উজিরের কারামুক্তি
বোগদাদের সুলতান হারুণ-অর রসিদ আবুল কাসেমের প্রদত্ত উপহারসহ এতদিন প্রতিটি মূহর্তে অনুতাপের জ্বালায় দগ্ধে মরছিলেন। তাঁর এই অনুতাপের একমাত্র কারণ উজির। নিরপরাধী লোকটাকে কারারুদ্ধ করেছেন। ব্যস্ত হয়ে তিনি কারাগারে ছুটে গিয়ে উজিরকে কারামুক্ত করে তাঁর হাত দুটো ধরে বিনম্র স্বরে উচ্চারণ করলেন–উজির, ভুল বুঝে তোমাকে কারারুদ্ধ করেছি। আবুল কাসেমের ধন-ভাণ্ডারে গিয়ে বুঝলাম তোমার কথাই সত্য। তাঁর সান্নিধ্যে দুদিন কাটিয়ে এ-সত্যই উপলব্ধি করলাম লোকটা শুধুমাত্র অপরিমিত ধন-সমুদ্রের অধিকারীই নন, তার চরিত্রে হাজারো গুণের সমাবেশ ঘটেছে। আমি তোমার কাছে পরামর্শ চাচ্ছি, বল কি দিয়ে তাঁর গুণের সম্বর্ধনা জানাব? তবে একটা কথা স্মরণ রেখো, শাহনশা বাদশা হয়ে তো আমার পক্ষে তার কাছে হীনতা স্বীকার করা সম্ভব নয়! কেউ ধন-সম্পদ বা চারিত্রিক গুণাবলীতে মহীয়ান হলেও, বাদশার সঙ্গে তুলনা চলে কি?
উজির কয়েক মুহূর্তে নীরবে ভেবে মুখ খুললেন–জাঁহাপনা! বসোরারাজ আপনার করদ—সবাই বলে লোকটা নাকি খুবই অত্যাচারী ও প্রজাপীড়ক। আমি ভাবছি, যদি বসোরার রাজপদে কাবুল কাসেমকে প্রতিষ্ঠিত করেন প্রজাদের মাথার ওপর থেকে অত্যাচারের বোঝা নেমে গেলে তারা হয়ত একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে। আর এর মধ্য দিয়েই আবুল কাসেমকে যথাযোগ্য মর্যাদা দান করাও হবে।
সুলতান উজিরের পরামর্শ’কে সৎ ও যুক্তি-যুক্ত বলে মেনে নিলেন। শুভস্য শীঘ্রম। রাজসভায় গিয়ে এক নির্দেশনামা লিখে দূত মারফৎ বসোরারাজের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। উজিরকে বললেন–তুমিও আবুল কাসেমের কাছে চলে যাও। আমার আদেশপত্র নিয়ে গিয়ে বসোরার রাজসিংহাসনে অভিষিক্ত করবে।
সুলতানের আদেশ পালন করতে দূত ও উজির ঘোড়া ছুটিয়ে দুদিকে রওনা হলেন।
সুলতান হারুণ-অর-রসিদের দূত বসোরারাজের হাতে নির্দেশনামা তুলে দিল। রাজা ব্যস্ত হয়ে নির্দেশনামা পাঠ করেই রীতিমত স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। অস্থিরচিত্ত রাজা তাঁর মন্ত্রণাদাতা উজিরকে ডেকে পাঠালেন।
কূটবুদ্ধির নাজির বৃদ্ধ উজির বললেন—এখন আমাদের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য আবুল কাসেমের সর্বনাশ করা। যে-কোন ভাবে তাঁকে বেকায়দায় ফেলতে হবে। তবে হ্যাঁ, বলপ্রয়োগে নয়, চাতুর্যে’র সাহায্যেই উদ্দেশ্য সিদ্ধির চিন্তা করতে হবে।
রাজা বৃদ্ধ উজিরের কূটবুদ্ধির প্রতি যথেষ্ট আস্থাবান! তিনি আশান্বিত হয়ে বললেন—ঠিক আছে, তোমার ওপরই দায়িত্ব ছেড়ে দিচ্ছি, যা ভাল বোঝ কর।
