কৌলফ ও দেলেরার কথা
শাহাজাদী ও তাঁর সখীরা বৃদ্ধা ধাত্রীকে কৌলফ ও দেলেরার কথা কিছু বলার জন্য অনুরোধ করলে তিনি গল্প শুরু করলেন —দামাস্কা নগরে আবদুল্লা নামে এক বণিক ছিল। বাণিজ্য করে তিনি প্রভূত সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। কিন্তু, দুর্ভাগ্যবশতঃ তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। দীন-দুঃখীর প্রতি ছিল তাঁর অশেষ করুণা, দুহাতে দান, নানাস্থানে মসজিদ, সরাইখানা ও চিকিৎসালয় স্থাপনেও প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন। কোন কিছুতেই কিন্তু তাঁর মন ভরল না। শেষপর্যন্ত দেশ ভ্রমণের মধ্য দিয়ে আত্মতুষ্টি লাভের আশায় তল্পিতল্পা গুছিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। দেশ-বিদেশে ঘুরতে ঘুরতে এক হাকিমের কাছে হাজির হলেন। তিনি হাকিমকে বললেন–পুত্র-সন্তান লাভের আশায় জীবনে বহু দানধ্যান করেছি। কিছুতেই আমার মনস্কামনা পূর্ণ হল না। আমার পর্বত প্রমাণ অর্থের কি গতি হবে, আমার একমাত্র চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাকিম কয়েক মুহূর্তে বণিকের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে মুখে খুললেন—মহাশয়, আমার ওপর আস্থাবান হলে শীঘ্রই পুত্রলাভ করতে পারেন।
আবদুল্লা করজোড়ে মিনতি করলেন—বৈদ্যরাজ, অনুগ্রহ করে উপায় বলে দিন। হাকিম বললেন—মহাশয়, এমন একটি পূর্ণ যৌবনা নারী ক্রয় করুন, যে দীর্ঘকায় অথচ কৃশতনু, কটিদেশ খুবই ক্ষীণ। তাছাড়া এমন মিষ্টভাষিণী ও সদা হাস্যময়ী হবেন যাহাতে আপনাদের মধ্যে সর্বদা মনের মিল বজায় থাকে। চৌদ্দ দিন এক নাগাড়ে কৃষ্ণকায় মোষের মাংস সুরাসহ আহার করতে হবে। মনে রাখবেন এ-সময়ে আপনাকে বিষয় চিন্তা থেকে দূরে থাকতে হবে। এ-ভাবে সেই নারীর সঙ্গে সহবাসে আপনি অচিরেই সুলক্ষণ যুক্ত পুত্রলাভের সৌভাগ্য অর্জন করবেন।
হাকিমের নির্দেশ অনুযায়ী আবদুল্লা বহু খোঁজাখুজি করে এক নারী ক্রয় করলেন। যথা সময়ে এক সুদর্শন শিশু জন্মলাভ করল। আবদুল্লা বহু আকাঙ্ক্ষিত পুত্রের নাম রাখলেন কৌলফ।
পুত্রের বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আবদুল্লা তার শিক্ষার ব্যবস্থা করলেন। কৌলফ ছিলেন অনন্যসাধারণ মেধাবী ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধির ধারক। শীঘ্রই তিনি তুর্কী, লাতিন, পার্শি এবং গ্রীক ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করে পরিচিতদের অবাক করে দিলেন।
সর্ব বিদ্যায় পারদর্শী যুবক কৌলফকে আবদুল্লা এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করতে পারতেন না। শেষ বয়সের সন্তান বলেই হয়ত পিতার একেবারে চোখের মণি হয়ে পড়েছিলেন।
বৃদ্ধ বণিক আবদুল্লা মৃত্যুকালে পুত্রকে কাছে ডেকে যাবতীয় স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির সন্ধান ও হিতোপদেশাদি দিয়ে ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলেন।
পিতার মৃত্যুর পর আবদুল্লার অপরিমেয় অর্থ হাতে পেয়ে কৌলফ যেন একেবারে সাগরে পড়লেন। একে তো যৌবনের চপলতায় মন ভরপরে, তার ওপর কাঁচা পয়সা ছড়াছড়ি, কুসংসর্গ জুটতে দেরী হল না। সঙ্গ দোষে বিদ্বান ও বুদ্ধিমান কৌলফের চরিত্র কলুষিত হতে দেরী হল না।
মানুষকে পাপের ফল হাতে হাতে পেতে হয়। পিতার পর্বত প্রমাণ অর্থ অচিরেই নিঃশেষ করে পথের ভিখারী হয়ে পড়লেন।
কৌলফের হাতে ভিক্ষাপাত্র ওঠার সময় হয়ে এসেছে দেখে বন্ধুবান্ধবরা একে একে সরে পড়ল। পরিচিত মহলে ঘৃণার পাত্র হয়ে তিনি দামাস্কা নগর ত্যাগ করে কারাকোরাম নগরে গিয়ে উপস্থিত হলেন, সরাইখানায় আশ্রয় নিলেন। সামান্য কিছু অর্থ যা অবশিষ্ট ছিল তা দিয়ে কোনরকমে পেটের জ্বালা নেভাতে লাগলেন। পরদিন পথে পথে ঘুরে রাত্রে সরাইখানায় ফিরে আসতেন!
পথে ঘুরতে ঘুরতে একদিন শুনলেন দুজন করদ রাজা বিদ্রোহী হয়েছেন। তাই কারাকোরামের মহারাজ কাবুল খাঁ সৈন্য সংগ্রহ করছেন বিদ্রোহীদের দমন করার জন্য।
খবর পেয়ে তিনি মহারাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। সুদর্শন বলিষ্ঠ ও যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী কৌলফকে সেনাপতি নিযুক্ত করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠালেন। কৌলফের অসাধারণ যুদ্ধকৌশলের কাছে দাঁড়াতে না পেরে করদ রাজারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলেন। মহারাজ বীরত্বে মুগ্ধ হলেন। যুবরাজ মির্জান তাঁকে বন্ধুরূপে বরণ করে নিলেন।
কিছুদিন পর সম্রাট কাবুল খাঁর মৃত্যু হয়। যুবরাজ মির্জান সিংহাসনে বসে কৌলফকে প্রধান উজিরের পদে নিযুক্ত করেন।
একদিন কৌলফ রাজপথ দিয়ে যাবার সময় দেখলেন ছয়টি স্ত্রীলোক অবগুন্ঠনে আবৃত অবস্থায় পথের ধার দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে এক অতিবৃদ্ধা লাঠি ভর দিয়ে আগে আগে চলেছেন। কৌলফ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন—তুমি কেগো, এ-সব নারী বিক্রী করবে কি?
বৃদ্ধা কৌলফের পোষাক-পরিচ্ছদের দিকে এক পলক তাকিয়ে নিয়ে বলল—হ্যাঁ, বিক্রী করব বটে, তবে এদের কোনটি আপনার কেনায় যদি ইচ্ছে হয় সঙ্গে আসতে পারেন। যাকে আপনি প্রণয়ের উপযুক্তা বিবেচনা করবেন, উচিত মূল্য দিয়ে কিনে নিতে পারবেন। কৌলফ বৃদ্ধাকে অননুসরণ করলেন।
