দার্দেনির কথা

দার্দেনির কথা

যুবতী তার রূপ-যৌবনের ডালিকে সামান্য আন্দোলিত করে একটা নড়েচড়ে বসে তার জীবন কথা শুরু করল —শোন আমার নাম দার্দেনি। দামাস্কা নগরের সুলতানের উজির ছিলেন আমার পিতা। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ, সজ্জন ও চরিত্রবান পুরুষ। নিজ প্রভুর প্রতি তাঁর মনে অগাধ ভক্তি-শ্রদ্ধা ছিল, আর প্রজাদের প্রতি ছিল খুবই স্নেহ-মায়া-মমতা। প্রজারাও তাঁকে খুবই শ্রদ্ধা করত। মানুষের ভাগ্যচাকা ঘুরপাক খায়, চিরদিন সমান যায় না। স্বয়ং সুলতান থেকে শুরু করে এমনকি প্রজারা পর্যন্ত আমার পিতাকে স্নেহ ভক্তি করত দেখে কয়েকজন ঈর্ষা-পরায়ণ ব্যক্তি গাত্রদাহে জর্জরিত হতে লাগল। তারা প্রতিদিন সুলতানের কাছে আমার পিতার বিরুদ্ধে মিথ্যা ঘটনা সাজিয়ে নানাভাবে দোষী করার চেষ্টা করতে লাগল। সুলতান শেষ পর্যন্ত ধূর্ত সভাসদদের কথায় বিশ্বাসী হয়ে আমার পিতাকে নির্বাসনদণ্ড দিলেন। আমি তখন মাত্র কয়েক বছরের শিশু মাত্র।

আমার পিতা অনন্যোপায় হয়ে স্বদেশ পরিত্যাগ করলেন। অন্যত্র গিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিলেন। আমার শিক্ষার জন্য তিনি নানাভাবে চেষ্টা করতে লাগলেন। দূর্ভাগ্যবশতঃ আমার শিক্ষালাভ হ’ল না তাঁর অকাল মৃত্যুর জন্য। আমার মায়ের স্বভাব ভাল ছিল না। পরপুরুষের প্রতি তার খুবই আসক্তি ছিল। আমাকে এক মহাজনের কাছে বিক্রি করে দিয়ে তিনি উপপতির সঙ্গে অন্যত্র চলে গেলেন।

সেই মহাজন অন্যান্য যুবতীদের সঙ্গে আমাকেও হাটে নিয়ে পসরা সাজিয়ে বসলেন। দেশের সুলতান হাটে নারী ক্রয় করতে এসে আমার রূপ-লাবণ্য দেখে মুগ্ধ হ’য়ে প্রচুর ধনরত্নের বিনিময়ে আমাকে কিনে নিলেন। অন্তপুরের একটি ঘর আমার বসবাসের জন্য নির্ধারণ করে দিলেন। কয়েকজন দাসদাসীও আমার সেবা-যত্নের জন্য নিযুক্ত করলেন।

সুলতান আমার রূপে পাগলপারা। একদিন আমার ঘরে এসে বিনীতভাবে ব্যক্ত করলেন—সুন্দরী, তোমার রূপ আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমি তোমাকে নিজের করে পেতে চাই। আমার প্রতি সদয় হও, তুমি আমার হও।

আমি সুলতানের কথায় প্রতিবাদ করতে গিয়ে বললাম— জাহাপনা কেন আমাকে মিছে মিছি দুঃখ দিচ্ছেন। আমি সামান্য নারী, আপনার পক্ষে নিতান্তই অনুপযুক্তা।

সুলতান কিন্তু আমার আচরণে মোটেই ক্রোধ প্রকাশ করলেন না, বরং আমাকে অবাক করে দিয়ে দিন দিন আমার প্রতি ভালবাসা প্রদর্শন করতে লাগলেন। সুলতানের আচরণে সুলতান মহিষিগণ আমার প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ হলেন। তাঁরা ষড়যন্ত্র করতে লাগলেন কি করে আমাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়। আমি প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত সতর্ক দৃষ্টি রেখে চলতে লাগলাম। আমার সতর্কতা অবলম্বনের ফলে তাদের পক্ষে আমার প্রাণনাশ করা সম্ভব হ’ল না।

সুলতান ছিলেন যথার্থই পুরুষ এবং প্রেমের পূজারী। আমি কিন্তু এতকিছু সত্ত্বেও সুলতানের প্রতি অনুরক্ত হতে পারিনি। বিধির কী বিচিত্র বিধান! তোমাকে প্রথম দর্শনের দিনই তোমার চরণে এই অভাগিনীর মন-প্রাণ সঁপে দিয়েছি। তোমার কাছে আমার একটাই বিনীত অনুরোধ, তোমার ভালবাসা থেকে যেন মুহূর্তের জন্যও আমাকে বঞ্চিত করো না।

যুবতীর কথায় আমার প্রেম-পাগল মনে অদ্ভুত একটা রোমাঞ্চ অ্নুভব করলাম। তার মায়া-কাজল মাখানো চোখ দুটির দিকে তাকিয়ে আবেগের সঙ্গে উচ্চারণ করলাম—প্রেয়সী, আজ থেকে আমি তোমার চরণের দাস হ’লাম। আমার একটাই মিনতি, কোনদিন আমাকে অবজ্ঞা করো না।

কি করে যে আমার প্রথম প্রেমের রাত্রিটুকু কেটে গেল বুঝতেই পারি নি। শেষ রাত্রির দিকে আমরা উভয়েই কেমন যেন অবসাদগ্ৰস্ত হ’য়ে পড়লাম। ক্লান্তিতে চোখের পাতা জড়িয়ে আসছি।। বুঝলাম প্রেয়সীর একটু বিশ্রাম প্রয়োজন। বাধ্য হয়েই শোয়ার ব্যবস্থা করছিলাম। এমন সময় ঘটল অঘটন! বাইরে থেকে কে যেন দরজায় করাঘাত করছে। প্রথমে ভাবলাম মনের ভুল। উৎকর্ণ হয়ে ব্যাপারটা উপলব্ধি করার চেষ্টা করলাম। হ্যাঁ, করাঘাতই বটে। কে যেন ঘন ঘন করাঘাত করছে, আর চিৎকার করে বলছে—দরজা খোল, দরজ। খোল!

দার্দেনি প্রমাদ গুণল! ভয়-বিহ্বল চোখ দু’টো মেলে আমার দিকে তাকাল—কেলেঙ্কারী ঘটতে চলেছে! সুলতানের কণ্ঠস্বর! আর রক্ষা নেই, এক্ষণি আমাদের কোতল করবে!

সুলতানের কথা কানে যেতেই আমার অন্তরাত্মা খাঁচাছাড়া হবার উপক্রম। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হ’য়ে স্থবিরের মত দাঁড়িয়ে থাকলাম। পালাবার কোন সম্ভাবনাই নেই।

আবার সুলতানের তর্জন-গর্জন কানে এল—এখনও বলছি দরজা খোল! যদি প্রাণে বাঁচার ইচ্ছা থাকে দরজা খোল বলছি।

দার্দেনি নিরুপায় আমাকে খাটের তলায় ঢুকিয়ে দিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতদুটো দিয়ে কোনরকমে দরজার ছিটকিনি খুলে ভীত-সন্ত্রস্ত মুখে দরজার একপাশে দাঁড়িয়ে থাকল।

ক্রোধোন্মত্ত সুলতান কোষমুক্ত তীক্ষ্ণ তরবারি হাতে আস্ফালন করতে করতে ঘরে ঢুকলেন—দুশ্চরিত্রা রমণী, বল কাকে ঘরে ঢুকিয়েছিস? কার সঙ্গে প্রেমালাপে এতক্ষণ মজেছিলি? এতদিনে ব্যাপারটা আমার কাছে পরিষ্কার হল। কেন আমাকে বার বার প্রত্যাখান করেছিস। প্রাণের দোসরটিকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস, ভাল চাস তো বল।

সুলতানের সঙ্গে কয়েকজন খোজা প্রহরী মশাল হাতে সেখানে উপস্থিত ছিল। সুলতান তাদের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললেন—সং-এর মত হাঁ করে তাকিয়ে কি দেখছিস? যা— কোথায় দুরাত্মা ঘাপটি মেরে রয়েছে, টেনে বের কর।

খোজা প্রহরীরা সুলতানের আদেশ পালন করতে গিয়ে হন্যে হ’য়ে চারিদিকে ছুটোছুটি শুরু করে দিল। শেষ পর্যন্ত আমাকে খাটের তলা থেকে টানাটানি করে বের করে আনল। আমার অবস্থা তখন প্রাণে মরা। কণ্ঠনালীর কাছে আত্মাটা কোন রকমে আটকে রয়েছে এই মাত্র।

আমাকে দেখেই সুলতান সক্রোধে গর্জে উঠলেন—ওরে দুশ্চরিত্র পাপী! তোর পাপ পূর্ণ করতে শেষ পর্যন্ত বাঘের থাবায় এসে হাজির হয়েছিস! আমার মান-সম্ভ্রম নষ্ট করতে তোর আত্মাটা এতটুকু কাঁপল না! তোর পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য তৈরী হ।

কথা কটা শেষ করতে না করতেই সুলতানের হাতের তরবারি ঝিলিক মেরে উঠল। মাথার ওপর তীক্ষ্ণ তরবারি তুলে আমাকে দ্বিখণ্ডিত করতে যাবেন, হঠাৎ এক অভাবনীয় কাণ্ড ঘটে গেল। এক অশীতিপরা বৃদ্ধা চিৎকার করে সুলতানের তরবারির সামনে এসে দাঁড়াল—জাঁহাপনা এ কী করছেন আপনি। এই পাপীর প্রাণনাশ করতে গিয়ে আপনার পবিত্র হাত কলুষিত করবেন! তাছাড়া শুধু এর দোষ দিয়ে কি হ’বে। এরা উভয়েই এক পাপকার্যে লিপ্ত, শাস্তি উভয়েরই হওয়া উচিত। আমার কথা শুনুন, দু’জনকেই সমদ্রগর্ভে নিক্ষেপ করুন। কুমির ও হাঙরে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ক্ষিদে মেটাক, তিলে তিলে দগ্ধে মরুক।

বৃদ্ধার কথায় সুলতান তরবারি সংযত করলেন। প্রহরীদের নির্দেশ দিলেন আমাদের দু’জনকেই বেধে সমদ্রগর্ভে নিক্ষেপ করতে। প্রহরীরা সুলতানের আদেশ পালন করল। প্রাসাদ চূড়া থেকে আমাদের সমুদ্রগর্ভে নিক্ষেপ করল।

আমি দেহে যথেষ্ট শক্তি ধরি, সাঁতারেও কম পটু নই। সামান্য চেষ্টা করতেই দেহের বাঁধন খুলে গেল। প্রাণপণে উন্মত্ত সমুদ্রের সঙ্গে লড়াই করতে করতে কোনরকমে তীরে এসে উঠলাম। হঠাৎ দার্দেনির অসহায় অবস্থার কথা মনে পড়তেই দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্যে হ’য়ে আবার সমুদ্রে ঝাঁপ দিলাম। বৃথা চেষ্টা। দার্দেনিকে ফিরে পেলাম না, ভগ্ন হৃদয়ে আবার তীরে ফিরে এলাম। নিজেকে সান্তনা দেবার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। বার বার মনে হ’তে লাগল। আমিই ভাগ্যহীনার মৃত্যুর কারণ। নিজের অজান্তে দু’চোখের কোণে জলবিন্দু দেখা দিল।

দার্দেনিকে হারিয়ে আমি উদভ্রান্তের মত হ’য়ে পড়লাম। মনে জমাট বাধা ব্যথা-বেদনা নিয়ে কায়রো নগর ত্যাগ করে বোগদাদের দিকে যাত্রা করলাম। দার্দেনিকে ভোলা সম্ভব নয়। যত চেষ্টা করি মনকে হাল্কা করতে, বার বারই তার সেই অসহায় মুখটি চোখের সামনে ফুটে ওঠে।

দিনের পর দিন হেঁটে ক্লান্ত-অবসন্ন শরীরে এক পাহাড়ের পাদদেশে হাজির হলাম। পাহাড়টি অনুচ্চ হলেও খুবই জঙ্গলাকীর্ণ। ওটাকে অতিক্রম করার চেষ্টা না করে এক ঝর্ণার ধারে সমতল পাথরের ওপর রাত্রি কাটানো মনস্থ করলাম। শরীর ও মন দুই-ই দুর্বল। বুকে হতাশার শকুনির দৌরাত্ম। আমার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও দার্দেনির কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে একটা তন্দ্রাভাব এসেছিল বুঝতে পারিনি। রাত্রি তখন তৃতীয় প্রহর হবে হয়ত। হঠাৎ এক রমণী কন্ঠের কাতর আর্তনাদে তন্দ্রা ভেঙে সোজা হয়ে বসলাম। দূরাগত করণে স্বরটা যে কোন দিক থেকে ভেসে আসছে প্রথমটায় বুঝে উঠতে পারিনি। নীরবে উৎকণ’ হ’য়ে ওটাকে লক্ষ্য করতে চেষ্টা করলাম। কয়েক মুহূর্ত পরে আবার সেই আতনাদ! কেমন যেন অস্থির-চঞ্চল হ’য়ে পড়লাম। আর্তস্বর লক্ষ্য করে ব্যস্ত হয়ে ছুটে গিয়ে দেখি, এক বৃদ্ধ গর্ত খুড়ছে। গত খোঁড়া শেষ হলে একটা কাঠের বাক্স টানাটানি করে কাছে নিয়ে এল। অনেক কষ্টে সেটাকে গর্তের মধ্যে নামিয়ে মাটি চাপা দিয়ে তাড়াতাড়ি চলে গেল। আমি একটা গাছের আড়াল থেকে নিঃশব্দে ব্যাপারটা লক্ষ্য করছিলাম।

কিছুক্ষণের মধ্যেই পাখির ডাকে সকাল হ’ল। আমি গর্তের কাছে এসে মাটি সরিয়ে কাঠের বাক্সটা বের করলাম। ব্যস্ত হয়ে ডালাটা খুলতেই আমার সর্বাঙ্গ থরথরিয়ে কাঁপতে লাগল। রক্ত চলাচল দ্রুততর হ’ল। এক রূপসী যুবতী রক্তে মাখামাখি হয়ে বাক্সের মধ্যে পড়ে রয়েছে। আত্মাটা তখনও দেহ আশ্রয় করে রয়েছে। অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত দেহটাকে টেনে বাক্সের বাইরে বের করে আনলাম। ক্ষতস্থান দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। চেহারা ও পোষাক-পরিচ্ছেদ দেখে মনে হ’ল নিশ্চয়ই কোন ভাগ্যাহতা রাজ-কন্যা। আমি ভয়ে ভয়ে যুবতীর মুখের কাপড় সরাতেই সে রীতিমত করুণ স্বরে আর্তনাদ করে উঠল—দয়া কর, আমাকে আর মেরো না! আমি আর সইতে পারছি না, একটু দয়া কর, আমাকে বাঁচতে দাও! মেরো না……আর মেরো না!

আমি তাকে অভয় দিতে গিয়ে শ্লেষ্মা জড়িত ভাঙা ভাঙা গলায় উচ্চারণ করলাম–তোমার ভয় নেই, তোমাকে মারতে নয়, বাঁচাতেই চাই। পরম দয়াময়ের ইচ্ছায় আমি এখানে হাজির হয়েছি। নইলে এই নির্জন-নিরালা পার্বত্য জঙ্গলে আমিই বা কেন রাত্রি কাটাতে আসব বল? তুমি শান্ত হও, বল তো কে এই পাষণ্ড যে তোমার মত একটা রূপসীর দেহে অস্ত্র চালাতে ইতস্তত করেনি?

যবর্তী ক্ষীণকণ্ঠে উচ্চারণ করল—আমি জানি না আপনি কে? ঈশ্বরের কাছে আপনার মঙ্গল কামনা করছি। অনুগ্রহ করে একটু জল দিয়ে আমার আত্মাটাকে রক্ষা করুন।

আমি ছুটে গিয়ে ঝর্ণার জলে আমার জামাটা ভিজিয়ে এনে যুবতীর তৃষ্ণার্ত আত্মাটা তৃপ্ত করলাম।

কয়েক মুহূর্তে নীরবে কাটিয়ে যুবতী আবার মুখ খুলল-মহাশয়, আমার শরীর থেকে যেভাবে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, আমি হয়ত আর বেশীক্ষণ বাঁচব না।

আমি তার কথার জবাব দিয়ে বৃথা কালক্ষয় না করে তাড়াতাড়ি জামাটা ছিঁড়ে তার ক্ষতস্থানগুলো জড়িয়ে রক্তক্ষরণ বন্ধ করলাম। আর এক ঢোক জলপান ক’রে যুবতী যেন আত্মাটা ফিরে পেল। অপেক্ষাকৃত পরিষ্কার স্বরে বলল— জানি না, আপনি কে? আপনার নামধাম বংশ পরিচয় কিছুই আমার জানা নেই। স্বীকার করতে দোষ নেই, আপনার অশেষ করুণাই আমাকে জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে, আপনার ঋণ অপরিশোধ্য। এখন আমার একটাই প্রার্থনা, যে ভাবেই হোক আমাকে লোকালয়ে নিয়ে চলন। আমাকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তোলার ব্যবস্থা করুন।

আমি সহৃদয়তার সঙ্গে প্রশ্ন করলাম—সুন্দরি, কে তুমি? কার কন্যা তুমি? তোমার কে কে আছে জানিয়ে আমাকে কৌতূহল মুক্ত কর।

যুবতী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—সে অনেক কথা তবে এটুকু বলতে পারি, আপনার ভয়ের কোনই কারণ নেই। পথে কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবেন, এ আমার বোন, পথে দস্যুর কবলে পড়ে এ দুর্দশা হয়েছে।

আমি আহত যুবতীকে নিয়ে এক সরাইখানায় গিয়ে উঠলাম। সরাইখানার কর্মাধ্যকে বললাম—দেখুন মশায়, দস্যুর কবলে পড়ে আমাদের এ-দুর্গতি। আমাদের যা কিছু ছিল সবই ওরা ছিনিয়ে নিয়েছে। আমার বোনের এখনও ক্ষীণ জীবনের আশা রয়েছে, অনুগ্রহ করে আশ্রয় দিলে হয়ত শুশ্রূষার দ্বারা সুস্থ করে তুলতে পারব।

আমার কাতর প্রার্থনায় কর্মাধ্যক্ষের মনে দয়ার সঞ্চার হ’ল। তাঁর অনুগ্রহে আশ্রয় পেয়ে গেলাম। এবার সাহসে ভর করে দ্বিতীয় নিবেদন রাখলাম—আর একটা কথা, আমরা বিদেশী, এখানে কাউকেই চিনি না। অনুগ্রহ করে একজন ভাল চিকিৎসকের সন্ধান দিলে খুবই উপকার হয়।

কর্মাধ্যক্ষ আমাকে আশ্বাস দিয়ে চিকিৎসকের সন্ধানে বেরোলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন চিকিৎসককে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এলেন। অভিজ্ঞ চিকিৎসক মাসাধিক কাল কঠোর পরিশ্রম করে যুবতীটিকে সুস্থ করে তুললেন।

রোগ নিরাময় হলে যুবতীটি একদিন আমার হাতে একটি চিঠি দিয়ে বলল—এই নগরের শেষে মাহীর নামে এক সওদাগর রয়েছেন তাঁকে এটা দিয়ে আসবেন।

সওদাগর আমার হাত থেকে যুবতীর প্রদত্ত পত্রটি পাঠ করে আমার হাতে বেশ কিছু সংখ্যক স্বর্ণ মুদ্রা দিলেন যুবতীকে দেবার জন্য।

মুদ্রাগুলো হাতে পেয়ে যুবতীর তো মহা উল্লাস! আমাকে বলল, একটি বেশ বড়সড় ও ভাল বাড়ি কেনার ব্যবস্থা করতে!

সুন্দর একটি প্রাসাদ তুল্য বাড়ি কেনা হল। সরাইখানার অধ্যক্ষকে তাঁর প্রাপ্য মিটিয়ে দিয়ে আমরা সদ্য ক্রয়করা বাড়িতে উঠে এলাম।

কিছুদিন পর আবার আর একটি চিঠি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে সেই সওদাগরের কাছে যেতে বলল। চিঠির বক্তব্য পড়ে তিনি এবার কিছু স্বর্ণ মুদ্রা আমার হাতে তুলে দিলেন।

যুবতীর নির্দেশে সেই স্বর্ণ মুদ্রা দিয়ে কিছু অত্যাবশ্যক জিনিস, মূল্যবান কাপড়-চোপড় এবং জনাকয়েক দাস-দাসী কিনে আনলাম। সেই চিঠি, সওদাগর এবং স্বর্ণ মুদ্রার ব্যাপারটি কিন্তু আমার কাছে রহস্যময় থেকে গেল। কৌতূহল হয়ে যুবতীকে জিজ্ঞেস করি কে এই সওদাগর, তাঁর সম্বন্ধই বা কি? কিন্তু বলি বলি করেও কথাটা আর তার কাছে পাড়া হ’য়ে ওঠে নি। যুবতীর বিশেষ অনুরোধে আমাকে আরও কিছুদিন তার বড় ভাই সেজে থাকতে হ’ল।

এক সকালে বতী আমার হাতে কিছু স্বর্ণ মুদ্রা দিয়ে বলল —স্থানীয় বাজারে নামারণ নামে এক বণিকের দোকান রয়েছে, সেখান থেকে এই ফর্দ মিলিয়ে কাপড়-চোপড় কিনে আন। একটা কথা স্মরণ রাখবে, সে কাপড়ের দাম যা চাইবে তাই দিয়ে দেবে। ভুলেও কোন রকম দর কষাকষি করবে না।

ঘাড় বাঁকিয়ে যুবতীর কাছ থেকে বিদায় নিলাম বটে, কিন্তু দর-কষাকষি করতে নিষেধ করার রহস্যটা বুঝতে পারলাম না। যাই হোক যুবতীর নির্দেশে বণিক নামারণ যা চাইল, পাইপয়সা পর্যন্ত মিটিয়ে দিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম।

কয়েকদিন নতুন কিছু ঘটল না। তিনদিন পরে যুবতী আবার আমার হাতে কিছু স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে সেই বণিকের কাছ থেকে কাপড় কিনে আনতে পাঠাল। এবারেও সেই রকমই নির্দেশ—যেন কাপড়ের দাম নিয়ে কোন রকম দরাদরি না করি। আমিও ফর্দ অননুযায়ী কাপড় মিলিয়ে নিয়ে কোন রকম দরদস্তুর না করে বণিকের কাছ থেকে কাপড় নিয়ে ফিরে আসছিলাম। আমার সরল ব্যবহারে বণিক খুবই বিস্মিত ও আনন্দিত হয়ে বললেন—

মহাশয়, আগামীকাল যদি এই দীন-হীনের ঘরে সামান্য আহারাদি করেন, এই অধম ধন্য হবে।

আমি উচ্ছ্বসিত আবেগের সঙ্গে বণিকের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করলাম। কাপড় নিয়ে বাড়ি ফিরে যুবতীকে বণিকের নিমন্ত্রণের কথা বললাম। ব্যাপারটা শনে যুবতীও উল্লাস প্রকাশ করলেন। আমাকে উৎসাহিত করতে গিয়ে বললেন—ভদ্রলোক যখন মুখ ফুটে অনুরোধ করছেন, যাওয়াই উচিত। তবে হ্যাঁ আহারান্তে আপনিও তাঁকে নিমন্ত্রণ করে আসবেন।

যুবতীর কথায় এবং তাঁর আচার-আচরণে মনে কেমন সন্দেহ হ’ল। ভাবলাম এর পিছনে কোন গোপন অভিসন্ধি লুকিয়ে নেই তো। কৌতুহল গোপনই রাখলাম।

পরদিন যথারীতি নিমন্ত্রণ রক্ষা করে বাড়ি ফেরার সময় তাঁর কাছেও আমার বাড়িতে পায়ের ধূলো দেবার জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ রাখলাম। ভদ্রলোকও আমার নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করলেন না।

পরদিন সন্ধ্যায় বণিক আমাদের বাড়ি এলেন। আমি যথোচিত অভ্যর্থনা করে তাঁকে বসতে দিলাম। আহারান্তে ভদ্রলোক বিদায় নেবার পর্বে যুবতী আমার হাতে সুরার পাত্র ধরিয়া দিয়ে বণিককে সুরাপানের জন্য অনুরোধ করতে বললেন। বণিক ও মহা উল্লাসে আমার হাত থেকে সুরার পাত্রটি তুলে নিলেন। সুরাপান, গল্পগুজব এবং হাসিঠাট্টার মধ্য দিয়ে অনেক রাত্রি হয়ে গেল। তাছাড়া অধিক সুরাপানে বণিক খুবই কাহিল হ’য়ে পড়েছেন দেখলাম। অনন্যোপায় হয়ে তাঁকে আমাদের বাড়িতে রাত্রিটুকু কাটিয়ে যেতে অনুরোধ করলাম।

আমার প্রস্তাবে বণিক সহজেই রাত্রিবাসে সম্মত হয়ে গেলেন। ওপরের একটি ঘরে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করে দিয়ে আমি নীচে আমার শোবার ঘরে চলে এলাম। নেশার ঘোরে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতে পারি নি। ঠিক কতক্ষণ পরে হিসাব করে বলা মুস্কিল, এক সময় যুবতী ব্যস্ত হয়ে আমার ঘরে ছুটে এলেন। ডাকাডাকি করে আমাকে ঘুম থেকে তুলে বললেন—মহাশয় তাড়াতাড়ি আসুন, আসুন বণিক নামারণের কী অবস্থা হয়েছে দেখবেন আসনে।

আমি ধড়ফড়িয়ে উঠে ছুটতে ছুটতে বণিকের ঘরের দরজায় পা দিয়েই থমকে দাঁড়ালাম। নিজের চোখ দুটোকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। দেখি হতভাগ্য বণিকের রক্তাপ্লুত মৃতদেহ বিছানায় লুটোচ্ছে। আমি সভয়ে চিৎকার করে উঠলাম–রাক্ষসি! একি করেছিস তুই! লোকটা কী ক্ষতি করেছিল যার জন্য এমন নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করলি। তোর জন্য আমিও অপরাধী হলাম।

আমাকে থামিয়ে দিতে গিয়ে যুবতী বলল–চীৎকার করবেন না, সংযত হোন। আপনার ভয়ের কিছু নেই। এই হতছাড়াটাকে যদি জানতেন তবে আমাকে এমন তিরস্কার করতেন না। এই পাষণ্ডই আমাকে নিষ্ঠুরভাবে ক্ষতবিক্ষত করে কবরস্থ করেছিল ঈশ্বরের অশেষ করুণা যে আমার সবচেয়ে বড় শত্রুকে হত্যা করতে পেরেছি। আমার অতীত কাহিনী শুনুন—মনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর হবে।

যুবতী মুহূর্তকাল নীরবে কাটিয়ে দম নিয়ে বলতে শুরু করলেন— আমি এই দেশের সুলতানের একমাত্র কন্যা। আমার পত্র নিয়ে যাঁর কাছ থেকে বার বার স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে এসেছিলেন, তিনি আমাদের কোষাধ্যক্ষ। এক বিকেলে আমাদের প্রাসাদের উদ্যানে ঘুরে বেড়ানোর সময় হঠাৎ নামারণকে দেখতে পেলাম। প্রথম দর্শনেই তার পেশীবহুল সুঠাম দেহ, গৌরবর্ণ দীর্ঘাকৃতি পুরুষোচিত দেহসৌষ্ঠব দেখেই আমি মনে মনে তাকে আত্মসমৰ্পণ করে বসলাম।

পরে অনুসন্ধান করে জানতে পারলাম যুবক নামারণ সামান্য একজন বণিক মাত্র। অথচ আমি সুলতানের একমাত্র কন্যা, তাই আমাদের প্রণয়-সম্পর্কে’র মধ্যে বিরাট একটা বাধার প্রাচীর সৃষ্টি হ’ল।

কিন্তু তার প্রেমে আমি এমনই মুগ্ধ হলাম, নিজেকে এমনভাবে জড়িয়ে ফেললাম যে সেখান থেকে সরে আসা আমার পক্ষে সাধ্যাতীত হয়ে পড়ল। প্রেম-রোগাক্রান্ত হয়ে আমি দিনদিন হতস্বাস্থ্য ও রুগ্ন হ’য়ে পড়তে লাগলাম। আমার দেহে কঠিন রোগ ভর করল। আমার ধাত্রী মা ছিলেন অত্যন্ত স্নেহ পরায়ণা, আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। বুদ্ধিমতী ও সুচতুরা মহিলাটি অনেক চেষ্টা-চরিত্র করে আমার রোগের কারণ জানতে পারলেন। তিনি একরাত্রে নামারণকে নারীবেশে আমার ঘরে নিয়ে এলেন। এবার প্রতি রাত্রেই সে আমার ঘরে রাত্রি কাটাতে লাগল। দিনের বেলায় ঘরের গোপন স্থানে তাকে লুকিয়ে রাখতাম।

কিছুদিন সুখভোগের পর সে আমার কাছ থেকে মাত্র দু’এক দিনের জন্য ছুটি নিয়ে নিজের বাড়ি গেল। এর পর থেকে নিজের বাড়িতেই থাকত। মাঝে মধ্যে রাত্রির অন্ধকারে চুপি চুপি এসে আমাকে সঙ্গদান করে আবার গোপনে প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে যেত। এমনিভাবে আমাদের গোপন অভিসার চলতে লাগল। একদিন ভাবলাম সে তো প্রায়ই আমার বাড়িতে আসে, কিন্তু, একদিন আমি যদি তার ঘরে যাই তবে হয়ত সে আরও বেশী সন্তুষ্ট হবে। এ-রকম চিন্তা করে এক রাত্রে গুটি গুটি নামারণের বাড়ি গিয়ে হাজির হলাম। তার শোবার ঘরের দরজায় পা দিতেই শরীরের সব কটা স্নায়ু যেন একসঙ্গে সচকিত হয়ে উঠল। তার ঘরে নারী-কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। উঁকি মারতেই আরও বিস্মিত হ’তে হ’ল। দেখি এক যুবতী নামারণের সঙ্গে সুরাপান করছে এবং হাসি-তামাশায় মত্ত। উন্মাদিনীর মত ঘরে ঢুকে যুবতীটির চুলের মুঠি ধরে হেঁচড়ে ঘর থেকে বের করে দিলাম।

এই শয়তান বণিক আমার পা দুটো জড়িয়ে ধরে মায়াকান্না, জড়ে দিল—প্রাণেশ্বরী, অপরাধ ক্ষমা কর। তোমার পা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করছি, ভবিষ্যতে আর এমন কুকর্ম করব না। তোমাকে ছাড়া অন্য কোন নারীর প্রতি আকৃষ্ট হ’ব না।

প্রেমিকের চোখের জল দেখে আমার মন গলে গেল। তাকে বুকে টেনে নিয়ে সব দোষ ক্ষমা করে দিলাম।

বণিক নামারণ আমার হাতে সারার পাত্র তুলে দিয়ে বলল— প্রিয়ে তুমি অস্থির-চঞ্চল। সামান্য সুরাপান করলে তুমি সুস্থবোধ করবে।

আমিও সরল বিশ্বাসে সুরার পাত্র মুখে তুলে নিলাম। ঝোঁকের বশে সুরাপান মাত্রাতিরিক্ত হয়ে যাওয়ায় আমি নেশাগ্রস্ত হয়ে এলিয়ে পড়লাম। দুষ্ট বণিক সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে গিয়ে একটি ছুরি দিয়ে বার বার আমার শরীরে আঘাত করতে লাগল। আমি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললাম। মুহূর্তকাল নীরবে কাটিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে যুবতী আবার বলল—তার পরের কাহিনী আমার চেয়ে তো আপনিই ভাল বলতে পারবেন। তাই তাকে হত্যা করে প্রতিশোধ নিতে বাধ্য হলাম। আশা করি এবার আমাকে আর অপরাধী বলবেন না। আপনার কাছে আমার একটা অনুরোধ, আমাকে আমাদের বাড়ী পৌঁছে দিন। আমাকে কাছে পেয়ে আমার বাবা অবশ্যই খুবই আনন্দিত হবেন, আপনার ভাগ্যও এতে প্রসন্ন হবে। আমার জীবন দানের জন্য আপনাকে প্রচুর ধনরত্ন দিয়ে পরস্কৃত করবেন এবং যথোচিত আদর-আপ্যায়ন করবেন সন্দেহ নেই।

আমি তাঁর আমন্ত্রণ প্রত্যাখান করে বললাম—ধন-রত্নের প্রতি আমার লিপ্সা নেই। আমার শুধুমাত্র এইটুকুই আক্ষেপ অহেতুক আমি নামারণের মৃত্যুর কারণ হলাম। আপনার উচিত ছিল সর্বাগ্রে ব্যাপারটা নিয়ে আমার সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করা। প্রয়োজনবোধে তার অন্য কোন শাস্তির ব্যবস্থা করা যেত। যুবতীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সেই নগর ছেড়ে চলে এলাম।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *