রাজবমশাহ ও চিরস্থানী সংবাদ
প্রাচীন কালে চীন দেশে এক রাজা রাজত্ব করতেন। রাজার নাম ছিল রাজবমশাহ। তাঁর মত ধর্মানুরাগী, সৎ ও ন্যায়পরায়ণ রাজা সচরাচর দেখা যায় না। হরিণ শিকার ছিল তাঁর সখ। একদিন তিনি সভাপারিষদ ও সসৈন্যে হরিণের খোঁজ করতে করতে গভীর বনে প্রবেশ করলেন। বনের এক গভীর অংশে এক হরিণী দেখে পিছু নিলেন। হরিণীটি শুধুমাত্র রাজারই নয়, সহচরদের মনেও গভীর বিস্ময়ের উদ্রেক করল। তার গায়ের রং মিশমিশে কালো, মাঝে মধ্যে গাঢ় নীল ছোপ, পিঠের দিকটা চোখ ধাঁধানো সোনালী রং। বিচিত্র রং-এর এই হরিণীটির চার পায়ে ছিল রূপোর নূপুর। রাজা বিস্ময় উদ্রেককারী হরিণীটিকে ধরার জন্য প্রাণপণে ছুটোছুটি করতে লাগলেন।
কিছুক্ষণ পরে রাজাকে অবাক করে দিয়ে হরিণীটি চোখের পলকে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল। রাজা কিন্তু আশা ছাড়লেন না। প্রতিটি ঝোপঝাড় তন্ন তন্ন করে খুজতে লাগলেন। অনেক খোঁজাখুজির পর হঠাৎ দেখতে পেলেন এক শীর্ণকায়া স্রোতস্বিনীর পাড়ে হরিণীটি শুয়ে রয়েছে। রাজা পা টিপে টিপে নিঃশব্দে এগোতে লাগলেন। সচেতুরা হরিণীটি রাজার পায়ের শব্দ শুনেই হঠাৎ লাফিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। নদীতে লাফিয়ে পড়ে চোখের আড়ালে চলে গেল।
রাজবমশাহ আশা ছাড়লেন না। ঘোড়া থেকে নেমে একটি সপ্রশস্ত পাথরের ওপর বসে নদীর দিকে তাকিয়ে রইলেন। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত্রি হল, রাত্রি পেরিয়ে হল সকাল। হতাশ মনে রাজা ভাবলেন-–এ তো সামান্যা হরিণী নয়। নির্ঘাৎ কোন মায়াবিনী। হরিণীর বেশ ধরে তার সঙ্গে ছলনায় মেতেছে। রাজা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, এর শেষ কোথায় দেখতেই হবে।
রাজার দীর্ঘ অনুপস্থিতি পারিষদ ও সৈন্যদের ভাবিয়ে তুলল। তারা খুঁজতে খুঁজতে নদীর পাড়ে এসে দেখে রাজা নির্নিমেষ চোখে নদীর দিকে তাকিয়ে আছেন। রাজা উজিরকে ডেকে হরিণীর বৃত্তান্ত বললেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গদান ও প্রয়োজনে পরামর্শ গ্রহণের উদ্দেশ্যে উজিরকে রেখে পারিষদ ও সৈন্যদের রাজধানীতে পাঠিয়ে দিলেন। হরিণী সম্পর্কে কৌতূহলী রাজা বৃদ্ধ উজিরকে নিয়ে নদীর ধারেই বসে থাকলেন।
ক্রমে দিনের আলো নিভে গিয়ে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এলো। রাত্রি গভীর হতেই রাজা ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পাথরটির ওপর শুয়ে পড়লেন। উজিরকে বললেন—খুব ক্লান্ত, একটা ঘুমিয়ে নিচ্ছি। হরিণীকে জল থেকে উঠতে দেখলেই ডেকে দিও। কিছুক্ষণের মধ্যে উজিরও ঘুমিয়ে পড়লেন। হঠাৎ বাঁশির মিষ্টি-মধুর স্বরে তাঁদের ঘুম ভেঙে গেল। তাকিয়ে দুজনেই তো রীতিমত হতবাক! সামনে বিশাল ও সুরম্য অট্টালিকা। অত্যুজ্জল সোনালী আলোয় সম্পূর্ণ বাড়িটা ঝলমল করছে। এক সময় অট্টালিকার ভেতর থেকে মন-পাগলকরা বীণার সুর বাতাসে ভেসে বেড়াতে লাগল! রাজা মোহগ্রস্তের মত উৎকর্ণ হয়ে সুরলহরী শুনতে লাগলেন।
উজির আতঙ্কে শিউরে উঠে বলতেন—মহারাজ, ব্যাপার বড় একটা সুবিধের মনে হচ্ছে না। নির্ঘাৎ এ মায়াবিনীর খেলা। চলুন জীবন নিয়ে সরে পড়ি।
রাজা উজিরের কথায় কর্ণপাত না করে একাই প্রাসাদের দিকে অগ্রসর হলেন। উজির অনন্যোপায় হয়ে তাঁকে অনুসরণ করলেন। প্রাসাদের দ্বার খোলাই রয়েছে। নিঃশব্দে তাঁরা ভেতরে গিয়ে একটি ঘরের মধ্যে ঢুকলেন। উজ্জল আলোকমালায় ঘরটি সজ্জিত। বহুমূল্যবান মণিমুক্তখচিত একটি সুদৃশ্যে সিংহাসন ঘরের কেন্দ্রস্থলে শোভা পাচ্ছিল। সিংহাসনে মূল্যবান আভরণে ভূষিতা এক পরমা সুন্দরী যুবতী বসে। রাজার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হাসছে, একদল রূপসী যুবতী তাকে ঘিরে বসে সুমধুর স্বরে গান গাইছে।
কিছুক্ষণ পরে সিংহাসনে উপবিষ্টা যুবতী গান বন্ধ করতে ইঙ্গিত করল।
রাজা বললেন—সুন্দরী, কে তুমি? কেনই বা এই গভীর অরণ্যে পুরুষ সমাগমশূন্য পুরীতে তুমি একাকী বাস করছ?
যুবতী ঠোঁটের কোণে হাসির রেখাটুকু বজায় রেখেই সুরেলা গলায় জবাব দিল–মহারাজ, আমিই সেই বিচিত্রা দর্শণা হরিণী। অনেক পুরুষই আপনার মত শিকার করতে এসে আমাকে দেখে মুগ্ধ হন। এখন আপনি আমাকে যা দেখছেন, এটাই আমার প্রকৃত রূপ। দৈববলে আমি এমন শক্তি পেয়েছি যে, আমি ইচ্ছামত যে-কোন মুহূর্তে যে-কোন রূপ ধারণ করতে পারি।
কথা বলতে বলতে যুবতী রাজার হাত ধরে অন্য আর একটি সুসজ্জিত ঘরে নিয়ে গেলেন। নানারকম সুস্বাদু আহার্য ও পানীয় দ্বারা আপ্যায়ণ করলেন। রাজার অন্য কোন দিকে বিন্দুমাত্র খেয়ালও ছিল না। অপলক চোখে যুবতীর রূপলাবণ্য দেখতে লাগলেন। উজির কিন্তু ব্যাপার-স্যাপার দেখে খুবই উদ্বিগ্ন হলেন। তিনি ভাবলেন–আজ অদৃষ্টে কি আছে কে জানে!
যুবতী মোহিনীহাসি ছড়িয়ে দিয়ে বলল—মহারাজ, আপনি আমার অতিথি, আহার্য ও পানীয় গ্রহণ করুন। আপনার পৌরুষ ও রূপে আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমি রাজকন্যা। এই দেহমন আপনাকে উৎসর্গ করলাম।
রাজা মোহের ঘোর কাটিয়ে বললেন–সুন্দরী, তোমার রূপ আমাকেও কম মুগ্ধ করেনি। তুমি কেন মায়ামৃগের রূপধারণ করে এই গভীর বনে ঘুরে বেড়াও বলে আমার কৌতূহল নিবৃত্ত কর।
যুবতী পাশের একটি আসন দখল করে বলল–মহারাজ, বলছি, শুনুন–চিরস্থান নামক সমুদ্রের বুকে একটি ছোট্ট দ্বীপ রয়েছে। সেখানে দৈত্যদের একাধিপত্য। আমি সেই দ্বীপের সম্রাটের কন্যা। চিরস্থানী আমার নাম। পিতার নাম মনটার। পিতার একমাত্র চোখের মণি আমি, খুবই আদরের। মানবদের আবাসভূমি ও জীবনযাত্রা দেখতে বেরিয়েছি। হঠাৎ আপনার সঙ্গে দেখা। আপনার রূপে মুগ্ধ হয়ে আমার দেহমন সমর্পণ করে বসলাম। পরমুহূর্তেই নিজের কাজে অনুতপ্ত হলাম। দৈত্যকন্যা হয়ে মানবের রূপে মুগ্ধ হয়েছি। তাই পালাতে চেষ্টা করলাম। ইচ্ছা থাকলেও মন বাধা দিল। তাই হরিণীর রূপ ধরে আপনাকে ভোলাবার জন এগিয়ে এলাম। আপনিও মোহমুগ্ধ হয়ে ছুটতে লাগলেন। এমন সময় আমি নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে গা ঢাকা দিলাম। তখনি আপনি ধৈর্য ধরে দিনের পর দিন আমার প্রতীক্ষায় নদীর ধারে বসে রইলেন এবং খুবই কঠোর প্রতিজ্ঞায় দেখে খুবই মায়া হল।
যুবতী যখন রাজার সঙ্গে বাক্যালাপে রত তখন এক সহচর দৈত্যকন্যা এসে খবর দিল—সখি, এইমাত্র খবর এসেছে, আপনার পিতার আকস্মিক মৃত্যু হয়েছে। সিংহাসন শূন্য। প্রজারা দুঃখিত এবং খুবই উদ্বিগ্ন। আপনার আগমনের প্রতীক্ষায় পথ চেয়ে অপেক্ষা করছে। আপনি অবিলম্বে রাজধানীতে পৌঁছে সিংহাসনে বসে প্রজাদের উৎকণ্ঠা মুক্ত করুন।
চিরস্থানী রাজার হাত ধরে অশ্রুসিক্ত চোখে রাজার দিকে তাকিয়ে বলল—মহারাজ, বাধ্য হয়েই আমাকে স্বদেশে ফিরতে হচ্ছে। কিন্তু চোখের আড়াল হলেও আপনাকে মনের আড়ালে রাখতে পারব না। কথা দিচ্ছি শীঘ্রই আমরা আবার মিলিত হবে। রাজাকে সান্ত্বনা দিয়ে রাজকন্যা চিরস্থানী ছলছল চোখে বিদায় নিল।
চিরস্থানী অন্তর্হিত হওয়া মাত্রই চোখের পলকে সুদৃশ্য প্রাসাদটি অদৃশ্য হয়ে গেল। রাজা দেখলেন, তিনি উজিরকে নিয়ে গভীর বনে দাঁড়িয়ে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকার কেটে গিয়ে পূব আকাশে ভোরের আলো ফুটে উঠল। রাজা বিস্ময়-বিস্ফারিত চোখে চারদিক দেখে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে উজিরকে বললেন— উজির একি স্বপ্ন, না মায়া? আমরা হয়ত এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলাম, তাই না?
উজির বললেন—স্বপ্ন নয়, এ মোহিনীর মায়া। যারা যুবতীর চারিদিকে বসে গান গাইছিল তারা মায়াবিনী। আপনাকে ছলনা করাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য। আমার মনে হয় এখানে আর এক মুহূর্তও থাকা সঙ্গত নয়। নিজের মঙ্গলের কথা চিন্তা করে সময় থাকতে এখান থেকে পালান।
রাজা উজিরের কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারলেন না বটে তবে প্রাসাদে ফিরে গেলেন। চিরস্থানীর কথা কিছুতেই মন থকে মুছে ফেলতে পারলেন না। শয়নে স্বপনে-জাগরণে চিরস্থানীর চিন্তা মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে। এক সময় তার মনের অবস্থা এমন অস্থির-চঞ্চল হয়ে পড়ল যে চিরস্থানীর দেখা পাবার লোভে অতি রাত্রে শিকারের ছলে বনের সেই জায়গায় গিয়ে ঘোরাফেরা শুরু করলেন। মাসাধিক কাল কেটে গেল, তাও সেই রাজকন্যা চিরস্থানীর দেখা নেই।
রাজার মনে ভাবান্তর জাগল। তিনি ভাবলেন—চিরস্থানী বিহনে রাজ্য সিংহাসন সবই বৃথা। কি হবে অতুল ঐশ্বর্যের স্রোতে ডুবে থেকে? এ-রকম চিন্তা করে রাজা উজিরের ওপর রাজ্যের যাবতীয় দায়দায়িত্ব দিয়ে বিষণ্ন মনে তিব্বত দেশের দিকে যাত্রা করলেন।
দেশ-দেশান্তরে ঘুরতে ঘুরতে রাজা একদিন তিব্বতরাজ্যের সীমান্তে হাজির হলেন। সেখান থেকে রাজধানী দুদিনের পথ। একদিন পর্বতের পাদদেশে এক গাছে হেলান দিয়ে রাত্রি যাপন করছিলেন। হঠাৎ তিনি শুনতে পেলেন নারীকণ্ঠের ক্রন্দনরোল। কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে গেলেন। একটি গাছের নীচে বসে এক নারীকে অঝোরে কাঁদতে শুনলেন। অপরিচিতা রহস্যময়ী নারীর মহামূল্যবান আভরণ থেকে অত্যুজ্জল আলোকচ্ছটা যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে। রাজা কৌতূহলাপন্ন হয়ে প্রশ্ন করলেন—সুন্দরি! কে তুমি? রাত্রির অন্ধকারে এই জনমানবহীন পর্বতের পাদদেশে কেন এলে? কেনই বা এমন করে কাঁদছ, কিসের ব্যথা-বেদনায় তুমি দগ্ধে মরছ?
যুবতী চোখের জল মুছে শ্লেষ্মাজড়িত কণ্ঠে জবাব দিলেন-মহাশয়, আমি রাজকন্যা ও পরে রাজমহিষী ছিলাম। ভাগ্যবিড়ম্বনায় আজ আমি পথের ভিখারিণী। যদি আগ্রহী হোন আমার দুঃখের কাহিনী বলি।
রাজার আগ্রহে যুবতী বললেন — মহাশয়, আপনার হয়ত মৈনাক নামক প্রবল প্রতাপশালী জাতির কথা অবশ্যই জানা আছে। আমার পিতা ছিলেন তাদের রাজা। আমি ছিলাম তাঁর একমাত্র আদরে কন্যা। ভাগ্যের কুটিল চক্রান্তে পিতাকে অকালে ইহলোক ত্যাগ করতে হয়। আমার বয়স তখন মাত্র সাত বছর। প্রজারা আমাকে সিংহাসনে অভিষিক্ত করল। বিশ্বস্ত মন্ত্রীর উপর রাজ্যশাসনে যাবতীয় ভার অর্পিত ছিল। স্বার্থের চক্রান্তে অচিরেই আমাকে বিপদের মুখে পড়তে হল। মোয়াফেক নামে পিতার এক সহোদর ছিলেন। সবাই জানতাম মোংগলদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে তিনি মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু একদিন আমার সুখর রাজত্বে ধূমকেতুর মত তাঁর আবির্ভাব ঘটল। একসময় রাজ্যের বহু আমির ওমরাহের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। তাঁকে পেয়ে আমার বিপক্ষে জোট বাঁধল, উদ্দেশ্য—আমাকে সিংহাসনচ্যুত করে তাঁকে অভিষিক্ত করবে। কার্যতঃ করলেও তাই। ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে আমার পিতৃব্য সিংহাসনে বসলেন। আমি বিদ্রোহ করি, এই আশঙ্কায় আমাকে হত্যার ষড়যন্ত্রও করতে লাগলেন। আমার প্রাণনাশে সম্ভাবনায় হিতাকাঙ্ক্ষী উজির গোপন আমাকে ও আমার ধাত্রী মাকে নিয়ে তিব্বতে পাড়ি দিলেন। তিনি ছিলেন চিত্রকলায় খুব পারদর্শী। সেখানে চিত্রকর বলেই পরিচয় দিলেন। এই পেশা সেখানে খ্যাতিও যথেষ্ট পেলেন।
দুঃখ-দুর্দশার মধ্য দিয়ে আমাদের বিড়ম্বিত জীবন কাটতে লাগল। অদৃষ্টের ওপর যাবতীয় দায়-দায়িত্ব চাপিয়ে কোন রকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে একের পর এক বছর কাটতে লাগল।
উজিরের চিত্রকলায় পারদর্শি তার কথা একসময় তিব্বতরাজের কানে উঠল। রাজা চিত্রকর উজির সাহেবকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে গেলেন। চিত্রবিদ্যায় উৎসাহী রাজাও সময় সংযোগমত মাঝে মধ্যে জীর্ণ কুটিরে এসে হাজির হতেন। একদিন উভয়ে যখন আলাপ আলোচনা করছিলেন তখন কার্যোপলক্ষে সে-ঘরে যাই। রাজা নির্ণিমেষ চোখে আমার মখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। সসঙ্কোচে ঘর ছেড়ে চলে আসলাম।
সে দিন এ-পর্যন্তই। ক্রমে রাজার যাতায়াত বেড়ে গেল। চিত্রকলার চেয়ে আমার প্রতি আকর্ষণেই যে তার এই মাত্রাতিরিক্ত যাতায়াত বুঝতে দেরী হল না। একদিন তিনি উজিরকে বললেন—দেখুন, রাজসভায় একজন চিত্রকরের আবশ্যক। চিত্রকলায় আপনার জ্ঞান ও পারদর্শিতায় আমি মুগ্ধ। আপনি সম্মত হলে কাজে যোগদান করতে পারেন এবং আমার প্রাসাদে আপনাদের বসবাসের ব্যবস্থা করে দিতে পারি। আপনি ভেবে দেখুন, সম্মত থাকলে দিন দুয়ের মধ্যে আমাকে জানাবেন।
বৃদ্ধ উজির রাজার অভিপ্রায় বুঝতে পেরে আমাকে বললেন-মা, আপনার প্রতি তিব্বতরাজ আকৃষ্ট হয়েছেন। চিত্রকর রাখার ব্যাপারটা একটা অজুহাত মাত্র। রাজপ্রাসাদে আমাদের নিয়ে তুলতে পারলে আপনাকে পাওয়া সহজ হবে অনুমান করেই তিনি এ-প্রস্তাব দিয়েছেন। বংশমর্যাদার কথা ও নারীধর্মের কথা বিস্মৃত হয়ে আবেগ ও উচ্ছ্বাসের বশে যেন কোন কাজ করে বসবেন না। যারা নিজেদের হেলায় বিকিয়ে দেয় তারা ভবিষ্যতে উপায়হীনা হয়ে পড়ে। যদি তিব্বতরাজ আপনাকে বিয়ে করে রাণীর মর্যাদা দিতে সম্মত থাকেন তবে তো কথাই নেই, নইলে কোন প্রলোভনেই নিজেকে তাঁর হাতে তুলে দেবেন না।
আমি উজিরের উপদেশ পালনে সম্মত হলাম।
আমরা তিনজন রাজপ্রাসাদে গিয়ে উঠলাম। রাজা আমাদের সুখ-সুবিধার জন্য সম্ভাব্য সব রকম ব্যবস্থা করে দিলেন।
নারীধর্ম নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনায় আমি রাজাকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এড়িয়ে চলতে লাগলাম। কিন্তু রাজার মধ্যে তেমন কিছু নজরে পড়ল না।
আমাকে একান্তে পেয়ে একদিন রাজা সসম্ভ্রমে ব্যক্ত করলেন-সসুন্দরী, তোমাকে প্রথম দর্শনের মুহূর্তেই তোমার ঐ রাঙা চরণে নিজেকে উৎসর্গ করেছি। গোপনে তোমাকে ভোগ করার কুমতলব আমার নেই। তোমাকে পত্নীর সম্মানে প্রতিষ্ঠিত করে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়াই আমার বাসনা, অবশ্য তুমি সম্মত হলে। সর্বপ্রথমে তোমার পরিচয় দিয়ে আমার কৌতূহল দূর কর।
রাজার সৌজন্য ও মহত্বে আমি মুগ্ধ হয়ে তাঁর কাছে আমার দূর্ভাগ্যের কাহিনী ব্যক্ত করলাম।
আমার জীবন-কাহিনী তিব্বতরাজের মনে রেখাপাত করল। তিনি আমাকে আশ্বাস দিয়ে বললেন—সুন্দরি! আমার ওপর আস্থা রাখতে পার। তোমার শত্রুনাশ করে হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। দুষ্টমতি মোয়াফেক কৃতকর্মের জন্য সমুচিত শিক্ষা পাবে। রাজার সহৃদয়তা ও আন্তরিক প্রেমে মুগ্ধ হয়ে তাকে পতিরূপে গ্রহণ করতে সম্মত হয়ে গেলাম। শুভ মুহূর্তে শাস্ত্র-সম্মত উপায়ে আমাদের বিয়ে হল।
রাজা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মৈনাক রাজ্যে দূত পাঠালেন। দূত মৈনাকরাজের সঙ্গে দেখা করে তিব্বতরাজের বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে বলল—আপনি যদি রাজ্যের ও আপনার নিজের মঙ্গল চান, এই মুহূর্তে রাজ্য ছেড়ে চলে যান। অন্যথায় যুদ্ধ অনিবার্য। মোয়াফেক তিব্বতরাজের শক্তি সম্বন্ধে অজ্ঞ ছিলেন না, তবুও তাঁর আদেশ অগ্রাহ্য করে দূতকে ফেরৎ পাঠালেন।
দূত তিব্বতে ফিরে গিয়ে মৈনাকরাজের ঔদ্ধতের কথা বলতেই রাজা সেনাপতিকে ডেকে মৈনাক অভিযানের প্রস্তুতি নিতে বললেন। রাজ্য জুড়ে সাজ সাজ রব পড়ে গেল।
একদিন মৈনাক রাজ্যের প্রতিনিধি তিব্বতরাজের কাছে এসে মোয়াফেকের আকস্মিক মৃত্যু-সংবাদ দিয়ে বললেন—মহারাজ, প্রজারা যুদ্ধ নয়, শান্তি চায়। আপনার বশ্যতা স্বীকার করে আমাকে আপনার দরবারে পাঠিয়েছে।
রাজা এই সংবাদ পেয়ে উল্লসিত হয়ে উজির আলি হাতেমকে প্রতিনিধি করে মৈনাক রাজ্য শাসন করতে পাঠালেন।
উজির আলি মৈনাক-যাত্রার প্রস্তুতি নিতে লাগলেন। একদিন সকালে অভাবনীয় এক বিপদ দেখা দেওয়ায় আমার সব আশা চিরদিনের মত বিলীন হয়ে গেল, আমি পথের ভিখারিণী হলাম।
একদিন রাত্রে আমি ধর্ম গ্রন্হ পাঠ করছিলাম। রাজা পাশের ঘরে পালঙ্কে শুয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। পাঠ শেষ করে আমি শয্যায় যাবার জন্য তৈরী হচ্ছি, হঠাৎ ভয়ঙ্কর এক মূর্তি আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। ভয়ে আমার সর্বাঙ্গ অবশ হয়ে আসার উপক্রম। আমি চিৎকার করে উঠলাম, রাজার ঘুম ভেঙে গেল। তিনি হন্তদন্ত হয়ে আমার কাছে ছুটে এলেন। আমি বীভৎস দৃশ্যে দেখার কথা বলতেই তিনি সক্রোধে গর্জে উঠলেন—কী ব্যাপার সত্য করে বল। গোপন করার চেষ্টা করবে না। তোমাকে তো আমার পাশে শুয়ে থাকতে দেখেছিলাম, এখানে কি করতে এসেছিলে?
আমি ধর্মগ্রন্হ পাঠের কথা বললাম। তাঁর পাশে সে রাত্রে তখনও শুইনি, এ-কথা বলতেই তিনি আমার হাত ধরে বলপূর্বক শোবার ঘরে নিয়ে গেলেন। পালঙ্কের দিকে নজর পড়তেই আমার মাথায় অকস্মাৎ যেন বজ্রাঘাত হল, হৃদযন্ত্রের গতি রুদ্ধ হবার উপক্রম। তাকিয়ে দেখি সত্যই এক নারী শুয়ে। আমারই মত অবয়ব, একই বেশভূষা, এমন কি মাথার চুলে হুবহু সাদৃশ্য রয়েছে। আমি স্থির থাকতে পারলাম না, হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললাম।
কিছুক্ষণ পরে সংজ্ঞা ফিরে পেতেই সেই রহস্যময়ী নারী ঠিক যেন আমারই কন্ঠস্বর অনুকরণ করে বলল-মায়াবিনী, কে তুই! কোন অভিপ্রায়ে আমার বেশ ধারণ করেছিস সত্য করে বল। তুই ভেবেছিস আমাদের দুজনকে একই রকম দেখে আমার স্বামী তোর অভিপ্রায় বুঝতে পারবে না। আমাকে তাড়িয়ে দিয়ে তোকে শয্যায় গ্রহণ করবেন। সে দূরাশা ত্যাগ করে এক্ষণি এখান থেকে দূর হয়ে যা। তারপর সেই মায়াবিনী রাজার দিকে ফিরে বলল—প্রাণেশ্বর, এই মায়াবিনীকে বন্দী করে অন্ধকারায় নিক্ষেপ কর। জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করে জীবিত অবস্থায় পুড়িয়ে মার।
আমি কান্নাপ্লুত কণ্ঠে বললাম—মহারাজ, আমি ভেবেছিলাম, হয়ত আমার দুর্দিনের অবসান ঘটে সত্যই সুদিন ফিরে এসেছে। সেই সৌভাগ্যেই হয়ত বা আপনার সঙ্গে মিলন হয়েছে। আজ এক মায়াবিনী এসে আমার সুখর স্বর্গ টুকরো টুকরো করে ভেঙে দিচ্ছে। আপনি কি আমাকে চিনতে ভুল করছেন? আপনি বিশ্বাস করুন, আমিই মৈনাক-রাজকন্যা, আপনার বিবাহিতা স্ত্রী।
মায়াবিনী পূর্বস্বর অনুসরণ করে গর্জে উঠল— পাপিষ্ঠা, তোর স্বভাবেই তোর পরিচয় ফুটে উঠেছে। মায়াবিনী কুহকিনীদের প্রধান লক্ষণই হচ্ছে কান্নার আশ্রয় নেওয়া ও শপথে মন ভুলানোর চেষ্টা। তাই কি ভেবেছিস তোর চোখের জলে আমার স্বামীর মন মজাবি?
রাজা ব্যাপার দেখে কেমন অপ্রতিভ হয়ে বললেন—তোমাদের দুজনের মধ্যে একজন অবশ্যই মায়ার আশ্রয় নিয়ে উদ্দেশ্য সিদ্ধির বাসনা নিয়ে আমাকে প্রতারিত করছ। কিন্তু, কে যে আসল, আর কে যে সত্যই মায়াবিনী তা আমি নির্ণয় করতে অক্ষম। অতএব কাকে শাস্তি দিতে গিয়ে কাকে শাস্তি দেব তাও আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। সিদ্ধান্তে একটুকু ভুল হলে সারা জীবন আমাকে অন্তর্জালায় দগ্ধে মরতে হবে।—এ-রকম চিন্তা করে রাজা প্রহরীকে ডেকে উভয়কে পৃথক পৃথক ঘরে বন্দী করে রাখতে নির্দেশ দিলেন।
রাজা পরদিন সকালে আমার ধাত্রী মা ও বৃদ্ধ উজিরকে ডেকে সব কথা বললেন। তাঁরা ব্যস্ত হয়ে ছুটে এলেন। বৃথা চেষ্টা, তারাও আসল-নকল নির্ণয় করে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন না। হঠাৎ ধাত্রী মার একটা কথা মনে পড়ে গেল। জন্মক্ষণ থেকেই আমার পিঠে স্পষ্ট একটা তিল ছিল। কিন্তু, এক্ষেত্রেও হতাশ হতে হল। উভয়ের পিঠেই একই রকম তিলের চিহ্ন দেখতে পেলেন। এতেও তারা হাল ছাড়লেন না। আমাদের দুজনকে বিভিন্ন প্রশ্ন করলেন, একই উত্তর পেয়ে আরও বেশী রকম আশ্চর্যান্বিত হলেন। হঠাৎ বুঝলাম আমার দুর্ভাগ্য ঘনিয়ে আসছে। সবাই আমাকেই দোষী সাব্যস্ত করে বসলেন। জলন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারাই স্থির হল এবং কুহকিনীকেই প্রকৃত রাণী বলে ঘোষণা করা হল।
রাজা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেন—প্রাণদণ্ডের বিনিময়ে নির্বাসনের ব্যবস্থা করলেন। তিনি নিজের মতের স্বপক্ষে যুক্তি দেখালেন, বলা যায় না ভবিষ্যতে এ-ই হয়ত নির্দোষী প্রমাণিত হতে পারে। রাজার আদেশে দাসীরা আমার মূল্যবান পোষাক খুলে ছেড়া একটি কাপড়ের টুকরো পরিয়ে রাজ্যের বাইরে দিয়ে গেল। পথচারীরা দয়া করে সামান্য খাবার দিয়ে যায় বলে আজও প্রাণে বেঁচে আছি। তাই বলছিলাম, রাজকন্যা ও রাজমহিষী হয়েও আমি আজ পথের ভিখারিণী।
চীনারাজ তাঁর কাহিনী শুনে বললেন— মহাশয়া, শোক সম্বরণ করুন। আমি এই মুহূর্তে শুধু এইটুকুই আশ্বাস দিতে পারি, আপনার দুঃখের দিন পার হয়েছে! আর এ-ও আশা রাখছি শীঘ্রই সুখর মখে দেখতে পাবেন। সুখ ও দুঃখ–দুইয়ের পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্য দিয়েই মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রিত হয়। কার্বাসা উজিরের জীবনেও আপনার মত দুর্দিন দেখা দিয়েছিল। তার দুঃখময় দিনগুলির কথা বলছি শুনুন–
প্রাচীন কালে হারকেনিয়া নামে এক নগর ছিল। খোদাবন্দ ছিলেন সেখানকার রাজা। তাঁর উজিরের নাম ছিল কার্বাসা। উজিরের বুদ্ধি ও বিচার-বিবেচনা ছিল খুবই তীক্ষ্ণ। একদিন নদীতে স্নান করার সময়ে তার হাতের আংটিটা হঠাৎ জলে পড়ে গেল। আশ্চর্য ব্যাপার! আংটিটা কিন্তু, জলে তলিয়ে গেল না, বরং শোলার মত জলে ভাসতে লাগল। ব্যাপারটা তাকে খুবই ভাবিয়ে তুলল। তিনি বাড়ি ফিরে চাকরদের আদেশ করলেন, এক্ষুণি আমার মূল্যবান জিনিসপত্র অন্যত্র সরিয়ে ফেল। রাজা শীঘ্রই আমাকে বন্দী করার আদেশ দেবেন। উজিরের আশঙ্কা বাস্তব রূপ নিল। জিনিসপত্র অর্ধেক স্থানান্তরিত হতে না হতেই সেনাপতি সৈন্য নিয়ে এসে উজিরকে হাতকড়া পরিয়ে কারাগারে নিয়ে গেলেন। সৈন্যরা সুযোগের সদ্ব্যবহার করল। উজিরের অবশিষ্ট জিনিসপত্র লুঠ করল।
উজির ছিলেন প্রকৃতই নির্দোষ। শত্রুর কুমন্ত্রণায় রাজা তাকে অন্ধ কারায় নিক্ষেপ করেছেন। প্রহরীরা উজিরের ওপর অত্যাচার করতে লাগল।
দীর্ঘ কয়েকমাস কারাভোগের পর উজিরের আপেল খাওয়ার সখ হল। কারাধ্যক্ষ প্রতিদিন তাঁর জন্য আপেলের ব্যবস্থা করলেন। একদিন সবেমাত্র আপেলটি হাতে দিতে যাবেন, দুটো ইঁদুর ঝগড়া করতে করতে ওটার ওপর এসে পড়ল। স্বাভাবিকভাবেই ওটা খাবার অনুপযুক্ত হল। ব্যাপারটা দেখে তিনি রক্ষীদের বললেন—রাজা শীঘ্রই আমার কারামুক্তির আদেশ দেবেন। কার্যতঃ হলও তাই।
রাজার আদেশে উজির মুক্তি পেলেন। রাজা নিজের কাজের জন্য অনুতাপ প্রকাশ করে বললেন-–তোমাকে ভুল বুঝে শাস্তি দিয়েছি, আবার কাজে যোগ দাও।
উজির ম্লান হেসে বললেন—মহারাজ, দোষ আপনার নয়, আমার অদৃষ্টের। আমি আগেই ইঙ্গিত পেয়েছিলাম, আমার ভাগ্যের চাকা ঘুরছে।
—তুমি আগেই ইঙ্গিত পেয়েছিলে! কি ব্যাপার বল তো? সব খুলে বলে আমার কৌতূহল নিবৃত্ত কর।
উজির মুচকি হেসে প্রসঙ্গ শুরু করলেন—মহারাজ একদিন নদীতে স্নান করবার সময় আঙ্গুল থেকে আংটিটা জলে পড়ে ডুবে না গিয়ে ভাসতে লাগল। বুঝলাম—দুর্দিন ঘনিয়ে আসছে। হাতে হাতে ফলও পেলাম। কারাভোগ কালে এক সময় আমার আপেল খাওয়ার খুবই ইচ্ছা হল। কারাধ্যক্ষ ব্যবস্থা করে দিলেন। একদিন এক ঘটনা ঘটল। দুটো ইঁদুর হুটোপাটি করতে করতে হাতের আপেলটির ওপর পড়ল। ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেল। চীনরাজ এই গল্প শেষ করে বললেন-রাজমহিষী, তোমার দুঃখ কেটে গেছে, সুখের দিন সামনে। আমার অবস্থাও তোমারি মত, মায়াবিনীর চক্করে ঘুরছি। কিন্তু সত্যই মায়াবিনী কিনা, নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছি না।
রাজমহিষীর অত্যুগ্র আগ্রহে চীনারাজ নিজের পরিচয় প্রদান করলেন।
রাত্রির অন্ধকারে বনের গভীরে তাঁরা যখন বাক্যালাপে রত তখন হঠাৎ এক বিচিত্র কাণ্ড ঘটে। তাঁদের চোখের সামনে দিয়ে এক যুবা পুরুষ প্রায় উলঙ্গ অবস্থায় ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেল। রাণী বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন—মহাশয়, ঐ…ঐ আমার স্বামী যাচ্ছেন। চোখ-মুখে দেখে মনে হচ্ছে, দারুণ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন। পর মুহূর্তেই তাঁরা দেখলেন অন্য কে একজন ঘোড়া ছুটিয়ে প্রথম ব্যক্তিকে অনুসরণ করছেন। হাতে কোষমুক্ত সুতীক্ষ্ণ তরবারি। পোষাক-পরিচ্ছদ রক্তে ভিজে জবজবে। তাকে স্পষ্ট বোঝা গেল অগ্রগামী ব্যক্তিকে ধরবার প্রাণপণ প্রয়াস চালাচ্ছেন। রাজমহিষী চিৎকার করে ডাকলেন, তাঁদের কেউ-ই কর্ণপাত করলেন না। ঘোড়সওয়ার দুজনের একই রকম দেহাবয়ব দেখে চীনরাজ বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন–রাজমহিষী এ-রকম অত্যাশ্চার্য ব্যাপার তো জীবনে কোন দিন দেখি নি! ঈশ্বরের কী বিচিত্র খেয়াল। কেন এক ছাঁচে দুজনকে গড়েছেন।
রাজমহিষী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—মহারাজ, আমার দুঃখের কাহিনী বলার সময় যা উল্লেখ করেছিলাম, এবার প্রত্যক্ষ করে বিশ্বাস করতে পারছেন তো?
এমন সময় সেখানে, ঘোড়ার পিঠে চেপে তৃতীয় ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটল। রাজমহিষীকে দেখে ঘোড়া থেকে নেমে অভিবাদন সেরে সামনে দাঁড়ালেন। হঠাৎ উজিরকে দেখে রাজমহিষী বিস্ময় ও আনন্দে অভীভূত হলেন।
উজির সবিস্ময়ে নিবেদন করলে — রাণীমা, আপনাকে এখানে দেখতে পাব, এ কল্পনারও অধিক। আপনাকে নির্বাসন দিয়ে মহারাজ বড়ই দুঃখে দিন কাটাচ্ছিলেন। আজ মায়াবিনীর আসল পরিচয় পেয়েছেন। তাঁকে সমুচিত শিক্ষা দিয়ে নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করেছেন। এখনও প্রাসাদ-কক্ষে তার রক্তাপ্লুত নিথর দেহ পড়ে রয়েছে। আর এক পাপিষ্ঠ রাজার অবয়ব ধারণ করে তাঁর রাজ্য গ্রাস করার চেষ্টা করছিল। রাজা তার প্রতিশোধ নিতে পিছু ধাওয়া করেছেন এই মুহূর্তে রাজাকে সাহায্য করা খুবই দরকার। একাকী থাকলে নিঃসন্দেহে পরাজিত হবেন।
উজিরের কথায় রাজা রাজবমশাহ বললেন—মহাশয়, রাণী খুবই দুর্বলা, আপনি তাঁকে নিয়ে এখানে অপেক্ষা করুন, আমি রাজার সাহায্যে যাচ্ছি। শীঘ্রই তিব্বত রাজাকে বিপদ মুক্ত করে এখানে নিয়ে আসছি।
উজিরের উত্তরের অপেক্ষা না করে রাজবমশাহ ঘোড়া ছুটিয়ে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
রাজবমশাহ বিদায় নিলে রাজমহিষী বললেন— উজির সাহেব, রাজা পারিষদদের পরামর্শে আমাকে মায়াবিনী জ্ঞানে নির্বাসিত করার পরের কাহিনী বলে আমার কৌতূহল নিবৃত্ত করুন।
উজির বললেন–আপনাকে নির্বাসিত করে রাজা মায়াবিনীকে ধর্মপত্নী জ্ঞানে যথোচিত আদর-যত্ন করতে লাগলেন। মায়াবিনীর মায়ায় মজে গিয়ে রাজকার্যে ভাঁটা পড়তে শুর করল। দিনের একটা বড় সময় অন্তঃপরেই কাটাতে লাগলেন। আজ সকালে রাজা আমাকে নিয়ে হরিণ শিকার করতে যাত্রা করলেন। সামান্য পথ গিয়েই ঘোড়া দাঁড় করালেন। আমাকে বললেন,—উজির, আমি একবারটি মহিষীর সঙ্গে দেখা করে আসছি—কথাটি আমার দিকে ছুড়ে দিয়েই ঘোড়া ফিরিয়ে ফেলে আসা পথ ধরলেন। আমিও পিছু নিলাম। সদর দরজার কাছে পৌঁছেই আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। দেখি এক অদ্ধ উলঙ্গ যুবা পুরুষ ঘোড়া ছুটিয়ে প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমি বিস্ময় প্রকাশ করে বললাম, -প্রভু, এ কী বেশ ধারণ করেছেন। অশ্বারোহী কোন জবাব দিল না। আশ্চর্য হলাম প্রভুকে চিনতে মোটেই ভুল করিনি। একই দেহাবয়ব একই চোখ-মুখ…আমাকে না চেনার ভান করে প্রভু উদভ্রান্তের মত ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেলেন। ব্যাপারটা কেমন অস্বাভাবিকই মনে হ’ল। এমন সময় পিছন দিক থেকে চিৎকার শুনলাম—উজির ঐ ঘোড়সোয়ারকে ধর…পিছু নাও–কথা বলতে বলতে মহারাজ রক্তমাখা তরবারি হাতে প্রাসাদ থেকে ছুটে বেরিয়ে এলেন। একলাফে ঘোড়ার পিঠে চেপে পলায়নরত রহস্যময়, যুবকের পিছু নিলেন। আমিও তাঁকে অনুসরণ করলাম।
****
রাজবমশাহ আবার নিজের রাজ্যে ফিরে এলেন।
একদিন গল্পচ্ছলে উজিরকে তিব্বতরাজ ও রাজমহিষীর অত্যাশ্চর্য কাহিনীটি বললেন। রাজা গল্প শেষ করলে উজির বললেন—মহারাজ চিরস্থানীও অবশ্যই কোন মায়াবিনী হবে, তার কুহকে আপনাকে মজিয়ে উদ্দেশ্য সিদ্ধ করতে যাচ্ছে।
রাজবমশাহ উঙ্গিরের কথা বিশ্বাস করে মায়াবিনী চিরস্থানীকে মন থেকে মুছে ফেলে রাজকার্যে মন দিলেন।
একদিন সকালে প্রজারা রাজদরবারে উপস্থিত হল। একজন পরিচারক এসে বলল—মহারাজ প্রাসাদে নেই।
সবাই ব্যস্ত হয়ে রাজার খোঁজ করতে লাগল। উজিরও রাজার বিচ্ছেদে খুবই কাতর হয়ে পড়লেন।
এদিকে চিরস্থানীর নির্দেশে দৈত্যরা রাজবমশাহকে নিয়ে চিরস্থানীর দ্বীপে হাজির হল। চিরস্থানীকে দেখেই তিনি আনন্দে আত্মহারা হয়ে বললেন—প্রিয়ে, আমার ভাগ্য বলেই তোমাকে পুনরায় দেখতে পেলাম। আমার নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল, তুমি আমাকে বিস্মৃত হয়েছ।
চিরস্থানীর চোখের কোণে জলবিন্দু দেখা দিল। তিনি চোখ মুছে বললেন—প্রিয়তম! দৈত্যকন্যাগণ একবার যাকে অন্তরের অন্তঃস্থলে আসন পেতে দেয়, জীবন-যৌবন সপে দেয়, জন্ম-জন্মান্তরেও তাঁকে মন থেকে মুছে ফেলতে পারে না। আমি এতদিন আপনাকে পরীক্ষা করছিলাম। আজ বুঝতে পারছি আপনি সত্যই আমাকে অন্তর থেকে ভালবাসেন।
চিরস্থানী পারিষদদের ডেকে বললেন–আমার হিতাকাঙ্ক্ষিগণ, আমার অভিষেকের মহহূর্তে আপনারা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন আমার যে কোন আদেশ প্রতিপালন করবেন। আমি আজ চীনাধিপতিকে আমার স্বামীত্বে বরণ করছি। আজ থেকে তিনিই এই দ্বীপের সিংহাসনে বসবেন, আপনাদের রাজা হবেন। আশা করি আপনাদের কাছ থেকে রাজার সম্মান তিনি পাবেন।
পারিষদদের সাক্ষী রেখে চিরস্থানী রাজবমশাহকে রাজমুকুট প্রদান করলেন। রাজসভায় হাসি ও আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল। বিয়ের আয়োজনও প্রায় সম্পূর্ণ। চিরস্থানী রাজবমশাহকে বললেন,—মহারাজ, আমাদের মঙ্গলের জন্য উভয়কেই বিয়ের আগেই একটি প্রতিজ্ঞা করতে হবে, প্রতিজ্ঞা ভ্রষ্ট হলে উভয়কেই দুর্ভাগ্যের কবলে পড়তে হবে।
সামান্য ইতস্ততের পর চিরস্থানী বললেন— প্রিয়তম, আমি দৈত্যকন্যা আর আপনি মানবকুলজাত। তাই স্বাভাবিকভাবেই আমাদের রীতিনীতি, আচার-ব্যবহার সম্পূর্ণ ভিন্নতর। তাই বলছিলাম কি, আমি যখন যে কাজই করি না কেন, আপনি তা সমর্থন করে নিলে কোনদিনই আমাদের বিচ্ছেদের সম্ভাবনা থাকবে না।
রাজবমশাহ তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন— প্রিয়ে, এমন একটা সাধারণ ব্যাপার নিয়ে তুমি এমন ভাবছ। যে-কোন রকম অবাঞ্ছিত কাজ হলেও আমি আপত্তি করব না, কথা দিচ্ছি।
চিরস্থানী বললেন—প্রিয়তম, আর একটা নিবেদন, আমার যেকোন কাজ বিরক্তিকর মনে হলেও আমাকে কোনদিন বাধা দেবেন না বা তিরস্কার করবেন না, কথা দিন।
—পরমেশ্বরের নামে শপথ নিচ্ছি, তুমি ন্যায়সঙ্গত মনে করলে, আমি সে কাজে কখনই আপত্তি করব না, কথা দিলাম।
—প্রিয়তম, আপনার ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করেছে। আপনি বিশ্বাস রাখতে পারেন, দৈত্যকন্যা কখনও অন্যায় পথে পা বাড়াবে না।
মহা ধূমধামের সঙ্গে বিয়ের কাজ মিটে গেল।
রাজবমশাহ হেসে বললেন— প্রিয়ে, তুমি নির্দ্বিধায় তোমার প্রতিজ্ঞার কথা বলতে পার। যে-কোন শর্তেই তোমাকে নিজে করে পেতে আমি প্রস্তুত।
রাজা রাজবমশাহ নতুন রাজ্যের কর্ম ভার গ্রহণ করে নিজের চীন রাজ্যের কথা ক্রমে ভুলে যেতে লাগলেন। দেখতে দেখতে একটা বছর কেটে গেল। শুভ মুহূর্তে চিরস্থানী এক দেবতুল্য রাজকুমার প্রসব করলেন। খবর পেয়ে রাজবমশাহ প্রসূতিগৃহে প্রবেশ করে পুত্রের রূপ-সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করে মুগ্ধ হলেন। বার বার চুম্বন সহযোগে পুত্রকে আদর করে রাজা চিরস্থানীর কোলে ফিরিয়ে দিলে তিনি এক পৈশাচিক কাজ করে বসলেন। পুত্রকে সামনের জলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করলেন।
রাজা ব্যাপারটা দেখে মনে মনে খুবই বিস্ময়াপন্ন ও ক্ষুব্ধ হলেন। কিন্তু প্রাক-বিবাহের প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী মুখে কিছুই প্রকাশ করলেন না। তিনি বিষণ্ণ মনে ভাবছেন আমার মত দর্ভাগা পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। ঈশ্বর প্রদত্ত প্রথম ফল মহিষীর খেয়ালে নির্মমভাবে আগুনে দগ্ধে মরল। তার অপদার্থ পিতা পুতুলের মত দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে এমন একটা নির্মম ও গর্হিত কাজ হজম করে নিলে। হায় ঈশ্বর! কেন আমি এমন এক মায়াবিনীর মায়ায় মজে নিজের জীবনকে হাহাকারের মুখে দিলাম! চিরস্থানীর মোহিনী মায়ায় রাজবমশাহ ক্রমে শোক ভুলে গিয়ে নতুন করে আমোদ-আহলাদে মেতে গেলেন। আরও একটি বছর পেরিয়ে গেল। চিরহানী এবার পরমাসুন্দরী এক কন্যারত্ন দান করলেন। কন্যাটি প্রাসাদ আলো করে এর-ওর কোলে কোলে ঘরে বেড়াতে লাগল। রাজ্যজুড়ে আনন্দে মেতে উঠল। কম কথা–কন্যা হয়েছে!
চিরস্থানী কন্যাটিকে তেমনি নির্মমভাবে হত্যা করল না দেখে রাজার আনন্দ যেন আর ধরে না। একদিন ঘটল এক অভাবনীয় ঘটনা। রাজবমশাহ ও চিরস্থানী এক বিকেলে প্রমোদ উদ্যানে কন্যাটিকে নিয়ে আদর করছেন। এমন সময় কোত্থেকে এক সাদা কুকুরী ছুটে এসে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে লেজ নাড়তে লাগল। সেই মুহূর্তে চিরস্থানী এক অত্যাশ্চর্য কাণ্ড করে বসলেন। কুকুরীর সামনে নিজের কন্যাটিকে ছুঁড়ে দিলেন। মুহূর্তের মধ্যেই কুকুরীটি তাকে কামড়ে ধরে ছুটে চোখের আড়ালে চলে গেল।
রাজবমশাহ রাণীর এই পৈশাচিক কাজে খুবই ক্রুদ্ধ হলেন। তিরস্কার করতে উদ্যত হয়েও পূর্বে কৃত প্রতিজ্ঞার কথা স্মরণ করে নিজেকে সংযত করে নিলেন। ক্রমে চিরস্থানীর দ্বীপ তাঁর কাছে অসহ্য হয়ে উঠতে লাগল। দেশে ফিরে যাওয়াই শেষ পর্যন্ত সাব্যস্ত করলেন। একদিন চিরস্থানীকে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে বলেই ফেললেন—প্রিয়ে! বহুদিন আমি রাজ্য ছাড়া। একবারটি প্রজাদের দেখে আসার জন্য মনে খুবই চাঞ্চল্যবোধ করছি! তোমার অনুমতি পেলে কিছুদিনের জন্য স্বরাজ্যে যেতে পারি।
চিরস্থানী বললেন—প্রিয়তম, তোমার প্রার্থনা পূরণ করতে আমার আপত্তির কিছুই নেই। কিন্তু এ-সময়ে আপনার সেখানে না যাওয়াই সঙ্গত। কারণ বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পারলাম মোংগলরা তোমার রাজ্য আক্রমণের তোড়জোড় করছে। যাক, চিন্তার কিছু নেই, তুমি গিয়ে সৈন্য পরিচালনা করে দেশকে শত্রুমুক্ত করে আস। প্রয়োজনবোধে আমিও গিয়ে তোমার পাশে দাঁড়াব।—চিরস্থানী কয়েকজন দৈত্যকে ডেকে রাজবমশাহকে চীনরাজ্যে পৌঁছে দিতে নির্দেশ দিলেন।
চিরস্থানীর নির্দেশে দৈত্যরা রাজবমশাহকে চীনরাজ্যে দিয়ে এল। চীনরাজ্যের উজির রাজাকে বহুদিন পর কাছে পেয়ে খুবই আনন্দিত হলেন। রাজাকে তিনি বললেন—মহারাজ, এতদিন আমার ওপর যে গুরুভার অর্পিত ছিল তা আমি আপনার হাতে ফিরিয়ে দিচ্ছি। আমাকে দায়মুক্ত করনে। রাজা স্বহস্তে দায়িত্বভার গ্রহণ করে রাজকার্যে মন দিলেন।
এক সময় মোংগলরা রাজ্যের সীমানায় শিবির স্থাপন করল। রাজবমশাহও শত্রু সৈন্যের প্রস্তুতির খবর পেয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে লাগলেন। ওয়েলি নামক এক সেনাপতির উপর যুদ্ধের যাবতীয় দায়িত্বভার অর্পিত হল।
রাজবমশাহর শিবিরে একদিন বহুদৈত্য সহ চিরস্থানীর আকস্মিক আবির্ভাব ঘটল। দৈতরা অবিশ্বাস্য কাণ্ডে মেতে গেল। রাজবমশাহর সৈন্যদের জন্য সংগৃহীত খাদ্য ও সমরাস্ত্রগুলো নষ্টের কাজে মেতে উঠল।
দৈত্যদের এ-রকম ধ্বংসাত্মক কাজে ওয়েলি খুবই মর্মাহত হলেন। চিরস্থানী তাকে প্রবোধ দিতে গিয়ে বললেন—ওয়েলি তোমার ভয়ের কিছু নেই। তোমার প্রভুকে গিয়ে বল, আপনার মহিষী সৈন্যদের সমস্ত খাদ্য নষ্ট করে দিয়েছেন।
ওয়েলি দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে রাজার কাছে গিয়ে ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করলেন।
ক্রোধোন্মত্ত রাজা পূর্ব প্রতিজ্ঞার কথা ভুলে গিয়ে রাণীর এরকম অদ্ভূত আচরণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে বললেন—কী ব্যাপার! তুমি বার বার এমন নাশকতামূলক কাজ করছ কেন? পুত্রকে জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ করলে, কন্যাকে কুকুরীর মুখে ছুঁড়ে দিলে, আজ আমার সৈন্যদের রসদ নষ্ট করেছ—তোমার উদ্দেশ্য কি জানতে চাই? তুমি কি চাও, আমি বিনাযদ্ধে মোংগলদের হাতে নির্মমভাবে বন্দী হই? তুমি পাপীয়সি! তুমি ডাইনি। তোমাকে বিশ্বাস করার ফল হাতে হাতে পাচ্ছি।
চিরস্থানী শান্তম্বরেই কথা কটা ছুঁড়ে দিলেন—মহারাজ, আপনি প্রতিজ্ঞা পালন করতে পারলে আমরা চিরদিন সুখ থাকতে পারতাম। প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে আপনি সে-পথে কাঁটা দিলেন। আমাদের অদৃষ্টের দোষেই আপনার মুখে দিয়ে ক্ষোভের কথা বেরিয়েছে, নইলে এমন তো হবার নয়! আপনার কথার জবাব দিচ্ছি। যে জলন্ত অগ্নিকুণ্ডে আমাদের পুত্রকে নিক্ষেপ করেছিলাম, তিনি অগ্নিকুণ্ডরূপী দৈত্যদের কুলপুরোহিত। নাম তার কাকলাশ। আর যে কুকুরী কন্যাকে নিয়ে অদৃশ্য হলেন, তিনি এক স্বর্গ বিদ্যাধরী। কন্যাকে নাচ-গানে পারদর্শী করার উদ্দেশ্যেই তাঁর হাতে কন্যাকে তুলে দিয়েছিলাম। কথা শেষ করে এক দৈত্যকে দিয়ে পুত্র কন্যাকে রাজার সামনে তুলে ধরে তাঁর ভুল শুধরে দিলেন। একমাত্র রাজবমশাহ ব্যতীত কোন নরই তাদের দেখতে পেলেন না।
পত্রে কন্যাকে দেখে রাজবমশাহ আনন্দে আত্মহারা হয়ে তাদের বুকে তুলে নিলেন। চিরস্থানী কর্তৃক যুদ্ধের রসদ ধংসের ক্ষোভ ভুলে গেলেন। চিরস্থানী এবার বললেন—মহারাজ, এবার বলছি শুনুন, কেন আপনার সৈন্যদের রসদ ধ্বংস করেছিলাম। মোংগলরাজ আপনার সেনাপতি ওয়েলিকে প্রচুর উৎকোচ দিয়ে হাত করে নিয়েছে। সেই বিশ্বাসঘাতক যাবতীয় খাদ্যদ্রব্যে শক্তিশালী বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল। আমি ওগুলো নষ্ট না করলে হয়ত আপনি সমূলে ধ্বংস হয়ে যেতেন। আমাকে বিশ্বাস না হলে ওয়েলিকে ডেকে খাদ্যদ্রব্যের কিছু অংশ খেতে বলনে, হাতে হাতে আমার কথার সত্যতা প্রমাণ পেয়ে যাবেন।
রাজার আদেশে ওয়েলি ছুটে এলেন। তিনি ওয়েলিকে সামান্য খাদ্য আহার করতে বলায় তিনি হঠাৎ কেমন মিইয়ে গেলেন! আমতা আমতা করে বললেন—মহারাজ, এখন আমার ক্ষিধে নেই, সময় মত আপনার নির্দেশ অবশ্যই পালন করব।
রাজবমশাহ ব্যাপারটা বুঝতে পেরে তীরবিদ্ধ বাঘের মত উঠলেন,— দুরাত্মা, আমার আদেশ লঙ্ঘন করলে তোমাকে এই মহাতেই জীবন্ত পাড়িয়ে মারব।
ওয়েলি ভয়ে ভয়ে সামান্য খাদ্যদ্রব্য মুখে দিতেই বিষ জ্বালায় ছটফট করে অচিরেই মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।
চিরস্থানী বললেন—প্রিয়তম, এবার অবশ্যই বুঝতে পারছ দৈত্যকন্যারা বিনা কারণে এমনতর কাজ করে না।
লজ্জিত ও অনুতপ্ত রাজবমশাহ বললেন— প্রিয়ে, আমার ভ্রম দূর হয়েছে। না বুঝে যে অন্যায় করেছি, তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। যুদ্ধ নিকটে, সর্বাগ্রে সৈন্যদের রসদের ব্যবস্থা করা দরকার।
চিরস্থানী বললেন—প্রিয়তম বৃথা চিন্তা করে সময় নষ্ট করার মত সময় হাতে নেই। এক কাজ করুন, আজ রাত্রেই অতর্কিতে মোংগলদের শিবির আক্রমণ করুন। শত্রুসৈন্য আকস্মিক আক্রমণে ছত্রভঙ্গ হয়ে পলায়ন করবে। এই সুযোগে আপনি তাদের যাবতীয় রসদ হস্তগত করে নেবেন।
চিরস্থানীর পরামর্শনুযায়ী চীনসৈন্য ও দৈত্যসৈন্য একত্রিত হয়ে রাত্রির অন্ধকারে অতর্কিতে মোংগলদের শিবিরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। উদ্দেশ্যে সিদ্ধ হল। মোংগলসৈন্য অতর্কিতে আক্ৰমণ সইতে না পেরে প্রাণ নিয়ে কোনরকমে পালিয়ে বাঁচল। তাদের যাবতীয় খাদ্যদ্রব্য রাজবমশাহের হস্তগত হল।
চিরস্থানী এবার বললেন—প্রিয়তম, সময় শেষ হয়েছে, তুমি এবার নিজরাজ্যে ফিরে যাও, আমাদের বিদায় নিতে হবে। আমার পক্ষে আর তোমার সান্নিধ্যে থাকা সম্ভব নয়। এখন থেকে আমাদের বিচ্ছেদের পালা শুরু হল।
রাজবমশাহ বিচ্ছেদ-ব্যথার আতঙ্কে শিউরে উঠে বললেন প্রিয়ে, আমার কাজের জন্য অনুতপ্ত মর্মাহত। নিজগুণে ক্ষমা করে নাও। তোমাকে ছেড়ে জীবন ধারণ আমার পক্ষে অসম্ভব। কথা দিচ্ছি। ভবিষ্যতে কোনদিনই তোমার কাজের প্রতিবাদ করব না।
—প্রাণেশ্বর, আমাকে ভুল বুঝো না। তোমাকে ছেড়ে থাকতে আমারও যে কী মর্মান্তিক দুঃসহ যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে তা ব্যাখ্যা করা সাধ্যাতীত। কিন্তু, দৈত্যকুলের চিরপ্রচলিত প্রথা লঙ্ঘন করা আমার সাধ্যাতীত। কথা শেষ করেই চিরস্থানী পুত্র-কন্যাসহ চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
প্রাণেশ্বরীর অন্তর্ধানে রাজবমশাহ শোকে-দুঃখে খুবই কাতর হয়ে পড়লেন। উজিরকে ডেকে বললেন—তুমি রাজ্যশাসনের দায়িত্বভার গ্রহণ কর। আমি প্রাসাদের এককোণে ইষ্টদেবতার নামগান করে জীবনের বাকী দিনগগুলি কাটিয়ে দিতে চাই। রাজকার্যের কোন ঝামেলার মধ্যে আমাকে জড়াবে না।
রাজবমশাহ নিজ প্রাসাদেই নিঃসঙ্গ জীবন কাটাতে লাগলেন। শোকে-দুঃখে তার দেহ একেবারে কঙ্কালসার হয়ে গেল। দশ-দশটি বছর এমনি কৃচ্ছ্রতার মধ্যে কেটে গেল। একদিন চিরস্থানীর আবির্ভাব ঘটল। তিনি ক্ষীণকায় রাজার শিয়রে দাঁড়িয়ে বললেন— প্রিয়তম, তোমার মৃত্যু আসন্ন জেনে ছুটে আসতেই হল। আমি যদি এতকাল আমার চিন্তায় এমনি বিভোর না থাকতে তবে আমার পক্ষে তোমার কাছে আসা সম্ভব ছিলনা। আজ আমাদের বিচ্ছেদকাল উত্তীর্ণ হয়েছে। তুমি এবার তোমার পুত্র-কন্যাকে ফিরে পাবে। চিরস্থানীর কথা শেষ হতে না হতেই রাজপুত্র ও রাজকন্যা সেখানে উপস্থিত হলেন। রাজবমশাহ আনন্দে আত্মহারা হয়ে পুত্র-কন্যাকে জড়িয়ে ধরে বুকের জ্বালা নেভালেন। চিরস্থানী জীবনের শেষের দিনগগুলি পুত্র-কন্যাসহ রাজার সান্নিধ্যে সমুখেই কাটালেন। রাজবমশাহ-যুবরাজ চীনের সিংহাসনে বসে প্রজাপালনে মন দিলেন। আর রাজকন্যা? রাজকন্যা সেই দ্বীপে গিয়ে দৈত্যদের রাণী হয়ে সুখরাজ্যশাসন করতে লাগলেন।
ধাত্রী ফরখোনাজ রাজবমশাহ ও চিরস্থানীর কাহিনী শেষ করে গল্পটি সম্বন্ধে সখীদের মনোভাব জানার জন্য বার বার এর-ওর মুখের দিকে অনুমান করলেন গল্পটি প্রত্যেকেই উপভোগ করেছে। শাহাজাদী ও সখীরা সবাই একবাক্যে বাহবা দিয়ে উঠলেন। ধাত্রী ফোকলা দাঁতে হেসে বললেন,—এমন অনেক পুরুষের কথা আমি জানি যারা প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তত। আগ্রহী হলে কৌলফ ও দেলেরার কথা তোমাদের শোনাতে পারি।
