২. কারণের সন্ধানে

২. কারণের সন্ধানে

নারী ও পুরুষ। এরা এক নয়। সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর এই ভিন্ন হওয়ার পিছনে প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ‘শরীর’। শরীরের গঠন আলাদা বলেই এদের আমরা পৃথকভাবে চিনতে শিখেছি। এসেছে শারীরবৃত্তীয় মেরুকরণ। বস্তুত শৈশবের একেবারে গোড়ায় কোন শিশুই নারী-পুরুষের পার্থক্য বুঝে উঠতে পারে না। সাংসারিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থাই তাকে সচেতন করে তোলে। পুরুষ-শিশু বুঝতে শেখে সে পুরুষ। নারী-শিশুও জানতে পারে তার আচরণ পুরুষের মতো হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। নারী-পুরুষের রুচি, অভ্যাস, সংস্কার-বিশ্বাস ও মূল্যবোধের মধ্যে অঢেল ফারাক রয়েছে। আর এ সবই সমাজ-আরোপিত। আরোপিত এই আচরণবিধির বাইরে পা ফেলা মানেই ‘ছি-ছি’ ব্যাপার। তাই নারী হবে সংবেদনশীল, ভাবপ্রবণ। আর পুরুষকে হতে হবে সবল, আক্রমণমুখী। পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারেও এক সুস্পষ্ট পার্থক্যের সীমা গড়ে উঠেছে। মেয়েদের শার্ট-প্যাণ্ট পরাটা যদিও খানিকটা চোখ সওয়া হয়ে গেছে, ছেলেদের শাড়ি পরার ব্যাপারটা আমরা ভাবতেই পারি না। অবশ্য যাত্রা, নাটকে একসময় পুরুষরা নারীর পোশাক পরে অভিনয় করতো। এছাড়া ধর্মীয় কারণেও অনেকে স্ত্রীবেশ ধারণ করে। বৈষ্ণবধর্মের শাখা-সম্প্রদায় সখীভাবগ্রাহী পুরুষরা শ্রীকৃষ্ণকে স্বামী রূপে কল্পনা করে এবং নিজেদের রাধা ভাবে। এরা বিয়ে করে না। সাধক গদাধর গোস্বামী নাম নিলেন রাধিকা। গোবিন্দ ঘোষ রঙ্গদেবী হিসাবে পরিচিত হয়ে উঠলেন। এইভাবেই কেউ ইন্দুরেখা, কেউ সুবেদী, আবার কেউ সুচিত্রা নাম নিয়ে নারীরূপে নিজেদের পরিচয় দিলেন।

এবার চলে আসি এমন কিছু মানুষের কথায় যারা কোন ধর্মীয় কারণে বা অভিনয়ের প্রয়োজনে স্ত্রীবেশ ধারণ করে না। পুরুষ হয়েও এরা নিজেদের নারী ভাবে। সদ্য শৈশব পেরিয়ে আসা কোন কিশোরের মধ্যে এই ভাব দেখা দিতে পারে। আবার পরিণত কোন পুরুষও এই মানসিকতাসম্পন্ন হতে পারে। প্রথম-প্রথম খুব গোপনেই এইসব পুরুষরা মেয়েদের শাড়ি, সায়া, ব্লাউজ, ব্রেসিয়ার পরতে থাকে। কপালে টিপ, ঠোঁটে লিপস্টিক, নখে নেলপালিশের ব্যবহার শুরু হয়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের নারী রূপ দেখে এরা তীব্র যৌন উত্তেজনা উপভোগ করে। এরা নিজের পুরুষাঙ্গকে ঘৃণা করে। এটিকে ধারণ করার জন্যে এদের লজ্জা হয়। নারী সঙ্গমে এদের কোন স্পৃহা নেই। বরং কোন পুরুষকেই স্বামী হিসাবে পেতে চায়। তাই এদের মধ্যে পুরুষের খোলস ছেড়ে পরিপূর্ণ নারীতে রূপান্তরিত হওয়ার বাসনা জাগে। এরাই রূপান্তরকামী বা যৌন পরিবর্তনকামী (Transsexual)। নারীও এই মানসিকতাসম্পন্ন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে তার মধ্যে পুরুষ হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা জাগে। তবে পুরুষের মধ্যেই এই মানসিকতা বেশি প্রকট হয়ে ওঠে। আবার আরও এক ধরণের ব্যক্তি আছে যার শুধুমাত্র বিপরীত লিঙ্গের পোশাক পরিধানেই তৃপ্ত হয়। যৌন পরিবর্তনে এদের অনীহা। এরা পুরুষাঙ্গ ছেদন করতে চায় না। এরা বিপরীত সাজসজ্জাকামী (Transvestite/Eonist)। Chevalier d’ Eon de Beaumont নামে একজন ফরাসি জীবনের ৪৯ বছর পুরুষ হিসাবে এবং ৩৪ বছর নারী হিসাবে কাটিয়েছিলেন। মৃত্যুর পর তার গোপনাঙ্গ দেখে জানা যায় যে, তিনি প্রকৃতই পুরুষ ছিলেন। তাই তার নাম অনুসারে এই মানসিকতাকে ‘Eonism’ ও বলে।

কারণের সন্ধানে

‘৯৮—এর বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালীন প্যারিসের রাস্তায় এক সমকামী

রূপান্তরকামিতার পাশাপাশি রয়েছে সমকামিতা (homosexuality)। এই দুই মানসিকতার মধ্যে মিল যেমন আছে তেমনি অমিলও কম নয়। সব রূপান্তরকামীই সমকামী। কিন্তু সব সমকামীরাই রূপান্তরকামী নয়। সমলিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ থাকলেও সমকামীরা বিপরীত লিঙ্গের পোশাক পরিধান করে না। সমকামী সম্পর্কে আবদ্ধ দুই পুরুষকে দুই নামে চিহ্নিত করা হয়— সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয়। যৌনক্রিয়ায় যে পুরুষের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তাকে ‘সক্রিয়’ এবং যে স্ত্রীর মতো আচরণ করে তাকে ‘নিষ্ক্রিয়’ বলা হয়। সক্রিয়-নিষ্ক্রিয়ের অবস্থানকে লক্ষ্য করেই অনেকে সমকামকে বিষমকামের ‘নকল-রূপ’ বলে মনে করেন। তারা আরও মনে করেন, কামবিকৃতির চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটেছে সমকামে। কিন্তু যৌনতা সম্পর্কিত নানা গবেষণা থেকে দেখা যায়, সক্রিয়-নিষ্ক্রিয়ের ধারণা প্রাচীন ও রক্ষণশীল। নারীর যৌন-আচরণের ওপর কখনোই নিষ্ক্রিয়তার রাবার-স্ট্যাম্প মারা উচিত নয়। কে কখন সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় হবে, এইভাবে তার ব্যাখ্যা দেওয়া হবে অতি সরলীকরণ প্রয়াস।

আমাদের একটা ধারণাই আছে, ‘লিঙ্গ’ (sex) অনুযায়ী মানুষের যৌন আকর্ষণ ও আচরণ নির্ধারিত হয়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এই ধারণাকেও নস্যাৎ করে দিয়েছেন। তাঁরা বলেন নানা ঘটনা, অবস্থা, সম্পর্ক ও জিনের ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ব্যক্তিমানুষের যৌনমানসিকতার প্রকাশ ঘটে। এবং তা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও জটিল। একে ‘সমকাম’ ও ‘বিষমকাম’ নামে দুটি কক্ষে বিভক্ত করে রাখা ঠিক নয়। কারণ বহু মানুষই আছেন যাঁর উভকামী (Bisexual)। সমলিঙ্গ ও বিষমলিঙ্গের মানুষের সঙ্গে এরা পর্যায়ক্রমে সম্পর্ক রেখে চলেন।

ফ্রয়েড (Freud) মনে করেন, প্রতিটি মানুষকেই পরিণত হয়ে ওঠার পথে সমকামের একটি পর্যায় অতিক্রম করে আসতে হয়। আর বয়সকালে এই মানসিকতারই কিছু রেশ থেকে যায়। বিশেষ বিশেষ সময়ে এরই প্রকাশ ঘটে। তাঁর কথা থেকে বোঝা যায়, একই শরীরে নারী ও পুরুষ দুটি সত্তা অবস্থান করে। আর তাই নারী হলেই তার আচরণ নারীর মতো হবে, পুরুষ হলে হবে পুরুষের মতো— এমন কথা ভাবা সমীচীন নয়।

এই ব্যাপারে অ্যালফ্রেড কিনসে (Alfred Kinsey)-এর সমীক্ষা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। যৌনতাকে পরিমাপ করার জন্যে কিনসে (kinsey) ও তাঁর সঙ্গীরা একটি স্কেল প্রবর্তন করেন, এর সাহায্যে কার যৌনতা কেমন তা পরিমাপ করা সম্ভব হবে।

কারণের সন্ধানে

১৯৩৮ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে মনোবিজ্ঞানী কিনসে (Kinsey) ৪২৭৫ জন শ্বেতাঙ্গ মার্কিন নাগরিকের যৌন-আচরণের ওপর সমীক্ষা চালান। এই সমীক্ষা থেকে জানা যায়, সমীক্ষিতের ৪% পুরোপুরি সমকামী। ৫০% পরিপূর্ণ বিষমকামী। এছাড়াও কিছু বিশেষ তথ্য উঠে এসেছে এই সমীক্ষায়। পরিণত বয়সে অন্তত তিন বছর সমকামী যৌন-অভ্যাসের মধ্যে রয়েছেন এমন ব্যক্তির সংখ্যা ৮%। ৩৭% স্বীকার করে, পরিণত বয়সে তারা অন্তত একবার সমকাম-অভিজ্ঞতার সংস্পর্শে এসেছে। এবং এরা আরও জানায়, এই ধরণের যৌন মিলনে তারা তীব্র যৌনসুখ (Orgasm) অনুভব করেছে। ৬০% তাদের প্রাক-কৈশোরের সমলিঙ্গের যৌন-অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করে। বস্তুত এই সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করেই কিনসে (Kinsey) তাঁর ‘যৌনতা পরিমাপক স্কেল’ উদ্ভাবন করেন।

কিনসে (Kinsey)-এর এই স্কেলের ব্যাপারে অনেকে ভিন্ন মত পোষণ করেন। তাঁদের ধারণা ওইভাবে ‘যৌনতা’কে মাপা যায় না। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সমীক্ষার ব্যাপারে আরও উন্নত বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতির প্রয়োগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে কিনসে (Kinsey)-এর স্কেল যে সমকামিতা নির্ণয়ে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। ফ্রান্স ও ইংল্যাণ্ডে যৌন-আচরণের ওপর সমীক্ষা থেকেও সমকামিতার সুস্পষ্ট উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।

মুম্বই-এর সমকামী সংগঠন ‘বম্বে দোস্ত’ (Bombay Dost) ৭০ জন সমকামীর ওপর একটি সমীক্ষা চালায়। এই সমীক্ষায় দেখা যায়, ৭০ জনের মধ্যে ৫২ জন জন্মগত সমকামী। ১১ জন জন্মের পর ধীরে ধীরে সমকামিতায় রূপান্তরিত হয়েছে এবং ৭ জন এই বিষয়ে কোন মন্তব্য করেনি।

দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সমকামিতার ওপর গবেষণা করছেন শিবানন্দ খান। তাঁর বিভিন্ন সমীক্ষা-রিপোর্ট থেকে জানা যায়, এই অঞ্চলের বহু মানুষ আছে যারা পরিপূর্ণ সমকামী হওয়া সত্ত্বেও বিবাহিত জীবনযাপন করছে। অনেকে ভুলক্রমে এদের উভকামী বলে চিহ্নিত করলেও, এরা মূলতো সমকামী। পারিবারিক অসুবিধের কারণে এদের বিয়ে করতে হয়। কিন্তু বিবাহিত জীবনের মাঝেও এরা পুংসঙ্গমের অভ্যাস ত্যাগ করে না।

সমস্যার সূত্রপাত :

আমাদের দেশে রূপান্তরকামী ও সমকামীর সংখ্যা কত? কোন সঠিক পরিসংখ্যান তুলে ধরা সম্ভব নয়। তবে এরা আছে। অসম্ভবরকম মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে এদের দিন কাটে। আস্তে-আস্তে এরা সামাজিক মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। সম্পন্ন ধনী পরিবারগুলো বাদ দিলে, সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত সংসারেই এদের সমস্যাটা হয় বেশি। আসলে এদের বিচ্ছিন্নতার পিছনে কিছু সুস্পষ্ট কারণ আছে :

(ক) বাড়ির পরিবেশ : একেবারে শৈশবে শিশুর মধ্যে এই ধরণের আচরণ ও মানসিকতার প্রকাশ ঘটে না। কিন্তু শিশু যখন শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে আসে তখনই সমস্যার সূত্রপাত। এই সময়ে ছেলে-মেয়ে উভয়ের দেহে-মনে নানারকম পরিবর্তন দেখা যায়। নারীদেহে স্তন প্রকাশ পায়। ঋতুস্রাব শুরু হয়। পুরুষের গলার স্বরের পরিবর্তন ঘটতে থাকে। শুক্রাণু উৎপন্ন হয়। এবং মুখে দাড়ি-গোঁফের রেখা দেখা যায়। এ সময় বিপরীত লিঙ্গের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ অনুভূত হয়। এ হল বিকাশধারার স্বাভাবিক গতি। বিপরীত সাজসজ্জাকামী ও যৌন পরিবর্তনকামীদের আচার-আচরণ হয় একটু অন্যরকম। এদের মানসিক পরিবর্তনগুলি হয় খুবই অদ্ভুত। রূপান্তরকামীদের আচরণে, কথাবার্তায় মেয়েলি হাবভাব ফুটে উঠতে থাকে। প্রথমে লুকিয়ে এবং তারপর প্রকাশ্যে নারী পোশাক পরা শুরু হয়। বিব্রত বোধ করে বাড়ির লোকেরা। কোনভাবেই তাকে বিরত করা যায় না। দাদা-দিদিরা তাকে অন্য চোখে দেখতে থাকে। ছোট ভাই-বোনেদের কৌতূহল জাগে তাকে ঘিরে। বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন এলে তাকে দূরে রাখা হয় তাদের থেকে। আচরণের স্বাভাবিকতা ও স্বতঃস্ফূর্তিতা বাধা পায়। এভাবে ‘অন্য-আচরণ’-এর সন্তানটি একই সংসারের মধ্যে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। নিজেকে নিয়ে তার ধন্দ বাঁধে। এদিকে পুরুষ, কিন্তু মেয়েদের মতো সেজেগুজে ঘুরে বেড়াতে ভাল লাগে। মেয়ে হতে ইচ্ছে করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে সে বুঝতে শেখে, সে আর পাঁচজনের থেকে একটু ভিন্ন। একটু অন্যরকম। বাবা-মা, ভাই-বোন কেউই তার মতো নয়। এত বুঝেও সে তার ব্যবহার পাল্টাতে পারে না। কি এক হীনমন্যতা তাকে গিলে খেতে চায়। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সে শঙ্কিত হয়ে ওঠে। এমন একটি মানসিক অবস্থা আসে যখন সে চায় সংসার ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে। তার কেবলই মনে হয়, তার জন্যে গোটা পরিবারটি মানসম্মান খোয়াতে বসেছে। সামাজিক স্বীকৃতির অভাব আর সুদীর্ঘকালের সামাজিক মূল্যবোধ রূপান্তরকামীও সমকামীদের ছুঁড়ে ফেলছে সমাজের বাইরে।

(খ) বন্ধু-বান্ধবের অভাব : কৈশোরে এদের সব চাইতে বড় সমস্যা হল বন্ধু-বান্ধবের অভাব। এদের আচরণের মধ্যে যে মেয়েলি ভাব ফুটে ওঠে তার কারণেই সমবয়সীরা এদের বন্ধু বলে মেনে নিতেই চায় না। পিছনে লাগে। রসিকতা করে। সহানুভূতি তো দূরের কথা, পরিহাসের মধ্যে দিয়ে উত্যক্ত করে তোলে। নিজেরা ছেলে হয়েও এরা ছেলেদের সঙ্গে মিশতে চায় না। বন্ধু বলে মেনে নিতে পারে না। বিশেষতঃ যৌনপরিবর্তনকামী পুরুষেরা নিজেদের মেয়ে ভাবতে ভাবতে উন্মাদ হয়ে যায়। পেতে চায় পরিপূর্ণ নারীত্বের স্বাদ। পুরুষকে এরা প্রেমিক ভাবে। সমবয়সী নারীকেই বন্ধু বলে পেতে চায়, কিন্তু মেয়েলি স্বভাবের এই ছেলেদের মেয়েরাও বন্ধু বলে মেনে নিতে পারে না। তারাও এদের নিয়ে মজা করে। তাই দেখা যায়, নারী-পুরুষ উভয়ের কাছেই এরা প্রত্যাখ্যাত। কিন্তু প্রত্যাঘাত করার কোন শক্তি এদের নেই। বয়স যত বাড়তে থাকে ততই এরা নিজেদের বন্ধু-বান্ধবদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে নেয়। এভাবেই এদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবোধ ও অন্তর্মুখীনতা দেখা দেয়। ভয়, সঙ্কোচ, দ্বিধা এদের চেপে ধরে। ভিতরের দুঃখ-কষ্ট আর হতাশাকে খুলে বলার মতো কোনও লোক এরা খুঁজে পায় না। এরা এই পরিবেশ থেকে মুক্তি পেতে চায়। তাই এই আচরণের অন্য কোন ব্যক্তিকে দেখলে এরা চঞ্চল হয়ে ওঠে। ছুটে যেতে চায় তাদের কাছে। মনে করে তার বন্ধু, আপনজন, পরমাত্মীয়।

(গ) বিদ্যালয়ের পরিবেশ : এখানেও ওই একই অবস্থা। ইস্কুলের সহপাঠীরা এদের মনের কথা বুঝে উঠতে পারে না। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কাছ থেকেও কোন সমবেদনা পায় না। আসল ব্যাপারটা হল, কেউ ঠিক বুঝতে পারে না এদের সমস্যাটা কি। মানব-মনের একেবারে গভীরে পড়ে থাকা এইসব মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার-স্যাপারে আমাদের জ্ঞানের দীনতা রীতিমত চোখে পড়ার মতো। তাই ইস্কুলের সবাই ভাবে এটা ওদের পাগলামি। ফলে শুরু হয় এক বিশ্রী ধরণের মানসিক নির্যাতন। কটু কথা। অশ্রাব্য কথা বলে উত্তেজিত করা। অতিষ্ঠ করে তোলার আরও নানান ফন্দি-ফিকির বেরতে থাকে। অনেক আশা নিয়ে অভিভাবকেরা যাদের একদিন ইস্কুলে ভর্তি করেছিলেন, সমগ্র ইস্কুলের পরিবেশটাই একসময় তাদের কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে। এই পরিবেশে তারা হাঁফিয়ে উঠতে থাকে। ছুটে যেতে চায় অন্য কোথাও। অন্য পরিবেশে।

(ঘ) পড়শির কটূক্তি : পাড়াপড়শির কাছে সব জানাজানি হলেই হয় সবচেয়ে মুশকিল। শুরু হয় কটূক্তি। হালকা চালে কথা বলা, উপেক্ষা আর অবহেলা লেগেই থাকে। বাড়ির বাইরে হলেই এদের শরীরের ওপর দিয়ে পিছলে যায় পড়শির কৌতূহলী চোখ। আসা-যাওয়ার পথে তাকে নানান জেরার মুখে পড়তে হয়। জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য স্বাভাবিক গতিবিধির ওপর আরোপিত হয় নানারকমের বাধা। এই অবস্থায় এরা অত্যন্ত বিব্রত হয়ে পড়ে। নিজেদের আচরণ সম্পর্কে সদাসর্তকতা এদের মধ্যে টেনশান বাড়িয়ে তোলে। ধীরে-ধীরে এদের মধ্যে হীনমন্যতা ও মানসিক অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। অনেকে আবার এই অবস্থায় খুব ‘অ্যাগ্রেসিভ’ হয়ে ওঠে। কেউ-কেউ আত্মহননের পথ বেছে নেয়। নিজের সমাজ সংসারকে নিরাপত্তার পরিপন্থী বলে মনে হয়। ফলে নিজেদের ব্যক্তিগত সংসার ও পরিচিত পরিবেশের বাইরে এক নতুন সংসার গড়ে তুলতে চায়। যেখানে সকলের সমান অধিকার ও মর্যাদা। মনের মানুষ হবে অন্য এক পুরুষ।

পরিণত বয়সের কথা :

রূপান্তরকামিতা ও সমকামিতা— এই দুই বিশেষ ধরণের মানসিকতা যে কেবল শৈশব ও কৈশোরেই দেখা দেবে, এমন কোন কথা নেই। কৈশোর পেরিয়ে আসা কোন পরিণত যুবকের মধ্যেও ধীরে-ধীরে এ মানসিকতার জন্ম হতে পারে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার লক্ষ্মীকান্তপুরের সিকির গাববেড়িয়া গ্রামে মোসারফ আলি মণ্ডলের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল কয়েক বছর আগে। ওর বিয়ে হয়েছিল একসময়। চার বছরের একটি মেয়ে আছে। মোসারফের আর ঘর করা হল না। মহিলা বেশে সে ঘর ছাড়ল। মাঝে-মাঝে গ্রামে আসে। শাড়ি পরা, কানে দুল, হাতে চুড়ি। আগ্রার ঈদগাকাটগরের বস্তি এলাকায় এমনই একজনের সঙ্গে কথা হয়েছিল। নাম, আখতার।

কেন এমন হবে?

অনেকেই সমকামিতা ও রূপান্তরকামিতাকে যৌনবিকৃতি বলে মনে করেন। এদের কাছে আচরণের এই অস্বাভাবিকতা সুস্থ মানসিকতার লক্ষণ হতে পারে না। আবার কেউ-কেউ বলেন, পুরুষের আচরণ নারীসুলভ হওয়াটা দোষাবহ নয়। এটি তার আচরণের স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ।

কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, ইলেকট্রোএনকেফেলোগ্রাফি (Electroencephalography/ E.E.G.)’র সাহায্যে কোন ত্রুটি ধরা পড়তে পারে। তবে, এটা নিতান্তই অনুমান। পরীক্ষিত নয়। তবে মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর একটা ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা চলেছে। বলা হয়, শিশুপুত্র তার মায়ের প্রতি অসম্ভব রকম টান বা ভালবাসা অনুভব করে। সে ভাবে, বাবা তাকে মায়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে চায়। বাবা তার প্রতিদ্বন্দ্বী। সেও পুরুষ, বাবাও পুরুষ। তাই সে যদি মেয়ে হয়ে যায় তাহলে বাবা তাকে মায়ের কাছ থেকে টেনে আনতে পারবে না। এই ভেবেই সে মেয়েদের পোশাক পরতে থাকে। এইভাবেই তার মধ্যে বিপরীত লিঙ্গের মানুষ হয়ে ওঠার বাসনা জাগে। কিন্তু হরমোন-বিশেষজ্ঞরা (Endocrinologist) এই কারণকে মানতে পারেন না। তারা মনে করেন, নারীর শরীরে নারীত্বের ভাব এবং পুরুষের শরীরে পুরুষালি ভাব ফুটে ওঠার ক্ষেত্রে হরমোনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষের শরীরে পুরুষ হরমোনই সক্রিয় হয়। এবং এই হরমোনের নির্দিষ্ট পরিমাণ নিঃসরণের জন্যেই নানারকম পুরুষালি লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। দাড়ি-গোঁফ প্রকাশ পায়। কণ্ঠস্বর ভারি হয়। শরীর ও মনে আরও অন্যান্য পরিবর্তন দেখা দেয়। অনেক সময় দেখা যায়, পুরুষের শরীরে মেয়েলি হরমোন বেশি হচ্ছে। তখন তার আচরণে মানসিকতায় মেয়েলি ভাব প্রকট হয়ে উঠতে থাকে। এ হল হরমোনজনিত সমস্যা। এই অবস্থায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে হরমোন-থেরাপির সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন।

রূপান্তরকামিতা ও সমকামিতার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণের কথা জানা যায় বিশিষ্ট মার্কিন বিজ্ঞানী সাইমন ডি-লিভে (Simon De Levay) এর গবেষণা থেকে। মৃত কয়েকজন মহিলা, কয়েকজন পুরুষ সমকামী ও রূপান্তরকামীর ওপর লিভে গবেষণা চালান। প্রধানত মস্তিষ্কের দুটি অংশকে তিনি পরীক্ষা করেন— (ক) হাইপ্যাথামাসের তৃতীয় ইণ্টাস্টিশিয়াম নিউক্লিয়াস অফ দি হাইপোথ্যালামাস (Third interstiteal nucleurs of the hypothalamus) বা IANA3 এবং (খ) করপাস ক্যালোসাম (Corpus collosum)।

হাইপোথ্যালামাস অংশটি তৃতীয় মস্তিষ্ক বিবরের তলায় শ্বেতবস্তুর (white matter) মধ্যে বিক্ষিপ্ত কয়েটি নার্ভ কেন্দ্র নিয়ে গঠিত। মস্তিষ্কের এই বিশেষ অংশটি লিভে বেছে নিয়েছিলেন তার কারণ হল, এই অংশটি যৌনমানসিকতা ও যৌন আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। হাইপোথ্যালামাসের মধ্যে একটি কোষপুঞ্জ থাকে, যাকে বলে IANH3। এই কোষপুঞ্জটি (IANH3) খুবই ছোট। লিভে লক্ষ্য করেন মহিলা, পুরুষ সমকামী ও রূপান্তরকামীর এই কোষপুঞ্জ (IANH3) একই ধরনের। কিন্তু বিষমকামী পুরুষদের ক্ষেত্রে এই কোষপুঞ্জটি অপেক্ষাকৃত বড় হয়ে থাকে।

করপাস ক্যালোসামের (Corpus collosum) ওপর লিভে দ্বিতীয় পরীক্ষা চালান। করপাস ক্যালোসাম হচ্ছে, গুরু মস্তিষ্কের দু’খণ্ডের মধ্যেকার স্নায়ু যোজক। মস্তিষ্কের কেন্দ্র বরাবর শ্বেতপদার্থ বর্তমান। এই শ্বেতপদার্থের মধ্যে প্রধানত তিন প্রকার স্নায়ুতন্তু আছে। এই স্নায়ুতন্তুগুলি হল (i) প্রজেকশন তন্তু (Projection fibres) (ii) অ্যাসোসিয়েশন তন্তু (Association fibres) এবং (iii) কমিস্যুরাল তন্তু (Commissural fibre)। প্রজেকশন তন্তু মস্তিষ্কের অন্যান্য অংশের সঙ্গে গুরু মস্তিষ্কের অ্যাসোসিয়েশন তন্তুর (Association fibre) যোগসূত্র স্থাপন করে। এছাড়া গুরু মস্তিষ্কে প্রতি গোলার্ধের বা সেরিব্রাল হেমিস্ফিয়ারের (Cerebral hemisphere) বিভিন্ন অংশের সঙ্গে কমিস্যুরাল তন্তু (Commissural fibre) যোগাযোগ স্থাপন করে। অগ্রভাগের এই তন্তুটি হল অ্যান্টিরিয়র কমিস্যুওর (Anterior Commissure)। লিভের গবেষণা থেকে জানা যায় পুরুষ রূপান্তরকামী ও সমকামীর করপাস ক্যালোসাম ও অ্যাণ্টিরিয়র কমিস্যুওর (Anterior Commissure) আকৃতি বড় হয়। অন্যদিকে সাধারণ বিষমকামী পুরুষদের এই অংশ দুটি ছোট। কিন্তু সাধারণ মহিলাদের ক্ষেত্রে রূপান্তরকামী ও সমকামী পুরুষদের মতো এই দুই অংশ একই রকম। অর্থাৎ বড় হয়।

কারণের সন্ধানে

মস্তিষ্কের চিহ্নিত অংশের আকৃতির তারতম্যকে বিজ্ঞানী ‘সাইমন লিভে’ সমকামিতা ও রূপান্তরকামিতার কারণ হিসাবে দেখাতে চান

সামগ্রিক এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর লিভে এই সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করেন যে, মস্তিষ্কে এই বিশেষ অবস্থার কারণে কোন ব্যক্তি সমকামিতা ও রূপান্তরকামিতার দিকে ঝুঁকে পড়ে।

মস্তিষ্কজনিত শারীরবৃত্তীয় কারণ ছাড়াও জিনকে সমকামিতার অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে। ১৯৯৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের National Cancer Institute-এর Biochemistry বিভাগের একদল বিজ্ঞানী তাঁদের এই সম্পর্কিত গবেষণার কথা ‘Science’ পত্রিকায় প্রকাশ করেন। তাঁরা দাবি করেন সমকামী মানসিকতার পিছনে জিন একমাত্র কারণ। তাঁরা ৭৬ জন পুংসমকামীর ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন ‘x’ ক্রোমোজোমের ওপর সমকামী বৈশিষ্ট্যগুলির জিন রয়েছে। এই ‘x’ ক্রোমোজোমটি ছেলেদের ক্ষেত্রে মায়ের নিকট থেকেই আসে। ‘Y’ ক্রোমোজোমকে নিয়ে তাঁরা ভাবছেন না। তাঁরা দেখেছেন বেশিরভাগ সমকামীর ‘x’ ক্রোমোজোমের জিনগুলি একই স্থানে অবস্থান করে।

লিঙ্গ পরিবর্তন ও তারপর :

চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্যাণে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে রূপান্তরকামীদের অনেকেই আজ বিপরীত লিঙ্গের মানুষ হয়ে উঠছে। তবে আমাদের দেশে এই জাতীয় অস্ত্রোপচার খুব কমই হচ্ছে, পৃথিবীর উন্নতদেশেই এই অস্ত্রোপচার হচ্ছে বেশি। ‘সেক্স-ক্রোমোটিন’ পরীক্ষা করে বোঝা সম্ভব রূপান্তরকামী ব্যক্তি কতটা পুরুষ ও কতটা নারী। সবশেষে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সার্টিফিকেট প্রয়োজন। তিনি যদি সম্মতি দেন তবেই অস্ত্রোপচার সম্ভব। তবে অস্ত্রোপচারের আগে বিশেষজ্ঞের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘Harry Benjamin International Gender Dysphoria Association’-এর অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন।

লিঙ্গ পরিবর্তনের এই অস্ত্রোপচার প্লাস্টিক সার্জারির জগতে নতুন দিগন্তের সন্ধান দিল। ১৯৬০ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই ব্যাপারে উন্নত গবেষণা শুরু হয়। এডগারটর (Edgertor), মেয়ার (Meyer), হুপস (Hoopes), বাইবার (Biber), ব্রাউন (Brown), রেনল্ডস (Reynolds) প্রমুখ চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা এগিয়ে এলেন। এঁরা মনে করেন, মনঃসমীক্ষণ বা অন্য কোন উপায়ে রূপান্তরকামীদের এই অবস্থা থেকে মুক্ত করা সম্ভব নয়। এই জাতীয় অস্ত্রোপচার কোন একজন চিকিৎসকের পক্ষে করা সম্ভব নয়। এখানে বিভিন্ন বিভাগের শল্য চিকিৎসক (প্লাস্টিক সার্জেন) ও বিশেষজ্ঞের (এন্ড্রোক্রিনোলজিস্ট, গায়নোকোলজিস্ট, জেনারেল সার্জেন প্রভৃতি) সম্মিলিত প্রয়াসই এই অস্ত্রোপচারকে সার্থক করে তুলতে পারে।

প্রথমে অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে রূপান্তরকামী পুরুষের শিশ্ন ও অণ্ডকোষ বাদ দেওয়া হয়। এরপর প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে কৃত্রিম যোনি স্থাপন করা হয়। একে ডাক্তারি পরিভাষায় ভ্যাজাইনোপ্লাসটি (Vaginoplasty) বলে। এর প্রায় দু’মাসের পর দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার হয়। এই পর্যায়ে কৃত্রিম স্তন গঠন করা হয়। অবশ্য স্তন পুনর্গঠন (Breast reconstructive plasty) কোন নতুন ঘটনা নয়। দেশি-বিদেশি ফিল্মি দুনিয়ার /নায়িকারা প্রায়শই এটি করিয়ে থাকেন। এখানে শিথিল ও বৃহৎ স্তনকেই (Pendulous breast) সুগঠিত করা হয়। কিন্তু কৃত্রিম স্তন স্থাপনের ব্যাপারটা একটু আলাদা। একে ব্রেস্ট অগমেনটেশান প্লাস্টি (Breast augmentation plasty) বলে। রূপান্তরকামী পুরুষের সুপ্ত স্তনযুগলের নিচের চামড়া কেটে ‘সিলিকন-জেল’ নামে এক বিশেষ ধরণের স্পঞ্জ জাতীয় বস্তু ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। অস্ত্রোপচার সফল হলে হরমোন বিশেষজ্ঞের (Endocrinologist) তত্ত্বাবধানে ‘হরমোন-থেরাপি’ শুরু হয়। এইভাবে দীর্ঘ কষ্টসাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে একজন রূপান্তরকামী পুরুষ ‘নারী’ হয়ে ওঠেন।

১৯৫২ সালে জর্জ জোরজেনসেন নামে একজন পুরুষ প্রথম অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নারীতে রূপান্তরিত হন। নতুন নাম নেন ক্রিসটিন জোরজেরসেন। এই ঘটনা সারা বিশ্বের মানুষকে নাড়া দিয়েছিল। এরপর ১৯৫৪ সালে রূপান্তরকামী পুরুষ ব্যারি কসে অস্ত্রোপচারের সাহায্যে পরিপূর্ণ স্ত্রী হয়ে যান। নাম হয় ক্যারোলিন কসে। রূপান্তরিত হওয়ার পর দু’বার বিয়েও করেন। জেমস গুটি, ইনিও একজন রূপান্তরকামী পুরুষ। ৪২ বছর বয়সে সাত সন্তানের পিতা জেমস-এর আচরণের মধ্যে নারীত্বের প্রকাশ ঘটতে থাকে। এমন স্বামীকে ডিভোর্স করে স্ত্রী অন্যত্র চলে গেলেন। এরপর ডাক্তারের সহায়তায় লিঙ্গ পরিবর্তন করে জেমস নতুন নাম নিলেন, লরেন গিবসন। ১৯৯২ সালে এক ইতালিয় যুবক লিঙ্গ পরিবর্তন করে নারী হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি নারীর মর্যাদা পেলেন না। ‘মিস ইতালি বিউটি কনটেষ্টে’ তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। তারপর সব জানাজানি হয়ে যাওয়ায় তাকে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দেওয়া হয়। ইজ্রায়েলের কোহেন ২৪ বছর বয়সে ‘সেক্স চেঞ্জ’ করে মেয়ে হন। নাম নিলেন দানা। আজ সংগীত শিল্পী হিসাবে তাঁর বিশ্বজোড়া নাম। সম্প্রতি ইংল্যাণ্ডে অনুষ্ঠিত ইউরোভিশন সংগীত প্রতিযোগিতায় তিনি শ্রেষ্ঠ সংগীত শিল্পীর সম্মানে ভূষিত হন। বিশ্বব্যাপী রূপান্তরকামী ও সমকামীদের যে আন্দোলন উঠেছে দানার ভূমিকা সেখানে উল্লেখযোগ্য।

কারণের সন্ধানে

‘দানা’— লিঙ্গ পরিবর্তন করে সম্প্রতি নারী হয়েছেন।

আগেই বলা হয়েছে, এই ধরণের অস্ত্রোপচার অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ। আমাদের দেশের সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের পক্ষে এর ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব নয়। তাই কৈশোর ও যৌবনে নিজেদের ভিন্ন-যৌন আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার জন্যে এরা বহুগামিতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এইভাবেই চলতে চলতে কেউ কেউ যৌনব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। যাদের আর্থিক-ক্ষমতা আছে তাদের অনেকেই আবার লিঙ্গচ্ছেদনের ভয়ে পিছিয়ে আসে। লিঙ্গচ্ছেদন করে নারীরূপ ধারণ করলেই যে ভবিষ্যৎ জীবন সুখের হবে, এমন কথা হলফ করে বলা যায় না। এই প্রসঙ্গেই মনে পড়ে গেল, দক্ষিণ ২৪ পরগনার কাশীনগরের কউতলার খাড়ি-আদকপাড়ার অমলার কথা। অমলা একসময় ছিল যৌন প্রতিবন্ধী। আজ সে শুধু সুস্থ নয়, এক কন্যা-সন্তানের জননী। কিন্তু কি আশ্চর্য, মা হয়েও তার গা থেকে ‘হিজড়ে’র অপবাদ যায় নি। এখনো সকালে উঠে লোকে তার মুখ দেখতে চায় না। তাই দেখা যাচ্ছে, অস্ত্রোপচার সম্ভব হলেও সুস্থ স্বাভাবিক জীবন পাওয়া অনেক সময়েই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এর জন্যেই আমাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। আরো প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন।

চিকিৎসার নামে নির্যাতন :

সমকামী ও রূপান্তরকামীরা এক নয়। যদিও এই দুই শ্রেণির সামাজিক সমস্যার মধ্যে অনেক মিল আছে; সমকামীরা লিঙ্গ পরিবর্তন করে নারী হতে চায় না। ফলে এখানে অস্ত্রোপচারের কোন প্রশ্নই ওঠে না। তাই একদল চিকিৎসক শক থেরাপি (Shock therapy) ও অ্যাভারসান থেরাপির (Aversion therapy) সাহায্যে অত্যন্ত নারকীয় ভাবে সমকামী প্রবণতাকে নির্মূল করার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা মনে করেন ‘সমকামিতা’ একটি ব্যাধি। আর এই জাতীয় চিকিৎসাই হল এই রোগের মোক্ষ দাওয়াই। ইংল্যাণ্ডের তিরিশ বছরের পিটার প্রাইসের (Peter Price) ওপর একসময় এই দাওয়াই প্রয়োগ করা হয়েছিল। অ্যাভারসান থেরাপির (aversion therapy) ভুল প্রয়োগে পিটারের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। ব্যাঙ্গালোরের National Institute of Mental Health and Neuro-Sciences (NIMHANS) নামে চিকিৎসাকেন্দ্রেও সমকামীদের সুস্থ করে তোলার জন্যে এই বীভৎস চিকিৎসা পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।

শক থেরাপি ছাড়াও আরো নানা পথে সমকামিতাকে সারিয়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। ডাঃ সমীরকুমার গুপ্ত তাঁর ‘সমকামিতা’ নিবন্ধে এমন কিছু অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছেন। এ’গুলি হল—

(ক) পুরুষত্বহীন করে সমকামীর সমস্ত যৌন-আকর্ষণ ও অনুভূতিকে ধ্বংস করা।

(খ) ব্রেন সার্জারির (যেমন, ফ্রন্টাল লোবেকটমি) মাধ্যমে যৌন-অনুভূতিকে ধ্বংস করা।

(গ) মনঃসমীক্ষণ ও মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।

(ঘ) ওষুধ (যেমন— কোকেন, ইস্ট্রোজেন ইত্যাদি) প্রয়োগ করা।

(ঙ) হস্তমৈথুনে অভ্যস্ত করা এবং চরম উত্তেজনার মুহূর্তে নগ্ননারীর ছবি দেখানো।

(চ) আধ্যাত্মিক জগতের প্রতি আকর্ষণ করা এবং আধ্যাত্মিক চিন্তায় নিমগ্ন হওয়ার অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলা।

(ছ) বারংবার উত্থিত শিশ্নের ছবি দেখিয়ে বিরক্তি উৎপাদন করা।

বাস্তবিক পক্ষে এই সমস্ত পদ্ধতি অনুসরণে সমকামীকে বিপরীতকামী বা বিষমকামী করে তোলা সম্ভব নয়। অসুবিধেটা হল, অনেক চিকিৎসকই ‘সমকামিতা’-কে এক ধরণের মানসিক রোগ হিসাবে ধরে নিয়েছেন। আর তাই অন্যান্য মানসিক রোগ নিরাময়ের পদ্ধতিই এখানে অনুসৃত হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনোবিজ্ঞানীদের সংগঠন, ‘American Psychiatric Association’ কর্তৃক ১৯৮০ সালে প্রকাশিত ‘Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorders––III’ (DSM-III) পত্রিকায় ‘সমকামিতা’-কে মানসিক রোগ হিসাবে, চিহ্নিত করা হয়নি। এটি কামবিকৃতি নয়, বরং একে বিকাশের একটি স্বাভাবিক ধারা হিসাবে মনে করা হয়।

১. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লাজোলার (Lajolla) Salk Institute—এর অধ্যাপক। কেম্বিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Natural Science—এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭১ সালে জার্মানির Gottingen university থেকে ডক্টোরেট উপাধি পান। এরপর মস্তিষ্কের ওপর আরও উন্নত গবেষণার জন্যে তিনি Harvard University—তে যান। এবং সেখানে David Hubel ও Torsten Wiesel—এর সঙ্গে ‘Brain Visual System’—এর ওপর কাজ শুরু করেন।। এই কাজের জন্যে ১৯৮১ সালে নোবেল পুরস্কার পান। এরপর ১৯৮৪ সালে Salk Institure—এ এসে Fundamental Vision Reserch নিয়ে আরও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

১. Foerster, D.W.

To elevate the treatment of gender dysphoria patients to a high standard and eliminate surgery on demand, the Harry Benjamin International Gender Dysphoria Association was formed in 1978. This society recognizes the need for a team approach and sets criteria for work-up and treatment of patients before surgical conversion. Any surgeon interested in gender dysphoria surgery should acquaint himself or herself with this society and its guidelines.

Ibid.

Psychiatric therapy did not reduce the very high suicide rate (estimated to be as high as 50%). Surgical operation, albeit less than, sharply reduced tha suicides and brought about a physical and psychological relief for the converted patients.

১. Foerster, D.W.

Christine was an American sailor, who, after World War II, declared herself to be female and actively sought to find a surgeon to remove her male genitalia and build her a vagina. No American surgeon would do this, but she found a Danish surgeon, Hamberger, with the courage to help her. An amputation of the penis was done with removal of the testicles and cords. Serotal skin was left, but penile skin was sacrificed. With the male genitalia effectively removed. She was then able to find an American surgeon who attempted to make a vagina with a skin graft.

১. The Statesman : 29.7.96.

For homosexuality, aversion theory was a failure, proving that sexual orientation in not a learnt behaviour.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *