আবুল কাসেমের অতীত কথা

আবুল কাসেমের অতীত কথা

সুলতান আবুল কাসেমের অতীত কথা শোনার আগ্রহ প্রকাশ করলে আবুল কাসেম বললেন–মহাশয়, আমার পূর্বপুরুষরা মিশর দেশে বাস করতেন। সে দেশে কায়রো নামে একটি নগর রয়েছে তা অবশ্যই আপনার অজানা নয়। আমার পিতাও সেই কায়রো নগরেই বাস করতেন। তাঁর নাম ছিল আবদুল আজিজ। তিনি ছিলেন রত্ন-ব্যবসায়ী। ব্যবসা ছিল খুবই রমরমা। দু’হাতে পয়সা রোজগার করেছেন। কায়রোর রাজা ছিলেন দুর্দান্ত প্রকৃতির লোক। যদি কোন ক্রমে শুনতে পান কোন প্রজা বিপুল সম্পত্তির অধিকারী তবে বলপূর্বক তা ছিনিয়ে নিতেন। এ রকম আশঙ্কায় আমার পিতা কায়রো ত্যাগ করে বসোরায় এসে আশ্রয় নেন। এখানে এলে এক বণিক-কন্যাকে বিয়ে করে ঘর সংসার পাতেন। সেই বণিক-কন্যার গর্ভেই আমি জন্মলাভ করি। পিতার বৃদ্ধ বয়সের সন্তান বলে পিতা আমাকে খুবই ভালবাসতেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ মাত্র পনের বছর বয়সে আমার পিতৃবিয়োগ ঘটে। পিতার আকস্মিক শোক সইতে না পেরে সামান্য রোগভোগের পর মাতাও ইহলোক ত্যাগ করেন।

পিতা-মাতার অবর্তমানে আমি হলাম নিতান্তই অসহায়। স্বাভাবিক ভাবেই মোসাহেবের দল চারদিক থেকে এসে ভিড় করতে লাগল আমার নবযৌবনের উপযোগী নানা রকম ইন্ধন যোগাতেও লাগল। আমার সর্বস্ব খুইয়ে অচিরেই আমি পথের ভিখারী হয়ে পড়লাম। লজ্জায়, ঘৃণায় ও অনুশোচনায় আমি অহর্নিশি দগ্ধে মরতে লাগলাম। টাকাকড়ির সঙ্গে আমার হিতৈষী মোসাহেব বন্ধুরাও গা ঢাকা দিল। অনন্যোপায় হয়ে ভাবলাম, মৃত্যুই আমার একমাত্র অবলম্বন, দ্বিতীয় কোন পথ আমার জন্য খোলা নেই। পরমুহূর্তেই ভাবলাম মৃত্যু চিন্তা তো কাপুরুষের কাজ। আমাকে উন্নতি করতেই হবে আবার নতুন করে আমাকে প্রতিষ্ঠা অর্জন করতেই হবে। এ রকম চিন্তা করে আমি বসোরা ত্যাগ করি।

দেশত্যাগী হয়ে আমি অর্থের উদ্দেশ্যে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। ভাবলাম, শুনেছি পিতা নাকি কায়রো শহর থেকে প্রভুত অর্থ উপার্জন করেছিলেন। যাই না, সেখানে গিয়ে দেখি, আমিও যদি অর্থের সন্ধান পাই। অমানুষিক পরিশ্রম করে এক সময় কায়রো নগরে পদার্পণ করলাম। সেখানে পৌঁছেই মনটা বিষিয়ে উঠল-ভাবলাম এই নগরেই আমার পূর্বপুরুষরা ব্যবসা করে প্রভুত বিত্ত উপার্জন করেছিলেন। আর আজ আমি ভিখারীর মত পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছি।

বিষণ্ণ মনে রাজবাড়ীর পাশের রাস্তা ধরে হাঁটছিলাম। রাজপ্রাসাদের সামনে গিয়ে হঠাৎ আমার দৃষ্টি প্রাসাদের জানালার দিকে গেল। সেখানে এক অপরূপ সুন্দরী যুবতী দাঁড়িয়েছিল; রূপের আভায় চোখ ঝলসে যাবার উপক্রম। কিছুতেই দৃষ্টি ফেরাতে পারছিলাম না। আমাকে নির্ণিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে হঠাৎ যুবতীটি অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি তখনও বিমূঢ়ের মত তাকিয়েই ছিলাম। ভাবছি যুবতী যদি আবার জানালায় এসে দাঁড়ায় তবে আর একবারটি দেখে মানবজীবন ধন্য করব। কিন্তু আমার আশা সফল হয়নি।

সূর্য পাটে বসল। আকাশে শেষ রক্তিম আভাটকু মিলিয়ে গিয়ে এক সময় সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত্রি নেমে এল। হতাশ মনে ঘুরতে ঘুরতে এই সরাইখানায় গিয়ে আশ্রয় নিলাম। সামান্য আহারে উপোষ ভঙ্গ করে ক্লান্তদেহে সরাইখানার চৌপায়ায় শরীর এলিয়ে দিতেই ঘুমে চোখ জড়িয়ে এল। যতোবারই ঘুমোতে চেষ্টা করি বারবারই সেই রূপসী যুবতীর মুখটি চোখের সামনে ছায়াছবির মত ভেসে উঠতে লাগল। উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে শুয়ে বসে দুর্ভাবনায় রাত্রির অবসান হ’ল। সকাল হ’ল। সকাল হ’তে না হ’তেই কোন রকমে চোখ-মুখে জলের ছিটা দিয়ে আবার সেই প্রাসাদের কাছে গিয়ে নির্ণিমেষ চোখে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। নিষ্ফল প্রয়াস। ব্যর্থ হ’য়ে মনের দুঃখে সরাইখানায় ফিরে আসতে হ’লে। সে রাত্রিও উৎকণ্ঠার মধ্যে কাটল।

সকাল হ’লে আবার সেই পূর্বে নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে জানালার দিকে সতৃষ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকলাম। সূর্যটা গড়াতে গড়াতে এক সময় মাথার উপরে উঠে এল। সূর্যের প্রখর তেজে গায়ে জ্বালা ধরে যাবার উপক্রম। আমার কিন্তু ভ্রূক্ষেপ মাত্র ছিল না। থালার মত রক্তবর্ণ সূর্যটা এক সময় পশ্চিম আকাশের গায়ে হামাগুড়ি দিতে দিতে দূরের গাছের আড়ালে এক সময় নিঃশেষে মিলিয়ে গেল। পৃথিবীর বুকে নেমে এল সন্ধ্যার অন্ধকার। আবার সেই সরাইখানা, চৌপায়ায় আশ্রয় করে নির্ঘুমে রাত্রি যাপন। বার বার আশাহত হলেও পুরোপরি আশা ছাড়তে পারলাম না। সকাল হলে ব্যাকুল মন আমাকে আবার টেনে নিয়ে গেল সেই জানালার ধারে। আবার সেই অসীম ধৈর্যের সঙ্গে আবার প্রতীক্ষার পরীক্ষা দিতে লাগলাম। ক্ষীণ আশার আলো দেখা দিল। ধীর পদক্ষেপে যুবতী আর রূপের ডালি নিয়ে খোলা জানালায় এসে দাঁড়াল। আমাকে লজ্জা করে সুমিষ্টকণ্ঠ থেকে কথা কটা বেরিয়ে এল—তুমি তো আচ্ছা লোক দেখছি। তোমার প্রাণে কি সামান্যতম ভয়ও নেই? তুমি কি জান না ঐখানে দাঁড়ানোর ব্যাপারে সম্রাটের কঠোর নিষেধ রয়েছে? অথচ তুমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা জানালার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাক! যদি প্রাণে বাঁচার সাধ থাকে এখান থেকে সরে পড়, নইলে রক্ষীরা এসে তোমার গর্দান নামিয়ে দেবে।

যুবতীর কথার জবাব দিতে গিয়ে বললাম–সুন্দরি, অপরাধ নিয়ো না। আমি নবাগত, সম্রাটের আদেশ জানা ছিল না। নির্দ্বিধায় অপরাধ স্বীকার করে নিচ্ছি। একটা কথা প্রথম দর্শনেই তোমাকে আমার মন-প্রাণ সঁপে দিয়েছি। তোমাকে যদি না-ই পাই, এ জীবন থাকা না-থাকা, দু-ই আমার কাছে সমান।

ক্রোধ প্রকাশ করে যুবতী বলল ঠিক আছে, নিষেধ যখন শুনলে না, প্রহরীকে ডেকে দিচ্ছি। কথা কটা আমায় ছুঁড়ে দিয়ে যুবতী চকিতে চলে গেল। আমি সেই মুহূর্তে অনিশ্চিত ভয়ভীতিতে কেমন যেন মিইয়ে গেলাম। ভাবলাম যুবতী কি সত্যি সত্যিই প্রহরী ডাকতে গেল। প্রাণভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত মনে গুটিগুটি সেখান থেকে সরে পড়লাম। ফিরে এলাম সরাইখানায়। আবার সেই নিদারুণ অস্বস্তির মধ্যে রাত্রি কাটাতে হ’ল।

সকাল হলে আমার বাঁধনহারা মন আমাকে আবার টেনে নিয়ে গেল সেই রূপসী যুবতীর দর্শনাকাঙ্ক্ষায়। আবার সেই নিরবিচ্ছিন্ন উৎকণ্ঠা নিয়ে অধীর প্রতীক্ষা। বেশ কিছুক্ষণ পরে যুবতীর দেখা পেলাম। সেই ক্রোধোন্মত্তা রূপ। শরীরের সমস্ত রক্ত যেন মুখে এসে ভর করেছে। আবার সেই কণ্ঠস্বর—নির্লজ্জ বেকুব কোথাকার! কাল না তোমাকে এখানে দাঁড়াতে নিষেধ করে দিয়েছি। আজ আবার এসেছ? তোমার কি প্রাণের মায়াও নেই? যদি মঙ্গল চাও, প্রাণ নিয়ে সরে পড়। প্রহরীরা এল বলে। এখানে তোমাকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে ধড়ে আর মাথা থাকবে না।

আমি নিবেদন করলাম—সন্দরি, তোমার চোখ ধাঁধানো রূপে আমাকে পাগল করেছে। কিন্তু তোমার হৃদয় এমন কঠোর, এমন পাষাণ যে আমার অবস্থা দেখে তোমার মধ্যে এতটুকুও করুণার উদ্রেক হচ্ছে না। আমার মানসিক পরিস্থিতি যদি বিন্দুমাত্র বুঝতে পারতে তবে এ-কথা মুখেও উচ্চারণ করতে না। জীবনের ভয় আমার নেই। তোমাকে যদি না-ই পাই কি হবে এ জীবন রেখে! তোমাকে ছাড়া বাঁচা মরা দুই-ই সমান। তুমি বরং প্রহরীকে ডেকে দাও, এ জীবন তোমার চোখের সামনে বিসর্জন দিই।

আমার কথায় যুবতীর মনে বিস্ময়ের সঞ্চার হ’ল। বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে বলল-এত বড় প্রতিজ্ঞা করে বসেছ! যাক, এক কাজ করবে, আজ মধ্যরাত্রে এখানে এসে দাঁড়াবে। —কথা কটা এক নিঃশ্বাসে আমার দিকে ছড়ে দিয়ে চোখের পলকে যুবতীটি অদৃশ্য হয়ে গেল।

যুবতীর কথায় কিছুটা আশ্বস্ত হলাম। উৎফুল্ল চিত্তে সরাইখানায় এসে হাজির হলাম।

রাত্রি গভীর হ’লে চুপি চুপি সরাইখানা থেকে বেরিয়ে সেই জানালার ধারে যেতেই থমকে দাঁড়ালাম। জানালা থেকে একটা দড়ি নীচে ঝুলতে দেখতে পেলাম। বুঝতে দেরী হল না আমার হৃদয়েশ্বরীর আহ্বান সঙ্কেত। মুহূর্ত মাত্র দেরী না করে তড়িৎগতিতে দড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেলাম। দু’টো ঘর পেরিয়ে তৃতীয় ঘরে পা দিলাম। সুসজ্জিত ঘর। দেখলাম দুগ্ধেফেন-শয্যায় যুবতী বসে আছে। ঠোঁটে মুচকি হাসির রেখা। যুবতীকে এত কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য ইতিপূর্বে আমার হয়নি। যুবতীর দেহে যৌবনের ঢল নেমেছে। বেশীক্ষণ এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকায় দেহ মনে অদ্ভূত একটা শিহরণ অনুভব করলাম।

যুবতী ঠোঁটের কোণে তেমনি হাসির রেখাটুকু বজায় রেখে ছোট্ট করে জিজ্ঞেস করল–কে তুমি? কোথায় তোমার বাস?

আমি বিন্দুমাত্র গোপন না করে আমার দুঃখের কাহিনী আমার প্রাণেশ্বরীর সামনে তুলে ধরলাম।

আমার কথায় যুবতীর মনে দয়ার সঞ্চার হ’ল।

সামান্য সরে আমাকে বসতে বলল। সামান্য ইতঃস্ততের পর আমি তার নরম বিছানার এক কোণে গুটিসটি হ’য়ে বসলাম।

যুবতী তার আবেশ জড়ানো চোখ দুটি আমার দিকে তুলে ধরে আবেগ ভরে উচ্চারণ করল—হে বিদেশী তুমি যেমন আমাকে দেখে মুগ্ধ হয়েছ, আমিও তেমনি প্রথম দর্শনেই তোমাকে মন-প্রাণ সঁপে দিয়েছি। তোমার কাহিনী আমাকে শোনালে, আমারও উচিত আমার কথা তোমাকে বলা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *