১. অতীত বীক্ষণ

১. অতীত বীক্ষণ

ব্যবসার আগে :

সমকামী পুরুষ যৌনব্যবসার প্রচলন হয় ঠিক কবে থেকে তার ঐতিহাসিক প্রমাণ খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন। তবে সুপ্রাচীনকাল থেকেই যে সমলিঙ্গের মধ্যে যৌন-সম্পর্ক গড়ে উঠেছে তার কিছু দৃষ্টান্ত বিভিন্ন দেশের সাহিত্য, ইতিহাস ও ধর্মশাস্ত্রে পাওয়া যায়। এখানে অর্থের বিনিময়ে দেহদানের ব্যবস্থা ছিল না। তবে যৌনক্ষুধা নিরসনের জন্যে যৌনসঙ্গীকে নানারকম জিনিস দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। রাজন্যবর্গের পৃষ্টপোষকতায় বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন দেশে সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ বিশেষভাবে আদৃত হত। ফলে এর প্রসার ঘটতে সময় লাগে নি। সমাজের নিম্নবর্গীয় থেকে উচ্চকোটির মধ্যে এই অভ্যাস লক্ষ্য করা গেছে।

বাইবেল ও কোরানে সমলিঙ্গের প্রেম-ভালবাসার সন্ধান মেলে। এই দুই ধর্মশাস্ত্রে এই ধরনের যৌনাচারকে অপরাধ হিসাবে অভিহিত করা হয়েছে। সুপ্রাচীনকালে সোডম (sodom) ও গমোরা (Gomorrah) নামে দুটি সমৃদ্ধ নগর ছিল। কোন এক সময়ে এই দুই শহরের পুরুষ অধিবাসীদের যৌন-মানসিকতার আমূল পরিবর্তন ঘটতে থাকে। নারীর প্রতি তারা আর সহজাত যৌন-আকর্ষণ অনুভব করে না। বরং সমলিঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট হয়। নারীকে পরিত্যাগ করে পুরুষের সঙ্গে পুরুষের শারীরিক ও মানসিক ভালবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠতে থাকে। নারীরা উপেক্ষিত হয়। নিকৃষ্ট জীব হিসাবে গণ্য হতে থাকে। কিন্তু পুরুষে-পুরুষে মিলনে নতুন প্রজন্মের আগমন ঘটে না। তাই এই মানসিকতার প্রসার ঘটলে একসময় হয়তো মানবজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। ঈশ্বর আতঙ্কিত হলেন। তাঁর সৃষ্ট শ্রেষ্ঠ জীব ‘মানুষ’ এক সময় ‘কু-অভ্যাসের’ (?) কারণে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যেতে পারে বলে রুষ্ট হয়ে তিনি সোডম ও গমোরা নগর দু’টিকে ধ্বংস করেন। পরবর্তীকালে খ্রিষ্টান ধর্মীয় অনুশাসনে ‘সমলিঙ্গের ভালবাসা’ অসামাজিক, নীতিবিরুদ্ধ ও বিকৃত আচরণ হিসাবে চিহ্নিত হয়। ধর্মযাজক সেন্ট টমাস অ্যাকুইনাস (St. Thomas Acquinas) বলেন, যে যৌন ক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে সন্তান জন্মের কোন সম্ভাবনা থাকে না তা সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক।

হায় করুণাময় ঈশ্বর! তুমি ভেবেছিলে সোডম ও গমোরা ধ্বংস হলেই হয়তো এই কু-অভ্যাস (?) থেকে মানুষের মুক্তি ঘটবে। কিন্তু না, তুমি ভুল ভেবেছো। তোমার আশাবাদী মনে ঝড় তুলে শত-শত সোডম ও গমোরার জন্ম হয়েছে ও হচ্ছে। যাকে তুমি কু-অভ্যাস বলে দূরে ঠেলে রেখেছিলে, তা মানুষের স্বাভাবিক আচরণবিধি। প্রাচীন ভারতের অঙ্গ, অহিচ্ছত্র, সাকেত (অযোধ্যা), শুরসেন (মথুরাসহ কৌশাম্বী নগরীর দক্ষিণ দিকে বিস্তীর্ণ ভূভাগ), সিন্ধুদেশ ও লাট (গুজরাট) প্রভৃতি অঞ্চলে সমলিঙ্গের ভালবাসার কিছু ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয় যায় বাৎস্যায়ন কৃত ‘কামসূত্র’ গ্রন্থে। এই গ্রন্থের ষষ্ঠ অধিকরণের নবম অধ্যায়ে এক বিশেষ ধরনের ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, এদের সঙ্গেই পুরুষেরা সহবাস করতেন। এদের বলা হত পঞ্চমী নায়িকা বা তৃতীয় প্রকৃতি। এরা নারী নয়। আবার পুরুষও নয়। নারী-পুরুষ উভয়ের কিছু-কিছু বৈশিষ্ট্য এদের মধ্যে লক্ষ্য করা যেত। সেই যুগে দাঁড়িয়ে বাৎস্যায়নের পক্ষে এই জাতীয় ব্যক্তিদের শরীর ও মনের বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব হয় নি। তাই এরা জন্মগত যৌনপ্রতিবন্ধী, না খোজা, না-কি রূপান্তরকামী-সমকামী তা সঠিক করে বলা কঠিন। বাহ্যিক দৈহিক গঠন অনুযায়ী বাৎস্যায়ন এদের দু’ভাগে ভাগ করেছেন— স্ত্রীরূপিণী ও পুরুষরূপিণী। স্ত্রীরূপিণীদের আচার-আচরণে নারীত্বের সুস্পষ্ট ছাপ লক্ষ্য করা যেত। আশ্চর্যের বিষয়, এই ব্যক্তিরা পুরুষে উপগত হত। এরা স্ত্রীবেশ ধারণ করতো। সঙ্গমের উপযুক্ত যৌনাঙ্গ না-থাকায় মুখ-মৈথুনে এরা অভ্যস্ত ছিল। পুরুষরূপিণীরা পুরুষের শরীর সংবাহনের কাজে ছিল অত্যন্ত পটু। কামোদ্দীপক বিভিন্ন পদ্ধতি উদ্ভাবনের মধ্যে দিয়ে তারা পুরুষকে শৃঙ্গারের চরম-সুখ দিত। তবে এরাও প্রকৃত সঙ্গমে ছিল অপারগ। সাধারণত হস্তমৈথুন ও ঊরুমৈথুনের মাধ্যমে এরা পুরুষের যৌনক্ষুধা চরিতার্থ করতো। সেই যুগে সম্ভ্রান্ত বংশীয় কিছু পুরুষের যুবক-গৃহ-ভৃত্য ছিল। এরা সুদর্শন। এইসব পুরুষদের সঙ্গেই গৃহস্বামীরা যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতেন। প্রৌঢ় কোন পুরুষের যৌনজীবনে এইসব যুবকের বেশ বড় ভূমিকা ছিল। নানাভাবে এরা প্রৌঢ়দের রতিসুখের আনন্দ দিত। আরও লক্ষ্য করা গেছে, যাদের স্ত্রীরা সঙ্গমে অনিচ্ছুক ও অসমর্থ তারা যুবকদের সঙ্গে নানারকম যৌনক্রীড়ায় লিপ্ত হত। এছাড়াও সমবয়স্ক দুই পুরুষের মধ্যে যৌন সম্পর্কের কথা কামসূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে একজন সক্রিয় ও অপরজন নিষ্ক্রিয়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হত। আবার কখনো-কখনো একই পুরুষ পর্যায়ক্রমে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় সঙ্গীর ভূমিকা পালন করতো।

বাৎস্যায়নের আগেই কৌটিল্য তাঁর ‘অর্থশাস্ত্রে’ এক বিশেষ ধরণের পুরুষের কথা উল্লেখ করেছেন। এরা নপুংসক। পুরুষাঙ্গ ছেদন করে এদের নপুংসক করা হত। এরা ছিল রাজঅন্তঃপুরের পাহারাদার। শুধু মহিলারক্ষীদের দিয়ে এই কাজ করানো ছিল বেশ কঠিন। আবার পুরুষ রক্ষীবাহিনীকে বিশ্বাস করা যেত না। এদের হাতে অন্তঃপুরবাসিনীর শ্লীলতাহানি হওয়ার সম্ভাবনাও থেকে যায়। তাই কিছু পুরুষকে খোজা করা হয়। এদের মধ্যে কেউ-কেউ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদেও বসেছিল। রাজঅন্তঃপুর বা হারেমের মহিলারা এইসব খোজাদের দিয়ে বিকৃতভাবে তাদের যৌনক্ষুধা মেটাতো। রাজা বা নবাব-বাদশারাও পিছিয়ে ছিলেন না। এদের অনেকেই পুরুষ-উপভোগে তৃপ্ত হতেন। তাই এরা খোজাদের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক গড়ে তোলেন। বিষ্ণুপুরাণ, আপস্তম্ব ধর্মসূত্র, শতপথ ব্রাহ্মণ, নারদ ধর্মসূত্র, গৌতম ধর্মসূত্র, মিলিন্দপঞ্চহ, এমন কি জৈন শাস্ত্র ও সোমদেব রচিত কথাসরিৎসাগরেও খোজাদের উল্লেখ আছে। মনুসংহিতায় নপুংসকের আচরণকে নারীসলুভ বলা হয়েছে। এবং সমলিঙ্গের যৌন সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গর্হিত। এর জন্যে কঠিন শাস্তি পেতে হত।

