ। তবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মর্গ সংস্কার কমিটির চেয়ারম্যান হওয়ার কারণে একটু-আধটু বেরোতে হচ্ছে। এ নিয়ে ভাবনা-চিন্তাও করতে হচ্ছে অনেক। ফলে আগের মতো না হলেও, এখনো আমি ব্যস্ত। এই ব্যস্ততার মধ্যে অজয় ও নিলয়ের অনুরোধ, পুরুষ যৌনকর্মীদের উপর কিছু লিখতে হবে। ওদের খুব স্নেহ করি। এমন একটা বিষয় নিয়ে ওরা কাজ করছে, সে-ব্যাপারে আমাদের জ্ঞান খুব সীমিত। আমি এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ নই। তবে মনোবিজ্ঞান ও অপরাধতত্ত্বের নানা শাখায় কাজ করতে গিয়ে ওদের সন্ধান পেয়েছি। পুরুষ যৌনকর্মীরা যে আছে সেটাই আমরা জানি না। আর তাছাড়া ওদের সম্বন্ধে অনেক ভুল ধারণা ও আমাদের মধ্যে আছে. এ’সম্পর্কে কিছু বলা কর্তব্য বলে মনে করছি। তাই এই অনুরোধে সাড়া দিতে হল।

১৯৬২ সালে ইংল্যান্ডের হার্ডফোর্ডশায়াররের এক মানসিক রোগের হাসপাতালে গবেষণার কাজে আমাকে থাকতে হয়েছিল। নানা বয়েসের ১৪০০ রোগী (নারী/পুরুষ) এই হাসপাতালে ভর্তি ছিল। এদের মধ্যে বেশ কিছু সংখ্যক ছিল সমকামী। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভাল যে, পুরুষ যৌনকর্মী সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলেই ‘সমকামিতা’ প্রসঙ্গ এসে যাবে। কারণ এই ধরনের যৌনকর্মীরা কমবেশি সকলেই সমকামী। আবার ফিরে আসি আগের কথায়। এই হাসপাতালেই আলাপ হল ডেভিড স্টমওয়েল (Devid Stoprmwell) এর সঙ্গে। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে লোকটি সুইসাইড করার চেষ্টা করেছিল। এবং অত্যন্ত অসুস্থ অবস্থায় তাকে এই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বিভিন্ন সময় তার সঙ্গে আমার অনেক কথা হয়। তাকে আমি কাউন্সিলিং করি। ডেভিড ছিল একজন ভাল ব্যবসাদার। ব্যবসায় তার খুব মন। অনেক মেয়েই ডেভিডকে ভালবেসে ছিল। কিন্তু ডেভিডের কাউকে পছন্দ হয়নি। এক কম বয়সি কর্মচারীকেই তার ভাল লাগতো। ডেভিডও তাকে দামি উপহার দিত। তার মাইনেও বাড়িয়ে দিল। তাকে নিয়ে নানা জায়গায় সে বেড়াতে যেত। কথা প্রসঙ্গে ডেভিড জানায়, কর্মচারীটির সঙ্গে সে সোডমিতে জড়িয়ে পড়ে। কর্মচারীটি ডেভিডের দুর্বলতা বুঝতে পারে। এরপর নানা ছলে সে ডেভিডের ব্যবসাকে গ্রাস করতে চেষ্টা করে। ডেভিডকে ব্ল্যাক-মেল করা শুরু করে। সবকিছু বুঝে ডেভিড মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বোধ করে। এবং একসময় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। দীর্ঘ চিকিৎসার পর ডেভিড সুস্থ হয়ে ওঠে। এরপর একটি মেয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক হয়। দু’জনে একসঙ্গে থাকা শুরু করে। এই সময় ডেভিড জানায়, মেয়েটির সঙ্গে বিভিন্ন সময় সে সঙ্গমে লিপ্ত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু পুরুষের সঙ্গে পায়ুকামে যে আনন্দ তা সে পায় না। এই কারণে মেয়েটিকে সে বিয়ে করতে রাজি হল না।

ডেভিডের মতো আরও অন্তত দশটি ঘটনার কথা বলতে পারি, সেখানে দেখা যাবে পুরুষ নারীকে ত্যাগ করে পুরুষের সঙ্গে দেহ ও মনের সম্পর্ক গড়েছে। আসলে সমকামিতা এবং কিছু-কিছু ক্ষেত্রে ট্রান্সসেক্সুয়ালিজমকে-এর কারণ হিসাবে ধরা হয়। আবার এই মানসিকতার পেছনে কী কারণ রয়েছে তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে আমার মনে হয়, ‘জিন’ই এর জন্যে দায়ী। জিনঘটিত সমস্যার কারণে এরা পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এবং এক সময় ‘মেল কমার্শিয়াল সেক্স ওয়ার্কার’ বলে পরিচিত হয়।

আমাদের দেশে অধিকাংশ হিজড়ে যৌনকর্মকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে। ফলে দেশে এরা এক ধরনের যৌনকর্মী। এরা পুরুষ, কিন্তু পুরুষাঙ্গ কেটে ফলে নিজেদের জন্ম যৌন প্রতিবন্ধী বলে পরিচয় দেয়। এদের মধ্যে শিক্ষিতের সংখ্যা খুব কম। এদের সাংস্কৃতিক মানও খুব নীচু। হিজড়েরা ছাড়াও বহু পুরুষই আছে যারা দেহব্যবসাকে পেশা হিসাবে নিয়েছে। এরা পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলে না। আবার হিজড়ে সেজেও থাকে না। ভারতের বিভিন্ন শহরে খুব গোপনে এরা ব্যবসা চালায়। এরা স্বেচ্ছায় এই ব্যবসায় এসেছে। আসলে এরা ট্রান্সসেক্সুয়াল বা হোমসেক্সুয়াল।

হিজড়েদের সঙ্গে সাধারণ পুরুষ যৌনকর্মীদের নানা ব্যাপারে অনেক পার্থক্য। কিন্তু যেহেতু এদের মানসিকতা এক, সেহেতু পুরুষ যৌন ব্যবসার স্বরূপ বুঝতে গেলে, পুরুষ যৌনব্যবসার সঙ্গে যুক্ত সব মানুষদের সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা দরকার। ইউরোপ, আমেরিকার হিজড়ে বলে কিছু নেই। তবে ওখানে ট্রান্সসেক্সুয়াল ও হোমোসেক্সুয়াল আছে। ১৯৭৮ সালে আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হিজড়েদের উপর একটি গবেষণা পত্র পাঠ করবার জন্যে গিয়েছিলাম। ‘হিজড়ে-কমিউনিটির’ কথা জানতে পেরে বিদেশি গবেষকেরা বিস্মিত হয়ে যান। তার উপর একটা কথা। হিজড়েদের এই অঙ্গচ্ছেদন যে ‘ট্রান্সসেক্সুয়াল মেন্টালিটি’র কারণে হচ্ছে তা বুঝলে অবশ্য অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। আমাদের দেশে সমাজের একেবারে নিচুতলার ট্রান্সসেক্সুয়াল মানুষরা হিজড়ে হয়ে যায়। এবং দেহব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়। বিদেশে এরাই অন্যভাবে কাজ করে।

পুরুষ যৌনকর্মী এবং হিজড়েদের সমস্যাকে গুরুত্ব সহকারে ভাবতে হবে। কারণ আমাদের উপেক্ষায় এই নিরাপরাধ মানুষরা এক সময় অপরাধ জগতের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।

.

প্রসঙ্গ পুরুষযৌনকর্মী— কয়েকটি প্রশ্ন!

অসিত দাস*

ধরে নেওয়া যাক ছেলেটির নাম সুমিত, বয়স ১৯/২০ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা ছিপছিপে সুদর্শন এই ছেলেটির স্বপ্ন অন্তত একটি স্নাতক ডিগ্রি। যাতে যে এ একটা চাকরি যোগাড় করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। এই পড়াশুনো, বই-খাতা-কলম টিউটরের খরচ চালানোর জন্য তার দরকার কিছু উপার্জন। অন্যজন অঙ্কুশ ২৫/২৬ বছরের এই যুবক বিবাহিত একটি বছর খানেকের পুত্র সন্তানও আছে তার। পাতালরেলের এক ঠিকাদারের অফিসে কাজ করত সে। কোনও কারণে পাতাল রেলের সঙ্গে সেই ঠিকাদারের সম্পর্ক ঘুচে যাওয়ায় তার চাকরি যায়। মহা সমস্যা, কিছু উপার্জন করা তার চাই-ই চাই, ধরা যেতে পারে অনুর কথাও। বছর ত্রিশের এই অতীব সুদর্শন যুবক ছোটবেলা থেকে মেয়েবন্ধুদের সঙ্গে বেশি সময় কাটাত। তাদের সঙ্গে পুতুল খেলা, নাচগান, কিতকিত এ সে যতটা স্বচ্ছন্দ, ততটাই ছিল ভীত ফুটবল, ক্রিকেট মারামারি, লম্ফঝম্পর মতো ‘পুরুষালি’ ব্যাপার স্যাপার। অতিমাত্রায় সৌন্দর্য-সচেতন অণু শারীরিক ভাবে পুরুষ হলেও হাবে ভাবে আচারে আচরণের এবং মানসিক ভাবে একজন নারীই। অন্য সব মেয়েদের মতো সেওভাবে একদিন এক স্বপ্নের রাজকুমার ঘোড়ায় চেপে আসবে তার দ্বারে, কঠিন, পেশল বাহুর জোরে ছিনিয়ে নেবে তাকে, সেই রাজপুত্রের রোমশ, বিশাল, দরাজ বুকের আশ্রয়ই তার একান্ত কাম্য, তার গোপন উষ্ণ স্বপ্নের রসদ। কিন্তু সংসার? বাস্তবের নির্মম কিন্তু অতীব প্রয়োজনীয় কিছু চাহিদা? হাঁ করে থাকা কিছু প্রত্যাশা তার আশপাশের মানুষের? কি করে মেটাবে সে?

সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে উঠে আসা এই চরিত্রগুলোর মধ্যে প্রধান সাদৃশ্য হল, নিজেদের প্রয়োজনে এরা উপার্জনের পথ হিসাবে বেছে নিয়েছেন যৌনকর্ম। অর্থাৎ এরা প্রত্যেকেই পুরুষ যৌনকর্মী। হ্যাঁ, চমকাবার মতো হলেও ব্যাপারটা সত্যি। এই কলকাতার বুকেই সুমিত অঙ্কুশ অনুর মতোই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন আরও অনেক অনেক পুরুষ যৌনকর্মী। বিভিন্ন বয়সের, বিভিন্ন আর্থসামাজিক স্তর থেকে উঠে আসা মানুষগুলির অভিব্যাক্তি, আচরণ ব্যবসা চালানোর কর্মপদ্ধতি খদ্দেরদের শ্রেণি এবং সমস্যাও বিভিন্ন রকম।

বিশ্বায়নের সঙ্গে দ্রুত পরিচিত হতে যাওয়া শিক্ষিত শহুরে ভাতরবর্ষের আমজনতার কাছে সমকামিতা, কিংবা অল্টারনেটিভ সেক্সুয়ালিটি অথবা বিকল্প যৌনতা আজ আর ততটা অপরিচিত শব্দ নয়। যদিও পৃথিবীর অন্য সব জায়গার মতো ভারতেও এই ধরনের যৌনাভ্যাস অতিপ্রাচীন কাল থেকেই প্রচলিত। আমাদের পুরাণ, পৌরাণিক চিত্রকলা, মন্দির ভাস্কর্য লোকগাথা এবং প্রচলিত কিছু রীতি রেওয়াজ এর সমর্থন যথেষ্ট সোচ্চার। তবুও আজও বিকল্পযৌনতা নিয়ে কাজ করা, অর্থাৎ এর ব্যাপ্তি, বিকাশ, সামাজিক পরিমণ্ডলে এর যথার্থ ভূমিকা এবং প্রভাব কতটা ব্যাপক তার গবেষকরা যথেষ্ট মনোযোগ আকর্ষণ করছে কি আমাদের? এসব নিয়ে আমাদের ভাবনা চিন্তা তত্ত্বের কচকচানিতেই পড়ে আছে এখনও এবং তারই ফলস্বরূপ এসবে পুরুষ যৌনকর্মীদের কোনও আগ্রহই নেই। তারা উদাসীন এ ব্যাপারে। এবং ততটাই উদাসীন তারা তাঁদের ন্যূনতম শারীরিক সুরক্ষার ব্যাপারেও। নিজেদের সামাজিক অবস্থান অথবা মর্যাদার প্রশ্ন তো দূর অস্ত। এইচ-আই-ভি/এইডস এর কথা হয়তো কেউ কেউ শুনেছেন, কিন্তু কোনওরকম গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন না Safer sex বা সুরক্ষিত যৌনসম্পর্ক সমন্বিত ধ্যানধারণার। বস্তুত এই সুরক্ষিত যৌনসম্পর্ক ব্যাপারটাই তাদের কাছে অপ্রেয়োজনীয় এবং খানিকটা অপরিচিত একটা ব্যাপার। যাঁরা এদেশে বিকল্প যৌন্যাভাস এর অস্তিত্বই এই সেদিনও স্বীকার করতেন না, সেই সরকারের অবস্থান তবুও বোঝা যায়, কিন্তু কলকাতার সুবিখ্যাত N.G.O রাও পুরুষ যৌনকর্মীদের নিয়ে গভীর কিছু ভাবছেন বলে আজও জানা যায়নি। সমস্যার ব্যাপকতা নিয়ে কিন্তু এঁরা কমবেশি সচেতন, তবুও মহিলা যৌনকর্মীদের সম্বন্ধে এঁরা যতটা সিরিয়াস ততটা পুরুষ যৌনকর্মীদের সম্বন্ধে নয়। কেন? যথার্থ Need assesment এর অভাব? ফান্ডের অপ্রতুলতা? অথবা স্বল্প পরিচিত একটি মার্জিনাল কমিউনিটির মধ্যে কাজ করার প্রচারের অপ্রতুলতার আশঙ্কা? কিংবা সমস্যাটির কমিউনিটির মধ্যে কাজ করার প্রচারের অপ্রতুলতার আশঙ্কা? কিংবা সমস্যাটির সামাজিক ব্যাপ্তিকেই অস্বীকার ? আশা করি প্রাজ্ঞ বন্ধুরা উত্তর জানাবেন।

এছাড়া থাকে সমকামীদের নিজস্ব সংস্থা বা Community Base organisation দের ভূমিকা। দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশের গুটিকয় এই ধরনের সংস্থা যাঁরা চালান সেই সব মানুষদের অধিকাংশই এসেছেন সমাজের উচ্চবিত্ত এলিট পরিমণ্ডল থেকে, তাঁরা তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্কহীন, নিজেদের আত্মপরিচয় নিয়ে হয়তো নিজেরাই কিছু সংশয়ে ভোগেন। তাই পুরুষ যৌনকর্মীরা একই Community’র মানুষ হলেও তাদের কাছে ব্রাত্য।

যৌনতার ব্যাপারে আমাদের যতই দুর্বার গ্রাহক থাকুক (HIV/AIDS আক্রান্তদের অকল্পনীয় হারে সংখ্যাবৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান যৌন অপরাধ যৌন সাহিত্যের জনপ্রিয়তা, অডিওভিশুয়াল মাধ্যমে যৌনতার অবাধ অনুপ্রবেশ, অবৈধ সম্পর্কের বাড়াবাড়ি এবং সর্বোপরি জনসংখ্যার তুরন্ত বর্ধমান গতি এ ব্যাপারে খোলাখুলি আলোচনা মতবিনিময় এবং নিজের মত সোচ্চারে প্রকাশ করতে আমাদের ততটাই অনাগ্রহ। একে কি বলা যায়? হিপোক্রেসি অথবা অন্যকিছু? সমাজবিজ্ঞানীরা ভাল বলতে পারবেন।

যারা অন্যকাজে অন্য সবার মতোই সমান পারদর্শী তাঁরা কেন যৌনকর্মে আসেন বাণিজ্যিক ভাবে? কেন নিজেকে অপরের শয্যায় সঁপে দেবার সময় ইচ্ছা অনিচ্ছাকে মূল্য দেননা এই সব পুরুষ যৌনকর্মীরা? কেন ন্যুনতম সুরক্ষাটুকুও নিশ্চিত করেন না? কেন অনেক পুরুষ যৌনকর্মী তাদের খদ্দেরদের থেকে ছিনিয়ে নেন তার যথাসর্বস্ব? কেন তাদের নিজেকে এত বেশি অ্যাগ্রেসিভ রাখতে হয়? কেন প্রয়োজন হয় নিজেদের মধ্যে কথা বলার জন্য সম্পূর্ণ অন্য এক বাগধারার? কোন নিরাপত্তাহীনতা, কোন আত্মঅবমূল্যায়নের থেকে তারা পুলিশ, স্থানীয় গুণ্ডা, মস্তান, খদ্দের এমন কী সমাজকর্মীদেরও বিশ্বাস করতে পারেন না? কেন তাদের কোনও বন্ধু নেই? এমনকি সাথী যৌনকর্মীও নন? এই প্রশ্নগুলি তোলার সময় এসেছে।

তবে রাত্রি যত গভীর হয়। সকাল তত কাছে আসে। কিছুদিন আগে এই কলকাতাতেই মহিলা যৌনকর্মীদের নিতান্ত সুপরিচালিত একটি সংস্থার নেতৃত্বের কাছে কয়েকজন পুরুষ যৌনকর্মী গিয়ে বলেছিলেন আমরাও যৌনকর্মী, আপনারা যা করেছেন তা আমাদেরও কাজ, আমাদেরও জন্য কাজ, তবে আমরা কেন এই কর্মযজ্ঞে অংশগ্রহণ করব না? তারপর ওই সংস্থা দ্বারা আয়োজিত সর্বভারতীয় যৌনকর্মী সম্মেলনের সাংগঠনিক নানা দায়িত্বপূর্ণ কাজে পুরুষ যৌনকর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্বপালন এবং এর দ্বারা অর্জিত তাদের আত্মবিশ্বাসের আত্মাপলব্ধির পুনরুত্থান আজ ইতিহাস। প্রার্থনা করি, এই চেতনা ছড়িয়ে পড়ুক প্রত্যেক পুরুষ যৌনকর্মীর অন্তরে।

পরিশেষে শুধু এইটুকু বলা যায়, ইন্টারনেট কম্পিউটারশাসিত এই জেটযুগের ‘স্বাধীন যৌনতার’ চাহিদা যত তাড়াতাড়ি ‘সুরক্ষিত যৌনতায়’ আত্মস্থ হয়, ততই আমাদের সবার, গোটা মানবজাতির মঙ্গল।

.

রূপান্তরকামিতা ও মনোচিকিৎসা

ডঃ নীলাঞ্জনা সান্ন্যাল*

মানবজমিনের একটা ভিত যৌনতা। কর্মমুখর পৃথিবীতে, শত নৈরাশ্যের মধ্যেও মানুষের এই আদিম প্রবৃত্তি তাকে তাড়া করে বেড়ায় সুখের খোঁজে, তৃপ্তির হদিশে। বয়ঃসন্ধিকালের সময় থেকেই পুরুষের প্রতি নারীর ও নারীর প্রতি পুরুষের যৌন আসক্তি অত্যন্ত সাধারণ জীবন বিকাশের নমুনা। শুধু যৌনতার প্রবৃত্তি নয়, এই সন্ধিঃক্ষণে মানুষ সচেতন হয় নিজ লিঙ্গ নির্ধারিত কতোগুলি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে। জীবন যখন স্বাভাবিক পথে চলতে থাকে, ছেলে মেয়েরা বড় হতে থাকে বিকাশের ধাপে ধাপে, তাল মিলিয়ে ফুটে ওঠে মানসিক বিকাশ-সুস্থতার পথে। বিশেষ কোনো সহজাত কারণে বা পারিপার্শ্বিকতার চাপে মানুষ যখন মনোবিকাশে বিপদগামী হয়, দেখা দেয় মানসিক অস্থিরতা, চাঞ্চল্য, উদ্বেগ ও ধোঁয়াশা জড়িত আত্মপ্রত্যয় ও আত্মপরিচিতি। লিঙ্গবেশের বিশিষ্ট আচরণ সেখানে অনুপস্থিত—দেখা দেয় অস্বাভাবিক আচরণ। এমনই একটি অস্বাভাবিকতা হলো রূপান্তরকামিতা বা Transsexualism। অর্থাৎ যখন কোনো পুরুষ বা নারী নিজের লিঙ্গ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা ও অনুভূতি সম্পন্ন না হয়ে, অপর লিঙ্গে নিজের মননকে তৈরি করে ফেলে, তার থেকে উৎপত্তি হয় এই অবাস্তবতার। এই ধরণের ব্যক্তিত্ব নিজের লিঙ্গ নির্ধারিত আচরণ করতে ও সামাজিক রীতি নীতি মানতে অত্যন্ত বেশি অস্বস্তি অনুভব করে। বিশেষতঃ পুরুষদের মধ্যে এই অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়, যেখানে তারা পুরুষ হওয়া সত্ত্বেও নিজের সত্ত্বাকে নারী বলে অনুভব করে ও যৌনসঙ্গমে নারী হিসাবে অংশ গ্রহণ করতে ইচ্ছুক হয়। সংখ্যাতত্ত্বের বিচারের নারীর থেকে পুরুষের মধ্যেই এই প্রবৃত্তির প্রাবল্য বেশি। তারা সামাজিকভাবে নিজেদের নারীবেশে সজ্জিত করে রাখতে পছন্দ করে। প্রকৃতির নুয়ে পড়া ভাব তাদের মধ্যে প্রকট হয় এবং অনেকক্ষেত্রেই এরা লিঙ্গচ্ছেদের মাধ্যমে শারীরিকভাবে প্রকৃত নারীসত্তার অধিকারী হতে চায়। যেহেতু এই মানসিকতা অস্বাভাবিক, প্রশ্ন ওঠে এদের চিকিৎসার, এদের সারিয়ে তুলে সামাজিক অবক্ষয়কে একদিক থেকে রোধ করে সমতা রাখার প্রয়াস সাধনে। প্রাসঙ্গিকভাবে দেখা দেয় এদের মনোচিকিৎসার—কথোপকথন পদ্ধতির মাধ্যমে মনোবিশ্লেষণের।

চিকিৎসার এই দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে প্রথমে বলা দরকার এই জাতীয় ব্যক্তিত্ব চিকিৎসার আওতায় স্বইচ্ছেতে আসতে নারাজ। কারণ রূপান্তরকামিতা যেখানে তাদের সুখের চাবিকাঠি, সেখানে সেই মানসিকতাকে পরিত্যাগ করার ইচ্ছে এদের মধ্যে থাকার সম্ভাবনা অত্যন্তই কম। এরা চিকিৎসকের সাহায্য চাইতে পারে অপর লিঙ্গে ঝুঁকে পড়ার সহজ রাস্তার দিশা খুঁজতে। এ পথ থেকে ফিরে নিজের বাস্তব অস্তিত্বের সঠিক কার্যাবলীতে অংশগ্রহণ করতে হয়। ইচ্ছের বিরুদ্ধে বয়সকালে যদি এদের মনোচিকিৎসায় আনা যায় এরা মুহূর্তের মধ্যে বুঝতে পারে ব্যক্তিসত্তার সঠিক অংশে এদের ফেরানোর প্রয়াস চলছে, যা তারা মানতে নারাজ। তাই বড় বয়সে মনোচিকিৎসার আয়ত্তে এদের আনা প্রায় অসম্ভব বলা চলে। প্রশ্ন ওঠে কোনসময়ে এদের চিকিৎসার জন্যে আনা প্রয়োজন তা ঠিক করার। মনোবিশ্লেষক হিসেবে বলা যেতে পারে এই ধরণের ব্যক্তিত্বকে অনেক ছোট বয়স থেকেই চেনা যায়। বোঝা যায় পুরুষ হয়েও সে নারীসুলভ। সেক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব তার মা বাবার বা অন্য গুরুজনদের। আচরণের বিকৃতি সংশোধন করাতে ওই বয়সেই বোঝানো দরকার পুরুষ ও প্রকৃতির তফাত— চেনানো দরকার দুই-এর মধ্যেই সৌন্দর্যের বিকাশকে কোনো অবস্থাতেই এদের নারীসুলভ পোশাক ছোটবেলায় পরানো উচিত নয়। উচিত নয় মেয়েলি নামে বা ঢঙে আদর করা বা সম্ভাষণ করা। ব্যক্তিত্বে সমলিঙ্গের সাথে প্রকৃত একাত্মতার জন্য প্রয়োজন সঠিক role model। বা প্রকৃত পুরুষ ব্যক্তিত্বের অধিকারী কোনো পুরুষের উপস্থিতি ও লালনপদ্ধতিতে এগিয়ে আসার। এদের ক্ষেত্রে পারিবারিক গঠনের বিশেষ ভঙ্গীতে যদি মায়ের সাথে একাত্মতা বেশি হয় বা মায়ের প্রতি অতিরিক্ত দুর্বলতা দেখা দেয়, তাহলে কথোপকথন পদ্ধতির মাধ্যমে তাকে বোঝানো দরকার মা বা মায়ের মতো আর কেউ প্রিয় পাত্রী হতে পারেন, হতে পারে তারা বহু কাজে দক্ষ, কিন্তু ব্যক্তিত্বের পরিধিতে তাদের মতো আচরণ বেমানান। ফলে ছোট থেকেই তাদের এই আত্মসচেতনা বাস্তবভঙ্গীতে বোঝানো গেলে সম্ভাবনা থাকে এই অস্বাভাবিকতার থেকে রেহাই পাওয়ার। বাচ্চার বোঝা দরকার সে পুরুষ হ’লে বেশিটাই তাকে বাবার মতো আচরণভঙ্গী শিখতে হবে, সে নারী হ’লে মাতৃসুলভ আচরণই তার কাছ থেকে অধিক কাম্য। এই পরিস্থিতির অনুপস্থিতিতে সে যে অসামাজিকতার অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবহারে বাঁধা পড়তে পারে, তা তাকে ভাল করে বোঝানো দরকার। বন্ধুরা তাকে নেবে না সহজে, খ্যাপাবে, সরে থাকবে তার কাছ থেকে, বাস্তবে হেয় করার চেষ্টা করতে পারে— এ তথ্যগুলো তার সামনে বারেবারে তুলে ধরা দরকার। অনেকবার অনেক ভাষায় এ তথ্য তার সামনে রাখা গেলে, গোড়াতেই কিছু মনো পরিবর্তন আশা করা যেতে পারে। একটি উদাহরণে আসি। ছোট্ট মেয়ে প্রিয়াংকা। মা বাবার একটি মাত্র সন্তান। দুজনেরই ইচ্ছে ছিলো পুত্র সন্তানের। তার ফলে কন্যা সন্তান হওয়ার পরেও তারা তাকে পুত্রের মতো করেই বড় করতে থাকেন। পোশাকে, ব্যবহারে, সম্ভাষণে ও তার চারিত্রিক গুণ বিশ্লেষণে তারা পুরুষের মতো দিকগুলোকে বেশি প্রশংসা করতেন। ফলে অল্পদিনের মধ্যেই দেখা গেলো সে নারী পোশাক একেবারেই সহ্য করতে পারে না, পরে ছেলেদের মতো বেশ, খেলে ছেলেদের খেলা-বিশেষতঃ ক্রিকেট। একটা সময়ের পরে দেখা গেলো সে বিখ্যাত ক্রিকেটার কপিল দেবের অনুরাগী, এবং তার অল্পকালের মধ্যেই সে তৈরি হ’লো শুধু কপিলদেব বলে তাকে ডাকলেই সাড়া দিতে, অন্যথায় নয়। শৈশবের এই গণ্ডি পেরোতেই তার মধ্যে দেখা গেলো অন্যান্য অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবহার, যেখানে সে মেয়ে বা ছেলে কেনো বন্ধুতেই সহজ হতে পারছে না, বড়দের কারো সাথে স্বচ্ছন্দ হ’তে পারছে না— হারিয়ে ফেলছে ব্যক্তিত্বের স্বাভাবিক ভারসাম্যকে। এক্ষেত্রে তাকে সুস্থ করে তোলার জন্য প্রয়োজন হয়েছিল মা বাবার চিকিৎসা। মনোবিশ্লেষণের মাধ্যমে তাদের ব্যাখ্যা করতে হয়েছিল পুত্র সন্তান কামনা যদি কন্যাসন্তানের মধ্যে মেটাতে চান সে সুস্থ ব্যক্তিত্ব তৈরি হতে পারে না, অপরলৈঙ্গিকতা সেক্ষেত্রে প্রায় অবশ্যম্ভাবী বলা যেতে পারে।

শিশুসন্তানের মধ্যেও অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করা গেলে তাকে playtherapy বা খেলার মাধ্যমে চিকিৎসা পদ্ধতিতে নিয়ে আসা যেতে পারে। বহুরকমের খেলনা নিয়ে খেলতে দিলে যদি কোনো ছেলে শিশুকে দেখা যায় শুধু পুতুল বা মেয়ে পুতুল নিয়েই সে বেশি খেলছে, বল, ব্যাট গাড়ি, সৈনিক সে ধরছে না, বুঝতে হবে ব্যক্তিত্বের তার অপলৈঙ্গিকতার প্রবণতা আছে। এতো ছোট এ অসুবিধে বোঝা গেলে বাড়ির পরিবেশে ব্যবহারিক আচরণ-বিবর্তনকারী পদ্ধতি বা Behaviour modification technique-এর মাধ্যমে তাকে নিজলিঙ্গে মানসিকভাবে অবস্থান করার সুফল শেখানো যেতে পারে।

বড়দের রূপান্তরকামিতার কারণ হিসেবে অনেকক্ষেত্রে আবেগজনিত বিশেষ কষ্ট বা trauma-র খোঁজ পাওয়া যায়। এসব ক্ষেত্রে পুরুষ হিসেবে কেউ খুব মানসিক আঘাত পেলে, সেই role বা ভূমিকা ছেড়ে দিয়ে নারীত্বের আচরণের মধ্যে স্বস্তি খোঁজে। বৌদ্ধিক ব্যাখ্যায় ও সহানুভূতি সম্পন্ন আবেগের বেড়া নিয়ে এদের আবার স্বলিঙ্গসূচক আচরণে কিছুটা ফেরানো যেতে পারে। এইসব ক্ষেত্রে অনেকসময় দেখা যায় দৈহিক গঠনে অপর লিঙ্গের হরমোনাল স্রাবের রকমফেরেও এই মানসিকতার ধারা গড়ে উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে চিকিৎসার সাহায্য নিয়ে injection-এর মাধ্যমে হরমোন সমতা পরিবর্তন করা গেলে কিছুটা উপকার পাওয়া যেতেই পারে।

শেষ করার আগে বলা দরকার প্রাপ্তবয়স্ক রূপান্তরকামী পুরুষের মধ্যে বিশেষ করে উদ্বেগ জনিত, anxiety ও বিষাদজনিত, depressive মনোভাব পরিলক্ষিত হয়। জীবন বিকাশে সুস্বাস্থ্যের ধারা অনুপস্থিত হলে মানসিক এই ধরনের রোগের দিকে মননে টান পড়তেই পারে। তখন দরকার মনোবিশ্লেষণের। নিজের আঙ্গিক পরিবর্তন করে কৃত্রিম আঙ্গিকে যাওয়ার চেষ্টা করলেই সমাজ থেকে বাধা আসবে, আসবে নিজের মধ্যে অস্বচ্ছ ধারণা ও দ্বন্দ্ব।

রূপান্তরকামী মানুষের বুদ্ধিতে ঘাটতির প্রসঙ্গ নেই, কিন্তু আছে বিবেচনার ঘাটতি। পরতে পরতে মনের যে জট তাদের এই অপ্রকৃতিস্থ অবস্থার দিকে ঠেলে দেয়, ধৈর্য ধরে, পরিবারের সহযোগিতা নিয়ে যদি মনোবিশ্লেষক তা খোলার চেষ্টা করেন, সব ক্ষেত্রে সাফল্য না এলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাফল্যের সম্ভাবনা আছে।

মানুষ সুন্দর, তা সে যে লিঙ্গেরই হোক, সুস্থবিকাশে যে প্রকৃতি সৌন্দর্য্য তা ছোটবেলাতেই বড়দের আচরণে ফুটিয়ে তোলা দরকার। ব্যক্তিত্বের এই অস্বাভাবিকতা অনেকটাই ভুল লালন-পদ্ধতির ফল, সামাজিক সচেতনায় আমাদের অভিজ্ঞতা যদি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় ভুলটা ঠিক কোথায়— মানতে অসুবিধে হবে কেন? ওরা তো আমাদের সন্তান, আমাদের আত্মীয়, ওদের ভালো আমরা চাইবো না?

.

যৌনপরিবর্তনকামী পুরুষ ও বেশ্যাবৃত্তি : একটি নৈতিক সমীক্ষা

মাধবেন্দ্রনাথ মিত্র*

আমাদের সমাজে কিছু কিছু পুরুষ আছেন যাঁদের যৌনপরিবর্তনকামী (transsexual male) অ্যাখ্যা দেওয়া হয়ে থাকে। এঁরা পুরুষ হয়েও নারীসুলভ মানসিকতা নিয়ে থাকতে চান, আবার কখনো কখনো লিঙ্গ পরিবর্তন করে নারী হয়ে যেতেও চান। এঁদের মধ্যে কাউকে কাউকে আবার যৌনব্যবসায় লিপ্ত হতেও দেখা যায়। যৌনপরিবর্তনকামী পুরুষের মানসিকতা ও কাজকর্ম নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করাই এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য। আলোচনায় যতই অগ্রসর হব, ততই আমাদের আলোচ্য বিষয়ের চিত্রটি আরও পরিষ্কার হতে থাকবে বলে আশা করি। আলোচনাটি তিনটি ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে আমরা ভালভাবে বুঝতে চেষ্টা করবো যৌনপরিবর্তনকামী ব্যক্তি বলতে আমরা ঠিক কাদের বোঝাচ্ছি। দ্বিতীয় ভাগে যৌনপরিবর্তনকামিতার একটি নৈতিক মূল্যায়ন করার চেষ্টা করবো। যৌনপরিবর্তনকামী পুরুষেরা অনেকসময়েই বেশ্যাবৃত্তি অবলম্বন করে। তৃতীয় ভাগের বিষয় তাদের এই কাজের একটি নৈতিক পর্যালোচনা।

যৌনপরিবর্তনকামী ব্যক্তি কাকে বলে?

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে প্রথমেই আমাদের ‘sex’ এবং ‘gender’ এই দুটি শব্দের পার্থক্য বুঝতে হবে। শারীরিক যৌনলক্ষণ অনুযায়ী নারী-পুরুষের মধ্যে যে বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে, তাই হল ‘sex’। শরীরগতভাবে পুরুষ এবং নারীর যৌনাঙ্গ পৃথক। নারী সন্তান ধারণে সক্ষম। পুরুষ কিন্তু গর্ভসঞ্চার করে সন্তান উৎপাদনে সাহায্য করে, ধারণ করতে পারে না। নারীও পুরুষের এই শারীরবৃত্তীয় ধর্মগুলি যদি না-থাকে, তাহলে তারা যথাক্রমে নারী ও পুরুষ পদবাচ্য হয় না। এই শারীরবৃত্তীয় ধর্ম ছাড়াও পুরুষ এবং নারীর ওপরে সমাজ কিছু ধর্ম আরোপ করে থাকে। যেমন, আমাদের সমাজ অনেক সময়ই মনে করে নারীর বিশেষ ধর্ম হচ্ছে, সে গৃহে বাস করে সন্তান প্রতিপালন করবে, রান্নাবান্না করে সকলকে খাওয়াবে, স্বামীসেবা করবে। অন্যদিকে পুরুষের ধর্ম হচ্ছে, সে বাইরে গিয়ে অর্থোপার্জন করে স্ত্রী ও সন্তানাদি প্রতিপালন করবে। নারী ও পুরুষের ওপরে সমাজ-আরোপিত এই ধর্মগুলির সঙ্গে শারীরিক দিক থেকে নারী ও পুরুষের কোন অঙ্গাঙ্গী সম্বন্ধ নেই। এই ধর্মগুলি ব্যতিরেকও একজন ব্যক্তিকে নারী এবং আর একজন ব্যক্তিকে পুরুষ বলতে শারীরগতভাবে অন্তত কোন বাধা থাকে না। কোন নারীর সমাজ আরোপিত ধর্মগুলি না থাকলেও তাকে শারীরিকভাবে নারী বলতে কোন বাধা নেই। কারণ, এগুলি তার প্রকৃতিদত্ত ধর্ম নয়। পুরুষের ক্ষেত্রে এ’কথা প্রযোজ্য। সমাজের প্রত্যাশা মতন এই আরোপিত ধর্ম অনুযায়ী ভূমিকা পালন যদি কোন নারী বা পুরুষ না করে তাহলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায় না। প্রকৃতির বিচারে নারী নারীই থাকে এবং পুরুষ পুরুষই থাকে। কিন্তু শারীরিক ধর্মগুলি না থাকলে কোন ব্যক্তিকে নারী বা পুরুষ বলা যায় না। এই সমাজ-আরোপিত ধর্মগুলির সাহায্যে যখন কোন ব্যক্তিকে নারী বা পুরুষ আখ্যা দেওয়া হয়, তখন নারী ও পুরুষের এই ভেদকে আর ‘sexual difference’ বলা যায় না, এই ভেদকে আমরা বরং ‘gender difference’ বলবো। প্রথম ভেদটি শারীরবৃত্তীয় (bilogical) ভেদ এবং দ্বিতীয়টি সমাজ-আরোপিত ভেদ।

মনোবিদগণ যৌনপরিবর্তনকামিতাকে ‘gender idenity disorder’ (যৌনসত্তা সম্বন্ধীয় অসুবিধে) বলে বুঝতে চেয়েছেন। যারা যৌনপরিবর্তনকামী ব্যক্তি তারা নারী হতে চায় এবং নারীজনোচিত আচরণ করতে ভালবাসে। যৌনপরিবর্তনকামী পুরুষেরা যেহেতু সমাজে ব্রাত্য, তারা প্রায়ই সমাজের বাইরে থাকে। কিছু কিছু এই ধরণের পুরুষ হিজড়ে সমাজে যাতায়াত করে এবং কেউ কেউ যৌনব্যবসায় লিপ্ত হয়। যৌনপরিবর্তনকামী পুরুও বলতে কি বুঝি—এই আলোচনা করার পর আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে কি উপায়ে এই যৌনপরিবর্তনকামিতাকে আমরা নৈতিকভাবে মূল্যায়ন করবো।

যৌনপরিবর্তনকামিতার একটি নৈতিক মূল্যায়ন :

যৌনপরিবর্তনকামিতা কি নৈতিকভাবে সমর্থন যোগ্য?—এই প্রশ্নটির উত্তর দিতে গেলে প্রথমেই আমাদের বোঝবার চেষ্টা করতে হবে নৈতিকতার সঙ্গে যৌনতার সম্পর্ক কি। এই সম্পর্কটি ঠিকমতো বুঝতে হলে আবার যৌনতার দুটি দিকের কথা বলতে হয়। যৌনতার একটি দিক সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত এবং অপরটি হচ্ছে সমাজগত বা সামাজিক দিক। যে যৌনকর্ম সমাজের পক্ষে ক্ষতিকারক তা অন্যায় বা অনৈতিক বলে বিবেচিত হয়। আর যদি দু’জন ব্যক্তি সমাজের ক্ষতি না করে পারস্পরিক সম্পর্কের সূত্রে যৌনসম্পর্ক স্থাপনে ইচ্ছুক হয় এবং যৌনসম্পর্ক স্থাপন করে তা তাদের নিতান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। এখানে সমাজের হস্তক্ষেপ তাদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। যৌনসম্পর্ক স্থাপনেচ্ছু এই দুজন ব্যক্তির যৌনমিলন অনৈতিক বলা যায় না। অবশ্য ব্যক্তিগত যৌনসম্পর্ক স্থাপনের মধ্যেও অনৈতিকতা খুঁজে পাওয়া যাবে, যদি একজন অপরকে শুধুমাত্র যৌনপরিতৃপ্তির উপায় বলে গণ্য করে। যৌনতা বিষয়ে নৈতিক বিচারের অন্যতম প্রধান আলোচ্য হচ্ছে—আমরা যৌনক্রিয়ার ব্যাপারে ব্যক্তির আচরণের ওপর কতটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করবো। অর্থাৎ এই ব্যাপারে ব্যক্তি স্বাধীনতাকে কতটা মূল্য দেব। যাঁরা যৌনসম্পর্ককে সামাজিক বিধিনিষেধের বাইরে যেতে দিতে চান না তাঁদের আমরা চরমপন্থী বলবো। এর বিপরীত মত যারা পোষণ করেন তাদের নরমপন্থী বলা হয়। চরমপন্থী মনোভাবের লোকেরা অনেক সময়েই মনে করেন বিবাহের বাইরে যৌনসম্পর্ক ঘোরতর অন্যায়। সুতরাং একমাত্র বিবাহিত দম্পতিই যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হতে পারে। যাঁরা কট্টরপন্থী তাঁরা হয়তো একথাও বলবেন যে, উচ্চবর্ণের লোকের সঙ্গে নিম্নবর্ণের লোকের বিবাহও ঘোরতর অন্যায়, যদি সেই সমাজ বর্ণাশ্রমে বিশ্বাসী হয়। নরমপন্থীগণ স্বাভাবিকভাবেই এই ধরণের সামাজিক অনুশাসনের বিরোধিতা করবেন। চরমপন্থী বা নরমপন্থী কোনটি যৌনতার ব্যাপারে নৈতিকতা গ্রাহ্য তা আলোচনা করতে গেলে আমাদের জানতে হবে যৌনক্রিয়ার উদ্দেশ্য কি?

যৌনক্রিয়ার উদ্দেশ্য ত্রিমাত্রিক—প্রজনন, যৌনসুখ উপলব্ধি এবং ভালবাসার প্রকাশ। অবশ্যই যৌনক্রিয়ার এই তিনটি একে অপরের বিরোধী বলা যায় না। এই তিনটি মাত্রা একসঙ্গে পূর্ণ হওয়াটা যেমন যৌনক্রিয়ার উদ্দেশ্য হতে পারে, এর যে কোন একটি দুটি একসঙ্গেও যৌনক্রিয়ার উদ্দেশ্য হতে পারে। এই তিনটি মাত্রার মধ্যে তৃতীয়টির অর্থ এই নয় যে, যৌনসম্পর্ক ছাড়া ভালবাসার প্রকাশ হয় না। এর অর্থ যৌনসম্পর্কের মধ্যে দিয়ে একটি গভীর ভালবাসার মধ্যেই যৌনতার গন্ধ পেয়েছিলেন। এই তিনটি মাত্রার মধ্যে কোনটি প্রধান এবং কোনটি অপ্রধান এই নিয়ে বিতর্ক দেখা যায়। চরমপন্থীরা সাধারণত প্রথমটিকেই যৌনক্রিয়া প্রধান এবং একমাত্র উদ্দেশ্য বলে মনে করেন। তাই তাঁরা এমনকি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যৌনক্রিয়া কেবলমাত্র প্রজনন চেষ্টার মধ্যে আবদ্ধ রাখতে চান। প্রজন্মের উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোনরকম যৌনক্রিয়াই তাই তাঁদের কাছে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হলেও অনৈতিক। ঊনবিংশ শতাব্দীর ভিক্টোরিয়া যুগে তাই বিবাহ বহির্ভূত যৌনক্রিয়া তো নিষিদ্ধ ছিলই, এমনকি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রজননের উদ্দেশ্য ভিন্ন অন্য সমস্ত যৌনক্রিয়াও নিষিদ্ধ ছিল। অপরপক্ষে নরমপন্থীরা, যাঁরা যৌনক্রিয়ার ব্যাপারে ব্যক্তিস্বাধীনতাকে বেশি মূল্য দিয়েছেন, তাঁরা যৌনসুখ ভোগ এবং ঐ সুখভোগের অধিকারের ওপর বেশি জোর দিয়েছেন।

যে যৌনক্রিয়া সাধারণ মানুষের ক্ষতির কারণ যা তাকে সাধারণত অনৈতিক বলা হয় এবং আইন প্রণয়ন করে সেগুলি বন্ধ করার চেষ্টা দেখা যায়। যেমন ধর্ষণ, শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন, অপরকে কষ্ট দিয়ে যৌনসুখে আনন্দ ইত্যাদি যৌনক্রিয়াকে সকলেই, প্রায় জাতি ধর্ম ব্যক্তি নির্বিশেষে নৈতিকভাবে অন্যায় বলে ধরে থাকেন। আবার কিছু কিছু যৌনসম্পর্ক নৈতিক না অনৈতিক তা নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়।

যৌন পরিবর্তনকামিতা শেষোক্ত এই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হবে। স্বাভাবিকভাবেই যাঁরা যৌন পরিবর্তনকামিতাকে নৈতিকভাবে সমর্থন করবেন তাঁরা নরমপন্থী মনোভাবের মানুষ হবেন; এবং দুই সমর্থনের পেছনে তাঁদের যুক্তি হবে—

(১) যৌন সুখ উপলব্ধি এবং তার মাধ্যমে গভীর ভালবাসার প্রকাশই যৌনক্রিয়ার মুখ্য উদ্দেশ্য; এবং

(২) এই সুখ উপলব্ধিতে বাধা দেওয়া মানে ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা।

(৩) স্বাধীনতা একটি মানবিক অধিকার।

(৪) সুতরাং ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার অর্থ মানবিক অধিকারে হস্তক্ষেপে করা এবং মানবিক অধিকার থেকে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা অনৈতিক।

(৫) অতএব যৌন পরিবর্তনকামিতাকে বাধা দেওয়া অনৈতিক অর্থাৎ যৌন পরিবর্তনকামিতা নৈতিকভাবে গ্রাহ্য।

এই প্রসঙ্গে বলা দরকার যৌনতা সম্বন্ধে ব্যক্তি স্বাধীনতা কিন্তু স্বেচ্ছাচারিতা বা যথেচ্ছাচারিতা নয়। স্বেচ্ছাচারিতা বা যথেচ্ছাচারিতা একরকমের স্বার্থপরতা যেখানে অপরের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা হয়ে থাকে। আমি যদি যৌন সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে স্বেচ্ছাচারী বা যথেচ্ছাচারী হই, তাহলে সেখানে আমার সুখ, আমার ইচ্ছাই একমাত্র লক্ষ্য হবে, আমার যৌনসহচরীর কোন ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষার সেখানে কোন মূল্য আমি দিই না। আমি সেখানে অপরকে শুধু আমার সুখভোগের যন্ত্র বা পণ্য বলে গণ্য করছি। তাকে মানুষের মর্যাদা দিচ্ছি না। তারও যে ব্যক্তি স্বাধীনতা আছে তাকে কোনরকমভাবে গ্রাহ্যের মধ্যেই আনছি না। ব্যক্তি স্বাধীনতার ধারণা এর সম্পূর্ণ, ভিন্ন এবং বিপরীত। ব্যক্তিস্বাধীনতায় যাঁরা বিশ্বাসী, তাঁরা অপরের ব্যক্তিস্বাধীনতায়ও বিশ্বাসী। সুতরাং যৌনতা সম্বন্ধে ব্যক্তিস্বাধীনতার অর্থ হচ্ছে—আমি এবং আমার যৌনসহচরীর মধ্যে একটি মানবিক মর্যাদা পূর্ণ সম্বন্ধ।

যৌন স্বাধীনতার নৈতিকতা নিয়ে কেউ যদি প্রশ্ন তোলেন, তাহলে ওপরের যুক্তিগুলি খণ্ডিত হবে। জুডো-ক্রিশ্চান ধারায় যাঁরা বিশ্বাসী তাঁরা হয়তো সে প্রশ্ন তুলতে পারেন। এই ধারা .(tradition) অনুযায়ী শুধুমাত্র শারীরিকভাবে বিপরীত লিঙ্গের অধিকারী মানুষই যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হতে পারে। এই যৌনমিলন প্রধানতঃ সন্তান উৎপাদনের জন্য। তা না-হলে বংশলোপ হবে এবং শেষ পর্যন্ত মানবজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। অন্য যে-কোন যৌনসম্পর্ক যা সন্তান উৎপাদনের জন্য নয়, তাকে নৈতিকভাবে কোন মতেই সমর্থন করা যায় না। যৌন পরিবর্তনকামী পুরুষ শারীরিকভাবে পুরুষ লিঙ্গের অধিকারী। সুতরাং সে নারীর সঙ্গেই যৌন সম্পর্ক স্থাপন করবে। নারী ব্যতীত অপর কারো সঙ্গে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করলে কাজটি অনৈতিক বলে গ্রাহ্য হবে। জুডো-ক্রিশ্চান মত অনুযায়ী ঈশ্বর মানুষকে শুধু সৃষ্টি করেননি, তাদের বংশবৃদ্ধি করতেও আদেশ দিয়েছেন। যে যৌনসম্পর্ক এই বংশবৃদ্ধির সহায়ক নয় তা সর্বদা বর্জনীয়। এই ঈশ্বরের আদেশ সে, লঙ্ঘন করতে চায় সে পাপ করে এবং এই পাপ নৈতিকভাবে সমর্থন যোগ্য হতে পারে না। যে পুরুষ যৌন পরিবর্তনকামী সে ঈশ্বরের সৃষ্টির বিরোধী কাজ করছে এবং ঈশ্বরের আদেশ লঙ্ঘন করছে। ঈশ্বর পুরুষ ও নারীকে সৃষ্টি করেছেন। পুরুষ হয়ে নারী সাজা ঈশ্বরের অভিপ্রেত নয়— ‘বাইবেলে’ এ কথা স্পষ্ট করে উল্লেখ আছে। যে পুরুষ নারী সাজে ঈশ্বরের চোখে সে অপরাধী, সুতরাং সে অনৈতিক কাজ করছে।

জুডো-ক্রিশ্চান ধারার এই যুক্তিগুলি সত্য-সত্যই বাইবেল-এর বক্তব্য কিনা তা বলার অধিকার আমার নেই। বাছাই করা কিছু উক্তি যা বাইবেল থেকে নেওয়া হয়েছে সেগুলি বিচ্ছিন্নভাবে উপরোক্ত মতামতকে সমর্থন করলেও সেই মতটি সম্পূর্ণ বাইবেল এর অনুসারী কিনা আমার মনে সংশয় আছে। তাছাড়া প্রাচীন যে কোন ধর্মগ্রন্থের বৈশিষ্ট্য হল, পরস্পর বিরোধী মতের সহাবস্থান। এই বিরোধী মতগুলির সমন্বয়সাধন কোনভাবে হয়তো করা যায়। তাই বাইবল এর অংশবিশেষ উদ্ধৃতির সাহায্যে কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া হয়তো ঠিক হবে না। যদি এই যুক্তিগুলি ঠিক হয় তাহলে তার বিরুদ্ধে হয়ত নানা কথা বলা যেতে পারে। প্রথমতঃ এই যুক্তিগুলি যাঁরা গ্রহণ করবেন তাঁদের রিলিজিয়ন ও মর্যালিটির একাত্মতাও গ্রহণ করতে হবে। অর্থাৎ যা ধর্মগ্রন্থে আছে তার বিরোধিতা করা মানে তাকে অনৈতিক বলে ঘোষণা করা। রিলিজিয়ন এবং মর্যালিটির এই সম্পর্ক অনেকেই স্বীকার করবেন না। তাঁদের মতে রিলিজিয়ন এবং মর্যালিটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি ক্ষেত্র। তা যদি না হত, তাহলে যাঁরা নাস্তিক তাঁরা অবশ্যই অনৈতিক বলে স্বীকার করতে হয়। তা কিন্তু ঠিক নয়। এমন অনেক নাস্তিক মতামত আছে যা নৈতিকতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ। বৌদ্ধদর্শন যেমন নাস্তিক দর্শন, কিন্তু তাঁদের নৈতিকতা বিশেষভাবে মূল্যবান। সুতরাং ঈশ্বরে বিশ্বাসী বা বিশেষ ধর্মগ্রন্থে অবিশ্বাসী হওয়া মানে অনৈতিক হওয়া নয়। বাইবেল এর বিশেষ কিছু উক্তির সমর্থনে যে সমস্ত যুক্তি দেখানো হয়েছে, তার থেকে কেবলমাত্র এটুকুই প্রমাণিত হয় যে, যৌন পরিবর্তনকামী ব্যক্তিরা বাইবেল এর দৃষ্টিভঙ্গী থেকে পাপী। কিন্তু তার থেকে কখনোই প্রমাণিত হয় না যে, তারা কোন নৈতিকতা বিরুদ্ধ কাজ করছে। কারণ রিলিজিয়নের ক্ষেত্র এবং মর্যালিটির ক্ষেত্র সম্পূর্ণ পৃথক।

বাইবেল ভিত্তিক যুক্তির বিরুদ্ধে দ্বিতীয় আপত্তিটি বুঝতে চেষ্টা করা যায়। পৃথিবীর সমস্ত মানুষই জুডো-ক্রিশ্চান ধারায় বিশ্বাসী নয়। সেই সমস্ত মানুষের কাছে বাইবেল-এর বাণী পালন করার কোন বাধ্যবাধকতা নেই। তাই তাদের স্বাধীনভাবে বিচার করতে হবে, যৌনপরিবর্তনকামিতা নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য কিনা। সে যদি কোন ধর্মীয় অনুশাসনকে চরম মূল্য না দেয়, তাহলে সে কি করবে? তার নিশ্চয়ই ধর্মীয় অনুশাসন মানা বা না-মানার স্বাধীনতা আছে। যদি না-থাকে তাহলে নৈতিক বিচারের কোন তাৎপর্য থাকে না। এই স্বাধীনতা প্রকৃতপক্ষে নৈতিকতার পূর্বশর্ত। কারণ যার এই স্বাধীনতা নেই তাকে তার কাজের জন্যে দোষী করা বা প্রশংসা করা যাবে না/কোন কাজ করার ব্যাপারে আমার স্বাধীনতা থাকার অর্থ এই যে, ইচ্ছে করলে আমি কাজটা নাও করতে পারি। সুতরাং কোন কাজের নৈতিক মূল্যায়নের পূর্বশর্ত আমার ইচ্ছার স্বাধীনতা।

এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, কোন একটি কাজ নৈতিক না অনৈতিক তা বোঝবার জন্যে আমরা যদি কোন ধর্মীয় অনুশাসনের সাহায্য না নিই তাহলে কি করে বুঝবো কাজটি নৈতিক না অনৈতিক। এর উত্তরে কেউ-কেউ বলতে পারেন যে, যে কাজটি স্বাভাবিক (natural) তাই, অস্বাভাবিক (unnatural) কাজই অনৈতিক। এই অর্থে নারী-পুরুষের যৌন মিলনই স্বাভাবিক। এই তত্ত্বটি পরিষ্কার করে জানতে হলে ‘স্বাভাবিক’ ও ‘অস্বাভাবিক’ শব্দ দুটির অর্থ বুঝতে হবে। ‘স্বাভাবিক’ কথাটি ‘স্বভাব’ শব্দের বিশেষণ। কোন বস্তুর স্বভাব হচ্ছে তাই যা বস্তুটিকে অন্যান্য বস্তু থেকে পৃথক করে এবং যার ফলে কোন একটি বস্তু সেই বস্তু বলে পরিচিতি লাভ করে। কোন বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান করে কোন একটি বস্তুর স্বভাব কি তা নির্ণয় করেন। এই স্বভাব যখন বর্ণনা করা হয়, তখন সেই বর্ণনাকে ওই বস্তুটি সম্বন্ধে স্বাভাবিক বর্ণনা বলা যায়। যেমন, আমি যদি বলি Oº সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় জল জমে বরফ হয়ে যায় এবং ১০০º সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় জল বাস্প হয়ে যায়, তাহলে সেটা যেহেতু প্রকৃতির নিয়ম, তাই এটাই স্বাভাবিক। যদি এর অন্যথা হয়, তাহলে তাকে ‘অস্বাভাবিক’ বলা হয়ে থাকে। একজন মনোবৈজ্ঞানিক মানুষের প্রসঙ্গে এরকম স্বাভাবিক নিয়মের কথা বলতে পারেন। যেমন, তিনি অনেক অনুসন্ধান ও গবেষণা করে এই সিদ্ধান্তে আসতে পারেন যে, মানুষ স্বাভাবিকভাবে বিপরীত লিঙ্গের মানুষের সঙ্গে যৌন মিলন চায়। যদি কোন মানুষের মধ্যে এর ব্যতিক্রম দেখা যায়, তাহলে সে অস্বাভাবিক মানুষ। তাকে অনেক সময় রোগগ্রস্ত মানুষ বলা হয় এবং চিকিৎসার সাহায্যে তার রোগ নিরাময়ের উপায়ও বলা হয়ে থাকে। এই স্বাভাবিকতার সঙ্গে আদর্শমূলক নৈতিকতার (normative ethics) পার্থক্য করা প্রয়োজন। আদর্শমূলক নৈতিকতার আলোচনায় মানুষ প্রকৃতপক্ষে কি রকম ব্যবহার করতে চায় তাতে উৎসাহিত নয়। তার প্রশ্ন— মানুষের কি রকম ব্যবহার করা বা ব্যবহার করতে চায় তাতে উৎসাহিত নয়। তার প্রশ্ন— মানুষের কি রকম ব্যবহার করা বা ব্যবহার করতে চাওয়া উচিত। মানুষ যা করতে চায়, তাই তার করা উচিত কি না এটাই নৈতিকতার আলোচ্য বিষয়। তাই বর্ণনামূলক বৈজ্ঞানিক অর্থে যৌনপরিবর্তনকামিতা অস্বাভাবিক হলেও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে ভাল বা মন্দ বলা যায় না। অস্বাভাবিক বলে পরিগণিত হলেও নৈতিক দিক থেকে তা গ্রহণীয় নয়, এ’কথা বলা যায় না। কারণ, বর্ণনাক্ষেত্র এবং নৈতিকতার ক্ষেত্র পৃথক।

‘স্বাভাবিক’ কথাটি অনেক সময় ‘কৃত্রিম’ কথাটির বিপরীত অর্থে ব্যবহৃত হয়। এই অর্থে ঈশ্বর-সৃষ্ট বা প্রকৃতির সৃষ্টি যে-কোন বস্তুই স্বাভাবিক। মানুষ যখন এই সৃষ্ট-পদার্থকে তার প্রয়োজনে পরিবর্তন করে, তখন সেই পদার্থটিকে কৃত্রিম পদার্থ বলা হয়। যেমন, মানুষ আগে গুহা বা বনজঙ্গলে বসবাস করতো, সেটাই স্বাভাবিক বাসস্থান ছিল। পরে মানুষ কৃত্রিম উপায়ে গৃহ নির্মাণ করে তাতে বসবাস করতে শুরু করে। এখন কেউ যদি বলেন, ঈশ্বর-সৃষ্ট গৃহ ছেড়ে কৃত্রিম উপায়ে নির্মিত বাসভবনে বসবাস করা নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে অন্যায়, তাহলে কি আমরা তা মেনে নেব? কোন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিও সেকথা স্বীকার করবেন না। ঠিক সেই রকম বলা যায়, যদিও নারী ও পুরুষের শরীরগত বিভেদ ঈশ্বরের সৃষ্টি এবং সেইজন্যই শারীরিকভাবে যে পুরুষ তার পুরুষ থাকাটাই স্বাভাবিক এবং যে-নারী তার নারী হিসেবে পরিচিত হওয়াটা স্বাভাবিক। এর অন্যথা হলেই তা অস্বাভাবিক ও অনৈতিক হয়ে যাবে— একথা কোন যুক্তিতে মেনে নেব। কেউ যদি কৃত্রিম উপায় অবলম্বন করে যৌনপরিবর্তন করতে চায় তাহলে তা কেন নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে গ্রহণীয় হবে না?

‘অস্বাভাবিক’ কথাটির তৃতীয় অর্থ হচ্ছে, যা ‘অ-স্বাভাবিক’ (Abnormal)। অনেক মানসিক রোগীকে ‘অ-স্বাভাবিক’ আখ্যা দেওয়া হয়। মানসিক রোগ হওয়াটা কি অনৈতিক? তাই ‘যৌন পরিবর্তনকামিতা’ অ-স্বাভাবিক বা মানসিক রোগ বলে কেউ স্বীকার করলেও সেই যুক্তিতে তাকে অনৈতিক বলা যায় না।

শরীরের যে অংশ যে কাজের জন্য মুখ্যত সৃষ্ট হয়েছে। সেই অংশ যদি সেই কাজ না করে, চতুর্থ অর্থে, তাকেই আমরা ‘অস্বাভাবিক’ আখ্যা দিয়ে থাকি। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, যে দাঁতের মুখ্য কাজ হচ্ছে খাদ্য দ্রব্যকে চিবিয়ে গুঁড়ো করা, সেই দাঁতের সাহায্যে যদি একজন ইলেকট্রিক মিস্ত্রি ইলেকট্রিকের তার ছেঁড়ে তাতে কি সে কোন নৈতিক অপরাধ করে? সুতরাং দেখা যাচ্ছে, ‘অস্বাভাবিক’ ও ‘অনৈতিক’ এই শব্দ দুটি সমার্থক নয় এবং সেজন্য বলা যায় না, যা অস্বাভাবিক তাই অনৈতিক এবং যা অনৈতিক তাই অস্বাভাবিক।

আমরা আগেই দেখেছি—ধর্মগ্রন্থতে যা উচিত বা অনুচিত বলা হয়েছে তাই নৈতিক বা অনৈতিক—এই মতটি গ্রহণ করার কিছু অসুবিধে আছে। আমরা এও দেখলাম, ‘নৈতিকতা’ ও ‘স্বাভাবিকতা’ সমার্থক নয়। তবে কোন কাজটিকে আমরা নৈতিক বলবো? নৈতিকতার কি কোন নির্দিষ্ট মানদণ্ড আছে? এই প্রশ্নের উত্তরে নানামুনির নানা মত দেখা যায়। কেউ বলেন, যে কাজটি করলে পৃথিবীতে দুঃখের চেয়ে সুখের পরিমাণ বাড়ে সেই কাজটি নৈতিক। অর্থাৎ এখানে কাজটির ফলাফলের সাহায্যে নৈতিকতার বিচার করা হচ্ছে। এর বিপরীত মতও দেখতে পাওয়া যায়, যা ফলাফল নিরপেক্ষ। এই মত অনুসারে কোন একটি কাজ দুঃখের চেয়ে সুখ বেশি উৎপন্ন করল কিনা তা নিয়ে কাজটির নৈতিকতা বিচার করা যায় না। এই দৃষ্টিকোণ থেকে এমন ব্যক্তিগত নীতি অনুসারেই কাজ করা উচিত যে নীতিকে সর্বজনগ্রাহ্য বলেও অনুমোদন করা যায়। এইরকম নানাবিধ নৈতিকতার মানদণ্ড নিয়ে নীতিশাস্ত্রকারগণ আলোচনা করেছেন। এই মতগুলির মধ্যে কোনটি গ্রহণযোগ্য তা নিয়ে আলোচনা এই প্রবন্ধের স্বল্প পরিসরে সম্ভব নয়। এই সমস্ত মানদণ্ডের মূল্যায়ন না করে আমরা এই প্রবন্ধে ধরে নেব যে, এমন কতগুলি কাজ আছে যা অনৈতিক বলে সর্বজনস্বীকৃতি পেয়েছে। যেমন আমরা দেখেছি, যৌনতা প্রসঙ্গে বলাৎকার সর্বজনস্বীকৃত অনৈতিক। কূট তার্কিকদের মধ্যেও এই বিষয়ে বিশেষ বিবাদ-বিসংবাদ দেখা যায় না। ঠিক সেরকম ভাবেই বলা যায়, ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করাকে অনৈতিক বলে সকলে স্বীকার করবেন। এখানে অবশ্য ব্যক্তি স্বাধীনতার অর্থটিকে পূর্বের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ঠিক ঠিক অর্থে বুঝতে হবে। দুজন পরিণত বয়স্ক যৌন মিলনেচ্ছু ব্যক্তির মধ্যে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে যদি অন্য কারও ক্ষতি না হয়, তাহলে সেখানে বাঁধা দেওয়ার অর্থ ব্যক্তি-স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা। একজন যৌনপরিবর্তনকামী পুরুষ যদি লিঙ্গ পরিবর্তন করে বা না-করে অন্য কোন পুরুষের সঙ্গে উভয়ের স্ব-ইচ্ছায় যৌন মিলনে আবদ্ধ হয়, তাহলে তারা কোন অনৈতিক কাজ করছে বলে ধরে নেওয়া হবে কেন! বরং তাদের বাধা দেওয়া ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বলে তা অনৈতিক।

আরও বলা যায়, যদি কোন যৌন পরিবর্তনকামী পুরুষকে পুরুষজনোচিত ব্যবহার করার জন্যে জিদ করা হয়, তাহলে তার মনে যে দ্বন্দ্ব বা সংঘাতের উৎপত্তি হয়, সেই দ্বন্দ্বের ফলে তার মানসিক রোগের সৃষ্টি হতে পারে। একথা ঠিকই যে, সমস্ত পুরুষই যদি যৌন পরিবর্তনকামী হয়ে ওঠে তবে মানব জাতির অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। কিন্তু হাজার হাজার পুরুষের মধ্যে একজন, দুজন বা দশজন অথবা শতকরা একভাগ পুরুষও যদি যৌন পরিবর্তনকামী হয় তাহলে সেটা প্রকৃতির খেয়াল বলেই মেনে নেওয়া যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয়। সুতরাং নৈতিকতার দোহাই দিয়ে যৌনপরিবর্তনকামিতাকে নিন্দা করে কোনভাবেই সমর্থন করা যায় না। অবশ্য চরমপন্থী মনোভাবের লোকেরা যৌন পরিবর্তনকামিতাকে কখনোই সমর্থন করবে না। বস্তুতপক্ষে তারা ‘সমকামিতা’কে, এমনকি কোন কোন বিপরীতকামী (heterosexual) সম্বন্ধকেও অনৈতিক বলবেন। তাদের এই অসমর্থনের মূলে যে বিশ্বাস আছে তা হল, প্রজনন ক্রিয়ার উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য যে কোন যৌন সম্পর্কই অবৈধ, অনৈতিক। তাই বিপরীতকামী ক্রিয়ায় যে গর্ভনিরোধক দ্রব্যাদি ব্যবহার করা হয় তা-ও অনৈতিক। কিন্তু নরমপন্থীরা মনে করেন না যে, প্রজনন ক্রিয়ার উদ্দেশ্য ছাড়া যৌন সম্পর্ক অবৈধ, অনৈতিক। তাই তাদের মতে গর্ভনিরোধক দ্রব্যাদি ব্যবহার করা যেমন অনৈতিক নয়, তেমনি সমকামিতা ও যৌন পরিবর্তন-কামিতা কোনটিই অনৈতিক নয়।

আমাদের সমাজে কিন্তু যৌনপরিবর্তনকামী পুরুষ ব্রাত্য। তাই তারা সমাজের মূলস্রোত (Main Stream) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে বাধ্য হয়েই তারা তাদের যৌনসুখ চরিতার্থ করার জন্য হয় হিজড়ে সমাজে যাতায়াত করতে শুরু করে অথবা বেশ্যাবৃত্তি (Prostitution) গ্রহণ করে। এতক্ষণ আমরা আলোচনা করেছি ‘যৌনপরিবর্তন- কামিতা’ নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য কিনা এবং দেখেছি নৈতিকভাবে যৌন পরিবর্তনকামিতাকে সমর্থন না করার কোন জোরাল যুক্তি নেই। এখন আমরা আলোচনা করবো তাদের বেশ্যাবৃত্তি গ্রহণ করা নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য কিনা।

বেশ্যাবৃত্তির নৈতিকতার মূল্যায়ন :

যদি ধরে নেওয়া যায় যে, বৃত্তি হিসাবে বেশ্যাবৃত্তি নিন্দনীয় এবং অনৈতিক, তাহলে উপরোক্ত প্রশ্নের উত্তরটি সহজ হয়ে যায়— যৌনপরিবর্তনকামী পুরুষের বেশ্যাবৃত্তি গ্রহণ করা অনৈতিক। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, কোন যুক্তিতে বলা যায় বেশ্যাবৃত্তি অনৈতিক? অর্থাৎ সমাজে বেশ্যাবৃত্তি থাকাটা কি অন্যায়? অন্যায় হলে কেন তা অন্যায়? এইসব প্রশ্নের সদুত্তর না পেলে যৌন পরিবর্তনকামীর বেশ্যাবৃত্তি অবলম্বন করা ন্যায় না অন্যায় তা বোঝা যাবে না।

প্রথমে আমরা বুঝতে চেষ্টা করবো যারা বেশ্যাবৃত্তিকে অনৈতিক বলে ঘোষণা করেন তাদের কি কি যুক্তি থাকতে পারে। প্রাথমিকভাবে এই কথাই মনে হয় বেশ্যাবৃত্তি যাঁরা গ্রহণ করেন তাঁদের বেশিরভাগই স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেন না। তাঁদের জোর করে এই বৃত্তি গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়। যাঁরা বেশ্যালয় চালান তারা মানুষকে একটি পণ্য হিসেবে ব্যবহার করেন এবং শোষন করেন। মানুষকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা, তাকে শোষণ করা যে অনৈতিক তা সর্বজনস্বীকৃত।

কিন্তু প্রশ্ন উঠতে পারে— যদি কোন ব্যক্তি কারও শোষণের শিকার না হয়ে স্বেচ্ছায় বেশ্যাবৃত্তি গ্রহণ করে, তাহলেও কি তাকে অনৈতিক বলা যাবে? আমি যদি টাকার বদলে আমার শরীরকে ব্যবহার করতে দিই, সেটা আমার ব্যক্তিগত বিশেষ অধিকার বলেই দেব। অন্যে তার স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে আমার দেহকে পণ্য হিসেবে যদি ব্যবহার না করে, তাহলে আমি তো আর শোষিত নই। সেটা আমার টাকা রোজগারের একটা উপায় মাত্র। আমার শরীর ও মনের আমিই সার্বভৌম কর্তা। আমি এই শরীরকে কোন কাজে লাগাবো তা আমি ঠিক করবো। আমি কারখানার কর্মী হব না যৌনকর্মী হব তা আমার সিদ্ধান্তেই হওয়া উচিত। অন্যের সিদ্ধান্ত আমার উপর চাপানো শুধু অন্যায় নয়, অনৈতিকও বটে।

বেশ্যাবৃত্তির বিরুদ্ধে প্রধান প্রচলিত যুক্তিগুলি দুটি মতবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত : (১) বিবাহের বাইরে যৌন সম্বন্ধ অন্যায়, এবং (২) যে যৌনসম্বন্ধ প্রেমের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়, তা অন্যায়। এটি মতবাদের কোনটিই যে যুক্তিসিদ্ধ নয় তার ইঙ্গিত উপরের আলোচনা থেকে পাওয়া যাবে। সেখানে আমাদের মূল বক্তব্য এই ছিল যে, কোনরকম যৌন সম্পর্কই অনৈতিক বলে গ্রাহ্য হবে না, যদি না সেই সম্পর্ক কোন সর্বজনস্বীকৃত নৈতিক সূত্রের বিরোধী হয়। বেশ্যাবৃত্তিকে অনৈতিক বলতে হলে আমাদের দেখাতে হবে যে, ওই বৃত্তি কোন একটি সর্বজনস্বীকৃত নৈতিক সূত্রের বিরোধী। একটি সর্বজনস্বীকৃত নৈতিক সূত্র হচ্ছে—যদি কোনো মানুষ অপর একটি মানুষকে ‘শুধুমাত্র’ নিজের স্বার্থসিদ্ধির উপায় হিসাবে ব্যবহার করে তাহলে তা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এই নীতিটি প্রখ্যাত দার্শনিক ‘ইমানুয়েল কান্ট’—এর মতবাদ। কান্টের মতে, কোন ব্যক্তি যখন নিজের উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে অন্যকে ব্যবহার করে তখন তা অন্যায় নয়। কিন্তু যখন সে ‘শুধুমাত্র’ নিজের উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে তাকে ব্যবহার করে তখনই তা অন্যায়।

যে-ব্যক্তি নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও বেশ্যাবৃত্তিতে নিয়োজিত হতে বাধ্য হয়, সেখানে বেশ্যাবৃত্তিকে নৈতিকভাবে সমর্থন করা যায় না। কিন্তু কেউ যদি স্বেচ্ছায়, জেনেশুনে, তার স্বাধীনতা ও স্বায়ত্ততাকে ক্ষুণ্ণ হতে না দিয়ে বেশ্যাবৃত্তি গ্রহণ করে, তাহলে তা নৈতিকভাবে অন্যায় বলা যায় না।

বেশ্যাবৃত্তি বা যৌনবৃত্তি বিষয়ে উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এখন আমাদের বিচার করতে হবে যৌন পরিবর্তনকামী পুরুষের যৌনবৃত্তি অবলম্বন করা নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য কি না। এই প্রশ্নের উত্তরও এইভাবে দেওয়া যায়। যে যৌনপরিবর্তনকামী পুরুষ স্বেচ্ছায় যৌনবৃত্তি অবলম্বন করে, তার এই কাজকে অন্যায় বলা যায় না।

এই প্রসঙ্গে একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। যৌন পরিবর্তনকামী পুরুষ সমাজের এক কোনায় অত্যন্ত প্রান্তিকভাবে অবস্থান করে। কিন্তু তার এই মানসিকতা স্ব-ইচ্ছায় হয়নি। এটাকে বরং প্রকৃতির খেয়াল বলা যেতে পারে। প্রকৃতির এই খেয়ালি-সৃষ্টি যৌন পরিবর্তনকামী পুরুষ তাহলে কি করবে? তারও অন্যান্য মানুষের মতো যৌনসুখ ভোগ করার অধিকার আছে। এই অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করা কখনই নৈতিক সমর্থন পেতে পারে না। সমাজের মূলস্রোতে রেখে সমাজ যদি তাকে তার মনোমত সঙ্গী খুঁজে নিতে সাহায্য করতো, তাহলে হয়তো তাকে যৌনবৃত্তি গ্রহণ করতে হত না। তাই এক্ষেত্রে সমাজই দায়ী। আগেই আমরা বলেছি, যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কাউকে বেশ্যাবৃত্তি গ্রহণে বাধ্য করে, সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানই অন্যায় করছে। এখানে বাধ্য করার অর্থ এই নয় যে, তার অজান্তে তাকে জোর করে বেশ্যাবৃত্তি গ্রহণ করতে বাধ্য করা। এক্ষেত্রে যৌনবৃত্তি অবলম্বন না করার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে না ঠিকই। কিন্তু অপরপক্ষে এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি করা হচ্ছে যে, সে নিজের স্বাভাবিক জৈবিক প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্যে যৌনবৃত্তি অবলম্বন করছে। অথচ কোন বিপরীত মানুষকে তার স্বাভাবিক যৌনপ্রবৃত্তির চরিতার্থতার জন্যে সমাজের বাইরে গিয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকতে হচ্ছে না। যৌনপরিবর্তনকামী পুরুষও মানুষ, বিপরীত ব্যক্তিরাও মানুষ। তবে একজন মানুষকে লোকচক্ষুর আড়ালে গিয়ে যৌনবৃত্তি অবলম্বন করে তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি চরিতার্থ করতে হচ্ছে কেন এবং অপরজনকে তা করতে হচ্ছে না কেন— এই প্রশ্নের উত্তরে কেউ যদি বলে এটি বৈষম্য মূলক আচরণ এবং একে নৈতিকভাবে সমর্থন করা যায় না। তাহলে কি খুব অন্যায় হবে?

প্রশ্ন উঠতে পারে— কিভাবে এই বৈষম্য দূর করা যায়? এর উত্তরে অন্ততঃ একথা বলতেই হবে যে, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী পালটাতে হবে, যে দৃষ্টিভঙ্গী একটি নির্দিষ্ট কৃষ্টির ফসল। যাকে আমরা কৃষ্টি-বিপ্লব (Cultural revolution) আখ্যা দিতে পারি।

* উপাচার্য, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।

* মনঃসমীক্ষক ও জাতীয় শিক্ষক

* সদস্য, কাউন্সেল ক্লাব, কলকাতা।

* প্রোজেক্ট ম্যানেজার, ‘প্রাজক ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি’, কলকাতা

* প্রাক্তন অধ্যক্ষ, কলকাতা মেডিকেল কলেজ এবং বিভাগীয় প্রধান, ফরেনসিক এন্ড স্টেট মেডিসিন। সম্পাদক, ‘Journal of Indian Academy of Forensic Sciences.’

* লেখক পুরুষ যৌনকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করছেন। HIV/AIDS সম্পর্কিত নানা সংগঠনের সঙ্গে তিনি যুক্ত। Marginalized Communityদের সঙ্গে তিনি নানা কাজ করছেন।

* বিভাগীয় প্রধান, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।

* অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *