আবুল কাসেমের কথা

আবুল কাসেমের কথা

কোন এক সময়ে তুরস্কের রাজধানী বোগদাদ নগরে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন মহাপরাক্রমশালী এক সুলতান ছিলেন—নাম তাঁর হারুণ-অল-রসিদ। প্রজাপালক হিসাবে তাঁর খুবই খ্যাতি ছিল। প্রজাদের তিনি অন্তর দিয়ে ভালবাসতেন। প্রজারাও তাঁকে একান্ত আপনজন মনে করত। সুলতান প্রজাদের সুখ-দুঃখ, ব্যাথা-বেদনা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করার জন্য গভীর রাত্রে ছদ্মবেশে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াতেন। এভাবে প্রজাদের চোখের মণি হয়ে তিনি দীর্ঘকাল রাজত্ব করে যথেষ্ট যশ ও খ্যাতি অর্জন করেন! তাঁর রাজত্বে জমিদার বা ধনিকশ্রেণী দরিদ্র ও দুর্বলের ওপর অত্যাচার করতে পারত না। তার একমাত্র কারণ হচ্ছে, কখন কোন ছদ্মবেশে কখন কোথায় উপস্হিত হবেন, কি শাস্তির বিধান দেবেন তা কারো জানা ছিল না। সর্বগুণে গুণান্বিত সুলতান হারুণ-অল-রসিদের মধ্যে একটা মাত্র দোষই লক্ষিত হ’ত তা হচ্ছে তিনি নিজের কাজের জন্য গর্ববোধ করতেন। তাঁর মন ছিল দাম্ভিকতা ও আন্তরিকতায় পূর্ণ। সবার কাছে পঞ্চমুখে আত্মপ্রশংসা করতেও এতটকু ইতস্ততঃ করতেন না। কথা প্রসঙ্গে এমন মন্তব্যও করে বসতেন যে, তাঁর মত শাসক পৃথিবীতে দ্বিতীয় নেই। এই দাম্ভিকতার জন্যই তিনি সবার নিন্দার পাত্র হয়ে উঠলেন।

সুলতান হারুণ-অল-রসিদের এক অতিবৃদ্ধ, বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ উজির ছিলেন। তাঁর নাম ছিল জাফর খাঁ। এই অগাধ দাম্ভিকতায় তিনিও কম বিরক্তিবোধ করতেন না। একদিন বাধ্য হয়েই সুলতানের কাছে করজোড়ে নিবেদন করলেন—হুজুর একমাত্র মূর্খেরাই আত্মপ্রশংসার মাধ্যমে দাম্ভিকতা প্রকাশ করে থাকে। কিন্তু পরিণামে গৌরবলাভ তো হয়-ই না, উপরন্তু লোকের কাছে দারুণভাবে হাস্যস্পদই হয়ে থাকে। অতএব আমার বিনীত নিবেদন, আপনি অনুগ্রহ করে এই নিন্দনীয় কাজ থেকে বিরত থাকুন।

উজিরের কথায় সুলতানের মধ্যে বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখা দিল, ক্রোধের সঞ্চার হ’ল। ক্রোধোন্মত্ত সুলতান গর্জে উঠলেন— উজিরসাহেব আপনার ধৃষ্টতা দেখে আমি বিস্মিত হচ্ছি! আমার মত ঐশ্বর্যশালী প্রজাপালক সুলতান পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি আপনি দেখাতে পারেন?

মুহূর্তকাল নীরবে কাটিয়ে সাহসে ভর করে বৃদ্ধ উজির করজোড়ে নিবেদন করলেন— জাঁহাপনা, অপরাধ নেবেন না। যদি অভয় দেন নিবেদন করি, আপনার রাজ্যেরই বাসোরা নগরে আবুল কাসেম নামে এক প্রজা বাস করে। তার দয়াশীলতা, দানধ্যান ও সর্বোপরি তার অগাধ বিত্তের কথা শুনলে আপনি বিস্মিত হবেন। যদি আগ্রহী হন চলনে, তাকে দেখলেই আপনার দ্বিধা দ্বন্দ্ব দূর হবে এবং নিজের সম্বন্ধে ভ্রান্ত ধারণাও ঘুচে যাবে। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার! তিনি কিন্তু ভুলেও কারো কাছে মুখ ফুটে নিজের কথা ব্যক্ত করেন না।

বৃদ্ধ উজিরের কথায় সুলতানের ক্রোধ উপশম হওয়া তো দূরের কথা, বরং শতগণ বেড়ে গেল। তিনি সেনাপতিকে ডেকে জাফরকে কারাগারে নিক্ষেপ করার আদেশ দিলেন। জাফর কারাগারে নিক্ষিপ্ত হলেন।

সুলতান বিষণ্ণ মনে নিজ কক্ষে পায়চারি করছেন। এমন সময় প্রধানা বেগম সেখানে এলেন। সুলতানের এই আকস্মিক ভাবান্তর লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করলেন— প্রাণেশ্বর আপনার মধ্যে কেমন একটা অস্থিরতা লক্ষ্য করছি যে! তবিয়ত ভাল তো?

প্রিয়তমা মহিষীর অত্যুগ্র আগ্রহ দেখে সুলতান উজিরের ব্যাপার বিস্তারিত বর্ণনা করলেন।

মহিষী ব্যাপারটা হৃদয়ঙ্গম করে বললেন— জাঁহাপনা। প্রকৃতিস্থ হোন, ক্রোধ সম্বরণ করুণ। কোন ব্যাপারই পরিষ্কার না জেনে কারো প্রাণনাশ করা সঙ্গত নয়। বৃদ্ধ উজিরকে অন্ধ কারায় নিক্ষেপ করে মোটেই সঙ্গত কাজ করেন নি। সে যে আপনাকে সত্য কথা বলেছে, তারই নিশ্চয়তা কোথায়? অতএব সব দিক বিবেচনা করে বলছি, অনুগ্রহ করে সর্বপ্রথমে ব্যাপারটা সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হোন। পরে বিচার-বিবেচনা করে যা হয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

মহিষীর কথায় সুলতান যেন সম্বিৎ ফিরে পেলেন। কয়েক মুহূর্ত নীরবে কাটিয়ে এক সময় মুখ খুললেন–প্রিয়ে, তুমি ঠিকই বলেছ। তোমার পরামর্শই গ্রহণ করলাম। অন্যের ওপর ভরসা না করে আমি নিজেই বসোরা যাব, সব কিছু স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করব। যদি উজিরের কথা মিথ্যে হয় তবে তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করব, সত্য হলে তাকে অবশ্যই বিশেষভাবে সম্মানিত করব।

সুলতান পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বসোরার দিকে যাত্র করলেন তখন মধ্যরাত্রি। অন্ধকারের কালো ঘোমটা ভেদ করে তেজস্বী ঘোড়া ছদ্মবেশী সুলতানকে নিয়ে বসোরার দিকে ছুটে চলল।

সুলতান সোজা বসোরায় পৌঁছে এক সরাইখানায় আশ্রয় নিলেন। কথা প্রসঙ্গে সরাইখানার মালিককে জিজ্ঞেস করলেন-আচ্ছা বলতে পারেন, আবুল কাসেম নামে কেউ নগরীতে থাকেন কি?

সরাইখানার মালিক জবাব দিল—হ্যাঁ অবশ্যই।

—নগরের কোনদিকে তিনি থাকেন জানা আছে কি? আর একটা কথা, শুনেছি তিনি অতি ধনবান, দাতা হিসাবেও নাকি তিনি এ-অঞ্চলে খুবই খ্যাত, কথাটা কি সত্য?

—হ্যাঁ, মহাশয়—অত্যন্ত সত্য কথা। শুধু আমি কেন, বসোরা নগরের ছেলে-বুড়ো সবাই তাঁর দান-ধ্যানের কথা জানেন। দেবতুল্য লোকটি দীন-দুঃখীদের মা-বাপ।

সরাইখানার মালিকের কথায় সুলতানের মনে যেন আনন্দ আর ধরে না। সকাল হতে না হ’তেই তিনি ঘোড়া ছুটিয়ে চললেন আবুল কাসেমের বাড়ির দিকে। কিছু দূরে গিয়ে এক শিল্পকারের কাছে ব্যাপারটা উত্থাপন করতেই লোকটি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন—-কী ব্যাপার বলুন তো মশায়? আপনি কি এ-রাজ্যে থাকেন না? মহামানব আবুল কাসেম একজন পৃথিবী-বিখ্যাত লোক! আপনি তাঁর বাড়ি চিনতে না পারেন, কিন্তু তাঁকেও চেনেন না শুনে সত্যিই আশ্চর্যবোধ করছি।

কোন রকমে ঢোক গিলে সুলতান আমতা আমতা করে জবাব দিলেন—কিছু মনে করবেন না মশায়, আমি বিদেশী, এখানে নতুন এসেছি। যদি অনুগ্রহ করে তাঁর বাড়ীটা দেখিয়ে দেন, নতুবা সঙ্গে কাউকে দেন বড়ই উপকার হয়।

ছদ্মবেশী সুলতানের অনুরোধে শিল্পকার একটি বালক’কে সঙ্গে দিল আবুল কাশেমের বাড়িটা দেখিয়ে দেবার জন্য। যথাস্থানে পৌঁছে সুলতান পথ-প্রদর্শক ছেলেটার হাতে একটা মোহর দিয়ে বিদায় করলেন।

.

আবুল কাসেমের সুরম্য প্রাসাদ দেখে সুলতান তো বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। তিনি বিস্ময়ভরা চোখে চারিদিক তাকিয়ে দেখতে লাগলেন। চারদিকে প্রহরারত শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে, কতলোক বাড়ির মধ্যে অবাধে যাতায়াত করছে। কেউ কাউকে ডেকেও জিজ্ঞেস করছে না—ওহে, তোমরা কারা? কোথায় যাচ্ছ?

সুলতান প্রাসাদের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে সদর দরজা ডিঙিয়ে বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করলেন। সামনেই এক প্রহরীকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন—আমি বহু দূরদেশ থেকে এসেছি, তোমাদের প্রভুর দর্শনপ্রার্থী। আমাকে একটিবার পৌঁছে দিতে পার?

প্রহরী সুলতানকে দেখেই বুঝে নিল তিনি যে-ই হোক না কেন, সামান্য লোক নন। মুহূর্ত মাত্র দেরী না করে সে সুলতানের কাছে ছুটে গেল, বিদেশী দর্শনপ্রার্থী’র সংবাদ দিল।

আবুল কাসেম বিদেশীর আগমনবার্তা পাওয়া মাত্র নিজেই ব্যস্ত হয়ে ছুটে এসে ছদ্মবেশী সুলতানকে অভ্যর্থনা করে বিশ্রামকক্ষে নিয়ে গেলেন। সুলতানকে সদস্য আসনে বসতে দিয়ে নিজে ঘরের মেঝেতে বসলেন।

আবুল কাসেম এক সময় সবিস্ময়ে নিবেদন করলেন–মহাশয় আজ্ঞা হোক আপনার জন্য কি করতে পারি?

সুলতান বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে স্বাভাবিকভাবেই জবাব দিলেন—দেখুন কিছু দিন যাবৎ আপনার সুখ্যাতির কথা শুনে আপনার দর্শনলাভের আকাঙ্ক্ষা জেগেছে। মনের অফুরন্ত কৌতূহল চরিতার্থ করতেই এখানে ছুটে আসতে হয়েছে।

আবুল কাসেম যথোচিত শিষ্টাচারের সঙ্গে জবাব দিলেন— এ তো আমার পরম সৌভাগ্য। যদি অনুগ্রহ করে আপনার পরিচয় দেন ধন্য হব।

সুলতান সামান্য ইতঃততের পর বললেন—আমি একজন বণিক, বোগদাদ নগরে বাস করি। দেশ-বিদেশে ঘরে বাণিজ্য করাই আমার পেশা। কার্যোপলক্ষ্যে ঘুরতে ঘুরতে এ রাজ্যে এসে হাজির হয়েছি। কাল সন্ধ্যায় সরাইখানায় উঠেছি। ভাবলাম এই সংযোগে আপনার দর্শনলাভ করি।

আবুল কাসেম ছোট করে হেসে নিবেদন করলেন—মহাশয়, আপনার পায়ের ধুলো পেয়ে আমার বাড়ি ধন্য হ’ল। আপনার মত একজন বিদেশীকে হাতের কাছে পেয়ে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। আপনার সেবা করার অনুমতি দিয়ে আমাকে ধন্য করুন।

সুলতান অনুরূপ হাসি বিনিময় করে বললেন–মহাশয়, আপনার সৌজন্যে আমি মুগ্ধ। আমি তো আগেই বলেছি, দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ানোই আমার কাজ। কত জায়গায় গিয়েছি, কত মানুষের সঙ্গেই তো পরিচয় হ’ল। কিন্তু আপনার মত এতগুণের সমাবেশ দ্বিতীয় কারো মধ্যেই নজরে পড়ে নি।

সুলতান ও আবুল কাসেম যখন এমনি কথোপকথনে মগ্ন তখন আট-দশ জন পরিচারক সুদৃশ্য সোনার থালায় করে নানা রকম মিষ্টান্ন এবং সুগন্ধযুক্ত সুরাপূর্ণ পাত্র সুলতানের সামনে রেখে সেলাম করে বিদায় নিল। কয়েক মুহূর্ত পরে সুদৃশ্য বেশভূষায় সজ্জিতা দশ-বারোজন পরিচারিকা সুস্বাদু ফলমূল ও সুগন্ধি পরিপূর্ণ পাত্র সুলতানের সামনে এনে রাখল।

আবুল কাসেমের বিশেষ অনুরোধে সুলতান সামান্য আহার করলেন। আহারান্তে পঞ্চমুখে আবুল কাশেমের অতিথি পরায়ণতার প্রশংসা করতে লাগলেন।

আবুল কাসেম নিজের প্রশংসার কথা শুনে কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন। এক সময় সুলতানকে থামিয়ে দিয়ে বললেন—মহাশয় কিছু মনে করবেন না, আপনার মত একজন মহাত্মার মুখে আমার মত একজন সামান্য দীনহীনের প্রশংসা মানায় না! আপনার জন্য আমি যেটুকু করতে পেরেছি, এ তো মানবিক ধর্মমাত্র! মানুষ মাত্রেই এ কর্তব্যজ্ঞান থাকা বাঞ্ছনীয়।

সুলতান সেদিন আবুল কাসেমের প্রাসাদেই থেকে গেলেন। নানা রকম সুস্বাদু ও উপাদেয় খাদ্যদ্রব্য সহযোগে মধ্যাহ্ন ভোজ সেরে বিশ্রামের জন্য একটা সুসজ্জিত ঘরে গেলেন। তিনি অবাক হয়ে আবুল কাসেমের ঐশ্বর্য দেখতে লাগলেন। যতই দেখছেন ততই যেন অবিশ্বাস্য এক অত্যাশ্চর্য জগতে ডুবে যাচ্ছেন তিনি! বার বার এদিক-ওদিক তাকিয়ে ভাবছেন—উজিরের কথা একবর্ণও মিথ্যা নয় তো, প্রতিটি বর্ণনা অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে তো? এঁর মত ঐশ্বর্যশালী ব্যক্তি এই নিখিল বিশ্বে দ্বিতীয়টি আছেন বলে মনে হয় না! সবচেয়ে লক্ষণীয় হচ্ছে তিনি যথার্থই বিনয়ের অবতার! প্রতিটি মানুষের প্রতি সমান আচরণ ও সমান শিষ্টাচার প্রদর্শনও তাঁর উল্লেখযোগ্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।

সুলতান একমনে বিশেষ কিছু একটা ভাবছেন অননুমান করে আবুল কাসেম মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলেন—মহাশয়, মনে হচ্ছে, আপনি কিছু একটা ভাবছেন?

আবুল কাসেমের আকস্মিক প্রশ্নে সুলতান রীতিমত হকচকিয়ে জবাব দিলেন—কই, কিছুই না তো?

আবুল কাসেমের অনুরোধে সুলতান সুবাসিত সুরার পাত্রটি হাতে তুলে নিলেন। এমন সময় একদল রূপসী যুবতী কিন্নরী নানা রকম বাদ্যযন্ত্রসহ ঘরে ঢুকল। তারা আবুল কাসেমের নির্দেশে নাচগানের আসর বসাল। কিন্নরীদের সুমিষ্ট কণ্ঠের গান ও নিপুণ ছন্দবদ্ধ নাচ দেখে সুলতান যারপর নাই মুগ্ধ হয়ে গেলেন। অভাবিত আবেগে চোখের পাতা জড়িয়ে আসতে লাগল। ভাববিমুগ্ধ সুলতানের মনে জেগে উঠল—আমারও তো একদল কিন্নরী রয়েছে বটে, তারাও নাচ-গানে পারদর্শী বটে, কিন্তু কই তাদের মধ্যে তো মুহূর্তের জন্যও এমন নৈপুণ্যের ঢেউ নজরে পড়েনি, এমনতর কিন্নরকণ্ঠের গানও কোনদিন শুনিনি! এমন নৃত্য-গীত পটীয়সী নর্তকী স্বর্গের অপ্সরা ভিন্ন মনুষ্য জাতির মধ্যে কেউ আছে বলে জানা ছিল না।

ছদ্মবেশী সুলতান যখন কিন্নরীদের নাচ-গানে বিভোর, আবুল কাসেম তখন ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তিনি বাঁ হাতে একগাছি ছড়ি এবং ডান হাতে অপর্বে সন্দর একটি চারাগাছ নিয়ে ফিরে এলেন। চারাগাছটি মূলভাগ স্বর্ণময়, শাখা-প্রশাখা ও পত্র হীরক খচিত এবং পুষ্পরাশি রত্ন খচিত।

তার শীর্ষদেশে নানা রকম সুগন্ধি দ্রব্যে তৈরী অপরূপ সুন্দর একটি ময়ূর শোভা পাচ্ছে। আবুল কাসেম ঘরে ঢুকে সসম্ভ্রমে সুদৃশ্য ও বহু মূল্যবান চারাগাছটি সুলতানের পায়ের কাছে রেখে দিলেন।

সুলতান হাত বাড়িয়ে গাছটি তুলে নিয়ে বিস্ময় বিস্ফারিত চোখে বার বার এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগলেন।

একসময় ঘটল এক অভাবনীয় চমকপ্রদ ঘটনা। আবুল কাসেম আচমকা হাতের ছড়িটা পাখির মাথায় ছোঁয়াতেই ওটা অপরূপ ভঙ্গিমায় নাচতে লাগল। শুধু কি তা-ই? ময়ূরের দেহ নিসৃত সুগন্ধ ঘরময় ছড়িয়ে পড়ল। সুলতান অপলক চোখে তাকিয়ে ভাবছেন, আবুল কাসেমের কাণ্ড যত দেখছেন ততই যেন তাঁকে এক গভীর বিস্ময়ের জগতে ঠেলে দিচ্ছে। কৌতূহল দমন করতে না পেরে জিজ্ঞেসই করে বসলেন—মহাশয়, এমন আশ্চর্য জনক গাছটি আপনি কোথায় পেলেন?

আবুল কাসেম সুলতানের প্রশ্নের কোন জবাব না দিয়ে গাছটি হাতে করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আবুল কাসেমের এরকম আচরণে সুলতান বিস্মিত হলেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন কী ব্যাপার লোকটি এমন অভদ্র ভাবিনি তো! আমার প্রশ্নের কোন জবাব না দিয়েই চলে গেলেন। সবই আছে, কিন্তু লোকের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হয় মোটেই জানে না দেখছি। তাছাড়া কৃপণও বটে! কিন্তু উজিরের কথা প্রতিটি অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে বটে, কিন্তু একটা কথা ঠিক বলে নি। আবুল কাসেমের মত এতবড় দাতা নাকি ভূমণ্ডলে দ্বিতীয় আর নেই, অত্যন্ত অসত্য মন্তব্য করেছে উজির। তার অসত্য ভাষণের নিদর্শন হচ্ছে যদিও ছদ্মবেশে এসেছি, অপরিচিত ভদ্রজন তো! আমার যখন গাছটি পছন্দ হয়েছে লোকটা তো গাছটি আমাকে উপহার স্বরূপ দিতে পারতো। অতএব একে দাতা বলে চিহ্নিত করা যায় না।

সুলতান যখন আবুল কাসেমের আচরণ প্রসঙ্গে ভাবছেন, ঠিক এমন সময় আবুল কাসেম ছোট্ট একটি বালককে সঙ্গে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। বালক ঘরে ঢুকে তার হাতের সুরার পাত্রটি সুলতানের দিকে এগিয়ে ধরল। সুলতান পাত্রটি হাতে নিয়ে পাত্রের সুরাটুকু পান করে শূন্য পাত্রটি বালকের হাতে দিতে গিয়ে চমকে উঠলেন— একী এ ত পূর্ণ পাত্র। শূন্য পাত্রে সুরা এল কোত্থেকে! পুনরায় পাত্রের সুরাটুকু নিঃশেষ করে যেই পাত্রটি বালকের হাতে তুলে দিতে যাবেন, আবার সেই অদ্ভুত কাণ্ড, পাত্রটি সুরাপূর্ণ দেখতে পেলেন। পূর্বের রত্ন ও ময়ূর চিহ্নিত চারাগাছটি প্রসঙ্গ বিস্মিত হয়ে আবুল কাসেমকে জিজ্ঞেস করলেন। মহাশয়! কী ব্যাপার বলুন তো, এমন আশ্চর্য জনক পাত্র আপনি কোথায় পেলেন?

আবুল কাসেম মুচকি হেসে জবাব দিলেন—মহাশয় এ প্রশ্নের সঠিক জবাব দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। লোকমুখে শুনেছি, কোন এক অজ্ঞাত পরিচয় ফকির নাকি এ-পাত্রটি তৈরী করেছেন। কথা কটা বলে আবুল কাসেম বালকটিকে নিয়ে বাড়ীর ভেতরে চলে গেলেন।

.

আবুল কাসেমের আচরণে সুলতান বিস্মিত হয়ে ভাবতে লাগলেন—কী ব্যাপার, লোকটি কী তবে বিন্দুমাত্রও শিষ্টাচার জানে না? এটি কি একজন ভদ্রলোকের প্রশ্নের জবাব দেবার ধরন হল! তাছাড়া অদ্ভুত জিনিস কে তাঁর কাছে দেখতে চাইছে? তাছাড়া ব্যাপারটা ভাল করে দেখা ও বোঝার আগেই, নিয়ে চলে যাচ্ছেন, এটা কেমনতর ভদ্রতা হ’ল? ছিঃ-ছিঃ-ছিঃ উজির একেবারে পঞ্চমুখে প্রশংসা করেছিলেন! ঠিক আছে, দেশে ফিরে তাকে সমুচিত শিক্ষা দিয়ে ছাড়ব অপদার্থটিকে যদি শূলে না চড়াই, তবে আমি সুলতান ই না।

বোগদাদের সুলতান উজিরের উক্তি স্মরণ করে যেন ক্লোধে ফেটে পড়ছিলেন। হঠাৎ আবুল কাসেমকে দরজায় দেখতে পেয়ে মুখে তুলে তাকালেন। একটি রূপসী যুবতীর হাত ধরে তিনি চৌকাঠ ডিঙিয়ে ঘরে ঢুকলেন। যুবতীটির সর্বাঙ্গে রূপের জোয়ার। পৃথিবীর যাবতীয় রূপ-সৌন্দর্য যেন একত্রে পুঞ্জীভূত! রূপের আভায় চোখ ঝলসে যাওয়ার উপক্রম। বহুমূল্য স্বর্ণালঙ্কারের মণিমুক্তোগুলো থেকে ঠিকরে আলো বেরিয়ে আসছে। রূপসী যুবতীর রূপ-সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে সুলতান তাকে হাত ধরে নিজের পাশে নিয়ে বসালেন। সুলতানের মুগ্ধভাব দেখে আবুল কাসেম যুবতীর গুণগান করতে লাগলেন। এক সময় তিনি একটি বীণা এনে হাতে দিলেন। তার নরম নরম আঙুলগুলোর ছোঁয়ায় বীণার তারগুলো ঝনঝনিয়ে উঠল। শুরু হল মন-পাগল করা রসালাপ। সুলতান  মন্ত্রমুগ্ধের মত বীণার সঙ্গীত-লহরী শুনতে লাগলেন। বীণা বাদন বন্ধ হলে সুলতান সম্বিৎ ফিরে পেয়ে উচ্ছসিত আবেগের সঙ্গে বলে উঠলেন–মহাত্মন, আপনার মত ভাগ্যবান এই ধরাধামে বিরল। আপনি বিশ্বের অন্যতম ব্যক্তি বললেও হয়ত ভুল হবে না।

সুলতানের কথায় আবুল কাসেম এবারেও যেন কর্ণপাত করলেন না। যুবতীর হাত ধরে মুচকি হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আবুল কাসেমের ব্যবহারে সুলতান এবারও ব্যথিত ও মর্মাহত হলেন।

কিছুক্ষণ পরে আবুল কাসেম আবার ঘরে ঢুকলেন। এবার কিন্তু কাউকে সঙ্গে আনলেন না, একাই ফিরে এলেন।

সুলতান ও আবুল কাসেম মুখোমখি বসে দেশ-বিদেশের গল্পে মাতলেন। দীর্ঘ সময় ধরে কথোপকথনের পর সুলতান বললেন—মহাশয়, এবার যে আমাকে উঠতে হয়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে আর দেরী করা সম্ভব নয়। আপনার অনুমতি পেলে যাত্রা করতে পারি।

আবুল কাসেম যথোচিত বিনয় ও সৌজন্য প্রদর্শন করে সুলতানের সঙ্গে সদর দরজা পর্যন্ত এসে বিদায় সম্ভাষণ জানালেন।

.

আবুল কাসেমের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সুলতান ঘোড়ায় চাপলেন। ধীর-মন্থর গতিতে হেলে-দলে সুলতানের বিশাল দেহী ঘোড়াটা এগিয়ে চলল। ঘোড়ার পিঠে বসে সুলতান ভাবছেন আবুল কাসেম সম্বন্ধে উজির জাফর যা যা বলেছে অক্ষরে অক্ষরে সত্য। তার অগাধ ঐশ্বর্য ও অভূতপূর্ব শিষ্টাচার যে-কোন মানুষকে মুগ্ধ না করে পারে না। ভারতবর্ষ তোলপাড় করলেও এমন ঐশ্বর্যের সন্ধান পাওয়া দুষ্কর। ময়ূর-সুশোভিত যে বৃক্ষ দেখলাম বিশ্বের কোন রাজরাজেশ্বরেরও আছে বলে মনে হয় না। তা ছাড়া যে-বালক সুরা পাত্র নিয়ে এসেছিল, পঞ্চমুখে তার গুণ কীর্তন করলেও শেষ হবার নয়। সবশেষে রূপবতী যুবতী? পৃথিবীর সৌন্দর্য রাশি যেন তার দেহে পুঞ্জীভূত করা হয়েছে। উজির জাফর প্রতিটি বর্ণ সত্য বলেছে। আবল কাসেম তুমি যথার্থই ভাগ্যবান, তবে তুমি যেমন ধনকুবের, তেমন দাতা নও। আমি তোমার ময়ূরশোভিত বৃক্ষ ও সুরাপাত্র হাতে বালকের যথেষ্ট প্রশংসা করলাম, তোমার কি উচিত ছিল না তার কিছু না কিছু, আমাকে প্রদান করা? তবে তোমাকে দাতা বলে প্রশংসা করি কিভাবে? তাই তোমাকে দাতা বলব না, তোমাকে কৃপণ বলতে বাধ্য হচ্ছি। তোমার ধনগর্ব’ই সার। কিন্তু উজির তাকে আমার চেয়ে দাতা বলে ব্যাখ্যা করেছে। অতএব উজির একথা অবশ্যই সত্য বলেনি। দেশে ফিরে তাকে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করব।

সুলতান আবুল কাসেমের কথা ভাবতে ভাবতে সরাইখানাভিমুখে অগ্রসর হতে লাগলেন। সরাইখানায় পা দিতেই বিস্ময়ে থমকে দাঁড়ালেন। সুলতানকে বিদায় সম্ভাষণ জানানোর বহু পূর্বেই আবুল কাসেম মূল্যবান বহু প্রকার পট্টবস্ত্র, কয়েকটি তেজস্বী ঘোড়া, কয়েকটি উট, পূর্বে কথিত কিন্নরী, দশটি ভৃত্য, ময়ূরশোভিত সেই রত্নময় বৃক্ষ, বালকসহ সেই সুরাপাত্র, রূপের আধার সেই কিন্নরকণ্ঠী যুবতী প্রভৃতি বন্ধুত্বের নিদর্শন স্বরূপ সরাইখানায় পাঠিয়ে দিয়েছেন। অভাবনীয় উপহারসামগ্রী দেখে সুলতান কয়েক মুহূর্তে নির্বাক হয়ে রইলেন। আবুল কাসেমের দানশীলতা দেখে রীতিমত মূর্ছা যাবার উপক্রম। কোন রকমে বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে সুলতান সরাইখানায় ঢুকলেন। সুলতানকে দেখে সবাই নতজানু হয়ে কুর্নিশ করে সসম্ভ্রমে দাঁড়াল! একজন এগিয়ে এসে আবুল কাসেম লিখিত একটি পত্র সুলতানের হাতে দিল। সুলতান ব্যস্ত হয়ে পত্রটির ভাঁজ খুলে চোখের সামনে ধরলেন—মহামান্য মহাশয়!

আপনি যে অনুগ্রহ করে আতিথ্য গ্রহণ করেছেন তার জন্য সহস্র ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনার শুভ পদার্পণে আমার গৃহ পবিত্ৰ হ’ল। আপনার কাছে আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ যদি অধমের পক্ষ থেকে কোন ভুল-ত্রুটি হয়ে থাকে নিজগুণে মার্জনা করে নেবেন। আপনি যে ময়ূরশোভিত ও রত্নখচিত বৃক্ষ এবং সুরাপাত্র হাতে বালককে দেখে প্রশংসা করছিলেন তা পাঠালাম, অনুগ্রহ করে ওগুলো গ্রহণ করে অধমকে ধন্য করবেন। আমাদের প্রথম পরিচয়কে স্মরণীয় করে তোলার জন্য সঙ্গে আরও কিছু উপঢৌকন পাঠালাম। অনুগ্রহ করে এগুলোও যদি স্বদেশে নিয়ে যান তবে এই অধম ধন্য হবে। আমি একটি রীতি মেনে চলি, কেউ আমার গৃহে এসে কোন দ্রব্য দেখে আনন্দ প্রকাশ করলে তা বন্ধত্বের নিদর্শন স্বরূপে তাকে প্রদান করে থাকি, ওসবের ওপর আমার আর কোন স্বত্ব থাকে না। সব শেষে আমি আবারও অনুরোধ রাখছি, আমার পক্ষ থেকে প্রেরিত দ্রব্যসামগ্রী গ্রহণ করে আমাদের সদ্যলব্ধ বন্ধুত্বকে দীর্ঘস্থায়ী করলে ধন্য হ’ব।

বিনীত-
আবুল কাসেম

পত্রপাঠ শেষ করে সুলতান কাগজটি ভাঁজ করতে করতে তন্ময় হয়ে ভাবতে লাগলেন—আবুল কাসেমের ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করেছে। উজির জাফর যা বলেছে, এই মুহূর্তে স্বীকার করতেই হচ্ছে, প্রতিটি কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্য। সত্যি আমি কী অর্বাচীন! আবুল কাসেম কিপ্টে, দান করার ক্ষমতা নেই ভেবে এতক্ষণ কত কুকথাই তার সম্বন্ধে ভেবেছি। স্বীকার না করে উপায় নেই, তাঁর মত দানশীল সহৃদয় ব্যক্তি পৃথিবীতে সত্যিই দ্বিতীয়টি নেই। রাজ-রাজরাগণ যে-সব মহামূল্য ও অত্যাশ্চর্য দ্রব্য চোখেও দেখেন নি, তা তিনি অবলীলাক্রমে অজ্ঞাত কুলশীল এক ব্যক্তিকে বন্ধুত্বের নিদর্শন স্বরূপ উপঢৌকন হিসেবে প্রদান করলেন। হে আবুল কাসেম তুমি ধন্য তোমাকে বন্ধরূপে পেয়ে আমিও নিজেকে ধন্য মনে করছি। আর উজির জাফর, তোমার জীবনও ধন্য। এহেন মহাত্মার সন্ধান পেয়ে আমি নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম আত্ম-অহঙ্কারেই মন ছিলাম। আজ মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছি, আবুল কাসেমের পাশে আমি কতই না নগণ্য। স্বদেশে ফিরে উজির জাফরের প্রতি কুব্যবহার করার প্রায়শ্চিত্ত করব, রত্ন সিংহাসনে বসিয়ে সেবা করব।

পর মুহূর্তেই সুলতান ভাবলেন আবুল কাসেম এমন ধন-সম্পদ কোথায় পেলেন, এমন অলৌকিক দান করা কী করেই বা মানুষের পক্ষে সম্ভব! এর অনুসন্ধান আমাকে করতেই হবে; যথোচিত সন্ধান না পেয়ে বোগদাদ নগরীতে ফিরে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। অনুসন্ধান-পর্ব চালাতে যদি আমাকে এখানে কিছুদিন থাকতেও হয়, অপরিসীম কষ্ট স্বীকার করতে হয় তবুও আমি পশ্চাদপদ হব না।

উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে সুলতান সরাইখানায় নির্ঘুমে রাত্রি কাটালেন। কাক-ডাকা সকালে ঘোড়া ছুটিয়ে আবুল কাসেমের প্রাসাদে হাজির হলেন। ছদ্মবেশী সুলতান সবিনয়ে নিবেদন করলেন—মহাশয় আপনার দানশীলতা আমাকে মুগ্ধ করেছে, বিস্মিতও বটে। আমার বিশ্বাস আপনার মত দ্বিতীয় দাতা পৃথিবীতে বিশেষ করে ভারতবর্ষে, আর কেউ আছে বলে আমার জানা নেই। আপনি আমাকে যে সব উপঢৌকন পাঠিয়েছেন, আমি ওগুলোর অনুপযুক্ত। অপরাধ নেবেন না, আপনি অনগ্ৰহ করে তা ফিরিয়ে নিন। আমি তো বলেছি, আমি সামান্য বণিক মাত্র। আপনার প্রদত্ত দ্রব্যসামগ্রী আমার পক্ষে বাস্তবিকই ভয়ের কারণ। আমাকে ক্ষমা করবেন, ওগুলো ফিরিয়ে নিন।

সালতানের কথায় আবুল কাসেম খুবই মনঃক্ষুন্ন হলেন। ক্রোধ প্রকাশ করে বলে উঠলেন—মহাশয়, আপনার কথায় মনে হচ্ছে এই অধম আপনার নিকট মারাত্মক অপরাধ করেছে। নতুবা আপনি এমন কথা বলবেন কী করে। কোন দোষ-ত্রুটি না থাকলে কেউ প্রদত্ত উপঢৌকন তার মালিককে ফিরিয়ে দেবার প্রস্তাব করতে পারে বলে আমার জানা নেই।

সুলতান লজ্জিত হয়ে বললেন—সে কী মশায় আপনি এ-রকম কথা বলে আমাকে লজ্জা দেবেন না। আপনার ব্যবহারে আমি প্রীত। কিন্তু একটা কথা বলতে চাচ্ছি, যদি অভয় দেন তবে বলি।

আবুল কাসেম মুচকি হেসে বললেন—আপনি নির্দ্বিধায় বলতে পারেন। বলুন, কি বলতে চাচ্ছেন?

—আপনি এই যে মুক্ত হস্তে দান করে যাচ্ছেন, শীঘ্রই আপনার ধনভাণ্ডার শূন্য হয়ে যাবে। আমার মনে হয়–

আবুল কাসেম সুলতানের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন-আমার ধনক্ষয়ের আশঙ্কায় আপনি এ-কথা বলতে চাচ্ছেন বুঝতে পেরেছি। তবে এ-রকম আশঙ্কার কোন কারণ নেই। আপনার জানা নেই, আমি প্রতিদিনই ঠিক এমনিভাবেই দান করে থাকি। এমনি সহস্রগুণ দানেও আমার ভাণ্ডার শূন্য হবার নয়। আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন। আপনি যদি এর কারণ শোনেন তবে আপনার সংশয় দূর হবে। আপনি আগ্রহী হ’লে আমি সব কথা বিস্তারিতভাবে আপনার কাছে ব্যক্ত করতে পারি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *