উজির ও তাঁর কন্যার কথা
বোগদাদের সুলতান আবুল কাসেমের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মহামূল্যবান উপহার সমূহ সঙ্গে করে প্রাসাদে ফিরে গেলেন। সুলতান বিদায় নেবার অব্যবহিতকাল পরেই আবুল কাসেমের এক বিপদ দেখা দিল। বসোরার উজিরকে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আবল কাসেম প্রতিদিন এক হাজার মুদ্রা উপহার দিতেন। উজির খুবই খল প্রকৃতি ছিলেন। কিভাবে আবুল কাসেমের যাবতীয় সম্পত্তি নিজ হস্তগত করতে পারবেন প্রতিনিয়ত এই চিন্তায় মগ্ন থাকতেন। এই কার্য সিদ্ধির জন্য যে-কোন কুকর্ম করতেও তিনি পিছপাও নয়।
এই উজিরের এক অপরূপা সুন্দরী কন্যা ছিল। নাম তার— বালকেশী। আবুল কাসেমের ধনসম্পদের মোহের বশে উজির কন্যাকে একদিন ডেকে বললেন–বৎসে তোমাকে একবারটি আবুল কাসেমের বাড়ি যেতে হবে। তোমার সবচেয়ে সুন্দর বেশভূষায় সজ্জিত হয়ে যাবে কিন্তু, তার সঙ্গে যে-কোন রকম ব্যবহার করে তাঁর ধনভাণ্ডারের সন্ধান নিয়ে আসবে।
পিতার কথায় বালকেশী স্তম্ভিত ও মনক্ষুণ্ণ হলেন। এরকম লজ্জাকর ও নিন্দনীয় কাজ করতে অসম্মতি প্রকাশ করে বললেন —আপনি পিতা হয়ে এ-রকম একটা গর্হিত পথে আমাকে ঠেলে দিচ্ছেন। তাছাড়া আপনার তো অজানা নয়, শাহজাদার সঙ্গে আমার প্রণয় সম্বন্ধে রয়েছে। কথাটা তাঁর কানে গেলে কি পরিনাম হবে একবার ভেবে দেখেছেন? আশা করি আমাকে এ রকম নিন্দনীয় কাজ করতে দ্বিতীয়বার আদেশ করবেন না।
কন্যার ঔদ্ধতে ক্রোধোন্মত্ত উজির গর্জে উঠলেন—তোমার উপদেশ নয়, কাজ চাই। আমি চাই তুমি আমার আদেশ পালন করতে আবুল কাসেমের বাড়ি রওনা হও।
বালকেশী বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন পিতা, আপনার মতিচ্ছন্নতা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে। বিচার-বদ্ধি লোপ না পেলে এ-রকম কথা কেউ উচ্চারণও করতে পারে না। উজির-কন্যা রাত্রির অন্ধকারে একাকী পরপরুষের গৃহে গেলে রাজ্যজুড়ে ঢি ঢি পড়ে যাবে যে! আমার ঐকান্তিক মিনতি, আবুল কাসেম, প্রতিদিন যে একহাজার স্বর্ণ মুদ্রা উপহার স্বরূপে পাঠাচ্ছেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকুন। সব চেয়ে বড় কথা হচ্ছে, আপনার তো কোন অভাব নেই।
—আমি তো বলেইছি, তোমার উপদেশ নয়, কাজ চাই। আমার আদেশ পালন না করলে মৃত্যুর জন্য তৈরী হও। তোমাকে টকেরো টুকরো করে রাজপুথে ফেলে রাখব, শেয়াল-কুকুরে ছিঁড়ে খাবে।
পিতার কঠিন কঠোর প্রতিজ্ঞা শেষ পর্যন্ত বালকেশী লঙ্ঘন করতে পারলে না। চোখের জল ফেলতে ফেলতে উত্তম বেশভূষায় সজ্জিত হয়ে পিতার সঙ্গে আবুল কাসেমের মনোরঞ্জনের জন্য যাত্রা করলেন।
গভীর রাত্রে এক অষ্টাদশী রূপসীকে দেখে দ্বাররক্ষী জিজ্ঞেস করল—তুমি কে? এত রাত্রে কোথায় যাচ্ছ?
বালকেশী ভয়ে ভয়ে জবাব দিলেন—তোমার প্রভুর সঙ্গে দেখা করতে চাই। একবারটি তাঁকে খবর দাও।
বালকেশীকে অপেক্ষা করতে বলে দ্বাররক্ষী প্রভুর কাছে সংবাদ পাঠাল। কিছুক্ষণের মধ্যেই এক পরিচারক এসে বালকেশীকে অন্দর মহলে আবুল কাসেমের কাছে নিয়ে গেল। আবুল কাসেম নৈশভোজ সেরে বিশ্রাম করছিলেন। তাঁকে দেখেই আবুল কাসেম যথোচিত অভ্যর্থনা করে বললেন—এত রাত্রে এই অধমের কাছে ছুটে এসেছ, কি ব্যাপার বল তো? কোথায় থাক, তোমার পরিচয়ই বা কি?
বালকেশী অপেক্ষাকৃত মৃদুস্বরে জবাব দিলেন—মহাশয়, আপনার খ্যাতি পৃথিবী জুড়ে। আপনার মত দানবীর পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। পরিচয় দেবার মত কিছুই আমার নেই। একজন ভাগ্যহীনা এইটুকুই বলতে পারি। আমার অনুরোধ এর বেশী জানতে চেয়ে আমাকে লজ্জা দেবেন না।
আবুল কাসেম কোনদিনই নারীর প্রতি আসক্ত ছিলেন না। কিন্তু আজ এই অষ্টাদশী রূপসী তাঁকে হঠাৎ কেমন যেন মোহমুগ্ধ করে তুললেন। মনের কোনে গভীর চাঞ্চল্য জেগে উঠল। রূপ-সৌন্দর্য মানষের মনকে এমন দুর্বল করে দেবার ক্ষমতা রাখে তিনি আগে কখনই তা বোঝেন নি। মোহমুগ্ধ আবুল কাসেম এক সময় সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বললেদ–আজ আমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন! তোমার আগমনে আমি ধন্য আমার পুরীও পুতপবিত্রতায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠল।
কথা বলতে বলতে আবুল কাসেম নিজেই উঠে গিয়ে মণিমত্তা-খচিত সুরাপাত্র নিয়ে এসে যুবতীকে সুরাপানে আপ্যায়িত করলেন। নিজের পাত্রটি এক নিঃশ্বাসে শূন্য করে আবেগজড়িত কণ্ঠে আবুল কাসেম উচ্চারণ করলেন–সুন্দরি, তোমার রূপলাবণ্য, সদ্যফোঁটা পদ্মের মত সুন্দর মুখচ্ছবি আমার গভীরে এক অনস্বাদিত আনন্দের জোয়ার বইয়ে দিচ্ছে। তোমার চরণকমলে অধমের এই নশ্বর দেহ সমর্পণ করলাম। কথা কটা কোন রকমে শেষ করে ধৈর্য হারা আবুল কাসেম বালকেশীকে নিয়ে শয্যায় গমন করলেন।
বালকেশীর দুচোখ বেয়ে জলে ধারা নেমে এল। তিনি বিছানায় শুয়েই ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগলেন।
আবুল কাসেম বিস্ময় প্রকাশ করে অপরাধীর সরে বললেন–সুন্দরি তোমার চোখে জল, তুমি কাঁদছো? তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কাজ করার সামান্যতম ইচ্ছাও আমার নেই। তোমার প্রতি কোন অবিচার-
বালকেশী দুহাতে মুখ থেকে কান্নাপ্লুত কণ্ঠে কেটে কেটে উচ্চারণ করলেন—মহাশয়, অপরাধ আপনার নয়, অপরাধ আমার অদৃষ্টের। অদৃষ্ট বিরূপ না হলে কোন নারী অন্ধকারে এমন করে ব্যাভিচারিণীর মত কোন পুরুষের কাছে আসে—কথা কটা বলতে বলতে বালকেশী কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
বালকেশীর কথাটা কানে যেতেই আবুল কাসেমের মন হঠাৎ কেমন বিষিয়ে উঠল। ব্যাথাহত হয়ে তিনি প্রশ্ন করলেন–সুন্দরী, তোমার মুখে একী কথা শুনছি, যদি তাই হয় তবে রাত্রির অন্ধকারে আমার কাছে আসার কারণ কি?
কান্নাপ্লুত কণ্ঠেই বালকেশী কোন রকমে জবাব দিলেন— মহাশয়, আমার পিতার নির্দেশেই এ-কাজ করতে বাধ্য হয়েছি! আপনার গুপ্তধন ভাণ্ডারের খবর নিয়ে যেতেই হবে, এই আমার পিতার আদেশ। আমি যদি ব্যর্থ হয়ে বাড়ি ফিরি পিতা আমার শিরশ্ছেদ করবেন। এখানে এসে আমার বিপদ দেখছি আরও কঠিন রূপ নিয়ে দেখা দিয়েছে। প্রাণের চেয়েও নারীর কাছে যার মূল্য শতগুণ বেশী, সেই সতীত্ব খোয়াতে হচ্ছে আমাকে! বহুদিন আগে থেকেই আলি নামে এক যুবকের সঙ্গে আমার বিয়ের কথা পাকা হয়ে রয়েছে। আমি মনে-প্রাণে তাকেই স্বামীত্বে বরণ করে নিয়েছি। আপনার সঙ্গে সহবাস তো দূরের কথা, প্রেমালাপ করলেও আমার মন কলঙ্কিত হবে বলেই আমার বিশ্বাস। সেই আশঙ্কাতেই আমার চোখে জলের ধারা নেমে আসছে।
মর্মাহত আবুল কাসেম নিজেকে সংযত করে বললেন— সুন্দরি, যদিও তোমার রূপ-যৌবন আমার মনে ভাবান্তর ঘটিয়েছে, তবুও যখন তুমি আমার কাছে নির্দ্বিধায় সব কিছু ব্যক্ত করলে, কথা দিচ্ছি, আমার দ্বারা তোমার কোনই অবমাননা হবে না। তুমি নিঃসংশয়ে তোমার প্রিয়তমের কাছে যেতে পার।
কিন্তু আমার পিতার সেই কঠোর নির্দেশ…
আবুল কাসেম মুচকি হেসে বললেন, তোমার এ-আশাও পূরণ করছি। চল আমার ধনভাণ্ডার দেখিয়ে আনছি। এই কথা বলে কালো কাপড় দিয়ে বালকেশীর চোখ দুটো খুব ভাল করে বেধে গুপ্তধন ভাণ্ডারে নিয়ে গেলেন। আবুল কাসেমের ধনভাণ্ডারে চোখ ধাঁধানো মহামূল্যবান মণিমুক্তো হীরা এবং জহরআদি স্বচক্ষে দেখে বালকেশী তো মূর্ছা যাবার উপক্রম। এত সম্পদ কারো ভাণ্ডারে থাকতে পারে তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারেন নি। সকাল হয়ে আসছে অনুমান করে আবুল কাসেম বালকেশীর চোখ দুটো পানরায় ভাল করে বেধে ধনভাণ্ডারের বাইরে নিয়ে এলেন।
অস্থিরচিত্ত উজির বালকেশীর প্রত্যাগমনের প্রতীক্ষায় সারাটা রাত্রি সদর দরজায় একরকম দাঁড়িয়ে কাটিয়েছেন। বালকেশীকে ফিরতে দেখে ব্যস্ত হয়ে ছুটে গিয়ে হাত ধরে সোজা অন্দরমহলে নিয়ে গেলেন। পিতার ব্যস্ততা ও অত্যুগ্রতা লক্ষ্য করে বালকেশী বললেন— পিতা, আবুল কাসেমের ধনভাণ্ডার আমি দেখে এসেছি। পৃথিবীর যাবতীয় ধনসম্পদ একত্রে পুঞ্জীভূত করলেও বুঝি তার ধনভাণ্ডারের সমান হবে না। তিনি আমৃত্যু অকাতরে দান করলেও এই কুবেরের ভাণ্ডার শূন্য হবে না।
উজির আগ্রহান্বিত হয়ে প্রশ্ন করলেন, তাই নাকি মা, হ্যাঁ, তারপর তারপর?
—ভদ্রলোক অগাধ ধনসম্পদের মালিক বটে। কিন্তু তার ধন সম্পদের চেয়ে চরিত্রই শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী।
বালকেশীর শেষ উক্তিটা উজিরের কানে গেছে বলে মনে হল না। আবুল কাসেমের অপরিমিত ধন-সম্পদের চিন্তা তাঁর দেহ-মনে গভীর রেখাপাত করল। অর্থগৃধ্ন উজিরের লোভাতুর মনের বহিঃ-প্রকাশ লক্ষিত হল চোখের বাদামী রং-এর তারা দুটোর মধ্য দিয়ে। অদ্ভুত একটা চাঞ্চল্য তার দেহ-মনে ভর করল, জেগে উঠল অন্তহীন উন্মাদনা।
