ছোটদের পারস্য উপন্যাস – সুবোধ চক্রবর্তী
কামিনী প্রকাশল
প্রকাশক : শ্রীশ্যামাপদ সরকার
তৃতীয় প্রকাশ : শ্রাবণ ১৩৬৯
প্রচ্ছদ : নারায়ণ দেবনাথ
মদ্রাকর : কালীমাতা প্রিন্টার্স
অসম্পূর্ণ বই
।। পূৰ্বাভাষ।।
কোন এক সময়ে কাশ্মীরে তওঙ্গন্নবী নামে প্রজাহিতৈষী এক সুলতান ছিলেন। সুলতান যেমন প্রজাদের পুত্রসম জ্ঞান করতেন, প্রজারাও তাঁকে ততোধিক ভক্তি-শ্রদ্ধা করত। রাজ্য শাসনের গুরুদায়িত্ব মাথায় থাকলেও তিনি কিন্তু ক্ষণিকের জন্যও ঈশ্বর-আরাধনা থেকে বিরত হননি ঈশ্বরের প্রতি ছিল তাঁর অকৃত্রিম নিষ্ঠা।
সুলতান তওঙ্গন্নবী’র একটি পুত্র ও একটি কন্যা ছিল। পুত্রের শুধু অগাধ পাণ্ডিত্যই ছিল না, পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় দখলও ছিল যথেষ্ট। সুলতানের কন্যার নাম ছিল ফরোখনাজ। রূপসী তন্বী যুবতী ফরোখনাজের মধ্যেও নানা গুণের সমন্বয় ঘটেছিল। তাঁর রূপের খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে বহুদেশ থেকে রাজা ও রাজপুত্রেরা সুলতানের প্রাসাদে আসতে লাগলেন। ফরোখনাজের রূপে মুগ্ধ হয়ে তাঁরা তাঁর পাণিগ্রহণের জন্য সুলতানের কাছে বিভিন্নভাবে উৎসাহ প্রকাশ করতে শুরু করলেন।
সুলতান কন্যা ফরোখনাজের অদ্ভুত একটি অভ্যাস ছিল। তিনি সপ্তাহে একদিন দু’শ অপরূপ রূপযৌবন সম্পন্না যুবতী ও দু’তিন শ’ বলিষ্ঠ দেহরক্ষী সঙ্গে নিয়ে গভীর বনে মৃগয়া করতে যেতেন। সুলতানের কন্যার এই মৃগয়া-গমনের দৃশ্য দেখার জন্য রাস্তার দু’ধারে উৎসাহী প্রজারা এমনভাবে ভীড় করে দাঁড়াত যে দেহরক্ষীদের সুতীক্ষ্ণ তরবারী ব্যবহার করে তবে সুলতান-কন্যার পথ করে দিতে হ’ত। মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী জেনেও প্রজারা পতঙ্গের মত সুলতান-কন্যার রূপের আগুনে ঝাঁপ দিতে বিন্দুমাত্র ইতস্ততঃ করত না। কে কার থেকে বেশী এগিয়ে রূপসী যুবতীর রূপ সৌন্দর্যকে প্রত্যক্ষ করে জীবন সার্থক করতে পারে এ নিয়ে রীতিমত প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হ’য়ে যেত। প্রজাদের এই নিষ্ঠুরভাবে মৃত্যুবরণে প্রজাহিতৈশী বৃদ্ধ সুলতান যারপর নাই ব্যথিত ও মর্মাহত হলেন। প্রজাদের এই অকালমৃত্যু বন্ধ করার জন্য তিনি মনস্হ করলেন কন্যাকে যে-কোন ভাবে মৃগয়া থেকে বিরত করবেন।
.
এক সকালে তিনি কন্যাকে নিজের ঘরে ডাকিয়ে প্রজাদের এই অহেতক মৃত্যু-প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বললেন—মা, তোমার রূপে পাগল হ’য়ে কত শত প্রজা উন্মাদের মত মৃত্যুবরণ করছে তা আমি স্বচক্ষেই প্রত্যক্ষ করছ। আমার ইচ্ছা তুমি মৃগয়ার খেয়াল বন্ধ করে প্রজাদের এই নিষ্ঠুর মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা কর।
পিতার কথায় সুলতান-কন্যার মনে বিষাদের কালো ছায়া নেমে এল! কিন্তু, নিরুপায়, সুলতানের আদেশ অলঙ্ঘনীয়। অনন্যোপায় হয়ে তিনি পিতাকে কথা দিলেন, নিজের খেয়াল চরিতার্থ করতে গিয়ে ভবিষ্যতে আর কোন দিনই প্রজাদের মৃত্যুর কারণ হবেন না।
সুলতান-কন্যা প্রজাদের মঙ্গলের কথা চিন্তা করে পিতাকে কথা দিলেও তিনি কিন্তু ব্যাপারটাকে মন থেকে মেনে নিতে পারলেন না। সারাটা দিন বিমর্ষ ভাবেই কাটালেন! রাত্রে ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখলেন তিনি অভ্যাসমত রূপসী যুবতী ও দেহরক্ষীদের সঙ্গে নিয়ে গভীর জঙ্গলে মৃগয়া করতে গেছেন। মৃত্যুভীত-সন্ত্রস্ত বন্য পশুরা লোকজন ও অস্ত্রশস্ত্র দেখে জীবন রক্ষার জন্য ছুটোছুটি-দাপাদাপি শুরু করে দিয়েছে। এমন সময় সুলতান-কন্যা মৃত্যুভয়ে ভীত একটি হরিণকে ঝোঁপের আড়াল দিয়ে ছুটে পালাতে দেখে তার পিছন নিলেন। ঘোড়া ছুটিয়ে হরিণটিকে তীরবিদ্ধ করতে এগিয়ে যেতে যেতে এক সময় দেখলেন ব্যাধের জালে হরিণটি আটকা পড়েছে। মৃত্যুভয়ে ভীত হরিণটি জাল থেকে মুক্তি পাবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। কিন্ত হায়! মুক্তি পাওয়া তো দূরের কথা সে বরং জালে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে পড়ল। হঠাৎ দেখেন উন্মত্ততাপ্রায় হরিণী তার স্বামীর উদ্ধারের জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে।
বিধাতার নিষ্ঠুর পরিহাস। হরিণী চেয়েছিল তার স্বামীকে উদ্ধার করতে কিন্তু ফল হল বিপরীত! স্বামীকে উদ্ধার করল বটে, কিন্তু নিজে জালে জড়িয়ে পড়ল। এদিকে তার স্বামী ছাড়া পাওয়া মাত্র প্রাণ-ভয়ে গভীরতম জঙ্গলের দিকে ঊর্দ্ধশ্বাসে ছুটতে লাগল, স্ত্রীর পরিণতির কথা চিন্তাও করল না। ঠিক এমনি সময়ে হঠাৎ সুলতান-কন্যার ঘুম ভেঙে গেল। ব্যাপারটা তার মনে গভীর রেখাপাত করল।
অন্ধকার ঘরে পালঙ্কের ওপর বসে সুলতান-কন্যা সেই স্বপ্নে দেখা হরিণ-হরিণীর ব্যাপারটার কথা ভেবে প্রতিজ্ঞা করলেন, তিনি ভুলেও পুরুষের কপট ভালবাসায় মুগ্ধ হয়ে নিজেকে কারো হাতে স’পে দেবেন না, কারো সঙ্গে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হ’য়ে নিজের সর্বনাশের পথ ডেকে আনবেন না।
এদিকে সুলতানের কন্যার অপরূপ রূপসৌন্দর্যে’র খ্যাতি দেশ-বিদেশ ছড়িয়ে পড়ল। আরব, বেলুচিস্হান, পারস্য, ইরান, তুরস্ক প্রভৃতি রাজ্যের সুলতান ও সুলতান-পুত্রেরা কাশ্মীরের সুলতান তওঙ্গন্নবী’র কাছে পাণি গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ ক’রে পত্র লিখতে লাগলেন। ব্যাপারটা নিয়ে তিনিও কম ভাবিত নন। কার হাতে কন্যাকে সমর্পণ করা যায় এ নিয়ে তিনি যখন আকাশ-পাতাল ভেবে অস্হির, ঠিক এমনি সময়ে শাহজাদী ফরোখনাজ সজল চোখে পিতার সামনে দাঁড়ালেন। বিয়ের অসম্মতির কথা ব্যক্ত করতেই সুলতান যেন আকাশ থেকে পড়লেন। শেষ পর্যন্ত অনন্যোপায় হ’য়ে কন্যাকে কথা দিলেন যে, তাঁর সম্মতি ছাড়া তিনি বিয়ের ব্যবস্হা করবেন না।
সুলতান হিরাতসাহ একদিন কাশ্মীরের সুলতানের কাছে বহু উপঢৌকন সহ দূত পাঠিয়ে নিজ পত্রের সঙ্গে ফরোখনাজের বিয়ের প্রস্তাব করলেন। হিরাতসাহের পত্র ফরোখনাজের যোগ্যতম পাত্র। এমন একটি লোভনীয় প্রস্তাব হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার সম্ভবনায় সুলতান খুবই মর্মাহত হলেন। কিন্তু ফরোখনাজ কিছুতেই বিয়েতে সম্মতি দিলেন না।
সুলতান হিরাতসাহের দূত আশাহত হয়ে স্বদেশে ফিরে গেলেন।
সুলতান তওঙ্গন্নবী কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে আর নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারলেন না। কন্যার এ-রকম মতিগতির পরিবর্তনের জন্য তিনি কন্যার প্রধানা ধাত্রী ফতেমাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন—তুমি তো তাকে নিজ-কন্যার মত পালন করেছ, তুমি কি বলতে পার, ফরোখনাজের বিয়ের ব্যাপারে অসম্মতির কারণ কি?
ধাত্রী সামান্য ইতস্ততের পর ব্যক্ত করল—জাঁহাপনা, আপনি তাকে মৃগয়ায় যেতে নিষেধ করলে সে খুবই মনঃক্ষুন্ন হয়। এক রাত্রে সে এক দুঃস্বপ্ন দেখে এ-রকম সিদ্ধান্ত নেয়। তার মনে বদ্ধমূল ধারণা জন্মায় পুরুষজাতি অতিশয় বিশ্বাসঘাতক। তার এ-ধারণা যে ভ্রান্ত এ-সম্বন্ধে অনেক কথাই তাকে বুঝিয়েছি। কিন্তু হায়! কোন যুক্তিতেই সে কান দিল না। বাধ্য হয়ে আমাকে তার এই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের চেষ্টা থেকে বিরত থাকতে হ’ল। সুলতান ফতেমাকে যার পর নাই পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন সে যেন যে-কোনভাবে শাহাজাদী ফরোখনাজকে তার ভ্রান্ত-প্রতিজ্ঞা থেকে সরিয়ে আনে। তিনি এও-উল্লেখ করলেন যে, সচ্চরিত্র পুরুষের প্রেমের কাহিনী শোনালে অবশ্যই তার ভাবান্তর ঘটবে এবং মনে বিয়ের ব্যাপারে আগ্রহ জাগবে। ধাত্রী ফতেমা সুলতানকে তাঁর নির্দেশ পালনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিদায় নিলেন।
এক রাত্রে শাহাজাদী ফরোখনাজ তার সখীদের সঙ্গে গল্প করছিলেন। ধাত্রী ফতেমা সে-গল্পের আসরের মধ্যমণি। এক সময় তিনি আগ্রহ প্রকাশ করে বললেন-–মা কতকগুলো অদ্ভুত গল্প আমার মনে জেগেছে। তুমি উৎসাহী হ’লে আমি গল্পগুলো শোনাতে পারি। ফরোখনাজ আগ্রহান্বিত হয়ে সামান্য এগিয়ে বসলেন। তার সখীদের মধ্যেও অত্যুগ্র আগ্রহ লক্ষ্য করে ফতেমা গল্পের ঝোলার মুখ খুললেন।



Leave a Reply