বৃদ্ধা কৌলফকে নিয়ে এক উপাসনা-গৃহের দ্বারে গিয়ে কৌলফকে দাঁড় করিয়ে ভেতরে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে স্ত্রীলোকের পরিধেয় বহুমূল্য বস্ত্রাদিসহ ফিরে এসে বললেন-এখানে পুরুষের প্রবেশাধিকার নেই, আপনাকে নারীবেশে অন্দরমহলে যেতে হবে। শীঘ্র এই বস্ত্রাদি পরে তৈরী হয়ে নিন।
কৌলফ বৃদ্ধার কথায় সম্মত হয়ে পুরুষের বেশ পরিত্যাগ করে নারী-বেশ ধারণ করে বৃদ্ধার পিছন পিছন অন্দরমহলে প্রবেশ করলেন। সুন্দর পরিপাটি করে বাড়িটি সাজানো। বিস্ময়বিস্ফারিত চোখে সবকিছু দেখতে দেখতে কৌলফ একের পর এক ঘর অতিক্রম করে এগিয়ে চললেন। এমন সময় এক রূপসী যুবতী হাসতে হাসতে এগিয়ে এসে তাঁর হাত ধরে একটি ঘরে নিয়ে গেলেন। প্রথম দর্শনেই কৌলফ তাকে মনপ্রাণ সঁপে দিয়েছেন। যুবতী তাঁকে বহু মূল্যবান এক সিংহাসনে বসাল। এবার আর এক পরমা সুন্দরী এসে সোনার পাত্র থেকে জল ঢেলে ঢেলে অতি-যত্নে তাঁর পা দুটো ধুইয়ে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আরও অত্যাশ্চর্য ঘটনা ঘটল। কুড়িজন যুবতী পরিবেষ্ঠিতা হয়ে এক অপরূপা ঘরে ঢুকলেন। ব্যাপার স্যাপার দেখে কৌলফ সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললেন। যুবতীরা সেবাশুশ্রূষা করে তাঁকে সুস্থ করে তুললেন। সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে কৌলফ সসঙ্কোচে বললেন, —হঠাৎ রূপের হাটে নিজেকে ঠিক রাখতে পারিনি। কাজেই সংজ্ঞা হারিয়ে বসেছিলাম।
যুবতী কৌলফের হাত ধরে পাশের ঘরে নিয়ে গেলেন। কৌলফ হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে যুবতীর পায়ে পড়ে বললেন,—প্রিয়তমে তোমার রূপ আমাকে পাগল করে তুলছে। তোমাকে ছেড়ে জীবন ধারণ কল্পনাও করতে পারি না। কথা দাও, আমার জীবন-সঙ্গিনী হবে।
কৌলফের কথায় যুবতী ক্রোধ প্রকাশ করে বললেন—মূর্খ, তোর এত স্পর্ধা! তুই কুলকামিনীর প্রেম প্রার্থনা করছিস!
বৃদ্ধা ঘরে ঢুকে বললেন—তুমি আমাকে ভুল বুঝে অন্যায় করেছ। যদি আমি দাসী-ব্যবসায়ী-ই হতাম, তোমাকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে আসতাম না। তুমি যার প্রেম-প্রার্থনা করলে তিনি প্রধান রাজ সচিবের কন্যা।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সেই রূপসী যুবতী বেশ পরিবর্তন করে এসে বললেন—আপনাকে এবারের মত ক্ষমা করলাম। আপনার পরিচয় জানতে ইচ্ছা করি।
কৌলফ পরিচয় দিতে গিয়ে ভয়ে ভয়ে বললেন—সুন্দরী, আমি এখানকার প্রধান সেনাপতি। নাম কৌলফ।
যুবতী ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা টেনে বললে—মহাশয়! আমি বহু আগেই আপনার নাম ও সুখ্যাতির বহু প্রশংসা শুনেছি, আজ আপনাকে আমাদের বাড়িতে দেখে খুবই আনন্দিত হলাম। আপনার সান্নিধ্য আমাদের আনন্দ বর্ধন করুক।
কৌলফকে নাচ-গানের মধ্য দিয়ে সম্বর্ধনা করা হলে যুবতী মনে সাহস সঞ্চার করে এক সময় বললেন—আপনি যখন রাজার প্রধান প্রিয়জন, একটি কথা বলে আমার কৌতূহল নিবৃত্ত করুন। বলল, —রাজঅন্তঃপরে কোন নারী রূপে-গুণে শ্রেষ্ঠা ও রাজা কাকে সর্বাধিক ভালবাসেন।
কৌলফ হেসে জবাব দিলেন—গোলেন্দা নামে এক অনন্যাসাধারণ যুবতীই শ্রেষ্ঠা। মহারাজ তাকে সর্বাধিক ভালবাসেন। এই মুহূর্তে আমার চোখে কিন্তু তুমিই সবাধিক সুন্দরী বলে বিবেচিত। তোমার কাছে তাঁর রূপ যৌবন ম্লান হয়ে গেছে।
বৈরক নামে এক উজিরের কন্যা রূপসৌন্দর্যের আকর এই যুবতী। নাম তাঁর দেলেরা। রাজকার্যোপলক্ষে বৈরককে কোজণ্ডি দেশেই বছরের বেশীরভাগ সময় থাকতে হয়। যুবতী সখীদের নিয়ে এখানে আনন্দস্ফূর্তির মধ্য দিয়ে কালযাপন করেন। মাঝে মধ্যে পুরুষদেরও এনে আনন্দ বৃদ্ধি করে থাকেন। তবে নবাগত পুরুষকে কোনরকম অসদাচারণ করতে দেখলে কঠোর শাস্তি দিতেও ইতস্তঃত করেন না। যুবতী কৌলফের সঙ্গে প্রেমালাপে মত্ত হলেন।
কৌলফ রাত্রির শেষার্ধে সবিনয়ে নিবেদন করলেন–সুন্দরী, তোমার সাহচর্যে আজ আমার জীবন ধন্য হল। রাত্রি প্রায় শেষ। আজকের মত আমাকে বিদায় দাও। অনুমতি পেলে আগামীকালও এসে আমোদ-প্রমোদ করে জীবন ধন্য করে যেতে উৎসকে।
যুবতী স্বর্ণমুদ্রাপর্ণে একটি পাত্র তাঁর সামনে তুলে ধরে বললেন—কাল যদি সত্য সত্যই এখানে আসতে চাও, তবে এই স্বর্ণমুদ্রাগুলো গ্রহণ কর।
যুবতীর নির্দেশে প্রহরী কৌলফকে প্রাসাদের গোপন দরজা দিয়ে সদর রাস্তায় পৌঁছে দিয়ে এল।
সকালে রাজসভায় উপস্থিত হলে মহারাজ মির্জান জিজ্ঞেস করলেন—কৌলফ, কাল রাত্রে তুমি কোথায় ছিলে, খোঁজ করে পাই নি যে?
রাজার আগ্রহে কৌলফ দেলেরার বৃত্তান্ত নিবেদন করলেন। কৌতূহলী রাজা আগ্রহান্বিত হয়ে বললেন—কৌলফ, তোমার কথায় মনে হচ্ছে, ওই যুবতী বিশ্বের সুন্দরীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠা। এক বারটি তার রূপ-সৌন্দর্য স্বচক্ষে দেখে জীবন সার্থক করতে চাই।
কৌলফ বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন—মহারাজ, এ কি করে সম্ভব? আপনি রাজাধিরাজ হয়ে—
কৌলফের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে রাজা বললেন–তার জন্য ভেবো না, আমি ছদ্মবেশ ধারণ করে যাব। তুমি আমাকে তোমার পরিচারক বলে পরিচয় দেবে।
উপায়ান্তর না দেখে কৌলফ রাজাকে চাকরের ছদ্মবেশে সাজিয়ে রাত্রির অন্ধকারে রাজপুথের পূর্ব-নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে বৃদ্ধার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।
কৌলফকে দেখে বৃদ্ধা বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন—কী ব্যাপার আজ আবার একজন সঙ্গী নিয়ে এসেছ যে?
কৌলফ মুখে হাসির রেখা ফাটিয়ে বললেন—আমার পরিচারক। খুবই সুগায়ক বলে সঙ্গে করে নিয়ে এলাম। আপনার অনুমতি পেলে সঙ্গে নিয়ে যাই।
বৃদ্ধা কোন প্রতিবাদ না করে কৌলফ ও ছদ্মবেশী রাজাকে নারী-বেশে সজ্জিত করে গোপন দরজা দিয়ে প্রাসাদে নিয়ে গেলেন। সঙ্গের দ্বিতীয় ব্যক্তির দিকে বিস্ময়-বিস্ফারিত চোখে সেই সুন্দরী তাকিয়ে থাকলেন। কৌলফ হেসে বললেন—খুবই ভাল গান গায়, সঙ্গে নিয়ে এসেছি। তাছাড়া লোকটা আমারই পরিচারক।
দেলেরা বললেন-ভালই করেছ। এখানেই থাক। হাসাহাসি কাজকর্ম করেও সাহায্য করতে পারবে।
কৌলফ একগাল হেসে বললেন—ঠিক আছে আমার এই যুবক দাসটিকে তোমায় প্রদান করছি।
কৌলফ ও দেলেরার কথোপকথন শুনে পরিচারকবেশী রাজা বললেন—দেবী, আজ থেকে নিজেকে চিরদিনের দাস বলে মনে করছি। আমৃত্যু আপনার সেবায় নিযুক্ত থাকব।
দেলেরা বললেন—আজ থেকে একে দাস বলে গ্রহণ করলেও এখানে রাখা সমীচীন হবে না। লোকনিন্দার ভয় রয়েছে। তুমি যখন আসবে, সঙ্গে করে নিয়ে আসবে।
পরিচারকবেশী রাজা মহা উৎসাহে সবাইকে খাদ্য ও পানীয় বিতরণ করতে লাগলেন। যুবতী পরিচারককেও একসঙ্গে বসে আহারের অনুমতি দিলেন। তিনজনে মহা উল্লাসের সঙ্গে পানাহার করলেন।
দেলেরা কৌলফের দিকে সুরাপূর্ণ একটি পাত্র এগিয়ে দিয়ে একগাল হাসি ছড়িয়ে দিয়ে বললেন–প্রিয়তম, এই সুরাটকু পান করে রাজমহিষী গোলেন্দামের প্রতি তুমি যে মনে মনে গোপন আকর্ষণ অনুভব কর, তা পূর্ণ কর।
কৌলফ বিস্ময় প্রকাশ করে ও রীতিমত অপ্রস্তুত হয়ে বললেন –একী কথা প্রিয়তমা, তিনি রাজ-মহিষী, আমি তাঁর দাসান, দাস।
দেলেরা বিদ্রূপাত্মক হাসি হেসে বললেন-–কি ব্যাপার, আজ সাধুতার পরিচয় দিচ্ছ যে বড়? কাল তো সে-রকমই বললে। তুমি তুমি আমার সঙ্গে যেমন প্রেমালাপ করেছ, তাঁর সঙ্গে সে-রকম করনি?
—কই এমন কথা তো ভুলেও উচ্চারণ করিনি।
—ভুলে গেলে চলবে কেন? কাল রাত্রে এ-রকমই বলেছিলে। এখানে তো আর কেউ নেই, কেউ রাজার কানে গিয়ে এ-কথা তুলবে না। তারপর ভৃত্যকে বললেন–তোমার প্রভুকে জিজ্ঞেস কর, কেন কথাটা গোপন করছে?
ভৃত্যবেশী রাজা বললেন—মহাশয়, সত্য গোপনের কারণ কি? রাজ-মহিষীর প্রেমাসক্ত কি করে হয়েছেন? কিভাবেই বা রাজার কাছে গোপন রেখেছেন বিস্তারিত বলুন।
কৌলফ রাজার কথায় একেবারে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। দেলেরা এক সময় বীণা যন্ত্র নিয়ে গান ধরলেন। তাঁর সুরেলা কণ্ঠের গান শুনে রাজা এমনই মোহিত হয়ে গেলেন যে, পার্থিব জগতের অস্তিত্ব ভুলে গিয়ে সোল্লাসে বলে উঠলেন—প্রিয়তমে, আমার সভায় যে সব কৃতি গায়ক রয়েছেন, তাদের মধ্যে গায়ক মেজিন সর্বশ্রেষ্ঠ, আজ দেখছি তোমার গলার কাছে তিনি শিশু মাত্র!
ব্যাপারটা দেলেরার বুঝতে দেরী হল না। দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে সখীদের কাছে কপাল চাপড়ে বললেন—সখিগণ, সর্বনাশ হয়েছে! কৌলফ রাজাকে সাজিয়ে এনেছে। এখন কি করা কর্তব্য, বুদ্ধি দাও।
সখীদের পরামর্শে দেলেরা ঘরে ঢুকে ম্লান মুখে করজোড়ে রাজার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন—মহারাজ, অধীনের অপরাধ ক্ষমা করুন।
রাজা তাঁকে অভয় দিয়ে তাঁর পরিচয় জানতে চাইলে দেলেরা নিজের পরিচয় দিলেন। ভোর হওয়ার আগেই রাজা কৌলফকে নিয়ে প্রাসাদে গেলেন।
রাজা রাজ-মহিষী ও কৌলফের কথা যুবতীর মুখে যা শুনেছিলেন তাতে অবিশ্বাসী হওয়ার জন্য কৌলফকে দেশান্তরে পাঠিয়ে দিলেন। নির্বাসন-দণ্ড দিলেন।
কৌলফ রাজার ভুলের মাশুল দিতে গিয়ে সমরখন্দ নগরে চলে গেলেন। সেখানে কপর্দকশূন্যে অবস্থায় এক উপাসনা-মন্দিরে আশ্রয় নিলেন। একদিন সেখানে মজাফর নামে এক সাধুর আবির্ভাব ঘটল। সাধুর আগ্রহে কৌলফ নিজের পরিচয় দিলেন। কৌলফের দুর্দশায় সাধুর দয়া হল। তাঁকে নিজের কুটিরে এনে সামান্য অর্থ দিয়ে বিদায় করলেন। কিছুদিন পর আবার একদিন উপাসনা-মন্দির থেকে কৌলফকে ডেকে আরও কিছু অর্থ দিলেন। এমনি করে যখন কৌলফ দুঃখের দিনগুলো কাটাচ্ছিলেন তখন দানেসনন্দ নামে এক লোকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হল। তিনি কৌলফকে বললেন—মজাফর সাধু কেন ডেকে ডেকে ধনরত্ন দিচ্ছেন, হয়ত তোমার জানা নেই। তাঁর পুত্র তাহেরকে বিয়ে দিয়েছিলেন। মনের মিল না হওয়ায় তাহের স্ত্রীকে পরিত্যাগ করে। ক্রোধের উপশম হলে স্ত্রীকে নতুন করে পাবার জন্য খুবই ব্যাকুল হয়ে পড়ে। কিন্তু শাস্ত্রের বিধান হচ্ছে, পরিত্যক্ত স্ত্রীকে কেউ বিয়ে করে পুনরায় পরিত্যাগ না করলে তাকে তাহের গ্রহণ করতে পারবে না। মজাফরের ইচ্ছা তুমি কাল সকালে তাকে বিয়ে করে পুনরায় পরিত্যাগ করে তাহেরের রাস্তা পরিষ্কার করে দাও। সামান্য একটা কাজে যদি মজাফরের উপকার হয়, তোমার অসুবিধার কি থাকতে পারে, তাই না? তবে হ্যাঁ, বিয়ের সময় তোমাকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে, ব্যাপারটা কারো কাছে প্রকাশ করবে না।
কৌলফ তাঁর প্রস্তাবে সম্মত হলেন।
বিয়ের সময় ভার্যার মুখে গলা পর্যন্ত কাপড় টেনে ঢেকে দেওয়া ছিল পাছে রূপ-সৌন্দর্যে মজে গিয়ে কৌলফ স্ত্রীকে পরিত্যাগ করতে অসম্মত হয়।
বাসর ঘরে কৌলফ দীর্ঘশ্বাস ফলে বললেন–সুন্দরী কী দুর্ভাগ্য এমন অমূল্য রত্ন হাতে পেয়েও কাল হারাতে হবে।
কৌলফের সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী ঘোমটার আড়াল থেকে আঁতকে উঠে বললেন—কে? কে তুমি। এমন পরিচিত কন্ঠস্বর? তুমি কি সেই কৌলফ?—আমি সেই ভাগ্যবিড়ম্বিতা দেলেরা। শুনেছি আমার কথায় মহারাজ তোমাকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। পাপিষ্ঠাকে ক্ষমা কর। আমার পিতা কার্যোপলক্ষে এখানে প্রায়ই আসতেন। মজাফরের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়! তাঁর পুত্রের সঙ্গে আমার বিয়ে দেন। বিয়ের পর স্বামীর কাছ থেকে মুহূর্তের জন্যও সুখ পাইনি। চোখের জল ফেলে তোমার কথাই অষ্টক্ষণ ভাবতাম। ঈশ্বরের কৃপায় দেখা পেলাম।
কথাবার্তার মধ্য দিয়ে কখন যে ভোর হয়েছে নবদম্পতি টেরই পান নি। মজাফর দরজায় করাঘাত করতে লাগলেন। বিষণ্ণ মনে কৌলফ দরজা খুলে দিলেন। উপায় নেই, প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, স্ত্রীকে পরিত্যাগ করতেই হবে। কৌলফ উপায়ান্তর না দেখে দরজা খুলে দিলেন।
মজাফর কৌলফের হাতে পঞ্চাশটি স্বর্ণ মুদ্রা গুঁজে দিয়ে বললেন—প্রতিশ্রুতি রক্ষা কর, পত্নী ত্যাগ করে অনত্র চলে যাও।
কৌলফ মদ্রাগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ক্রোধ প্রকাশ করে বললেন–এ কি অন্যায় কথা বলছেন। ন্যায়পরায়ণ রাজা আসরেফের প্রজাগণ এমন প্রবঞ্চক, আগে জানতাম না তো! আমাকে বিদেশী পেয়েই হয়ত এমন প্রবঞ্চনা করতে সাহস পাচ্ছেন। রাজার কাছে এ-সব বললে সমুচিত শাস্তি পেতে হবে জেনে রাখবেন।
মজাফর বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন—কী ব্যাপার! প্রতিশ্রুতির কথা অস্বীকার করতে চাচ্ছ? তুমি আরও অর্থ আশা করছ?
—মহাশয়, অর্থের লিপ্সা আমার নেই। এক কোটি স্বর্ণ-মদ্রা পেলেও আমি ধর্ম পত্নী ত্যাগ করব না। দরকার হয় কাজীর নিকট চলুন, উপযুক্ত শাস্তি পেয়ে যাবেন।
মজাফর, তাহের এবং দাসেননন্দ কৌলফকে প্রথমে রক্তচক্ষু, পরে পরে অনেক ভাবে অনুনয় বিনয় করলেন। কিছুতেই তিনি এত-টুকুও টললেন না। কাজী বিচার করে শেষ পর্যন্ত বলতে বাধ্য হলেন—ভিক্ষুক কোথাকার, যদি প্রাণের মায়া থাকে, এক্ষণি পত্নী ত্যাগ করে এখান থেকে বিদায় হ, নইলে তোকে দু’টুকরো করে দেব।
কাজীর কথাতেও কৌলফ এতটুকু নরম হলেন না। ক্রুদ্ধ কাজী অননুচরদের বেত্রাঘাতের নির্দেশ দিলেন। একশত বেত্রাঘাতেও তার মতের পরিবর্তন হল না। কাজী পরের দিন কঠিন শাস্তির ভয় দেখালেন।
দেলেরা কাজীর কথায় খুবই মুষড়ে পড়লেন। ভাবলেন, যদি কৌলফ শাস্তির ভয়ে তাঁকে পরিত্যাগ করে চলে যান।
কৌলফ তাঁর মনের ভাব বুঝতে পেরে বললেন—কাজীর শাস্তি যত কঠোরই হোক, তোমাকে ছেড়ে যাব না, কথা দিচ্ছি।
দেলেরা চোখের জল মুছে বললেন—প্রিয়তম, তোমার কথায় মনে হচ্ছে আমাদের বিচ্ছেদ-বেদনা সইতে হবে না। একটা কথা, কাল কাজীকে তোমার পরিচয় দিয়ে বলবে, আমি কোজণ্ডি নগরের বিখ্যাত মামুদ সওদাগরের পুত্র। পরিচয় পেলে আশাকরি কাজী অবশ্যই তোমাকে মুক্তি দেবেন।
পরদিন বিচারকালে কৌলফ কাজীকে লক্ষ্য করে বললেন— মহাশয়, আপনি আমাকে যতটা ভিখারী ভাবছেন, তা কিন্তু নয়। আমি কোজণ্ডি নগরের মামুদ সওদাগরের পুত্র। আমার পিতার বিত্তের তুলনায় এই মজাফর সামান্য ভিক্ষুক মাত্র। পিতা আমার দূরাবস্থার কথা শুনলে শত শত উটের পিঠে প্রচুর স্বর্ণ-মুদ্রা পাঠিয়ে দেবেন। দেশত্যাগ করে আসার সময়ে আমার সহস্রাধিক স্বর্ণ-মুদ্রা দস্যুরা ছিনিয়ে নেয়। তাই মঠে আশ্রয় নিতে হয়েছে। পিতাকে সংবাদ দিন, হাতে হাতে প্রমাণ পাবেন।
কাজী মহতেকাল নীরবে কাটিয়ে বললেন—তাই তো, এমন ভাগ্যবানের পুত্রকে তো আর পত্নী পরিত্যাগ করতে বলা যায় না।
তাহের কাজির আকস্মিক ভাবান্তরে মুষড়ে পড়ে বললেন—এ কী করছেন মশায়! একজনের মখের কথাই বিশ্বাস করছেন?
কাজী মুচকী হেসে জবাব দিলেন—ঠিক আছে মিথ্যা প্রমাণ করতে পারলে ও কঠোর শাস্তি পাবে এবং পত্নী পরিত্যাগ করতে বাধ্য হবে।
তাহের তাতেই আস্বস্ত হতে বাধ্য হয়ে বললেন—তবে এক কাজ করুন যত দিন সত্যাসত্য প্রমাণ না হয়, ওদের পৃথক থাকার ব্যবস্থা করুন।
কাজী অনুরূপ হেসেই জবাব দিলেন-তা কি করে হয়? মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত পতি ও পত্নীকে পৃথক করা বিচার সঙ্গত নয়। ও মামুদের পুত্র হলে পত্নীকে নিয়ে যেখানে খুশী যেতে পারবে, অন্যথায় প্রাণদণ্ড।
বিচার শেষে কৌলফ দেলেরার কাছে গিয়ে সব বৃত্তান্ত বর্ণনা করলেন। দেলেরা অভয় দিতে গিয়ে বললেন—ভয়ের কি আছে, দূতে খবর নিয়ে আসার আগেই আমরা বোখরা নগরে পালিয়ে যাব।
কৌলফ আতঙ্কিত হয়ে বললেন—সে কী করে সম্ভব! মজাফরের লোকেরা কড়া পাহারা দিচ্ছে।
—কাজীর কাছে গিয়ে বল, শত্রুর গৃহে বাস করতে নিরাপদ বোধ করছি না। বিচার চলাকালীন আমাদের অন্যত্র থাকার অনুমতি দিলে বাধিত হব।
কাজীর কাছে প্রসঙ্গটা উত্থাপন করতেই তাহের রীতিমত হায় হায় করে উঠল। তীরবিদ্ধ বাঘের মত গর্জে উঠে বললেন নরাধম, কোন সাহসে এ-কথা উচ্চারণ করলি। জানিস দেলেরা আমাকে প্রাণাধিক ভালবাসে? দুর্ভোগ্যবশতঃ আজ তোর মত পাপিষ্ঠের হাতে পড়েছে।
কৌলফ শান্তস্বরেই জবাব দিল–এত উত্তেজিত হবার কি আছে? কাজির কাছে দেলেরাকে হাজির করলেই সমস্যা মিটে যাবে। তার মুখ থেকেই শোনা যাক, দেলেরা কাকে বেশী ভালবাসে, কাকেই বা পতিরূপে পেতে আগ্রহী।