উজির দূতকে ডেকে বললেন,— তুমি এক কাজ কর, দুদিন এখানে অপেক্ষা কর। এতটা পথ ঘোড়া ছুটিয়ে এলে, আবার যদি সঙ্গে সঙ্গে রওনা দিতে হয় খুবই কষ্ট হবে। দুটো দিন বিশ্রাম করে তারপর যেয়ো।
সুলতানের দূতকে কৌশলে দুদিন আটকে রেখে কয়েকজন সভাসদ সঙ্গে নিয়ে বৃদ্ধ উজির আবুল কাসেমের বাড়ি গেলেন। বসোরারাজের উজির, যথোচিত সমাদর তো করতেই হবে। আবুল কাসেম উজির ও সভাসদদের অভ্যর্থনা করে একটি সজ্জিত ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালেন। কিন্নরীদের তলব করে নাচ-গানের ব্যবহা করলেন। সাদৃশ্য পাত্রে সুরা ঢেলে দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। উজির সুযোগ বুঝে আবুল কাসেমের সুরার পাত্রে গোপনে একরকম তেজী বিষের গুড়ো মিশিয়ে দিলেন। আবুল কাসেম সুরার পাত্রটি ঠোঁটে ছুঁইয়েই সংজ্ঞা হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন। কিন্নরীরা ব্যস্ত হয়ে শুশ্রুষা করতে লাগল। সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে আবুল কাসেমের দেহ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। উজিরের সঙ্গীরা আসল ব্যাপারটা জানতেন না। আবুল কাসেমের আকস্মিক মৃত্যুতে তাঁরা শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়লেন। কিন্তু কূটবুদ্ধির নায়ক বৃদ্ধ উজির? তিনিও চুপ করে বসে থাকলেন না বুকফাটা আর্তনাদ জড়ে বসলেন। কপট শোকের বহিঃপ্রকাশ একটু বেশীমাত্রায়ই দেখাতে হয়। কিছুক্ষণ পরে শোক সম্বরণ করে আবুল কাসেমের নিঃসাড় দেহ একটা সিন্দুকে রেখে তালাবন্ধ করলেন। উপস্থিত সবাইকে লক্ষ্য করে উচ্চারণ করলেন—আবুল কাসেমের উত্তরাধিকারী অভাবে তাঁর যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রাজার অধিকারভুক্ত করা হল। এ-ব্যাপারে আপনাদের কারো কোন বক্তব্য থাকলে উত্থাপন করতে পারেন। উপস্থিত সবাই নীরবে উজিরকে সমর্থন করলেন। কূটবুদ্ধির উজির এভাবে উদ্দেশ্য সিদ্ধি করে বসোরারাজের কাঁটা দূর করলেন।
আবুল কাসেমের আকস্মিক মৃত্যুসংবাদ লোক মুখে দেশ-বিদেশে প্রচারিত হয়ে গেল। রাজ্যের সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে এল।
উজির আবুল কাসেমের সমাধির ব্যবস্থা করলেন! দেশের শোকগ্রস্ত আবাল-বৃদ্ধ বনিতা কাঁদতে কাঁদতে সমাধি ক্ষেত্রের দিকে ছুটতে লাগল।
উদ্দেশ্য—এমন একটা মহৎপ্রাণ অকালে চলে গেল যদি শেষবারের মত চোখে দেখে জীবন সার্থক করা যায়।
সিন্দুক থেকে আবুল কাসেমের মৃতদেহ বের করে গরম জলে ধুইয়ে পবিত্র করে সমাধিস্থ করার ব্যবস্থা করা হল। গরম জলের সংস্পর্শে এসে কিছু ক্ষণের মধ্যেই আবুল কাসেমের দেহে চেতনা ফিরে এল।
চোখ মেলে তাকিয়ে উজিরকে জিজ্ঞেস করলেন–আমি কোথায় আছি এখানে এত লোক কেন? কি হয়েছে?
আবুল কাসেমের দেহে চেতনা ফিরে এসেছে দেখে উজিরের পিঠে কে যেন হঠাৎ চাবুক মারল। বিস্ময় বিস্ফারিত চোখে আবুল কাসেমের দিকে তাকিয়ে থেকে এক সময় গর্জে উঠলেন— তোর ধনভাণ্ডার কোথায় শীঘ্র বল? এখানে তোর এমন কোন সুহৃদ নেই যে তোকে রক্ষা করে। ধনভাণ্ডারের খোঁজ না দিলে এক্ষুণি তোকে কেটে দু’টুকরো করে দেব। বল… বল কোথায় তোর ধনভাণ্ডার?
আবুল কাসেম ক্ষীণ স্বরে জবাব দিলেন—পাপিষ্ঠ! এখন আমি তোর জিম্মায় রয়েছি, তোর প্রাণে যা চায় কর। ধড়ে প্রাণ থাকতে ধনাগারের সন্ধান দেব না।
ব্যাপার সুবিধার নয় অনুমান করে উজির রক্ষীদের আদেশ করলেন নচ্ছারটাকে পিঠমোড়া করে বাঁধ।
উজিরের আদেশ মুহূর্তের মধ্যে পালিত হল। উজির তীব্র ক্ষোভের সঙ্গে করাতের মত তীক্ষ্ণ চাবুক দিয়ে নির্মমভাবে আবুল কাসেমকে ঘন ঘন আঘাত করতে লাগলেন। বিষ জ্বালায় জর্জরিত আবুল কাসেমের দূর্বল শরীর বেশীক্ষণ চাবুকের আঘাত সইতে পারল না, পুনরায় সংজ্ঞা হারিয়ে ঘাসের ওপর লুটিয়ে পড়লেন। উজিরের নির্দেশে আবার তাঁকে কাঠের সিন্দকে তালা বন্ধ করা হল। ভাগ্যাহত আবুল কাসেমের সংজ্ঞাহীন দেহ কবরস্থ করে সবাই চলে গেলেন।
সকাল হলে উজির রাজপ্রাসাদে গিয়ে বসোরারাজকে আবুল কাসেমের মৃত্যু সংবাদ দিলেন। খবরটা শুনে তিনি আনন্দিত হলেন বটে, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সুলতান হারুণ-অর-রসিদের দূত অপেক্ষা করছে, তাকে কি সংবাদ দিয়ে পাঠাবেন?
উজির ব্যাপারটাকে মোটেই আমল না দিয়ে বললেন—জাঁহাপনা এটা কোন সমস্যাই নয়। সুলতানকে বলে পাঠান, আবুল কাসেম হঠাৎ সিংহাসন লাভের সংবাদটা পেয়ে আর মাথা ঠিক রাখতে পারে নি, উল্লসিত হয়ে অধিক সুরাপান করতে গিয়ে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যায়।
বসোরারাজ উজিরের পরামর্শানুযায়ী চিঠি লিখে সুলতানের দূতের হাতে দিলেন।
দূত বিদায় নিয়ে বসোরার দিকে যাত্রা করল। উজির পরদিন সন্ধ্যায় মাটি খুড়ে সিন্দুক দেখতে পেলে, সিন্দক খুলতেই চক্ষ হির। এ যে রীতিমত অভাবনীয় ব্যাপার! সিন্দুক যে ফাঁকা! নিজের ভবিষ্যৎ বিপদের কথা চিন্তা করে ছুটতে ছুটতে বসোরারাজের কাছে গেলেন, দুঃসংবাদটা দিলেন।
দঃসংবাদটা কানে যেতেই বসোরারাজ তো মাথায় হাত দিয়ে বসলেন, উজিরকে বললেন—দেখুন, ব্যাপারটা খুবই দুর্ভাবনায় ফেলেছে। আবুল কাসেম যখন কবরে নেই, নিশ্চয়ই তাকে কেউ না কেউ পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। সে যদি বোগদাদে গিয়ে সম্রাটের কাছে আমাদের ষড়যন্ত্রের কথা ফাঁস করে দেয় তবে আপনার সঙ্গে আমারও মৃত্যু অনিবার্য।
উজিরও ভবিষ্যৎ-বিপদের সম্ভাবনায় খুবই মুষড়ে পড়লেন। কপালে হাত দিয়ে বসে কাঁদতে লাগলেন—হায় হায়। সামান্য ভুলের জন্য নিজের পায়ে নিজেই কুড়োল মারলাম! একটু বুদ্ধি করে নচ্ছারটাকে যদি খুন করে মাটিতে পুঁতে রাখতাম, তবে আর আজ এমন করে ভাবতে হত না। উজির কান্না থামিয়ে একসময় বললেন—হুজুর বসে বসে ভাবলে বিপদের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না। চলুন আমরা দু’জনে দু’দল সৈন্য নিয়ে উভয় দিকে ঘোড়া ছুটাই। আবুল কাসেম হয়ত বেশীদূর যেতে পারে নি, অবশ্যই ধরে ফেলতে পারব।
এদিকে উজির জাফর ঘোড়া ছুটিয়ে বসোরাভিমুখে আসছিলেন, পথে দূতের সঙ্গে দেখা। দূত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—হুজুর, কেন আর কষ্ট করে বসোরা যাচ্ছেন, আবুল কাসেম আর ইহজগতে নেই, আমি নিজের চোখে তার সমাধিক্ষেত্র দেখে এলাম। অতএব দেশে ফিরে চলুন।
জাফর বিষণ্ণ মনে প্রশ্ন করলেন-–আবুল কাসেম মারা গেছেন? তুই নিজের চোখে তাঁকে সমাধিস্থ করতে দেখেছিস?
দূত জবাব দিল—না, হুজুর, লোকের মুখে শুনলাম, তবে পরে গিয়ে সমাধিক্ষেত্র দেখেছি।
জাফর দূতের সঙ্গে স্বদেশে ফিরে এলেন। সুলতান হারুণ-অর-রসিদকে আবুল কাসেমের মৃত্যু সংবাদ দিলেন। তাঁর আকস্মিক মৃত্যু সংবাদ শুনে সুলতান মূর্ছিত হয়ে পড়লেন। পারিষদদের সেবা-যত্নে কিছু ক্ষণের মধ্যে সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে সহ হলেন। দূতের হাত থেকে বসোরারাজের প্রেরিত পত্রটা নিয়ে পড়লেন। কয়েক মুহূর্ত নীরবে ভেবে নিয়ে এক সময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—উজির, ব্যাপারটা কিন্তু আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। বসোরারাজ রাজ্য হারানোর আশঙ্কায় হয়ত বা তাঁকে হত্যা করে পথের কাঁটা সরিয়ে দিয়েছে। আর চারদিকে প্রচার করে দিয়েছে, সুরাপানের ফলে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু হয়েছে। তুমি সসৈন্য বাসোরা যাত্রা কর, বসোরারাজকে বন্দী করে আমার সামনে হাজির কর।
.
এদিকে আবুল কাসেম চৈতন্য ফিরে পেয়ে তালাবন্ধ সিন্দকের মধ্যে যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছিলেন। এমন সময় বুঝলেন, কে যেন সিন্দুকের তালা ভাঙছে। ভাবলেন-–হয়ত উজির আবার ফিরে এসেছে, প্রহার করবে। সমূহ নির্যাতনের সম্ভাবনায় তিনি কাঁদতে লাগলেন।
সিন্দকের ডালা তুলে লোকটা বলল—হুজুর, আমি উজির বা তাঁর লোক নই। বৃথা ভয় পাবেন না। নির্যাতন নয়, আপনাকে উদ্ধার করতে এসেছি।
আবুল কাসেম দুর্বল হাত দুটো দিয়ে জলে ভেজা চোখ দুটো মুছে বিস্মিত হলেন! দেখেন একজন পুরুষ ও একজন যুবতী তাঁর দিকে সহানভূতির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। যুবতীকে চিনতে দেরী হল না। যাকে তিনি সেদিন ধনাগার দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন, সেই আজ তাঁর দুঃসময়ে উদ্ধার করতে এসেছে।
বালকেশী করযোড়ে নিবেদন করলেন—মহাত্মা, আপনাকে উদ্ধার করতে এসেছি। ইনি আমার ভাবী স্বামী যুবরাজ আলি।
যুবরাজ আলি যথোচিত সম্মানের সঙ্গে নিবেদন করলেন— মহাত্মা, প্রিয়তমা বালকেশীর মুখে আপনার এই বিপদের কথা শুনে ছুটে এসেছি। আপনাকে নির্যাতন নয়, মক্ত করাই আমাদের উদ্দেশ্য।
বালকেশী বলল—আমার পিতা যে ধন-সম্পদের লোভে আপনার অনিষ্ট করবেন, আগেই অনুমান করেছিলাম। আপনার মৃত্যু সংবাদ প্রচার করা হলে মনে কেমন সন্দেহ জাগল। পিতার এক বিশ্বস্ত কিন্নরকে অর্থের দ্বারা বশীভূত করে ব্যাপারটা জানতে পারলাম। যুবরাজকে সংবাদ পাঠালাম। তিনি ব্যস্ত হয়ে ছুটে এলেন। আমরা কালবিলম্ব না করে রাত্রির অন্ধকারে গোপনে আপনাকে উদ্ধার করতে এসেছি।
আবুল কাসেম বিস্ময়বিস্ফারিত চোখে যুবতীর দিকে তাকিয়ে ভাবলেন—বিধির কী আশ্চর্য সৃষ্টি, এমন নিষ্ঠুর ঘরে এ-রকম গুণশীলা দয়াবতী কন্যা জন্মেছে।
যুবরাজ আলি ব্যস্ততা প্রকাশ করে বলল–প্রভু, এভাবে নিশ্চিন্ত নীরবে বিপদ ডেকে আনা সঙ্গত নয়, যে-কোন সময় উজির লোকজন নিয়ে চলে আসতে পারেন। এমন কি ব্যাপারটা তাঁর কানে গেলেও যথেষ্ট বিপদের সম্ভাবনা। চলুন, আপনাকে নিরাপদ আশ্রয়ে লুকিয়ে রেখে আসি।—কথা বলতে বলতে তাড়াতাড়ি আবুল কাসেমকে ছদ্মবেশ পরিয়ে নিজের বাড়ি নিয়ে গেলেন। বালকেশী একা চুপিচুপি বাড়ি গেল।
এদিকে বসোরারাজ এবং উজির আবুল কাসেমের সন্ধানে রাজ্য তোলপাড় করতে লাগলেন। সাধ্যাতীত চেষ্টা-চরিত্র করেও কোন সন্ধান না পেয়ে হতাশ মনে প্রাসাদে ফিরে গেলেন। তবুও আশা ছেড়ে নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকলেন না। চারদিকে সৈন্য মোতায়েন করলেন আবুল কাশেমকে দেখলেই বন্দী করে তাঁর সামনে হাজির করার জন্য।
যুবরাজ আলি নিজের ঘরে আবুল কাসেমকে রাখা নিরাপদ মনে করলেন না। একটা তেজী ঘোড়া ও বহুমূল্য রত্ন সঙ্গে দিয়ে রাত্রির অন্ধকারে তাঁকে দূরদেশে পাঠাবার ব্যবস্থা করলেন।
আবুল কাসেম মুহূর্ত মাত্র সময় নষ্ট না করে যুবরাজের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বোগদাদের দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন। ভাবলেন বোগদাদ নগরের যে ফকির তাঁর আতিথ্য গ্রহণ করে কদিন তার বাড়ি ছিলেন। বিদায় কালে যাকে বহুবিধ ধনরত্নে পুরস্কৃত করেছিলেন, তাঁর খোঁজ করে দিন কয়েকের জন্য গা-ঢাকা দেবেন।
আবুল কাসেম বোগদাদে পৌঁছে অনেক খোঁজাখুজি করেও তার ইপ্সিত ফকিরের সন্ধান পেলেন না। একদিন ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত হয়ে রাজপ্রাসাদের সামনেরর চত্ত্বরে বিষণ্ন মনে বসেছিলেন প্রাসাদের জানালা দিয়ে একটি বালক বাইরে তাকিয়েছিল। হঠাৎ আবুল কাসেমের দিকে চোখ পড়তেই সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে সুলতানের কাছে ছুটে গিয়ে বলল— জাঁহাপনা, আমার প্রতিপালক আবুল কাসেম এখানে এসেছেন।
সুলতান হারুণ-অর রসিদ বালকের কথা বিশ্বাস করতে না পেরে বললেন-–আবুল কাসেম, এ-পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। তুই হয়ত ভুল দেখেছিস। বালক বহুদিন যার সান্নিধ্যে কাটিয়েছে তাকে চিনতে ভুল করার কথা নয়। সে কথায় অধিকতর দৃঢ়তা প্রকাশ করে বলল—জাঁহাপনা, এতটুকু বয়স থেকে যাঁকে দেখে এসেছি, তাকে চিনতে কিছুতেই ভুল করতে পারি না।
উলতান ব্যাপারটাকে তবুও তেমন আমল দিলেন না। তবে বালকের ভুল ভাঙাবার জন্য একজন অনুচরকে বালকের সঙ্গে দিলেন ব্যাপারটা সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হবার জন্য।
বিধির বিচিত্র লীলা! বালক যখন অনুচরের সঙ্গে প্রাসাদের দরজা দিয়ে বেরিয়ে সামনের দিকে এগোচ্ছিল আবুল কাসেমও অবাক হয়ে ভাবছেন, কী ব্যাপার বালকটিকে আমার সেই বালকের মত মনে হচ্ছে, সে এখানে, এই রাজপ্রাসাদে এল কি করে! এমন সময় বালক দৌড়ে গিয়ে আবুল কাসেমকে জড়িয়ে ধরল।
আবুল কাসেম অবাক বিস্ময়ে বালকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন—কি ব্যাপার। তুমি রাজপ্রাসাদে এলে কি করে?
ছোট্ট ছেলেটি উৎফুল্ল হয়ে বলল–হুজুর আপনি কিছু দিন আগে যে ফকিরকে প্রচুর ধনরত্নসহ আমাকেও উপহার দিয়েছিলেন, তিনিই ছদ্মবেশী সুলতান হারুণ-অর রসিদ।
বালকের মুখে একথা শুনে আবুল কাসেম উৎফুল্ল চিত্তে সুলতানের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। বোগদাদেশ্বর তাঁকে কাছে পেয়ে আলিঙ্গন করলেন। অভ্যর্থনা করে তাকে সিংহাসনের একপাশে বসালেন। সুলতান বললেন— আবুল কাসেম, আমার দূত বসেরা থেকে ফিরে এসে আপনরে মৃত্যু সংবাদ দিয়েছিল। এ-সম্বন্ধে আপনি কিছু জানেন কি?
কাসেম সুলতানের কাছে একে একে সব ঘটনা বিস্তারিতভাবে বললেন।
সুলতান চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—দেখুন এখন বুঝতে পারছি, যা কিছু ঘটেছে তার জন্য আমিই দায়ী।
বসোরারাজের কাছে দূত পাঠিয়েছিলাম তাকে সিংহাসনচ্যুত করে আপনাকে অভিষিক্ত করতে। যাক, ঈশ্বরকে অশেষ ধন্যবাদ, আপনি জীবন ফিরে পেয়েছেন। আমার নির্দেশ উজির সৈন্য নিয়ে বসোরা গেছে সেই দুরাত্মাকে বন্দী করে আনতে।
সুলতান আবুল কাসেমকে নিয়ে প্রমোদ উদ্যানে গেলেন। সেখানে অতিথি আবুল কাসেমের সম্বর্ধনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একদল রূপসী যুবতী চোখ ঝলসানো পোষাক ও অলঙ্কারে সজ্জিতা, নাচ-গানের মধ্য দিয়ে মনোরম একটা পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। আবুল কাসেম আগ্রহের সঙ্গে নাচ দেখছিলেন। এমন সময় সম্রাজ্ঞী উদ্যানে এলেন। আবুল কাসেম যথোচিত সম্মানের সঙ্গে নতজানু হয়ে সম্রাজ্ঞীকে প্রণাম করার সময় যে যুবতীরা নাচ গান করছিল, তাদের মধ্যে একজন হঠাৎ বিকট চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে পড়ল। আবুল কাসেম সম্রাজ্ঞীকে প্রণাম সেরে ওঠার সময় আচমকা মূর্ছিতা যুবতীর দিকে নজর পড়তেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তাঁর মধ্যেও কেমন যেন অস্বাভাবিকতা লক্ষিত হল। আবুল কাসেম বার কয়েক হাত-পা ছোঁড়াছাড়ি করে এক সময় সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললেন। ব্যাপার দেখে সুলতান খাবই ভীত হয়ে পড়লেন। অনেক সেবা শুশ্রূষার পর আবুল কাসেম চেতনা ফিরে পেয়ে সুলতানকে বললে-জাঁহাপনা, কায়রো নগরে যে ঘটনা আপনাকে বলেছিলাম, হয়ত মনে আছে। প্রভুত সম্পদের অধিকারী হয়েও আমি দার্দেনির জন্য দিবারাত্রি পথ চেয়ে বসেছিলাম। আমার প্রেমে অধীরা দার্দেনি কায়রোরাজের আদেশে সমুদ্র গর্ভে পতিত হয়েছিল, এই সেই দার্দেনি।
বাদশা বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন—ঈশ্বরের কী অপার করুণা, আপনি আপনার প্রিয়তমা দার্দেনিকে ফিরে পেলেন।
পরিচারিকাদের সেবায় দার্দেনি সংজ্ঞা ফিরে পেলে সুলতান জিজ্ঞেস করলেন—দার্দেনি, তুমি তো সমদ্রগর্ভে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলে রক্ষা পেলে কিভাবে?
দার্দেনি সুলতানের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বললেন—সমদ্রে ভাসতে ভাসতে এক জেলের জালে আটকা পড়ি।—তীরে ওঠানোর সময় আমার শ্বাস-প্রশ্বাস খুবই ক্ষীণভাবে চলছিল। শুশ্রুষা করে সুস্থ করে তাদের ঘরে নিয়ে যায়। তারা এক দাসী-বিক্রেতার কাছে আমাকে বিক্রী করে দিল। দাসী বিক্রেতা পুনরায় আমাকে এই সম্রাজ্ঞীর কাছে বিক্রী করে দেয়।
দার্দেনি তাঁর দুঃখের কাহিনী শেষ করলে সুলতান বললেন–আবুল কাসেম আপনার উপকারের প্রত্যুপকারের এই উপযুক্ত সুযোগ। দার্দেনির দাসীত্ব মোচন করে তাকে আপনার হাতে উৎসর্গ করতে যাচ্ছি। মঙ্গলময়, ঈশ্বরের কাছে আপনাদের ভবিষ্যৎ সখী জীবন কামনা করছি।
সুলতান আবুল কাসেম ও দার্দেনির বিয়ের ব্যবস্থা করলেন। মহাধূমধাম ও আনন্দ-ফুর্তির মধ্য দিয়ে তাদের বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের অনুষ্ঠান মিটে গেলে একদিন আবুল কাসেম সুলতানকে বললেন—মহানুভব আমার যা কিছু সম্পদ রয়েছে সবকিছু, আপনার হাতে তুলে দিয়ে আমি শঙ্কামুক্ত হতে চাই। আমার বিশ্বাস, একমাত্র আপনার দ্বারাই ওগুলোর সদ্ব্যবহার হতে পারে।
বাদশাহ অসম্মতি প্রকাশ করে বললেন, তোমার ধন তুমি ভোগ কর, আমার প্রয়োজন নেই। তোমাদের দীর্ঘ ও সুখী জীবন কামনা করি।
কয়েকদিনের মধ্যেই উজির জাফর বসোরারাজের দুর্মতি উজিরকে শৃঙ্খলিত করে বোগদাদের সুলতানের কাছে নিয়ে এল। আবুল কাসেমের পলায়নে ভীত-সন্ত্রত হয়ে বসোরারাজ আত্মহত্যা করে ইতি মধ্যেই ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছেন। সুলতান বসোরাজার উজিরের প্রাণদণ্ডের আদেশ দিলেন।
উজিরের মৃত্যুদন্ডের কথায় আবুল কাসেম ব্যথিত ও মর্মাহত হয়ে সুলতানের কাছে তাঁর জীবন রক্ষার কাতর মিনতি করলেন।
আবুল কাসেমের কথায় সুলতান বিস্মিত হয়ে বললেন— আপনি কী মশায়! একদিন যে লোকটা আপনাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছিল, আজ আপনি সেই নরাধমের প্রাণ ভিক্ষা চাচ্ছেন! আপনার মত দয়ালু হৃদয়বান বিরল। আপনার মহানুভবতায় আমি মুগ্ধ। পাপিষ্ঠকে আমি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করলাম।
বসোরার উজিরকে দণ্ডাদেশ দিয়ে সুলতান আবুল কাসেমকে বললেন—মহাশয়, আমার অভিলাষ আপনি বসোরার সিংহাসনে বসে প্রজাদের হিতসাধনে ব্রতী হোন।
আবুল কাসেম সম্রাটের কথার জবাব দিতে গিয়ে বললেন—জাঁহাপনা, আপনার আদেশ শিরোধার্য। কিন্তু আমার একটি বিনীত নিবেদন রয়েছে, অনুগ্রহ করে বসোরার সিংহাসনে আমার পরিবর্তে যুবরাজ আলিকে অভিষিক্ত করুন! সে আমার জীবন রক্ষা করেছিল, তার কাছে কৃতজ্ঞতা পাশে আমি আবদ্ধ।
সুলতান আবুল কাসেমের প্রার্থনা পূর্ণ করলেন। যুবরাজকে বসোরার সিংহাসনে অভিষিক্ত করা হল। আবুল কাসেমের এই অসামান্য ত্যাগের কথা দেশ-বিদেশে প্রচার হল, লোকের মুখে মুখে ঘুরতে লাগল মহত্বের কথা।
আবুল কাসেম কিছুদিন সস্ত্রীক সুলতানের আতিথ্য গ্রহণের পর শুভ মুহূর্তে বসোরা গমন করলেন।
.
ধাত্রী গল্প শেষ করে সখীদের মন্তব্য শুনতে চাইলেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সুলতান হারুণ-অর-রসিদকে এক বাক্যে মহৎ বলে মেনে নিল।
আবার কেউ বা তাদের উক্তিকে নস্যাৎ করে দিয়ে বলে উঠল—সুলতান নয়, মহত্বের দাবী করতে পারেন আবুল কাসেম। এতকাল পরে দার্দেনির সঙ্গে পুনরায় দেখা হয়। ইতিমধ্যে তিনি প্রভুত সম্পত্তির অধিকারী হয়েছেন। এত পরিবর্তনেও প্রেয়সীর প্রতি প্রেম অক্ষুণ্ণই ছিল, তাকে বুকে টেনে নিলেন। তার পরেও যদি বলতে হয়, বসোরার যুবরাজ তাঁর জীবন রক্ষা করেছিলেন, প্রতিদানে বসোরার সিংহাসনে তাকে বসিয়ে যথেষ্ট ত্যাগ ও মহত্বের পরিচয় দিয়েছেন।
বৃদ্ধা ধাত্রী সখীদের কথা শুনে বললেন–আবুল কাসেম মহৎ সন্দেহ নেই। প্রেমিক হিসাবে তিনি শ্রেষ্ঠত্বের দাবী রাখেন এটাও অনস্বীকার্য, সত্য। তার মনে সিংহাসনের প্রতিও কোন লোভ ছিল না। এমন অনেক নির্লোভ ব্যক্তির কথা আমি জানি, পৃথিবীর পার্থির অপার্থিব কোন কিছুর ওপরই তাদের বিন্দুমাত্র লোভ-লালসা নেই। এ-রকমই একজন নির্লোভ মহৎ ব্যক্তির কথা বলছি শোন।