প্রাচীন গ্রিস ও রোমেও সমলিঙ্গের ভালবাসার সন্ধান পাওয়া যায়। এখানে এক সময় পুরুষ পুরুষের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ অনুভব করতো। গভীর মানসিক সাযুজ্যের মধ্য দিয়ে এক অনির্বচনীয় শারীর সুখে মেতে উঠতো। পারস্পরিক সান্নিধ্য ও নির্ভরশীলতাকে আশ্রয় করে দুই পুরুষের এক বিচিত্র ঐক্যদাম্পত্য জীবন গড়ে উঠেছিল। সাধারণত বয়স্ক পুরুষরাই কিশোরদের সঙ্গে এই সম্পর্ক গড়ে তুলতো। সমবয়সীদের মধ্যে এই জাতীয় সম্পর্ক গড়ে উঠতো কমই। এথেন্সের বিভিন্নস্থানে কিছু জিমখানা ছিল। এখানে কিশোর ও যুবকরা ব্যায়ামচর্চা করতো। আদুর গায়ে তাদের এই শরীরচর্চা দেখতে আসতো বয়স্ক পুরুষরা। এই দৃশ্য তারা উপভোগ করতো। শুধু তাই নয়, এর মধ্যে দিয়েই তারা এক অদ্ভুত যৌন পরিতৃপ্তি লাভ করতো। (Roberts: 1993) স্পার্টাকাসের সৈন্যবাহিনীর বহু সৈন্যই ছিল সমলিঙ্গের প্রতি আসক্ত। করোনিয়ার যুদ্ধে থেবিয়ানরা পরাজিত হয়। বিজয়ীরা যুদ্ধক্ষেত্রে শত শত জোড়া মৃতদেহ দেখেছিল। এই সবই ছিল পুরুষ প্রেমিক-প্রেমিকার মরদেহ। (হোসেন : ১৯৮৭)।

আসলে সমলিঙ্গের ভালবাসার একটা সামাজিক স্বীকৃতি ছিল। গ্রিক ধর্মশাস্ত্র সমকাম স্পৃহাকে স্বাভাবিক আচরণবিধির পর্যায়ে ফেলে। গ্রিস ও রোমে ‘ভেনাস’ ছিলেন কামনার দেবী। এই দেবীই আবার সমলিঙ্গের ভালবাসার প্রতিভূ ছিলেন। এছাড়া ‘প্রিয়াপাস’ ও ছিলেন সমকামীদের আরাধ্যা দেবী। তাহিতিতেও সমলিঙ্গে আসক্ত ব্যক্তিদের আরাধ্য দেবতার মূর্তির সন্ধান পাওয়া গেছে। আনতোলিয়া, গ্রিস ও রোমের বিভিন্ন মন্দিরে, ‘সিবিলি’ ও ‘ডাইওনীসস’-এর পুজো ব্যাপকভাবে শুরু হয়েছিল। এই দুই দেব-দেবীর পুরোহিতেরা ছিলেন খোজা নপুংসক। সমলিঙ্গের প্রতি এরা অনুরক্ত ছিলেন বলে অনেকে মনে করেন। গ্রিক ধর্মশাস্ত্রে জিউস ও গানাইমেডির বৃত্তান্তে সমলিঙ্গের প্রেম-ভালবাসার কথা জানা যায়। (ভট্টাচার্য:)

রোম সম্রাট নিরো ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও খামখেয়ালী। তিনি একবার এক তরুণকে বিয়ে করার কথা ভাবেন। এবং করেও ফেলেন। তবে বিয়ে করার আগে তিনি ওই তরুণের পুরুষাঙ্গ ছেদন করান। আর বিয়ের পরে তরুণটি সম্রাটের নির্দেশে স্ত্রীবেশ ধারণ করেছিল। জুলিয়াস সিজারেরও সমলিঙ্গের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল। (Roberts : 1992/ হোসেন:)

মধ্য ও আধুনিক যুগে ভারতের বিভিন্ন শাসকদের মধ্যে পুরুষে উপগত হওয়ার অভ্যাস লক্ষ্য করা যায়। মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর বয়ঃসন্ধিতে এক বালককে ভালবেসে ছিলেন। দুর্নিবার ছিল সেই ভালবাসার টান। ‘বাবরনামা’য় তিনি খোলাখুলি এই কথা স্বীকার করেন। এর আগে অবশ্য সুলতান আমলে আলাউদ্দিন খিলজির পুরুষ প্রেমের কথা জানা যায়। (Bombay Dost : v. 5/ আঃ বাঃ ১৫.২.৯৮)

পাঞ্জাবের মহারাজা রঞ্জিৎ সিংহ মাঝে মধ্যেই রাজঅন্তঃপুরে নর্তকীদের নিয়ে এক অদ্ভুত নৃত্যে মেতে উঠতেন। বলাবাহুল্য, এইসব নর্তকীরা মেয়ে নয়। এরা নারীবেশী বালকের দল। আসলে মহারাজা বালকদের সঙ্গেই যৌনক্রীড়া পছন্দ করতেন। হায়দ্রাবাদের নবাব টিপু সুলতানের রিপুর তাড়না ছিল কল্পনাতীত। নারী সম্ভোগে তিনি ছিলেন পারদর্শী। আবার পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। অযোধ্যার নবাব ওয়াজেদ আলির শখ ছিল একটু ভিন্ন। তিনি নিজে নারী সেজে নর্তকীদের সঙ্গে খেলা করতেন।

শুধু রাজারাজড়া নয়, খলিফা, আমির-ওমরাহ উলেমা ও সুফিদের মধ্যেও সমলিঙ্গের প্রেমের সন্ধান পাওয়া যায়। হজরত মহম্মদের মৃত্যুর পর মুসলমানদের ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় জীবন পরিচালনার জন্যে খলিফা পদের সৃষ্টি হয়। এইসব খলিফাদের অনেকেই বালক প্রেমে মশগুল ছিলেন। একবার এক সুশ্রী কম-বয়সী বালককে নিয়ে এক খলিফার সঙ্গে তাঁর ভাই-এর বিরোধ বাধে। ভাই-এর ভয়ে খলিফা বালকটিকে তাঁর শয়নকক্ষে আটকে রেখেছিলেন। বালক সম্ভোগে নিন্দনীয় তো নয়ই, বরং গৌরবের বিষয় ছিল। (শ্রীপান্থ : ১৯৮৬)। যদিও প্রকাশ্যে এ কথা স্বীকার করতেন না কেউ-ই। আসলে মুসলিম সমাজে যৌনতার ব্যাপারে ছিল নানান গোঁড়ামি ও সংস্কার। ধর্মীয় অনুশাসনে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা ছিল এই সমাজ। নারী-পুরুষের ভালবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠার সম্ভাবনা এখানে ছিল কম। এই কারণেই অনেকে মনে করেন, এক পুরুষ অন্য পুরুষে উপগত হয়। অনেকে বলেন, একবার যে এই ভালবাসার স্বাদ পেয়েছে তার পক্ষে এর বন্ধন থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। আরবদেশের এক পিরসাহেব বলেন, বালক সম্ভোগের তৃপ্তিই আলাদা। এখানে যৌনসঙ্গীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে এ’ নিয়ে কোন দুর্ভাবনা থাকে না। মাসিক ঋতুস্রাবের ঝামেলা না-থাকায় নিশ্চিন্তে সহবাস চালানো সম্ভব।

মধ্যযুগে পৃথিবীর বিভিন্ন মুসলিম শাসনাধীন রাষ্ট্রে আমির-ওমরাহদের মধ্যেও সমলিঙ্গের প্রেম লক্ষ্য করা যায়। শরিয়তি নির্দেশ পুরোপুরি উপেক্ষা করেই আরবদেশে বহু ‘শেখ’ অন্য পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক বজায় রাখতেন। সাধারণত দেখা যেত, এইসব শেখরা অল্পবয়সী কিশোরদের উপপত্নীর মর্যাদা দিতেন। এবং প্রায়ই এদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হতেন। এই ধরণের আচরণের ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল। ফলে সাধারণের কাছে এটা আর কোন রাখা-ঢাকা বিষয় ছিল না। বরং এক ধরণের রীতি হিসাবে চালু হল যে, কোন বিবাহিত পুরুষ ‘রক্ষিতা’র মতো কম-বয়সী বালককে বিশেষ যৌনসঙ্গী হিসাবে কাছে রাখতে পারবে। এছাড়া অবিবাহিত অনেক পুরুষই এই ধরণের বালকদের সঙ্গে ‘লিভ-টুগেদার’ করতো। (Hodgson : 1974)। রোসেনথাল (Rosenthal)-এর লেখা থেকে জানা যায়, মধ্যযুগে আরবের বিভিন্ন শহরের নির্দিষ্ট স্থানে কিছু বিশেষ ধরণের পুরুষ বসবাস করতো। পুরুষ হয়েও এরা পুরুষকে দেহদান করতো। অনেকসময়েই এরা মহিলাবেশ ধারণ করতো। হাতে চুড়ি, নাকে নথ, কানে দুল। খুব পরিচ্ছন্নভাবে এরা দাড়ি গোঁফ কামাতো।

গোটিন (Goitein) -এর লেখা ‘The Sexual Mores of the common people in Society and the Sexes in Medieval Islam’ গ্রন্থ থেকে আরও ফতোয়া জারি করলেও নিজেরাই খুব সংগোপনে বালকদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তেন।

খ্রিষ্টীয় নবম শতাব্দীতে ইরানিয় এক প্রশাসকের মুখ্য সহকারী ছিলেন মুতাজিলি ইসলাম সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি। তিনি আমজনতার কাছে ঘোষণা করেন মুতাজিলি হল শ্রেষ্ঠ ধর্ম এবং পুরুষ সম্ভোগই যৌন-আনন্দের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। এই সময়েই আবু নওয়াজ নামে একজন কবির কথা জানা যায়। পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে তিনি চারটি জিনিস প্রার্থনা করেছিলেন— ভাং (নেশার দ্রব্য), মাংস, রুটি ও সম্ভোগের জন্যে বালক। (Rosenthal:)। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে জনৈক সুফিসন্ত শেখ আবু মুহম্মদ আলি আল-হাবিবি একদল নগ্ন বালকের সঙ্গে প্রতিদিন হামামে (স্নানাগারে) স্নান করতেন। এদের সঙ্গে সঙ্গমেও তিনি তৃপ্ত হতেন। তিনি মনে করতেন, যৌনবাসনা অবদমন করা ঠিক নয়। শিষ্যদের তিনি বিভিন্নভাবে যৌন কামনা মেটানোর কথা বলতেন। প্রায় ওই একই সময়ে সুফি কবি আবুল পথ ইবনও বলেন, সুফিসন্তদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের একটা বড় দিকেই হল সমলিঙ্গের ভালবাসা। সুফিদের অনেকে মুরিদদের (শিষ্যদের) সঙ্গে গভীর ভালবাসার সম্পর্ক গড়ে তুলতেন এবং বিশ্বাস করতেন, সুন্দরী নারীর থেকেও কম-বয়েসী বালকের সঙ্গলাভ অনেক উপভোগ্য। ‘ঈশ্বর’ সাধনায় ব্রতী হওয়ার জন্যেও পুরুষসঙ্গ একান্ত কাম্য। (Rosenthel:)

নিউ গিনি অঞ্চলে ‘কেরাকি’ (Keraki) নামে এক বিশেষ সম্প্রদায় বাস করে। এরা বিশ্বাস করে, কৈশোরে কোন পুরুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বৃদ্ধি ও পুষ্টির জন্যে বয়স্ক পুরুষের বীর্য একান্ত প্রয়োজন। তাই সমস্ত কিশোরই বয়স্ক পুরুষদের সঙ্গে পায়ুকামে লিপ্ত হয়। এরা আরও মনে করে, দীর্ঘদিন পায়ুকামে অভ্যস্ত হওয়ার ফলে কিশোররা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। তাই এই ঝামেলা এড়ানোর জন্যে কিশোরদের চুনগোলা জল খাওয়ানো হয়। যৌবন প্রাপ্তির পর এইসব কিশোররা সমকাম ও বিষয়কামে পটু হয়ে ওঠে। আফ্রিকার কঙ্গো ও সুদানের ‘জান্দি’ (zande) আদিবাসীদের মধ্যেও পুরুষসঙ্গম রীতির যথেষ্ট প্রচলন আছে। সাধারণত এই গোষ্ঠীর পুরুষরা ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সের আগে বিয়ে করে না। তবে অবিবাহিত জীবনে এরা বালক সম্ভোগ করে থাকে। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপে তাহিতিদের যৌনজীবন অনেকটাই সংস্কার মুক্ত। যৌনতাকে নিয়ে এদের মধ্যে নানারকম লোককাহিনি প্রচলিত আছে। এখানকার রূপান্তরকামী পুরুষরা ‘মাহু’ (Mahu) নামে পরিচিত। এরা গৃহভৃত্যের কাজ করে। এবং গৃহকর্তার সঙ্গে এদের ঘনিষ্ঠ যৌন সম্পর্ক গড়ে ওঠে। জাম্বিয়ার ‘ইলা’ (Ila) উপজাতির মানুষরা প্রধানত মৎসজীবী। অবশ্য এরা কৃষিকাজ ও পশুপালনও করে থাকে। এই উপজাতির কিশোররা পারস্পরিক হস্তমৈথুন ও পুংসঙ্গমে অভ্যস্ত। অবশ্য বয়স বাড়লে তাদের এই অভ্যাস ত্যাগ করতে হয়। কারণ, এরাও মনে করে পায়ুসঙ্গমে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার সম্ভাবনা আছে। দক্ষিণ সমুদ্রের সামোয়া দ্বীপপুঞ্জের অধিবাসী ও গ্রিনল্যাণ্ডের এস্কিমোদের মধ্যেও পুংসঙ্গমের অভ্যাস লক্ষ্য করা গেছে। (Goldenson & Anderson : 1994)। গুজরাটের ‘কুচি’ (Kutchi) জনগোষ্ঠীর লোকেদের মধ্যে সমলিঙ্গের বিবাহ প্রচলিত আছে। মিশরীয় কৃষকদের মধ্যে হস্তমৈথুন, পশুমৈথুন ও পায়ুকামের বহুল প্রচলন ছিল। একসঙ্গে মিলিত হয়ে এরা স্নান করতো। এখানে নারীর কোন প্রবেশাধিকার ছিল না। সক্রিয়-নিষ্ক্রিয় বলে এখানে কাউকে চিহ্নিত করা হত না। একই পুরুষ কখনো নিষ্ক্রিয়, আবার কখনো সক্রিয়ের ভূমিকা নিতো।

শুরু হল ব্যবসা :

সমাজ বিবর্তনের নানা ঘাতপ্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে অর্থের বিনিময়ে দেহাদান ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটেছিল। কিন্তু ঠিক কবে ও কেমনভাবে তা আজ সুনির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। অনেক নৃতাত্ত্বিক মনে করেন, মাতৃকা পুজো বা চর্চাকে কেন্দ্র করে প্রাচীনকালে কোন এক সময় গণিকাবৃত্তি বা নারী যৌনব্যবসার প্রকাশ ঘটে। পরবর্তীকালে সমাজ বিভক্ত হয়ে পড়ে নানা শ্রেণিতে। এই সমাজেই অভিজাতশ্রেণির মনোরঞ্জনের স্বীকৃতি স্বরূপ দেবতা মনোরঞ্জনেও নারীকে নিয়োগ করা হত। তাকে পুরোহিত শ্রেণির নির্দেশে একাধিক কলায় পারঙ্গম হতে হত। ধীরে-ধীরে পুরোহিতদের সহযোগিতায় ও স্বার্থে প্রতিটি মন্দিরেই দেবদাসী প্রথার প্রচলন হয়। এবং অত্যন্ত প্রচ্ছন্নভাবে দেহ ব্যবসার প্রসার ঘটতে থাকে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সিবিলি, ডাইওনিসস প্রভৃতি মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন পুরুষাঙ্গচ্ছেদিত পুরোহিতেরা। এরাও পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তেন কি-না তার কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে এরা নিজেদের নারী সাজে সজ্জিত করতেন। ফলে এদের মধ্যে দেহদান সম্পর্কিত যৌন-আচরণের প্রকাশ ঘটতে পারে বলে অনুমান করা যায়।

বিবাহ বহির্ভূত যৌনাচার ও পুংসঙ্গমের পিছনে কিছুটা ধর্মীয় ও সামাজিক সমর্থন মিলতে থাকে। নিত্যনৈমিত্তিক বহুগামী যৌন-অভ্যাসের মধ্যে এক সময় অর্থের অনুপ্রবেশ ঘটে। অর্থের বিনিময়ে মানুষ যৌন-আনন্দ পেতে চায়। যৌনতাকে নিয়ে শুরু হয় ব্যবসা। এই যৌন-ব্যবসার একটি বিশেষ রূপ হল সমকামী পুরুষ যৌনব্যবসা।

খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে প্রাচীন গ্রিসেই খুব বিক্ষিপ্তভাবে এই ব্যবসা শুরু হয়েছিল। এথেন্স সম্রাট সলোন (solon) এই ব্যবসাকে বে-আইনি ঘোষণা করেন। যদিও তিনি নিজে একজন সমকামী ছিলেন। এছাড়া যৌন-আচরণকে সংযত ও নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে সম্রাট নানারকম বিধিনিষেধও আরোপ করেন। পুরুষ যৌনকর্মীরা সলোনের আইনকে একপ্রকার উপেক্ষা করেই প্রকাশ্য রাস্তায় খদ্দের ধরার আশায় ঘুরে বেড়াতো।

সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফ্রান্স ও ইংল্যাণ্ডে নানাধরণের গণিকালয় গড়ে ওঠে। নানারকম খদ্দেরের বিকৃত যৌনক্ষুধা মেটানোর জন্যে বিভিন্ন রকম ব্যবস্থা ছিল এখানে। শুধু গণিকালয় নয়, কফি-হাউস, চকলেট ও কসমেটিকের দোকান ও পানশালায় খুবই প্রচ্ছন্নে যৌনব্যবসা চালানো হত। আবার কখনো-কখনো প্রকাশ্য রাস্তায় খদ্দের ধরার জন্যে যৌনকর্মীরা বেরিয়েও আসতো। নানা অঙ্গভঙ্গীর মধ্যে দিয়ে তারা খদ্দেরকে প্রলুব্ধ করতো। এই সময় সমকামী পুরুষ যৌনকর্মীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। মহিলা যৌনকর্মীদের পাশাপাশি এদের ব্যবসা বসেছিল বেশ জাঁকিয়ে। ইংল্যাণ্ডের বুল এ্যাণ্ড বুচার (Bull & Butcher), স্পিলার্স হেড (spiller’s Head), দি ফাউনটেন (The Fountain), দি সান (The Sun), দি বুল হেড (The Bull Head) প্রভৃতি পানশালায় পুরুষ যৌনকর্মীদের দেখা মিলতো। নানা বয়সের খদ্দেরও আসতো। এদের সঙ্গে মিলিত হতে। নানাভাবে এরা খদ্দেরের দৃষ্টি আকর্ষণ করতো। এদের অনেকেই মহিলা সাজতো। পুরোপুরি নারীসুলভ ভঙ্গী। এদের ছিল কৃত্রিম সুডৌল স্তন। আসন্ন সন্তানসম্ভবার বেশে স্ফীত উদর নিয়ে কেউ কেউ ঘুরে বেড়াতো। এরা পানশালার অভ্যন্তরে এমন কি প্রকাশ্য রাস্তায় সন্তান প্রসবের মেকি যন্ত্রণা (mock childbirth) অনুভবের অভিনয় করতো। আকৃষ্ট হত অনেক পুরুষই। এছাড়াও ছিল প্রাক-সঙ্গম প্রমোদ অনুষ্ঠান। এখানে খদ্দেরের সঙ্গে পুরুষ যৌনকর্মীর নকল বিয়ে (mock marraige) হত। হৈ-হুল্লোড়ে মেতে উঠতো পানশালাগুলি। অধিকাংশ খদ্দেরই ছিল রাজন্যবর্গ ও অভিজাত শ্রেণির লোক। তারা দু’হাতে দেদার পয়সা ওড়াতো।

যৌনব্যবসার প্রসারে সামাজিক অবক্ষয় বাড়তে থাকে। (এর বিপরীতটিও সত্য)। নৈতিকতার মান কমে যায়। মূল্যবোধের চরম অধঃপতন ঘটে। তাই এই ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিহত করার জন্যে এই সময়ে নানারকম সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ইংল্যাণ্ড, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া, জার্মানি প্রভৃতি দেশে যৌনকর্মীদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা নেমে আসে। তাদের গ্রেপ্তার করা শুরু হয়। দোষী হিসাবে তাদের কঠিন শাস্তি পেতে হয়। সমাজ-সংস্কারের নামে যৌনকর্মী নিধনের এক পৈশাচিক খেলায় মেতে ওঠে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ। পুরুষ যৌনকর্মীদের অবস্থা এই সময় আরও ভয়াবহ হয়ে দাঁড়ায়। এদের নিকৃষ্ট, অপাঙক্তেয় জীব হিসাবে গণ্য করা হত। ফলে এদের ওপর আঘাতটা নামে অনেক বেশি। প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত, দেশ থেকে বিতাড়ন, মস্তক মুণ্ডন, নাসিকাছেদন, এমন কি শিরচ্ছেদও করা হয়। বিকারগ্রস্ত মানুষ বলে এদের পাগলাগারদে রাখা শুরু হয়। এই সময় ইংল্যাণ্ডের রানী মেরীর (queen Merry) পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরা যৌনব্যবসা রোধ করার কাজে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এদেরই উদ্যোগে ১৭২৬ খ্রিষ্টাব্দে কুড়িটি সমকামী গণিকালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়। এদের মধ্যে উল্লেখ্য মাদার ক্ল্যাপ (mother Clap) একজন নারী যৌনকর্মী ছিলেন। বয়সকালে তিনি গণিকালয়ের মালিক হয়ে ওঠেন। এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে কিছু রূপান্তরকামী পুরুষ সংগ্রহ করে সমকামী যৌনব্যবসা শুরু করেন। তার গণিকালয়ে একসঙ্গে চল্লিশজন সমকামী খদ্দেরের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা ছিল। ধরা পড়ার পর তার ব্যবসা শুধু বন্ধই করে দেওয়া হয় না, তাকে নানারকম দৈহিক নির্যাতনও সহ্য করতে হয়। এছাড়াও তার বহু টাকা জরিমানা হয় এবং তিনি দু’বছরের জন্যে কারারুদ্ধ হন। তার তিন পুরুষ যৌনকর্মীকে ফাঁসি দেওয়া হয়। এই দমননীতির ফলে পুরুষ যৌনকর্মীদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠলেও ইংল্যাণ্ড থেকে সমকামী যৌনব্যবসাকে উচ্ছেদ করা সম্ভব হয় নি।

আব্রাহাম ফ্লেক্সনারের (Abraham Flexner) লেখা ‘Prostitution in Europe’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, জার্মানির বার্লিন শহরে পুরুষ যৌনকর্মীদের ব্যবসা ছিল রমরমা। এদের সংখ্যা ছিল ১০০০ থেকে ২০০০-এর মধ্যে। শুধুমাত্র পুরুষ সমকামী খদ্দেরের বিনোদনের জন্যে বার্লিনে কিছু পানশালা তৈরি হয়েছিল। এখানে নারীর কোন প্রবেশাধিকার ছিল না। এছাড়া চল্লিশটি রিজর্ট (Resort) ছিল, যেখানে যৌনব্যবসা চালানো হত। তাঁর লেখা থেকে আরও জানা যায়, সেই সময় বার্লিন শহরে প্রায় ৩০,০০০ সমকামী বাস করতো। এরাই ছিল মূল খদ্দের।

জার্মান মনোবিজ্ঞানী ম্যাগনাস হার্শফেল্ড (Magnus Hirschfeld)-এর লেখা থেকে যৌনব্যবসা সম্পর্কিত অনেক তথ্যই জানা যায়। তিনি জানান, বার্লিন ছিল ইউরোপে পুরুষ যৌন-ব্যবসার মূল কেন্দ্র। বার্লিন ও সংলগ্ন অঞ্চলে প্রায় ২০,০০০ পুরুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তিরিশের দশকে ভারত পরিভ্রমণে এসেও হার্শফেল্ড (Hirschfeld) ভারতের বিভিন্ন শহরে এই ব্যবসা লক্ষ্য করেছিলেন। এইসব পুরুষ যৌনকর্মীর অনেকেই ছিল পুরুষাঙ্গচ্ছেদিত ব্যক্তি (Castrated male)। এরা হিজড়ে (Eunuch) নামে পরিচিতি ছিল। এদের অধিকাংশই রূপান্তরকামী হলেও কেউ কেউ ছিল জন্ম-যৌন প্রতিবন্ধী। রূপান্তরকামীরা নিয়মিত দাঁড়ি-গোফ কামাতো। কাজের সুবিধার জন্যে এরা নিজস্ব সংগঠনও তৈরি করেছিল। এইসব হিজড়েদের সঙ্গে মহিলা যৌনকর্মীদের কাজের ব্যাপারে যে অনেক পার্থক্য তা হার্শফেল্ড (Hirschfeld) বুঝতে পেরেছিলেন। হিজড়েরা স্ত্রীবেশ পরিধান করতো। ভারতের বিভিন্ন শহর ঘোরার সুবাদে হার্শফেল্ড (Hirschfeld) জানতে পারেন হিজড়ে ছাড়াও আরও কিছু পুরুষ আছে যারা যৌন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে অর্থ উপার্জন করে। এদের সঙ্গেও হিজড়েদের অনেক পার্থক্য। এদের ব্যবসার মূল ঘাঁটি ছিল লক্ষ্নৌ।

সংখ্যায় অল্প হলেও পুরুষ গণিকালয় একেবারে দুর্লভ ছিল না। সন্ধের পর এইসব গণিকালয়ের কর্মীরা আলো জ্বেলে খদ্দেরের জন্যে অপেক্ষা করতো। অপরিচিত খদ্দেরকে পথ চিনিয়ে দেওয়ার জন্যে রাস্তায় থাকতো নানা বয়সের দালাল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পশ্চিমের বিভিন্ন দেশে পুরুষ যৌনব্যবসায় দালালের কোন ভূমিকা নেই। এমন কি আমাদের দেশের এই ব্যবসা বর্তমানে দালাল নির্ভর নয়। হার্শফেল্ড (Hirschfeld) যে সব গণিকালয় ঘুরে দেখেছেন সেসবই মহিলা গণিকালয়ের অনুরূপ। খুবই সংগঠিত ও পরিকল্পিতভাবে এই ব্যবসা চলতো। সমুদ্রোপকূলের করাচি শহরের যৌনব্যবসার ইতিহাস সুপ্রাচীন। এখানে অনেক পুরুষ-গণিকালয় ছিল। যৌনকর্মীদের অধিকাংশই ছিল খোজা। তবে বালকামী খদ্দেরকে তুষ্ট করার জন্যে কিছু কিশোরকেও গণিকালয়ে রাখা হত। ১৮৪৫ সালে ব্রিটিশ সরকার এদের বিষয়ে পরিপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের জন্যে বিশেষ ধরণের সমীক্ষা চালায়। ১৮৫৫ সালে রিচার্ড বার্টন (Richard Francis Burton) তাঁর ‘Terminal Essay’ গ্রন্থে করাচি শহরের নারীবেশী পুরুষ যৌনকর্মীদের ওপর সবিশেষ আলোচনা করেন। এই লেখক তাঁর ‘The Book of the Thousand Nights and a Night’ গ্রন্থের দশম খণ্ডে সমকামী যৌনতার কথাও উল্লেখ করেছেন। ১৮৫২ সালে উত্তরপূর্ব ভারতের মণিপুর রাজ্যের একদল নারীবেশী পুরুষ যৌনকর্মীকে দেহব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আদালতে মামলা দায়ের করা হয় (Mehir & Gribble : 1929)। এ থেকে সুস্পষ্ট হয় যে, ওই অঞ্চলে পুরুষ যৌনব্যবসার প্রচলন ছিল। পুরনো লাহোরেও এই ব্যবসা চলতো। লালবাতি অঞ্চল হীরা-মাণ্ডির অলি-গলির নারী যৌনকর্মীদের সঙ্গে পুরুষরাও এই ব্যবসায় নেমেছিল। কিছু-কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে এদের আবার স্বতন্ত্র গণিকালয়ও গড়ে ওঠে। পুরুষ হয়েও এরা স্ত্রী-বেশ ধারণ করতো। প্রখ্যাত ফরেনসিক-বিশেষজ্ঞ ডাঃ জে.বি. মুখার্জির সমীক্ষা থেকে জানা যায়, এইসব পুরুষ যৌনকর্মীরা লক্ষ্নৌ, বেনারস, হায়দ্রাবাদ, দিল্লি, মুম্বাই, ভূপাল, আমেদাবাদ, কলকাতা, কটক, ওয়ালটেয়ার, পাটনা ও আরও কিছু ছোট শহরে বাস করে। এবং এরা সকলেই রূপান্তরকামী (২য় অধ্যায় দ্রষ্টব্য)। এরা মেয়েদের পোশাক পরে। সাধারণের কাছে এরা হিজড়ে বলেই পরিচিত। তবে এরা ছাড়াও বহু পুরুষই আছে যারা স্ত্রী-বেশ ধারণ করে না। এরাও এক বিশেষ ধরনের যৌনকর্মী। এদের সকলেই নিজের প্রকৃত নাম গোপন রেখে ছদ্মনাম ব্যবহার করে। স্বাধীনভাবে ব্যবসা করলেও পুরুষযৌনকর্মীদের অনেকেই গণিকালয়ের মাসির (madam) অধীনে থেকে কাজ করে। আসলে সমকামী খদ্দেরের জন্যে মাসিকে এদের রাখতে হয়। মুম্বই-এর কামাতিপুরা লালবাতি অঞ্চলে এই ধরণের অনেক কর্মীর দেখা মিলবে। ১৯৯২ সালে প্রথিতযশা সমাজবিজ্ঞানী মণি নাগ এই অঞ্চলে সমীক্ষা চালান। তাঁর সমীক্ষা থেকে জানা যায়, এইসব পুরুষদের যথেষ্টই চাহিদা আছে। অনেক সময় এদের পারিশ্রমিক মহিলা যৌনকর্মীদের তুলনায় বেশি হয়। এই ব্যাপারে এক নারী যৌনকর্মী সাবিত্রী’র সঙ্গে কথা বলেছিলাম। পুরো নাম সাবিত্রী ফার্নাণ্ডেজ। কামাতিপুরার শুক্লা স্ট্রীটের মুশা বিল্ডিং-এর ১২ নম্বর ঘরে বসে ও আমাদের শুনিয়েছিল পুরুষ যৌনকর্মীদের নানা কাহানি। কেন যে এইসব পুরুষরা বেশ্যা বোনে গেল, তা সাবিত্রী ঠিক গুছিয়ে বলতে পারে না। তবে ওরা যে পুরোপুরি ছেলেদের মতো না, তা সাবিত্রী বোঝে। কোথায় যেন ওদের শরীর-মনে একটা গণ্ডগোল আছে। সাবিত্রী আরও বলে,

‘হামমে আওর উনহুঁ মে তায়াল্লাক হ্যায় ভাই আওর বহনক মওয়া খেক। কামকে বারে মে কভি কভি থোড়া থোড়া গরমিল হোতা হ্যায় গরচে হাম লোগমে বহুত দোস্তি হ্যায়। উনকো খরিদার দোসরা হ্যায় হামরা খরিদার দোসরা হ্যায়। মাগার কুছ কুছ এইসা ভি হ্যায় যো উনসে ভি মিলতা হ্যায় আওর হামসে ভি।’

অনেক পুরুষই আছে যারা খুব গোপনে আমরা দেখা পেয়েছিলাম ওড়িশার পুরি জেলার ছয়তানা গ্রামের সানুয়া পাড়ায়। গ্রামের লোকেরা এদের ‘মায়া’ বলে ডাকে। নিজেরা স্বীকার না করলেও গ্রামবাসীদের কাছ থেকে এদের দেহব্যবসার কথা জানা যায়। এছাড়াও জগন্নাথ মন্দির থেকে প্রায় ১৩ কি.মি. দূরে রেভেনা গ্রামেও কিছু ওড়িশার পুরুষ যৌনকর্মীদের ওপর একটি সমীক্ষা চালান। তার রিপোর্ট থেকেও এই বিষয়ে অনেক কিছু জানা যায় (Freeman : 1979)।

অবস্থার বিপাকে বহু কিশোর ও যুবক এই ধরণের যৌনকাজের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। হোটেল-বয়, ম্যাসেজ-বয় ও ট্রাকের খালাসিদের অনেকেই আজ ‘পার্ট-টাইম’ যৌনকর্মী।

প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশেও পুরুষ যৌনব্যবসার বেশ রমরমা। শিবানন্দ খানের ঢাকা সমীক্ষা রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু পুরুষ গণিকালয় গড়ে উঠেছে। এগুলো ঠিক সাধারণ গণিকালয়ের মতো নয়। কিছু হোটেল ও গেস্ট-হাউসকে এই উদ্দেশ্যে ভাড়া নেওয়া হয়েছে। এবং পরিকল্পিতভাবেই এই ব্যবসা চলছে। (NAZ Dhaka Report 2 : 1996)।

মুক্ত অর্থনীতির জোয়ারে যৌন-পর্যটনের হাত ধরে সমকামী যৌনব্যবসা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিশেষ করে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার থাইল্যাণ্ডে বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। ‘১৯৯০ সালে থাইল্যাণ্ডের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ১০ বিলিয়ান ডলার।’ (মিত্র : ১৯৯৭)। তাই দেখা যাচ্ছে, বাণিজ্য খাটতির প্রায় অর্ধেকটা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে যৌনব্যবসার মাধ্যমে। বস্তুত ১৯৬৭ সাল থেকে থাইল্যাণ্ডে এই ব্যবসার সূত্রপাত ঘটে। এই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও থাইল্যাণ্ডের মধ্যে একটি চুক্তির ফলে ভিয়েতনামগামী মার্কিন সেনারা থাইল্যাণ্ডে বিশ্রাম ও বিনোদনের সুযোগ পায়। সেনাদের মনোরঞ্জনের জন্যে গড়ে ওঠে নানা ধরণের নাইট ক্লাব ও লালবাতি এলাকা। এরপর সত্তরের দশকে পশ্চিম ইয়োরোপের বিভিন্ন দেশ ও জাপান থেকে পর্যটকরা এখানে আসতে শুরু করে। স্রেফ বিনোদনের আশায়। ‘পারমিসিভ সোসাইটি’র তকমা আঁটা ঢালাও যৌন ব্যবসার হাটে পুরুষ যৌনকর্মীর সংখ্যা নিতান্ত কম নয়।

থাইল্যাণ্ডের পাতাইয়া সমুদ্র সৈকতে (Pattaya Sea Beach) যৌন-বিনোদনের নানারকম ব্যবস্থা আছে। যৌন-পর্যটন (Sex-Tourism) সম্পর্কিত পৃথিবীর বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এই জায়গার নাম বেশ ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। তাই পশ্চিম ইয়োরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহু পর্যটকই ছুটে আসছে পাতাইয়ার। বালকামী (paedophile), ধর্ষকামী (sadist) ও মর্ষকামীর (Mosochist) কাছে পাতাইয়া আজ স্বর্গরাজ্য। দেশ-বিদেশের বহু নারী দুষ্ট-পাচারচক্রের মাধ্যমে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছে। প্রত্যন্ত গ্রামও বাদ নেই। নারী মাংসের জোগান দিতে আড়কাঠির দল হাত বাড়িয়েছে দূর— বহুদূরের গ্রামে। উত্তর-পূর্ব থাইল্যাণ্ডের বহু গ্রামে এখন কমবয়সি মেয়েদের আর দেখা যাচ্ছে না। সবাই ছুটেছে ব্যাঙ্ককের কোন গণিকালয়ে অথবা পাতাইয়ার কোন রিজর্টে।

পাতাইয়ার যৌন-পর্যটন শিল্পের আরও একটি লক্ষ্য করার মতো বিষয় হল ‘পুরুষ যৌনকর্মী’। সংখ্যায় অপেক্ষাকৃত কম বলে প্রচার মাধ্যমে এরা তেমন একটা জায়গা পাইনি। তবে এদের কথাও বিদেশিরা জেনে ফেলেছে, নানাভাবে। তাই এদের খদ্দেরের অভাব নেই। ছুটে আসছে নানা বয়সের সমকামী খদ্দের। এই ব্যাপারে kevin-এর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। পুরো নাম kevin Ahern। সানফ্রানসিসকোর (Sanfrancisco) এক পুরুষ যৌনকর্মী। ‘দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি’ আয়োজিত কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে যৌনকর্মীদের প্রথম জাতীয় সম্মিলনে যোগ দিতে এসেছিল Kevin। ওর কথা থেকে জানা যায়, পাতাইয়ায় পুরুষ যৌনকর্মীদের ব্যবসার বাড়বাড়ন্ত বেশ চোখে পড়ার মতো। বহুবারই ও গেছে ওখানে। খদ্দের হয়ে নয়, ব্যবসার হালহকিকতের খবরাখবর নিতে। ঘোরাঘুরির ফাঁকে ওখানেও ও বেশ কিছু খদ্দের জুটিয়েছিল। এইসব খদ্দেরের অধিকাংশই ছিল জাপান ও মধ্যপ্রাচ্যের লোক। পাতাইয়ার পুরুষ যৌনকর্মীরা ‘লেডিবয়’ নামে পরিচিত। মহিলাদের মতো অঙ্গভঙ্গী করলেও এরা যে কেউ-ই মহিলা নয় তা তাদের ঘোরাফেরা ও কথাবার্তা থেকেই বোঝা যায়। Kevin-এর সঙ্গে কথা বলে মনে হল, থাইল্যাণ্ডের এই ‘লেডিবয়’ বা রূপান্তরকামী। এরা লিঙ্গচ্ছেদন করেছে কি-না তা ও জানে না। তবে এদের সবার উন্নত বক্ষ, মেয়েদের মতো। এর জন্যে এরা হরমোন থেরাপি করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শিশু-নারী যৌনকর্মীদের স্তন বৃদ্ধির জন্যেও এইরকম ব্যবস্থা করা হয়। তাইওয়ানের বিভিন্ন গণিকালয়েও এই ব্যবস্থার ব্যাপক প্রচলন আছে। Kevin-এর সঙ্গে আলাপচারিতার মাঝে পরিচয় হল Cat Ross-এর সঙ্গে। ও নিজে সানফ্রানসিসকোর একজন নারী যৌনকর্মী। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের যৌনকর্মীদের অবস্থার ওপর ও একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করতে চায়। ওর কাছ থেকেও জানা গেল থাইল্যাণ্ড, ফিলিপাইস, তাইওয়ান, হংকং ও শ্রীলঙ্কায় পুরুষ যৌনকর্মীদের ব্যবসা এখন প্রকাশের আলোয় এসে দাঁড়িয়েছে। নিজেদের অধিকার আদায় করার জন্যে এরা আজ নারী যৌনকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়ে আন্দোলনে নেমেছে।

'কেভিন'— সানফ্রান্সিসকোর এক পুরুষ যৌনকর্মী

‘কেভিন’— সানফ্রান্সিসকোর এক পুরুষ যৌনকর্মী

রাজধানী ব্যাঙ্ককের লুম্বিনি পার্ক (Lumbini park) হল পুরুষ যৌনকর্মীদের একটি বিশেষ বিচরণক্ষেত্র। সারাদিন শুনসান। সন্ধের পরই লোকের আনাগোনা শুরু হয়। কেউ ক্রেতা, কেউ বিক্রেতা। রাত যত বাড়ে, ব্যবসা তত জমে ওঠে। শুধু যৌনকর্মী নয়, সাধারণ সমকামীরাও এখানে আসে। এরা খুঁজে ফেরে মনের মতো জীবনসঙ্গীকে। তাই শুধু ব্যবসার এলাকা নয়, প্রেম-ভালবাসা বিনিময়ের একটি উত্তম স্থানই হল এই লুম্বিনি পার্ক। এছাড়াও রয়েছে ব্যাঙ্কক আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর সংলগ্ন এলাকা। এখানে সাধারণত পুরুষ যৌনকর্মীরা খদ্দের ধরার জন্যে আসে। ঠিক এইরকম আরও একটি এলাকা হল কুসুমভিট রোড (Kusumvit Road)।

থাইল্যাণ্ডের ব্যাঙ্কক শহরের একটি অত্যন্ত পরিচিত রাস্তা হল সিলমন স্ট্রিট (Silmon street)। সন্ধের পরই এখানে পুরুষ যৌনকর্মীদের ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। কেউ খদ্দের ধরায় ব্যস্ত, কেউবা আবার সমমানসিকতার সঙ্গী খুঁজতে উদগ্রীব। এই রাস্তার খুব নিকটে একটি এলাকার নাম প্যাটপং (Patpang)। এখানে সমকামীদের মনোরঞ্জনের জন্যে নানান রকম রেস্তোরাঁ, পার্লার ও বিশেষ ধরণের টেলিফোন বুথের ব্যবস্থা রয়েছে। আমাদের পরিচিত টেলিফোন বুথের সঙ্গে এর ফারাক অনেক। এগুলি ‘টেলিফোন পাব’ (Pub) নামে পরিচিত। অনেকটা রেস্তোরাঁ ধরনের এই পাবগুলিতে সমকামীদের আনন্দ দানের বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। ছোট ছোট টেবিল, তার ওপর টেলিফোন, সঙ্গে ঝুলছে দুই সংখ্যা বিশিষ্ট বড় হরফে লেখা ইংরেজিতে টেলিফোন নাম্বার। অন্য টেবিল থেকে বা সংশ্লিষ্ট ওই ঘরের অন্যপ্রান্ত থেকে টেলিফোনের এই নাম্বার সকলের চোখেই পড়বে। মনের মতো সঙ্গীকে টেলিফোনের মাধ্যমে ডেকে আনা যেতে পারে পাশের চেয়ারে। কিছু সময় গল্পগুজব এবং তারপর নির্দিষ্ট দিন ঠিক করে মিলিত হয় সবাই। এইভাবে অত্যন্ত অভিনব কায়দায় সমকামী যৌনব্যবসা চলেছে।

রেস্তোরাঁ জে. ডি ডিসকো-(J.D.Disco) তেও সমকামীদের মনোরঞ্জনের জন্যে ঢালাও ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রবেশের অধিকার আদৌ সুলভ নয়। গুনে গুনে ২০০ বাহাট (Bahts- থাই টাকা) দিলে ভিতরে প্রবেশ করার অনুমতি মেলে। রেস্তোরাঁটি সুবিশাল। তিনতলা। একতলায় নাচগান পরিবেশনের জন্যে একটি প্রশস্ত মঞ্চ আছে। দোতলা ও তিনতলায় গ্যালারির আকারে আরাম কেদারায় বসে ওই দৃশ্য বিভিন্ন সমকামী মানুষেরা উপভোগ করে।

‘ব্যবিলন স্যনা’ (Babylon Souna) ব্যাঙ্ককের একটি বিলাসবহুল রেস্তোরাঁ। এটি সমকামী যৌনব্যবসার একটি অতি পরিচিত স্থান। কেবলমাত্র সমকামীদেরই এখানে প্রবেশ অধিকার। প্রবেশ মূল্য ১৮০ বাহাট। প্রতি শনিবার ও রবিবার এটাই বেড়ে দাঁড়ায় ২০০ বাহাটে। ‘স্যনা’ (Sauna) আক্ষরিক অর্থে রেস্তোরাঁ নয়। বরং আভিধানিক অর্থে স্নানাগার বলাই শ্রেয়। Webster Dictionary তে ‘স্যনা’ কথার অর্থ লেখা হয়েছে— A bath house or rooms usually of wood, equipped for a bath. (স্নানের জন্য নির্মিত, সাধারণ কাঠের, বাড়ি বা ঘর) ব্যাবিসন স্যনাকে পুরোপুরি স্নানাগার না বলে অনেক কিছুর সমাবেশ ঘটেছে এমন একটি বিশাল সুদৃশ্য অট্টালিকা বলাই সমীচীন। রেস্তোরাঁটি দুপুর ১২টায় খোলে এবং রাত ১২টায় বন্ধ হয়। একতলায় আগত খদ্দেরদের অভ্যর্থনার জন্যে রিসেপশানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরিধেয় বস্ত্র পরিবর্তনের জন্যে বিশেষ ঘর আছে। মূল্যবান জিনিস রাখার জন্যেও বিশেষ লকার আছে। এছাড়াও একতলায় রয়েছে একটি সুবিশাল ব্যায়ামাগার ও জিমন্যাসিয়াম। এখানেই পুরুষ যৌনকর্মীরা জমায়েত হয়। এদের রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষ নিয়োগ করে। এরা ‘মাসেল কুইন’ নামেও পরিচিত। এখানে এরা শরীরচর্চা করে এবং বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গীর মধ্যে দিয়ে খদ্দেরকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে। দোতলায় আসা যাক।— এখানে রয়েছে সুসজ্জিত ছোট ছোট কক্ষ। প্রতিটি ঘরে নরম তুলতুলে গদিবিশিষ্ট খাট। আর যা বলাই বাহুল্য তা হল প্রতি ঘরেই বিশেষ ধরণের কণ্ডোমের পর্যাপ্ত জোগান আছে। উন্নতমানের অতি সুগন্ধী সাবান, সেন্ট ও মুখ পরিষ্কার করার জন্যে বিশেষ ধরণের লিকুইডের ব্যবস্থা আছে। তিনতলাটা অনেকটা খোলা মেলা। গোপনীয়তাহীন মুক্ত পরিবেশ। যে যার নিজের সঙ্গী নিয়েই ব্যস্ত। এখানকার বিশেষত্ব হল স্নান করার উপযুক্ত পরিবেশটি। স্নানরত পুরুষদের পরিধেয় বস্ত্রের ওপর কোন বিধিনিষেধ নেই। তাই অনেক সময় বেলেল্লাপনা তূরীয় মার্গে পৌঁছায়। নগ্ন হয়ে সঙ্গীকে নিয়ে উদ্দাম নৃত্যে মেতে ওঠাটা এখানে স্বাভাবিক ঘটনা। উত্তেজনাকে বাড়াবার জন্যে কামোদ্রেককারী সমকামী মৈথুন চিত্র সম্বলিত বিভিন্ন পত্রিকা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হয়। কাওসান (Kaosan) এবং চাটোচাক বাজার (ChatoChak Markets) অঞ্চলে পুরুষ যৌনকর্মীরা খুব স্বাভাবিক গতিতেই ঘোরাফেরা করে।

সুসজ্জিত বিভিন্ন Departmental stores-এ সমকামীদের যৌন-জীবনের নিত্য প্রয়োজনীয় নানান ধরণের দ্রব্য পাওয়া যায়। প্রিয় সঙ্গীকে নিয়ে এই অঞ্চলেই শুধু ঘুরে বেড়াতে চায় এমন সমকামীর সংখ্যা কম নয়।

মুক্ত অর্থনীতি স্বর্গরাজ্য হংকং। যৌনবিনোদনের নানারকম ব্যবস্থা এখানেও রয়েছে। এখানকার সমকামী মনোরঞ্জনের কেন্দ্র হল ‘চুন কিং ম্যানসান’ (Chun King Mansion)। প্রবেশাধিকারের মূল্য ২০০ হংকং ডলার। ব্যাঙ্ককের মতো এখানেও খদ্দেররা যৌনকর্মীদের সঙ্গে টেলিফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারে। চুন কিং ম্যানসানের ঠিক বিপরীতে পিকিং রোড। এখানে অসংখ্য ম্যাসেজ পার্লার, স্যনা প্রভৃতি গড়ে উঠেছে। এগুলি অত্যাধুনিক পুরুষ গণিকালয়। এখান থেকে পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ হার্ভার ভিউ (Harbour View)। সমকামীদের অত্যন্ত পছন্দের এলাকা। এখানে পুলিশের ঝামেলা নেই। ফলে অন্য এলাকার তুলনায় এখানে খদ্দেরের আনাগোনা বেশি। নিশ্চিন্তে, নির্ভাবনায় যৌনকর্মীরা এখানে ঘোরাফেরা করে। রাত প্রায় দু’টো পর্যন্ত এখানে ব্যবসা চলে।

কেন এই ব্যবসায়?

কেন এমনটা হয়? কেন কিছু পুরুষ ‘যৌনকর্মী’ হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠে? কেন এরা পুরুষে উপগত হয়? পুরুষ হয়েও এরা কেন নারী সংসর্গে বঞ্চিত? তবে কী এদের জোর করে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে? এরা কী বিকারগ্রস্ত? কী এদের সমস্যা? কারাই-বা আসে এদের কাছে?— এ রকম আরও হাজারো প্রশ্ন মনে আসতে পারে। এক কথায় এর উত্তর দেওয়া কঠিন।

যৌনব্যবসা বলতে অমরা ‘নারী মাংসের কারবার’কে বুঝি। নারীকে পণ্য করে এখানে ব্যবসা চালানো হয়। পুরুষ যৌনকর্মীদের ভিতরে প্রবেশ করে তত্ত্বতল্লাশের আগে সার্বিক দেহব্যবসার কারণ উন্মোচন খুবই দরকার। এবং তাহলেই হয়তো আমাদের বুঝতে সুবিধে হবে নারী যৌনকর্মীর সঙ্গে পুরুষ যৌনকর্মীর পার্থক্য কতটা। আর ওপরের প্রশ্নগুলোর উত্তরের কিছু ইঙ্গিতও পাওয়া যেতে পারে।

সভ্যতার ঊষাকাল থেকে মানব সমাজে যে যৌনব্যবসা চলে আসছে তার কারণ একটি নয়, অনেক। ১৮৩৬ সালে ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পেরেণ্ট ডুকাটিলেট (Parent Duchatelet) রচিত ‘Da la prostitution dans la ville de paris’ গ্রন্থকে যৌনব্যবসার ওপর লিখিত প্রথম বিজ্ঞানসম্মত প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসাবে গণ্য করা হয়। এখানে ডুকাটিলেট (Duchatelet) প্রমাণ করতে চেয়েছেন, কোন মহিলার যৌনব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রধান কারণ হল তার শোচনীয় অর্থনৈতিক অবস্থা। পরে ব্লাসকো (Blascho), জর্জকেবেন (Georg keben), ওডাওল্ডবার্গ (Oda Oldberg), হেলপ্যাক (Helpach) প্রমুখ সমাজবিজ্ঞানীরাও অর্থনীতির তত্ত্বকেই প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। আরও পরে মার্কসীয় দার্শনিকেরা অর্থনৈতিক অবস্থাকেই বেশ্যাবৃত্তির একমাত্র কারণ হিসাবে তুলে ধরেন। কিন্তু এ কথাকে মানতে নারাজ অনেকেই। অ্যানটম বোমগারটন (Antom Baumgarton), অলডার (Alder), চেসার (Chesser) এবং ভারতের বিশ্বনাথ জোয়ারদার, পুনেকার, রাও প্রমুখ সমাজতত্ত্ববিদ অর্থনীতি ছাড়াও সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। অন্যদিকে লম ব্রোসো (Lom Broso), তারনোস্কি (Tarnowsky), স্ট্রমবার্গ (Strohmberg), হ্যাভলক এলিস (Havelock Ellis) প্রমুখ লেখকরা শারীরবৃত্তীয় কিছু বিশেষ অবস্থাকেই বেশ্যাবৃত্তির কারণ বলে মনে করেন। তাত্ত্বিকরা যাই বলুন মাঠে নেমে কাজ করতে এসে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মীরা এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অনেক কারণের সন্ধান পেয়েছেন। ‘সংলাপ’-এর ইন্দ্রাণী সিনহার কলকাতার ৪০০ জন মহিলা যৌনকর্মীদের ওপর সমীক্ষা থেকে এই পেশায় আসার বেশ কিছু কারণের কথা জানা যায় (Sinha : 1992)। এ গুলি হল— ভালভাবে থাকার জন্যে, বন্ধু নিয়ে এসেছে, পরিচারিকার কাজ করতে এসে ধর্ষিতা হয়ে, প্রেমিকের দ্বারা প্রতারিত হয়ে, কাজের লোভ দেখিয়ে, স্বামী পরিত্যক্তা, পণ দিতে না পেরে, স্বামীর হাতে নির্যাতিত হয়ে, অন্নসংস্থানের জন্যে। তাই দেখা যাচ্ছে, অসংখ্য কারণের সমাবেশ ঘটছে। সময় পরিবর্তনের সঙ্গে হয়তো আরও অনেক কারণ এসে দাঁড়াবে। বস্তুত পুরুষের নারী মাংস লোলুপতা মেটানোর জন্যে ‘দুষ্টপাচার চক্র’ মেয়ের জোগান দিয়েই চলেছে।

আসলে যৌনব্যবসা একটা ইণ্ডাস্ট্রি। নারী যৌনকর্মীরা এই ব্যবসারই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ যেন একটা সুতোর মালা। এখানে একই সাথে গাঁথা রয়েছে দালাল, গণিকামাসি, নানান আড়কাঠিদল ও সমাজের ক্ষমতাবান কিছু ব্যক্তি। ফলে এই ব্যবসা অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ভাবে পরিচালিত হয়। এই ব্যবসাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে এক বিকল্প সংস্কৃতি। অন্যদিকে পুরুষ যৌনকর্মীদের ব্যবসা সাধারণত স্ব-নিয়ন্ত্রিত। দালালনির্ভর নয়। তবুও এই দুই যৌনকর্মীর মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া আছে। আছে সহানুভূতি ও সহমর্মিতার বোধ। কিন্তু যে-সব কারণে কোন এক সময় কিছু নারী ‘লাইনের মেয়ে’ বোনে যায় ঠিক ওই একই কারণে কিন্তু পুরুষরা এই ব্যবসায় আসে না। ফলে উল্লিখিত কারণের নিরিখে পুরুষ যৌনব্যবসার বিশ্লেষণ সম্ভব নয়।

পুরুষ যৌনকর্মীরা হয় রূপান্তরকামী, না-হয় সমকামী। এদের মানসিকতা ভিন্ন। যৌন অনুভূতিও স্বতন্ত্র। আর এই ভিন্ন যৌন মনস্তত্ত্বই এদের মধ্যে সমস্যার সৃষ্টি করে। পারিবারিক জীবনে ও পারিপার্শ্বিক অবস্থায় এই সমস্যা ঘনীভূত হয়। সমস্যার কথা জানাজানি হলেই এদের ঠেলে দেওয়া হয় মর্যাদাহীন অবমাননাকর জীবনে। বিকৃত রুচির মানুষ হিসাবে এদের চিহ্নিত করা হয়। অধিকাংশ দেশে এদের আচরণ আইনত দণ্ডনীয়। সমাজের স্বীকৃতিও মেলে না এর পিছনে। ফলে নানাভাবে এদের পর্যুদস্ত করা শুরু হয়। চিত্ত পরিশুদ্ধির নামে অবলীলায় চলে নিধন-যজ্ঞ। ১৯৯৬-এর এপ্রিলে কায়রোয় দু’জন পুরুষকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়। কারণ এরা সমকামী। জিম্বাবয়ের রাষ্ট্রপতি রবার্ট মুগাবে দেশের সমস্ত সমকামীকে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দিয়েছেন। এক সাংসদ সমকামীদের প্রকাশ্যে বেত্রাঘাতের মধ্যে দিয়ে আচরণ সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছেন (Bombay Dost : 1996)। এইভাবে দমননীতির মধ্য দিয়ে এই মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের স্বতঃস্ফূর্ততাকে রুদ্ধ করার চেষ্টা চলেছে।

মিষ্টি দেখলেই রুমা বলে— না, না, না… কিছুতেই না। ওটা দেখলেই আমার গা-পিত্তি জ্বলে ওঠে। মা বলেন— কেন রে রুমা তুই মিষ্টি খাস না? কত ভাবি তোকে ভাল-মন্দ মিষ্টি খাওয়াবো, আর তুই কি-না রাত দিন ওই শুধু তেঁতুল…। রুমা জানে না কেন ওর মিষ্টি ভাল লাগে না, কেন ও তেঁতুল খায়। ঠিক এই রকমই সোনু, আলম, সুনীল, মোস্তাকিনদের মনে হয়, কেন পুরুষ হয়েও ওদের পুরুষকে ভাল লাগে। নারীর প্রতি ওরা কোন আকর্ষণ অনুভব করে না। রূপান্তরকামী পুরুষরা তো নারী সাজে সজ্জিত হয়ে পুরুষের জীবনসঙ্গিনী হতে চায়। এ কী নিতান্তই পাগলামি? না-কী এর পিছনে রয়ে গেছে কোন সূক্ষ্ম শারীরবৃত্তীয়-মনস্তাত্ত্বিক কারণ। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের এই মানসিকতা সম্পর্কিত জ্ঞান খুবই কম। তাই এদের আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ হওয়া খুব কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাইলেই সারা জীবনের জন্যে স্থায়ী পুরুষসঙ্গী এরা পায় না। সাময়িক কিছু সময়ের জন্যে কোন পুরুষের সঙ্গে ভালবাসার খেলায় মেতে ওঠা যায় মাত্র। আইনি বাধা ও সামাজিক স্বীকৃতির অভাবে পুরুষে পুরুষে বিবাহ এখনও অসম্ভব ব্যাপার। অনেকের কাছে হাস্যকর। কিন্তু সুতীব্র মানসিক যন্ত্রণায় কিছু পুরুষ হন্নে হয়ে ঘুরে বেড়ায়, পুরুষের খোঁজে। কাঙ্ক্ষিত জীবনের স্বপ্ন দেখে। এদের কেউ-কেউ পরিবারের চাপে তি-তি বিরক্ত হয়ে কোন মেয়েকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়। তবে সে বিয়ে কখনোই সুখের হয় না। কারণতো একটাই— মেয়েকে এদের ভাল লাগে না। ফলে স্বাভাবিক লিঙ্গোত্থান ও আনন্দঘন সঙ্গম অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। স্ত্রীকে যৌনসুখ দিতে এরা পারে না। চোরাস্রোতের মতো ফাটল ধরে যায় দাম্পত্য জীবনে। তারপর একসময় বিচ্ছেদ। কিন্তু এরা কেউ-ই পুরুষত্বহীন ব্যক্তি নয়। পুরুষের সঙ্গে সঙ্গমেই কেবল এদের লিঙ্গোত্থিত হয় ও তীব্র কামোত্তেজনা জাগে। কিন্তু পুরুষকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন এদের স্বপ্নই থেকে যায়। তা আর বাস্তবায়িত হয় না। আজ এই পুরুষ, কাল ওই পুরুষ। কারুর কাছেই পাকাপাকি ঠাঁই মেলে না। এভাবে ঠোক্কর খেতে-খেতে দীর্ণ হয়ে ওঠে জীবন। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদাসীন ও হতাশ হয়ে পড়ে। তারপর আর কী, জীবনকে নিয়ে উদ্দাম খেলায় মেতে ওঠে। ‘ক্রুসিং স্পটে’ (Cruising spot) ভিড় জমায়। আনন্দের (?) খোলা বাজারে নিজেকে বিকিয়ে দেয়। বাছবিচারহীন যৌন জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। হয়তো কোন ভদ্রমহোদয় প্রশ্ন তুলবেন, এভাবে যথেচ্ছ যৌন ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়াটা কী ঠিক? নীতিশাস্ত্রের পাতা ঘেঁটে আমরা বলবো, না, কখনোই নয়। কিন্তু বয়ঃসন্ধির প্রারম্ভিক প্রভাবে কিশোর, কিশোরীর মনোজগতে নানা জটিলতার সৃষ্টি হয়। দেহ-মনে চঞ্চলতা বাড়ে। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ অনুভূত হয়। বস্তুত শরীরের অন্তঃরসগুলির কার্যকারিতার প্রভাবে এই পরিবর্তন ঘটে। তাই একে আমরা স্বাভাবিক ধরে নিই। কিন্তু রূপান্তরকামী ও সমকামীর মধ্যে এই পরিবর্তন ঘটে অন্যভাবে। তাই হয়তো ওরা সমলিঙ্গের প্রতি আসক্ত হয়। যে-পুরুষকে বহু চেষ্টাতেও পাওয়া যাবে না, তার প্রতি আকর্ষণ হয় দুর্নিবার। প্রেমিকের প্রত্যাখ্যান এই দুর্নিবার টানকে আরও বাড়িয়ে তোলে। যথেচ্ছ যৌনসম্ভোগ বা বহুগামিতা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়। নিজের অজান্তেই এরা ধীরে ধীরে একসময় পুরুষ যৌনকর্মী হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠে।

তবে সকলেই যে পুরুষ যৌনকর্মী হবে হলফ করে এমন কথা বলা যায় না। বিশেষ করে উচ্চকোটির কথা একটু আলাদা। ওদের সঙ্গে পিছড়েবর্গের অনেক পার্থক্য। শিক্ষা ও তথাকথিত শহুরে সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা উচ্চকোটির দৃষ্টিভঙ্গীও স্বতন্ত্র। যৌনতা বিষয়ে ওদের মনোভাব অনেকটাই খোলামেলা। গ্রামের বা বস্তির মানুষের মতো অন্যের ‘হাঁড়ির খবর’ রাখার অভ্যাসটা এখানে কম। তাই ‘মনের মানুষ’-এর খোঁজে এরা ক্রুসিং স্পটে (Cruising spot) ঘুরে বেড়ায় কম। সমলিঙ্গের কারুর সঙ্গে গভীর ভালবাসার সম্পর্ক গড়ে তোলে। তারপর তাকে বিয়ে করে ঘর বাঁধে। গড়ে ওঠে দুটি পুরুষের সংসার। দুরন্ত সাহস ও মনের জোরে ছকে বাঁধা জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। অরবিন্দ ও অশোক দুই প্রবাসী ভারতীয়। কানাডার অধিবাসী, ১৯৯৬ সালের জুন মাসে ওরা বিয়ে করে। আনুষ্ঠানিকভাবে। সম্পূর্ণ আচারঅনুষ্ঠান মেনে। অবশ্য বিয়ের পাঁচ বছর আগে থেকেই ওরা একসঙ্গে থাকা শুরু করেছিল। স্কট ও টিঙ্কুও এই একই পথ অনুসরণ করেছে। সমস্ত প্রচলিত বিশ্বাসকে ভেঙে ওরা আজ একে অপরের জীবনসঙ্গী।

স্কট-টিঙ্কু, অরবিন্দ-অশোকের মতো আর ক’জনই বা সাহস দেখাতে পেরেছে। ফলে অধিকাংশের জীবনই সমস্যার অন্ধগলিতে দীর্ণ হয়ে ওঠে। আর এই সমস্যার স্বরূপ বুঝতে গেলে রূপান্তরকামিতা ও সমকামিতা বিষয়ে একটু বিশদভাবে জেনে নেওয়া ভাল।

১. Emcyclopedia of Bioethics : Vol.2,

Acquinas argued that the purpose of sexuality is reproduction or procreation. Sexual activities are natural if they fulfill this purpose and thus accord with the eternal or natural law. All nonprocreative sexual activities are unnatural.

১. Encyclopedia of Bioethics, Vol. 2.

In ancient Greece, various patterns of same-sex intimacy were permitted and in some cases prescribed. For example, in the city-state of Athens, during the classical period and among the educated, good homosexuality was defined as a tutorial relationship between an older and a younger male citizen of equal status, expressed through intercrual (between the thighs) “intercourse”. Sexual activity between persons of the same age was sometimes cause of laughter.

১. Goldenson, R. Anderson, K. : 1994.

‘The Zande dalay marriage until the 30s and 40s, making pederasty a common custom.

২. Cleugh, J.: 1970

The peasants of the Nile indulged in masturbation, sodomy and even bestiality from puberty onwards. At the baths, during the hours when males only were admitted, patrons would form a circle. Every individual in it had his back to another. He thus enjoyed both passive and active anal intercourse simultaneously, the ideal being to procure a dozen or twenty orgasms at the same moment.

১. Roberts : 1992.

…a plentiful supply of male prostitutes could be found working the streets; they were usually young who paraded like their female counterparts in brightly coloured robers and garish make-up. An Athenian proverb of the time suggested that you could sooner slip five elephants under your armpit than hide one of these boy whores.

১. Hirschfeld : 1935

…eunuchs are divided into two classes : those who shave and those who do not need to shave. Those who do not shave are obvious dysglandular types who are usually cast out by their parents as abnormal. A great majority of those who do shave are transvestites, but perhaps a few hermaphrodites also belong to this category.

The eunuchs are supposed to have an organization, since they preserve a strong line of demarcation between themselves and female prostitutes well as betweeen themselves and the male prostitutes, whose headquarters are presumably at Lucknow.

১. Encyclopaedia Britannica : 1974

In western civilizations male homosexual prostitution differs radically in many respects from heterosexual prostitution. There is no pimp, large-scale organization is absent……..

২. Mukherjee, J.B. : 1978

In 1845, after the Sind was conquered, Sir charles Napier instructed Burton to visit and report on inmates of three brothers of eunuchs and young boys in the them small town of Karachi (now in Pakistan).

৩. Mukherjee, J.B. : 1978

These male homosexual transvestites are found mostly in groups in Indian cities like Lucknow, Bananas, Hyderabad, Delhi, Bombay, Bhopal, Ahmedabad, Calcutta, Cuttack, Waltair, Patna and elsewhere in many districts, towns moffusil market places mostly in northern India.

১.  Nag, M. : 1997.

The most visible group of male sex workers in India is perhaps the one in the Kamathipura red-light area of Bombay which I visited in 1992. A cursory look at some of them standing in front of their houses gave me the impression that they were women with better quality clothing and make-up than those of the neighbouring FSWs. I was corrected by the local social worker accompanying one and told that these were not women but male sex workers who had a relatively higher income than FSWs.

১. Srisang, Sudarat S. : 1990.

In one of our small surveys for this project, in nine villages in three provinces namely chiang Rai (Amphur Mac Chau), Chiang Mai (Amphur Fang), and Payao (Amphur Chiangkhan) with 57 cases, we found only five girls aged around 13-14 years old in all those nine villages. The others had gone “South”.

From the data gathering, it has been discovered that 63% girls under sixteen are brought to the prostitution house by their parents themselves, 16% come through agents and 21% through their neighbours or friends who also send their daughters to the brothels.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *