দেলেরার জবানবন্দী

দেলেরার জবানবন্দী

কাজির নির্দেশে দেলেরাকে বিচার সভায় হাজির করা হল।

কাজির নির্দেশে দেলেরা ঘোমটায় মুখ ঢেকেই বললেন— ধর্মাবতার, আপনি বিচার করে আমার অভিলাষ পূর্ণ করুন। মামুদের পুত্র আমার অধিক প্রেমের পাত্র। আপনি মহানুভব, অনুমতি করনে, আমরা অন্যত্র গিয়ে বসবাস করি।

দেলেরার কথাটা কানে যেতেই তাহের দেলেরা ওপর তর্জন-গর্জন শুরু করে দিলেন।

কাজী তাঁকে বাধা দিয়ে বললেন—তাহের ক্ষোভ সম্বরণ কর। ওরা যেখানে খুশি গিয়ে বাস করতে পারে। তবে কথা দিচ্ছি, বিচারে অপরাধী সাব্যস্ত হলে শাস্তি সে পাবেই।

তাহের আতঙ্কিত হয়ে বললেন—ধর্মাবতার, এখানে থাকলে তবে তো বিচার করে তাকে প্রাণদণ্ড দেবেন। দূত ফিরে আসার আগেই তো সে অন্যত্র চলে যাচ্ছে।

কাজী আশ্বাস দিয়ে বললেন—চারদিকে প্রহরী নিযুক্ত করে দেব। চিন্তা করো না।

কাজীর অনুমতি পেয়ে কৌলফ দেলেরাকে নিয়ে এক সরাইখানায় আশ্রয় নিলেন। দেলেরার বিয়ের যৌতুক হিসেবে প্রাপ্ত গহনা বিক্রী করে সুখে বাস করতে লাগলেন। তাদের এই বিচিত্র প্রেমের কথা শুনে কৌতূহলী হয়ে এক পুরুষ রাজ-পোষাকে সজ্জিত হয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। রাজপুরুষ কথা প্রসঙ্গে বললেন— যুবক রূপবতী দেলেরার উপযুক্ত পাত্র তুমিই, তাহের কোনক্রমেই তার পতি হওয়ার যোগ্য নয়।

রাজাকে হিতাকাঙ্ক্ষী জ্ঞানে কৌলফ বললেন—মহারাজ, আপনাকে মিথ্যা বলব না। আমি মামুদের পুত্র নই, দেলেরাকে পাবার জন্য মিথ্যার আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছি। কোজণ্ডী নগর থেকে দূত ফিরে এলেই মিথ্যার দায়ে আমার প্রাণদণ্ড হবে। আমি প্রাণভয়ে ভীত হয়ে পড়েছি।

রাজপু্রুষবেশী রাজা বললেন–তোমার দুঃখে আমি মর্মাহত। কিন্তু দৃঢ়প্রতিজ্ঞ কাজির হকুম নড়চড় হবার যো নেই। অদৃষ্ট সম্বল করে বসে থাকা ভিন্ন উপায় দেখছি না। ঈশ্বরই একমাত্র ভরসা। কৌলফকে সান্ত্বনা দিয়ে রাজা বিদায় নিলেন।

রাজা বিদায় নিলে দেলেরা বললেন—স্বামী, লোকটাকে কিন্তু সুবিধার মনে হল না। কৌশলে আমাদের উদ্দেশ্য জেনে নেবার জন্যই হয়ত এসেছিল।

—প্রিয়তমে, এটা হয়তো তোমার ভ্রান্ত ধারণা। লোকটাকে সজ্জন বলেই মনে হল। সত্যই তো ঈশ্বর বিনা কে আমাদের বিপদমক্ত করতে পারেন।

এভাবে দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনার মধ্যে চৌদ্দদিন উত্তীর্ণ হল। পনের দিনের দিন শমন এসে হাজির। কৌলফকে ও তাঁর হৃদয়েশ্বরীকে চির দিনের মত পরিত্যাগ করে বিদায় নিতে হল।

বিদায় মুহূর্তে দেলেরা কান্নায় বুক ভাসিয়ে বললেন— প্রাণেশ্বর, তোমাকে যদি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে আমিও আত্মঘাতিনী হয়ে তোমাকে অনুসরণ করব। তোমাকে বিনা জীবন-ধারণ কল্পনাও করতে পারছিলেন!

কৌলফ ও দেলেরা যখন বিদায়পর্ব সারছিলেন তখন কাজী, দাসেনন্দ, মজাফর এবং তাহের উপস্থিত হলেন। কাজিকে দেখেই নিশ্চিন্ত বিপদাশঙ্কায় দেলেরা হঠাৎ মূর্ছা গেলেন।

কাজি কৌলফকে অবাক করে দিয়ে বললেন—কৌলফ তোমার পিতার কাছ থেকে দূত ফিরে এসেছে। প্রমাণ পেলাম তুমি মামুদেরই পত্র। না জেনে তোমার প্রতি অন্যায় করেছি, ক্ষমা কর। এই মুহূর্তে দেলেরা তোমার। ওকে নিয়ে যেখানে খুশি যেতে পার।

কাজির কথা শেষ হতে না হতেই এক দূত এসে কৌলফের হাতে এক পত্র দিল। দূত বলল—প্রভু, আপনার অবর্তমানে আপনার পিতা-মাতা বড়ই শোকে অভিভূত হয়ে পড়েছেন, চলুন দেখা দিয়ে তাঁদের জীবন রক্ষা করবেন।

কৌলফ পত্র পাঠ করতে লাগলেন–প্রাণেশ্বর, তোমার অদর্শনে আমরা কত শোকসন্তপ্ত ও মর্মাহত চিঠিতে ব্যাখ্যা করা কঠিন। মজাফরের দূত মারফৎ তোমার কুশলাদি জেনে মনের চাঞ্চল্য কিছু প্রশমিত হল। তোমার জন্য চল্লিশটা উটের পিঠে হিরা-জহরত পাঠালাম। তোমার প্রতীক্ষায় আছি। ইতি মামুদ।

চতুর কৌলফ ব্যাপারটা সামলে নিলেন। কোন রকম বিস্ময় প্রকাশ করে কাজি বা অন্যান্যদের কিছুই বুঝতে দিলেন না।

.

কাজি তার সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে বিদায় নিলেন।

দেলেরার সংজ্ঞা ফিরে এলে কৌলফ তাঁর কাছে কাজির আগমনের কারণ বললেন। আর এ-ও বললেন–প্রিয়ে, আমাদের বিপদ কাটেনি। সওদাগরের পুত্র নুরুদ্দিন এই নগরেই রয়েছেন। তিনি এ-কথা শুনে কাজির কাছে অভিযোগ করতে পারেন। যতশীঘ্র সম্ভব আমাদের অন্যত্র চলে যাওয়া উচিত।

কৌলফ ও দেলেরা যখন নগর পরিত্যাগ করে যাওয়ার ব্যবস্থা করছেন তখন সেই রাজকর্মচারী এসে উপস্থিত হলেন। তিনি বললেন—কৌলফ তুমি মামুদের পুত্র এ কথা তখন অস্বীকার করেছিলে কেন? এখন তো সত্য প্রমাণিত হয়ে গেল।

কৌলফ সামান্য ইতস্ততের পর বললেন—মহাশয়, আপনার কাছে কিছুই গোপন করিনি। আমি এখনও বলছি, মামুদ আমার পিতা নয়।

—কিন্তু তা না হলে তিনি কখনই এইসব ধনরত্নাদি পাঠাতেন না।

—আমারও কেমন অবাক লাগছে। হয়ত ভুল বশতঃই এগুলো, পাঠিয়ে দিয়েছেন।

—তবে হয়ত বা সাধুপুত্র এই নগরেই বাস করছেন। তিনি এই ব্যাপারটা জানতে পারলে কাজির শরণাপন্ন হবেন। অতএব সব দিক চিন্তা করে তোমার উচিত যত শীঘ্র সম্ভব এই নগর পরিত্যাগ করা। কথা ক’টা বলে রাজপুরুষ বিদায় নিলেন।

রাত্রি গভীর হলে কৌলফ তাঁর পত্নী দেলেরাকে নিয়ে নগর পরিত্যাগ করার প্রস্ততি নিচ্ছিলেন। এমন সময় বাইরে প্রচুর লোক সমাগমের শব্দ পেলেন। চিৎকার চেচাঁমেচি শুনে দরজা খুলে বাইরে আসতেই দেখেন বহু অশ্বারোহী সৈন্য দরজায় দাঁড়িয়ে। একজন ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে কৌলফকে অভিবাদন করে বলল–মহারাজ, আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। আমরা আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি, চলুন।

কৌলফ রাজসভায় পৌঁছে দেখেন, মহারাজ সিংহাসনে বসে। উজির সসম্ভ্রমে তাকে মহারাজের সামনে নিয়ে গেলেন। কৌলফ নতজানু হয়ে রাজাকে অভিবাদন করলেন।

মহারাজ হেসে বললেন—কৌলফ, তোমার অসাধারণ প্রেমের কথা শুনে তোমাকে স্বচক্ষে দেখার জন্য কৌতূহল হয়েছিল, তোমার কাছে ছুটে গিয়েছিলাম। তোমার সত্যতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও তুমি এতটুকুও সত্য গোপন করনি। দ্বিতীয়বার আমি ছদ্মবেশে রাজপুরুষের পরিচয় দিয়ে দেখা করলেও তুমি নিজেকে মামুদের পুত্রের পরিচয় দিয়ে নিজেকে বাঁচাবার চেষ্টা করনি দেখে আমি খুবই মুগ্ধ হয়েছি। এই মুহূর্ত থেকে তুমি সব রকম বিপদ থেকে মুক্ত। তুমি আমার প্রাসাদেই থাক। তোমাদের প্রেমও আমাকে কম মুগ্ধ করেনি। তাই তো কোজণ্ডি নগর থেকে দূত বিরূপসংবাদ নিয়ে ফিরে এলে আমি সঙ্গে সঙ্গে ভৃত্য পাঠিয়ে তাকে ডেকে আনি। সেই দূত মারফৎই মজাফরের নিকট ওই নকল পত্রটি পাঠিয়ে দেই। তোমার জীবনরক্ষার যাবতীয় দায়িত্ব আমার ওপর ছেড়ে দিয়ে আজ থেকে তুমি আমার প্রাসাদেই থাক। কৌলফ রাজার কথা অবজ্ঞা করতে পারলেন না, দেলেরাকে নিয়ে রাজপ্রাসাদেই বসবাস করতে লাগলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *