শুভ মিলন

শুভ মিলন

বৃদ্ধা ধাত্রী এভাবে নানারকম গল্পচ্ছলে সুলতানের কন্যা ফরোখনাজকে হিতোপদেশ দান করতে লাগলেন। কিন্তু কোন কিছুতেই চঞ্চলা ফরোখনাজের মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হল না। কন্যার অবস্থা দেখে সুলতান খুবই ভাবিত হয়ে পড়লেন।

দীর্ঘ দিন পরে এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটল। এক কাক-ডাকা সকালে ফরোজনাজ মঠে উপস্থিত হলেন। মঠরক্ষীরা তাকে অভ্যর্থনাসহ মঠের ভিতরে নিয়ে গেলেন! মঠের প্রাচীরের গায়ে কৃতিশিল্পীর নিপুণ তুলির টানে আঁকা বহুবর্ণের সুদৃশ্য চিত্র ছিল। অত্যুৎসাহী সুলতান-কন্যা চারদিক ঘুরে ঘুরে চিত্রগুলি দেখতে লাগলেন।

অসংখ্য চিত্রের একত্র সমাবেশ ঘটলেও মাত্র দুটি চিত্রের দিকে ফরোখনাজ বিশেষভাবে আকৃষ্ট হল। একটি চিত্র শিল্পী এক হরিণীকে ব্যাধের জালে আটক অবস্থায় দেখিয়েছেন। হরিণটিকে জাল থেকে মুক্তি দেবার জন্য হরিণ প্রাণপণে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আর দ্বিতীয় চিত্রটিতে দেখানো হয়েছে, এক হরিণ ব্যাধের জালে আটক পড়েছে। হরিণীটি ব্যাধের জালে হরিণকে আটকা পড়তে দেখে প্রাণভয়ে দৌড়ে বাঁচাবার চেষ্টা করছে। ভুলেও হরিণটির কথা ভাবেনি।

চিত্র দুটি ফরোখনাজের মনে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করল। তিনি তন্ময় হয়ে ভাবতে লাগলেন। আমার এতদিনের ধারণা কি তবে ভুল? আমি যে স্বপ্ন দেখেছিলাম পুরুষ জাতি অত্যন্ত নিষ্ঠুর, আত্মকেন্দ্রিক, তা তো নয়।

ফরোখনাজ যখন এমনি ভাবনায় বিভোর তখন অকস্মাৎ সেখানে ধর্ম যাজক এসে উপস্থিত হলেন। তাঁকে দেখেই তিনি যথোচিত ভক্তিসহকারে প্রণাম করে সসম্ভ্রমে এক পাশে দাঁড়ালেন। ধর্মযাজক ছোট্ট করে হেসে ডান হাতটি সামান্য উত্থিত করে আশীর্বাদ করলেন।

ধর্ম যাজক ঠোঁটের কোণে অনুরূপ-হাসির রেখা টেনে বললেন—মা। এতদিন তুমি ভ্রান্ত পথে চলে নিজেই নিজেকে দগ্ধে মেরেছ। আমার কথা যদি শোন বলছি, তুমি তোমার মতিগতির পরিবর্তন করে ধর্ম কর্মের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত কর। ঈশ্বরের সাধনায় নিজেকে লিপ্ত কর। মনের শান্তি ও স্বস্তি ফিরে পাবে, জীবনকে আর এক মুহূর্তের জন্যও দুর্বিষহ মনে হবে না। অজ্ঞানতার কুয়াশা কেটে গিয়ে ভোরের আলো ফুটে উঠবে। জ্ঞানের আলোর সংস্পর্শে এসে আত্ম পবিত্রতার পথে এগিয়ে যাবে। যথার্থ আত্মিক উন্নতি হবে।

ধর্ম যাজকের কথায় ফরোখনাজের দু’চোখের কোণে জলবিন্দু দেখা দিল। ওড়নার কোণ দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বললেন প্রভু। এতদিনে আমার ভুল ভেঙেছে। আজ আমি মনস্থির করে ফেলেছি। ধর্ম পথই আজ আমার কাছে একমাত্র অবলম্বন। পিতাকে আর কষ্ট দেব না। পিতার নির্দেশ পালন করব। আমি বিয়ে করে পিতার মনস্কামনা পূর্ণ করব।

সুলতান কন্যার মত পরিবর্তনের কথা শুনে খুবই আনন্দিত হলেন। কন্যার বিয়ের জন্য চারদিকে লোক পাঠিয়ে উপযুক্ত পাত্রের সন্ধান করতে লাগলেন।

পাত্রের খোঁজ পাওয়া গেল। কাশ্মীরের সুলতান বয়সে যুবক। সুদর্শন যুবাপুরুষ। শুভ মুহূর্তে কাশ্মীরের সুলতানের হাতে তিনি তাঁর প্রাণের ফরোখনাজকে তুলে দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। রাজ্যজড়ে আনন্দ-উৎসব শুরু হয়ে গেল। নবদম্পতি সুসজ্জিত উটের পিঠে চড়ে কাশ্মীর-রাজ্যের দিকে এগিয়ে চললেন।

সমাপ্ত

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *