৪. সমীক্ষার কথা

৪. সমীক্ষার কথা

 পুরুষ যৌনকর্মীদের সংখ্যা কত? আমাদের হাতে কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নারী যৌনকর্মীদের ওপর ক্ষেত্র সমীক্ষাভিত্তিক নানারকম গবেষণামূলক ও সেবামূলক কাজ হচ্ছে। ফলে এদের সম্পর্কে প্রদেশ ও অঞ্চলভিত্তিক পরিসংখ্যানের চিত্র উঠে আসছে। যদিও বহু নারী যারা ছদ্মবেশে এই ব্যবসায় যুক্ত হয়েছে তাদের সংখ্যা বলা কঠিন। তুলনামূলকভাবে সংখ্যায় কম হলেও পুরুষ যৌনকর্মী আছে। এবং এরা কাজ করে এতটাই সংগোপনে যে এদের চিহ্নিত করা দুরূহ ব্যাপার। কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সক্রিয়তা ও বিশেষ উদ্যোগে এদের আর্থ সামাজিক, ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক এবং অবশ্যই পরিসংখ্যানগত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলেছে। এই ব্যাপারে ‘নাজ ফাউণ্ডেশান’ (Naz Foundation)-এর প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্য। ‘নাজ’-এর শাখা সংগঠন ঢাকা ও কলকাতা শহরে পুরুষ যৌনকর্মী তথা বিকল্প যৌনতার ওপর সমীক্ষা চালায়। এই সমীক্ষারই কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা হল।

ঢাকা : ‘নাজ ফাউণ্ডেশান ঢাকা’র উদ্যোগে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের পুরুষদের যৌনতার ওপর ক্ষেত্র সমীক্ষা চালানো হয়। এই ব্যাপারে ‘ফোর্ড ফাউণ্ডেশান বাংলাদেশ’ (Ford Foundation Bangladesh) অর্থ সাহায্য করে। সমীক্ষা কার্যকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। এর সদস্য হন সুমন লাহিড়ী, এম, এইচ, ফারাজ এবং সহেল রতন। শিবানন্দ খান এই সমীক্ষা-কার্যের উপদেষ্টা মনোনীত হন।

সমীক্ষার অংশ হিসাবে ১৯৯৬-এর সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ঢাকায় একটি কর্মশালা আয়োজন করা হয়। এখানে ৩২ জন পুরুষ অংশগ্রহণ করে। এদের বয়স ১৮ থেকে ৪০-এর মধ্যে। এরা সকলেই মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। এরা পুরুষে উপগত হয়। তবে ২ জন ছাড়া কেউ-ই নিজেদের সমকামী বলে পরিচয় দিতে রাজি নয়। ৩২ জনের মধ্যে ১০ জন নিজেদের ‘কোটি’ (Koti) বলে পরিচয় দিয়েছে। পুরুষ যৌন ব্যবসায় ‘কোটি’ বহুল প্রচলিত শব্দ। এই শব্দটি শুধু বাংলাদেশেই ব্যবহৃত হয় না, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলেও এর যথেষ্ট প্রচলন আছে। ‘কোটি’ কথার অর্থ পুরুষ যৌনকর্মী যে যৌনক্রীড়ায় নিজেকে নিষ্ক্রিয় হিসাবে ভাবে। এদের আচরণে মেয়েলিভাব অনেক সময়েই বেশ সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। উপস্থিত ৯ জন নিজেদের ‘পান্থি’ (Panthi) শ্রেণির মানুষ বলে মনে করে। এর অর্থ সক্রিয় সমকামী। এরাই কোটিদের কাছে খদ্দের হিসাবে আসে। ৮ জন সদস্য জানায় যে, বিভিন্ন সময়ে পর্যায়ক্রমে তারা কখনো সক্রিয় এবং কখনো নিষ্ক্রিয়ের ভূমিকায় অংশ নেয়। একে সহজ করে বললে দাঁড়ায়, কখনো এরা নিজেদের নারী ভেবে পুরুষের শয্যাসঙ্গিনী হতে চায়, আবার কখনো ‘কোটি’দের কাছে আসে কাম চরিতার্থের জন্যে। যৌন আচরণে বিরূপতার প্রকাশ ঘটে বলেই এরা ‘দোপরোঠা’ (Doporatha) নামে পরিচিত। অবশিষ্ট ৫ জন জানায়, পুরুষের সঙ্গে যৌনক্রীড়ায় অংশগ্রহণ করলেও এরা পায়ুকামে লিপ্ত হয় না। অন্যভাবে এরা যৌনসুখ পেয়ে থাকে।

সমীক্ষার কথা

৩২ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ২৬ জন প্রতি সপ্তাহে একাধিক পুরুষের সঙ্গে সহবাস করে। এদের মধ্যে ৫ জন স্বীকার করে যে, ৫ বছর বয়সে তারা বড়দাদা, কাকা বা কোন পড়শির যৌননিগ্রহের শিকার হয়। এছাড়াও ১ জন সাত বছর বয়সে তার নারকীয় গণধর্ষণের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে।

যৌন আচরণ যে কত বিচিত্র রকমের হতে পারে তা আরও জানা যায়, অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে। ২ জন প্রতিনিধি জানায় পুংসঙ্গমের পাশাপাশি তার স্ত্রী সঙ্গমেও আসক্ত। তাই এরা নারী যৌন-কর্মীদের কাছেও যায়, মাঝেমধ্যেই। সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা নারীর সঙ্গে এরা পায়ুসঙ্গমে লিপ্ত হয়। যোনি সঙ্গমে এদের অনীহা। ১০ জন অকপটে জানায় পুংসঙ্গমে অভ্যস্ত হলেও, নারীকে এদের ভালই লাগে। শুধু তাই নয়, অনেকের সঙ্গে কিছু-কিছু মহিলার সম্পর্কও গড়ে উঠেছে। খুব ঘনিষ্ঠ আলাপচারিতায় ‘নাজ’ কর্তৃপক্ষ আরও জানতে পারেন যে, প্রতিনিধিদের ৫০% -এর পুংসঙ্গমের পূর্বে স্ত্রী সঙ্গমের অভিজ্ঞতা ছিল। এবং বর্তমানে ২ জন বিবাহিত। পুরুষে উপগত হওয়া সত্ত্বেও অবিবাহিতরা জানায় আগামী দিনে তারা বিয়ে করবে।

কর্মশালার বিভিন্ন আলাপ-আলোচনার মধ্যে দিয়ে আরও একটা বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। তা হল— যেসব বিকল্প যৌনতায় বিশ্বাসী পুরুষদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল, তাদের যৌন অভিজ্ঞতা হয় একটু দেরিতে। এটা কোন দৈহিক কারণ নয়, পুরোটাই অর্থনৈতিক। আসলে সচ্ছল সংসারে সাধারণত বাড়ির কিশোর-কিশোরীদের স্বতন্ত্র ঘর থাকে। একাধিক সদস্যকে একসঙ্গে শুতে হয় না। অন্যদিকে সাধারণ নিম্নবিত্ত সংসারে কমবয়সি একাধিক ছেলেকে একসঙ্গে শুতে হয়। ফলে সহজেই একে অন্যের দেহ ভোগ করার সুযোগ পায়।

পায়ুকাম প্রথমাবস্থায় কষ্টকর। পায়ু অভ্যন্তরে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় কোন রস নির্গত হয় না। তাই কৃত্রিম নানারকম দ্রব্য ব্যবহার করতে হয়। উপস্থিত প্রতিনিধিদের কাছ থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে পায়ুকামে অভ্যস্ত ব্যক্তিরা ঘি, মাখন, ভেজলিন ও নানারকম ক্রিম ব্যবহার করে। পায়ুকামের জন্যে বিশেষ ধরণের ক্রিম ‘Ky Jelly’-র কথা সকলে জানলেও ব্যবহার করে না। বাংলাদেশি ৮০ টাকায় এই জেলি এখন ওই দেশের প্রায় সর্বত্রই পাওয়া যায়।

যৌন ব্যাধি সম্পর্কেও এদের বিশেষ কোন ধারণা নেই। আসলে এই সম্পর্কে এরা কিছু ভাবেই না। কাজেই HIV টেস্ট করানোর কথা কখনোই এদের মাথায় আসে নি। কিন্তু এদের ‘এইডস’ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই প্রকট। কারণ বহুগামিতা ছাড়াও কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীর ২৭ জন মাদকাসক্ত। এরা ইনট্রাভেনাস ড্রাগ ইউজার, অর্থাৎ এরা শিরার মধ্যে মাদক ইনজেকশান নেয়। ৫ জন ফেনসিডিল (Phensydyl) নামে কাশির ওষুধ খেয়ে নেশা করে। এটি একটি সিরাপ। এতে ইথাইল অ্যালকোহলের (C2H5OH) এর পরিমাণ বেশি থাকে। ফলে নেশা হয় খানিকটা মদের মতো।

উপস্থিত প্রতিনিধিবর্গের কাছ থেকে বাংলাদেশের সমকামী পুরুষ যৌনব্যবসা সম্পর্কিত কিছু তথ্যের সন্ধান পাওয়া যায়। বাংলাদেশে ২২টি ‘ক্রুসিং স্পট’ আছে। এইসব ক্রুসিং স্পটে পুরুষ যৌনকর্মীদের সঙ্গে কিছু হিজড়েকেও ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।

‘কর্মশালা’ পরিসমাপ্তির পর ‘নাজ’-এর সমীক্ষকেরা ঢাকা শহরের বিভিন্ন শ্রেণির পুরুষের সঙ্গে কথা বলেন। এবং এদের মধ্যে থেকে ৫৪ জনকে বেছে নেওয়া হয়। তারপর শুরু হয় সাক্ষাৎকার পর্ব। এই সাক্ষাৎকারের মধ্যে দিয়ে সমীক্ষিতদের যৌন জীবনের নানা কথা উঠে আসে।

সমীক্ষার কথা

পুরুষ যৌনকর্মী : পুরুষ যৌনকর্মীরা ক্রুসিং স্পটে খদ্দেরের সঙ্গে মিলিত হতে আসে। সমীক্ষকেরা ৮টি এলাকা ঘুরে দেখেন। এইগুলির অধিকাংশই পার্ক। সাধারণত সন্ধে ৬টার পর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত এখানে ব্যবসা চলে। গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ জন খদ্দেরের আনাগোনা হয় এখানে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, এখানকার পুরুষ যৌনকর্মীরা সমাজের নিম্ন শ্রেণির মানুষ। এদের কেউ-কেউ ছোটখাটো ফ্যাক্টরির শ্রমিক। এছাড়াও লিফট অপারেটার, দোকান কর্মচারীও আছে। একজন পুরুষ যৌনকর্মী গড়ে প্রতিদিন ৫-৬ জন খদ্দেরকে সঙ্গ দেয়। পুরুষ যৌনকর্মীরা যখন পার্কে ব্যবসা করে তখন তারা ছদ্মনামে পরিচিত। আবার অন্য সময় লোকে তাদের প্রকৃত নামেই চেনে। এদের বয়স ১৬-৪০ বছরের মধ্যে। এরা নিজেদের ‘কোটি’ বলে পরিচয় দেয়। খদ্দের পিছু তারা ৫০-১০০ টাকা নিয়ে থাকে। যদি কোন খদ্দের সঙ্গীকে নিয়ে পার্কের বাইরে যায়, সে ক্ষেত্রে রেট বেড়ে হয় ২০০ টাকা। অবশ্য খদ্দেরের ব্যবহারে সন্তুষ্ট হলে বা খদ্দেরকে ভাল লাগলে রেট অনেক সময় কমেও যায়। তাছাড়া নানারকম উপহারও মেলে খদ্দেরের কাছ থেকে। পার্কের মধ্যে কেউই কন্ডোম ব্যবহার করে না। অবশ্য পার্কের বাইরে কন্ডোম ব্যবহারের রীতি আছে। যৌনকর্মীরা সাধারণত মধ্যবিত্ত খদ্দেরদেরই বেশি পছন্দ করে। কারণ এদের কাছ থেকে টাকা বেশি পাওয়া যায়। পার্কের এই সমকামী যৌন ব্যবসা নিয়ন্ত্রিত বা পরিচালিত হয় একজন গুরুর দ্বারা। কোন ঝামেলা হলে গুরু সামাল দেয়। বিভিন্ন সময় ব্যবসা সম্পর্কে গুরু কর্মীদের উপদেশ দিয়ে থাকেন। পার্কে প্রধানত পায়ুকামই (Anal sex) হয়। সমীক্ষা থেকে আরও জানা গেছে পুং-যৌনকর্মীদের কেউ কেউ বিবাহিত। আবার অবিবাহিত অনেকেই আছে যারা বিয়ে করতে চায়। তবে তারা স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করতে পারবে কিনা এ বিষয়ে তাদের সন্দেহ আছে। কিছু কিছু পুরুষ যৌনকর্মী আছে যারা নিজেদের পুরোপুরি নারী ভাবে (Transsexual) এবং খদ্দেরের মধ্যে কারো কারো সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তুলে ‘স্বামী’ পাতাতে চায়। খদ্দেরের মধ্যে কিছু পুলিশকর্মীও আছে। যাদের কাছে থেকে এরা কম টাকা নেয়। মাত্র ১০-২০ টাকা। কিছু পুলিশকর্মী এদের কাছে আসার সময় ইউনিফর্ম ছেড়ে আসে। খদ্দেরের দলে আছে অনেক মসজিদের মোল্লাও। প্রতিটি পার্কে সাধারণত ২০-৩০ জন পুরুষ যৌনকর্মীকে দেখা যায়। অবশ্য বিশেষ অনুষ্ঠানের দিনে ‘কোটির’ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০০ মতো। সারাদিন এই সব পার্কে সাধারণ মানুষের আনাগোনা চলে। সন্ধের পর পার্ক বন্ধ হয়ে যায়। দারোয়ানের যোগসাজসে এই ব্যবসা চলে। এই দারোয়ানরা টাকার বদলে কোটিদের ভোগ করে।

২২টি মিলনস্থলের মধ্যে সমীক্ষকেরা ৮টি এলাকা ঘুরেছিলেন। দক্ষিণ ঢাকায় ঝোপ-ঝাড় ও গাছে ঘেরা একটি বিশাল পার্ক আছে। পার্কের মধ্যে ছোট্ট একটি লেক। সন্ধের পর আলো কমে আসে। এখানে ভাল আলোর ব্যবস্থাও নেই। তখনই শুরু হয় কর্মীদের স্বাধীন বিচরণ। এই প্রসঙ্গে অবশ্য এটাও উল্লেখ করা যেতে পারে যে, এই পার্কে নারী যৌনকর্মীরাও ব্যবসা করে থাকে। তবে এরা এখানে সঙ্গমে লিপ্ত হয় না। খদ্দের ধরে মাত্র। তারপর খদ্দের নিয়ে অন্যত্র।

এই দক্ষিণ ঢাকাতে আরও একটি ছোট পার্ক আছে। এখানে কোন লাইটের ব্যবস্থা নেই। ফলে এখানেও সমকামী যৌন ব্যবসা জাঁকিয়ে বসেছে।

উত্তর ঢাকায় একটি সুদৃশ্য বৃহৎ পার্ক। সারাদিন এখানে লোকের যথেষ্ট সমাগম। পার্কের মধ্যে একটি বড় লেক আছে। সন্ধে ৬টার পর পার্ক বন্ধ হয়ে যায়। পার্কের মধ্যে ঝোপঝাড় কম নয়। পার্কের চারদিকের বেড়া মজবুত নয়। ফলে পার্ক বন্ধ হওয়ার পরেও পুরুষ যৌনকর্মীরা বেড়ার ফাঁক ফোকর দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতে পারে। রাত যত গভীর হয় ওই একই পথে খদ্দেরও আসে।

ঢাকার একটি প্রসিদ্ধ মসজিদ চত্বরে এ ধরণের যৌনকর্মীদের দেখা যায়। সাধারণত বৃহস্পতিবার সন্ধেবেলায় এরা বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই স্থানকে ক্রুসিং স্পট বা মিলনস্থল না বলে পিক আপ সেন্টার বলাই ভাল। কারণ এখানে থেকে খদ্দের কর্মীদের নিয়ে কাছেপিঠের একটি ছোট পার্কে যায়। অবশ্য বর্তমানে ওই পার্কটি বন্ধ থাকায় খদ্দেরকে হোটেল বা অন্য কোথাও যেতে হয়।

ঢাকার একটি ব্যস্ত রাস্তা। শপিং সেন্টারও বটে। সন্ধের পর এখানে কেনাকাটার ভিড় হয়। এই ভিড়ে মিলেমিশে থাকে ‘কোটি’ ও ‘পান্থি’। পান্থিদের দলে অনেক ছাত্রদেরও দেখা যায়। এদের বয়স ১৬-২৫-এর মধ্যে। এরা মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে।

সদা ব্যস্ত ফেরি ঘাট। এখানেও ওই একই দৃশ্য। তবে এখানে কিছু ‘মালিশ বয়’ দেখা যায়। ছোট ছোট ঘর এখানে ভাড়া পাওয়া যায়। ফলে এই ব্যবসা একটু নিরাপদে ও সবসময় চলে। এছাড়াও লঞ্চের মধ্যেও এই ব্যবসা চলে।

বেশ কিছু শিশুপুরুষ যৌনকর্মী হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। ঢাকার একটি রেলওয়ে স্টেশনে এরকম কিছু শিশু দেখা যায়। এরা এগিয়ে আসে যাত্রীদের সাহায্য করতে। কেউ কেউ যাত্রীদের কাছে ভিক্ষা চায়। এরাই আবার নানা ছলনায় যাত্রীকে প্রলুব্ধ করে। এবং দেহদান করে উপার্জন করে। এদের বয়স ৮-১৫-এর মধ্যে।

হোটেলের কর্মী :

সমীক্ষকেরা ঢাকা শহরের ২০ জন হোটেলে কর্মীর সঙ্গে কথা বলেন। এই সব হোটেল কর্মীরা বিভিন্ন সময়ে নিজেদের মধ্যে যৌন ক্রিয়া করে থাকে। আসলে

সমীক্ষার কথা

 হোটেল কর্মীদের যৌন-আচরণে।

পুরুষ যৌনকর্মী ছাড়াও বহুপুরুষ আছে যারা পুরুষকে দেহদান করে। অনেক সময়ই এদের মধ্যে কোন ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকে না। শুধুমাত্র যৌনতাকে চরিতার্থ করার জন্যেই এ কাজ করে। অবশ্য এদের কেউ কেউ পার্টটাইম যৌনকর্মী হিসাবে কতিপয় খদ্দেরের মনোরঞ্জন করে থাকে। সমীক্ষিত ২০ জন হোটেল কর্মীর মধ্যে ৮ জন নিজেদের মধ্যে প্রায়শই এই কাজ করে থাকে। ৪ জন পারস্পরিক বোঝাপড়ায় হস্তমৈথুন ও থাইমৈথুনে লিপ্ত হয়। বাকি ৮ জন বিভিন্ন সময়ে হোটেলের পুরুষ খদ্দেরের সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক গড়ে তোলে, টাকার বিনিময়ে। এইসব কর্মীদের পুরুষের সঙ্গে মিলিত হওয়ার পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে। এরা কেউ-ই বিবাহিত নয়। এদের মধ্যে ২ জন জানায় যে, তারা প্রতিমাসে দু’বার নারী যৌনকর্মীদের কাছে যায়। এরা মনে করে, পুরুষের সঙ্গে পুরুষের যৌন মিলন অপরাধমূলক কাজ নয়। তারা আরও মনে করে পুরুষে পুরুষে মিলন অনেক নিরাপদ। এতে যৌনব্যাধি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এদের কারুরই এইডস (AIDS) সম্পর্কে কোন সুস্পষ্ট ধারণা নেই। এরা কন্ডোম ব্যবহার করে না। এইভাবে যৌন আচরণ করায় এদের অনেকের মধ্যে কিছু সংস্কার গড়ে উঠেছে। এবং এই সংস্কারের সবটাই প্রায় শিশ্নকে ঘিরে। শিশ্নের আকৃতি, লিঙ্গোত্থান, বীর্যস্থলন ইত্যাদি। পুরুষের সঙ্গে পুরুষের এই মিলনকে এরা ‘প্রকৃত সেক্স’ বলে মনে করে না। তাই তারা এ ব্যাপারে লজ্জিত নয়। তবুও তাদের ধারণা, তাদের এই আচরণের ব্যাপারে হোটেলের মালিক বা অন্য কেউ কিছুই জানে না। এমনকি পরিবারের কেউ-ই এদের এ ব্যাপারে সন্দেহ করে না। সমীক্ষিত সকলের ব্লু-ফিল্ম (Blue film) দেখার যথেষ্ট অভ্যাস আছে :

এইরকম ৬ জনের সঙ্গে সমীক্ষকেরা আলাপ করেন। এরা গ্রাম থেকে এসেছে। বয়স ১৩-১৮ বছর। এদের বিভিন্ন সময় মালিককে দেহদান করতে হয়। নিজেদের মধ্যেও এরা নানারকম যৌন ক্রিয়া করে থাকে। প্রধানত এরা পায়ুকামে অভ্যস্ত।

রিক্সাচালক : ঢাকায় ৮ জন রিক্সাচালকের ওপর সমীক্ষা চালান হয়। বর্তমানে ঢাকায় থাকলেও, এদের আদি বাড়ি গ্রামাঞ্চলে। এদের যৌন-আচরণে উভকামিতা লক্ষ্য করা গেছে। ৮ জনের মধ্যে ৬ জন কোন না কোন সময়ে মহিলা যৌনকর্মীদের সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে। এবং এদের সঙ্গে পায়ুকামে লিপ্ত হয়েছে। ৩ জন বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও পুরুষের সঙ্গে মিলিত হবার অভ্যাস ত্যাগ করতে পারে নি। গ্রামে থাকতেও এদের মধ্যে ৫ জন পুরুষের সঙ্গে সহবাস করেছে। ঢাকায় আসার পরে এদের মধ্যে এই অভ্যাস বেড়ে যায়। পায়ুসঙ্গম ও মুখমৈথুনে এরা অভ্যস্ত। এরা কন্ডোম ব্যবহার করে না। ‘এইডস’-এর ভয়াবহতা সম্পর্কে এরা আদৌ ওয়াকিবহাল নয়। যাত্রীকেও (passengers) এরা দেহদান করে, অবশ্যই অর্থের বিনিময়ে। এবং এই জাতীয় যৌনক্রিয়ায় তারা পরম-আনন্দ পেয়ে থাকে। (এই প্রসঙ্গে অশোক রাও কবি লিখিত ‘The Rickshawallah’ গল্পটি দ্রষ্টব্য— savvy, March ’97)

পুরুষ পথশিশু :

ঢাকা শহরের পুরুষ পথশিশুরাও যৌনব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। সমীক্ষকেরা নানা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে দিয়ে ১০ জন পুরুষ পথশিশুর সঙ্গে আন্তরিকতার সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হন। এদের বয়স ৮-১৪ বছর। প্রথমে ১৩ বছর বয়সি একজনের সঙ্গে পরিচয় হয়। চুরি করা, ভিক্ষে করা থেকে শুরু করে শরীর বিক্রি করেও এরা উপার্জন করে। এদের কোন স্থায়ী ঠিকানা নেই। সকলেই গৃহহীন। ৫ জন অনাথ। ১০-৫০ টাকার বিনিময়ে এরা রাস্তার বড় ছেলে, কুলি-মজুর, রেল ও পুলিশ কর্মীদের কাছে দেহদান করে। পথ শিশুদের মধ্যে ৪ জন ছেলে রাস্তারই মেয়েশিশুকে ধর্ষণ করেছে।

ট্রাক ড্রাইভার (Truck driver): বাংলাদেশের বহু ট্রাক ড্রাইভারের পায়ুকামে লিপ্ত হওয়ার অভ্যাস আছে। এদের অনেকেই বিবাহিত এবং ছেলেমেয়েও আছে। ঢাকার নির্দিষ্ট কিছু ট্রাক-স্টপে এরা গাড়ি দাঁড় করায়। এখানেই পুরুষ যৌনকর্মীরা এদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্যে দাঁড়িয়ে থাকে। আসলে শহরের মধ্যে নারী যৌনকর্মীদের সঙ্গে মিলিত হওয়া সম্ভব নয় বলেই, এরা পুরুষ যৌনকর্মীর খোঁজ করে। তাছাড়া এখানে নারী যৌনকর্মীদের রেটও বেশি।

এরা কন্ডোম ব্যবহার করতে চায় না। পুরুষ যৌনকর্মীদের সঙ্গে মিলিত হওয়া ছাড়াও এদের সঙ্গে খালাসিদের এক ধরণের বিশেষ যৌন সম্পর্ক আছে।

কলকাতা :

দীপ পুরকায়স্থর তত্ত্বাবধানে ‘নাজ ক্যালকাটা প্রোজেক্ট’ (Naz Calcutta project) কলকাতার পুরুষ যৌনকর্মী ও বিকল্প যৌনতায় বিশ্বাসী পুরুষদের ওপর একটি সমীক্ষা চালায়। ১৯৯৬-এর ১৫ নভেম্বর থেকে ১৯৯৭-এর ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত এই সমীক্ষা চলে।

আইনি ও সামাজিক স্বীকৃতি না থাকায় আমাদের দেশে পুরুষ যৌনকর্মীরা প্রকাশ্যে তাদের যৌন আচরণের কথা জানাতে পারে না। ফলে এদের খুঁজে বের করা এবং সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা খুবই কঠিন। এছাড়া আমাদের দেশে বহু পুরুষ আছে যাদের যৌন আচরণে উভকামিতার (bisexuality) প্রকাশ ঘটেছে। এদের চিহ্নিত করা নিঃসন্দেহে আরও দুরূহ। তাই সমীক্ষা কার্যের প্রথমে নাজের তরফ থেকে কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে পুরুষ যৌনকর্মীদের মিলনস্থল (cruising spot) চিহ্নিত করার চেষ্টা চলে। এ ব্যাপারে ওই অঞ্চলের কিছু সাধারণ মানুষ ও বিকল্প যৌনতায় বিশ্বাসী কিছু মানুষের সাহায্যে নেওয়া হয়। সাকুল্যে কলকাতার ১৫টি মিলনস্থলের সন্ধান পাওয়া গেছে। এইসব মিলনস্থলে যে সব পুরুষেরা অন্যপুরুষে উপগত হওয়ার জন্য একত্রিত হয় তাদের দশটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে।

১। পুরুষ যৌনকর্মী (MSW)

২। পুরুষ খদ্দের (MBS)

৩। অপেশাদার পুরুষ সঙ্গী (NCC)

৪। স্বঘোষিত সমকামী (SICM)

৫। মুসলমান সমকামী

৬। হিন্দু সমকামী পুরুষ

৭। কম আয়ের শ্রমিক ও ঠিকা শ্রমিক (Lig-msm)

৮। বেশি ও মাঝারি আয়ের পুরুষ (uig/mia-msm)

৯। বালক ও যুবক সঙ্গী (Ymsm)

১০। বিবাহিত পুরুষ অথবা অবিবাহিত পুরুষ যাদের মহিলা সঙ্কট আছে। (mmsm)

এই শ্রেণিবিভাগ যে ত্রুটিমুক্ত নয় সে কথা সমীক্ষার রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন— হিন্দু ও মুসলমান হিসাবে পুরুষ সঙ্গীদের যে দুটি ভাগ তা অনেক সময় গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। কারণ কম আয়, মাঝারি ও বেশি আয়ের মুসলমানেরা অন্য শ্রেণির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে একই ব্যক্তিকে দুইভাবে শ্রেণি বিভক্তকরণের ফলে খানিকটা ত্রুটিযুক্ত হয়ে পড়ে এই শ্রেণিবিভাগ। যাই হোক অসংখ্য অসুবিধা ও সীমাবদ্ধতাকে মাথায় রেখে নাজ কর্তৃপক্ষ ৩০০ জন বিকল্প যৌনতায় বিশ্বাসী পুরুষের (MSM) সঙ্গে মিলিত হয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে সচেষ্ট হয়।

সমীক্ষিতের সবাই স্বীকার করে যে, মিলনস্থলে তাদের নানারকম পুলিশি ও মস্তানির ঝামেলা সহ্য করে কাজ করতে হয়। ফলে তারা ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থার মধ্যে থাকে। কোনরকমভাবে ঝামেলাকে এড়িয়ে কাজ করে বেরিয়ে যাওয়াই এখানে প্রধান ব্যাপার। সংস্থা মনে করে যৌন রোগ সম্পর্কে কমবেশি ওয়াকিবহাল করা হলেও, যৌন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করে তোলার অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে না।

যেসব জায়গায় যৌন মিলন চলে ও সঙ্গীর খোঁজে পুরুষেরা ঘোরাফেরা করে সেগুলি সাধারণত শহর কলকাতার বিভিন্ন পার্ক, রেলওয়ে প্ল্যাটফর্ম ও বাস টার্মিনাস চত্বর, ফাঁকা বাস ও ট্রাম, শৌচাগার, পর্যটন ও পিকনিক এলাকা, জিমখানা, সুইমিং পুল ও সিনেমা হল। মানসিকতা অনুযায়ী বিভিন্ন পুরুষেরা বিভিন্ন জায়গায় মিলিত হয়। তবে এর ব্যতিক্রমও লক্ষ্য করা যায়, কিছু কিছু সময়। সঙ্গীর ফাঁকা বাড়ি সবচেয়ে নিরাপদ। এখানে ঝুট ঝামেলা নেই। এখানে মিলিত হতে চায় অনেক পুরুষই।

মিলনস্থলে সমীক্ষা চালিয়ে নাজ লক্ষ্য করেছে পুরুষ যৌনকর্মীদের পাশাপাশি বহু অপেশাদার পুরুষ অন্য পুরুষের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য আসে। তাই উপার্জনের থেকেও মানসিক ও শারীরিক আরাম পাওয়াটাই এদের কাছে বড় কথা। তাই পুরুষের সন্ধান করলেও পুরুষ যৌনকর্মীদের মতো এরা খদ্দেরের সঙ্গে দরাদরি করে না। তবে সন্তুষ্ট হয়ে সঙ্গী এদের অনেক সময় নানা রকমের উপহার দিয়ে থাকে।

পুরুষ যৌনকর্মী ও অপেশাদার পুরুষদের মধ্যে কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। পথ চলতি সাধারণত মানুষ পুরুষ যৌনকর্মীদের আচরণের মধ্যে কিছু অসঙ্গতি লক্ষ্য করলেও, অপেশাদার আচরণ তেমন চোখে পড়ার মতো নয়। এই দুই শ্রেণির আচরণের বৈসাদৃশ্য নীচের তালিকায় তুলে ধরা হল—

সমীক্ষার কথা
সমীক্ষার কথা

উপরে উল্লিখিত পার্থক্যগুলি ছাড়াও অপেশাদারের কিছু নিজস্ব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আছে, যা রিপোর্টে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়। বহু অপেশাদার আছে যারা বিবাহিত। প্রতিসময় তাদের মনে হয়, তারা স্ত্রী ও পরিবারের সঙ্গে প্রতারণা করছে। এটা একসময় তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় পরিণত হয়। এদের কেউ কেউ মনে করে স্ত্রী বোধ হয় এদের এই আচরণের কথা জেনে ফেলবে। ফলে নিজেকে অবিবাহিত হিসাবে পুরুষ সঙ্গীর কাছে পরিচয় দিয়ে থাকে। তাদের ধারণা, ‘বিবাহিত’ একথা জানতে পারলে পুরুষ সঙ্গী হয়তো নানাভাবে তাকে ব্ল্যাকমেল করবে।

বিকল্প যৌনতায় বিশ্বাসী (MSM) পুরুষদের যৌনজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল যৌথ যৌনাচার (Group sex)। অপেশাদাররা (NCC) সাধারণ এই জাতীয় আচরণের সঙ্গে বেশি যুক্ত। সমীক্ষায় দেখা গেছে ৯৪% কম আয়ের এবং ৫৯% মাঝারি ও বেশি আয়ের অপেশাদারেরা পার্কে সঙ্গীদের সঙ্গে মিলিত হয়। নিজের বাড়িতে পুরুষ সঙ্গীদের সঙ্গে যৌন ক্রিয়ায় লিপ্ত হওয়ার সংখ্যা কম আয়ের অপেশাদারের মধ্যে ৪৪% এবং বেশি ও মাঝারি আয়ের সংখ্যা ৭২%। সঙ্গীর বাড়িতে গিয়ে যৌন সম্ভোগের সঙ্গে যুক্ত হয় এমন নিম্ন আয়ের অপেশাদারদের সংখ্যা ৬৯% এবং বেশি ও মাঝারি আয়ের সংখ্যা ৮৬%।

বিবাহিত পুরুষেরা নিজের বাড়িতেই সাধারণত পুরুষ সঙ্গীর সঙ্গে মিলিত হবার উপযুক্ত স্থান বলে মনে করে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৭১% পুরুষ নিজের বাড়ির সদস্যদের অনুপস্থিতিতে পুরুষসঙ্গীকে নিয়ে আসে। পরিচিত সাধারণ মিলনস্থলকে তারা এড়িয়েই চলে, নিজের এই আচরণের প্রকাশ ঘটবে বলে। অন্যদিকে, অবিবাহিত পুরুষরা অধিকাংশই পার্ক ও অন্যান্য মিলনস্থলে মিলিত হয়ে থাকে।

যৌনজীবনে ‘ঠেক’ (Theak)-এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বহুল প্রচলিত কথ্যভাষার একটি বিশেষ প্রতিশব্দ হল ‘ঠেক’। কোন নির্দিষ্ট জায়গায় একত্রিত হয়ে গল্প গুজব, চা খাওয়া, গুলতানি করার আসরকেই বলে ঠেক (Theak)। কলকাতায় এরকম বেশ কিছু ‘ঠেক’ আছে। ঠেকে যৌন যৌনাচার (Group sex) একটি সাধারণ ব্যাপার। নতুন সঙ্গীর সন্ধানের আশায় অনেকেই ঠেকে আসে।

নাজ-এর প্রস্তাব : একা নাজের পক্ষে সাধারণ মানুষের সমকামিতা সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গী বা মূল্যবোধ পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। রিপোর্টে একথা খুব জোরের সঙ্গে উল্লেখ করেই সংস্থা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের আন্তরিক সহযোগিতা ও সাহায্য কামনা করে। বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে পুরুষদের (MSM) সমস্যা বিষয়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করার জন্য গবেষণা করতে নাজ আহ্বান জানায়। বিকল্প যৌনতায় বিশ্বাসী পুরুষদের নিয়ে বিভিন্ন নিবন্ধ প্রকাশ করা প্রয়োজন। তাহলে সাধারণ মানুষ এদের অবস্থা ও সমস্যা সম্পর্কে অবহিত হতে পারবে। প্রশাসন ও পুলিশ কর্তৃপক্ষের কাছেও এরা অপাঙক্তেয়। তাই সহানুভূতির সঙ্গে পুলিশ কর্তৃপক্ষকে এই বিশেষ মানুষদের সম্পর্কে ভেবে দেখার অনুরোধ করা হয়েছে।

বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকেও এই ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে। কর্মশালা (workshop) ও আলোচনা চক্রের আয়োজন করে সমকামী যৌনমানসিকতার গভীরে প্রবেশ করা ও সমাধানের সূত্র নির্দেশ করার চেষ্টা করা উচিত। এরা যাতে নিজেদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। এই ব্যাপারে ‘সাপোর্ট গ্রুপ’ গঠন ও টেলিফোনে পরামর্শ দানের ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে।

পুনা :

মহারাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর হল পুনা। অনেকে একে দাক্ষিণাত্যের রানী বলে। মুলা ও মুথা নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত এই শহরটি বর্তমানে একটি ব্যস্ত বাণিজ্যকেন্দ্র। একসময় এখানে চালুক্য, রাষ্ট্রকূট ও যাদব বংশীয় রাজারা রাজত্ব করতেন। মহম্মদ বিন তোগলক, বাহমনী রাজারা এবং মারাঠাশক্তি পুনাকে শাসন করেছে। এই রকম ঐতিহ্যশালী শহরেই আমরা এসেছি। ক্ষেত্র সমীক্ষার কাজে। বলা বাহুল্য, সমীক্ষার বিষয় ‘পুরুষ’ যৌনকর্মী। পুনা স্টেশন থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে মুম্বই-ঔরঙ্গাবাদ জাতীয় সড়কের কাছে রামবাড়িতে (Ram wadi) এক নিকট আত্মীয়ের বাড়িতে আমরা উঠেছিলাম।

পুরুষ যৌনকর্মীদের বসতি এলাকাগুলি খুঁজে বের করাই ছিল আমাদের প্রথম কাজ। পরিচিত কারুরই এই ব্যাপারে সামান্য ধারণাটুকুও নেই। পরিচিতির গণ্ডি পেরিয়ে অচেনা মানুষজনের কাছে গিয়ে পড়লাম। একই কথা…….। অর্থাৎ ওদের ঠেক-ঠিকানার কথা বাতলাতে পারলো না কেউ-ই।

একদিন পড়ন্ত বিকেলে পুনা স্টেশন চত্বরে এক চায়ের দোকানে আলাপ হল রাজেনের সঙ্গে। রাজেন অটো চালক। বেশ মিশুকে। অল্প সময়ের মধ্যে বেশ আড্ডা জমে গেল। বলা বাহুল্য, তা ছিল নিতান্তই স্থূল। একসময় কথাটি পেড়েই ফেললাম।— আচ্ছা, ‘গাণ্ডুরা’ এখানে কোথায় থাকে? একগাল হেসে কাঁধ ঝাঁকিয়ে ও বলল— যাবেন নাকি স্যার? একি, বলে কি লোকটা!… না, না, এটা ওর স্রেফ ইয়ার্কি। গলার টোনই তো তাই বলছে। বুঝলাম এবার ‘গাণ্ডু’ নিয়ে বিচ্ছিরি ইয়ার্কি শুরু হবে। আর না, উঠে পড়া ভাল। উঠেই পড়লাম। মুহূর্তেই দুজনের হাত ধরে গলা নামিয়ে বললো— ‘বেশি না স্যার, ত্রিশ টাকা দেবেন। বকশিস চাই না। রাজেন বেইমানি করে না।’ সব কেমন গোলমাল হয়ে গেল। লালবাতি ও তার সংলগ্ন এলাকায় ঘোরাফেরা করলে এমন কথাই শোনা যায়। কিন্তু সে কথা আসছে কেন? আমরা তো আতিপাতি করে খুঁজে বেড়াচ্ছি গাণ্ডুদের, যারা ঘুরে ঘুরে খদ্দের সংগ্রহ করে। অনেক কষ্টে সেদিন রাজেনের হাত থেকে ছাড়া পেয়েছিলাম। ফ্ল্যাটে এসে পুরো ব্যাপারটাই বারিদাকে বলি। পুরো নাম আব্দুল বারি। বাঙালি। দীর্ঘদিন পুনায় আছেন। ভাল মারাঠি জানেন। আমাদের কাজের ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ অনেক। বারিদাকে সঙ্গে নিয়ে শুরু হল আমাদের সমীক্ষার কাজ। পুনার কুখ্যাত লালবাতি এলাকাগুলির নাম শুক্রবার পেঠ, বুধবার পেঠ ও বোহারি আলি অঞ্চল। যৌনব্যবসা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য আমরা বিভিন্ন থানার পুলিশ আধিকারিকের সঙ্গে যোগাযোগ করি। শুক্রবার পেঠের খুব কাছেই ‘ধামধেড়া গলি’। এখানেই বাস করে পুরুষ যৌনকর্মীরা। এটি ফারাকুনা থানার অধীনে। বুঝলাম, রাজেন তাহলে আমাদের ঠিকই বলেছিল। সকাল থেকে সন্ধে এবং কোন কোন দিন অনেক রাত পর্যন্ত এই এলাকায় আমরা ঘোরাঘুরি করেছি। পিম্প বা দালালদের ঝামেলায় পড়তে হয়েছে কয়েকবার। সর্বোপরি পুলিশের ঝামেলাও কম না। বুঝলাম পুলিশের সাহায্য ছাড়া এই অঞ্চলে সমীক্ষা চালানো অসম্ভব। তাই একদিন সোজা গিয়ে উঠলাম শুক্রবার পেঠের পুলিশ চৌকিতে (ফাঁড়ি)। ফারাকুনা থানার অধীনে এই চৌকি। আলাপ হল পুলিশের বড়বাবু সুরেশ মৃখীর সঙ্গে। ওনার সঙ্গেই পুরো এলাকাটি ভাল করে ঘুরে দেখলাম। সমীক্ষার সময় এক হাবিলদার সাহেব, নায়েক ওয়াটজিকে আমাদের সঙ্গে থাকার মৌখিক নির্দেশও দিলেন। সবরকম পুলিশ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতিও তিনি দিলেন। কাজেই নির্ভয়ে শুরু হল আমাদের সমীক্ষা।

বুধবার ও শুক্রবার পেঠ জনবহুল এলাকা। রাস্তার দুধারে দোকান। ব্যস্ত রাস্তায় যানবাহন চলছে অনবরত। দুধারে সারি সারি তিন-চারতলা বাড়ি। মাঝে মাঝে সরু সরু আঁকাবাঁকা গলি সোজা চলে গেছে ভিতরে। গলির মুখেই জটলা, যৌনকর্মীরা এখানেই দাঁড়ায়। এই অঞ্চলে আনুমানিক পাঁচ হাজার যৌনকর্মীর বাস। বড় বাড়িগুলির ভিতরেই চলে দেহব্যবসা। শুক্রবার পেঠের পুলিশ চৌকি থেকে বেরিয়ে একটু হাঁটলেই ডানদিকে পড়বে সরু গলি। এই গলি দিয়ে মিনিট তিনেক হাঁটলেই ধামধেড়া গলিতে পৌঁছান যাবে। এই গলির দুধারে বাড়ি। ডানদিকের বাড়িগুলির ছাউনি অ্যাসবেসটারের। বামদিকেরগুলি দোতলা ও তিনতলা। কোন কোন বাড়ির দেওয়ালে আবার নক্সা করা। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। দেখলে মনে হবে বেশ সম্পন্ন সব পরিবার। এদের অর্থনৈতিক অবস্থা অপেক্ষাকৃত ভাল। এই গলির ডান ও বামদিকে থাকা যৌনকর্মীরা কিন্তু নারী নয়। নিজেদের এরা জন্মগত যৌন প্রতিবন্ধী বা হিজড়ে বলে পরিচয় দেয়। সাধারণ মানুষ এদেরই ‘গাণ্ডু’ বলে।

সমীক্ষা থেকে জানা যায়, এইসব হিজড়ে যৌনকর্মীরা আসলে পুরুষ। এরা রূপান্তরকামী। এদের সংখ্যা ১২২। এদের মধ্যে ৪৩ জনের ওপর সমীক্ষা চালান হয়।

সমীক্ষার কথা

সারণি থেকে জানা যায়, সাধারণ সমকামী যৌনকর্মীদের মতো এরা নয়। মোট ৪৩ জনের মধ্যে ৩৩ জনই স্বেচ্ছায় পুরুষাঙ্গ ছেদন করেছে। এদের বেশির ভাগই শিক্ষিত ডাক্তারের কাছে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে খোজা হয়েছে। ব্যতিক্রম কিছু বয়স্করা। এরা হাতুড়ে পদ্ধতিতে ছেদন কার্য ঘটিয়েছে। প্রকাশ্যে যৌনব্যবসার সঙ্গে যুক্ত একথা স্বীকার করলেও এরা নিজেদের পুরুষ কিংবা নারী হিসেবে পরিচয় দেয় না। ‘হিজড়ে’ হিসেবে পরিচিত হতে চায়। এরা মহিলা বেশ ধারণ করে। শাড়ি ও সালোয়ার কামিজই বেশি পরে। যদিও ঘরে অনেকেই লুঙ্গি বা শুধু সায়া পরে থাকে। গর্ভ নিরোধক ওষুধ (contraceptive pill বা o/c) খেয়ে এদের স্তন নারীসুলভ হয়েছে। শুক্রাশয় না থাকায় শরীরে টেস্টোটেরন হরমোন নিঃসরণ হয় না। ফলে পুরুষত্বের ভাব ম্লান হতে থাকে। দাড়িগোঁফ কমে যায়। অন্যদিকে গর্ভ নিরোধক ওষুধে ইস্টোজেন থাকায় শরীরে যৌন লক্ষণগুলির বহিঃপ্রকাশ ঘটতে থাকে। অর্থাৎ স্তন ও নিতম্বের বৃদ্ধি ঘটে। এদের কাছে সাধারণত সমকামী ও উভকামী খদ্দেররাই আসে। এছাড়াও কিছু বিষমকামীও এসে থাকে। বস্তুত এরা নিজেকে নারীর মতো করে গড়ে তোলে এবং খদ্দেরের মর্জি বা নির্দেশেই স্তন গ্রন্থির বিকাশ বা বৃদ্ধি ঘটায়।

পুনা শিল্প নগরী। বাণিজ্য কেন্দ্রও বটে। নানা ধর্মের লোকের বাস এখানে। ধামধেড়া গলির পুরুষ যৌনকর্মীরাও ভিন্ন-ভিন্ন ধর্মাবলম্বী। যদিও অঙ্গচ্ছেদনের পর এরা এক বিশেষ সম্প্রদায়ের অনুশাসন মেনে চলে। সমীক্ষিত ৪৩ জনের মধ্যে হিন্দু-১৫, মুসলমান-২৩, এবং খ্রিস্টান-৫ জন। এদের বয়স ১৮ থেকে ৫০ এর মধ্যে। শিক্ষাগত যোগ্যতা— ১ জন বি.এ, ৩ জন মাধ্যমিক মানের, নিরক্ষর ৮ জন। বাকি ৩১ জন ৪র্থ শ্রেণি থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত।

এদের দৈনিক গড় আয় ৮০ থেকে ১৬০ টাকা। কখনো কখনো এর বেশিও হয়। কারণ এদের মধ্যে কয়েকজন সুদর্শন যৌনকর্মী হোটেলে খদ্দেরের মনোরঞ্জনের জন্যে ডাক পায়। এইভাবে উপার্জিত অর্থের পরিমাণ সমীক্ষার মধ্যে রাখা হয়নি। আয়ের একটা অংশ (২৫%) দিতে হয় ওস্তাদ বা গুরুমাকে। দিনে এরা ৩-৭ জন খদ্দেরকে যৌনঅঙ্গ দিয়ে থাকে।

গাণ্ডু, ছক্কা বা হিজড়ে বলে পরিচিত এই সব পুরুষ যৌনকর্মীরা নানাভাবে বিহার, উত্তর প্রদেশ, দিল্লি, মুম্বই ও রাজস্থানের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে এসেছে। ভারতের হিজড়েরা নবজাতককে নিয়ে নাচগান করে উপার্জন করে। ধামধেড়া গলির এইসব ব্যক্তি প্রধানত যৌনব্যবসায় সঙ্গে যুক্ত হয়েই জীবিকা নির্বাহ করে। তবে ওয়ানী নামে ওদের এক ওস্তাদ বা গুরু বলে, শরীরের জৌলুস ফুরিয়ে গেলে খদ্দের আর আসে না। ফলে ভিক্ষা করা ছাড়া এদের অন্য কোন উপায় থাকে না। পুনার বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ করে স্টেশন চত্বরে বয়স্ক ভিখারি হিজড়ের দেখা মিলবে। এছাড়াও যৌনব্যবসায় যারা নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি তারাও মাঝে মধ্যে ভিক্ষা করে। বয়সকালে সকলের অবস্থা অবশ্য একরকম হয় না। ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও অর্থের জোরে অনেকে খানদান বা ওস্তাদ হয়ে ওঠে। নিজের অধীনে বেশ কয়েকজন এই ধরণের যৌনকর্মীকে রাখে। যাদের খাটিয়ে উপার্জন করে।

ধামধেড়া গলির এইসব পুরুষ যৌনকর্মীরা অনেক সময় খদ্দেরকে সঙ্গ দেওয়ার নামে তার সবকিছু কেড়ে নিয়ে সর্বস্বান্ত করে দেয়। এ ব্যাপারে পুলিশের বড়বাবু সুরেশ মৃখী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ওরা এভাবে উপার্জন চালিয়ে যাচ্ছে। যারা নিয়মিত খদ্দের তাদের কথা আলাদা। কিন্তু কৌতূহলবশত সন্ধের পর যেসব পুরুষ এই অঞ্চলে ঘোরাফেরা করে তাদের পুরুষ যৌনকর্মীদের পাল্লায় পড়তে হয়। ভুলিয়ে ভালিয়ে ঘরে ঢুকিয়ে এরা সব কিছু কেড়ে নেয়। পুলিশের কাছে অভিযোগ করেও বিশেষ কিছু ফল হয় না। সমীক্ষা চলাকালীন পুলিশ ফাঁড়িতে সন্ধের পর এমন কয়েকজনকে ডায়েরি করার জন্য আসতে দেখি। ডায়েরি নেওয়া তো হয়ই না বরং অভিযোগ করতে আসা লোকদের পুলিশ মারধর ও গালাগাল করতে থাকে। তাই দেখা যাচ্ছে এখানে যৌনব্যবসা ও ছিনতাই-এর এক বিচিত্র সহাবস্থান ঘটেছে। তিনজন ওস্তাদ-ওয়ানী, ধর্মা ও রাধা এই ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করে। এরা সকলেই এক সময় পুরুষ ছিল। এখন অঙ্গচ্ছেদন করে নিজেদের ‘নপুংসক’ বলে পরিচয় দিতে চায়।

এরা নিজেদের পুরনো নাম বলতে চায় না। ঠিক কবে থেকে পুরুষ যৌনকর্মীরা স্থায়ীভাবে এই অঞ্চলে বাস করছে সেকথা সঠিক করে কেউ বলতে পারল না। তবে অনেক চিন্তা করে ধর্মা আমাদের বলে, প্রায় দেড়শ বছর ধরে এ ব্যবসা চলে আসছে। আর নারী যৌনকর্মীদের ব্যবসার ইতিহাস আরও প্রাচীন। ১৬০০ খ্রীস্টাব্দ থেকে তারা এখানে ব্যবসা চালাচ্ছে।

এখানে যৌন পরিবর্তনকামীদের এই সমকামী যৌনব্যবসা অনেক সুগঠিত ও সুসংবদ্ধ। এরা দালালের ওপর নির্ভর করে না। পুরোপুরি স্বনির্ভর। পাশাপাশি নারী যৌনকর্মীদের দালালদের সঙ্গে এদের সুসম্পর্ক না থাকলেও বৈরিতা নেই। কোন কারণে গণ্ডগোল বাধলে এরা নিজেরাই তার সামাল দেয়। এলাকার মস্তানরা এদের বেশ সমীহ করে। শুক্রবার পেঠ ও বুধবার পেঠের বিভিন্ন অলিগলিতে দিনে কয়েকবার পুলিশ রেড করে। খদ্দেরকে তো হেনস্থা হতেই হয়, যৌনকর্মীরাও বাদ যায় না। খদ্দের সমেত যৌনকর্মীদের থানায় (পুলিশ চৌকি) তুলে আনা হয় মাঝেমধ্যে। কিন্তু ধামাধেড়া গলির চিত্রটি একটু স্বতন্ত্র। যৌন পরিবর্তনকামী পুরুষ যৌনকর্মীরা নিরুপদ্রবে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে কয়েকজন যৌনকর্মী স্বীকার করে যে, মাঝে-মধ্যে এদেরও পুলিশকে টাকা দিতে হয়। আসলে পুলিশ এদের ঘাঁটায় না। তবে এরা পুলিশকে মান্য করে।

খদ্দের : ধামধেড়া গলিতে যারা এইসব যৌনকর্মীদের কাছে যায় তাদের মধ্যে ৩৩ জনের ওপরে সমীক্ষা চালানো হয়। গলির মধ্যে, চায়ের দোকানে এবং ফাঁড়িতে বসে এইসব খদ্দেরের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। সমীক্ষিতের সঙ্গে কথা বলে যেসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে তা নীচের সারণিতে তুলে ধরা হল।

সারণি-১

সমীক্ষার কথা

সারণি-২

সমীক্ষার কথা

সারণি-৩

সমীক্ষার কথা

মোট ৩৩ জন খদ্দেরের মধ্যে ৯ জন বাস ও ট্রাক ড্রাইভার এবং তাদের খালাসি। বিভিন্ন কারখানার শ্রমিক ৮ জন এখানে খদ্দের হিসাবে আসে। ঠিকাদারদের অধীনে কাজ করে বিভিন্ন ধরণের শ্রমিক। এদের অর্থনৈতিক অবস্থা আশাব্যঞ্জক নয়। এরকম ৫ জন শ্রমিক এখানে আসে। বিভিন্ন দ্রব্য ফেরি করে বেড়ায় এমন হকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় এরা প্রায়ই পুরুষ যৌনকর্মীদের কাছে আসে। এমন ৩ জন হকারের সঙ্গে তাদের যৌনজীবন ও আচরণ নিয়ে কিছুক্ষণ কথা বলার সুযোগ আমরা পেয়েছিলাম। পুনা শহরে অটোরিক্সা এবং সিক্সসিটার চলে অনেক। শহরের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যাতায়াতের উল্লেখযোগ্য যানবাহন হল এইগুলি। অটো ও সিক্স সিটারের চালকরা প্রায়শই বুধবার ও শুক্রবার পেঠে আসে। এরকম তিনজন চালকের সঙ্গে শুক্রবার পুলিশ চৌকিতে কথা হয়েছিল। সমীক্ষিত ৩৩ জনের মধ্যে ৫ জন নিজেদের পেশার কথা জানাতে রাজি হয় নি। কথাবার্তা ও চালচলনের এরা যে বাকি খদ্দেরের থেকে আলাদা তা বেশ বোঝা যায়। পেশাগত পরিচয় জানাজানি হলে কর্মক্ষেত্রে অসুবিধা হতে পারে বলেই এরা নিজেদের প্রকাশ করেত চায় নি। সমীক্ষায় দেখা যায় বিবাহিত পুরুষরাই পুরুষ যৌনকর্মীদের কাছে বেশি যায়। এদের সংখ্যা ২৮। মাত্র ৫ জন অবিবাহিত পুরুষ এই সব যৌনকর্মীদের কাছে যাচ্ছে। ২০ থেকে ২৭ বছর বয়সি ৯ জন পুরুষের মধ্যে ৭ জন বিবাহিত এবং ২ জন অবিবাহিত। ২৮ থেকে ৪০ বছর বয়েসিদের ১১ জনের মধ্যে ১০ জন বিবাহিত ও ১ জন অবিবাহিত। চল্লিশোর্ধ অর্থাৎ ৪১ থেকে ৫৫ বছর বয়েসিদের ৭ জনের মধ্যে বিবাহিতের সংখ্যা বেশি— ৫ জন। আর ২ জন অবিবাহিত। ৫৬ বছরের বেশি বলে মনে হয়েছে এমন খদ্দেরের সংখ্যা ৬। এরা সকলেই বিবাহিত বলে পরিচয় দেয়।

বিভিন্ন বয়েসি এই ৩৩ জন খদ্দেরের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এরা প্রায়ই আসে গণিকালয়ে। এরা নিজেদের সমকামী বলে পরিচয় দিতে চায়নি। অবশ্য সমকামিতা সম্পর্কে এদের কোন সুস্পষ্ট ধারণা আছে বলেও মনে হয়নি। ৩৩ জন খদ্দেরের মধ্যে ২২ জন শুধুমাত্র পুরুষ যৌনকর্মীদের সঙ্গে মিলিত হতেই ধামধেড়া গলিতে আসে। এদের মধ্যে ২০ জন বিবাহিত এবং ২ জন অবিবাহিত। খুবই আশ্চর্যের বিষয় মোট ৩৩ জনের মধ্যে ১১ জন জানায় যে, বিভিন্ন সময় তারা মহিলা যৌনকর্মীদের কাছেও যায়। এই ১১ জনের মধ্যে ৮ জন বিবাহিত এবং ৩ জন অবিবাহিত।

‘কেন আপনারা পুরুষ যৌনকর্মীদের কাছে আসেন?’ ৩৩ জন খদ্দেরের প্রত্যেকেই এই প্রশ্ন করা হয়। সরাসরি কেউ-ই উত্তর দিতে চায়নি। ব্যাপারটা যে অন্যায় ও অত্যন্ত গর্হিত, তা হাবেভাবে প্রকাশ করেছে। কিন্তু কাজটা যে অন্যায় নয় বরং এক বিশেষ ধরণের যৌন আচরণ সে কথা আমরা কিছুটা বোঝাতে সক্ষম হই। খানিকটা বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের পর ওরা আমাদের কাছে (খুলে) বলতে থাকে এখানে আসার কারণগুলি। ১২ জন জানায়, বিভিন্ন সময় তারা বহু নারীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। কিন্তু নারী যৌনকর্মীর যৌনক্রীড়ায় নিষ্ক্রিয়তায় তারা আনন্দ পায়নি। ফলে এই সব ‘গাণ্ডু’ বা রূপান্তরকামীদের কাছে আসে। এরা নানা বিচিত্র উপায়ে এদের যৌনসুখ দিয়ে থাকে। ৮ জন খুবই স্পষ্টভাবে জানায় যৌনি মৈথুনে তাদের কোন আকর্ষণ নেই। আর এই কাজে নারী যৌনকর্মীরা নানাভাবে বাধা দেয়। তাই এরা এখানে আসে। ৬ জনের কথা, সবসময় সঙ্গমে পরিপূর্ণ তৃপ্তি আসে না। শরীর ম্যাসেজ বা মর্দন ও মুখমৈথুনের কারণে তারা এখানে আসে। ভ্রান্তধারণার বশবর্তী হয়ে ৩ জন এখানে আসে। এরা ভাবে যৌনব্যাধি সংক্রামিত হয় কেবলমাত্র যোনি সঙ্গমে। ৪ জন এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য করেনি।

১. ভারতের হিজড়ে সমাজ গ্রন্থের লেখকদ্বয়ের একটি সমীক্ষায় কলকাতা শহরে এজাতীয় কিছু ঠেকের সন্ধান পাওয়া গেছে। সন্ধের পর এইসব ঠেকে পুরুষেরা (MSM), মিলিত হয়। গান বাজনা করে এবং বিপরীত সাজে সজ্জিত হয়ে খদ্দেরের মনোরঞ্জন করে থাকে। পৃষ্ঠা ১১৩, ১১৪।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *