আবুল কাসেমের গুপ্তধন প্রাপ্তি

আবুল কাসেমের গুপ্তধন প্রাপ্তি

সুলতান-কন্যার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দেশ-দেশান্তরে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ এক বণিকের সঙ্গে দেখা হ’ল। বণিক কার্যোপলক্ষে বোগদাদ নগরে যাবার প্রস্ততি নিচ্ছিলেন। আমিও তাঁর পিছু নিলাম।

বণিকের সঙ্গে বোগদাদে হাজির হলাম। আমার কাছে তখন একটি মাত্র স্বর্ণ মুদ্রা সম্বল। শেষ সম্বল ঐ স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে কিছু প্রসাধন সামগ্রী কিনে লোকের দরজায় দরজায় ফেরি করতে লাগলাম। এভাবে ফেরি করতে করতে একদিন দেখলাম কয়েকজন ভদ্রলোক কোন এক জায়গায় পানাহার করতে করতে খোস মেজাজে গল্পগুজব করছেন। আমি প্রতিদিন তাদের কাছে আমার গন্ধদ্রব্যাদি বিক্রি করতে লাগলাম। একদিন ওদের কাছ থেকে ফেরার সময় এক বৃদ্ধ আমাকে ডেকে বললেন—তুমি সবার কাছে কিছু না কিছু বিক্রি করলে, কিন্তু, কই আমার কাছে কিছুই বিক্রি করলে না তো?

আমি সসঙ্কোচে বললাম—কিছু মনে করবেন না, অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য ক্ষমা করবেন। সবার পিছনে রয়েছেন বলে নজর এড়িয়ে গেছেন। বৃদ্ধ ফোকলা দাঁতে হেসে আমার ঝাড়ি থেকে একটি আতর তুলে নিয়ে আমার পরিচয় জানতে চাইলেন।

আমি তাকে বাধা দিয়ে বললাম –পরিচয় জিজ্ঞেস করে অনুগ্রহ করে আমাকে ব্যথা দেবেন না। আমার পূর্বে স্মৃতি স্মরণ করতে চাইনে। বৃদ্ধ ভদ্রলোক আমাকে আর ঘাঁটালেন না, আমার হাতে দশটি স্বর্ণমুদ্রা গুঁজে দিয়ে লাঠি ভর দিয়ে চলে গেলেন।

বড়লোকের ব্যাপার-স্যাপার দেখে অবাক হতে হল। একটি মাত্র আতরের জন্য পুরো দশটি স্বর্ণমুদ্রা হাসিমুখে আমার হাতে গুঁজে দিলেন। বৃদ্ধ নিশ্চয়ই কোন আমির-ওমরাহ হবেন হয়ত!

পরের দিন সর্বাগ্রে বৃদ্ধটির সামনে ঝুড়ি রাখলাম। আগের দিনের মত সেদিনও একটি আতর তুলে নিয়ে দশটি স্বর্ণ মদ্রা আমার হাতে দিলেন। সেদিনও আমার পরিচয় জানার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। উপায়ান্তর না দেখে পরিচয় দিতেই হল। ভদ্রলোক তার নিস্তেজ চোখ দুটো আমার দিকে তুলে ধরে ছোট্ট করে হেসে বললেন—আমার অনুমান অভ্রান্ত। প্রথম দর্শনেই বুঝে নিয়েছিলাম, আমিজের পুত্র। তোমার বাবা আমার অভিন্নহৃদয় বন্ধু ছিলেন। এভাবে নিকৃষ্ট জীবন-যাপনের দরকার নেই, চল আমার সঙ্গে। একরকম জোর করেই আমাকে তাঁর বাড়ি নিয়ে গেলেন।

সহৃদয় পিতৃবন্ধু বৃদ্ধের আশ্রয়ে সুখই আমার দিন কাটতে লাগল। কিছুদিন পর বাণিজ্য-পণ্যাদি বিক্রি হয়ে গেলে বাসারা নগরে ফিরে যাবার সময় আমাকেও সঙ্গে নিয়ে এলেন। আমার সৌভাগ্য দেখে আমার বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-পরিজনরা খুবই অবাক হ’ল। বৃদ্ধ বণিক আমাকে পোষ্যপত্র রূপে গ্রহণ করলেন। তিনি প্রায়ই বলতেন–আবুল কাসেম, তোমাকে পুত্ররূপে পেয়ে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে মনে করি। আমিও তাঁকে পিতার ন্যায়ই সেবা-যত্ন করতে লাগলাম।

কয়েকদিনের মধ্যেই বণিক এক অদ্ভুত রকম কঠিন রোগাক্রান্ত হলেন। রোগ নির্ণয় ও নিরাময়ের জন্য বহু চিকিৎসক আনা হ’ল। চিকিৎসা ব্যর্থ হ’তে চলেছে অনুমান করে একদিন আমাকে কাছে ডেকে ফিসফিসিয়ে বললেন—স্পষ্ট বুঝতে পারছি আমার দিন ফারিয়ে আসছে। তোমাকে একটি গোপন কথা বলে যেতে চাই, আমি যা কিছু উপার্জন করেছি তা-ই তোমার জীবন কাটানোর পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু তার চেয়ে শতগুণে আমার পৈতৃক ধন-সম্পদ মাটির নীচে লুকানো রয়েছে। যাবার আগে তোমাকে সব বলে যাচ্ছি, তবে প্রশ্ন কোরো না, এই অপরিচিত ধন কোত্থেকে এল আমার জানা নেই। আমার পিতামহ মৃত্যুকালে নাকি তাকে দিয়ে গেছেন। পিতার মৃত্যুর পর তা আমার হস্তগত হয়। আমার মৃত্যুর পর তোমার ওপরই ওগুলোর মালিকানা বর্তাবে। কথা শেষ করে তিনি একটি উইল আমার হাতে গুঁজে দিলেন। একটি কথা মনে রাখবে, একটি কাণাকড়িও যেন অপব্যয় করবে না, সৎ কাজে প্রতিদিন এর থেকে মক্ত হস্তে দান করবে। এ-কাজ যে যশের কোন সন্দেহ নেই। তবে তোমার দান দেখে রাজা উজিরও ঈর্ষা করতে পারেন। ছলে-বলে-কৌশলে তোমার ওই ধন আত্মসাৎ করতে চেষ্টা করবে। তাই তুমিও আমার মতই বাণিজ্য করে সংসার যাত্রা নির্বাহ করবে। তবেই তুমি কারো সন্দেহভাজন হ’বে না, ধনরাশি ভোগ করতে পারবে।

আমি মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধকে কথা দিলাম—তাঁর উপদেশ অবশ্যই স্মরণ রাখব! বৃদ্ধ আমার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে গুপ্তধনাগারের স্থানটির কথা বলেই ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলেন।

বৃদ্ধের মৃত্যুর অব্যবহিত কাল পরে একদিন খোঁজ করতে করতে গুপ্তধনাগারে হাজির হলাম। ব্যাপার দেখে আমার তো চক্ষুস্থির। এত ধন একত্রে দেখা তো দূরের কথা ভাবতেও পারি নি। প্রতিদিন দুহাতে দান করলেও তার এক শ ভাগের এক ভাগও ফুরোবে না।

এই অপরিমিত ধন-সম্পদ হাতে পেয়ে ভাবলাম যদি দান ধ্যানই না করলাম তবে আর এগুলো থেকে কি লাভ। প্রতিদিন দীন-দঃখীদের অকাতরে দান করতে শুরু করলাম।

আমি হঠাৎ এ-রকম দান-কর্ম শুরু করায় পুরবাসীরা নানা রকম জল্পনা-কল্পনা শুরু করল। আমার দানের কথা শুনে দেশের বিভিন্ন অংশ থেকে বহু অর্থলোভী, কৃপণ ও কুচরিত্র লোকেরাও এসে সাহায্য প্রার্থনা করতে লাগল।

একদিন এক ঘটনা ঘটল। নগররক্ষক এসে বললেন—শোনলাম তুমি নাকি প্রচুর গুপ্তধন পেয়েছ, ওগুলো কোথায় আছে বল। রাজার আদেশে আমাকে ছুটে আসতে হয়েছে। গুপ্তধন রাজারই প্রাপ্য হয়, আমি নিয়ে যেতে এসেছি।

নগররক্ষকের কথায় আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন যেন মোচড় মেরে উঠল। সর্বনাশ হতে চলেছে! বৃদ্ধের আদেশ অগ্রাহ্য করায় এই বিপদে পড়েছি সন্দেহ নেই। আমার অবস্থা দেখে নগর-রক্ষক ধরেই নিয়েছেন, লোকমুখে যা শুনে এসেছেন তা অবশই সত্য। আমার দুর্বলতার সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ছাড়লেন না! মুচকি হেসে বললেন— আপনি চিন্তা করছেন কেন? আমি তো রয়েছি। গুপ্তধনের কিছু অংশ আমাকে দিন, সব ধামাচাপা পড়ে যাবে।

আমি উৎসাহ প্রকাশ করে বললাম—কত পেলে খুশি হন, বলুন? লোকটি ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে বললেন—তুমি প্রতিদিন দশটি করে স্বর্ণমুদ্রা দিলেই আমি ব্যাপারটাকে আর বেশী ঘাঁটাব না।

নিজের স্বার্থের কথা চিন্তা করে তাঁর কথায় আমি সম্মত হলাম। নগররক্ষক সন্তষ্ট হয়ে বললেন-আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, আমার দ্বারা কোন অনিষ্ট হবে না। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানাচ্ছি, আপনার ধনভাণ্ডার অক্ষয় হোক। আপনার ছত্র-ছায়ায় দরিদ্র অসহায় ব্যক্তিরা প্রতিপালিত হোক।

কিছদিন নির্বিঘেই কাটল। একদিন সকালে উজির দূত পাঠিয়ে আমাকে তলব করলেন। তাঁর তলবী পরোয়ানা পেয়ে ভয়ে ভয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। তিনি বললেন—আমি অনেক গুপ্তধন পেয়েছ শুনে সুখী হলাম। কিন্তু, আইন অনুসারে এর এক পঞ্চমাংশ সুলতানের প্রাপ্য। কই, সুলতানের প্রাপ্য দাওনি তো! তাঁর প্রাপ্য মিটিয়ে দিয়ে তুমি যাকে খুশি দান করতে পার। উজিরের মনোভাব বুঝতে পারলাম। তাঁকে বললাম—আমি গুপ্তধন পেয়েছি সত্য, কিন্তু, আমার দেহে প্রাণ থাকতে তার সন্ধান কেউ পাবে না। তবে কথা দিচ্ছি আমার ওপর জোরজুলুম না হলে প্রতিদিন হাজার স্বর্ণমুদ্রা আপনাকে দিতে পারি।

স্বার্থগৃধ্ম উজির আমার প্রস্তাবে সম্মত হয়ে গেলেন। আমার সঙ্গে একটি লোক দিলেন। আমি তাকে বাড়ী নিয়ে এলাম, একমাসের ত্রিশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা পাঠিয়ে দিলাম। উজির তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করল না। আমার দেওয়া অর্থ আত্মসাৎ করে সুলতানের কানে গুপ্তধনের ব্যাপারটি তুললেন। সুলতানকে এ-কথাও বললেন—কাসেম দৃঢ়প্রতিজ্ঞ গুপ্তধনের সন্ধান কাউকেই দেবে না। প্রাণ থাকতে নাকি গুপ্তধন কোথায় আছে বলবে না।

সুলতান উজিরের কথায় বিস্ময় ও ক্রোধ প্রকাশ করে আমাকে দূত পাঠিয়ে ডাকালেন। আমি ভয়ে ভয়ে সুলতানের দরবারে গেলাম। অতিশয় চতুর সুলতান মনের ক্রোধ গোপন রেখে মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বললেন—দেখ যুবক, তোমার গুপ্তধন প্রাপ্তির খবর আমি জানি। আমার দিক থেকে তোমার ভয়ের কিছু নেই, বরং আমি তোমার দান-ধ্যানে সন্তুষ্ট। আমাকে নীচ ভেবো না, তোমার ধনভাণ্ডার দেখাতে ভয়ের কিছু নেই। তুমি নির্দ্বিধায় আমাকে তোমার ধনভাণ্ডার দেখাতে পার।

আমি হাত কচলে নিবেদন করলাম—জাঁহাপনা, আপনি দেশের সুলতান, আপনাকে অমান্য করার স্পর্ধা আমার নেই। অধীনের একটাই নিবেদন-অনুগ্রহ করে আমাকে ধনভাণ্ডারের খোঁজ দিতে বলবেন না। এতে যদি হুজুর ক্রোধ বশতঃ প্রাণ সংহারও করেন, তবুও আমি প্রতিজ্ঞা থেকে সরে আসতে পারব না। আপনি যদি রাজি হন ধনভাণ্ডার দেখানোর পরিবর্তে আমি আপনাকে প্রতিদিন দুই হাজার স্বর্ণমুদ্রা উপহার স্বরূপ দিতে প্রস্তত আছি। সুলতান উজিরের দিকে ফিরল। চার চোখে কি কথা বিনিময় হল জানি না। সুলতান আমাকে আলিঙ্গন করে ঈশ্বরের কাছে বহুভাবে আমার মঙ্গল কামনা করলেন। আমি বাড়ী ফিরে লোক মারফৎ ষাট হাজার স্বর্ণমুদ্রা একমাসের উপহার স্বরূপ সুলতানকে পাঠিয়ে দিলাম।

বোগদাদধিপতি কাসেমের ব্যাপার-স্যাপার দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তাঁকে প্রাসাদে ডেকে এনে তাঁর ধনভাণ্ডার দেখার জন্য খুবই আগ্রহ প্রকাশ করলেন। এমনও বললেন যে, তাঁর দ্বারা কাশেমের কোনই অনিষ্ঠ হবে না।

কাসেম শেষ পর্যন্ত বললেন—মহাশয়, আপনাকে আমার ধনভাণ্ডার দেখাতে কোনই আপত্তি নেই। তবে কিনা আমার একটি প্রতিজ্ঞা রয়েছে, তা থেকে আমি তো সরে আসতে পারিনি। যদি নিতান্তই যেতে চান তবে চোখ দুটো বেধে এক বস্ত্রে এবং নিরস্ত্র হয়ে ধনভাণ্ডারে যেতে হবে! আপনি সম্মত থাকলে চলুন।

কোন রকম দ্বিধা না করে সুলতান কাসেমের কথায় রাজি হয়ে গেলেন।

স্থির হল আবুল কাসেম রাত্রির অন্ধকারে সুলতানকে নিয়ে ধনাগারে যাবেন।

রাত্রে আহারাদির পাট চুকিয়ে দাস-দাসীরা একে একে যে-যার ঘরে শুতে চলে গেল। বিশালায়তন প্রাসাদের মত বাড়ি ক্রমে নিঝুম-নিস্তব্ধ হয়ে এল। সুলতান বিছানায় শুয়ে নিদিষ্ট সময়ের প্রতীক্ষায় আগ্রহে সময় কাটাচ্ছেন। সময় যেন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে—এক একটি মিনিট যেন এক একটা বছর। ক্রমে রাত্রি গভীর হল। আবুল কাসেম নিঃশব্দে সুলতানের ঘরে প্রবেশ করলেন। সুলতান বিছানায় উঠে বসলেন। আবুল কাসেম প্রায় ফিসফিসিয়ে বললেন–জাঁহাপনা আমার প্রতিজ্ঞা পালনে যদি সম্মত হন, আমার সঙ্গে আসুন।

সুলতান বললেন—আমি ঈশ্বরের নামে শপথ করছি, কোন অবস্থাতেই প্রতিজ্ঞা লঙ্ঘন করব না। আবুল কাসেম তাঁর চোখ দুটো কাপড়ের টুকরো দিয়ে বেধে চারদিকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সুলতানকে ধনাগারের দিকে নিয়ে চললেন। পরবর্তী সময়ে সুলতান যাতে বুঝতে না পারেন তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ধনাগারে উপস্থিত হয়ে সুলতানের চোখের বাঁধন খুলে দিলেন। কাসেম একটি পাথরের দরজা খুলে দিতেই সিঁড়ি নজরে পড়ল, সোজা নিচের দিকে নেমে গেছে।

সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে যেতেই আর একটা দরজা পড়ল। খুলতেই সুলতানের চক্ষুস্থির। চোখ দুটো রগড়ে ভাল করে তাকাতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল একটি সূপ্রশস্থ চৌবাচ্চা। চৌবাচ্চাটা অসংখ্য মণিমত্তায় পূর্ণ। তার চারদিকে দ্বাদশ হেমস্তম্ভ, প্রত্যেক স্তম্ভের মাথায় অপূর্ব কারুকার্য মণ্ডিত একটা করে রক্তবর্ণ মূর্তি দাড়িয়ে।

বিস্ময় বিস্ফারিত চোখে সুলতান আবুল কাসেমের দিকে তাকালেন। আবুল কাসেম তাঁর মানসিক অবস্থা অনুমান করে কৌতূহল নিবৃত করতে গিয়ে বললেন—জাঁহাপনা, এই যে চৌবাচ্চাটা দেখছেন এতে কত যে স্বর্ণমুদ্রা রয়েছে তা গণনা করে সঠিক হিসাব করা মানুষের দুঃসাধ্য। আমি প্রতিদিন এর থেকে মুক্তহস্তে দান করছি, অঙ্গুলি প্রমাণও কমাতে পারি নি। আমৃত্যু এ-ভাবে দান করলেও ফুরোবে কি না সন্দেহ।

বোগদাদের সুলতান তাঁকে সমর্থন করতে গিয়ে বললেন-কথাটা ঠিকই, দিনের পর দিন দান করলেও আপনার জীবিত অবস্থায় শেষ হবে এটা বলা যায় না।

আবুল কাসেম হেসে বললেন—যদি এটা শূন্য হয়ে যায় ক্ষতি কি? অন্য আর একটাতে হাত দেব। কথা বলতে বলতে তিনি তাকে অন্য আর একটা ঘরে নিয়ে গেলেন। ঘরে ঢুকে সুলতান মূর্ছা যাবার উপক্ৰম। চোখের পাতা বন্ধ করতে পারছেন না। ঘরটা আগেরটা থেকে উজ্জ্বলতম। ঘরের সর্বত্র ঐশ্বর্যের ছাপ, মনিমুক্তার ঝালর শোভা পাচ্ছে। এঘরেও পূর্বকথিত ঘরের মত বিশালায়তন চৌবাচ্চা মণিমুক্তা হীরা, জহরৎ, প্রবাল প্রভৃতি নানারকম দুষ্প্রাপ্য রত্নে পূর্ণ। সুলতান বিস্ময়ে হতবাক হয়ে ভাবছেন একী বাস্তব না স্বপ্ন!

বোগদাদধিপতির মনের ভাব বুঝতে পেরে আবুল কাসেম তাঁর হাত ধরে একটা মনিমুক্তা খোচিত সিংহাসনের কাছে নিয়ে গেলেন। চোখ ধাঁধানো এই সিংহাসনের ওপর এক নারী ও এক পুরুষ অর্ধশায়িত অবস্থায় বসে থাকতে দেখলেন। মৃত হলেও সুলতানের চোখে যেন জীবিত বলেই মনে হল। আবুল কাসেম, সুলতানের ভ্রমশোধরাতে গিয়ে বললেন—মহাশয়, এই যে মৃত নারী ও পুরুষকে দেখছেন এরাই এই ধনভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী ছিলেন। পুরুষ মূর্তি হচ্ছেন বাদশা ও নারী মূর্তি হচ্ছেন রাণী। এদের সঞ্চিত অর্থই আমার হাতে এসেছে।

সুলতান বললেন—তোমার দোষ আমি দেব না। তুমি এ ধন-সম্পদ দানধ্যানে ব্যয় করতে পার। এটকুও বলতে পারি। বৃদ্ধ সওদাগর তোমাকে যে নির্দেশ দিয়ে গেছেন তা যুক্তিযুক্ত নয়। আমার একটা অনুরোধ, এই মৃত বাদশা ও রাণীর নাম জানার খুবই আগ্রহ প্রকাশ করছি।

আবুল কাসেম অক্ষমতা প্রকাশ করে বললেন—জাঁহাপনা আপনার অনরোধ রক্ষা করতে আমি অক্ষম, সত্য বলতে কি, ধন-ভাণ্ডারের পূর্বাধিকারীও এদের নাম জানতেন না। স্বাভাবিকভাবেই আমার অজ্ঞাত রয়ে গেছে! কথাকটা শেষ করে আবল কাসেম অপেক্ষাকৃত ধনসমৃদ্ধ অপর একটি ঘরে সুলতানকে নিয়ে গেলেন। ঘরটা রত্নরাজিতে পরিপূর্ণ। সুলতানের ইচ্ছা ছিল ভোরের আলো ফোঁটা পর্যন্ত এই রত্নভাণ্ডার ঘরে ঘরে দেখেন। আবুল কাসেম অক্ষমতা প্রকাশ করে বললেন—দাস-দাসীরা ঘুম থেকে ওঠার আগেই আমাদের প্রাসাদে ফিরে যেতে হবে, নইলে ধনভাণ্ডার গোপন থাকবে না। অনন্যোপায় হয়েই আবুল কাসেম পূর্বনির্ধারিত উপায়ে সুলতানের চোখ দুটো বেঁধে ধনভাণ্ডারের বাইরে নিয়ে গেলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *