৮. এইডস

৮. এইডস

‘এইডস (AIDS) একটি মারণব্যাধি, যা হলে মৃত্যু অবধারিত। বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম ও সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে আমরা এইডস বিষয়ে ধীরে ধীরে অনেক কথাই জানতে পারছি। বড় শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামেও এইডস-এর ওপর নানা কর্মশালা ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হচ্ছে। কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও এই রোগ সম্পর্কে কিছু ভ্রান্ত ধারণা এখনো আমাদের মধ্যে থেকে গেছে। এবং তা অত্যন্ত বদ্ধমূল।

এইরকম একটি ধারণা হল শুধুমাত্র পুরুষে পুরুষে সঙ্গমের মধ্য দিয়েই ‘এইডস’ সংক্রামিত হয় ও তার প্রসার ঘটে। এইডস— এর আবির্ভাব ও সে সম্পর্কে গবেষণার বিভিন্ন পর্যায়কে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে কি ভাবে পুরুষ যৌনকর্মী তথা সমস্ত সমকামী মানুষ এই ভ্রান্ত ধারণার শিকার হয়েছে।

১৯৮০ সালের আগে এইডস সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের কোন ধারণা ছিল না। তার অর্থ এই নয় যে, এই সময় এইডস এগিয়ে আসছিল। সর্বপ্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা এই রোগের অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এই রোগে আক্রান্ত হলে দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অনাক্রমতা (Immunity) থাকে না। ফলে নানারকম রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা যায়। এই রোগের লক্ষণগুলি হল— ইনফ্লুয়েনজা, পেশিতে যন্ত্রণা, অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, গায়ে খুব ‘ছোট লাল রং-এর ছোপ-ছোপ দাগ। এর সঙ্গে থাকে পেটে ব্যথা ও পাতলা মল। কোন কোন রোগীর হাত-পায়ে পক্ষাঘাতের লক্ষণ দেখা যায়। কিছু রোগীর ম্যানেনজাইটিস বা কেন্দ্রীয় স্নায়ু (Central Nervous sysstem) অবশ হতেও দেখা যায়। আবার দীর্ঘদিন (১০-১৫ বছর) এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার পরেও কিছু-কিছু ব্যক্তির মধ্যে রোগের লক্ষণের প্রকাশ নাও ঘটতে পারে।

১৯৮১ সালের জুন মাসে ক্যালিফোর্নিয়ার (California) Dr. Michael Gottlib-এর অধীনে নিউমোনিয়াতে (Pnuimonia) আক্রান্ত ৫ জন রোগীকে ভর্তি করা হয়। প্যাথোলজিক্যাল টেস্ট (Pathological test) থেকে জানা যায়, এই রোগীরা নিউমোসিসটিস কারিনি নিউমোনিয়ায় (Pneumocystis carinnipneumonia) আক্রান্ত। বিভিন্ন ধরণের ওষুধ প্রয়োগে কোনরকম সুফল পাওয়া যায় না। বরং রোগীদের অবস্থা দিনে দিনে খারাপ হতে থাকে। ওই বছর ওই একই হাসপাতালে দুরারোগ্য ক্যানসার-এ আক্রান্ত ২৬ জনকে ভর্তি করা হয়। এরা সকলেই যুবক। যে ধরণের ক্যানসারে এরা আক্রান্ত হয়েছিল তাকে ডাক্তারি পরিভাষায় বলা হয় ক্যাপোসিস সারকোমা (Kaposis Sarcoma)। অস্ট্রিয়ার চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ Dr. Moritz Kaposi-এর নাম অনুসারে এই রোগের মাইক্রবস (জীবাণু)-এর নাম রাখা হয়। আসলে এই রোগ এক বিশেষ ধরণের চর্মরোগজনিত ক্যানসার। এতে আক্রান্ত হলে ত্বকের বিভিন্ন স্থানে নীল ও বাদামী রং-এর ক্ষতের সৃষ্টি হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এর আগে যারা এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন তারা শারীরিক ভবে দুর্বল এবং স্বভাবতই এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম ছিল। কিন্তু এখানে ঘটনা ঠিক উল্টো। সবল সুস্থ যুবকরাই এই রোগে আক্রান্ত হতে থাকে। ফলে চিকিৎসকেরা ধন্দে পড়ে যান এবং নতুনভাবে ভাবনা-চিন্তা শুরু করেন। ভর্তি হওয়া মোট ৩১ জন (৫+২৬) রোগীর পুনরায় প্যাথোলজিক্যাল টেস্ট (Pathological test) হয়। এই টেস্ট থেকে জানা যায় এরা প্রত্যেকেই কোন না কোন যৌনরোগে (Sexually Transmitted discase/STD) আক্রান্ত। একান্ত আলাপচারিতায় চিকিৎসকেরা রোগীদের সঙ্গে গভীর সখ্যতা গড়ে তোলেন এবং এদের ব্যক্তিগত যৌনজীবন সম্পর্কে অনেক তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এর থেকে জানা যায়, এরা সকলেই সমকামী। বহু পুরুষের সঙ্গেই এরা প্রায়ই সঙ্গমে লিপ্ত হয়।

ইতিমধ্যে প্রচার মাধ্যম ব্যাপকভাবে প্রচার শুরু করে যে, সমকামীদের বাছবিচারহীন যৌন সম্পর্কই মানুষের শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। এবং এর জন্যেই অন্য যে কোন রোগে দ্রুত আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রকট। বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণিত না হলেও সাধারণের মধ্যে এই ধারণাই বদ্ধমূল হতে থাকে যে, সমকামিতাই এই রোগের মূল কারণ। তাই এই রোগের কিছু চটজলদি বাজারি নামকরণ হল GRID (Gay related immune deficiency), Gay Plague ও Gay Cancer.

প্রচার মাধ্যম যাই বলুক, বিজ্ঞানীরা কিন্তু থেমে নেই। এবার তারা হাত বাড়ালেন এমন কিছু মানুষের দিকে যারা ইন্টার ভেনাস ড্রাগে আসক্ত। এদের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন যে, এদের অনেকেরই রক্তের অনাক্রমতা (immunity power) কম। শুধু তাই নয় নানারকম রোগে এরা ভুগছে, যা কোন ওষুধ ব্যবহারে নিরাময় হচ্ছে না। এছাড়াও বিভিন্ন লালবাতি অঞ্চলের মহিলা যৌনকর্মী ও তাদের খদ্দেরের ওপর সমীক্ষা চালিয়েও কিছু কিছু ক্ষেত্রে একই ধরণের রোগের সন্ধান পাওয়া যায়। এরপর বিজ্ঞানীরা হিমোফিলিয়ায় (Haemoplilia) আক্রান্ত কিছু ব্যক্তির ওপর পরীক্ষা চালান। আশ্চর্যের বিষয় এখানেও দেখা গেল রক্তের অনাক্রমতার অভাব। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, হিমোফিলিয়া (Haemophilia) একটি বংশগত রোগ। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের একবার রক্তক্ষরণ শুরু হলে তা বন্ধ হয় না। অর্থাৎ রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষমতা নেই। (সাধারণত রক্ত জমাট বাঁধার সময় ২ থেকে ৫ মিনিট)।

বিভিন্ন রুচি ও অভ্যাসের মানুষের মধ্যে গবেষণা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা একথা প্রতিষ্ঠা করতেও সক্ষম হলেন যে, সমকামিতাই এই রোগের কারণ নয়। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে সমকামিতা সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা ভাঙতে থাকে। এর আরও প্রমাণ পাওয়া যায় আফ্রিকার উগাণ্ডা (Uganda) দেশের রাকাই (Rakai) জেলায়। এখানকার কিছু যুবক দুর্বল ও শীর্ণকায় হতে থাকে। এদেরও কোন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল না। কিগালি (Kigali), রোয়াণ্ডা (Rwanda) কিনসাসা (kinshasha) প্রভৃতি স্থানে এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। লক্ষ্য করার বিষয়, এইসব রোগীরা সমকামী নয়। নতুন এই রোগের নাম দেওয়া হয় ‘স্লিম রোগ’ (slim disease)।

ভারতে এইডস (স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক)

ভারতে এইডস
ভারতে এইডস

১৯৮২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় অবস্থিত ‘Centers for Disease Control’ এই রোগের নামকরণ করে AIDS (Acquired immuno deficiency syndrome)। GRID-এর অপবাদ থেকে মুক্ত হল সমকামী মানুষরা। কিন্তু তখনও পর্যন্ত এই ভাইরাসের কোন সুনির্দিষ্ট নাম দেওয়া সম্ভব হয়নি। ১৯৮৩ সালে প্যারিসের Pasteur Institure-এর ল্যুঁ মতানিয়রে (Luc Montagnier) এই ভাইরাসের নাম দিলেন লিমফো এডিনোপ্যাথি অ্যাসোসিয়েটেড ভাইরাস (Lymphadenopathy Associated viras/LAV)। এরপর ১৯৮৪ সালে আমেরিকার National Cancer Research Institute-এর বিজ্ঞানী রবার্ট গ্যালো (Robert Gallo) একটি ভাইরাসের কথা উল্লেখ করেন। এর নাম দিলেন হিউম্যান টি সেল লিমফোট্রফিক ভাইরাস (Human T cell Lymphotropic Virus/HTLV III)। ল্যুঁ ও গ্যালো আবিষ্কৃত দুটি ভাইরাসই মূলত একই। ১৯৮৬ সালে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এইডস রোগ সম্পর্কে আলোচনা ও রোগের ভাইরাসের সুনির্দিষ্ট নামকরণ করাই ছিল এই সম্মেলনের মুখ্য উদ্দেশ্য। এখানেই এই রোগের ভাইরাসের নাম দেওয়া হয় HIV (Human Immuno deficiency Virus)

এই ভাইরাস (HIV) কেমনভাবে শরীরে ছড়িয়ে পড়ে তা নিয়েও বিজ্ঞানীরা নানা গবেষণা করেছেন। এই গবেষণা থেকে জানা যায় আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে অসুরক্ষিত যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে রোগসংক্রামিত হতে পারে। এজন্য সঙ্গমের সময় কণ্ডোম ব্যবহার করা একান্ত প্রয়োজন। এইডস রোগীর দেহে ব্যবহৃত সংক্রামিত সূচ ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করলেও এ রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। এছাড়া সংক্রামিত রক্ত ও সংক্রামিত মায়ের থেকে তার গর্ভের সন্তানের মধ্যেও এই রোগের অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে। অনেক সময় গভীর চুম্বন (deep/wet kissing)-এর মধ্যে দিয়েও এ রোগ সংক্রামিত হতে পারে। সংক্রামিত ব্যক্তিকে স্পর্শ করলে, একসঙ্গে থাকলে, সেবাশুশ্রূষা করলে, মশামাছি কামড়ালে এমন কি এক থালায় একসঙ্গে খেলেও এই রোগ ছড়ায় না।

ভাইরাস কণাকে ভিরিয়ন (virion) বলে। এদের দেহের ভিতর নিউক্লিক অ্যাসিড (RNA বা DNA) এবং প্রোটিন আবরণী দ্বারা গঠিত। ভাইরাসের দেহ প্রধানত তিনটি অংশে বিভক্ত। (i) ক্যাপসিড (Capsid) (ii) ভাইরাস জিনোম (Virus genome) বা নিউক্লিয়য়েড ও (iii) উৎসেচক (Enzyme)

ক্যাপসিড : এটি ভাইরাসের দেহের বাইরের আবরণ। একই প্রকার অসংখ্য প্রোটিন অণু একক (Protein sub unit) বা ক্যাপসোমিয়ার (Capsomere) দ্বারা গঠিত। এরা নিজস্ব পদ্ধতিতে বিন্যস্ত থাকে। যেমন— বেলনাকার, কীলকাকার (কণ্টক), বতুলাকার প্রভৃতি। ক্যাপসিডের কাজ হল নিউক্লিয়য়েডকে রক্ষা করা।

নিউক্লিয়য়েড : ভাইরাসের নিউক্লিয় অ্যাসিড অংশকেই বলে নিউক্লিয়য়েড বা ভাইরাস জিনোম। এই অংশটি যে কোন একট্রকার নিউক্লিক অ্যাসিড দিয়ে গঠিত। যেমন DNA (ডি অকাসি রাইবো নিউক্লিয় অ্যাসিড), RNA (রাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড)।

ভারতে এইডস

‘এইডস ভাইরাস’ (HIV)

DNA কিংবা RNA কখনই একই ভাইরাসে থাকে না। নিউক্লিক অ্যাসিডের বিন্যাস প্রধানত রৈখিক (linear)। কিন্তু পোষক দেহে প্রবেশের পরই গোলাকার হয়। নিউক্লিয়য়েডের কাজ রোগের বিস্তার ঘটানো।

উৎসেচক : ভাইরাসের দেহে বিশেষ ধরণের উৎসেচক থাকে। লিপিড, কার্বোহাইড্রেটও থাকে। যেমন— ফাজ ভাইরাসে লাইসোজাইম, প্রাণী ও পতঙ্গ ভাইরাসে DNA বা RNA পলিমারেজ এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসে নিউরোমিনিডেজ নামক উৎসেচক থাকে।

ভাইরাসের উৎপত্তি সম্পর্কে সাধারণত তিনটি মতবাদ প্রচলিত আছে। অকোষীয় মতবাদ, পরজীবীতাজনিত মতবাদ এবং জিনজনিত পদার্থভিত্তিক মতবাদ। শেষের জিনজনিত মতবাদই বেশি গ্রহণযোগ্য। এই মতবাদে বলা হয়েছে, পোষক কোষের জিনঘটিত পদার্থের (Genetcal materical) অংশ থেকে ভাইরাসের উৎপত্তি। এই পোষক কোষের মধ্যেই ভাইরাস দ্রুত বিভাজিত হয়ে সংখ্যা বৃদ্ধি করে। ফলে সংশ্লিষ্ট কোষ রোগাক্রান্ত হয়ে মৃত্যু ঘটতে পারে। এই পোষক কোষের মৃত্যুর ফলে ভাইরাস পুনরায় বাইরে চলে আসে।

HIV ভাইরাস শরীরের কতকগুলি নির্দিষ্ট স্থানে বাসা বাঁধে। এগুলি হল— মস্তিষ্কের কোষসমূহ, লসিকাগ্রন্থি, থাইমাস গ্রন্থি, ফুসফুস, ক্ষুদ্রান্ত, চামড়া, রক্ত, অস্থিমজ্জা, এবং পুরুষের বীর্যরস ও নারীর যোনিরস।

কিভাবে এই ভাইরাসের জন্ম হল সে সম্পর্কে চারটি মতবাদ আছে। তবে এরা কোনটিই সর্বজন স্বীকৃত নয়। তত্ত্বগুলি হল—

বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীতত্ত্ব (Isolated community theory) : এই তত্ত্ব বলে, কোন একটি বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই রোগের জীবাণু ছিল। কিন্তু সেই সব ব্যক্তিরা এই রোগের কেবলমাত্র ধারক। পরবর্তীকালে তাদের সংস্পর্শে এসে অন্য ব্যক্তিদের মধ্যে এই রোগ সংক্রামিত হয়ে পড়ে।

জীবাণু যুদ্ধের তত্ত্ব (Germ monkey theory) : এই মতবাদ অনুসারে ১৯৯৬ সালে পূর্ব জার্মানির একদল বিজ্ঞানী এই মতবাদ প্রতিষ্ঠা করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই এই জীবাণু কৃত্রিম ভাবে তৈরি করে। এবং তারাই সারা পৃথিবীতে তা ছড়িয়ে দেয়।

সবুজ বাদর তত্ত্ব (Green monkey theory) : এই মতবাদের প্রবক্তরা মনে করেন, ইঁদুর যেমন প্লেগের জীবাণু বহন করে ঠিক তেমনই আফ্রিকার সবুজ বাঁদরেরাও এই ভাইরাস বহন ও সংক্রমণ করে।

পরিব্যক্তিতত্ত্ব (Mutation theory) : জিনের মধ্যে হঠাৎ পরিবর্তনকেই বলে পরিব্যক্তি বা মিউটিশান। সাধারণ ভাইরাসের মধ্যে মিউটিশানের ফলে বিশেষ জাতীয় ভাইরাসের জন্ম হয়, বা এইডস রোগের জন্য দায়ী। এই মিউটেশান তত্ত্বের প্রবক্তা হিউগো-ডি-ভ্রিস (Hugo-de vrides)।

HIV কোথা থেকে এলো সেই বিতর্কে না গিয়ে কেমনভাবে এই রোগের হাত থেকে আমরা মুক্ত হবো সে সম্পর্কে ভাবাটাই বোধ হয় সমীচীন। তাই জাম্বিয়ার প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি মন্তব্য করেন, ‘‘It is not important to know where it comes from but rather where it is going’’.

HIV-এর গতি অপ্রতিরোধ্য। তার গতিকে স্তব্ধ করার মতো কোন ওষুধ এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। ফলে যার শরীরের AIDS প্রবেশ করবে তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু বিজ্ঞানীরা থেমে নেই। সম্প্রতি আফ্রিকা কেনিয়া থেকে প্রকাশিত East African Medical Journal -এ AIDS নিরাময়ের ওষুধ আবিষ্কারের কথা প্রকাশ করা হয়েছে। কেনিয়ার চিকিৎসাবিজ্ঞানী জোসেফ চেগী (Joseph Chege) ‘চেতন’ (Cheetan) নামে একটি ওষুধ আবিষ্কার করেছেন। তিনি আশা করেন এই ওষুধে প্রাথমিক কিছু প্রতিক্রিয়া থাকলেও, আগামীদিনে এই ওষুধই এইডস-কে প্রতিহত করতে পারবে।

আমেরিকার National Institute of Alergy and infectious disease-এর কর্ণধার অ্যান্টনি ফসি জানিয়েছেন HIV ভাইরাসকে প্রতিহত করার জন্যে এক বিশেষ ধরণের উপকারী ভাইরাসকে তৈরি করা হয়েছে, যে ভাইরাস HIV-কে ধ্বংস করতে পারবে। এই উপকারী ভাইরাসটি গরুর পাকস্থলীতে পাওয়া যায়। গরুর ক্ষেত্রে এটি অপকারী। কারণ এই ভাইরাস গরুর দেহে ক্ষুধামান্দ্য (Loss of Apetite) সৃষ্টি করে। ভাইরাসটির নাম হল ভেসিকিউলার স্টোমাটিটিস ভাইরাস (VSV) এই ভাইরাসকে জৈব রাসায়নিক ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে আক্রান্ত রোগীর দেহে প্রবেশ করালে HIV ধ্বংস করে দেয়। তবে এই ওষুধ ডাক্তারদের হাতে আসতে অনেক দেরি। কারণ ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে গবেষণা চলছে। VSV যদি মানুষের শরীরে প্রবেশ করান হয় তাহলে গরুর মতো মানুষের দেহেও ক্ষুধামান্দ্য রোগ দেখা দেবে কিনা সে বিষয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এছাড়াও মানুষের দেহে VSV-কে নিষ্ক্রিয় করার মতো অ্যান্টিবডি আছে কিনা তা নিয়েও বিজ্ঞানীরা ভেবে দেখছেন।

১৯৯৬ সালে Anti Retroviral Therapy বা Cocktail therapy-এর উদ্ভাবন হয়। এর ফলে মারণব্যাধি এইডসকে প্রতিহত করা সম্ভব না হলেও অনিবার্য মৃত্যুকে পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু এই চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয় সাপেক্ষ। ফলে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের পক্ষে এই চিকিৎসার সুযোগ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

বিভিন্ন ধরণের ওষুধের সংমিশ্রণে যে চিকিৎসা চালানো হয় তাকে Cocktail Therapy বলে। মূলত দুই ধরণের Ant Hi drug আবিষ্কৃত হয়েছে।

(ক) Reverse Tramocriptase inhitors (RTI)

(খ) Protease inhabitors (PI)

(ক) RTI গ্রুপের ওষুধ হল—

(a) Azidothiamidine (AZT)

Alaxo ও Cipla তৈরি করে।

দিনে 100 mg. করে 5টি ক্যাপসুল থেকে হয়। প্রতিটির দাম (Alaxo) ২০.৫০/এবং (Cipla) ২৬.৫০ টাকা।

(b) D.Dc (De-deoxycytidine) Hivid.

(c) DDI (De-deoxyinocin) videx.

(d) 3-Tc (Lamivudine) Epivir.

(e) D4T (stavudine) Zerit.

(খ) PI গ্রুপের ওষুধ হল (Protease inhabitors).

(a) Squinavir (Invirase + Fortavase).

(b) Indinavir (crixivon).

(c) Ritohavin (crixivan).

(d) Nelfinavir (vircept).

এই ওষুধ নিয়ে কালোবাজারি শুরু হয়েছে। RTI গ্রুপের ওষুধ-এর এক মাসের কোর্সের দাম ২৫০-৫০০ ডলার। ভারতের কালোবাজারে ৯০০০-১১০০০ টাকা। PI গ্রুপের ওষুধের দাম ৫৭৮-৬৫০ ডলার। ভারতের কালোবাজারে এই ওষুধ বিক্রি হচ্ছে ২০,০০০-২২,০০০ টাকায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইংল্যান্ড থেকে এই ওষুধ ভারতে আসে। কখনো-কখনো কিছু এইডস রোগী বিভিন্ন সংস্থার কল্যাণে বিদেশে চিকিৎসার জন্যে যাওয়ায় সুযোগ পান। কিছুদিন চিকিৎসার পর, ওষুধ নিয়ে তারা দেশে ফেরেন। এবং নানা রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় কারণে অনেক সময়ই এই ওষুধ খাওয়া বন্ধ করেন। এরাই এই ওষুধ অনেক কম দামে বিক্রি করেন।

ককটেল থেরাপির আবিষ্কার ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমকামীদের মধ্যে এর প্রতিক্রিয়া কি তা নিয়ে কিছু সমাজবিজ্ঞানী গবেষণা শুরু করেছেন। James Dilley ও তাঁর সহকারীরা সানফ্রানসিসকোর ৫৪ জন সমকামীর সঙ্গে কথা বলেন। এদের মধ্যে ২৬ শতাংশ জানায় যে, এইডস এর ব্যাপারে তারা আতঙ্কিত নয়। তাদের বিশ্বাস এইডস হলে ককটেল থেরাপির সাহায্যে এর হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।

মুম্বই-এর পুরুষ যৌনকর্মীদের (হিজড়ে) ওপরে ডাঃ আই. এস. গিলাডা দীর্ঘ সমীক্ষা চালিয়ে লক্ষ্য করেছেন, এদের অধিকাংশই সমকামী যৌনব্যবসায় সঙ্গে যুক্ত। এবং এই কারণেই এরা মারণব্যাধি এইডস-এ আক্রান্ত হচ্ছে।

আমাদের দেশেও সমকামিতাকে এইডস-এর অন্যতম কারণ হিসেবে অনেকেই মনে করে। কিন্তু একথা যে ভ্রান্ত সে তা আগেই বলা হয়েছে। সাধারণ মানুষের এই ভ্রান্ত ধারণাকে দূর করায় জন্যেই কিছু শিক্ষিত সমকামী বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯৯২ সালের নভেম্বর মাসে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ‘The 2nd International Congress on AIDS in Asia and the Pacific”– সম্মেলনে ভারতের সমকামীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সমকামী নেতৃবর্গের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ পান। এবং সম্মিলিত প্রয়াসের মধ্য দিয়ে এইডস সম্পর্কে মানুষের মিথ্যা ধারণাকে পাল্টানোর জন্যে উপস্থিত প্রতিনিধিবৃন্দ প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন।

কিছু খানদান ধুরানীর কথা বাদ দিলে আমাদের দেশের সাধারণ ধুরানী ও পেশাগত ধুরানীদের (পুংযৌনকর্মী) এইডস সম্পর্কে ধারণা খুব একটা স্বচ্ছ নয়। বিভিন্ন সময় ক্রুসিংস্পটে (cruising spot) এদের সঙ্গে কথা বলেছি। এদের কথা থেকে মনে হয়েছে, এইডস-এর সঙ্গে পায়ুকাম তথা সমকামিতার কোন সম্পর্ক নেই। ওদের বিশ্বাস যোনি সঙ্গমেই কেবলমাত্র এইডস সংক্রামিত হয়। কিন্তু একথা এখানে উল্লেখ করা বিশেষ প্রয়োজন যে, সমকামী যৌন অভ্যাসের মধ্যে এইডস বা অন্য যে কোন ধরণের যৌনব্যাধি (STD) সংক্রমণের সম্ভাবনা থেকে যায়। কারণ পায়ুসঙ্গমে মলদ্বার ছিঁড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। ফলে রক্তের সঙ্গে মাইক্রবসের (জীবাণু) প্রবেশ করতে সুবিধা হয়। কিন্তু যোনি সঙ্গমে সংক্রমণের কোন সম্ভাবনা থাকে না। স্ত্রীসমকামীদের মধ্যে এইডস-এর সম্ভাবনা খুবই কম। তবুও যারা যোনিপথে ভাইব্রেটর ব্যবহার করে যৌনসুখ অনুভব করে তাদের মধ্যেই এইডস ও STD-এর সম্ভাবনা থাকে। কারণ একজনের ব্যবহৃত ভাইব্রেটর ভাল করে স্টেরিলাইজ না করে ব্যবহার করলেই ইন্টারভেনাস মাদক দ্রব্য ব্যবহারের ন্যায় এইডস-এর সম্ভাবনা থাকে। বর্তমানে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন (যারা পুরুষ যৌনকর্মীদের ওপর কাজ করছে) পুরুষ যৌনকর্মীদের এইডস এর হাত থেকে বাঁচার জন্যে কণ্ডোম ব্যবহার করার ব্যাপারে সচেতন করে তুলছে। আসলে পুরুষ যৌনকর্মীদের ধারণা কণ্ডোম জন্মনিয়ন্ত্রণের একটি উপায় মাত্র। এ ব্যাপারে চেন্নাই-এর শেখরের ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। হিজড়ে ও পুরুষ যৌনকর্মীদের মধ্যে তিনি কাউন্সেলিং ও অন্যান্য সেবামূলক কাজ করে চলেছেন। সবচেয়ে বিস্ময়কর হল, শেখরই ভারতের প্রথম স্বঘোষিত এইডস রোগী।

ভারতে এইডস

”উচ্ছৃঙ্খল যৌনজীবনই মৃত্যুর পরোয়ানা”

ভারতে এইডস

১. Hubley. J : 1995

These symptoms were then found in other sections of the population who were not homosexuals– haemophiliacs and intravenous drug injectors.

১. Gelada, 1:

The consative organism of AIDS is called HIV, the Human Immuno deficiency virus. It was discovered by Dr. Luc Montagnier of the Pasteur Institute of Paris in 1983 who named it as LAV and later was isolated by Dr. Robert Gallo of the National Institute of Health from U.S.A. who colled as HTLV-III.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *