৩. ব্যবসার সমাজতত্ত্ব

৩. ব্যবসার সমাজতত্ত্ব

সমকামী পুরুষ যৌনব্যবসার সমাজতত্ত্ব অত্যন্ত জটিল। কারণ, এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মান এক নয়। অত্যন্ত সংগোপনে এই ব্যবসা পরিচালিত হয়। দালালনির্ভর না হওয়ায় এই ব্যবসার বিভিন্ন ব্যক্তিদের পারস্পরিক সম্পর্ক খুব কমই প্রকাশিত হয়। গত কয়েক বছর আগে পর্যন্তও এরা প্রকাশের আলোয় আসতে চাইতো না। সামগ্রিক যৌনব্যবসা সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুরুষ যৌনকর্মীদের সামাজিক অবস্থান বিষয়ে আমরা ধীরে-ধীরে জানতে শুরু করেছি। তলিয়ে দেখার চেষ্টা করছি কী আছে এর ভিতরে। কৌতূহলের ভারী চাদর আজ অনেকটাই সরে যাচ্ছে।

১৯৯৭-এর নভেম্বরে কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ‘দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি’র উদ্যোগে যৌনকর্মীদের প্রথম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এখানে কলকাতার ১৫০ জন পুরুষ যৌনকর্মী অংশগ্রহণ করে। ওরা জানায়, কলকাতায় এরকম যৌনকর্মীর সংখ্যা ২০০০। ওরা ঐক্যবদ্ধ হতে চায়। পুলিশি ঝামেলা প্রতিহত করতে চায়। তাই ওরা ‘দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি’র সদস্য হওয়ার কথা ভাবছে। সম্মেলনে ওরা দাবি তোলে নারী যৌনকর্মীদের মতো ওদের জন্যেও গড়ে তুলতে হবে ‘দ্বিতীয় সোনাগাছি’। জোট বাঁধার আশায় ওরা আজ বিভিন্ন জেলা ও রাজ্যের পুরুষ যৌনকর্মীদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।

বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিকাঠামোর ওপর এই ব্যবসার সমাজতত্ত্ব বিশেষভাবে নির্ভরশীল। তাই সব দেশে এই ব্যবসার প্রকৃতি এক নয়। বিজ্ঞানসম্মত সমাজতাত্ত্বিক মূল্যায়নের মধ্যে দিয়ে এর রূপের পার্থক্য ধরা পড়বে।

আমাদের দেশের পুরুষ যৌনকর্মীরা ‘ধুরানী’ নামে পরিচিত। অবশ্য ‘ধুরানী’ শব্দের সঙ্গে নানা অর্থ যুক্ত হয়ে আছে। ব্যাপক অর্থে সমস্ত সমকামী ও রূপান্তরকামীকে এই নামে ডাকা হয়। এর সঙ্গে কোন হীনমন্যতা বা বে-আইনি-অনৈতিক কাজের সম্পর্ক নেই। বরং এর মধ্যে দিয়ে এক বিশেষ মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের গভীর স্বাজাত্যবোধ ফুটে ওঠে। নিজের গোষ্ঠীর মধ্যে ‘ধুরানী’ বলে পরিচয় দিয়ে তারা শ্লাঘা অনুভব করে। কিন্তু হিজড়ে দুনিয়ায় ‘ধুরানী’ বলতে ‘নারী’ যৌনকর্মীকেই বোঝায়। এখানে এই শব্দটি অশালীন অপভাষার (slang) অঙ্গ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। অনুমান ‘ধুর’ (আঞ্চলিক শব্দ) শব্দের সঙ্গে আনি /আনী প্রত্যয় যোগ করে ‘ধুরানী’ কথার সৃষ্টি হয়েছে।

আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক মর্যাদার স্কেলে আমাদের দেশের পুরুষ যৌনকর্মী বা ধুরানীদের চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়—

(ক) খানদান ধুরানী, (খ) লহরী ধুরানী, (গ) আদৎ ধুরানী, এবং (ঘ) আকুয়া ধুরানী।

শ্রেণিবিভাগ :

খানদান ধুরানী : অত্যন্ত ধনী পরিবারের রূপান্তরকামী ও সমকামী পুরুষরা খানদান ধুরানী হয়ে ওঠে। জীবনের প্রথমদিকে অর্থ উপার্জনটাই এদের কাছে মুখ্য ছিল না। পুরুষের সান্নিধ্য ও যৌনসুখের আকর্ষণে এরা এই পথে আসে। পরে অবশ্য অর্থ উপার্জনটাও সহজে হওয়ার কারণে এরা এই ব্যবসা ছেড়ে যেতে পারে না। এরা প্রায় সকলেই শিক্ষিত শুধু নয়, উচ্চশিক্ষিত এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্মানজনক পদেও আসীন। ভারতের বড় বড় শহরগুলির খানদান ধুরানীদের মধ্যে বেশ যোগাযোগ আছে। কোন নির্দিষ্ট স্থানে খদ্দের ধরার আশায় এদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় না। বলা যেতে পারে অগোছাল পুরুষ যৌনকর্মীদের ব্যবসায় এরা অনেকটাই গোছান মানুষ। পরিকল্পনামাফিক এরা কাজ করে। খদ্দেরের সঙ্গে এদের বোঝাপড়া যথেষ্টই। ব্যক্তিগত ডায়েরিতে এরা খদ্দেরের নামও লিখে রাখে। প্রত্যেকের জন্যে নির্দিষ্ট সময়ও ব্যয় করে। স্বাস্থ্য সম্পর্কে এরা যথেষ্ট সচেতন। যৌন ক্রিয়ার সময় এরা খদ্দেরকে কণ্ডোম পরতে বাধ্য করে। মহিলার বেশভূষা না পরলেও আচার-আচরণে নারীত্বের ভাব এদের কারুর কারুর মধ্যে সুস্পষ্ট। বড় চুল রাখা, চোখে সুরমা লাগানো, মুখে পাউডার, ঠোঁটে লিপস্টিকের টান প্রায় সকলেই দিয়ে থাকে। অনেকেই কানে দুল ও হাতে বালা পরে। খানদান পুরুষ যৌনকর্মীদের সংখ্যা কম থাকায় খদ্দেররা এদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে নেয়। অর্থাৎ এদের ফোন নাম্বারগুলি সব খদ্দেরদেরই জানা। শুধু কি তাই! বেশ কয়েকজন পুরুষ যৌনকর্মীদের কাছে পেজার থাকতেও দেখা যায়। মুম্বই, দিল্লী, কলকাতায় এমন কয়েকজনের সঙ্গেই আমাদের আলাপ হয়েছিল। কথাপ্রসঙ্গে এরা জানায় পেজারের মাধ্যমে খদ্দের ধরা সহজ এবং এটা খদ্দেররা পছন্দ করে বলেই তাদের এ ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। আসলে গোপনীয়তা রক্ষা করার জন্যেই এই জাতীয় ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছে। এটা কোন নতুন বিষয় নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইয়োরোপের বহুদেশেই পুরুষ যৌনকর্মীরা খদ্দেরের সঙ্গে সেলুলার ফোনে যোগাযোগ করে নেয়। বিশেষ সাংকেতিক ভাষায় কম্পিউটার চালিত টেলি যোগাযোগের মাধ্যমে খদ্দেরের সঙ্গে যৌনকর্মীর কথা হয়।

বিভিন্ন সময়ে সমীক্ষা থেকে দেখা যায়, এইসব খানদান ধুরানীদের সঙ্গে অভিজাত কলর্গাল বা নারী যৌনকর্মীদের যথেষ্ট মিল আছে। এসব ক্ষেত্রে যৌনব্যবসা চলে অত্যন্ত সংগোপনে। গণিকালয়ে বসবাসকারী নারী যৌনকর্মীদের ওপর সমীক্ষা চালানো এবং তথ্য সংগ্রহ করা অসাধ্য কিছু নয়। কিন্তু যারা ছদ্মবেশে পরিপাটি অভিজাত পোশাকের আড়ালে এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে তাদের খুঁজে বের করা এবং সে সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন করা খুবই কঠিন। বিখ্যাত সমাজ বিজ্ঞানী প্রমিলা কাপুরের ‘Life and world of call girls in India’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, সুপরিকল্পিত র‌্যাকেটের মাধ্যমে কলর্গালরা বড় বড় শহরের পাঁচতারা হোটেলে দেহ বিক্রি করতে যায়। এই একই রকম র‌্যাকেটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে খানদান ধুরানীরাও। দেশি, বিদেশি সমকামী পর্যটকদের মনোরঞ্জনের জন্যেই খানদান ধুরানীদের ডাক পড়ে। ব্যবসার স্বার্থে তাই এই সব কলর্গালদের সঙ্গে খানদান ধুরানীদের যে গোপন যোগসূত্র আছে সেকথা বলাই বাহুল্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইয়োরোপের বিভিন্ন দেশে এইসব অভিজাত সমকামী যৌনকর্মীরা কলবয় (call boy) নামে পরিচিত।

ব্যবসার সমাজতত্ত্ব

যৌনকর্মীদের প্রথম জাতীয় সম্মেললে অংশগ্রহণকারী পুরুষ যৌনকর্মীরা

শুধুমাত্র হোটেলেই নয়, ডাক পড়লে এরা খদ্দেরের বাড়িতে যায়। কখনো কয়েকঘণ্টার জন্যে, আবার কখনো সারাদিন এরা খদ্দেরের সঙ্গে তার বাড়িতে কাটায়। খানদান ধুরানীদের নির্দিষ্ট কোন রেট নেই। কাজের সময় ও প্রকৃতি অনুযায়ী এদের রেট বাড়ে-কমে। একবার সঙ্গমের রেট ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে। বিদেশি হলে এই রেট বেড়ে যায় ৮০০-১০০০ বা তার বেশি। সমকামী যৌনব্যবসায় প্রাক সঙ্গম ক্রিয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খদ্দেরকে নানাভাবে উত্তেজিত করা ও শারীরিক চাহিদা মেটানো এর মধ্যে পড়ে। এর জন্যে অবশ্য খদ্দেরকে আলাদা টাকা দিতে হয়। কাজ শুরুর আগে পাকাপাকিভাবে খদ্দেরের সঙ্গে কথা বলে নেওয়া হয়। কিন্তু স্থায়ী খদ্দেররা সকলেই নির্দিষ্ট রেটগুলি জানে। সেক্ষেত্রে দরকষাকষির কোন প্রয়োজন হয় না। অনেক সময় ঘণ্টা হিসাবেও রেট স্থির হয়। এক্ষেত্রে একটা অদ্ভুত বিষয় হল একসঙ্গে একাধিক ঘণ্টা থাকলে ঘণ্টা প্রতি রেট থেকে বেশ কিছু ছাড়ের ব্যবস্থা থাকে। অনেক খদ্দের আছে যারা এদের নিয়ে ‘টুর’-এ যায়। এবং বেশ কয়েকদিনও তারা বিভিন্ন জায়গায় কাটায়। সেখানে উঁচুদরে দেহ বিকায়। এ ব্যাপারে কথা হচ্ছিল নবীনচাঁদ বড়াল স্ট্রিটের ২৬ বছরের সুনীলের সঙ্গে। ও জানাল খদ্দেরের সঙ্গে যখন টুরে যায় তখন বন্ধু সেজে যায়। এক ঘরে থাকলেও হোটেল কর্তৃপক্ষের কোন সন্দেহ জাগে না। সঙ্গে থাকে কসমেটিক্স সেট। খদ্দেরের মর্জি অনুযায়ী বিভিন্ন সময় তাকে বিভিন্ন সাজে সজ্জিত হতে হয়। কখনো শাড়ি পরতে হয়। আবার কখনো সালোয়ার কামিজ। কখনো আবার শুধু বিকিনি।

খানদান ধুরানীদের অনেকেই বিউটিশিয়ানের কাজে বেশ পটু। মেয়েলি স্বভাবের এইসব ধুরানীদের হাতে কনে সাজানোর দায়িত্ব দেন অনেকে। কনে সাজানোর রেট বেশ উঁচু—১২০০-১৫০০ টাকা। কখনো কখনো আরও বেশি রেট হয়ে থাকে।

বড় শহরের অভিজাত পরিবারের অনেকেই গ্রুপ সেক্সের আনন্দে মেতে উঠেছে। একসঙ্গে বেশ কিছু নরনারী মিলিত হয়ে বিকৃতভাবে তাদের যৌনবাসনা চরিতার্থ করে। সমকামীরাও এই ব্যাপারে পিছিয়ে নেই। বেশ কয়েকজন সমকামী পুরুষ, কিছু উভকামী পুরুষ এবং কিছু মহিলাও গ্রুপ সেক্সে অংশগ্রহণ করে। গ্রুপ সেক্সের ব্যাপারটা বেশ জটিল।

লহরী ধুরানী : লহরী ধুরানীরা সাধারণত মধ্যবিত্ত পরিবার থেকেই আসে। এরা যৌন পরিবর্তনকামী পুরুষ। পুরুষ সঙ্গলাভের আশায় এরা এ ব্যবসায় নেমেছে। যদিও আজ অনেকের কাছেই এটাই উপার্জনের একমাত্র উৎস। পারিবারিক অসচ্ছলতার প্রতিচ্ছবি এদের চোখে মুখে। চেহারা একেবারেই সাদামাটা। তবে এদের মধ্যে যারা সুশ্রী, ব্যবসার সুবাদে অনেক সময় এরা খানদান ধুরানীতে পরিণত হয়। তবে এক্ষেত্রে শিক্ষাও যোগ্যতার অন্যতম মাপকাঠি। যৌনব্যবসা ছাড়া এদের অনেকেই ছোটখাট চাকুরি করে বা পৈতৃক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। সমীক্ষায় দেখা গেছে এদের শিক্ষার মান সপ্তম শ্রেণি থেকে স্নাতক স্তর পর্যন্ত।

ব্যবসার সমাজতত্ত্ব

খদ্দেরের আশায় কয়েকজন পুরুষ যৌনকর্মী

ব্যবসার সূত্রে শহরের গণিকালয়ে সাধারণ মহিলা যৌনকর্মীদের সঙ্গে এদের সম্পর্ক বেশ ভালই। অনেকটা ভাইবোনের মতো। একে অন্যকে খদ্দের যোগান দেয়। এবং ব্যবসা সম্পর্কিত নানা বিষয়ে আলোচনা করে। অনেকেই গণিকালয়ের কোন মাসির অধীনে পাকাপাকিভাবে থাকে। সমকামী খদ্দেরের চাহিদা মেটাতে মাসি এদের রাখেন। উপার্জিত অর্থের একটা অংশ মাসিকে দিতে হয়। আবার অনেকেই আছে আঁধিয়াদের মতো। আঁধিয়ারা হল— স্বাধীন পথচারী মহিলা যৌনকর্মী (street walker)। খদ্দেরকে নিয়ে এরা আগে গণিকালয়ের কোন মাসির কাছে যায়। প্রত্যেক মাসির অধীনে আছে কিছু বড় ঘর, যা কাপড়ের পার্টিশান দিয়ে ছোট ছোট খুপরিতে বিভক্ত। ক্ষণিকের আনন্দের স্বাদ মেটায় এখানেই। এই অাঁধিয়াদের মতোই লহরী ধুরানীরাও আসে এখানে। এদের রেট সাধারণত ১০০-১৫০ টাকা। এর ২৫% মাসিকে দিতে হয়। এছাড়া মাঝারি গোছের কিছু হোটেলেও লহরী ধুরানীরা যায়। এক্ষেত্রে রেটও বেশি হয়। তবে তা নির্ভর করে সম্পূর্ণই দরকষাকষির ভিত্তিতে। এদের খদ্দের সাধারণত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের মানুষ। গণিকালয়ে যাওয়া ছাড়াও খদ্দেরের মনোরঞ্জনের জন্যে সম্পূর্ণ নিজস্ব কায়দায় কিছু বিচিত্র নাইট ক্লাব গড়ে উঠেছে। সূর্য সেন স্ট্রিটের এমন একটি ক্লাবে আমাদের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল মুস্তাকিনের। মুস্তাকিনের কাছ থেকে জানা যায় এইসব নাইট ক্লাবে সরাসরি দেহদানের ব্যবসা চলে না। খদ্দেররা দুটি কারণে এখানে আসে (ক) পছন্দমতো ধুরানী খুঁজতে (খ) নেশাগ্রস্ত হয়ে ধুরানীদের সঙ্গে নাচ-গান করে হুল্লোড় করতে। বলা যেতে পারে এই ধরনের নাইট ক্লাবগুলি হল লহরী ধুরানীদের কাছে এক ধরণের কর্মীবিনিয়োগ কেন্দ্র। দালাল মারফত খবর পেয়ে এখান থেকে ধুরানীরা ছুটে যায় খদ্দেরের কাছে। টেলিফোন বা পেজার এদের কাছে স্বপ্ন। তাই এ ব্যবসায় দালালদের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সমীক্ষায় কলকাতার এরকম নয়টি নাইট ক্লাবের সন্ধান পাওয়া গেছে। খানদান ধুরানীদের তুলনায় এদের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সচেতনতা বেশ কমই। তবে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে এদের যৌন চিন্তাভাবনার পরিবর্তন ঘটেছে। এখনো অনেকেই পরিচিত খদ্দেরের সঙ্গে যৌনক্রিয়ায় কণ্ডোম ব্যবহার করতে বাধ্য করে না। কেবলমাত্র অপরিচিত খদ্দেরের ক্ষেত্রেই কণ্ডোম ব্যবহারের কথা বলে। খানদানদের সঙ্গে রেষারেষি না থাকলেও খুব একটা সুসম্পর্কও নেই।

আদৎ ধুরানী : সমকামী পুরুষ যৌনকর্মীদের একেবারে তলানী হল আদৎ ধুরানী। এদের আবার পৌনে আটটা ধুরানীও বলা হয়। বস্তুত ভারতের সর্বত্র এই বিশেষ প্রতিশব্দের ব্যবহার নেই। শুধুমাত্র কলকাতা শহরের গড়ের মাঠ, হাওড়া স্টেশন, ও স্টেশন সংলগ্ন সাবওয়েতে সমকামী মানুষদের মধ্যে পৌনে আটটা শব্দটি বহুল প্রচলিত। সন্ধের পরই কলকাতার ময়দান এলাকায় ঘোরাফেরা করলে সন্ধান মিলবে বহু নারী যৌনকর্মীর। খোলা আকাশের নীচে পলিথিন সিট পেতে এরা খদ্দেরকে সঙ্গ দেয়। রাত যত বাড়ে যৌনতার বিক্রিবাটাও তত বাড়ে। সাধারণত আটটা থেকে নটার মধ্যে বেশ কিছু পুরুষের দেখা মিলবে, যারা খদ্দের নয়। এদের কাছে বরং খদ্দের আসে। এরাই হল আদৎ বা পৌনে আটটা ধুরানী। কখন কিভাবে এ প্রতিশব্দের উদ্ভব হল তা সঠিক করে বলা যায় না। তবে মনে হয় সন্ধে পৌনে আটটার কাছাকাছি যেহেতু এদের দেখা মেলে তাই এরা পৌনে আটটা ধুরানী নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে। এদের চেহারায় কোন মাধুর্য নেই। অধিকাংশেরই বেশভূষায় দীনতার ছাপ স্পষ্ট। কুলি, মজুর ও ছোটখাটো হকার প্রভৃতি একেবারে নিম্নশ্রেণির সমকামী মানুষেরা এদের খদ্দের। কার্জন পার্ক, শিয়ালদহ ফ্লাইওভারের নীচে, বড়বাজারের রাজাকাটরার মোড়, পার্ক সার্কাস ময়দান, রবীন্দ্রসরোবরের টালিগঞ্জ সংলগ্ন এলাকা, বাবুঘাট প্রভৃতি এলাকায় সন্ধের পর খদ্দের ধরার আশায় এদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। সাধারণ মানুষের মধ্যে অপরিচিত চোখ এদের খুঁজে পাবে না। তবে জুহুরী চেনে জহর। খদ্দের মানুষটি ঠিক চিনে নেয় তার পছন্দের ধুরানীকে। ইঙ্গিতে কথাবার্তা। দরকষাকষি। তারপর নির্জন কোন স্থানে গিয়ে যৌনক্ষুধা নিবৃত্তি। ক্ষেত্রসমীক্ষার সময় আলাপ হয়েছিল আশিকের সঙ্গে। ও জানায়, খদ্দের বুঝে দর চড়াই। প্রতি ‘খেপে’* ১০-১৫ টাকা। এইসব ধুরানীরা বস্তিবাসী। অনেকেই রেললাইনের পাশে ঝুপড়িতে বাস করে। জোর করে কেউ এ ব্যবসায় আসেনি। ভিন্ন যৌনমানসিকতার কারণেই এ লাইনে এসে ভিড়েছে। তারপর একসময় এটাই প্রধান জীবিকা হয়ে উঠেছে।

এদের সঙ্গে খানদান ধুরানীদের আপাত কোন যোগাযোগ নেই। যৌনমানসিকতা এক হলেও অর্থনৈতিক অবস্থা এদের মধ্যে একটা অভেদ্য প্রাচীর গড়ে তুলেছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে এরা ভীষণ অবহেলিত। তীব্র মানসিক যন্ত্রণা ও উপেক্ষার মধ্যে এদের দিন গুজরান।

আকুয়া ধুরানী : আকুয়া ধুরানী বলতে হিজড়েদের বোঝানো হয়েছে। ভারতের বিভিন্নস্থানে পুরুষালি চেহারার নারীবেশধারী যে সব হিজড়েদের দেখি তারা কেউই জন্মগত যৌন প্রতিবন্ধী নয়। মুষ্টিমেয় কয়েকজন বাদে এরা যৌন পরিবর্তনকামী পুরুষ। স্বেচ্ছায় হাতুড়ে পদ্ধতিতে পুরুষাঙ্গ ছেদন করে হিজড়ে সেজেছে। প্রকাশ্যে এরা একথা স্বীকার করতে চায় না। নিজেদের যৌন প্রতিবন্ধী হিসেবে দাবী করে। অনেক সময় শিশু, কিশোর, এমনকি যুবকদের ধরে এনে বলপূর্বক পুরুষাঙ্গ ছেদন করে হিজড়ে বানানো হয়। এরা হিজড়ে হয়ে উপার্জনের যন্ত্রে পরিণত হয়। সমগ্র ব্যবস্থাটাই পরিচালিত হচ্ছে দুষ্ট মাফিয়া চক্র দ্বারা। মক্কা, মদিনা, জেদ্দায় শিশুপাচার হচ্ছে। এদের জোর করে ভিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। পাচার হচ্ছে আরও বহু শিশু। যাদের মরুভূমির প্রচণ্ড রোদে উট দৌড়ের প্রতিযোগিতায় হাত-পা বেঁধে উটের পিঠে বসিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়াও বিশ্বজুড়ে সক্রিয় নারীপাচার চক্র। মানুষ নিয়ে কেনাবেচার হাটে মুনাফা লোটে মাফিয়ারা। এই মাফিয়াদের সক্রিয়তায় গড়ে উঠেছে হিজড়ে ক্রয়বিক্রয়। প্রতি বছর অসংখ্য পুরুষকে এই ব্যবস্থার শিকার হতে হয়। সর্বভারতীয় হিজড়ে কল্যাণ সভার সভাপতি শ্রী ঘৈরাতীলাল ভোলা সমীক্ষা চালিয়ে এই তথ্য সংগ্রহ করেছেন। সব হিজড়েই এক নয়। চেহারা ও গায়ের রং অনুযায়ী এদের শ্রেণিবিভাগ করা হয়।

পারস্পরিক সম্পর্ক :

রূপান্তরকামী ও সমকামীদের সঙ্গে আমাদের দেশের হিজড়ে দলের সদস্যদের সম্পর্ক বেশ ভাল। বিশেষ করে যারা দেহব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। আসলে হিজড়েদলের একটা বড় অংশ হল রূপান্তরকামী ও সমকামী। এরাই তাদের গোষ্ঠীর মধ্যে ‘আকুয়া’ নামে পরিচিত। এরা চায় নিজেদের দলে সমমানসিকতাসম্পন্ন লোকের সংখ্যা বাড়ুক। আর তাই নানাভাবে এইসব সাধারণ সমকামী-রূপান্তরকামীদের নিজেদের গোষ্ঠীতে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চালায়। অন্যদিকে আবার রূপান্তরকামীদের অনেকেই স্বেচ্ছায় হিজড়ে দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। তবে এখানে একটা বিষয় লক্ষ্য করার মতো। তা হল, সম্পন্ন-শিক্ষিত কোন রূপান্তরকামী বা সমকামী পুরুষ হিজড়েদলে যোগ দিতে চায় না। আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যই এর কারণ। হিজড়েরা সাধারণত নিরক্ষর বা কম-শিক্ষিত। উচ্চশিক্ষায় কোন ‘রূপান্তরকামী-সমকামী’ হিজড়ে ডেরায় এসে এদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে পারে না। বাড়ির পরিবেশ অনুকূল নয়, আবার সব ছেড়েছুড়ে হিজড়েদের সঙ্গে মিশে যাওয়ার মতো সাহসও এদের নেই। ফলে এদের ব্যক্তি-জীবনের সমস্যা অনেক সময়েই ভয়াবহ হয়। অনেক বাবা-মায়েরা ছেলের ‘এই ব্যাপার’-এ বেশ সচেতন। চোখে-চোখে রাখেন, সবসময়। তাই বাড়ি ছাড়ার ইচ্ছে থাকলেও অনেকের পক্ষে তা সম্ভব হয়ে ওঠে না। অত্যন্ত প্রাচুর্যের মধ্যে মানুষ হওয়া অনেকের কথা হল— ওভাবে মেয়ে সেজে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বেলেল্লাপনা করা সম্ভব নয়। অনেকে আবার বলে— ওরা বস্তি-ঝুপড়ির লোক, ওদের সঙ্গে কী মিশবো! ওপর ওপর উদাসীন থাকলেও হিজড়ে সমাজের অনেক কথাই ওরা জানে। সাধারণ মানুষের মতো ওরা কিন্তু হিজড়েদের ‘জন্ম যৌন প্রতিবন্ধী’ হিসাবে দেখে না। ওরা জানে, হিজড়েরা ‘ওদেরই মতো’। কোথায় যেন একটা সূক্ষ্ম মানসিক সাযুজ্য রয়ে গেছে। বন্ধুর বন্ধু বা তার কোন বন্ধুর মাধ্যমে হিজড়েদের সঙ্গে সুতোর মতো যোগাযোগ আছে কারুর কারুর। এই সরু পথে খুবই স্বাচ্ছন্দ্যে অনেককিছুই আদানপ্রদান হয়। এই প্রসঙ্গে হিজড়েদের ভাষার কথা চলে আসে। হিজড়ে দুনিয়ায় এক ধরণের উপভাষার প্রচলন আছে। নিজেদের অনেক কথাকে গোপন রাখার জন্যে হিজড়েরা সকলের সামনে এই ভাষায় কথা বলে। একে ‘উল্টি’ বলে। পুরুষ যৌনকর্মীদের মধ্যে ব্যবহৃত উপভাষার সঙ্গে এই ভাষার অনেক মিল। সমস্ত শ্রেণির পুরুষ যৌনকর্মীরা এই ভাষাকে দারুণভাবে রপ্ত করেছে। শুধু তাই নয়, যৌনকর্মী নয় এমন সমকামীরাও এই ভাষা কম-বেশি ব্যবহার করে। ক্ষেত্র-সমীক্ষায় দেখা গেছে, গ্রামদেশে হিজড়েরা এই ভাষা জানলেও এর ব্যবহার হয় কম। অন্যদিকে, শহরাঞ্চলের পুরুষ যৌনকর্মী ও হিজড়েরা এই ভাষায় বেশি কথা বলে। এটাও লক্ষ্য করা গেছে, প্রচলিত নানা শব্দের বর্ণগুলিকে উল্টেপাল্টে প্রতিনিয়তই নতুন নতুন শব্দের জন্ম হচ্ছে। এবং পুরুষ যৌনকর্মীদের মধ্যেই এই নতুন শব্দ সৃষ্টি করার প্রবণতা বেশি।

পুরুষ যৌনকর্মী ‘আদৎ’দের সঙ্গেই হিজড়েদের বেশি যোগাযোগ। শিক্ষার মান ও অর্থনৈতিক অবস্থার ব্যাপারে মিল আছে বলেই এদের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে। হিজড়েরা নানাভাবে ‘আদৎদের দলে টানার জন্যে প্ররোচিত করে। হিজড়ে দলে মিশে গেলে নিরাপত্তাও অনেক বাড়ে। চট করে কেউ কটু কথা বলতে সাহস পায় না। তাছাড়া হিজড়ে সেজে থাকলে দেহব্যবসা ছাড়াও আরও নানা উপায়ে অর্থোপার্জন সম্ভব। তাই অনেক ‘আদৎ’ হিজড়ে হয়ে যায়। হিজড়ে দলে অন্তর্ভুক্তির পরই ‘আদৎ’-দের নাম হয় ‘আকুয়া’। আকুয়ারা খোজা নয়। তবে কিছুদিন হিজড়ে দলে থাকার পর এদের পুরুষাঙ্গ ছেদন করতে হয়। তখন এরা ‘ছিন্নি’ (অঞ্চলভেদে ‘ছিবড়ি’) বলে পরিচিত হয়ে ওঠে। পুরুষাঙ্গ ছেদন করার ভয়ে কোন-কোন ‘আদৎ’ হিজড়েদের এড়িয়ে চলে। এদের ধারণা লিঙ্গ খোয়া গেলে মৃত্যু হতে পারে। দেহব্যবসার পাশাপাশি কোন কোন ‘আদৎ’ ছোটখাটো চাকরি বা কাজ করে। তাদের ভয়, একবার হিজড়ে হয়ে গেলে তাদের ওই চাকরি হারাতে হবে। কারুর কারুর সাংসারিক দায়দায়িত্ব একটু বেশি। তারা ভাবে, হিজড়ে হয়ে গেলে এই দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করা যাবে না। অনেকের কাছে হিজড়ে জীবন মানে ভবঘুরে ছন্নছাড়া অবস্থা। আজ এখানে, কাল সেখানে। তাই এইসব আদৎরা হিজড়েদের সঙ্গে মিশে যেতে পারে না। সামাজিক মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রান্তিক হিসাবে পরিচিত হওয়ার ভয় অনেকেরই আছে। তাছাড়া আদৎদের নিজস্ব পরিচিতির জগতে ভিন্ন উপসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যার থেকে বেরিয়ে হিজড়ে দলের সদস্য হতে অনেকেই চায় না।

ব্যবসার সমাজতত্ত্ব

‘আদৎ’দের মাধ্যমে ‘খানদান’ ও ‘লহরী’দের সঙ্গে ‘আকুয়া’দের যোগাযোগ হয়। তবে উল্লেখ্য যে, ‘খানদান’দের সঙ্গে এমন যোগাযোগ কমই হয়ে থাকে। ‘লহরী’রা মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। এদের মেলামেশার জগৎ ‘আদৎ’দের তুলনায় বেশ আলাদা। এদের খদ্দেরও ভিন্ন। বিভিন্ন ‘ক্রুসিং স্পটে’ ঘোরাফেরা করার সুবাদে এদের সঙ্গে ‘আদৎ’দের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ‘লহরী’ হিজড়ে হয়েছে,— এমন ঘটনা ঘটে খুব কম।

আমাদের মধ্যে একটা ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, মেয়েলি স্বভাবের কোন ছেলেকে (transsexual) দেখলেই হিজড়েরা জোর করে টেনে এনে দলে ভিড়িয়ে নেয়। ওদের হাতের তালির নাকি অসাধারণ ঐন্দ্রজালিক আকর্ষণ-ক্ষমতা আছে। সাধারণ তালির থেকে এই তালি আলাদা। এর আওয়াজও বিকট। বাম হাতের তালির ওপর ডান হাতের তালি নব্বই ডিগ্রি করে সজোরে বাড়ি দেওয়ার ফলে দুই তালুর মাঝের হাওয়া সরে যায়। ফলে শব্দ হয় একেবারে ভিন্ন রকম। এই তালি শুনে নাকি ঘরে থাকা কোন রূপান্তরকামী ও সমকামী ঠিক থাকতে পারে না। বিচলিত হয়ে ওঠে। ঘর ছেড়ে, সংসার ছেড়ে সে বেরিয়ে আসে। যোগ দেয় হিজড়ে দলে। হিজড়েদের কথাও তাই। কিন্তু এই কথার কোন বৈজ্ঞানিক সত্যতা নেই। আসলে হিজড়েদের তালি জানিয়ে দেয়— এলাকায় ‘ওরা’ এসেছে। ফলে ওই মানসিকতার যারা, তারা তো ওদের দেখবেই। দেখে ভাল লাগে। একাত্মতা অনুভব করে।

কীভাবে এ পথে আসে?

রূপান্তরকামী ও সমকামীরা কৈশোরে তাদের বন্ধুদের নানাভাবে যৌন খেলায় প্ররোচিত করে। হস্তমৈথুন, মুখমৈথুন শুরু হয়। অনেক সময় এইসব ঘটনা জানাজানিও হয়ে যায়। অভিভাবকেরা সতর্ক হন। ফলে এই বিশেষ যৌন-ইচ্ছা অবদমিত হয়। কিন্তু অত্যন্ত সংগোপনে তা অবচেতন মনে লালিত হতে থাকে। কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে এই ইচ্ছা আরও বাড়ে। এখানে স্বাধীনতাও আগের চেয়ে বেশি। পরিচিতির গণ্ডি বাড়তে থাকে। নতুন মানুষের সঙ্গে মেলামেশার সুবাদে পুরনো ইচ্ছা আবার জেগে ওঠে। অন্যদিকে কিছু বয়স্ক পুরুষ আছে যারা এদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। এখানে প্রেম-মহব্বতের থেকে শারীর সুখই বড় কথা। এক পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক দীর্ঘদিন টেকে না। তীব্র মানসিক যন্ত্রণা এদের কুরে-কুরে খায়। কিন্তু মিলনের আকাঙ্ক্ষা প্রবল। ফলে নতুন নতুন পুরুষে উপগত হওয়াটা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়। এইভাবে শরীর নিয়ে খেলা করতে করতে কখন যে এই পথে নেমে আসে তা এরা নিজেরাই জানে না।

না-চাইতেই এরা যৌনসঙ্গীর কাছ থেকে কিছু উপহার পেয়ে থাকে। শারীর সুখের পাশাপাশি উপহার পাওয়াটা হয় বাড়তি লাভ। ‘উপহার না দিলে শরীর দেবো না’— অনেকসময় যৌনসম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে এমনটাই হয়ে থাকে। সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে উপহারের রূপ বদলায়। উপহারের স্থানে আসে নগদ টাকা। রূপান্তরকামী বা সমকামী পুরুষটি বুঝতে পারে বাজারে তারও চাহিদা আছে। কদর আছে। ফলে দেহদানের সময় খদ্দের বুঝে সে মোটা অঙ্কের টাকা দাবী করে। যা ছিল একসময় শুধুমাত্র যৌন-আনন্দ, তা হয়ে দাঁড়ায় উপার্জনের উৎস। ধীরে ধীরে এইভাবেই এরা অর্থ-উপার্জনের ধান্দায়া মেতে ওঠে। পরিচিত হয়ে ওঠে পুরুষ যৌনকর্মী হিসাবে।

ছোট বয়সে রূপান্তরকামী ও সমকামীদের মধ্যে অনেকেই নিকট আত্মীয়ের দ্বারা ধর্ষিত হয়। লোক জানাজানির ভয়ে একথা সে কাউকে জানায় না। অন্যদিকে আত্মীয়টি নানাভাবে তাকে প্রলুব্ধ করে এবং সঙ্গমে লিপ্ত হয়। এইভাবে পুরুষের সান্নিধ্যে তার মধ্যে নতুন অনাস্বাদিত সুখানুভূতির জন্ম হয়। এরপর নিজে স্বেচ্ছায় পুরুষের সঙ্গে মিলিত হতে চায়। এবং একটা সময় আসে যখন এর থেকে সে বিরত হতে পারে না। ভিতরকার সুপ্ত যৌনেচ্ছার প্রকাশ ঘটতে থাকে। এইভাবেই সমমানসিকতার বন্ধু-বান্ধবদের হাত ধরে একসময় সে এ পথে এসে দাঁড়ায়।

ভারতের বিভিন্ন লালবাতি এলাকায় সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, সেখানে নারী যৌনকর্মীদের পাশাপাশি কিছু পুরুষ যৌনকর্মী এ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এইসব পুরুষ যৌনকর্মীদের মায়েরা এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। রূপান্তরকামী হওয়ার কারণেই এরা উত্তরাধিকার সূত্রে মায়ের ব্যবসাই গ্রহণ করে। যেমন নারী যৌনকর্মীর মেয়েরা অধিকাংশই এই ব্যবসায় নেমে পড়ে। অবশ্য যারা রূপান্তরকামী নয় তারা দালাল বা মস্তানে পরিণত হয়। লালবাতি অঞ্চলে এইসব রূপান্তরকামীদের হাত ধরেই অন্য এলাকায় কিছ সমকামী ও রূপান্তরকামীরা এখানে আসা শুরু করে। প্রথম প্রথম এরা বিভিন্ন ধরনের পুরুষের সঙ্গ লাভের জন্যেই আসে। পরে অবশ্য সহজে কিছু উপার্জনের জন্যেই এখানে নিয়মিত আসা শুরু করে। এবং দেহদানকে ব্যবসা হিসাবে ধরে নিয়ে পুরুষ যৌনকর্মী হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠে।

হত দরিদ্র পরিবারের সমকামী ও রূপান্তরকামীদের অবস্থা মর্মান্তিক। এখানে শরীর ও মনের ক্ষুধার সঙ্গে রয়েছে পেটের জ্বালা। অভিভাবকহীন জীবনে এদের অনেকে বাছ-বিচারহীন যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হয়। পথশিশুদের অনেকেই সমকামী বহু মানুষের কাছে সামান্য অর্থের বিনিময়ে দেহদান করে। এতে তারা আরামও যেমন পায়, তেমনি অর্থও উপার্জন করে। ধীরে ধীরে তারা এই কাজে পটু হয়ে ওঠে এবং পুরুষ যৌনকর্মী হিসাবে পরিচিত হয়। আমাদের দেশের এইসব দরিদ্র পরিবারের কিছু কিছু রূপান্তরকামীরা হাতুড়ে পদ্ধতিতে পুরুষাঙ্গ ছেদন করে হিজড়েতে পরিণত হয়। আবার অনেকে পুরুষাঙ্গ ছেদন না করেও হিজড়ে মহল্লার স্থায়ী সদস্য হয়ে যায়। বাচ্চা নাচানো, ভিক্ষাবৃত্তির পাশাপাশি তারা সমকামী পুরুষের কাছে দেহ বিক্রি করে।

আগেই দেখা গেছে সমকামীর বিয়ে সুখের হয় না। যৌনতাকে কেন্দ্র করে দাম্পত্য জীবনে কলহ বাধে। ফাটল ধরে সম্পর্কে। মানসিক সাযুজ্য ও শারীরিক সম্পর্ক না থাকায় বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। অনেক সময়ই রূপান্তরকামী বা সমকামী পুরুষটি যৌন আকাঙ্ক্ষাকে মেটানোর জন্যে পুরুষ সঙ্গী খোঁজে। এবং তাকে নিয়ে নতুন ভাবে থাকতে চায়। কিন্তু সঙ্গী পেলেও ইচ্ছা পূরণ হয় না। আবার নতুন পুরুষ সঙ্গীটিও তার সঙ্গে সারাজীবন থাকতেও চায় না। ফলে বার বার সঙ্গী বদল হয়। এবং এই ভাবেই বহুপুরুষে উপগত হয়ে ‘সে’ যৌনকর্মী হয়ে ওঠে।

সমাজবিজ্ঞানী পারকিনস এবং বেনেট (Parkins & Bennett) পরিচালিত সমীক্ষা থেকে জানা যায়, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রূপান্তরকামীদের প্রায় অর্ধেকই যৌনব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। এর কারণ অনুসন্ধান করে তাঁরা জানেন— লিঙ্গ পরিবর্তন করার চিকিৎসার খরচ তোলার জন্যেই তারা এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে। (Roberts : 1993)

মিলনস্থল (Cruising-spot) :

সমকামী পুরুষ যৌনকর্মীদের ব্যবসার কোন সুনির্দিষ্ট স্থান নেই। আর একটু পরিষ্কার করে বলা যেতে পারে, হাতে গুনে কয়েকটি লালবাতি অঞ্চলের কিছু নির্দিষ্ট এলাকা ছাড়া পশ্চিমবঙ্গে পুরুষ যৌনকর্মীদের কোন গণিকালয় নেই। তবে ভারতের পুরুষ গণিকালয় হিসাবে পরিচিত অঞ্চলে আমরা যে সব পুরুষ যৌনকর্মীদের দেখি তারা অধিকাংশই পুরুষাঙ্গচ্ছেদিত ব্যক্তি, যারা ‘হিজড়ে’ নামে পরিচিত। হুবহু মেয়ে সেজে খদ্দের ধরার জন্য এলাকায় বিভিন্ন গলির ধারে এরা দাঁড়িয়ে থাকে। নতুন আসা অনেক মানুষই এদের মহিলা ভাববে।

পুরুষ যৌনকর্মীর প্রধানতঃ পথচারী (Street walker)। এদের অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে ‘মিলনের স্থান’। খানদান ধুরানীরা খদ্দেরকে নিয়ে হোটেলে যায়। এছাড়া খদ্দের অনেক সময় নিজের বাড়িতে এদের নিয়ে আসে। প্রাইভেট কারের মধ্যেও এরা খদ্দেরের সঙ্গে মিলিত হয়। এই শ্রেণিভুক্ত পুরুষ যৌনকর্মীদের বাদ দিলে অন্যরা বিভিন্ন সময় খদ্দেরকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যায়। কখনো খোলা আকাশের নীচেও উন্মুক্ত পলিথিনের সীট বিছিয়ে দেহ ব্যবসা চলে। আবার কখনো নির্মীয়মাণ বহুতল বাড়ির অভ্যন্তরে বা পাবলিক ইউরিনালের মধ্যে। ঝোপঝাড়ের পরিপূর্ণ নির্জনস্থানেও এ ব্যবসা চলে। ভারতের প্রতিটি বড় শহরে নির্দিষ্ট কিছু স্থানে নির্দিষ্ট সময়ে পুরুষ যৌনকর্মীদের দেখতে পাওয়া যায়। নীতিগত কারণে এইসব অঞ্চলের নাম উল্লেখ করা সঙ্গত নয়। কারণ চেন্নাই-এর community Action Net work’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সেখানকার পুরুষ যৌনকর্মীদের সুষ্ঠু পুনর্বাসন ও আইনি স্বীকৃতির দাবি তুলে তাদের ব্যবসার স্থানগুলির নাম উল্লেখ করেছিল। এর ফলে ওইসব অঞ্চলে পুলিশি হামলা বাড়ে এবং ব্যবসা ব্যাহত হয়। ফলে উপকার করতে গিয়েই এদের ক্ষতি করা হয়।

পায়ুকাম :

পায়ুকাম বা পায়ুসঙ্গমকে অনেকে প্রকৃতি বিরুদ্ধ ও অস্বাভাবিক বলে মনে করেন। পুরুষ পুরুষে উপগত হয়ে পায়ুকামে লিপ্ত হতে পারে। আবার পুরুষ নারীর সঙ্গে যোনি সঙ্গমের পাশাপাশি পায়ুকামেও প্রবৃত্ত হয়। তাই পায়ুকামকে সমকামিতার সমার্থক হিসাবে চিহ্নিত করা সঙ্গত নয়। কেন এই জাতীয় মানসিকতা হয় তার কোন সুনির্দিষ্ট কারণ নেই। সমকামী পুরুষের পায়ুকাম এবং বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আসক্ত কোন পুরুষের পায়ুকামের যৌন মনস্তত্ত্ব কখনোই এক নয়। এ বিষয়ে মনঃসমীক্ষক ও মনোবিজ্ঞানীরা এখনো গবেষণারত।

‘Sodom’ শব্দ থেকে Sodomy অর্থাৎ পায়ুকাম শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে।

সমকামী পুরুষ মাত্রেই যে পায়ুকামী তা সবসময় ধরে নেওয়া সঙ্গত নয়। কারণ চরম যৌনতানুভূতির পর্যায়ে (Orgasm) পৌঁছাতে সমকামী কোন পুরুষ সবসময় পায়ুকামকে বেছে নেয় না। এই ব্যাপারে ভারতে সমকামী হিজড়েদের ওপর সমীক্ষা চালিয়ে ‘Indian Health Organisation’-এর সাধারণ সম্পাদক ডাঃ আই. এস. গিলাডা জানান সাধারণত তিনভাবে পুরুষ-সমকামী চরমসুখের আনন্দ লাভ করতে পারে।

পায়ুকাম (Aual sex)

মুখকাম (oral sex)

সঙ্গীয় ঊরুদ্বয়ের মধ্যে লিঙ্গস্থাপন (Irtra crusal sex)

পায়ুকামের প্রতি প্রলুব্ধ হওয়ার সুনির্দিষ্ট কোন কারণ জানা না গেলেও, পায়ুকামের অভ্যাস সাধারণত তিন ধরণের পুরুষের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। (ক) সমকামী, (খ) উভকামী, (গ) বিষমকামী। প্রথম শ্রেণির পুরুষেরা নারীর প্রতি কোন অবস্থাতেই আকর্ষণ অনুভব করে না। পুরুষের সঙ্গে পায়ুকামে লিপ্ত হয়ে এদের যৌনক্ষুধা নিবৃত্ত হয়। বহু বিষমকামী পুরুষ আছে যারা স্ত্রী পুত্র, কন্যা নিয়ে ঘর সংসার করে। কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে শারীরিক যৌনমিলনে তৃপ্ত হয় না। এরা অনেক সময়েই স্ত্রী সঙ্গে পায়ুকামে লিপ্ত হয়। আবার অন্যপুরুষের সঙ্গেও পায়ুকামের সম্পর্ক গড়ে তোলে। তৃতীয় শ্রেণির পুরুষেরা মূলত বিষমকামী। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি এদের দুর্মর আকর্ষণ। কিন্তু অনেক সময়েই নারী সহজ লভ্য হয় না। তাই নারীর বিকল্প হিসাবে এরা যৌন পরিবর্তনকামী পুরুষ বা অল্পবয়েসি কিশোরের সঙ্গে পায়ুকামে লিপ্ত হয়। ‘NAZ Dhaka Foundation’-এর উদ্যোগে ঢাকায় কিছু পুরুষের যৌন জীবনের ওপর সমীক্ষা থেকে জানা যায়, সেখানকার বেশ কিছু পুরুষ স্ত্রীর সঙ্গে পায়ুকামে লিপ্ত হয়। নিজেদের সমকামী হিসাবে তারা কখনোই ভাবে না। কারণ হিসাবে তারা দেখিয়েছে স্ত্রীর যোনিপথের শিথিলতার জন্যেই তারা এ পথ বেছে নিয়েছে। ১৯৯৭ সালে ইংল্যাণ্ডের ‘The Face’ পত্রিকা ব্রিটেনের পুরুষদের যৌন কল্পনার ওপর টেলিফোনে একশোজনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। এর মধ্যে ১৫% পুরুষ নারীর সঙ্গে পায়ুকামে লিপ্ত হওয়ার বাসনা প্রকাশ করেছে। (Debonair, Jan.’98)

বাংলাদেশের ঢাকা শহরের দশজন পথচারী পুরুষ শিশুর ওপর সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে এদের মধ্যে ৬ জন বিভিন্ন সময় বয়স্ক পুরুষের দ্বারা ধর্ষিত হয়েছে। তারা জানায় পুলিশ, চাকুরিজীবী ও ব্যবসাদার কিছু মানুষ তাদের সঙ্গে সঙ্গমে লিপ্ত হয়। [Khan: 1996]

পায়ুধর্ষণ : সঙ্গীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে বলপূর্বক তার সঙ্গে পায়ুকামে লিপ্ত হওয়াই হল পায়ুধর্ষণ। নারী ধর্ষণের বহু সংবাদই সংবাদপত্রে স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু কিছু অসহায় রূপান্তরকামীরা যে কিছু বিকৃত সমকামীর পায়ুকামের শিকার হচ্ছে, সে তথ্য সাধারণত আমরা উদঘাটন করি না। অবিশ্বাস্য হলেও এটাই সত্যি। আবার কিছু পুরুষ খদ্দের গণিকালয়ে নারী যৌনকর্মীদের সঙ্গে পায়ুকামে লিপ্ত হবার জন্যে যায়। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘CINIASHA’ কলকাতার একটি গণিকালয় থেকে ১৫ বছরের এক গণিকাকে উদ্ধার করে। দীর্ঘ দিন পায়ুকামের শিকার হবার ফলে তার পায়ুদ্বারে (Anus) বীভৎস ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। (Sleightholme & Sinha : 1996)!

সারা বিশ্বজুড়েই এখন ব্লু-ফ্লিমের ব্যবসা চলছে রমরমিয়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্লু-ফ্লিমের অভিনেত্রী রোকসানে (Roxaune) জানায় বিভিন্ন সময়ে যোনি সঙ্গমের পাশাপাশি তাকে পায়ুসঙ্গমেও লিপ্ত হতে হয়। এথেকে সহজেই অনুমেয়, নারী সাহচর্যে পুরুষের পায়ুকামে লিপ্ত হবার বাসনা অবিশ্বাস্য কিছু নয়। কানাডার টরেন্টো থেকে প্রকাশিত ‘Enema Digest’ পর্নো-পত্রিকায় পায়ুকামের বিভিন্ন অভ্যাসের কথা উল্লেখ করা হয়। গবেষক ডঃ শিবানন্দ খান বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের পুরুষের যৌন আচরণের ওপর সমীক্ষার সময় ৮ জন রিক্সাচালকের সঙ্গে কথা বলেন। এই ৮ জনের মধ্যে ৬ জন নারীর সঙ্গে পায়ুসঙ্গমের কথা স্বীকার করে।

‘পায়ুধর্ষণ’ সম্পর্কে বিশদ আলোচনার আগে ‘ধর্ষণ’ সম্পর্কে কিছু কথা জানা দরকার। ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৩৭৬ ধারায় ধর্ষণকে আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ধর্ষণ বলতে পুরুষ কর্তৃক নারীর যোনিতে বলপূর্বক লিঙ্গ প্রবেশকেই বোঝান হয়েছে। এখানে অপরাধী হিসাবে চিহ্নিত পুরুষের বিরুদ্ধে ৩৭৬ ধারা প্রযোজ্য হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, উপযুক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে অপরাধীর সাজা লঘু হয় বা মকুব হয়। লোকলজ্জার ভয়ে ধর্ষিতা নারী ধর্ষণের কথা নীরবে সহ্য করতে বাধ্য হয়। ফলে ধর্ষণকারীর বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অসম্ভব হয়ে ওঠে। মানসিক অবসাদে জর্জরিত হয়ে বহু ধর্ষিতা নারীকেই চরম হীনমন্যতার মধ্যে বেঁচে থাকতে হয়। মুম্বই-এর ‘Forum Against oppression of women’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ধর্ষণ প্রতিরোধে সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করার জন্যে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। ধর্ষিতা নারীদের জন্যে ‘কাউনসিলিং’-এর ব্যবস্থা করে এদের মানসিক ভারসাম্য যাতে অটুট থাকে তার জন্য বিশেষভাবে সাহায্য করে চলেছে। অন্ধ্রপ্রদেশের করিমনগর জেলার দরিদ্র সাধারণ নারীরা ধর্ষণ প্রতিরোধের জন্যে জোট বেধেছে। ‘মহিলা সংঘ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে এরা ধর্ষণকারীর বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৬ ধারায় পায়ুধর্ষণের (Anul rape) কথা উল্লেখ করা হয়নি। ৩৭৭ ধারায় পায়ুকামের কথা উল্লেখ করা রয়েছে। কিন্তু সেখানেও পায়ুধর্ষণ বিষয়টির অনালোকিত থেকে গেছে। পায়ুকামকে ৩৭৭ ধারায় প্রকৃতি বিরুদ্ধ যৌন আচরণ (Carnal intercourse against the order of nature) হিসেবে অবিহিত করা হয়েছে। ফলে ‘পায়ুকাম’ ও ‘পায়ুধর্ষণ’-এর মধ্যে পার্থক্যের সীমারেখা টানা হয়নি। আইনে বলা হয়েছে পায়ুকামে লিপ্ত দুই পুরুষই সমান অপরাধী। ‘In this crime question of “consent” has no value. Both the active and passive agents will be punished even when the act has been done with the consent of the passive agent (J.B. Mukherjee) বাস্তবের নিরিখে আইনের এই অংশটি নিতান্তই হাস্যকর। যে পুরুষ তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে’ অন্য পুরুষের দ্বারা পায়ুধর্ষণের শিকার হচ্ছে, তাকে কোন অবস্থাতেই অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যাবে না। ভারতের বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলি ৩৭৭ ধারা পরিমার্জনের জন্যে দাবি তুলেছে। ‘AIDS Bhendhar virodhi Andolan’ নামে দিল্লির একটি বেসরকারী সংস্থা ভারত সরকারের বিরুদ্ধে দিল্লি হাইকোর্টে ৩৭৭ ধারা পরিবর্তনের জন্যে মামলা দায়ের করেছে। সংগঠনের পক্ষে সওয়াল করেন শ্রী রাজেশ তালওয়ার ও শ্রীমতী শোভা আগরওয়াল। ১৯৯৪ সালের দায়ের করা এই মামলার আজও কোন নিষ্পত্তি হয় নি।

শুধু ৩৭৭ ধারা নয়, ৩৭৭ ধারায় উল্লিখিত ধর্ষণের সংজ্ঞা পরিবর্তনের দাবি উঠেছে। বিভিন্ন সমকামী সংগঠন তাদের নিজস্ব আলোচনা সভায় ও পত্রপত্রিকায় পায়ুধর্ষণের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। তাই বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে ধর্ষণ সম্পর্কে নতুনভাবে চিন্তাভাবনার প্রয়োজন। এবং নতুন আইনি ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে আমাদের অজানিত পায়ুধর্ষণের বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। নতুন দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে তাই ‘পুরুষের দ্বারা নারী ধর্ষণ’-এর পাশাপাশি ‘পুরুষের দ্বারা পুরুষ ধর্ষণ’ এবং ‘নারীর দ্বারা পুরুষ ধর্ষণ’ বিষয়গুলি নিয়ে নতুনভাবে চিন্তাভাবনা করা উচিত। এবং আশা করা যায় নবচিন্তার আলোকে ‘পায়ুকাম’ ও ‘পায়ুধর্ষণ’-এর মধ্যে যে সুস্পষ্ট পার্থক্য আছে সে বিষয়ে সাধারণ মানুষ অবহিত হবে।

ভারতীয় দণ্ড বিধির ৩৭৭ ধারার আরও একটি হাস্যকর অংশ ‘মুখমৈথুন’ Oral sex/coitus through mouth) আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এক্ষেত্রে সমকাম ও বিষমকাম হিসেবে সুস্পষ্ট কোন নির্দেশ আইনে দেওয়া হয়নি। সঙ্গী পুরুষ হোক বা নারীই হোক, শিশ্ন যদি তার মুখে স্থাপন করা হয়, তবে তা পায়ুকামের সমান অপরাধ। এই বিশেষ যৌন ক্রিয়াকে ‘ফেলাসিয়ো’ (Fellatio) বলা হয়। আইনে ‘ফেলাসিয়ো’ অপরাধ হলেও এর ঠিক বিপরীত অর্থাৎ যোনিতে মুখস্থাপন (cunnilingus) বিষয়ে আইন সম্পূর্ণ নিশ্চুপ। এ থেকে আইন প্রণয়নকারীরা ‘যৌনতা’ বিষয়ে যে কতটা অজ্ঞ তা বোঝা যায়। বাৎস্যায়নকৃত প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃত সাহিত্য ‘কামশাস্ত্র’-এ মুখমৈথুনের ব্যাপক উল্লেখ আছে। লেখক আট রকমের মুখমৈথুনের কথা বলেছেন। পশুর সঙ্গে যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হওয়া অর্থাৎ পশু মৈথুনকেও ৩৭৭ ধারায় পায়ুকামের সমান অপরাধ হিসেবে ধরা হয়েছে।

পায়ুকাম সম্পর্কিত কিছু কুসংস্কার :

(ক) বয়ঃসন্ধিকাল থেকে পুরুষ ও নারী উভয়ের মধ্যে হস্তমৈথুনের (Masturbation) অভ্যাস লক্ষ্য করা যায়। এই অভ্যাস নারীর তুলনায় পুরুষের মধ্যেই অধিক। পায়ুকামে অভ্যস্ত অনেক কিশোর, যুবক মনে করে দীর্ঘদিন পায়ুকাম ও হস্তমৈথুনের অভ্যাস অব্যাহত রাখলে শারীরিক অক্ষমতা দেখা দিতে পারে। এবং শিশ্ন (penis) খর্ব ও সঙ্কুচিত হয়ে যায়।

(খ) পায়ুকামী অনেকেই মনে করে, নারী সংসর্গেই একমাত্র যৌনরোগ (STD) হয়ে থাকে। তাই বিবাহের পূর্বে যথেচ্ছ পায়ুসঙ্গম নিরাপদ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যৌনরোগে আক্রান্ত পুরুষেরা মনে করে স্ত্রী-গাধার সঙ্গে সঙ্গমে লিপ্ত হলে (Bestiality) সিফিলিস গনেরিয়ার মতো STD রোগের হাত থেকে মুক্ত হওয়া যাবে।

(গ) বিবাহের পূর্বে কৌমার্যকে অক্ষুণ্ণ রাখতে চায় অনেকেই। তারা ভাবে, পায়ুসঙ্গমে কৌমার্য নষ্ট হয় না।

(ঘ) অনেক পুরুষের স্বপ্ন দোষ দেখা যায়। তারা মনে করে, পায়ুসঙ্গমে এই দোষ কাটবে ও শুক্রস্খলন বন্ধ হবে।

পায়ুকামের দৈহিক প্রতিক্রিয়া :

পায়ুসঙ্গমের বাস্তব অসুবিধাকে অস্বীকার করা যায় না। শারীরবৃত্তীয় কারণে পায়ুর মধ্যে কোন কিছু প্রবিষ্ট হওয়া সহজ নয়। দৈহিক করসতের ফলেই তা সম্ভব। তাই যোনি ধর্ষণের তুলনায় পায়ুধর্ষণের ক্ষতের সৃষ্টি হয় অনেক বেশি। ধর্ষিত পুরুষের ধর্ষণের পর পায়ুমুখ খানিকটা প্রশস্ত অবস্থায় থাকে। অধিকাংশ সময়েই রক্তপাত হয়। এবং চামড়ার ওপরে অংশে অসংখ্য ক্ষতের সৃষ্টি হয়ে গুটিয়ে যায়। এই অবস্থায় পায়ুদ্বারে যন্ত্রণা হয় ও যে কোন স্পর্শে প্রদাহ হয়। তার স্বাভাবিক চলাফেরাও অনেক সময় ব্যাহত হতে পারে। পায়ুদ্বার ছাড়াও কক্সিস (coceyx) কসেরুকার শেষপ্রান্তে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। অল্পবয়েসি বালকদের ওপর ধর্ষণে এই ক্ষত অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি হয়ে থাকে। সমকামী পুরুষ যৌনকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে পায়ুসঙ্গমে অভ্যস্ত থাকায় এদের পায়ুদ্বারে তাৎক্ষণিক ঘা বা ক্ষতের সৃষ্টি হয় না। এদের অনেকেই পায়ুদ্বারের রোম পরিষ্কার করে রাখে। এবং কৃত্রিমভাবে নানান সময়ে পায়ুর মধ্যে সুমসৃণ দণ্ড বা ডাইলেটর প্রবেশ করিয়ে পায়ুপথ প্রশস্ত করে। বিভিন্ন গণিকালয়ে শিশু যৌনকর্মীদের যোনিপথ প্রশস্ত করার জন্যে যোনির মধ্যে শোলা ভিজিয়ে প্রবেশ করিয়ে রাখা হয়। ভারতের হিজড়েদের মধ্যে ব্যাপকভাবে পায়ুকাম প্রচলিত। বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হিজড়ে-মহল্লায় হিজড়েদের পায়ুমুখ বড় করার প্রথা আছে। ঘি মাখিয়ে ছুঁচলো গোল পাথরের বা কাঠের দণ্ডকে প্রতিদিন সকালে পায়ুর মধ্যে প্রবেশ করানো হয়। এই সময় তার হাত পা বেঁধে রাখা হয় এবং রক্তপাত না হওয়া পর্যন্ত দণ্ডটি ধীরে ধীরে ভিতরে প্রবিষ্ট হয়। সাত থেকে দশদিন ধরে এই প্রক্রিয়া চলে।

পায়ুপথ প্রশস্তকরণের সবচেয়ে বড় কারণ হল যোনির ন্যায় সঙ্গম কালে পায়ুর মধ্যে কোন রস নির্গত হয় না। নরনারীর কাম ক্রিয়ায় নারীর যোনির মধ্যে ‘বার্থালিন’ থেকে মিউকাস জাতীয় পিচ্ছিল রস নির্গত হয়। এর ফলে সঙ্গম সহজ ও আরামদায়ক হয়। শিশ্নসঞ্চালন কালে যোনিতে ক্ষত হয় না। পুরুষ যৌনকর্মীরা পায়ুতে ক্ষত না হবার জন্যে নানারকম ক্রিম বা তেল, এমন কি থুতু ব্যবহার করে থাকে। অবশ্য উচ্চবিত্তের সমকামী পুরুষরা পায়ুকামের কষ্ট লাঘব করার জন্যে KyJelly ব্যবহার করে। পুরুষ যৌনকর্মীদের পায়ু এতটাই প্রশস্ত হয় যে, তা দেখতে অনেকটা ফ্যানেলের (Funnel shaped) মতো লাগে। চিৎ করে শুইয়ে পা দুটি ওপরে তুললে পায়ুমুখ (Anal orifice) থেকে মলাশয় (Rectun) পর্যন্ত দেখা যায়। লুব্রিকেটিং বা পিচ্ছিল বস্তু ব্যবহার করা সত্ত্বেও এইসব যৌনকর্মীদের ঘা হয়। এ থেকে ভগন্দর (Fissures) ও বহিঃঅর্শ (External piles) হতে পারে। দীর্ঘদিন পায়ুকামে অভ্যস্ত হলে পায়ুমুখ নরম ও পিচ্ছিল হয়ে থাকে।

পায়ুকামে যৌনমুখ : পায়ুকামে যৌনমুখ হয় কিনা তা চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণা সাপেক্ষ বিষয়। তবে পায়ুকামে চরম আনন্দ (সুখানুভূতি) পাওয়া যায়, এমন কথা বলেছে অনেক পুরুষ যৌনকর্মীই। আগ্রার ঈদগাকাটগরের আলম কথাপ্রসঙ্গে জানিয়েছিল পায়ুসঙ্গমে ও শুধু তৃপ্ত হয় না, ওর পুরুষাঙ্গ উত্থিতও হয়। অন্য কোনভাবে ওর দ্রুত লিঙ্গোত্থান ঘটে না। এই প্রসঙ্গেই মনে পড়ে গেল মীরার কথা। মীরার সঙ্গে দেখা হয়েছিল কুভাগামের মেলায়। তামিলনাড়ুর ভিল্লুপুরম জেলার অন্তর্গত একটি গ্রাম হল এই ‘কুভাগ্রাম’। প্রতিবছর তামিল চিত্রাই মাসে (এপ্রিল/মে) গ্রামের আরাবান মন্দির সংলগ্ন চত্বরে বিরাট মেলা বসে। নানা মানুষ জমায়েত হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হিজড়ে ও ধুরানীরা আসে এই মেলায়। বলা বাহুল্য, সন্ধের পরে মেলায় পুরুষ যৌনকর্মীদের ব্যবসা বেশ জমে ওঠে। আরাবান মন্দিরের খুব কাছেই অরুমুগমের বাড়িতে আমরা ক’দিন ছিলাম। আমরা যে ঘরে ছিলাম তার পাশের ঘরটা ভাড়া নিয়েছিল মীরা। সান বাঁধানো উঁচু দাওয়ায় বসে অনেক রাতে ও আমাদের বলেছিল— পায়ুসঙ্গমের সময় পায়ুপথে ওর অদ্ভুত সুখানুভূতি হয়। কিন্তু কখনোই ওর পুরুষাঙ্গ দৃঢ় হয় না। মনে পড়ে গেল ডাঃ জে.বি. মুখার্জির একটি মৌলিক গবেষণাপত্রের কথা। ডাঃ মুখার্জি কয়েকজন হিজড়ের ওপর এক বিশেষ ধরণের সমীক্ষা চালান। তিনি প্রতিটি হিজড়ের পায়ুপথের মধ্য দিয়ে প্রস্টেট গ্ল্যাণ্ডকে স্পর্শ করেন ও কিছুক্ষণ ধরে সংবাহন করেন। এর ফলে দেখা যায়, প্রত্যেকের মূত্রছিদ্র দিয়ে এক ধরণের তরল পদার্থ বেরিয়ে আসছে। এবং এরা সকলেই যৌন তৃপ্তি অনুভব করেছে। বস্তুত পায়ুপথে কোন কিছু প্রবিষ্ট হলে আরাম লাগার কথা নয়। বরং তা যন্ত্রণাদায়ক। কিন্তু এখানে ব্যাপারটা হচ্ছে পুরো উল্টো। তাই মনে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে, কেন এই বিশেষ অনুভূতি হয় পায়ুপথে। (এমন ভাবটা কী অমূলক যে) পায়ুনালীর মধ্যে ওরা যে বিশেষ স্পর্শানুভূতি পেয়ে থাকে তার সঙ্গে কেবলমাত্র যোনির অনুভূতিই তুলনীয়। শারীরবৃত্তীয় কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয় কি-না তা চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের তলিয়ে দেখতে হবে। এই প্রসঙ্গেই আরও একটা কথা মনে পড়ছে, তিরিশ বছর বয়সী এক যুবক বিয়ে করে পরমাসুন্দরী এক মহিলাকে। কিন্তু কী আশ্চর্য! মহিলাটির যোনি সঙ্গমে তীব্র অনীহা। স্বামীকে বাধ্য করায় পায়ুসঙ্গমে লিপ্ত হতে। যোনি সঙ্গমে সে এতটাই নিষ্ক্রিয় থাকে যে মনে হয় সে কারুর দ্বারা ধর্ষিত হচ্ছে। নিরুপায় স্বামী সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানের জন্যে ‘The Asian Age (14.6.98) পত্রিকার ‘Mid life crisis’ বিভাগে চিঠি পাঠান। উত্তরে বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী ডঃ নীলাঞ্জনা সান্যাল জানান— যে কোন কারণেই মহিলার পায়ুর অভ্যন্তর শরীরের অন্য অংশের তুলনায় অনেক বেশি অনুভূতিশীল এবং এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ মনঃসমীক্ষকের সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন।

এবার একটু ইতিহাসের দিকে তাকানো যাক। তুরস্কের অটোমান সম্রাটদের হারেমে ছিল অসংখ্য খোজা। রানীদের পরিচর্যা ও হারেমের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বই ছিল এদের। পুরুষাঙ্গ না-থাকায় এদের পক্ষে যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হওয়া সম্ভব ছিল না। অনেক সময় হারেমের রানীরা এদের সাহায্যে বিকৃতভাবে তাদের যৌনবাসনা মেটাতো। আবার কোন সমকামী-সম্রাটের যৌনসঙ্গী হিসাবেও এদের দেখা যেত। বস্তুত এইসব কামক্রিয়ায় তারা যন্ত্র হিসাবেই ব্যবহৃত হত। পৌরুষহীন এমনকি যৌন আবেগহীন কামশীতল ব্যক্তি হিসাবে তারা গণ্য হত। কিন্তু খুবই আশ্চর্যের কথা, এইসব খোজাদের এক বিচিত্র যৌনজীবন ছিল। এখানে একে অন্যের সঙ্গী হয়ে অথবা কয়েকজন একত্রিত হয়ে এক ভিন্ন ধরণের যৌন সম্ভোগের কলাকৌশল উদ্ভাবন করে। এর মধ্যে দিয়ে তারা যৌন উত্তেজনা অনুভব করতো। এমনকি যৌনসুখের চরম অভিব্যক্তির পর্যায়ে (orgastic phase) পৌঁছানো সম্ভব হত। এই প্রক্রিয়াটি ছিল পায়ুকেন্দ্রিক। সুতো দিয়ে বাঁধা শক্ত সিদ্ধ-ডিম বা কোন কাঠের দণ্ডকে তারা ধীরে ধীরে পায়ুনালীর মধ্যে প্রবেশ করাতো। এবং তারপর সুতো ধরে নাড়ালে পায়ু-অভ্যন্তরে এক অদ্ভুত যৌনসুখের চরম মানসিক অনুভূতি লাভ করতো। কথিত আছে, একে অন্যের এই সুতোর ওপরে ভায়োলিন বাজাতো। বর্তমানেও কোন-কোন সমকামী কিশোরের মধ্যে পারস্পরিক হস্তমৈথুনের মতো ‘হস্তমৈথুনে পায়ুকাম’ (anal masturbation)-এর অভ্যাসের সন্ধান পাওয়া যায়। এখানে একে অন্যের পায়ুর ভিতরে আঙুল চালিয়ে দিয়ে রতিসুখ দেয়। কথ্য ইংরেজিতে একে বলে ‘fist fucking’। অবশ্য ভাইব্রেটারের (vibrator) সাহায্যেও অনেকে এই আনন্দ পেয়ে থাকে। (Goldenson & Anderson : 1987)।

লগন :

প্রতিবছর পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে রূপান্তরকামী পুরুষ বা ধুরানীরা বিহারের ছাপড়া, আরা, বালিয়া, সীমান প্রভৃতি জেলায় এবং উত্তরপ্রদেশের বেরিলি, ইটাওয়া প্রভৃতি স্থানে নাচতে যায়। এই নাচতে যাওয়ার পোশাকেই লগন বলা হয়। আগেই আলোচনা করা হয়েছে পুরুষ যৌনকর্মীদের একটা বড় অংশই রূপান্তরকামী। এরা যেমন নারী সাজে সজ্জিত হতে চায়, তেমনি নারী সেজে জনসমক্ষে নাচতেও এরা ভালবাসে। দেহ ব্যাবসা ছাড়া নাচগান করে উপার্জন এদের বাড়তি আয়। তাছাড়া একই গতানুগতিক পরিবেশের বাইরে মানুষের মনোরঞ্জন করেও এরা ভীষণ আনন্দ পেয়ে থাকে।

বছরের দুটো সময় এরা লগনে যায়। অঘ্রাণ থেকে মাঘ এবং চৈত্র থেকে জ্যৈষ্ঠ। চৈত্র মাসে লগন সবচেয়ে জমে ওঠে বলে একে অনেকে ‘চৈতা’ও বলে।

লগন কোন পরিচ্ছন্ন ব্যবসা নয়। ওপরে নাচ গানের একটা প্রলেপ জড়ানো থাকলেও এর ভিতরে চলে নানা ধরণের কারবারের চোরা স্রোত। সাধারণ মূল স্রোতের মানুষের চোখের আড়ালে কিছু মানুষ এই লগনকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলেছে নিজস্ব আয়ের বিশেষ ব্যবস্থা। ‘লগন’ হাল আমলের ব্যাবসা নয়। বহু বছর ধরেই এই রেওয়াজ চলে আসছে। তাই এই ব্যাবসাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে পরিকল্পিত দালাল চক্র। এরাই প্রধানত এই ব্যাবসার নিয়ন্ত্রক। আশ্বিন, কার্ত্তিক মাসে দালালরা ধুরানীদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। কয়েকবার লগনে গেছে এমন পুরনো ধুরানীরা নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে দালালদের সঙ্গে আগাম যোগাযোগ করে। যাদের হয়ে দালালরা কাজ করে বা যাদের কাছে ধুরানী ও হিজড়েদের পৌঁছে দেওয়া হয়, বিহার ও উত্তরপ্রদেশের সেইসব ব্যক্তিরা ‘মাস্টারজি’ বা ‘মালকিন’ নামে পরিচিত। মাস্টারজিরা এই ব্যবসায় পুঁজি খাটায়। প্রথম-প্রথম মাস্টারজিদের ফরমাস অনুযায়ী তাদের অনুগত ভৃত্যের মতো দালালরা পশ্চিমবঙ্গের কিছু স্থান থেকে ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে ও পরিচিতজনের সাহায্যে ধুরানীদের সংগ্রহ করতো। একজন দালাল একবারে দুই অথবা তিনজন ধুরানীকে সঙ্গে নিয়ে যেত। ধীরে ধীরে এই ব্যবসায় ধুরানীদের চাহিদা বাড়তে থাকে। সাধারণ দালালদের পক্ষে একসঙ্গে বহু ধুরানীর জোগান দেওয়া সম্ভব হয়ে উঠতো না। তাই বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু মানুষ এই কাজকে অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা বলে মনে করতে থাকে। এবং পরিকল্পিত র‌্যাকেটের মাধ্যমে এই দালালি ব্যবসা শুরু করে।

পশ্চিমবঙ্গের গঙ্গার দু’ধারে গড়ে ওঠা চটশিল্পের বহু শ্রমিক বিহার ও উত্তরপ্রদেশের মানুষ। এরা সমাজের পিছড়েবর্গের লোক। বস্তির ঘিঞ্জি এলাকায় এদের বাস। ব্যক্তিগত জীবনে এদের অনেকে পুরুষ সাহচর্যে যৌন তৃপ্তি পায়। আর এই কারণেই এদের সঙ্গে ধুরানীদের পরিচয়। বেশি টাকা পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এরা ধুরানীদের মাস্টারজিদের কাছে পাঠায়। বছরের বিভিন্ন সময় ধুরানী জোগান দেওয়া এদের ‘সাইড-বিজনেস’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বেশ গুছিয়ে পরিপাটি ভাবে এই ব্যাবসা চালানোর জন্যে এদের সঙ্গে জুটেছে স্থানীয় মস্তান। এরাই সরাসরি ধুরানীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। কিছু হিজড়ে মহল্লার গুরু মায়েদের সঙ্গে এদের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ। গুরুমায়ের অধীনে থাকা হিজড়েদের নিয়ে ব্যবসা করার সময় গুরুমাকে মোটা টাকা কমিশন দিতে হয়। অনেক গুরুমা এইসব দালাল চক্রকে এড়িয়ে মাস্টারজির সঙ্গে সরাসরি কারবার করে। কিছু কিছু হিজড়ে গুরু-মায়ের একজন ‘মোগা’ বা ‘পুরুষ সঙ্গী’ থাকে। এরা বয়েসে গুরু-মায়ের ছোট। বাইরের সব কাজই এদের করতে হয়। অসুস্থতা বা বার্ধক্যজনিত কারণে গুরুমায়েরা অক্ষম হয়ে পড়লে ‘লগন’ ব্যবসার পুরো দায়িত্বই মোগাকে নিতে হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য টিটাগড়, খড়দহ, বালি, কাঁচরাপাড়া প্রভৃতি অঞ্চলের বেশ কিছু গুরুমায়ের ‘মোগা’ অবাঙালি, বিশেষ করে বিহারি। ফলে এদের পক্ষে ‘লগন’ সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখা ও ব্যবসা চালানো অনেক সহজ।

বহু বয়স্ক ধুরানী আছে যাদের শরীরে জৌলুস আর আগের মতো নেই। বয়সকালে শরীর গেলেও উপার্জন করার নেশা কমেনি। তাই ধুরানী ব্যবসায় এরা আজ নতুন দালাল শ্রেণি হিসাবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। ব্যবসার চোরা গোপ্তা পথের হাল হকিকত সবই এদের জানা। বিভিন্ন হিজড়ে মহল্লার ধুরানী ও সাধারণ কিছু ধুরানীদের নিয়ে এরা নিজস্ব কায়দায় এক বিশেষ ধরণের দালাল চক্র গড়ে তুলেছে। মাস্টারজির সঙ্গে এদের সরাসরি যোগাযোগ থাকে। আবার কেউ কেউ অন্য দালাল চক্রের এজেন্ট হিসাবেও কাজ করে থাকে।

ধুরানীর লগন যাত্রায় সঙ্গী হয় ব্যাণ্ড পার্টি দলের কিছু বাদক। নাচ গানে এদের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। বিহারের ওই সব অঞ্চলে যে বাজনাদার নেই তা নয়, তবে চটুল, চটকদারি গান পরিবেশনে পশ্চিমবঙ্গ বিশেষ করে কলকাতার বাজনাদারদের জুড়ি মেলা ভার। দালালরা ধুরানীদের সঙ্গে যোগাযোগের পর এই সব ব্যাণ্ড পার্টি দলের বাদকদের সঙ্গেও যোগাযোগ করে। বহু ব্যাণ্ড পার্টি দলে ভাল কাওয়ালি গায়ক থাকে। লগনে এদের কদর খুব বেশি। কাওয়ালির তালে তালে ধুরানীরা উদ্দাম নাচে মেতে ওঠে। লগনের মরসুমে বিহার ও উত্তরপ্রদেশে কলকাতার কিছু কাওয়ালি দল যায়। এদের মধ্যে কলকাতার ময়ূরভঞ্জ রোডের ওয়াসিগার্ডেনের ‘সাহানাজকাদরী কাওয়াল এণ্ড পার্টি’ এবং মোমিনপুরের রামনগর লেনের ‘ইউসুফ আজাজ কাওয়াল পার্টি’-এর নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া টিটাগড়ের ‘আজাদ ব্যাণ্ড পার্টি’ ও লগনে যাওয়া শুরু করেছে। এইসব ব্যাণ্ড পার্টি দলের গায়ক ও বাদকের সঙ্গে ধুরানীদের সম্পর্ক খুবই মধুর। ধুরানী জগতের অনেক না-বলা কথা এরা জানে। এমন কি ধুরানী সমাজে ব্যবহৃত উল্টির ভাষার সঙ্গে এরা বিশেষ পরিচিত। ব্যবসার কারণে দীর্ঘদিন এক সঙ্গে মেলামেশা ও চলাফেরার ফলে উভয়ের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন হিজড়ে মহল্লার গুরুমায়েদের সঙ্গে ব্যাণ্ড পার্টিদলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। বাসুবাটি, ঘুটিয়ারি শরিফ, ভাঙড়, কাজীপাড়া প্রভৃতি মেলায় হিজড়েরা নাচগানের জন্যে এদের আমন্ত্রণ জানায়। এভাবেই ধুরানী জগতের কাছাকাছি কোন কোন গায়ক বা বাদক নিজের উদ্যোগেই ধুরানী ব্যবসার দালালিতে নেমে পড়ে। বর্তমানে নামহীন বহু ছোটখাটো গানবাজনার দল গজিয়ে উঠেছে। এরাও লগনে যায়। তবে মাস্টারজির কাছ থেকে দাদন নিয়ে ধুরানী সংগ্রহ এদের অন্যতম কাজ।

মাস্টারজি বা মালকিন ধুরানী ব্যবসায় টাকা খাটান। এই ব্যবসার জন্য চুক্তি হয় ৬ মাসের। তিন মাস, তিন মাস করে। মাস্টারজি দালাল মারফত ধুরানী জোগাড় করে। জনপিছু ২৫,০০০-৬০,০০০ টাকা দালালের সঙ্গে চুক্তি হয়। এর মধ্যে বিভিন্ন ধুরানীর বিভিন্ন রকম রেট। দালালের সঙ্গে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ধুরানীরা যোগাযোগ করে বা দালালরা উপদালালকে দিয়ে ধুরানী জোগাড় করে। ধুরানীদের কাছে তাদের নানা ‘পোজের’ ছবি থাকে। এই ছবি দেখেই চুক্তি হয় এবং রেট স্থিরীকৃত হয়ে থাকে। সুন্দরী বা নাগিন ধুরানীদের রেট মোটামুটি ৪০,০০০-৬০,০০০ টাকা। সাধারণ মানের কিন্তু নারীসুলভ ধুরানীদের রেট হল ২৫,০০০-৩৯,০০০ টাকা। দেখতে ভাল নয় এবং চেহারার মধ্যে পুরুষালী ভাব বেশ স্পষ্ট এমন ধুরানীর রেট বেশ কম। ১০,০০০-২৪,০০০ টাকা। প্রতিক্ষেত্রেই জনপিছু দালালরা ৩০০০-৫০০০ টাকা পর্যন্ত লাভ করে থাকে। উপদালাল মারফত বিভিন্ন ধুরানী জোগাড় করার জন্যে দালালদের বেশ কিছু খরচ হয়ে যায়। নাচগান করেই ধুরানীরা অর্থ উপার্জন করে। এছাড়া আছে দেহব্যবসার আয় ও খদ্দেরের কাছ থেকে নানারকম উপঢৌকন। লগনে যাওয়া এবং থাকার খরচ সবই হল মাস্টারজির। সুতরাং ধুরানীদের নিজস্ব সামান্য কিছু খরচ ছাড়া সব টাকাটাই বাড়িতে আনতে অসুবিধা হয় না। সুন্দরী বা নাগিন ধুরানীর সংখ্যা খুবই কম। মোটামুটি ৫-৭%। সাধারণ মানের কিছু নারীসুলভ লক্ষ্মণ আছে এমন ধুরানীর সংখ্যা ৫৫% -৬০%। আর বাকি সবই হল পুরুষালী চেহারার ধুরানী। নাগিন ধুরানীর চাহিদা ভীষণ। নাগিন হতে হলে শুধু চেহারা হলেই হয় না। ভাল নাচও জানতে হয়। অবশ্য এ প্রসঙ্গে রবি ধুরানী বলেছিল— ‘গায়ের রং কটা ও বড় বুক হলেই হল। কোমর দোলালেই সে নাগিন বোনে গেল।’ কিন্তু সব সময় একথা ঠিক নয়। দেখতে ভাল না হলে তার নাচগানের গুণ যতই থাক না কেন, নাগিন হওয়া অসম্ভব।

মাস্টারজিরা কয়েকজন ধুরানী ও বাজনাদারদের নিয়ে দল গঠন করে। এরা বিয়ে বাড়িতে নাচতে যায়। মহল্লায় থাকা হিজড়ে ও ধুরানীরা এখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, হিজড়ে ও ধুরানীদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের বিশেষ কোন ধারণা নেই। জন্মগত যৌনপ্রতিবন্ধী হিসাবেই এরা পরিচিত। তাই নারীর বিকল্প হিসাবে অনেকেই এদের পেতে চায়। প্রায় অধিকাংশ ধুরানীরাই নাচগানে অত্যন্ত পটু। হিন্দি সিনেমার নাচ-গান এরা পরিবেশন করে। বিয়ে বাড়িতে এদের নাচার জন্যে একটি বিশেষ জায়গার ব্যবস্থা করা হয়। কোথাও কোথাও মঞ্চও তৈরি হয়। বাজারে হিট কোন হিন্দি ছবির প্রেম-বিনোদনের গানের দৃশ্যই সাধারণত অভিনয় করে দেখান হয়। একজন ‘পুরুষ’ নায়কের ভূমিকায় থাকে এবং নায়িকার ভূমিকায় ধুরানী বা হিজড়েদের দেখা যায়। প্রথা অনুযায়ী পাত্র পক্ষ বিয়ে করতে যাবার সময় ৫-৬ জন ধুরানী নিয়ে যায়। নাচগানের জন্যে। প্রথমে প্রত্যেক ধুরানী এককভাবে নৃত্যপরিবেশন করে। তারপর শুরু হয় ওই ফিল্মি ঢঙে নাচ গান। রাত যত বাড়ে নাচ-গান তত জমে ওঠে। এরপর ৫-৬ জন ধুরানী একত্রে নাচতে শুরু করে। যদি কোন পাত্রী পক্ষের আর্থিক সামর্থ থাকে তাহলে তারাও ধুরানী সংগ্রহ করে নাচ-গানের ব্যবস্থা করে।

বিহারের যে সব জেলায় ধুরানীরা যায় সেখানে ছোট ছোট নাটক বা যাত্রাদলে নায়িকার ভূমিকায় এরা অভিনয় করে থাকে। এক্ষেত্রে যাত্রা দলের মালিকের সঙ্গে মাস্টারজির চুক্তি হয়।

দুর্গাপুজো উপলক্ষে বিভিন্ন ক্লাব নাচ-গানের আসর বসায়। এখানে ধুরানী ভাড়া করে নাচানো হয়। সরস্বতী পুজোর ভাসানের অনুষ্ঠানে ধুরানী নাচানোর প্রচলন আছে। সাধারণত প্রতিমা নিরঞ্জনের মিছিলে একটি ফাঁকা লরির ওপর মঞ্চ তৈরি করা হয়। সেখানে এক বা একাধিক ধুরানী নানা ঢঙে নৃত্য পরিবেশন করে। সঙ্গে থাকে ব্যাণ্ড পার্টির দল।

‘হোলি’ বিহারিদের কাছে একটি বিশেষ ধর্মীয় উৎসব। হোলির দিন সকাল থেকে কাদা মাটি নিয়ে এরা খেলা করে। এরপর দুপুর থেকে নতুন পোশাক পরে এরা আবীর খেলায় মেতে ওঠে। আবীর খেলায় ধুরানীদের অংশগ্রহণ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। কারণ নানাভাবে এরা সাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। এবং এই সময়ে এরা কিছু উপার্জনও করে। কাছাকাছি বসবাস করে এমন বেশ কিছু ধুরানী একত্রিত হয়ে ব্যাণ্ড পার্টি নিয়ে নাচগান করে, বাড়ি বাড়ি। এইভাবে পয়সা উপার্জন হয়। এখানে উপার্জিত অর্থের কোন ভাগই মালিককে দিতে হয় না। কিন্তু কিছু মালিক নিজে উদ্যোগ ও দায়িত্ব নিয়ে তার অধীনের ধুরানীদের হোলি অনুষ্ঠানে নাচতে পাঠায়। এ থেকে উপার্জিত সমস্ত অর্থই মালিকের, তবে এর সামান্য অর্থ ধুরানীদের দেওয়া হয়।

নাচ-গান করে অর্থ উপার্জন করাই ধুরানীদের একমাত্র আয়ের উৎস নয়। মাস্টারজি ধুরানীদের অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে দেহ ব্যবসায় নামায়। প্রতিবছর লগনে যায় এমন বেশ কিছু ধুরানীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সব মাস্টারজিই সমকামী। ধুরানীদের সঙ্গে এদের দৈহিক সম্পর্ক থাকে। সমকামী হওয়া সত্ত্বেও এরা কেউ কেউ বিবাহিত। স্ত্রী, পুত্র, কন্যাও আছে। তাই এদের ‘উভকামী’ বলা যেতে পারে। মাস্টারজিরা অত্যন্ত সম্পন্ন, জোতদার শ্রেণির মানুষ। অনেকের বাড়িতে হাতিও আছে। নিজের বাড়ির সীমানার মধ্যেই ধুরানীদের থাকবার ছোট ছোট ঘরের ব্যবস্থা করা হয়। এরা যেন তার উপপত্নী। কোন কোন মালিক তার পছন্দের ধুরানীকে শাড়ি পরিয়েই রাখে। এবং রক্ষণশীলতার কারণে কেউ কেউ ধুরানীদের অন্যপুরুষের সঙ্গে মিশতে দেয় না। সাধারণত দেখা গেছে দালাল মারফত মালিকেরা যে সব ধুরানীদের নিয়ে যায় তাদের রোজকার খাবার বন্দোবস্ত তাকেই করতে হয়। বাড়ির লোক দিয়ে ধুরানীদের বাজার করিয়ে দেওয়া হয়। এবং ধুরানীরা নিজেরাই রান্নাবান্না করে নেয়। নিজের ভোগের কারণে মালিকরা প্রতিবছর ধুরানীদের জন্যে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে। অবশ্য নাচগানে নামিয়ে এদের দিয়ে কিছু অর্থ তুলে নেওয়া হয়। সম্প্রতি মালিকরা বা মাস্টারজিরা এইসব ধুরানীদের সমকামী বেশ্যা বৃত্তির কাজে নামিয়েছে। সচ্ছল, অর্থবান বহু মানুষই ধুরানীদের সঙ্গে সহবাস করতে চায়। তাই এর থেকে মালিকের ভাল উপার্জন হয়। এইভাবে লোক চক্ষুর আড়ালে বিচিত্র কায়দায় বিহারের প্রত্যন্ত গ্রামেগঞ্জে সমকামী পুরুষ যৌনকর্মীর ব্যবসা জাঁকিয়ে বসেছে।

দুটি ঘটনা :

ক. জেসমিনের আর বাড়ি ফেরা হল না। আসল নাম কি তা জানা যায় নি। তবে লোকে ওকে এই নামেই চেনে। একসময় সন্ধের পর গড়ের মাঠে খুব দেখা যেত। ছিপছিপে, রোগা। পাঞ্জাবি-পায়জামাই বেশি পরতো। পকেটে নিজের নারী সাজে সজ্জিত বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গীর নানান ছবি থাকতো। ওর খদ্দেরদের কাছে এইসব ছবির আলাদা মূল্য ছিল। বড়বাজারের রাজাকাটরার মোড়ে ওর সঙ্গে আমাদের প্রথম পরিচয় হয়। টিটাগড়ের এক হিজড়ের কাছে কিছুদিন কাটিয়েছিল, শিষ্য হয়ে। কি নিয়ে ওই হিজড়ের সঙ্গে গণ্ডগোল হওয়াতে ও টিটাগড়ের পাট চুকিয়ে কলকাতার এক ঝুপড়িতে চলে আসে। দেহব্যবসাকে জীবিকানির্বাহের সহজ পথ হিসাবে বেছে নেয়। একদিন এক খদ্দের মারফত লগনের এক দালালের সঙ্গে পরিচয় হয়। দালাল-ই তাকে বিহারের দলসিংসরাই-এ নিয়ে যায়। স্টেশন থেকে নেমে ‘কোরবাদধা’ গ্রাম। গ্রামের ‘টবকা’ নামে এক পাড়ায় এক জোতদারের বাড়িতে ওর থাকার ব্যবস্থা হল। বিয়েবাড়ি ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে নাচগান করে তার ভালই কেটে যাচ্ছিল। জোতদারের তিন মেয়ে। সবাই বিবাহিতা। দূরে থাকে। স্ত্রী অসুস্থ। তাই বাড়ির সব কাজ জেসমিনকেই করতে হত। জোতদারের কিছু বিচিত্র বায়নাক্কা ছিল। সারাদিন তিনি বাড়িতে জেসমিনকে শাড়ি পরিয়ে রাখতেন। ধীরে-ধীরে একসময় জেসমিন তার উপপত্নীর মর্যাদা পেল। নানাভাবে সে ওই প্রৌঢ়কে রতিসুখের আনন্দ দিয়ে থাকে।

খ. কালেভদ্রে পিণ্টু আসে তার গ্রামের বাড়ি মারফুডাঙ্গায়। তবে প্রতি মাসে মাকে মানি-অর্ডার করে টাকা পাঠায়। বেচারি মা ভাবে— ছেলে আমার দূর দেশে বাবুদের কাছে কাজ করে। একসময় সে ভাল কাওয়ালি গাইতো। ব্যাণ্ড পার্টিদলের সঙ্গে খুব যোগাযোগ ছিল। তাদের সঙ্গে একদিন বিহারের ছাপড়ায় চলে যায়। ছাপড়া থেকে সিমানের বাসে ‘একমা’ স্টপ। এখান থেকে জিপে করে ‘উমাশঙ্কর মোড়’। তারপর সোজা হাঁটা। গ্রামের দিকে। নাম, ‘বাবু-কা-পার্শা’। এখানকার এক মালকিন রামখিলান লগনের এক বড় সমঝদার। পিণ্টুকে তার ভাল লেগে যায়। এখানেই তার থাকার ব্যবস্থা হল। চার সন্তানের বাবা রামখিলানের পুরুষ-সঙ্গমের অভ্যাস ছিল। ফলে পিণ্টুর সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বছর দুই এইভাবে চলে। এরপর পট পরিবর্তন হতে থাকে। রামখিলানজির বড় ছেলে পিণ্টুর বয়সি। নানা অবস্থার মধ্যে দু’জনের ভালবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। রামখিলানজি এইসব খবর রাখতেন না। কাউকে না জানিয়ে মাঘ মাসের এক সন্ধেয় দু’জন বাড়ি ছাড়ে।

বালা :

গ্রামীণ যাত্রায় যারা নারীর ভূমিকায় অভিনয় করে তাদের ‘বালা’ বলে। অনেক সময় কিছু পুরুষকে নারী চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায়। এদের সবাই না-হ’লেও কেউ কেউ ‘ধুরানী’। পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার ও মুর্শিদাবাদের কিছু অঞ্চলে এদের দেখা যায়। শুধু যাত্রায় অভিনয় নয়, বিভিন্ন সময় বহুরূপী সেজেও এরা উপার্জন করে। অনেক সম্পন্ন ধনী পুরুষ এদের সঙ্গে সম্ভোগে লিপ্ত হোত। একজন ‘বালা-ধুরানী’ জানায়, ‘অনেক ধনী-নামী মানুষও আমারে পাঁচ-ছয় বছর আগেও বউ বানাইত। কামড়ায়া-আঁচড়ায়া শ্যাষ করত। অ্যাহন আর শাড়ী-ব্লাউজ ছাড়তে পারি না। অভ্যাস হয়া গেছে তো। পুরুষ হয়া জন্মাইয়াও হইলাম মাইয়া।’ (পরিবর্তন, ২৫.২.৮১)

স্ত্রী-সমকামিতা :

পুরুষ যৌনব্যবসার প্রেক্ষিতে ‘স্ত্রী-সমকামিতা’ ও ‘সমকামী নারী যৌনকর্মী’দের বিষয়ে সামান্য কিছু উল্লেখ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। নারী যৌনকর্মী বলতে আমরা এমন কিছু নারীকে বুঝি যারা পুরুষের কাছে দেহদান করে। অর্থাৎ যাদের খদ্দের ‘পুরুষ’। কিন্তু কিছু নারী আছে যারা অর্থের বিনিময়ে ‘নারী’কে যৌন-পরিষেবা দান করে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইংল্যাণ্ডের সুফক-স্ট্রিটের মাদার কারেজ (Mother courage) ও বাউ স্ট্রিটের মিস ফ্রান্সেস ব্রাড-শ (Miss Frances Bredshaw)-এর গণিকালয়ে এই ধরণের নারীদের রাখা হত। এই শতাব্দীতেই প্যারিসে স্ত্রী-সমকামী সংগঠন ‘anadrynes’-এর জন্ম হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মাদাম ডি ফ্লুরি (Madame de Fleurry)। পরে লণ্ডন ও ইউরোপের বিভিন্ন শহরে এর শাখা খোলা হয়। সাধারণ গণিকালয়ের নারী যৌনকর্মীদের মধ্যেও সমকামী সম্পর্ক গড়ে ওঠার কথা জানা যায়। (Roberts : 1992)। প্রখ্যাত ফরাসি লেখিকা সাইমন ডি বভোয়ার (simone de Beauvoir) ‘The second sex’ গ্রন্থে এই বিষয়ে একটি সমীক্ষার উল্লেখ করা হয়েছে। ফরাসি দেশের ৫১০ জন নারী যৌনকর্মীর ওপর সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, এদের মধ্যে ৯৪ জন অন্য নারীর সঙ্গে সহবাসে যৌন পরিতৃপ্তি বোধ করে। এরা জানিয়েছে, কিছু মহিলাই তাদের এই ধরণের আচরণে অভ্যস্ত হতে বাধ্য করেছে। মীরা নায়ার তাঁর ‘India Cabaret’ তথ্যচিত্র নির্মাণের সময় মুম্বই-এর ক্যাবারে ডান্সারদের মধ্যে এই জাতীয় সম্পর্ক লক্ষ্য করেন।

স্ত্রী-সমকামীরা ‘লেসবিয়ান’ (lesbian) নামে পরিচিত। ‘Lesbian’ শব্দটি ‘লেসবস’ (Lesbos) কথা থেকে উৎপত্তি হয়েছে। ‘লেসবস’ একটি প্রাচীন দ্বীপ। এই দ্বীপে ‘স্যাফো’ (Sappo) নামে এক নারী বাস করতেন। সমলিঙ্গের প্রতি তার গভীর অনুরাগ ছিল। লেখনীর মধ্যে দিয়ে তিনি ‘স্ত্রী-সমকামিতা’র কথা তুলে ধরেছিলেন। নারীর প্রতি নারীর ভালবাসা ও প্রেমই পরবর্তীকালে ‘sapphic love’ হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠে।

বিশিষ্ট গবেষক প্রকাশ কোঠারি সমকামীদের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন স্ত্রী-সমকামী’রা প্রকাশ্যে আসে খুবই কম। ব্যক্তিগত জীবনে নানা সমস্যার কথা এরা জানাতে নারাজ। তিনি জানান পুরুষ ও স্ত্রী সমকামীর অনুপাত ৫০ : ১। মানুষের যৌনজীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষণা করেছেন কিনসে (Kinsey)। তাঁর সমীক্ষা থেকেও স্ত্রী-সমকামিতার অনেক কথা জানা যায়।

পুরুষ সমকামিতার পিছনে যেমন একটি সুনির্দিষ্ট কারণ নেই, ঠিক তেমনি স্ত্রী সমকামিতার জন্যে একটি কারণকে উল্লেখ করা সঙ্গত হবে না। সাধারণত এর কারণগুলিকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে—

(ক) মানসিক (খ) শারীরিক (গ) সামাজিক ও পারিবারিক।

পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে অধ্যাপক সাইমন ডি-লিভের গবেষণা সমকামিতার কারণ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্তের সন্ধান মিলেছে। শারীরবৃত্তীয় কারণ হেতু কিছু মহিলা ‘সমকামী’ হয়। শুধু তাই নয়, অন্যভাবে বিচার করলে এদের আমরা যৌন পরিবর্তনকামী স্ত্রী হিসাবে ধরে নিতে পারি। আচার-আচরণ ও পোশাকের মধ্যে পুরুষালী ভাব সুস্পষ্ট। যৌনাঙ্গের কিছু অতিসাধারণ ত্রুটি ও অক্ষমতার কারণে অনেক নারী স্বাভাবিক পুরুষের সঙ্গে সঙ্গমে চরম পর্যায়ে (orgasm) পৌঁছান সম্ভব হয় না। এই কারণেই বেশ কিছু মহিলা সমকামিতার পথ বেছে নেয়। আমাদের মতো রক্ষণশীল সমাজে যে সব নারীর স্বামীরা পেশাগত কারণে দূরে থাকে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ শরীর ও মনের যৌন চাহিদা মেটানোর জন্যে অন্য নারীর সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তোলে। এক্ষেত্রে যৌন সম্পর্ক সম্বন্ধে কোন সন্দেহ জাগে না। নারীর যৌন সুখের চরম পর্যায়ই হল ‘অরগাজম’ (orgasm)। যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হওয়া বহু নারী এই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে না। তার কারণ, তার পুরুষ সঙ্গীর ‘orgasm’ বিষয়ে জ্ঞানের অভাব। যৌন ক্রিয়ায় পুরুষ নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে। নারীকে চরমপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব সে পালন করে না। ফলে নারীর কাছে যৌনসঙ্গম নিত্য অভ্যাসে পরিণত হয়। তার স্বাতন্ত্র্য ক্ষুণ্ণ হয়। স্বকীয়তা বলে কিছু থাকে না। এই কারণে অনেক নারী সমকামী হয়ে ওঠে। যৌন জীবনে orgasm-এর কি অসাধারণ ভূমিকা তা জানা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির Rutgers University-‘র Beverly Whipple এবং Barry Konisaruk-এর গবেষণা থেকে। তাঁরা জানান, ‘orgasm’ এর মধ্যে দিয়ে নারী এমন এক বিশেষ ধরণের শারীরিক সুখ অনুভব করে যা তাকে নানারকম দৈহিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেয়। মাইগ্রেনে (Migraine) আক্রান্ত ৫২ জন নারীর ওপর গবেষণা করে Southern Illionis school of Medicine-এর অধ্যাপক Dr James Crouch লক্ষ্য করেছেন— তীব্র মাথায় যন্ত্রণার সময় এদের ‘orgasm’-এর সুখ দেওয়ার পর ৮ জনের ব্যথা সম্পূর্ণ সেরে যায় এবং ১৬ জনের ব্যথা পুরোপুরি না সারলেও বিশেষ শারীরিক আরাম অনুভব করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Institute for Advanced Study of Human Sexuality-র একটি বিশেষ সমীক্ষা থেকে জানা যায়— যারা যৌন জীবনে ‘orgasm’ -এর পর্যায়ে পৌঁছাতে সক্ষম হয় তারা সাধারণত বিনয়ী স্বভাবের। এছাড়াও মানসিক উৎকণ্ঠা এদের মধ্যে কম দেখা যায়। এবং হিংসাত্মক কার্যকলাপের সঙ্গে এরা যুক্ত হতে চায় না। নিজের দুর্ভাগ্যের জন্য অপরকে এরা দায়ী করে না।

স্ত্রী সমকামীরা নানাভাবে যৌনসুখ লাভ করে। পুরুষ সমকামীদের মধ্যে যেমন মুখমৈথুন (oral Sex/ Fellatio) প্রচলিত, ঠিক তেমনি দুই সমকামী মহিলা একে অপরের গোপনাঙ্গ বিশেষ করে ভগাঙ্কুর (clitoris) লেহন করে। একে ‘Cunnilingus’ বলে। এছাড়াও চুম্বন ও মর্দনের মধ্যে দিয়েও যৌনতৃপ্তি বোধ করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, স্ত্রী সমকামিতায় দুই সঙ্গীর মধ্যে একজন সক্রিয় ও অপরজন নিষ্ক্রিয়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। যদিও এই ধারণা অনেকক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য নয়।

যৌনক্রিয়ার সময় সক্রিয় নিষ্ক্রিয়ের যোনি মুখে ভগঙ্কুর প্রবেশ করানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে। পারস্পরিক এই স্পর্শানুভূতির মধ্যে দিয়ে উভয়েই সুখ পায়। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডাঃ জে.বি. মুখার্জি স্ত্রী সমকামীদের এই আচরণকে ‘Penis game’ বলেছেন। অনেক সময় দুই সঙ্গী কৃত্রিম শিশ্নের মাধ্যমে একে অপরকে আরাম দিয়ে থাকে। রবার বা প্লাস্টিকের লম্বা দণ্ড, মোমবাতি, লম্বা বেগুন, শশা প্রভৃতির সাহায্যে এই ‘পেনিস গেম’ খেলা হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যার সাহায্যে নানারকম ‘কৃত্রিম শিশ্ন’ (penis) প্রস্তুত করা শুরু হয়েছে। পশ্চিম দুনিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশ্যেই এসব বিক্রি হয়। এই কৃত্রিম পেনিস বা শিশ্নকে বলে ভাইব্রেটর (vibrator)। প্রচলিত কিছু ভাইব্রেটর যা সচরাচর ব্যবহার করা হয়, সেগুলি হল— Thruster, Sleekest, Multi-Speed vibrator, Electro super vibrator, Thunderthrob, Multihead vibrator, Flexy vibrator। এছাড়া যোনি চুম্বন ও লেহন-এর জন্যে কৃত্রিম যন্ত্র তৈরি হয়েছে। একে বলে Autosuck Vagina.

অধিকাংশ স্ত্রী সমকামীই নিস্কোম্যানিয়াক (Nymphomanic)। অর্থাৎ এদের যৌনাকাঙ্ক্ষা অত্যধিক (Mukherjee J.B.)। এদের ভগাঙ্কুর স্বাভাবিকের তুলনায় বড়।

* বিশেষ টীকা দ্রষ্টব্য।

১. বিস্তারিত তথ্যের জন্য ”ভারতের হিজড়ে সমাজ” গ্রন্থ দ্রষ্টব্য।

১. ”ভারতের হিজড়ে সমাজ” গ্রন্থের দশম অধ্যায় দ্রষ্টব্য।

১. Beauvair :

In a study of 510 young Prostitutes, it was found that 284 of them lived alone, 132 with a man friend, and 94 with a woman with whom they were usualy in homosexual relations. A number of these girls said they had been debauched by other woman and some of them prostituted themselves to famales.

১. Mukherjee J.B. Vol II 1985

“In some cases, artificial phallus or penis, made of rubber or plastic, may be used for vulvo-vaginal penetration (penis-games). Science has helped to improve these contrivances which have become much more sophisticated & improved these days…”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *